মধু বোঁদে { লেখাটি বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম , প্রতিলিপি বাংলা , পাক্ষিক গল্পগুচ্ছ ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত। }

প্রতিদিন কতো যে অদ্ভুত সব ঘটনার সাক্ষী হতে হয়, অদ্ভুত সব মানুষের সাথে পরিচিত হতে হয়, ভেবে হাসিও পায় আবার দুঃখও হয়। এদের কে ভুলতে চাইলেও কিন্তু ভোলা যায় না। মনের গভীরে বাসা বেঁধে রয়েই যায়। আজ এরকমই একজন আপাত নিরীহ গোবেচারা মানুষকে দীর্ঘ দিন পরে রাস্তায় হঠাৎ দেখে এক যুগ আগের এক ভয়ঙ্কর দুর্যোগের রাতের কথা মনে পড়ে গেল। ভদ্রলোকের সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয় না থাকলেও, তাঁকে রাস্তাঘাটে প্রায়ই দেখতাম।

মার্চ মাসের একটা দুপুর, অফিসে কাজের ভয়ঙ্কর চাপ, হঠাৎ এক অত্যন্ত ঘনিষ্ট বন্ধুর ফোন, তার মা মারা গেছেন। ওর মা’কে মাসিমা বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে পুত্রসম স্নেহ করতেন, কতোবার ওদের বাড়ি গিয়ে কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে এসেছি, একসাথে বেড়াতে গেছি। যদিও বন্ধুর বাড়ি, আমার বাড়ির কাছেই তবু সহকর্মীদের ওপর হাতের কাজ চাপিয়ে সোজা তার বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হলাম। আকাশের অবস্থা খুব ভালো বলে মনে হলো না, তাই প্রাথমিক শোক সামলে নিয়ে একসময় একটা ম্যটাডোরে শবদেহ নিয়ে নিকটতম শ্মশান ঘাটে নিয়ে যাওয়া হলো। উল্লিখিত ভদ্রলোককে ওই পাড়ার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে সঙ্গে যেতে দেখলাম। তখনও নিমতলা, কেওড়াতলা, ইত্যাদি মহাশ্মশান ছাড়া আর সব শ্মশানেই কাঠের চিতায় শবদাহ করা হতো। হাওড়ার শ্মশান ঘাটগুলোয় বৈদ্যুতিক চুল্লি হয়তো স্বপ্নের পর্যায়েই ছিল। যাইহোক, তখনও শবদাহ করতে যাওয়াটা এখনকার মতো ঠিক ‘জুলে রিমে ট্রফি’ জয়লাভের আনন্দানুষ্ঠানের পর্যায়ে পড়তো না, হরিধ্বনি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো বটে, তবে সেই ধ্বনির তীব্রতা কখনই সহনীয় ডেসিবেল মাত্রা অতিক্রম করতো না।

সে যাহোক্, যেকথা বলছিলাম, রওনা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মুষলধারে শিলাবৃষ্টি শুরু হলো। চশমা খুলে রেখে হাত দিয়ে মাথা বাঁচিয়ে আমরা কোনমতে শ্মশান ঘাটে গিয়ে হাজির হলাম। এই শ্মশানটায় গোটা চারেক চুল্লির  ব্যবস্থা থাকলেও, বৃষ্টির জন্য আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিলো না। শ্মশান চত্বরে একটা মন্দির, তার সামনে বেশ খানিকটা জায়গা উঁচু করে লাল সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো চাতাল। শ্মশান যাত্রীরা ও ভক্তরা সেই চাতালে বসে পূজা দেখেন, বিশ্রাম নেন। আমরা ভিজে পোষাকে সেই চাতালের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, কারণ লাল তেলতেলে বাঁধানো চাতালটা এখন আর বসার মতো অবস্থায় নেই। চাতালের ঠিক নীচে শবদাহের চুল্লির অঞ্চলটি জলমগ্ন, জলের হাত থেকে বাঁচতে কয়েকটা কুকর সেই চাতালে আশ্রয় নিয়েছে। ভিজে কর্দমাক্ত নোংরা চাতালে মাছি ভনভন্ করছে। অবশেষে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে ধীরে ধীরে জল নেমে গেলে, শবদাহর জন্য প্রস্তুতি পর্ব সমাপ্ত হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে মুখাগ্নি ও চিতায় অগ্নিসংযোগ করা হলে, আমরা ভিজে পোষাকে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে  চাতালের ওপর দাঁড়িয়ে রইলাম। অবস্থার গভীরতা অনুভব করে বন্ধুর বাড়ি থেকে বেশ কয়েকটা গরম চাদরও ইতিমধ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

