ইলিশ উৎসব{লেখাটি প্রতিলিপি বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত}

36271711_998507660324983_1780579280690872320_n ইদানীং দেখছি বাঙালির সব উৎসবকে ছাপিয়ে একটা উৎসব মাথাচাড়া দিয়ে প্রথম শ্রেণীতে স্থান করে নিয়েছে। সেটা আর কিছু নয়, ইলিশ উৎসব। বাজারে ইলিশ মাছের জোগান থাকুক বা না থাকুক, বাড়িতে সপ্তাহে দু’-তিন দিন ইলিশের পদ রান্না হোক বা না হোক, ইলিশ উৎসবে যোগ দিয়ে ইলিশের স্বাদ আস্বাদন করে সবাইকে সেই সুসংবাদটা ঘটা করে না জানালে, সমাজে স্টেটাস্ বজায় রাখা দায় হয়ে পড়ে।

বিভিন্ন কারণে আমি আজ পর্যন্ত সেই উৎসবে যোগদান করতে না পারায়, একপ্রকার একঘরে হয়ে আছি। অথচ এই ইলিশ আমার অত্যন্ত প্রিয় একটি মাছ। বাজারে তার মূল্য যাই হোক না কেন, তাকে আদর করে রান্নাঘরে নিয়ে আসতে কখনই দ্বিধা বা কার্পণ্য করি না। তবে একবার অদ্ভুতভাবে ছলচাতুরির মাধ্যমে আমার এই ইলিশ ভক্ষণের সুযোগ হয়েছিল, বলা যায় বিনা পয়সায় একটা ঘরোয়া ইলিশ উৎসবে যোগ দেওয়ার সুযোগ এসেছিল। আজ হঠাৎ সেই দিনটার কথা মনে পড়ে গেল, তাই সেই গল্পই আজ বলবো।

আজ থেকে প্রায় একত্রিশ বছর আগে, তখন আমি দক্ষিন বঙ্গের একটি জেলার একটি সদর শহরে একটা লজে থেকে, প্রায় সতেরো-আঠারো কিলোমিটার দূরের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে চাকরিসূত্রে যাতায়াত করি। অফিস থেকে কয়েক কিলোমিটার পথ ভ্যান রিক্সায় গিয়ে, একটা নদীর প্রায় মোহনার কাছ থেকে নৌকা পার হয়ে, ভাঙাচোরা রাস্তায় প্রায় চোদ্দো কিলোমিটার পথ লজঝড়ে বাসে করে আমার লজে যেতে হতো। আমার সাথে আমার অফিসেরই একজন সহকর্মী, দেবাশীষ একসাথে যাতায়াত করতো। অবিবাহিত দেবাশীষ আমার লজের পিছনদিকে সামান্য দূরে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতো, এবং আমারই মতো চন্দনের ঝুপড়িতে রাতে খেতে যেত।

সেবছর নদীতে হঠাৎ প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। গঙ্গা বা রূপনারায়ণ না হলেও, ওই এলাকার ইলিশ এখনও সব বাজারেই প্রচুর দেখা যায়। সবথেকে বড় কথা, যেমনই হোক সেটা ইলিশ, এবং বেশ তাগড়াই সাইজের ইলিশ। ইলিশ আমার অত্যন্ত প্রিয়, এবং দিনের পর দিন মাসের পর মাস চন্দনের ঝুপড়িতে খেয়ে খেয়ে, জিভে চড়া পড়ে গেছে। বিকেলের শেষভাগে, প্রায় সন্ধ্যার মুখে আমি আর দেবাশীষ ভ্যান রিক্সা থেকে নদীর পারে নেমে দেখি রাস্তার ধারে স্তুপীকৃত, প্রায় পাহাড় প্রমাণ ইলিশ জড়ো করা আছে। প্রায় গোটা ব্লকেই তখনও বিদ্যুৎ বা টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়নি, কাজেই মাঝেমধ্যে কাঠি আইসক্রীম ছাড়া, বরফের দেখা পাওয়া ভার। পরিবহণ ব্যবস্থার হালও তথৈবচ। তিনটে-সাড়ে তিনটের পর, হাওড়া-কলকাতা যাওয়ার বাসের জন্য, বড় রাস্তায় যাওয়ার বাস যোগাযোগও প্রায় অনিশ্চিত ছিল। কতদিন বাড়ি ফেরার জন্য, ওই ছাব্বিশ-সাতাশ কিলোমিটার পথ বাসের অভাবে ভ্যান রিক্সায় যেতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। কাজেই বরফ দিয়ে মাছকে তাজা রাখা, বা হঠাৎ ব্যবস্থা করে দূরের কোন শহরে মাছ পাঠানোর ব্যবস্থা করা, প্রায় অসম্ভবই ছিল।

সে যাহোক যেকথা হচ্ছিল। আমাকে দেখেই ইলিশের পাহাড়ের মালিক এসে পাকড়াও করলো, “বাবু টাটকা ইলিশ, দুটো নিয়ে যান, আমি বেছে দিচ্ছি”। সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু লোক এগিয়ে এসে আমায় দুটো ইলিশ নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে শুরু করলো। করবে নাই বা কেন, আমি যে গোটা ব্লকের দু’-দুটো অঞ্চলের প্রায় আশিটা গ্রামের প্রভুত অর্থনৈতিক উন্নতি করাবার পবিত্র দায়িত্ব নেওয়ার জন্য একমাত্র ঠেকা  নিয়ে গেছি, আমি যে একমাত্র রূরাল ডেভেলপমেন্ট্ অফিসার, বা ফিল্ড অফিসার। ওদের ভাষায় ফিলটার বাবু।

পাকা তেঁতুল দেখলে বা নাম শুনলে যেমন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই রসনা সিক্ত হয়, অত ইলিশের উপস্থিতি ও দু’-দুটো রাক্ষুসে সাইজের ইলিশ নিয়ে যাওয়ার অনুরোধও, চন্দনের ঝুপড়ির ছাইপাঁশ খাওয়া আমার শুকনো জিভে জল এনে দিলো। কিন্তু উপায় নেই, কারণ আমি একটা লজে থাকি, আর অবিবাহিত দেবাশীষও একা একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে, এবং উভয়েই রাতে চন্দনের ঝুপড়িতে পেট ভরাতে যাই। সন্ধ্যার পর থেকে চন্দনের ঝুপড়িতে আমাদের মতো হতভাগ্যদের ভিড় শুরু হয়ে যায়। এতো খদ্দেরের জন্য ভাত, রুটি, ডাল, সবজি, মাছ, মাংস, ইত্যাদি একা হাতে রান্না করতে চন্দন হিমশিম খেয়ে যায়। তার ফুলবাবু পুত্র ও একজন কর্মচারী তাকে নামমাত্রই সাহায্য করে। কাজেই তাকে দিয়ে মাছ কাটিয়ে রান্না করে দেবার প্রস্তাব মোটেই কার্যকরি হবে না বুঝে লোভ সংবরণ করে বললাম, “না গো আমার অসুবিধা আছে”।

ইলিশ বিক্রেতা আমায় চেনে, হয়তো আমাদের দেওয়া লোনের টাকাতেই তার নৌকা বা ট্রলার কেনা। সে বোধহয় আমার কাছে যথেষ্ট টাকা নেই ভেবে বললো, “দুটো মাছ নিয়ে যান বাবু, সস্তায় দিয়ে দেবো”। আমার নেওয়ার উপায় নেই, তাই নেবো না বলায় সে বললো, “আজ নিয়ে যান, সুবিধা মতো পরে দাম দিয়ে দেবেন”। এই প্রস্তাবেও রাজি না হওয়ায়, সে দুটো মাছ নিয়ে আমায় বললো, “আপনাকে কোন দাম  দিতে হবে না ফিলটার বাবু, এতো মাছ উঠেছে আর আপনি খাবেন না তাই কখনও হয়? আপনি এই দুটো নিয়ে যান”। আমার রাজি হওয়ার কোন উপায় নেই, তাই অন্য একদিন হবে বলে নৌকার দিকে এগিয়ে গেলাম।

দেবাশীষ একবার চন্দনকে কিছু টাকা দিয়ে রান্না করিয়ে নিলে কেমন হয় জিজ্ঞাসা করলে, তাকে আমার অতীতের এক এই জাতীয় তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানালাম। উনিশশ’ আশি সালে একবার বেড়াতে গিয়ে চন্ডীগড়ের এক লজে উঠেছিলাম। ওখানে ডিম খুব সস্তা দেখে, ওই সেক্টরের সুপার মার্কেট থেকে একগাদা ডিম কিনে নিয়ে এসেছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল না, কারণ লজটায় রান্না করার কোন সুযোগ ছিল না, এবং কেয়ারটেকার হয়তো ডিমগুলো সিদ্ধ করে দিতে নাও রাজি হতে পারে। কিন্তু আমার বন্ধুর বুদ্ধিতে অতগুলো ডিম কিনে লজে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। ওর যুক্তি ছিল, চাঁদির জুতো মারলে সবাই সব কাজ করে দেয়। কিন্তু হাজার অনুরোধ, পয়সার লোভ দেখিয়েও বাস্তবে কোন লাভ না হওয়ায়, আবার সেই দোকানে গিয়ে ফেরৎ দেবার চেষ্টা করা হলো। ফেরৎ দেওয়াও সম্ভব না হওয়ায়, পাশের এক দোকান থেকে সিদ্ধ করার ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু যাতায়াতের পথে যেভাবেই হোক বেশ কয়েকটা ডিম ফেটে যাওয়ায়, ও বাকি ডিমগুলো সিদ্ধ করে দেওয়ার পারিশ্রমিক দিয়ে প্রতিটা ডিমসিদ্ধের যা দাম দাঁড়ালো, একটা পাঁচতারা  হোটেলেও বোধহয় ডিমসিদ্ধের মূল্য তার থেকে কম।

সে যাহোক আমরা দুজনে হাতের ইলিশ পায়ে ঠেলে ভগ্ন হৃদয়ে নৌকায় গিয়ে উঠলাম। নৌকা যখন দড়িদড়া খুলে প্রায় ছেড়ে দেবে, হঠাৎ দেবাশীষ নৌকা থেকে নেমে এক প্রকাণ্ড ইলিশ কিনে আনলো। ওর আর আমার, উভয়েরই একই সমস্যা, তাই জিজ্ঞাসা করলাম এটা নিয়ে গিয়ে সে কি করবে। উত্তরে সে জানালো, যে সে এটা তার বাড়িওয়ালিকে প্রেজেন্ট করবে। বাড়িওয়ালার ছোট সংসার, কাজেই সে অবশ্যই ইলিশের ভাগ পাবে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। বললাম, “তোর তবু বাড়িওয়ালি আছে, আমার যে কেউ নেই’।  দেবাশীষ আমায় বললো, “আজ রাতে চন্দনের ঝুপড়িতে খেতে না গিয়ে, রাত সাড়ে ন’টা-দশটা নাগাদ আপনি আমার বাড়ি চলে আসুন, বাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দিন”। সেই ব্যবস্থাই পাকা করে একসময় আমরা যে যার ডেরায় চলে গেলাম।

কথামতো রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ তৈরি হয়ে, ফুরফুরে মেজাজে, গুনগুন করে একটা গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে দেবাশীষের বাসায় হাজির হয়ে চিৎকার করে ডাকলাম, “দেবাশীষ বাড়িতে আছিস নাকি”? বোধহয় সাবধানতা রক্ষার্থেই, সে আমার তৃতীয়বার চিৎকারের পরে ভিতর থেকে উত্তর দিলো, “কে-এ-এ-এ-এ-এ”? এইবার দরজা খুলে আমায় দেখে যেন ভীষণ অবাক হয়ে গলার পর্দা পাঁচ ডেসিবেল চড়িয়ে বললো, “আরে সুবীরদা আপনি হঠাৎ, ভিতরে আসুন ভিতরে আসুন”। এবার সে তার বাড়িওয়ালা ও বাড়িওয়ালির সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো, “আমার অফিসার, খুব ভালো লোক, এই সামনেই একটা লজে থাকেন”। এরপর সে নিজেই বললো, “ঘরে এসে বসুন, ভালো দিনে এসেছেন। এসেছেনই যখন, তখন গরিবের বাসায় দুটো ভাত খেয়ে যাবেন কিন্তু”।

আমিও প্রচণ্ড অনিচ্ছা ও যারপরনাই অবাক হবার ভান করে বললাম, “তুই হঠাৎ চন্দনের ঝুপড়ি ছেড়ে রান্নাবান্না শুরু করলি কবে যে খাওয়াবি? জানা ছিল নাতো”। এবার ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা, উভয়েই  আমাকে তাদের বাসায় আজ দেবাশীষের সাথে রাতে খেয়ে যেতে অনুরোধ করলেন। এটা তো মানতেই হবে, যে এই অনুরোধ রক্ষা না করলে, তাঁদের চরম অপমান করা হবে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিমরাজি হয়ে দেবাশীষের ঘরে গিয়ে বসলাম।

যথা সময়ে বেশ বড় বড় দুটুকরো ইলিশ দিয়ে ভাত খেয়ে লজের উদ্দেশ্যে বেরোলাম। দেবাশীষ আমাকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য আমার সাথে চললো। আমি বললাম, “তোর বাড়িওয়ালি বড় ভালো রান্না করে রে।  আজ তো অর্ধেক মাছ আমরা দুজনেই সাঁটিয়ে দিলাম, ওদের বোধহয় কম পড়বে। আগামীকাল আমি তোর বাড়িওয়ালিকে দুটো মাছ প্রেজেন্ট করবো”। দেবাশীষ বললো, সেটা ঠিক হবে না, ওরা তাহলে বুঝতে পারবে যে আজকের ঘটনাটা সাজানো। কাজেই সেই সুযোগ আর পাওয়া গেল না। পরের দিন থেকে রাতে আবার সেই চন্দনের দোকানের ছাইপাঁশ ভক্ষণ শুরু হলো।

সুবীর কুমার রায়

১৭- ০৭- ২০১৯

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s