অপাঙক্তেয় খেলা (স্মৃতির পাতা থেকে) { লেখাটি বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত। }

ছোটবেলায় সাতগুটি, হুস্ হুস্, শিরগীজ, ইত্যাদি নানা খেলা নিয়ে বিকেলবেলাটা মেতে থাকতাম। গুলি খেলারও খুব নেশা ছিল, কিন্তু গুলি কেনার সামর্থ ছিল না। তাছাড়া বাবা গুলি খেলা পছন্দও করতেন না। মা’কে পটিয়ে পাটিয়ে নানাভাবে গুলি কিনতাম। আজ আমি মানুষ হয়েছি কী না জানি না, তবে আমি জোর গলায় একথা বলতে পারি, মা না থাকলে আমি বড়ই হতাম, মানুষ হতে পারতাম না। আমি আমার সুন্দর, নানা অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ ছেলেবেলাটা হারাতাম। আমার সব ভাইবোন আজ স্বীকার করবে কী না জানি না, তবে এটা সত্য যে, আমরা যে আজ বড় হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি, তার পিছনে মা’র প্রত্যক্ষ মদত, সহযোগীতা ও আত্মত্যাগ, মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। আমরাই বোধহয় সেই স্নেহ ও আত্মত্যাগটুকু নিংড়ে নিয়ে বড় হয়ে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান, আশা আকাঙ্খা থেকে বঞ্চিত করেছি, অবহেলা করেছি, মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের মতো করে নতুন ধারায় বয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।

ভাবলে খুব কষ্ট হয় যে, আজকালকার একটা ছেলেও সাতগুটি, পিট্টু, শিরগীজ, রুমাল চোর খেলার নামই শোনে নি। আজ একটা মেয়েকেও আর এক্কা-দোক্কা খেলতে দেখি না। অথচ এই খেলাটা, আমরাও ছোটবেলায় বোন ও তার বান্ধবীদের সাথে খেলতাম। মাঠের অভাবে নাহয় ছেলেদের খেলা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু মেয়েদের এই এক্কা-দোক্কা খেলতে বাধা কোথায়? এই খেলাটাতো একসময় মেয়েদের জাতীয় খেলা ছিল বলা যায়। খেলতে মাঠ বা স্টেডিয়ামও লাগে না, ঘরের মধ্যে, দালান, ছাদ, বা উঠনেও ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বর্গফুট ফাঁকা জায়গা পেলেই খেলা যায়। এখন ক’টা ছেলে সাইকেলের রিম নিয়ে চাকা চালায়? চোখে তো পড়ে না। অথচ হাজার বাধা বিপত্তির মধ্যেও, এটা ছিল আমাদের একটা অতি প্রিয়, আনন্দের, ও আকর্ষণীয় খেলা। তবে কী আজকালকার ছেলেমেয়েরা সব সভ্য, আমরাই অসভ্য ছিলাম? কী জানি, রাস্তাঘাটে পোষাক, কথাবার্তা, আলাপ আলোচনা দেখলে ও শুনলে তো তা মনে হয় না।

আসলে আমরা, সাহেব বাবা-মা’রা আমাদের একটা বা দু’টো সন্তানকেও সাহেব ব মেমসাহেব বানাতে ব্যস্ত। নীগারদের ঐ সব নোংরা খেলা আমাদের সহ্য হবে কেন? তাই আমরা খেলার জন্য ভিডিও গেম বা মুঠো ফোন কিনে দিতে, নন্টে ফন্টে, হাঁদা ভোঁদা, বা বাঁটুল দি গ্রেট এর পরিবর্তে হ্যারি পটার, স্পাইডার ম্যান ইত্যাদি কিনে দিতে বেশি পছন্দ করি। যেখানে বাড়ির আশেপাশে খেলার মাঠই নেই, সেখানে তেপান্তরের মাঠের মতো অবাস্তব মাঠের প্রয়োজনীয়তা দেখি না। ঠাকুরমার সাথেই সম্পর্ক নেই, তো তার আবার ঝুলি!

সুবীর কুমার রায়।
০৪-০৫-২০১৬

Like

 

Like

 

Love

 

Haha

 

Wow

 

Sad

 

Angry

Comment

Advertisements

এক টুকরো কৈশোর {লেখাটি বাংলায় লিখুন ও বই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত}