শ্মশানের কাজ মিটতে বেশ রাত হয়ে গেলো। গাড়িটাকেও চুক্তিমতো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর বেশ অনেকটা পথ হেঁটে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে অস্থি ভাসিয়ে স্নান করা, বন্ধু ও তার ভাইকে কাছা ধারণ করতে সাহায্য করা, ইত্যাদি মিটিয়ে যখন বাড়ির পথ ধরলাম, তখন অনেক রাত। মনে একটাই চিন্তা, আমার নিজের কোন সংস্কার না থাকলেও, বা সঙ্গে অনেক লোক থাকলেও, বন্ধুর বাড়ি একবার যেতেই হবে। সেখানে লোহা ছুঁয়ে, দাঁতে নিমপাতা কেটে, আগুনের তাপ নিয়ে, নিজের বাড়ি ফেরার পথে কুকুরের আক্রমণের মুখে না পড়তে হয়।

যাইহোক বেশ ফিরছিলাম। রাস্তায় যত্রতত্র কুকুর শুয়ে থাকলেও, তারা বোধহয় আমাদের আজ এই দুঃখের দিনে তেড়ে আসতে সংকোচ বোধ করে একবার মুখ ঘুরিয়ে দেখে আবার শুয়ে থাকলো। কিন্তু ফেরার পথে অনেকক্ষণ পরপর অনুচ্চ স্বরে হরিধ্বনি দেওয়া হলেও, অল্প বয়সি যুবকরা মাঝেমাঝেই সুর করে উচ্চৈঃস্বরে “মধু বোঁদে” বলে চিৎকার করছিল। কেন করছিল বা কার উদ্দেশ্যে করছিল বুঝতে না পারলেও, একটা আসন্ন ঝামেলার আঁচ অনুভব করছিলাম।

কিছুক্ষণ পরেই মধু বোঁদে চিৎকারের সাথে সাথেই সামনে থেকে “তোর বাপকে গিয়ে বল্” উত্তর শুনতে পেলাম। এরপর থেকে মধু বোঁদে চিৎকারের পর্দা ও সংখ্যা, উভয়ই বেড়ে গেল। বেড়ে গেল সামনে থেকে ওই ভদ্রলোকের মুখ থেকে চোখা চোখা উত্তরের সংখ্যা। ক্লান্ত অবসন্ন দেহে কাঁপতে কাঁপতে সারাদিন পর ফেরার পথে, এমন একটি দিনে শ্মশান বন্ধুদের এই আচরণ ক্রমশঃ বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল।

বেশ ফিরছিলাম, আর হয়তো আধ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবো, এমন একটা সময় অতি নিরীহ ভদ্রলোকটি অতি হিংস্র রূপ ধারণ করে “শালা, তোদের বাপরা আমাকে দাদা বলে ডাকে আর তোরা কাল কা যোগী, আমায় নাম ধরে ডাকছিস? এসব কথা তোদের বাপেদের গিয়ে বলগে যা”, সাথে সঙ্গী যুবকদের বাপেদের উদ্দেশ্যে চোখা চোখা বিশেষণ উচ্চরণ করে একজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মারামারি, ধস্তাধস্তি, চিৎকার করে গলিগালাজের বন্যা বইতে শুরু করায়, শুয়ে থাকা কুকুররা পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে দলবদ্ধ হয়ে অন্যান্য পাড়ার সঙ্গীদের ডেকে এনে প্রতিবাদ শুরু করে দিলো। কয়েকজন পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেও বিফল হলো। বাধ্য হয়ে আমরা কয়েকজন বাস রাস্তার ওপর বসে একটা আশঙ্কা নিয়ে যুদ্ধ বিরতির অপেক্ষা করতে লাগলাম। রাতদুপুরে এই চিৎকার চেঁচামিচিতে না স্থানীয় লোকেরা বিরক্ত হয়ে ঝামেলা শুরু করেন। যাহোক্, অনেক চেষ্টার পর পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়ায়, আমরা বন্ধুর বাড়ি অক্ষত দেহে ফিরে এসে প্রয়োজনীয় নিয়ম কানুন সুসম্পন্ন করে, যে যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

পরে মধু বোঁদে রহস্য উদঘাটন হয়েছিল। জানা গেল কোন এক উৎসব বাড়িতে মধু নামক ওই ভদ্রলোক বোঁদে পরিবেশন করেছিলেন, তারপর থেকে তাঁকে ‘মধু বোঁদে’ বললেই তিনি ওইরকম উত্তেজিত হয়ে পড়েন। জানি না, যে উৎসব বাড়িতে মিষ্টি হিসাবে একমাত্র বোঁদেই হয়েছিল, সেখানে তাঁর দোষটা কোথায়? তিনি সেখানে বোঁদের পরিবর্তে কিভাবে রসগোল্লা পরিবেশন করবেন, ভেবে পেলাম না।

সুবীর কুমার রায়

০৬-০৭-২০১৭

Advertisements

ভীষ্মলোচন শর্মা { লেখাটি বাংলায় লিখুন ও বই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

আমাদের পাড়ায় গতকাল সকাল হইতেই একটি বাড়িতে নামগান সংকীর্তন শুরু হইয়াছে। কত প্রহরের অনুষ্ঠান জানা নেই, তবে প্রায় সারা রাত চলার পর, আবার আজ কাকভোর হইতে নতুন উদ্দমে শুরু হইয়াছে। যদিও মাইকের কোন প্রয়োজনই ছিল না, তথাপি অন্যান্য জেলার, হয়তো বা অন্যান্য রাজ্যের বাসিন্দাদের কথা ভাবিয়া, খরচের কথা না ভাবিয়া মাইকের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। শবদেহের সাথে যাহারা কীর্তন গাহিতে গাহিতে যান, তাঁহাদের হঠাৎ সংগীত উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাওয়ায়, এখানে আসিয়া গান গাহিয়া আমাদের ধন্য করিতেছেন। ডি.এন্.এ. পরীক্ষা না করিয়াই বলে দেওয়া সম্ভব, যে শিল্পীরা ভীষ্মলোচন শর্মার বংশধর না হইয়া অন্য কোন বংশের হইতেই পারেন না। সকলেরই ভালো লাগা উচিৎ, ছোট বউ, মেজো বউ, বড় বউ ছবির মতো ইহাতে আন্ন্দ পাওয়ার সব উপকরণই বিদ্যমান। লোকনাথ বাবা, লক্ষ্মী মাতা, কালী মাতা, হরি, রাম, রামকৃষ্ণ, সকলেই নিজ নিজ গুণে সৎগীতে স্থান পাইয়াছেন। নিজ নিজ বাটি হইতে যাঁহারা শ্রবণ করিতে পারিতেছেন না, তাঁহাদের সকলকে আহ্বান জানানো হইতেছে। ৪০-৪১ ডিগ্রী উত্তাপেও যাঁহার ইহার ব্যবস্থা করিয়া, দুই হাত দূরত্বে বসিয়া বধির হইবার ভয়কে উপেক্ষা করিয়া শ্রবণ করিতেছেন, তাঁহাদের ধন্যবাদ। যাঁহারা এই কীর্তন শ্রবণ করিয়া বিরক্তি প্রকাশ করিতেছেন, সেইসব পাপিষ্ঠদের ধিক্কার জানাইতেছি।

নকশাল আন্দোলন ও ছোটমামু

সাতের দশকের প্রায় প্রথম দিক থেকেই শুরু হয়ে গেল এক নতুন বিপদ, বিশেষ করে যুবকদের বিপদ। নকশাল আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললে, শুধু খুন জখমের খবরে পাতা ভরা থাকতো। সর্বত্র বোমার আওয়াজ, গোলাগুলি আর পুলিশের ঝামেলা লেগেই থাকতো। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা সহনীয় ছিল। অত্যন্ত মেধাবী ছেলেরা এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়লো। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্ররা, যাদের আমরা চিরকাল অন্য চোখে দেখে আসতে অভ্যস্ত, তাদের অনেকেই এই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভাবে যোগ দিল। তারা অবশ্য একটা আদর্শ, একটা নীতি নিয়ে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। সাধারণ জনগন তাদের এই আদর্শকে সমর্থনও করেছিল। কিন্তু এখন যেমন ঠাকুর দেবতা, রাজনীতি বা হাত দেখা, কিছু মানুষের জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে সময়ও বেশ কিছু অশিক্ষিত, সমাজের অপাংক্তেও ছেলে এই আন্দোলনকে তাদের জীবিকা হিসাবে গ্রহন করে, নিজেদের নকশাল হিসাবে পরিচিত করেছিল। পাড়ায় পাড়ায় মস্তানি, লুঠতরাজ ও অত্যাচার ছিল তাদের এই রাজনীতি নামক জীবিকার অঙ্গ। এরা পাড়ার লাইট পোষ্টের বাল্ব ভেঙ্গে, পাড়ার রাস্তাঘাট অন্ধকার করে রাখতো। এর গাছের ডাব, তার বাগানের সবজি জোর করে নিয়ে যেত। ভয়ে তাদের কেউ কিছু বলতে সাহস করতো না। আর এটাই ছিল তাদের মুলধন। আমাদের পাড়ায় একটা ছেলে ছিল, যার কাজ ছিল রাস্তার লাইট পোষ্টের বাল্ব ভেঙ্গে দেওয়া। এই কাজের জন্য সে পয়সাও পেত। সেও নিজেকে নকশালপন্থী বলে পরিচয় দিত, এবং ভয়ে, ভক্তিতে, অনেকেই তাকে একজন বিশিষ্ট নকশাল নেতা বলে সমীহও করতো। হায় রে চারু মজুমদার, কানু স্যান্যাল, তোমরা শিব গড়তে গিয়ে এ কী তৈরি করলে?

সি.আর.পি. ও পুলিশের ধরপাকড়ের ঠেলায় সব নকশালপন্থীরা পালিয়ে পালিয়ে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এরমধ্যে একদিন আমার ছোটমামা, যাকে আমরা ছোটমামু বলে ডাকি, আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হ’ল। দিদির থেকে বছর খানেকের বড় এই ছোটমামু ছিল একটু কমবুদ্ধি সম্পন্ন খ্যাপাটে গোছের। এর কথা লিখতে গেলে রামায়ণ হয়ে যাবে। ছোটমামু দিদুর খুব আদরের ছিল। অনেক চেষ্টা করেও বেচারা ম্যাট্রিক পাশ করতে পারে নি, করার কথাও নয়। তবু এই ছোটমামু সম্বন্ধে কিছু বলতেই হবে, তা নাহলে নকশালদের সম্বন্ধে ধ্যান ধারণাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। চোখে খুবই কম দেখে, কথা বলতে গেলে আটকে যায়, যাকে আমরা তোতলা বলি আর কী, সারা শরীরে ছুলি, পৃথিবীর কোন বিষয়ের কোন খবর রাখে না, পড়াশোনার দৌড় তো আগেই বলেছি। ছোটমামু ও সুকুমার রায় সৃষ্ট গঙ্গারামের মধ্যে কে বেশি মেধাবী, তা নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে। যাহোক্, এ হেন ছোটমামুও নকশালপন্থী ছিল। যদিও নকশালবাড়ি কোথায়, নকশালদের বক্তব্য বা নীতি কী, সে জানতো না। সে শুধু এটা জানতো— “চিনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান”। যদিও চিন দেশটা কোথায় এবং তার চেয়ারম্যান-ই বা কে, সে সম্বন্ধে তার স্বচ্ছ ধারণার অভাব ছিল। তার পিছনে এই নিয়ে আমরা খুব লাগতাম।

একবার আমি আর আমার ছোট ভাই মামার বাড়ি গেছি। দাদু-দিদু যে ঘরে থাকতেন, তার পাশের ঘরে দু’পাশের দু’টো চৌকির একটায় আমি ও ভাই রাতে শুয়েছি, অপরটায় ছোটমামু। একটু আগেই ছোটমামুর সাথে মাও সে তুংকে নিয়ে কথা হয়েছে। আমি ভাইকে ম্যাও ম্যাও করে বেড়ালের মতো ডাকতে বললাম। আমার কথা মতো ভাই কয়েকবার ম্যাও ম্যাও করতেই, ছোটমামু একটানে মশারির দড়ি ছিঁড়ে বিছানা থেকে উঠে এসে চিৎকার করে বলতে শুরু করলো, “খোকা, খুব সাবধান। এসব নিয়ে ইয়ার্কি ঠাট্টা করবি না। আমি কিন্তু মামা-ভাগ্নের সম্পর্ক বুঝি না। খুন করে করে আমার হাত পেকে গেছে। আমি বুঝি স্রেফ শেষ করে যাও”। এমন ভাবে সে কথাগুলো বললো, যেন আগে সে অনেককে শেষ করেছে। প্রিয় পুত্রের চিৎকার শুনে দিদু পাশের ঘর থেকে বলতে শুরু করলেন— “ও যেটা বিশ্বাস করে তা নিয়ে তোরা কেন কথা বলছিস? অনেক রাত হয়েছে এবার ওকে ঘুমতে দে। তোরাও ঘুমো”।

মেজমামা একটি বিদেশী কোম্পানিতে উচ্চ পদে কাজ করতেন এবং তাঁর চেষ্টায় ছোটমামুও এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি পায়। ছেলে ভাল চাকরি করে, বয়স হয়েছে, লেখাপড়া হয়তো খুব একটা করেনি, কিন্তু পাত্র হিসাবে খারাপ কোথায়? সোনার আংটি আবার বাঁকা, আর তাই ছোটমামুর বিয়ে নিয়ে দিদু খুব ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। বিয়ে ঠিকও হ’ল। দিদু খুশি, ছোটমামুও খুশি, বাকি সবাই চিন্তিত। সব বিয়েতেই পাত্রের সাথে কেউ না কেউ বিয়ে বাড়িতে রাতে থাকে। সঙ্গ দেওয়া এবং নানারকম ঝুটঝামেলা, মানে ব্যাগিং থেকে পাত্রকে রক্ষা করার জন্যই রাতে থাকা। সাধারণত বন্ধুবান্ধব বা সমবয়সি ভগ্নিপতি বা ঐ জাতীয় কেউ, পাত্রের সাথে রাতে থাকে। কিন্তু ছোটমামুর সাথে থাকার মতো কোন বন্ধু না থাকায়, বা আর কেউ সেরকম যোগ্য বিবেচিত না হওয়াতেই বোধহয়, এই বিপজ্জনক, দুঃসাহসিক, দুর্লভ কাজটার ভার এই হতভাগ্যের ওপর বর্তালো। নিজেকে কিরকম ব্ল্যাক ক্যাট, ব্ল্যাক ক্যাট মনে হওয়া সত্ত্বেও এই জাতীয় জেড প্লাস ক্যাটাগরির ভি.ভি.আই.পি.-র সাথে রাতে একা থাকতে সাহস হ’ল না। শেষ পর্যন্ত ক্ষৌণীশদাকে অনেক বুঝিয়ে, আমার হেল্পার কাম সচিব হিসাবে সঙ্গে থাকতে রাজি করালাম।

বিয়েবাড়িতে হইচই, খাওয়া দাওয়া চলছে। ছোটমামু বরাসনে প্রচন্ড গাম্ভীর্য নিয়ে বসে, পাশে আমি ব্ল্যাক ক্যাটের মতো চারিদিকে তীব্র নজর দিয়ে প্রহরারত। মাঝেমাঝে মনে হচ্ছে হিটলারের পরে আর বোধহয় কেউ ছোটমামুর মতো এত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে পারে নি। মাঝেমাঝেই কন্যাপক্ষের লোকজন আমাকে খেয়ে নেবার জন্য অনুরোধ করছে। ইচ্ছা থাকলেও যাবার উপায় নেই।

এরমধ্যে এক ভদ্রলোক এসে হাত জোড় করে ছোটমামুকে বললেন, “নমস্কার, আমি সম্পর্কে আপনার মামাশ্বশুর হই”। ছোটমামু তার ব্যক্তিত্বের রেগুলেটারের নব্ দু’-তিন ঘর বাড়িয়ে গম্ভীর ভাবে ঘোষণা করলো, “দুঃখিত, আমি কিন্তু আপনাকে প্রণাম করতে পারছি না”। ভদ্রলোক নরম গলায় বললেন, “আরে না না, তার দরকার নেই, তবে আমি কিন্তু বয়সে ও সম্মানে আপনার থেকে বড়। আপনার সম্বন্ধে অনেক কথা শুনেছি, তাই আলাপ করতে এলাম”। ছোটমামু আরও গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞাসা করলো, ”আমার সম্বন্ধে আপনাকে কে কী বলেছে”? কথাবার্তায় পরিবেশ ক্রমশঃ জটিল হচ্ছে দেখে, আমি প্রসঙ্গ বদলে অবস্থার সামাল দিলাম।

একসময় বিয়ে শুরু হ’ল। পুরোহিত ছোটমামুকে তার সাথে মন্ত্র পাঠ করতে বললে, ছোটমামু গম্ভীর হয়ে মন্ত্রের মানে জানতে চাইছে এবং কখনও কখনও তার মূল্যবান মতামতও ব্যক্ত করছে। এভাবে একসময় বিয়ে শেষ হ’ল। বরযাত্রীরা সবাই ফিরে গেল। আমি আর ক্ষৌণীশদা পবিত্র কর্তব্য পালন করার জন্য বিয়ে বাড়িতে থেকে গেলাম। এবার শুরু হ’ল স্ত্রী আচার। একটা ছোট ঘরে রাজ্যের মেয়েরা ছোটমামুকে ঘিরে ভিড় করে আছে। এই ভয়ঙ্কর সময়টাকে সামলানোর জন্যই আমাদের এখানে থাকা, অথচ ক্ষৌণীশদা সুযোগ বুঝে কোথায় কেটে পড়েছে। একঘর মেয়েদের মধ্যে বর ছাড়া আমি একমাত্র পুরুষ। মেয়েরা বোধহয় আমার এ ঘরে থাকার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বার বার বলছে, “মেয়েদের মধ্যে তুমি কী করছো? যাও, গিয়ে খেয়ে নাও”। আমি আর কী করি, বাধ্য হয়ে বললাম, “ছোটমামুর সাথে একসঙ্গে খেতে যাব”। মেয়েরা জানালো আজ মামা-মামীকে আলাদা করে খেতে দেওয়া হবে, কাজেই আমি যেন খেতে চলে যাই। আমি ছোটমামুর ঠিক পিছনটায় দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় ছোটমামুর শাশুড়ি এক কাচের গ্লাশে দুধ নিয়ে এই ঘরে এসে, ছোটমামুকে তাঁর কোলে বসতে বললেন। ছোটমামু কিছুতেই তাঁর কোলে বসতে রাজি নয়।

আসলে ওদের বাড়ির প্রথা, শাশুড়ি বাবু হয়ে বসে, দুই কোলে মেয়ে ও জামাইকে বসিয়ে এক গ্লাশ দুধ দু’জনকে খাওয়াবেন। আমি ব্যাপারটা বুঝে ছোটমামুকে কোলে বসতে বললাম। আমি এটা বুঝেছিলাম যে শাশুড়ি কখনও জামাইকে নিয়ে ইয়ার্কি ঠাট্টা করবেন না। ছোটমামুকে আমার বলা-ই ছিল, যে আমি না বললে সে যেন কোন কিছু না খায় বা করে। এটা তো সত্যি, যে যুদ্ধ ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে সমস্ত কিছুই ন্যায্য ও নির্দোষ। তাই এরকম একটা ভয়ঙ্কর যুদ্ধক্ষেত্রে, তাও আবার ভিনদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমায় একটা অন্যায় কাজ নির্দোষ হিসাবেই মেনে নিতে হ’ল। সবার অলক্ষ্যে ঝুঁকে পড়ে হাত দিয়ে ইশারা করায় অসুবিধা থাকায়, পিছন থেকে প্রায় বারো বছরের বড় ছোটমামুকে সবার অলক্ষে পা দিয়ে মৃদু আঘাত করলাম, কিন্তু ও বুঝলো না। বাধ্য হয়ে তখন বলতেই হ’ল, “ছোটমামু, উনি যা বলছেন কর”। সমস্ত মেয়েরা হইচই করে উঠলো “তুমি এ ঘর থেকে যাও তো বাছা। ছোটদের এ ঘরে থাকতে নেই”। আমি আবার বললাম, “ছোটমামু উনি যা বলছেন কর”। গ্রীন সিগনাল পেয়ে ছোটমামু উৎসাহিত হয়ে প্রায় লাফ দিয়ে তার শাশুড়ির কোলে বসে পড়ে দুধের গ্লাশটা নিয়ে চোঁ চোঁ করে দুধ খেতে শুরু করলো। শাশুড়ির অপর কোলে তাঁর মেয়ে, অর্থাৎ আমাদের ছোটমামী বসে ঐ গ্লাশের অর্ধেক দুধ, যাকে ছোটমামুর প্রসাদ বলা যেতে পারে, খাওয়ার অপেক্ষায়। বিপদ বুঝে আমি পিছন থেকে আবার কয়েকবার মৃদু পা চালিয়ে ছোটমামুকে দুগ্ধ পান থেকে যখন বিরত করতে সমর্থ হলাম, তখন গ্লাশের নীচে, সামান্য অমৃত পড়ে আছে। প্রথা মাফিক ছোটমামী সেই টুকু দুধ পান করে ধন্য হ’ল। একসময় জানা গেল, বর-কনেকে ঘরে খেতে দেওয়া হবে। রাতও অনেক হয়েছে, তাই আমিও খেতে গেলাম। আগেই লক্ষ্য করেছি, কাপ আইসক্রীম হয়েছে। যাবার আগে ছোটমামুকে বার বার সাবধান করে গেলাম, সে যেন আইসক্রীম কাপের ঢাকনাটা না চাটে। আমি জানি পাতলা কাগজের ঢাকনা খুললে তাতে আইসক্রীম লেগে থাকবেই, এবং ছোটমামু অবশ্যই সবার সামনে সেটা চেটে খাবে। যাহোক, বরযাত্রী হিসাবে নিমন্ত্রিত হয়ে এসে, কপাল দোষে শেষ পাতে ঠান্ডা খাবার খেয়ে এসে দেখলাম, ওদের খাওয়াও শেষ। ওদের বাড়ির রীতি অনুযায়ী, দু’জনকে এক ঘরে থাকার ব্যবস্থা করা হ’ল। এতক্ষণে আমার মুক্তি, আর এতক্ষণে আমি একটা ঘরে শুতে গিয়ে আমার অ্যাসিস্টেন্ট, ক্ষৌণীশদার দর্শণ পেলাম।

এই ছোটমামুর ধারণা ছিল, সে খুব বড় নকশাল নেতা। যদিও তার সম্পর্কে সকলেই জানতো। তার বৌভাতে সম্ভবত তার কোন বন্ধু, ইয়ার্কি করে কিছু বই উপহার দিয়েছিল। রাতে ছোটমামু তো সেই বই নিয়ে মহা হৈচৈ শুরু করে দিল। ক্রমে ক্রমে শোনা গেল তার কোন বন্ধু তাকে বিয়েতে “রেড বুক” উপহার দিয়েছে, সেগুলোকে সাবধানে যত্ন করে রাখতে হবে। তখন এই রেড বুক নিয়ে সবাই খুব মাতামাতি করতো, বিশেষ করে যারা নিজেদের নকশালপন্থী বলে প্রচার করে গর্ববোধ করতো। কিন্তু রেড বুক জিনসটা কী, খায় না মাথায় দেয়, খুব কম লোকই জানতো। রেড বুকের থেকে হলুদ বই এর কদর ও পাঠক অনেক, অনেক গুণ ছিল। দিদুর হাবভাবে মনে হ’ল, ছেলের রাজনৈতিক উথ্বান দেখে তিনিও খুব গর্বিত। রেড বুকের মাহাত্মে, ফুল শয্যা কন্টক শয্যায় পরিণত হ’ল। পরদিন সকালেও এই রেড বুক নিয়ে সারা বাড়ি তুলকালাম হবার পর দেখা গেল, সেগুলো কতগুলো চীনা ম্যাগাজিন। আমাদের এখানে যেমন সিনেমা, স্বাস্থ্য, রান্নাবান্না, বা মেয়েদের সাজগোজ নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকা রাস্তাঘাটে, স্টল বা ফুটপাথে দেখা যায়। সম্ভবত কোন ফুটপাথ বা স্টল থেকে সংগ্রহ করে তাকে তার কোন বন্ধু উপহার দিয়ে গেছে। তবে বইগুলোতে কী লেখা আছে, জানতে গেলে ছোটমামুকে হয় কোন চীনাম্যানের কাছে যেতে হবে, তা নাহলে সটান চীন এ যেতে হবে, কারণ আদ্যপ্রান্ত চীনা ভাষায় লেখা।

যাহোক্, যেকথা বলতে গিয়ে এত কথা এসে গেল, ছোটমামু আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর, বাইরে আড্ডা মারতে যাবার আগে ছোটমামুকে নিয়ে একটু মজা করার ইচ্ছা হ’ল। বাবাকে কে একজন একটা চামড়ার খাপে ভরা ইঞ্চি সাত-আট লম্বা, একটা মজবুত ছুরি দিয়েছিল। বাইরে যাবার আগে ছোটমামুকে দেখিয়ে ছুরিটা প্যান্টের ভিতর গুঁজে বললাম, “তুমি গল্প কর, আমি একটু ঘুরে আসছি”। ছোটমামু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “ওটা নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস”? বললাম, “কাছাকাছি যাব, চেম্বার নিয়ে যাবার দরকার নেই, এটাই যথেষ্ট”। ছোটমামু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। সে ভাবলো আমি খুব বড়সড় একজন নকশাল নেতা। আড়ালে গিয়ে ছুরিটাকে বার করে রেখে আমি আড্ডা মারতে চলে গেলাম।

দুপুরে ফিরে এসে শুনি আর এক কান্ড। ছোটমামু কার একটা নাম বলে মা’কে জিজ্ঞাসা করছে সে কোথায় থাকে, তার সাথে একবার দেখা করতে যাবে। মা তো মহা বিপদে পড়েছেন। এর আগে একবার বরাহনগর এলাকায় কী সব উল্টোপাল্টা বকে সে বেধরক মার খেয়েছিল। মেজমামা, যাকে আমরা মামামণি বলি, অনেক কষ্টে, অনেক চেষ্টায়, তাকে চরম বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। শেষে মা অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে শান্ত করে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত করলেন।

ছোটমামু বাবাকে খুব ভয় পেত। সে আর আমার দিদি বোধহয় বছর খানেকের ছোট বড়। ফলে ছোটবেলায় বোধহয় কখনও সখনও সে মা’র বুকের দুধ খেয়েছে, এবং সেটা বোধহয় দিদু বা মা’র কাছ থেকে শুনেছে। ফলে একটু উত্তেজিত হলেই আমাদের বলতো, তোদের মা আমার মা’র মতো। তার দুধ খেয়ে আমি বড় হয়েছি। যার রক্ত পান করেছি, তার ছেলেদের কিছু বলতে পারি না। বুকের দুধ কী ভাবে রক্তের আকার নিল, সেটা সেই বলতে পারবে। কিন্তু একথা সত্যি যে তার রক্ত পানের দৌলতে, আমরা তার হাত থেকে প্রাণে বেঁচেছি। যাহোক্, বাবা ছোটমামুকে এটা সেটা বলতে বলতে হঠাৎ বললেন, “আমি একবার টেগার্টকে হাতের মুঠোয় পেয়েও মারতে পারি নি, সে কোনরকমে পালিয়ে বেঁচেছিল”। টেগার্ট যে কে, ছোটমামুর জানার কথা নয়, কিন্তু সে আরও অবাক, কারণ একই বাড়িতে এতগুলো জলজ্যান্ত বিপ্লবীর কথা সে ভাবতেও পারে না। আমি হঠাