হীরেণ বাবু { লেখাটি ছোটোবেলাতেই ভালো ছিলাম, বাংলায় লিখুন, বইপোকার কলম, সাহিত্য সরণি, ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত। }

আমরা কয়েকজন স্কুল ছুটির পর, সন্ধ্যাবেলা হীরেণ বাবুর বাসায় গিয়ে ইংরেজি পড়তাম। হীরেণ বাবু আমাদের স্কুলেরই শিক্ষক। তিনি ছিলেন অবিবাহিত। স্কুলের পাশেই বাড়ি ভাড়া নিয়ে একাই থাকতেন। তিনি অত্যন্ত সরল ও সাধারণ জীবন যাপন করতেন। হাওয়াই চটি বা ছেঁড়া চটি, নোংরা ধুতি ও অপরিস্কার জামা পরে স্কুলে আসতেন। ছাত্রদের খুব যত্ন নিয়ে পড়ালেও, তিনি একটু খিটখিটে স্বভাবের লোক ছিলেন, রেগে গেলে দাঁত কিড়মিড় করতেন। ছাত্রদের কান মলে দেওয়া, চিমটি কাটা, প্রয়োজনে বেত্রাঘাতও করতেন।

তাঁর বাসায় পড়তে যাবার এক অদ্ভুত ঝামেলা ছিল। তাঁর ঘরে একটা কাচের দেওয়াল আলমারি ভর্তি পাতলা পাতলা অসংখ্য বই ছিল। বেশিরভাগই মহান ব্যক্তিদের জীবনি। কোনটা রাজা রামমোহন রায়, কোনটা বিদ্যাসাগর, কোনটা বিবেকানন্দ বা রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের জীবনি। এরকম শ’য়ে শ’য়ে বই তাঁর দেওয়াল আলমারিতে সাজানো থাকতো। নিয়মিত বই কিনে, তিনি তাঁর বইয়ের স্টক্ বাড়াতেন। তাঁর কাছে পড়তে গেলে তাঁর প্রথম কাজ ছিল, প্রত্যেক ছাত্রকে একটা করে বই পড়তে দেওয়া। পরের দিন পড়তে গেলে, তিনি প্রথমে প্রত্যেক ছাত্রকে, তাকে দেওয়া বই থেকে প্রশ্ন করতেন। ঠিকমতো উত্তর দিতে পারলে, তাকে নতুন কোন বই পড়তে দিতেন, আর না পারলে সেই বইটাই আবার ভালো করে পড়ে আসতে বলতেন।

আজ সারা পশ্চিম বাংলায় চিরুনি তল্লাশি করলেও, একটা হীরেণ বাবুকে খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। চারিদিকে রাজনীতি করা শিক্ষকদের ভিড়ে, হীরেণ বাবুরা হারিয়ে গেছেন। বেশ কয়েক বছর আগে অপর এক শিক্ষক, শিব বাবুর কাছে শুনেছিলাম, হীরেণ বাবু ডক্টরেট্ করে আমেরিকা যাচ্ছেন। আমি রসিকতা করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম— “হাওয়াই চটি পরে যাচ্ছেন”? শিব বাবুও হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিলেন, “হ্যাঁ, হাওয়াই চটি পরেই যাচ্ছেন”। এরও কয়েক বছর পরে একজনের কাছে খবর পেয়েছিলাম, তিনি নাকি এখন কোন রামকৃষ্ণ মিশনে থাকেন।

আজ এত বছর পরে হীরেণ বাবু না থাকলেও, তাঁকে স্মরণ করে আমার অন্তরের শ্রদ্ধা জানালাম। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন স্যার, আপনার আত্মা শান্তি লাভ করুক।চিরটাকাল আপনার আশীর্বাদ ছাত্রদের মাথার ওপর ছিল, আপনি এবার একটু বর্তমানের ছাত্র ও শিক্ষকদের আশীর্বাদ করে, ছাত্র-শিক্ষকদের সম্পর্কের উন্নতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার হাল ফিরিয়ে এনে বর্তমান প্রজন্মকে রক্ষা করুন।

সুবীর কুমার রায়
২৬-০৩-২০১৮

 

Advertisements

অনুশোচনা { লেখাটি ছোটোবেলাতেই ভালো ছিলাম পত্রিকায় প্রকাশিত }

জানি না ছেলেবেলায় অনুশোচনা হয় কী না। আমায় কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বারংবার অনুশোচনার জ্বালায় দগ্ধ হতে হয়েছে। যতদুর স্মরণ করতে পারি, এটাই বোধহয় আমার জীবনে প্রথম অনুশোচনা, যা এখনও আমার পিছু ছাড়েনি।

তখন আমি সম্ভবত সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। এখনকার মতো সেইসময় ছেলেমেয়ের হাতে পয়সা দেওয়ার চল্ ছিল না, আমার বাড়িতে তো ছিলই না। মা’কে পটিয়ে পাটিয়ে লাট্টু, গুলি, লালতুলো (বুড়ির চুল, বা হাওয়া মিঠাই), ল্যাক্টো বনবন্ লজেন্স্, আনারকলি বিস্কুট, টিনের বাক্স করে বিক্রি হওয়া শন পাপড়ি, ইত্যাদি কেনার সামান্য পয়সা কখনোসখনো পাওয়া যেত বটে, কিন্তু অসচ্ছল সংসারে ইচ্ছা থাকলেও, তাঁর পক্ষে অধিকাংশ সময়েই আবদার মেটানো সম্ভব হতো না। বাবা ছিলেন অত্যন্ত রাগী, কাজেই তাঁর কাছে পয়সা চাওয়ার কথা ভাবতেও পারতাম না। তাছাড়া আমিই তো একা দাবিদার ছিলাম না।

আমাদের বাড়িতে একটা অচল আধুলি দীর্ঘ দিন ধরে পড়ে ছিল। সেটাকে চালাবার চেষ্টাও করা হয়নি, ফেলেও দেওয়া হয়নি। কালক্রমে সেটা আমার পকেটে আশ্রয় পেলেও, এবং সেটা ভাঙিয়ে অনেক কিছু কেনার স্বপ্ন দেখলেও, রোগা জিরজিরে শরীরে অচল পয়সাকে সচল করার চেষ্টা সাহসে কুলায়নি।

একদিন শীতকালে বাবার সাথে কি কারণে মনে নেই, তাঁর অফিসে গিয়েছিলাম। যাওয়ার আগে সঙ্গে করে সেই ব্যাঙের আধুলি নিয়ে যেতে ভুলিনি। বদ্ধ অফিস ঘরে আমি হাঁপিয়ে ওঠায়, তিনি একজন চতুর্থ শ্রেণীর অল্পবয়সি কর্মচারীকে অফিসের উলটো দিকে কার্জন পার্কে আমায় একটু ঘুরিয়ে আনতে বলেন। তখন দুপুর বেলায় কার্জন পার্ক মানুষের ভিড়ে জমজমাট ছিল। অনেকে মনে হয় বাড়ির বাচ্চাদের নিয়েও ঘুরতে এসেছেন।

কর্মচারীটি পার্কের এক জায়গায় বসে আমার দিকে লক্ষ্য রাখছিল। আমি চারিদিকে খানিকটা দুর পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ এক অতি বৃদ্ধ চিনেবাদাম বিক্রেতাকে আবিস্কার করলাম। মলিন পোশাক পরিহিত, বয়সের ভারে ন্যুব্জ বৃদ্ধটি বিরাট একটা ঝোড়ায় করে চিনাবাদাম বিক্রি করছেন। আমি বোধহয় এতদিন এনার অপেক্ষাতেই ছিলাম, এতটুকু সময় নষ্ট না করে বুকভরা সাহস নিয়ে তাঁকে আট আনার বাদাম দিতে বললাম। তখন আট আনার বাদাম একজনের পক্ষে হজম করা সম্ভব ছিল না, আমার পক্ষে তো নয়ই, তাছাড়া খুব কম লোকই বোধহয় আট আনার বাদাম কিনতো। তাই বৃদ্ধ আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ক’পয়সার বাদাম দেবো। আমি পয়সা ভাঙাবার ঝুঁকি না নিয়ে আট আনার বাদাম চাইলাম। অচল আধুলি গছিয়ে বিশাল এক ঠোঙা চিনাবাদাম নিয়ে, আমি মুহুর্তের মধ্যে অনেক লোকের ভিড়ে হারিয়ে গেলাম।

এবার শুরু হলো অনুশোচনা, নানারকম দুশ্চিন্তা ও ভয়। লোকটাকে ঠকানো ঠিক হয়নি, এতোটা বাদাম নিয়ে আমি কি করবো, আধুলি রহস্য উন্মোচন করে বাদাম ফেরৎ দিতে যাওয়ার বিপদ, কপর্দকহীন আমার পক্ষে কাউকে বাদামের ভাগ দেওয়ার সমস্যা, সর্বোপরি বাদাম বিক্রেতা এতক্ষণে আমায় খুঁজতে বেড়িয়ে পড়েছেন কী না, ইত্যাদি ইত্যাদি।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কিছুটা বাদাম গলাধঃকরণ করে, ঠোঙা সমেত প্রায় সমস্ত বাদাম মাঠে গাছের আড়ালে ফেলে দিয়ে প্রমাণ লোপ করে, মুখ মুছে, বহুদিনের সাথী আধুলিটা পকেটছাড়া করে, আমার লোকাল গার্জেনের কাছে ফিরে এলাম।

সারাটা পথ আধুলির শোক ও ওই বৃদ্ধকে অহেতুক ঠকানোর অনুশোচনা নিয়ে বাবার সাথে বাড়ি ফিরলাম। না, সেই অনুশোচনা আমার আজও যায়নি। সেই বৃদ্ধ অবশ্যই আজ আর বেঁচে নেই, তবু তাঁর কাছে আজ এই বয়সে এসেও ক্ষমা ভিক্ষা করছি। তাঁর আত্মা শান্তি লাভ করুক।

সুবীর কুমার রায়

২৩-০৩-২০১৮

পারুলবালা { লেখাটি গল্পগুচ্ছ, বাংলায় লিখুন, বই পোকার কলম, সাহিত্য সরণি, উই পোকার কলম, ও প্রতিলিপি-বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত।}

শ্বশুরের পৌনে এক কাঠা জমির ওপর টালির চালের দেড়খানা মাটির ঘরে ছেলেকে নিয়ে বাস করে বাল্য বিধবা পারুলবালা। পাড়ার সবার বিপদের ত্রাতা, পারুল। বেশ কয়েক বাড়ি কাজ করে সে অতি কষ্টে সংসার চালিয়ে ছেলেকে বড় করেছে। ঠাকুর দেবতায় তার অগাধ বিশ্বাস। অল্প জায়গার ওপর টালির চালের মাটির বাড়ি হলে কি হবে, বাড়ির সামনের অধিকাংশ জমিই সে নিজের জন্য ব্যবহার না করে, অতি কষ্টে সাদা পাথরের তৈরি ছোট্ট একটা মন্দির করে মা কালীর এক মুর্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। লোকে বলে পারুলের স্বপ্নে পাওয়া দেবীটি খুব জাগ্রত, তাঁর কাছে ভক্তিভরে চাইলে, সকল মনস্কামনা পূর্ণ হয়। বাড়ির সামনে সকাল বিকাল বহু মানুষের ভিড়। দিনের মধ্যে যতটুকু সময় পারুল পায়, মন্দির পরিচর্যার কাজেই ব্যয় করে। আর কাউকে মন্দির, বা মন্দির সংলগ্ন বাঁধানো জায়গাটা পরিস্কার করতেও পারুল কোনদিন দেখেনি। পূজার প্রসাদ হিসাবে কোন ফল বা মিষ্টিও তার হাতে কেউ কোনদিন তুলে দেয়নি, অবশ্য পারুল সেটা আশাও করে না।

বেশ চলছিল, সমস্যা দেখা দিল পারুলের ছেলের বিয়ে ঠিক হওয়ায়। একটা অতিরিক্ত ঘর তৈরি না করলে, সেই শুভ কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। জমি অনেকটাই আছে, মন্দিরটি একটু এগিয়ে তৈরি করলেই, সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। নিজেদের খরচ কমিয়ে, ধারদেনা করেও সে সকলের জন্য নিজেই আবার নতুনভাবে মন্দিরটি তৈরি করে দিতেও চায়, কিন্তু তার জন্য পারুলের জমির অংশ ছাড়া আর সামান্য একটু জমির প্রয়োজন।

বাড়ির সামনের ফাঁকা জমিটি ধনী ব্যবসায়ী অলোকবাবুর। তিনিও গরদের কাপড় পরে ওই মন্দিরে পূজো না দিয়ে কোনদিন জল পর্যন্ত পান করেন না, কারণ তাঁর বিশ্বাস মায়ের আশীর্বাদেই তাঁর ব্যবসার আজ এই রমরমা অবস্থা। তাঁর প্রাসাদসম বাড়িটির ঠিক পিছনেই পারুলের জমি সংলগ্ন অনেকটা জমি ফাঁকা পড়ে আছে। তাছাড়া পারুল তাঁর বাড়িতে বাসন মাজা, ঘর মোছা, ইত্যাদি কাজও করে। তাই সাহস করে সে অলোকবাবুকে চার-পাঁচ ফুট জমি তাকে মন্দির নির্মাণের জন্য দান করতে অনুরোধ করে, যাতে পারুলের জমির সাথে তাঁর সামান্য জমিটুকু নিয়ে সে নিজ খরচায় আবার মন্দিরটি তৈরি করতে পারে।

ছেলের বিয়ের জন্য মন্দিরটি ভাঙতে হবে শুনে অলোকবাবু আঁতকে ওঠেন। পাড়ার এতগুলো লোকের বিশ্বাস ধুলিসাৎ করে মন্দির ভেঙে জাগ্রত দেবীর বিগ্রহ স্থানচ্যুত করার ফল খুব সুখকর হবে না বলে ভয়ও দেখান, কিন্তু নিজ জমির এক ইঞ্চি জায়গাও তিনি মন্দিরের জন্য ছাড়তে রাজি নন বলে পরিস্কার জানিয়ে দেন। মাসে মাসে পারুলের মাইনে থেকে জমির দাম শোধ করে দেওয়ার প্রস্তাবে, তিনি উত্তেজিত হয়ে ‘তোর বড় টাকার দেমাক হয়েছে’, ইত্যাদি বলে চিৎকার করতে থাকেন।

বাধ্য হয়ে পারুল পাড়ার সবার কাছে, বিশেষ করে যাঁরা রোজ সকাল-সন্ধ্যা মায়ের আরাধনা করতে আসেন, তার হয়ে অলোকবাবুকে অনুরোধ করতে বলেন, কিন্তু তার প্রস্তাবে কেউই সাড়া দিলেন না।

সব কিছুই আগের মতো চলতে লাগলো, অলোকবাবু রোজ সকালে গরদের কাপড় পরে মায়ের মুখ দর্শন করে পূজো দিয়ে বাসায় গিয়ে জলপান করেন। অন্যান্যরা রোগমুক্তি, অর্থ কামনা, পুত্র কামনা, ব্যবসা বা চাকরিতে উন্নতি, মামলায় জয়, ইত্যাদি কামনা করে মন্দিরে পূজা বা প্রণাম করতে নিয়মিত আসেন। পারুলও তার ছেলের বিয়ে দিয়ে পুত্রবধু ঘরে নিয়ে আসে।

পারুল আগের মতোই বাড়ি বাড়ি কাজ সেরে, মন্দির পরিস্কার করে, রাতে এখন মাদুর পেতে মন্দিরের বাইরেটায় খোলা আকাশের নীচে শোয়। সবাই দেখে, এই অবস্থায় তার ছেলের বিয়ে করা উচিৎ হয়েছে কী না, বা ছেলের এখন তার মায়ের জন্য কি করা উচিৎ, ইত্যাদি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেও বা পারুলকে মুখে কিছু না বললেও, দেবী মুর্তিটির সেই হাসি মুখ ও কমনীয় দৃষ্টির কিছু পরিবর্তন হয়েছে বলে তাদের যেন মনে হয়।

সুবীর কুমার রায়

০১-০৩-২০১৮

 

দুর্ভাগ্য ( স্মৃতির পাতা থেকে ) { লেখাটি ছোটোবেলাতেই ভালো ছিলাম পত্রিকায় প্রকাশিত।}

বিয়ের কিছুদিন পরেই ছোড়দি ও ছোট জামাইবাবু একদিন আমাদের বাড়িতে এসে, ম্যাটিনি শো তে কী একটা সিনেমা দেখতে গেলেন। বিকেলের দিকে এক বৃদ্ধ আমাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত। পরিচয় দিতে জানা গেল, তিনি আমার জামাইবাবুর মামা, খড়গপুরে থাকেন। মা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁর কিন্তু একবারও মনে হলো না যে, নতুন জামাইয়ের মামা, যাঁকে আমরা কেউ চিনিই না, বলা নেই কওয়া নেই, একবারে সটান কেন ভাগ্নের শ্বশুর বাড়ি এসে হাজির হলেন। তিনি তাড়াতাড়ি দু’টো টাকা দিয়ে আমাকে মিষ্টি কিনতে পাঠালেন। বেয়াই বলে কথা, তাও আবার এক্কেবারে নতুন জামাই এর মামা। এখন যেমন রসগোল্লা, দু’টাকা আর তিন টাকা সাইজের পাওয়া যায়, অবশ্য পাঁচটাকা বা আরও বেশি দামের, বড় সাইজের রসগোল্লাও অনেক দোকানেই পাওয়া যায়, তবে স্ট্যান্ডার্ড সাইজ বলতে, এই দু’রকমেরই পাওয়া যায়, কয়েক বছর আগে এই দুই সাইজেরই দাম ছিল যথাক্রমে এক টাকা ও দু’টাকা। এই ঘটনার সময়, অর্থাৎ চৌষট্টি সালে এই দুই সাজেরই দাম ছিল, পঁচিশ পয়সা ও পঞ্চাশ পয়সা। যাহোক্, আমাদের বাড়ির কাছাকাছি একটাই মিষ্টির দোকান ছিল। সেখান থেকে একছুটে পঁচিশ পয়সা দামের আটটা রসগোল্লা কিনে নিয়ে এলাম। ভদ্রলোককে একটা প্লেটে করে আটটা রসগোল্লাই আদর করে খেতে দেওয়া হলো। সাধারণত, সাইজ যাই হোক না কেন, সংখ্যায় অতগুলো মিষ্টি কাউকে খেতে দিলে, বিশেষ করে সদ্য পরিচিত কাউকে খেতে দিলে, সে তুলে নিতে বলবেই। চক্ষুলজ্জা বলেও তো একটা কথা আছে। আমিও মনে মনে তাই আশা করে, ভদ্রলোকের বিনয় করে তুলে দেওয়া প্রসাদের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু তিনি সে রাস্তায় না হেঁটে, চামচ দিয়ে ঐ ছোট ছোট রসগোল্লা কেটে কেটে, অণু পরমাণু আলাদা করে, চোখ বুজে মুখে পুরতে শুরু করলেন। এমন সময় ছোড়দির শরীরে হঠাৎ অ্যালার্জি দেখা দেওয়ায়, জামাইবাবু ছোড়দিকে নিয়ে ফিরে এলেন। ওদের দু’জনকে দেখেই আমি ছুটে গিয়ে জামাইবাবুকে তাঁর মামার আগমন সংবাদ দিলাম। তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার মামা? সে আবার কে? কোথা থেকে এসেছেন”? কথা বলতে বলতেই তিনি ঘরে ঢুকে তাঁর মামাকে দেখে বললেন, “কী ব্যাপার, আপনি এখানে? চলুন চলুন”। এইভাবে প্রায় জোর করেই তাঁকে চলে যেতে বাধ্য করলেন। কংস মামার কথা শুনেছি, কিন্তু কংস ভাগ্নেকে সেদিন দেখলাম। এই জন্যই বোধহয় বলে—যম, জামাই, ভাগনা, কেউ নয় আপনা।

ভদ্রলোক চলে যাবার পর জানা গেল, তিনি জামাইবাবুর কোন আত্মীয় নন। খড়গপুরে জামাইবাবুরা একসময় থাকতেন, এই ভদ্রলোক তাঁদের বাড়ির কাছেই থাকতেন। তাঁর স্বভাব ছিল, কোনভাবে কারো আত্মীয় স্বজনের ঠিকানা পেলে, একবার ঢুঁ মেরে কিছু খেয়ে আসা। তিনি বোধহয় কোন কারণে হাওড়া এসেছিলেন, এবং সেই সুযোগে কোন ভাবে আমাদের বাড়ির খোঁছ পেয়ে, কিছু ভালমন্দ উদরস্থ করতে এসেছিলেন। বেচারার কপাল খারাপ।

দিদিদের কাছে শুনি, পদ্মপুকুরে “সেন মশাই” বলে পরিচিত, বাবার এক সহকর্মীরও, এই এক রোগ ছিল। কে একজন স্পঞ্জের তৈরি হাতি নিয়ে নিমন্ত্রণ বাড়িতে খেতে যাচ্ছে দেখে, সেন মশাইও তার পিছন পিছন গিয়ে, অন্নপ্রাশন বাড়ির ভোজ খেয়ে এসেছিলেন। আমার দুর্ভাগ্য, হাজার চেষ্টা করেও তাঁকে আজ আর মনে করতে পারছি না। তাঁর চেহারাটাও মনে পড়ছে না।

 

সুবীর কুমার রায়

২৮-০২-২০০৬

 

গঙ্গা স্নানে মোক্ষ লাভ (স্মৃতির পাতা থেকে) { লেখাটি ছোটোবেলাতেই ভালো ছিলাম পত্রিকায় প্রকাশিত}

আজ যখন পিছন দিকে ফিরে চাই, তখন নিজেই অবাক হই এই ভেবে, যে কী বিচিত্র জীবন যাপন করে একটা সময় কাটিয়েছি। তপন নামে একটা ছেলে একদিন আমাদের সাথে স্কুল পালিয়ে হাওড়া স্টেশনের কাছে গোলমোহর অঞ্চলে এসে হাজির হলো। শীতকালে গোলমোহরে সার্কাস হতো। আমরা যখন ওখানে এসে হাজির হলাম, তখন গরম কাল না শীত কাল, এতদিন পরে মনে করতে পারি না, তবে তখন সেখানে একটা সার্কাস চলছিল। পকেটে কোন পয়সা নেই, কাজেই সার্কাস দেখার কোন প্রশ্নই ওঠে ন। এদিকে জল তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফাটার উপক্রম। পরপর অনেক শরবত বিক্রি হচ্ছে। একটা টেবিলের ওপর কয়েকটা রঙ্গিন সিরাপের বোতল, কয়েকটা কাচের গ্লাশ, আর বড় একটা ড্রামে জল নিয়ে জাঁকিয়ে ব্যবসা। অনেক শরবত ব্যবসায়ী, কিন্তু কেউ এক গ্লাশ খাবার জল দিতে রাজি নয়। শেষে একজন অতি দয়ালু, সহৃদয় শরবত ব্যবসায়ী জানালো, এক গ্লাশ শরবত কিনলে, খাবার জল পাওয়া যাবে। কী করা যায় ভাবছি, এমন সময় জানা গেল, আজ স্কুলে মাইনে দেবার জন্য, তপন টাকা নিয়ে এসেছিল, কিন্তু স্কুল পালানোর জন্য টাকা তার পকেটেই আছে। অনেক পটিয়ে পাটিয়ে তার থেকে পয়সা নিয়ে এক গ্লাশ শরবত কেনা হবে ঠিক হলো। শরবত বিক্রেতা জানালো, এক গ্লাশ শরবতের দাম বারো পয়সা। দামটা একটু বেশি হলেও প্রয়োজনের তাগিদে, এক গ্লাশ শরবত নিয়ে খাবার পর দাম দিতে গেলে সে জানালো, শরবতের দাম এক টাকা বারো পয়সা। আমরা তর্ক জুড়ে দিলাম। লোকটা হঠাৎ আমাদের দলের একজনের বুক পকেট থেকে একটা ভালো ফাউন্টেন পেন তুলে নিয়ে চিৎকার করে বলতে শুরু করলো যে, সে এক গ্লাশ শরবতের দাম এক টাকা বারো পয়সাই বলেছিল। আমরা যাকে খুশি জিজ্ঞাসা করতে পারি। জিজ্ঞাসা করার জন্য কষ্ট করে লোকের খোঁজ করতেও হলো না। কিছু বোঝার আগেই দু’চারজন মস্তান গোছের লোক এসে, কাচের গ্লাশ স্বজোরে টেবিলে ঠুকে জোর গলায় জানালো, যে শরবত বিক্রেতা এক টাকা বারো পয়সাই দাম বলেছিল। আমরা অসহায়ের মতো কী করবো ভাবছি। আমাদের সাথে প্রদীপ এসেছিল, ওর কথা যথা সময়ে বলবো। ওর চেহারা অনেকটা “বাঁটুল দি গ্রেট” এর মতো। গায়ে অসম্ভব শক্তি। এর আগে একদিন empty rake এ হাওড়া যাবার সময় একটা বেশ জোয়ান ছেলের সাথে ওর কী নিয়ে যেন ঝগড়া লেগেছিল। ছেলেটা গালাগালি দিতে দিতে হঠাৎ আমাদের দলের একজনের জামার কলার চেপে ধরলে, প্রদীপ তাকে মারতে শুরু করে। ছেলেটা অনেক চেষ্টা করেও প্রদীপকে একবারও আঘাত করতে পারেনি। সে যেন ঈশ্বর পাটনী হয়ে আমাদের মধ্যে এসেছে। প্রদীপ তাকে মারতে মারতে ট্রেনের দরজার কাছে নিয়ে গিয়ে বললো, এবার শালাকে ট্রেন থেকে ফেলে দেব। শেষ পর্যন্ত ছেলেটাকে আমরাই প্রদীপের হাত থেকে মুক্ত করি।

কিন্তু আজ এমন বিপদের দিনে প্রদীপ সঙ্গে এসেও কোথায় গেল ভাবছি, এমন সময় তাকে খুঁজে পাওয়া গেল। ইতিমধ্যে ঐ শরবত বিক্রেতা এক মুসলিম ব্যক্তি ও তার বাচ্চা ছেলেকেও বারো পয়সা আর এক টাকা বারো পয়সার গাড্ডায় ফেলেছে। লোকটা অনেকক্ষণ তর্ক করেও কোন সুফল না পাওয়ায় খুব অসহায় অবস্থায় বললো, “আল্লার কসম তুমি বারো পয়সাই বলেছ, এখন কেন এক টাকা বারো পয়সা চাইছ”? কী কারণে জানি না, শরবত বিক্রেতা আর তার সাথে বিতর্কে না গিয়ে তার কাছ থেকে বারো পয়সাই নিল। আমরাও তার মতো আল্লার কসম খেলেও, আল্লা বা তার, কারোর দয়া হলো না।। প্রদীপ এসে সব শুনে লোকটাকে পেন ফেরৎ দিতে বললো। লোকটা জানালো এক টাকা বারো পয়সা দিলে তবে পেন ফেরৎ দেবে। ইতিমধ্যে আমাদের চারপাশে অনেক দর্শক জুটে গেছে। যে টেবিলটার ওপর শরবতের জগ, বোতল, গ্লাশ ইত্যাদি রাখা ছিল, সেটার একটা কোনা ধরে প্রদীপ বললো, পেন ফেরৎ না দিলে সে টেবিল উল্টে দেবে। ততক্ষণে দু’চারটে খালি গ্লাশ মাটিতে পড়ে গেছে। আমরা গন্ডগোল বাধার আশঙ্কায় শঙ্কিত, দর্শকদের মধ্যে থেকে এবার অনেকেই আমাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। লোকটা কোন ঝামেলায় না গিয়ে চুপচাপ পেন ফেরৎ দিয়ে দিল। এক পয়সাও দাম না দিয়ে, প্রদীপ আমাদের সঙ্গে নিয়ে বাইরে চলে এল।

বাইরে এসে কিছুক্ষণ ঘুরপাক খেয়ে আমরা দক্ষিণেশ্বর গেলাম। তপনের স্কুলের মাইনের টাকা আমাদের ভোগে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে দেখে তপনও আতঙ্কিত। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আশেপাশে ঘুরেফিরে মন্দির চত্বরে আসতে, এক ধবধবে সাদা চুলের থুড়থুড়ে বিধবা বৃদ্ধা আমাদের বললেন “তোমরা এই বয়সেই পুণ্য করতে এসেছ বাবা”? আমি তাঁকে বললাম “পুণ্য আর করতে পারলাম কোথায় ঠাকুমা”? তিনি বললেন, “কেন? এখানে আসলেই পুণ্য লাভ হয়”। বললাম, “এখানে এসে গঙ্গায় স্নান করতেই পারলাম না, পুণ্য আর হলো কোথায়”? তিনি শুনে বললেন “কেন সাঁতার জান না বোধহয়? সাঁতার জানলে স্নান করে নাও, না জানা থাকলে গায়ে, মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়ে নাও, পুণ্য অর্জন নিশ্চই হবে বাছা”। বললাম, “স্নান তো করবো ঠাকুমা, সাঁতারও ভালোই জানা আছে, কিন্তু সঙ্গে গামছা আনা হয়নি যে, স্নান করবো কী ভাবে”? তিনি বললেন, “তাতে কী হয়েছে? তোমরা আমার নাতির মতো, আমার গামছাটা নাও”। তিনি আমায় একটা লাল রঙের ছোট্ট গামছা দিলেন। ব্যাস, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।

মুশকিল হলো গামছা মাত্র একটা, স্নান করার জন্য সাত-আটজন ইচ্ছুক ছেলে মিহির সেনের মতো সাঁতার কাটার জন্য প্রস্তুত। আমি বুদ্ধি দিলাম, প্রথমে একজন গামছা পরে গঙ্গায় নেমে গামছাটা আমাদের দিকে ছুঁড়ে দেবে। সেই গামছা পরে দ্বিতীয়জন গঙ্গায় নামবে এবং আগের মতোই তৃতীয়জনকে ছুঁড়ে দেবে। এইভাবে স্নান শেষ হলে ঠিক উল্টো প্রক্রিয়ায় একে একে পাড়ে উঠে এসে, বৃদ্ধাকে তাঁর গামছা ফেরৎ দিয়ে দেওয়া হবে।

সেইমতো এক এক করে সকলে গঙ্গায় নামলাম। আমি নামলাম সবার শেষে, যাতে স্নান সেরে সবার আগে আমি পাড়ে উঠে আসতে পারি, এবং গামছাটা সারাক্ষণ আমার কোমরে বাঁধা থাকে। বেশ কিছুক্ষণ গঙ্গায় সাঁতার কেটে, স্নান সেরে পাড়ে উঠে এসে প্যান্টজামা পরে গামছাটা দ্বিতীয়জনের উদ্দেশ্যে গঙ্গায় ছুঁড়ে দিলাম। এইভাবে তপন ছাড়া আর সকলে একে একে পাড়ে উঠে এসে জামাপ্যান্ট পরে নিল। এবার গামছাটা তপনকে ছুঁড়ে না দিয়ে একটু ওপরের সিঁড়িতে রেখে দেওয়া হলো। তপন ওই জায়গায় উঠে এসে গামছাটা নিতে পারছে না। ফলে সে গামছাটা জলে ছুঁড়ে দেবার জন্য কাকুতি-মিনতি শুরু করে দিল। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অনেক পুণ্যার্থী মজা দেখছে। কিছুতেই তাকে গামছাটা ছুঁড়ে না দেওয়ায়, এবার সে চিৎকার করতে শুরু করলো— “আমার কিন্তু লজ্জাশরম নেই, এই অবস্থায় পাড়ে উঠে যাব”। আমি বললাম, তাহলে তো গামছার আর প্রয়োজনই নেই, ঠাকুমাকে এটা ফেরৎ দিয়ে দিচ্ছি”। সে প্রায় কেঁদে ফেলার উপক্রম। শেষে তাকে গামছাটা ছুঁড়ে দিতে, সে পাড়ে উঠে এসে জানালো যে, সে আর একটু দেখে সত্যিই পাড়ে উঠে আসতো। যাহোক্, গামছাটা ভালো করে ধুয়ে, চিপে, বৃদ্ধাকে ফেরৎ দেওয়া হলে তিনি খুব খুশি হলেন। তাঁকে দেখে মনে হলো, আমাদের গামছা দিয়ে গঙ্গাস্নানের ব্যবস্থা করে তিনি পুণ্য লাভের আনন্দ উপভোগ করলেন। তপনের স্কুলের মাইনের টাকায় টুকটাক হাবিজাবি খেয়ে বাড়ির পথ ধরলাম।

সুবীর কুমার রায়

১২-০৫-২০০৬

ভবনাথ বাবু (স্মৃতির পাতা থেকে) { লেখাটি ছোটোবেলাতেই ভালো ছিলাম, বই পোকার কলম, বাংলায় লিখুন ও উই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত।}

আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্রী পরিমল সেন ছিলেন, অত্যন্ত রাশভারী ব্যক্তি। তাঁর সৃষ্ট নতুন নতুন নিয়মের গন্ডি, আমাদের স্বাধীনতাকে ক্রমশঃ সঙ্কুচিত করে দিচ্ছিল। টিফিন হতো চতুর্থ পীরিয়ড শেষ হলে। টিফিনের ঠিক আগে, স্কুলের গেট বন্ধ করে দেওয়া শুরু হলো। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে স্কুলে আসতো। স্কুল গেটের বাইরে একজন হিন্দুস্থানী, হজমি, সেকুল, মিষ্টি আমড়া, ইত্যাদি বিক্রি করতো। গেটের সামনে ছাত্রছাত্রীরা জটলা করে, সেইসব অমৃত কিনতো।

পরিমল বাবু নতুন নিয়ম চালু করলেন, কোন ছাত্র বা ছাত্রী পীরিয়ড শেষ হলে, ক্লাশরুমের বাইরে যেতে পারবে না। পীরিয়ড শেষ হলে শিক্ষককে বলে ক্লাশরুমের বাইরে জল খেতে বা বাথরুমে গেলেও শাস্তি পাবে। তিনি নিজেও যদি ভুল করেও কাউকে ক্লাশ শেষে ক্লাশের বাইরে জল খেতে বা বাথরুম যেতে ছাড়েন, তাহলেও সে শাস্তি পাবে। নতুন পীরিয়ডে শিক্ষক আসলে, তাঁকে বলে ক্লাশরুমের বাইরে যেতে হবে। এর পিছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণও ছিল। কোন পীরিয়ড শেষ হলেই, ছাত্ররা দল বেঁধে ক্লাশরুমের বাইরে চলে যেত। পরের পীরিয়ডের শিক্ষক ক্লাশে আসার বহু পরে ছাত্ররা হাওয়া খেয়ে দল বেঁধে ক্লাশে ফিরলে, বাইরে যাওয়া নিয়ে নতুন শিক্ষক কোন প্রশ্ন তুললে স্বচ্ছন্দে জানানো হতো, আগের পীরিয়ডের স্যারকে বলে বাথরুম বা জল খেতে গেছি। আগের পীরিয়ডের স্যারটি তখন অন্য ক্লাশরুমে, একই প্রবলেম ফেস করছেন।

স্কুলের বাউন্ডারি ওয়ালের একদিকে খানিকটা অংশ ভাঙ্গা ছিল। টিফিনে সেই পথে দিব্বি স্কুলের বাইরে যাওয়া যেত। একদিন হঠাৎ দেখা গেল, পাঁচিল সারিয়ে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হলো। টিফিনের সময় বাড়িতে টিফিন খেতে যাবার অজুহাত দেখিয়ে পরিমল বাবুর সাথে কথা বলা হলো। তিনি আমাদের আবেদনে কান না দিয়ে সরাসরি বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসতে বললেন। আমি উঠতি নেতার মতো তর্ক শুরু করে দিলাম— “অত সকালে মা টিফিন তৈরি করে দিতে পারেন না”। স্কুল কম্পাউন্ডের মধ্যে পাঁচিলের ধারে একটা ছোট্ট ক্যান্টিন, না ক্যান্টিন না বলে তাকে চায়ের দোকান বলা-ই বোধহয় ঠিক হবে, তৈরি করা হয়েছিল। শিক্ষকরা ওখান থেকে টিফিন বা চা আনিয়ে খেতেন। পরিমল বাবু আমাকে ঐ দোকান থেকে টিফিন কিনে খেতে বললেন। আমি বিপ্লবী জঙ্গী নেতার মতো ভঙ্গিতে তাঁকে জানালাম যে, আমার বাবার অত পয়সা নেই যে রোজ রোজ দোকান থেকে খাবার কিনে খাব। তাছাড়া, বাবা বাইরের খাবার খাওয়া পছন্দও করেন না। অগত্যা তিন-চারদিন বাধ্য হয়ে তিনি আমাদের কয়েকজনকে ওই দোকান থেকে পাউরুটি আলুর দম, বা ঐ জাতীয় কিছু কিনে খাওয়ালেন। শেষে আবার আগের মতো মিলিটারি নিয়ম চালু হলো। আজ ভাবি, একটি লোকের মুখের কথায়, স্কুলের অত ছেলে বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসতে, বা ঐ দোকান থেকে টিফিন কিনে খেতে বাধ্য হলেও, কোন অভিভাবক কিন্তু থানায় ডায়েরি করেন নি, বা মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থও হন নি, কোন রাজনৈতিক দলের দাদা দিদিও কিন্তু স্কুলের পরিচালন নীতিতে মাথা গলান নি।

স্কুলে ভবনাথ মজুমদার নামে এক অতিবৃদ্ধ প্রাক্তন সহ প্রধান শিক্ষক রোজ সকালে স্কুল খুললে স্কুলে আসতেন। তিনি বিনা বেতনে উচু শ্রেণীর ছাত্রদের ইংরাজী ক্লাশ নিতেন। ইংরাজী ভাষায় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। অন্যান্য শিক্ষকদের মতো, তিনিও ছাত্রদের নিয়মিত ক্লাশ নিতেন, এবং ছুটির পরে সকলের সাথে বাড়ি ফিরতেন। একথা সত্য, যে তাঁর বাড়ি স্কুলের কাছেই ছিল, কিন্তু রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতেও তাঁকে কখনও দেরি করে স্কুলে আসতে দেখি নি। বয়সের ভারে, ও চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসায়, অনেক সময়েই তিনি চট্ করে ছাত্রদের চিনতে পারতেন না। তিনি যেদিন আমাদের ক্লাশে আসতেন, আমি খুব খুশি হতাম। সুযোগ পেলেই উঠে দাঁড়িয়ে বলতাম— “স্যার মাথা বানিয়ে দেব”?

ওনার পায় কেশহীন মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিলে, কপালটা একটু টিপে দিলে, উনি খুব খুশি হতেন। দু’চার মিনিট মাথা বানিয়ে দিয়ে, মিনমিন্ করে বলতাম, “স্যার, আজ সকালে ভাত খেয়ে আসিনি, টিফিনে বাড়িতে ভাত খেতে যাব, একটু লিখে দেবেন? তিনি ছোট সাদা কাগজে বাড়ি যাবার অনুমতি দিয়ে সাক্ষর করে দিতেন, কিন্তু কোন তারিখ দিতেন না। কাগজ নিয়ে মহানন্দে ফিরে এসে নিজের সিটে বসতাম। ক্লাশ শেষ হবার কিছু আগে অন্য সিটে বসে, সেখান থেকে আবার একবার মাথা বানাবার কথা বলে, তাঁর কাছে উঠে যেতাম। তিনি চিনতে পারলে বিনা পারিশ্রমিকে মাথা বানিয়ে দিতাম, আর চিনতে না পারলে, আরও একটা তারিখহীন বাইরে যেতে দেবার হুকুমনামা সংগ্রহ হতো। মজার ব্যাপার, অধিকাংশ সময়েই তিনি চিনতে পারতেন না। অনেক সময় মাথা বানিয়ে দিয়ে বাড়ি যাবার অনুমতিপত্র চাইলে তিনি বলতেন, “এইজন্য মাথা বানাতে এসেছিস”? এর উত্তরও আমার জানা ছিল। সঙ্গে সঙ্গে বলতাম, “না স্যার, তাহলে লিখে দিতে হবে না”। তিনি কিন্তু খুব দয়ালু ছিলেন, আমাদের মিথ্যাচার, শয়তানি, তাঁর শিশুসুলভ নিষ্পাপ মস্তিষ্কে ঢুকতো না। অভুক্ত, অসুস্থ, সন্তানসম, ছাত্রদের কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারতেন না। ফলে ধীরে ধীরে তারিখহীন অনুমতিপত্রের স্টক্ আমার বেশ ভালোই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। গেটের বাইরে যেতে বাধা প্রাপ্ত হলে, স্টক্ থেকে একটা কাগজ মানিকদার, যাকে আমরা আড়ালে মামদো বলে ডাকতাম, হাতে দিয়ে গটগট্ করে গেট পেরিয়ে নিজের পথ ধরতাম। অনেক সময় ঘুরতে যাবার সঙ্গী সাথীদেরও, স্টক্ থেকে এক-আধটা গেটপাশ দান করতে হতো। পরিমল বাবু ব্যাপারটা বুঝতে পেরেও, কিছু করতে পারতেন না। কারণ তিনি নিজেও আর সকলের মতোই ভবনাথ বাবুকে সম্মান করতেন। যে শিক্ষক বহু বছর আগে অবসর নিয়েও শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বিনা বেতনে নিয়মিত স্কুলে আসতেন শুধুমাত্র ছাত্রদের পড়াবেন বলে, তাঁর ওপর কথা বলার কথা, বোধহয় তিনিও ভাবতে পারতেন না। ভবনাথ বাবু আমাদের দাদুর বয়সি ছিলেন। তাঁর সাথে আমাদের দাদু-নাতির মতোই একটা মিষ্টি সম্পর্ক ছিল। আজ অনুশোচনা হয়। স্কুল পালাতাম বলে নয়, তাঁর মতো একজন প্রকৃত ভদ্র, শিক্ষিত, দয়ালু, পণ্ডিত মানুষকে তাঁর সরলতার সুযোগ নিয়ে ঠকাতাম বলে। আজ তিনি না থাকলেও, নিজের দু’কান ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করতে এতটুকু লজ্জা, সংকোচ বা দ্বিধা বোধ হচ্ছে না, বরং নিজেকে অনেক হাল্কা মনে হচ্ছে।

শোলে দেখার ইতিকথা { লেখাটি ছোটোবেলাতেই ভালো ছিলাম, বইপোকার কলম, We’re above 60’s, বাংলায় লিখুন, ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত।}

ভারতীয় সিনেমা জগতে শোলের মতো দর্শক উন্মাদনার ইতিহাস তার আগে আর বোধহয় দেখা যায়নি, অন্তত আমার তো জানা নেই। রাস্তাঘাটে রক্ষাকালী, শীতলা, মনসা, ইত্যাদি পূজা, এমনকী স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, নেতাজী বা স্বামীজীর জন্ম দিবস, বা শিশু দিবস, ঘটা করে পালন করার অনুষ্ঠানে এখনকার মতো তারস্বরে শুধুমাত্র হনি সিং-এর গান বা লুঙ্গি ড্যান্স্ বাজিয়েই ভক্ত যুবকেরা ক্ষান্ত না হয়ে, শোলের ডায়লগের ক্যাসেট বা রেকর্ড বাজিয়ে অন্তরের ভক্তি নিবেদন করতো। টিভিতে প্রথম যেদিন শোলে দেখানো হয়, শুনেছিলাম সেই সুযোগটা হাতছাড়া না করে ছিঁচকে চোরেরা ভর দুপুরে অনেক বাড়ির ওপরই সুনজর দিয়ে লাভবান হয়।

হিন্দী ভাষায় কথাবার্তা একটু কম বোঝায়, আমি সাধারণত ডায়লগ ভিত্তিক সিনেমা দেখা থেকে নিজেকে দূরে রাখতাম। কেউ পাঁচবার, কেউ বা তার থেকে অনেক বেশিবার দেখে শোলের ডায়লগ যখন প্রায় সকলের মুখে মুখে ফিরতো, তখনও আমরা দুই ভাই রাষ্ট্রভাষার ভয়ে শোলে দেখায় আগ্রহ প্রকাশ করিনি।

এরকম একটা সময় আমাদের বাড়ির পাশে বিখ্যাত শ্যামলী হলে শোলে দেখানো শুরু হলো। আমার তাই নিয়ে সামান্যতম মাথাব্যথা না থাকলেও, আমার ভাই বেশ লজ্জিত হয়েই দুঃখ প্রকাশ করে বললো—“রাঙাদা, সবাই দশ-বিশবার করে শোলে দেখেছে, আমরা একবারও দেখিনি শুনলে লোকে  কি বলবে, চল্ দুজনে গিয়ে রাতের শোতে দেখে আসি। আমি বললাম “হিন্দী ভাষায় কথা ভালো বুঝতে পারি না বলেই তো এতদিন দেখি নি”। সে জানালো, যে সে সমস্যার সমাধান সে বার করে  ফেলেছে, তাই আগামীকাল নির্ঝঞ্ঝাটে সিনেমা দেখায় কোন সমস্যা হবে না।

ভাইয়ের প্রাণের বন্ধু গৌতম, যদিও সে আমারও বন্ধুর মতোই ছিল, আমাদের সাথে শোলে দেখতে যাবে। লম্বা চওড়া স্বাস্থ্যবান রসিক গৌতম আমাদের জন্য এতবড়ো পবিত্র দায়িত্ব পালন করছে, তাই তার জন্য টিকিট কাটা ছাড়া রাতের থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থাও করা হলো। নির্দিষ্ট সময়ে দোভাষী গৌতম এসে হাজির হয়ে কথা দিল, যে সে সমস্ত সিনেমার ডায়লগ আমাদের বাংলায় বুঝিয়ে দেবে।

নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগেই আমরা সব থেকে ব্যয়বহুল আসনে নিজেদের আসন গ্রহণ করলাম। দু’জনকেই একসাথে বোঝাবার সুবিধার্থে তাকে আমাদের দু’জনের মাঝখানের আসনে খাতির করে বসানো হলো।

এই হলটার একটু বিবরণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, হলের দু’পাশে লম্বা রো, মাঝখান দিয়ে হাঁটা চলার ব্যবস্থা। অবশ্য হলের দু’পাশ দিয়েও হাঁটাচলার জায়গা রাখা আছে। দাঁতের পাটির মতো একটার সাথে অপরটা জোড়া আসনগুলোর একবারে দুই প্রান্তে নাটবল্টু দিয়ে মেঝের সাথে লাগানো। প্রতিটা রোয়ের নাটবল্টুই মোগল আমলের পরে সম্ভবত মেরামত বা পরিবর্তন করা হয়নি, তাই যেকোন আসনের একজন যদি সামনে বা পিছনে কাত হয়ে বসে, তাহলে সেই রোয়ের সমস্ত আসনের দর্শককেই তার মর্জিমাফিক সামনে বা পিছনে কাত হয়ে বসতে হবে। দ্বিতীয়ত, মাঝেমাঝেই হলের আলো, বা সাউন্ড, বা উভয়ই কমতে শুরু করে, তখন হাজার চিৎকার চ্যাঁচামেচি করেও কিছু লাভ হতো না, কিন্তু কাঠের আসনের ওপর জোরে জোরে চড়চাপড় মারতে শুরু করলেই, কোন মন্ত্রবলে তৎক্ষণাৎ সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। সমস্যা নিরময়ের এই প্রথা সম্বন্ধে প্রায় সকল দর্শকই অবগত ছিল, তাই অহেতুক চিৎকার করে সময় নষ্ট না করে, প্রথমেই চেয়ার চাপড়ানো শুরু করে দিত।

সে যাহোক যে কথা হচ্ছিল, সিনেমা শুরু হলো। গৌতমকে দেখে মনে হচ্ছে যে সে এই প্রথম শোলে দেখছে। আমরাও মোটামুটি নিজেদের বুদ্ধিমতো কথা বুঝে সিনেমা দেখছি। হলের ওপর দিকে বিরাট একটা ঝুল না কি যেন ছাদ থেকে অনেকটা নীচু পর্যন্ত ঝুলে হাওয়ায় দুলছে ও সমস্ত পর্দা জুড়ে তার বিশাল একটা কালো ছায়া দোল খাচ্ছে। একদম ওপরে ছাদের কাছে গোলা পায়রার বাসা। খানকতক গোলা পায়রা মনের আনন্দে মাঝেমাঝেই এদিক ওদিক উড়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ একটা পায়রার পা বা ডানা লেগে ছিঁড়ে ঝুলটা ওপর থেকে নীচে ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করলো। পর্দায় সেই বিশাল ঝুলের নীচে পড়ার লাইভ টেলিকাস্ট্ আমরাও দেখলাম। পর্দায় আর ঝুলঝামেলা না থাকায়, সমস্ত দর্শক মুখের ভিতর দুটো আঙুল ঢুকিয়ে তীব্র শিস দিয়ে হলের মালিককে না পায়রাটাকে জানি না, কিছু সময় নিয়ে শুভেচ্ছা জানালো।

কথা ছিলো গৌতম মাঝে বসে হিন্দী কথা বাংলায় অনুবাদ করে আমাদের রিলে করে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সে সিনেমা দেখায় এতোটাই মগ্ন, যে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে গেলেই সে বিরক্ত হয়ে বলছে, “এখন কথা বলবেন নাতো, বাড়ি ফিরে রাতে বলে দেব। নিরুপায় হয়ে আমরা কখনও বুঝে, কখনও না বুঝে, কখনও বা অর্ধেক বুঝে শোলে দেখছি।

একসময় দেখলাম সেই দৃশ্য, শুনলাম সেই বিখ্যাত উক্তি, যা পূজা মন্ডপে, যুবকদের মুখে অজস্রবার শুনেছি—“কিৎনা আদমী থে, সরদার দো আদমী থে….” তারপরে রিভলবারের তিনটি কার্তুজ বার  করে নিয়ে গুলি করা ও “যা তু ভী বাঁচ গ্যায়ে” ইত্যাদি ইত্যাদি। পরিস্কার দেখলাম একে একে  তিনজনই বেঁচে গেল। ছবি চলছে, হলের ভিতর আলো ও সাউন্ডে কোন গোলমাল নেই, ফ্যানের ফুরফুরে হাওয়াতেও একটা বসন্তের আমেজ আছে, এমন সময় শুরু হলো প্রবল চেয়ার চাপড়ানো সঙ্গে হলের মালিকের চোদ্দো পুরুষের উদ্দেশ্যে চোখা চোখা বিশেষণ এমনকী মা মাসিকেও টেনে আনা হলো। গৌতমকেও দেখলাম প্রবল উত্তেজিত। একমাত্র আমরা দুই ভাই উত্তেজনার কারণ অনুধাবন করতে না পেরে, চুপ করে বিরোধী পক্ষের আসনে বসে।

হলের সমস্ত আলো জ্বেলে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর হল আবার অন্ধকার করে সেই দৃশ্য আবার দেখানো হলো। এবার দেখা গেল ওই দৃশ্যের শেষটায় ভিলেন গব্বর সিং হঠাৎ ওই তিনজনকেই গুলি করে মেরে দিল। আমরা না হয় আগে দেখিনি, ভালো হিন্দী বুঝি না তাই চুপ করে ছিলাম, কিন্ত আর সবাই তো দশ-বিশবার করে দেখা পাবলিক, মাতৃভাষার থেকেও ভালো হিন্দী বোঝে, তারা সহ্য করবে কেন? যাহোক বাকি অংশ বিনা গোলমালে সিনেমা দেখে তৃপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরে বিশিষ্ট অতিথি গৌতমের খাওয়া ও শোয়ার ব্যাপারে মন দিলাম।

সুবীর কুমার রায়

২৭-০১-২০১৮