একদিন বার্ষিক পরীক্ষা শেষে আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠলাম। নতুন নতুন বই হ’ল। নতুন বই কিনে দেবার ক্ষমতা বাবার ছিল না। আমরা অনেক ভাইবোন, সকলের পড়াশোনার খরচ চালাতে, বাবা হিমশিম খেতেন। তাছাড়া তখন একটা রেওয়াজ ছিল, সেকেন্ড হ্যান্ড বই কেনা। বেশির ভাগ ছেলেমেয়েই নতুন শ্রেণীতে উঠে, ওপরের শ্রেণীর কোন ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে তার বইগুলো অর্ধেক দামে কিনে নিত। আর তারা নিজেরাও পুরাতন বই অর্ধেক দামে বেচে দিয়ে, তাদের নিজেদের নতুন শ্রেণীর বই একই প্রথায়, ওপরের শ্রেণীর কোন ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে, অর্ধেক দামেই কিনে নিত। এইভাবে প্রতিটি বই-ই বেশ কয়েকবার হাত ফেরি হ’ত। কিন্তু সেকেন্ড হ্যান্ড বই কখনও থার্ড, ফোর্থ, বা ফিফথ্ হ্যান্ড হিসাবে গণ্য হ’ত না, এবং বইয়ের দাম সব সময়েই বই এর আসল দামের অর্ধেকই থাকতো। এখনকার মতো তখন বই নিয়ে প্রকাশক, স্কুল, বা প্রশাসনের মধ্যে পার্টনারশীপ ব্যবসা চালু না থাকায়, বছর বছর বই পরিবর্তন করার রেওয়াজ একেবারেই ছিল না।

মনে পড়ে বইগুলোর পাতায় কত কী যে লেখা থাকতো। বই এর পাতায় কবিতার ছন্দে লেখা— “এই বই যেইজন করিবে হরণ, ভগবানের হাতে হবে নিশ্চিত মরণ”। খাসা কবিতা, তবে কবির পরিচয় আজও জানা হ’ল না। আবার কোন বই এর পাতায় লেখা— বই এর মালিককে চিনতে হলে ১২ পৃষ্ঠা খুলুন। ১২ পৃষ্ঠা খুলে দেখা গেল লেখা আছে— আমাকে চিনতে হলে ৫৫ পৃষ্ঠা খুলুন। ৫৫ পৃষ্ঠায় লেখা আছে— আমাকে চিনতে হলে ২১ পৃষ্ঠা খুলুন। এইভাবে বহুবার বিপুল আগ্রহে বই এর মালিকের নির্দেশ মতো সামনে পিছনে পাতা উল্টিয়ে দেখা গেল তার নাম লেখা আছে। বইটা এত পুরানো, যে খোঁজ নিলে দেখা যাবে সে হয়তো আমার বাবা বা কাকার ক্লাশমেট ছিল।

আমাদের বাড়িতে পূজাআর্চার চল, কোন কালেই ছিল না, আজও নেই। মা’কে দেখেছি এক জায়গায় কতগুলো ঠাকুর-দেবতার বাঁধানো ছবি রাখতে। ঠাকুর দেবতাদের অবস্থাও আমাদের মতোই অসচ্ছল ছিল। সামান্য ফুল বাতাসা ছাড়া, তাঁদের তেমন কিছুই জোটেনি। লক্ষীপূজার দিন আমাদের বাড়ির একটা সিঁদুর মাখা, রঙচটা লক্ষীনারায়ণের বাঁধানো ফটো কাকার বাড়ি নিয়ে যাওয়া হ’ত। কাকার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই ভালো ছিল। ঠাকুরমা সেখানেই থাকতেন। কাকার বাড়িতে খুব ধুমধাম করে লক্ষীপূজা হ’ত। আমাদের হতশ্রী, হতদরিদ্র লক্ষীনারায়ণ, সেই পূজার জায়গায় বি ক্লাশ সিটিজেনের মর্যাদায়, একপাশে বসবার অধিকার পেতেন। বড়লোক মেয়ে জামাই আর দরিদ্র ঘরজামাই ও মেয়ে, জামাই ষষ্ঠিতে একই শ্বশুর বাড়িতে, যে ধরণের বৈষম্যমুলক খাতির যত্ন পায়, এই দুই লক্ষীনারায়ণ যুগলও সেই ধরণের খাতির যত্ন পেতেন। ফলে তাঁদের কৃপাদৃষ্টি, তাঁদের আনুকুল্য, আমাদের ভাগ্যে তেমন জোটেনি। লক্ষী সারা জীবন মুখ ঘুরিয়েই থেকেছেন, নারায়ণ কী উপকারে লাগেন জানি না, তবে আমাদের জন্য তিনি কিছুই করেন নি। তাঁকে দোষ দেওয়াও যায় না। তাঁর প্রতি আমার ব্যবহার, তাঁকে হয়তো আমাদের সুনজরে দেখা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেছিল। সেকথা সময়, সুযোগ থাকলে পরে বলা যাবে। সরস্বতী বোধহয় কিছুদিন আশায় আশায় থেকেছিলেন। তাই বাবা ও বড়দিদিকে তাঁর ভান্ডার থেকে যথেষ্ট ত্রাণ সামগ্রী উজাড় করে দিতে, কার্পণ্য করেন নি। তবে সেটা যে সরস্বতীরই দান, সে কথা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারবো ন। কারণ এই দু’জনেই ছিলেন ইংরাজী ভাষায় পারদর্শী।

সুবীর কুমার রায়

০৩-০৪-২০১৭

অতীতের পাতা থেকে { লেখাটি বাংলায় লিখুন ও বই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

