ডিজিটাল ভারত {লেখাটি প্রতিলিপি বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত।}

36271711_998507660324983_1780579280690872320_n   মেনকা নামে খোনা গলায় কথা বলা এক অত্যন্ত দরিদ্র মহিলা আমাদের বাড়িতে দীর্ঘদিন কাজ করেছিল। কোন শব্দ ‘র’ দিয়ে শুরু হলে, সে উচ্চারণ করতে পারতো না। কিন্তু শব্দের মাঝে বা শেষে ‘র’ থাকলে  দিব্যি উচ্চারণ করতে পারতো। শুধু এই কারণে, সে রাম বলতে না পারলেও মরা বলতে পারতো। তাকে আমি খুব দ্রুত মরামরামরামরা বলতে বললে দিব্যি বলতে পারতো, কিন্তু মরামরার ম এর পরে একটু শ্বাস নিতে বললে কিন্তু মআ হয়ে যেত। এতে ওর ভবিষ্যতে স্বর্গবাসে, বা ভূতের ভয় পেলে, অসুবিধা দেখা দেবে কী না জানি না, তবে আমাদের কোন অসুবিধার কারণ হতো না। কিন্তু আম অর্থাৎ রাম, দেবতা হয়েও, হয়তো বা এহেন চরম অপরাধের জন্যই তাকে নির্মম বিপদে ফেললেন। আমাদের বাড়ি রামরাজাতলা নামে একটা জায়গায় ছিল। এখানে বছরের কয়েক মাস ধরে বিরাট ধুমধাম করে রাম পূজো হয়। সকলের মুখে মুখে রামরাজাতলা একদিন রামতলা নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছিল।

সে যাহোক এহেন মেনকাদি একদিন কি কারণে হাওড়া গিয়েছিল। রামতলা থেকে বাস ও মিনিবাস হাওড়া যায়, কাজেই তার কোন অসুবিধা হয়নি। ফেরার পথে লোককে জিজ্ঞাসা করে করে সে মিনিবাসে ওঠে। টিকিট কাটার সময় সে কন্ডাক্টারকে একটা আমতলার টিকিট দিতে বললে, কন্ডাক্টার তাকে টিকিটও দেয়। আমতলায় তাকে নামতে বললে সে জানায় এখানে নয়, যে আমতলায় আম পূজো হয়, সেই আমতলায় যাবো। হাওড়া থেকে আমতলা ও.পি. পর্যন্ত এই মিনিবাসটা রামতলার প্রায় কাছে, সাঁত্রাগাছি মোড় নামে একটা জায়গা থেকে, বাঁদিকে ঘুরে আমতলা আউট পোস্ট পর্যন্ত যেত। যাহোক শেষপর্যন্ত তার বিবরণে আমতলা রহস্য সমাধান করতে পারায়, দয়ালু কন্ডাক্টার তাকে মিনিবাস থেকে নামতে বারণ করে, এবং ফেরার পথে রামতলার কাছাকাছি স্টপেজ, সাঁত্রাগাছি মোড়ে নামিয়ে দিয়ে যায়।

কথাপ্রসঙ্গে একদিন মেনকাদিকে মা হঠাৎ বলে যে “দাদা চাঁদে জমি কিনছে, ওখানেই বাড়ি করবে”। মেনকাদি প্রথমে অবিশ্বাসের সুরে বলে, “চাঁদে কেউ জমি কেনে নাকি, ওখানে কি মানুষ থাকে”? আমরা ওর কথা শুনে খুব হাসাহাসি করলাম। ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “কিন্তু আমি তাহলে কি করে ওখানে কাজ করতে যাবো”? মা বললেন, “চিন্তা করছো কেন, দাদাতো সিঁড়ি করে দেবে”। উত্তরে সে শুধু বললো, “রোজরোজ আমি অতো সিঁড়ি ভাঙতে পারবুনি বাপু, তোমরা তাহলে অন্য কোন কাজের লোক দেখে নিও”।

এই মেনকা দি মাঝেমধ্যেই সামান্য কিছু টাকা পয়সা চাইতো। অত্যন্ত গরীব হওয়ায়, ও মাকে তাঁর কাজে সাহায্য করায়, আমরা দিয়েও দিতাম। সত্যিকথা বলতে কি, আমাদের সে খুব ভালোওবাসতো। তাকে মাঝেমাঝে মাথা বেছে দিতে বলতাম। মাথা বেছে দেওয়া মানে, চুলটা একটু নেড়েচেড়ে দেওয়া। মুশকিল একটাই ছিল, ও কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর নিজের দুই আঙুলের নখ দিয়ে উকুন মারার মতো করতো, যে কেউ দেখলে ভাবতেই পারে, যে আমার মাথায় উকুনের চাষ আছে। তবে দশ-পনেরো মিনিট মাথা বাছার পরে, দুঃসাধ্য যেকোন পড়া অবলীলাক্রমে মুখস্থ করে ফেলা, বা  যেকোন কঠিন অঙ্কের সমাধান করে ফেলা, কিছুমাত্র কঠিন কাজ বলে মনে হতো না।

একদিন সে আমাকে বললো, “আঙা সনকার বিয়ে ঠিক হয়েছে, তোকে কিন্তু বরের আংটিটা দিতে হবে”।

অলকা আর সনকা নামে ওর দুটো মেয়ে আছে শুনেছিলাম, তাই জিজ্ঞাসা করলাম, “অলকার বিয়ে না দিয়ে সনকার বিয়ে ঠিক করতে গেলে কেন”?

উত্তরে সে শুধু বললো, “আমি কি আর ঠিক করেছি? দুই মেয়ের মধ্যে সনকা তো একটু চাখাচোখা, তাই ঘটক ওকেই বিয়ের জন্য পছন্দ করেছে। তোকে কিন্তু বরের আংটিটা দিতেই হবে?”

জিজ্ঞাসা করলাম “ঘটক নিজেই ওকে বিয়ে করছে”?

“না, তা কেন? ঘটক নিজে ওর সম্বন্ধ এনেছে। আংটি দিবি তো আঙা”?

“পাত্র কি করে”?

“তা আমি কি করে জানবো, আমি কি তোদের মতো নেকাপড়া শিকেচি”?

“পাত্রের বয়স কতো, দেখতেই বা কেমন”?

“আমি কি পাত্রকে দেখেছি যে বলবো? ঘটক তো বললো দেখতে বেশ ভালো, তোমার সনকার সাথে মানাবে”।

“পাত্র থাকে কোথায়”?

“ঘটক তো বললো ওদের বাড়ি আছে, মাটির ছোট বাড়ি হলেও নিজেদের”।

“হ্যাঁগো, জামাই বেঁচে আছে তো”?

ও বোধহয় বলতে যাচ্ছিল যে তা আমি কি করে জানবো, ঘটক জানে। কিন্তু শেষপর্যন্ত নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,   “যাঃ, কি যে বলিস, বেঁচে না থাকলে ঘটক কি আর বিয়ের সম্বন্ধ করতো”?

মেয়ের বিয়ের জন্য কয়েকদিন কামাই করে যেদিন সে আবার কাজে যোগ দিলো, সেদিনই তার কাছ থেকে জানতে পারলাম যে জামাই নাকি চোর, বিয়ের আসর থেকেই পুলিশ তাকে বালা পরিয়ে ধরে নিয়ে গেছে। আংটি না দেওয়ার জন্য নিশ্চিন্ত বোধ করলাম।

এরও কয়েক মাস পরে শুনলাম, বর এখনও জেলে থাকায় সনকা নাকি আবার কাকে বিয়ে করেছে। এবারের সম্বন্ধটাও ঘটকের দেওয়া কী না জিজ্ঞাসা করলাম না, সেটাও সম্ভবত ঘটক জানে।

আমি চাকরি বাকরি করে আধবুড়ো হয়ে যাওয়ার পরও কিন্তু, মেনকাদি তার এই আঙাকে ভোলেনি। মাঝেমাঝে আমার বাড়িতে এসে মাথায় মাখার জন্য একটু নারকেল তেল, বা সামান্য কিছু সাহায্য চাইতো। সামান্য কিছু খাবার ও সাহায্য, সাথে মাথায় মাখার একটু নারকেল তেল পেয়ে তার মুখটা কিরকম উজ্জ্বল হয়ে যেত, আজও ভুলতে পারলাম কই? জানি না সে আজও বেঁচে আছে কী না। যে লোকেই থাকুক, সে ভালো থাকুক, শান্তিতে থাকুক।

সুবীর কুমার রায়

৩০-১২-২০১৮

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s