বাবার সাথে বাজার করতে যেতে বেশ ভালো লাগতো। তবে ব্যাপারটা ছিল খুবই কষ্টকর। বাবার বাজার করার একটা নেশা ছিল। কোন্ জিনিসটা ভালো কোনটা ভালো নয়, কোন সবজি ভালো কী না কিভাবে বুঝতে হয়, তিনি খুব ভালো বুঝতেন। আমাদের শেখাবার চেষ্টাও যথেষ্টই করেছিলেন। কিন্তু আজও আমরা কোন ভাইবোনই সেটা শিখে উঠতে পারি নি। হয়তো সেভাবে শেখার চেষ্টাও করি নি, বা শেখার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করি নি।

প্রচন্ড অর্থকষ্টে আমাদের দিন কাটতো। তবে ঐ অর্থাভাবের জন্য আমাদের আহারটা প্রায়শঃই বেশ রাজকীয় হ’ত। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, ঘটনাটা সত্যি। মাসের প্রথম সপ্তাহের পর থেকেই টাকা পয়সার অভাব দেখা দিত। তার অনেক কারণও ছিল, সে কথা এখন থাক, পরে সুযোগ হলে বলা যাবে । আর এই অর্থাভাবের সময়েই আমাদের অতিপ্রিয় খাসির মাংস ভাত খাবার দিন আসতো। বাজারে একটা মাংসের দোকান ছিল। দোকানের মালিক অতন্ত চতুর ও পাকা ব্যবসাদার ছিল। সে বাবাকে মাষ্টারবাবু বলতো এবং বাবাকে জোর করে মাংস চাপাতো। এক কিলোগ্রাম মাংস চাইলে, সে দেড়-দুই কিলোগ্রামের কম কিছুতেই দিত ন। এইভাবে মাস শেষ হলে, তার প্রাপ্য মেটাতেই আবার অর্থাভাব, ফলে আবার খাসির মাংস ভাত।

একটা দিনের কথা বেশ মনে পড়ে। বাবার সাথে বাজারে গিয়ে মাংস কিনে মহানন্দে ফেরার পথে একটা মিষ্টির দোকান থেকে এক ভাঁড় টক দই কিনে ফিরছি। আমার হাতে দই এর ভাঁড়। বাবার হাতে বাজারের ব্যাগ। রেল লাইনের পাশ দিয়ে আমরা বাসায় ফিরছি। হঠাৎ কিছু বোঝার আগেই আমার হাতের দই এর ভাঁড়, ছিটকে গিয়ে পাশের জঙ্গলে পড়লো। হতভম্ব ভাব কাটলে বুঝতে পারলাম, একটা চিল ছোঁ মেরে আমার হাতের দই এর ভাঁড় নেবার চেষ্টা করেছিল।

বাবা ছিলেন খুব খাদ্য রসিক। মা সারাদিন রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। মোচা, ডুমুর জাতীয় ঝামেলার পদ প্রায়ই করতে হ’ত। বাবা নিজে অবশ্য মা’কে অনেক সাহায্য করতেন। অদ্ভুত অদ্ভুত সব রান্নার প্রক্রিয়া তাঁর মাথায় আসতো। নিজেও মাঝে মধ্যে এক আধটা পদ রান্না করতেন। তবে অধিকাংশ সময়েই তাঁর সাহায্য, মা’র খাটুনি বৃদ্ধি ও ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়াতো। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিস্কার হবে।

নারকেল কোড়া দিয়ে নারকেল নাড়ু করলে ছিবড়ে থেকে যায়, ফলে খেতে তত ভালো লাগে না। তাই নারকেল কুড়িয়ে, শিলে বেটে তবে নারকেল নাড়ু হবে। আর এই গোটা অধ্যায়টা তিনি নিজেই সামলাতেন। মা’র কষ্ট লাঘব করতে, সমস্ত কাজ নিজেই করতেন। কিন্তু তারপর শিল পরিস্কার, রান্নাঘর পরিস্কার, হাজারো বাসন পরিস্কার, মায় কড়াইয়ের পিছনের কালি পরিস্কার পর্যন্ত মা’কে অন্যান্য কাজের শেষে করতে হ’ত।

সুবীর কুমার রায়

২৬-০৩-২০১৭

আমার সংস্কৃত শিক্ষা { লেখাটি বাংলায় লিখুন ও বই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

এইভাবে এক সময় বৎসরিক পরীক্ষা এসে গেল। সকল বিষয় উত্তীর্ণ না হলে নবম শ্রেণীতে পা রাখার সম্ভাবনা নেই। আমি খুব ভাল  করে জানি, সংস্কৃতে পাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। পড়লেও নয়, না পড়লে তো নয়ই। কাজেই সংস্কৃতের পিছনে অযথা সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না। সংস্কৃত পরীক্ষায় পাশ করাবার একটা ব্যবস্থা করার জন্য মেনোকে ধরলাম। মেনো পন্ডিত স্যারের ভাইপো, আমার সাথে পড়ে। সে যদি কোন একটা উপায় বাতলাতে পারে।

কিন্তু এটাতো মানতেই হবে যে, দেশে এখনও কিছু ভাল লোক আছে বলেই, দেশটা এখনও সুষ্ঠ ভাবে চলছে। আমার দুরাবস্থার কথা শুনে, এরকমই একজন সহৃদয় উচু শ্রেণীর ছাত্র জিজ্ঞাসা করলো— “শব্দরূপ, ধাতুরূপ পড়া আছে? লিখতে পারবি”? লতা, মুনি, মতি, ইত্যাদি কয়েকটা মুখস্থ করাই ছিল, বললাম এগুলো জানা আছে। বলেই মুখস্থ বলতে শুরু করলাম— মতি-মতী-মতয়ঃ, মতিম্-মতী-মতিন, মত্যা—। সে আমাকে আর এগোতে না দিয়ে বললো, “বাঃ, চমৎকার তৈরি হয়েছে, এতেই চলবে। এক কাজ করবি, তুই খাতার প্রথমেই শব্দরূপ, ধাতুরূপ লিখবি, তারপরে যা পারবি লিখে যাবি”। বললাম, “আর তো কিছুই পারবো বলে মনে হয় না”। সে বললো, “ঠিক আছে, পারলে লিখবি, না পারলে আন্দাজে যা পারবি, লিখে যাবি, তাতে কিছু আসবে যাবে না। তবে হ্যাঁ, অনেক পাতা ধরে লিখবি। পারলে কাগজ নিবি, যাতে তোর খাতা বেশ মোটা হয়। শেষে আবার সেই শব্দরূপ, ধাতুরূপ লিখবি। মোটকথা দু’টো শব্দরূপ, ধাতুরূপের মধ্যে যেন, বেশ কিছু লেখা পাতা থাকে। ক্লিয়ার? দেখবি পাশ করে গেছিস”।

আন্দাজে সংস্কৃত খাতায় পাতার পর পাতা কী লিখবো ভেবে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “আন্দাজে এত কী লিখবো, ধরা পড়ে যাব না তো”? সে খুব তাচ্ছিল্য সহকারে বললো—“ফুঃ, নারে বাবা না। সাপ, ব্যাঙ যা মনে আসে লিখে যাবি। পন্ডিত স্যার পঞ্চাশটা খাতায় পঞ্চশবার শব্দরূপ, ধাতুরূপ দেখবেন, কাজেই পঞ্চাশের জায়গায় একান্নবার দেখলেও ধরতে পারবেন না। চুয়ান্ন, পঞ্চান্নবার দেখলেও নয়”। যাহা ঊনিশ, তাহাই বিশ জানতাম, এখন জানলাম যাহা পঞ্চাশ, তাহাই একান্ন। সত্যি জানার কোন শেষ নাই।

প্রশ্নপত্রে ছোট ছোট বাক্য সংস্কৃতে অনুবাদ করতে দেওয়া হয়েছে। ছেড়ে দিতে ভীষণ গায়ে লাগছিল, কষ্টও কম হচ্ছিল না। এক একটায় পাঁচ নম্বর করে আছে, পাঁচটা বাক্য অনুবাদ করতে হবে। এক শব্দরূপ আর ধাতুরূপ ছাড়া আর কোন প্রশ্নের উত্তর আমার সঠিক জানা নেই। কথা মতো শব্দরূপ ধাতুরূপ লিখে, আন্দাজে আন্দাজে দু’-তিনটে অনুবাদ নিজের বুদ্ধিতে লিখে হঠাৎ দেখি, শেখ আলমগীর বাইরে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টার পরে আমিও বাথরুমে যাবার সুযোগ পেলাম। ওকে জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পেয়ে ভাবলাম, এই অনুবাদ থেকে আমার পঁচিশ নম্বর পাওয়া আর কে আটকায়? প্রয়োজনীয় বাকি নম্বর শব্দরূপ, ধাতুরূপ থেকে উঠে আসবে, কাজেই দু’বার করে একই প্রশ্নের উত্তর লেখার ঝুঁকি আর নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

আলমগীর প্রথমেই সাবধান করে দিয়ে বললো, “দু’টো বলছি, মনে করে নিয়ে গিয়ে লিখে দে। সবক’টা মনে রাখতে পারবি না। সত্যি এই এক ছেলে। সমস্ত বিষয়েই ও সমান পারদর্শী। বরাবর প্রথম হয়। শুধু প্রথমই হয় না, সমস্ত বিষয়েই প্রথম হয়। কিন্তু লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু কথাটাতো আর এমনি আসেনি। জেদ করে সবক’টা শুনে, মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে পরীক্ষার হলে ফিরে গিয়ে বুঝলাম, “দাদখানি বেল, মুসুরের তেল” হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে আবার সেই পুরানো পরামর্শ মতো পাতার পর পাতা হাবিজাবি লিখে, পরামর্শ দাতার কথা মতো, আবার শব্দরূপ ও ধাতুরূপ লিখে এলাম। যতদুর মনে পড়ে সংস্কৃত পরীক্ষায় সেবার আটচল্লিশ পেয়েছিলাম। অর্থাৎ টোটকায় কাজ হয়েছিল।

সুবীর কুমার রায়

২৭-০৩-২০১৭

ও দয়াল বিচার করো {লেখাটি বাংলায় লিখুন ও বই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত}

আমি তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি। একদিন স্কুল চলা কালীন, আমার বই এর মধ্যে একটা সাদা কাগজ পেলাম। তাতে হাতে লেখা কোন দেবদেবীর মহিমার বিবরণ লেখা ছিল। আর ছিল ঐ লেখা কপি করে দশজনকে বিলি করার নির্দেশ। আগে এই লেখা বিলি করে, কে কী পেয়েছে, এবং বিলি না করায় কে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তার বিবরণও ফলাও করে লেখা ছিল। ঠাকুর দেবতার প্রতি আমার কোন দিনই আস্থা নেই, তবু সেই বয়সে ঐ কাগজ বিলি না করার মতো মনের জোর, আমার ছিল না। ঐ দেব বা দেবী কিন্তু খুব দয়ালু ছিলেন। তখনও আমাদের দেশে জেরক্স প্রচলিত হয় নি বলে, মাত্র দশ কপি বিলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে চার-পাঁচটা কপি করে, পরদিন স্কুলে একজন নিরীহ গোছের সহপাঠীর (নামটা আজ আর মনে পড়ে না) ব্যাগে একটা কপি রেখে দিলাম। কিন্তু দু’চারজন ব্যাপারটা দেখে ফেলে। পরে সাধু বাবু ক্লাশে আসলে আমরা ব্যাগ থেকে বই খাতা বার করলাম। সেই ছেলেটা বই বার করতে গিয়ে কাগজটা হাতে পেয়ে, ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করলো। সাধু বাবু কান্নার কারণ জানতে চাওয়ায়, সে তাঁকে হাতের কাগজটা দেখালো। এই গর্হিত কাজ কে করেছে এই নিয়ে শ্রেণীকক্ষ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে, সাক্ষীরা আমার নাম বলে দেয়। হাতের লেখাও আমার। ফলে সাধু বাবু আমাকে এই অমার্জনীয় অপরাধের জন্য, বেশ কয়েক ঘা প্রহার করে, শ্রেণীকক্ষে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করলেন।

আমি কিন্তু তাঁকে বোঝাতে পারলাম না যে, যে কারণে এই ছেলেটা কাঁদছে, যে কাগজ হাতে পেয়ে বিলি করার ভয় ও ঝামেলায়, ছেলেটা ভীত, সন্ত্রস্ত, গতকাল এই ঘরেই সেই একই কাগজ হাতে পেয়ে, সমবয়সী আমারও একই দশা হয়েছিল। নিজেকে বিপদ মুক্ত করতেই আমাকে অতগুলো কপি করতে হয়েছে, এবং দশজনের মধ্যে কেবল মাত্র একজনকে বিলি করেই, আজকের এই ঘটনা। কাগজের সেই দেব বা দেবীকে কিন্তু আমার চরম বিপদের সময় পাশে পাওয়া গেল না। এই অভিযোগ কাকেই বা জানাই।

 

সুবীর কুমার রায়

২৫-০৩-২০১৭

 

বৃদ্ধাশ্রম

বৃদ্ধাশ্রমটি বেশ বড় ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। ‘নিরালা’ নামটি সার্থক। শহরের একপ্রান্তে নিরিবিলি দোতলা বাড়িটির একদিকে পরপর মহিলাদের ঘর, কোনটাতে দু’জন, কোনটাতে তিন বা চারজনের থাকার ব্যবস্থা। একজনের জন্য থাকার ঘরের সংখ্যা নিতান্তই অল্প। অপর দিকে একই রকম ঘরগুলোয় পুরুষদের থাকার ব্যবস্থা, মাঝখানে বেশ চওড়া প্যাসেজ। বেশ বড় ডাইনিং হল্। এখানে বেশ বড় একটি টিভি ও অনেকগুলো চারজন বসার টেবিল ও চেয়ার। এখানেও সাধারণত বৃদ্ধরা একদিকে, বৃদ্ধারা অপর দিকে বসে টিভি দেখেন, আহার করেন।

এই আশ্রমেরই একতলার কোনার ঘরটিতে অনিতা মল্লিক একাই থাকেন। অবসরপ্রাপ্তা পঁচাত্তর বছর বয়স্কা অবিবাহিতা এই স্কুল শিক্ষিকাটি আজ প্রায় পাঁচ বছর এই আশ্রমের এই ঘরটিতেই বসবাস করছেন। আগে তিনি এই শহরেই নিজের একটি ছোট ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। এখন তিনি অসুস্থ হলেও, কোনদিনই তাঁকে খুব একটা মিশুকে স্বভাবের বলা যায় না, বরং  শামুকের খোলে ঢুকে থাকার মতো নিজেকে তিনি গুটিয়ে রাখতেই পছন্দ করতেন। বিকেলের গুলতানিতে, সন্ধ্যায় টিভি সিরিয়াল দেখার ফাঁকে, বা রাতে খাবার টেবিলে আর সকলের অতীত দুঃখের খবর পাওয়া যেত। অন্যান্য সকলেরই প্রায় এখানে আসার কারণ ছেলে বা মেয়ের দুর্ব্যবহার, মানসিক বা শারীরিক অত্যাচার। অনিতা দেবী অবিবাহিতা, অবসরপ্রাপ্তা স্কুল শিক্ষিকা, নিজের ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়ে এখানে এসে থাকেন ছাড়া, তাঁর অতীত সকলের কাছেই প্রায় অজানা ছিল। ইদানিং তো আবার অসুস্থতার জন্য মাঝেমাঝেই তাঁর খাবার, ঘরেই দিয়ে আসা হয়।

মাস খানেক আগে এক বৃদ্ধ আবাসিকের মৃত্যু হওয়ার পরেও তাঁর ছেলে মেয়েরা না আসায়, আশ্রম কর্তৃপক্ষ নিজেরাই তাঁর সৎকারের ব্যবস্থা করেন। সেই থেকে ঐ ঘরটি ফাঁকাই পড়ে ছিল। আজ কয়েকজন যুবক রতন চৌধুরী নামে এক অশীতিপর বৃদ্ধকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে ঐ ঘরটিতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে যান। জানা গেল অবিবাহিত এই বৃদ্ধটিকে শেষ বয়সে দেখাশোনা করার কেউ নেই। ভদ্রলোক কোন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন, টাকা পয়সাও যথেষ্টই আছে, তাই শেষ বয়সটা এখানে কাটানোই শ্রেয় বলে মনে করেছেন।

পরদিন দুপুরে ডাইনিং হলের খাওয়ার টেবিলে যে যার মতো গল্প করতে করতে খাবার খাচ্ছেন। কয়েকজন বৃদ্ধ আবাসিক রতন বাবুর সাথে আলাপ পর্ব সারছেন। একটু পরেই অনিতা দেবী হল ঘরে এসে উপস্থিত হলেন। খাবারের থালা নিয়ে টেবিলে বসার আগে উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে একটু কুশল বিনিময়ের মাঝখানেই তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে, ভাতের থালা নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। উপস্থিত অনেকেই অবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করে তাঁকে তুলবার চেষ্টা করলেন। অনিতা দেবী সম্ভবত অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন তার উপর সকলেই বৃদ্ধ, তাই কাজটা খুব সহজ হ’ল না। রতন বাবু এতক্ষণ আলাপচারীতায় ব্যস্ত ছিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনিও ব্যস্ত হয়ে অনিতা দেবীকে তুলবার চেষ্টা করতে এসেও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর নীচু হয়ে মাটিতে বসে অনিতা দেবীর মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে মুখে চোখে বেশ কিছুক্ষণ জলের ঝাপটা দিলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর জ্ঞান ফিরে এলে, সকলকে আশ্রমের কর্মচারীদের ডাকার পরামর্শ দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের ঘরে ফিরে গেলেন।

অনিতা দেবীকে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হ’ল। ডাক্তার এসে তাঁকে দেখে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র লিখে দিয়ে পরামর্শ দিয়ে গেলেন যে, কোন কারণেই যেন তিনি উত্তেজিত না হন। জানা গেল তার হৃৎপিন্ডের অবস্থা মোটেই ভালো নয়, যে কোন উত্তেজনা তাঁর পক্ষে চরম ক্ষতিকারক হতে পারে।

সন্ধ্যার পরে রতন বাবু সামান্য সান্ধ্যভ্রমণ সেরে আশ্রমে ফিরে দেখেন হই হই কান্ড। শ্বাস কষ্টে অনিতা দেবীর শরীর আবার খুবই খারাপ হয়েছে, তাঁর ঘরে বেশ কয়েকজন মহিলা ও পুরুষ আবাসিক তাঁকে ঘিরে ভিড় করে আছেন। তিনি ঘরের বাইরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, নিঃশব্দে অনিতা দেবীর ঘরে ঢুকে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

অনিতা দেবী অস্ফুট স্বরে বললেন “কাল তোমায় দেখেই আমার নিজেকে বড় অপরাধী বলে মনে হচ্ছিল। আমাদের সম্পর্কটা আমার বাড়িতে মেনে নিতে পারে নি বলে আমার অমতে আমাকে কাকার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যাওয়ার আগে তোমার মা-ও আমাকে দিয়ে তোমার দিব্যি করে শপথ করিয়ে নিয়েছিলেন, যে এ জীবনে আমি আর তোমার সাথে দেখা করবো না, মুখ পর্যন্ত দেখাবো না। কাকার বাড়ি থেকে পাশ করে স্কুলে চাকরি। পাছে তোমার সাথে দেখা হয়ে যায়, তাই   একটা দিনের জন্যেও আর বাড়িতে যাই নি। অবসর গ্রহণের পরও বছর দশেক নিজের ফ্ল্যাটেই ছিলাম। তারপর শরীর আর দিলো না, সব বেচে দিয়ে এখানে চলে এলাম। ভালোই ছিলাম, ইদানিং শরীরটা আর ভালো যাচ্ছে না, দিন বোধহয় শেষই হয়ে গেল। তোমার মঙ্গলের জন্য সেই সতেরো বছর  বয়স থেকে যে সত্য আমি এতদিন পালন করে এসেছি, আজ পঁচাত্তর বছর বয়সে আমি তা ভেঙ্গে ফেললাম। কিন্তু এতে আমার দোষটা কোথায় বলো”?

“দোষ তোমার নয়, দোষ আমারও নয়, দোষ আমাদের ভাগ্যের। আমি তোমাকে কোথায় না খুঁজেছি। খুঁজতে খুঁজতে কখন বুড়ো হয়ে গেলাম। বাউন্ডুলে জীবনে মাথাগোঁজার আশ্রয় থাকলেও, খাওয়ার কোন ঠিক ছিল না। আজ আলুর দম পাঁউরুটি, কাল কোন ঝুপড়িতে মাছ ভাত। শরীর কত সহ্য করবে? বয়সও তো আশি অতিক্রম করে গেল। পাড়ার কয়েকজন যুবকের পরামর্শে এখানে চলে এলাম। এসে ভাবছিলাম ভুল করলাম কী না। তোমায় দেখেই চিনতে পারি। বুঝলাম  ভুল করি নি, দেরিতে হলেও ভগবান আমাদের আবার একই জায়গায় এনে ফেলেছেন”।

এরকম একটা মিলনান্তক বাস্তব নাটক দেখার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। উপস্থিত সবাই রতন বাবু ও অনিতা দেবীকে বললেন, “এতগুলো বছর পরে যখন আপনারা আবার একই ছাদের নীচে এসে উপস্থিত হয়েছেন, তখন ভগবানের বোধহয় ইচ্ছা, বাকি জীবনটা আপনাদের একসাথে একই ছাদের নীচে কাটিয়ে দেবার”। রতনবাবু চুপ করে রইলেন, অনিতা দেবী শ্বাস কষ্টে কাহিল। এক বৃদ্ধা ছুটলেন তাঁর ঘর থেকে সিঁদুরের কৌটো ও শাঁখটা নিয়ে আসতে। দু’জন গেলেন ফুলের মালা কিনতে। শাঁখ ও সিঁদুর এলো, মালাও এলো, কিন্তু ঘরে তখন উলুধ্বনির পরিবর্তে ক্রন্দনরোল শোনা গেল। অনিতা দেবীর নিষ্প্রাণ দেহটি ততক্ষণে রতন বাবুর কোলে ঢলে পড়েছে। ডাক্তার ডাকা হ’ল, তিনি নাড়ি দেখে জানালেন ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক, সব শেষ। চার ঘন্টা পড়ে কেউ গিয়ে যেন ডেথ সার্টিফিকেটটা নিয়ে আসেন। রতন বাবু সজল চোখে অনিতা দেবীর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিলেন।

সমস্ত ঘটনা শুনে পরিচিত ডাক্তারটি বললেন,“ইচ্ছে করছে অনিতা চৌধুরী নামেই ডেথ সার্টিফিকেটটা লিখি, কিন্তু তাতে ভবিষ্যতে অসুবিধা দেখা দিতে পারে”। তিনি অনিতা মল্লিকের নামেই ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিলেন।

সুবীর কুমার রায়

১৬-০৩-২০১৭

 

একাল-সেকাল { লেখাটি অক্ষর-Akshar, Pratilipi , বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম , পাক্ষিক ‘গল্পগুচ্ছ’ , বিতর্কিত লেখনী ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

ছেলের চাকরির জন্য তার মার্কশীট ও অ্যাডমিট কার্ডের কপির অ্যাটেষ্টেশনের প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল তার চারিত্রিক প্রশংসা পত্রের। তাঁদের সময় তাঁরা এগুলো স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা কলেজের অধ্যক্ষকে দিয়েই করিয়ে নিতেন। কিন্তু অনেকেই জানালো যে এখন নাকি তাঁদের দিয়ে কাজটা করালে, গ্রহনযোগ্য হিসাবে বিবেচিত হয় না। কিন্ত ছেলের অসুস্থতার জন্য কাজটা সুদীপ বাবুকেই করতে হবে, আর হাতে সময়ও বিশেষ না থাকায়, ওর স্কুলের প্রধান শিক্ষককে দিয়েই কাজটি করাবার মনস্থ করে ওর স্কুলে গিয়ে হাজির হলেন। সুদীপ বাবুর ধারণা কাজটা প্রধান শিক্ষককে দিয়ে করিয়ে নিতে তাঁকে বিশেষ কোন বেগ পেতে হবে না, কারণ ঐ স্কুল থেকেই তাঁর ছেলে অত্যন্ত ভালো ফল করে উত্তীর্ণ হয়েছে। তিনি নিজেও তো ঐ স্কুল থেকেই একসময় পাশ করেছিলেন। স্কুলের সকলেই তাঁকে চেনেন, সম্মান করেন।

স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হলে বেয়ারা জানালো যে প্রধান শিক্ষক একটা মিটিং-এ ব্যস্ত আছেন, তিনি যেন পরে আসেন। সুদীপ বাবু তাকে একটু জেনে আসতে অনুরোধ করলেন যে কখন তিনি আসবেন। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এসে তাঁকে প্রধান শিক্ষকের ঘরে যেতে বলায়, সুদীপ বাবু তাঁর ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন।

ঘরে প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকরা ছাড়া আরও জনা পাঁচ-ছয় ব্যক্তি আলোচনায় ব্যস্ত। এদের মধ্যে একজনকে তিনি চিনতে পারলেন, তিনি স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে গিয়ে চার শত টাকাকে fore hundred লিখেছিলেন। সুদীপ বাবুর উপস্থিতিতেও তাঁদের আলোচনা বন্ধ না হওয়ায়, তিনি তাঁর প্রয়োজনের কথা বলে কাগজগুলো প্রধান শিক্ষকের হাতে দিলেন। প্রধান শিক্ষক তাঁর অনুরোধ রক্ষা করে, তাঁর কাজটি করার অবসরে উপস্থিত সকলের বক্তব্য সুদীপ বাবুর কানে গেল।

স্কুলের একটি নবম শ্রেণীর ছাত্রের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট উদ্ধার হওয়ায় অঙ্কের শিক্ষক মৃগেন বাবু তাকে গোটা কতক চড় কষিয়ে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখায়, অভিভাবকরা যারপরনাই অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ। বেশিরভাগ শিক্ষক ও অভিভাবকরা এর তীব্র নিন্দা করে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় রীতিমতো তাঁকে ধমক দিচ্ছেন। পরিচিত ভদ্রলোকটি দীপ্ত ভাষায় জানালেন, যে মৃগেন বাবু তাঁর স্কুলের শিক্ষক হলে সরকারি নিয়মের বিরোধিতা করে ছাত্রের গায়ে হাত তোলার জন্য তিনি কী কী করতেন। সুদীপ বাবুর মনে হ’ল, তিনি বোধহয় কোন অভিভাবক অথবা এই স্কুল কমিটির সদস্য।

বৃদ্ধ মৃগেন বাবু, যাঁর হাত দিয়ে স্কুলের বহু ছাত্র অঙ্কে অসাধারণ সব মার্কস নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, ন্যায় বিচারের আশায় চুপ করে মাথা নীচু করে খুনের আসামির মতো বিচারকদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখ দুটি চিক্ চিক্ করছে। শিক্ষিত, ভদ্র, নম্র, প্রধান শিক্ষকও বোধহয় ঐ প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের মতো ডাকাবুকো না হওয়ায় আদালত অবমাননার ভয়ে অসহায়, নীরব।

কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এতদিন পরে সুদীপ বাবুর হঠাৎ বেত হাতে নবীন বাবুর মুখটা মনে পড়ে গেলো। অত্যন্ত বদ রাগি নবীন বাবু তাঁদের বিজ্ঞান শিক্ষক ছিলেন। তাঁকে সবাই ভয় করলেও, শ্রদ্ধা করতো শুধুমাত্র তাঁর ছাত্রদের আন্তরিক ভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য। একদিন ছুটির সময় শ্রেণী কক্ষে বেঞ্চ ভাঙ্গার অপরাধে পরদিন তিনি সুদীপ বাবুকে দোষী সাব্যস্ত করে ভীষণ ভাবে বেত্রাঘাত করেন। সুদীপ বাবু তাঁকে বোঝাবার সুযোগই পেলেন না, যে গতকাল তিনি স্কুলেই আসেন নি।

ঘটনার দিন দুয়েক পরে টিফিনের সময় তাঁকে দেখে সমস্ত ছাত্র ও শিক্ষকদের সামনেই তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “আমি জানতাম না রে যে তুই সেদিন স্কুলেই আসিস নি। পরে শুনে আমি রাতে ঘুমোতে পারি নি। তুই আমায় ভুল বুঝিস না। রাগ করিস না রে, তুই আমার ছেলের মতো, তবু পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস”।

বিষণ্ণ মনে সুদীপ বাবু দ্রুত পায়ে বাড়ির পথ ধরলেন।

সুবীর কুমার রায়

১১-০৩-২০১৭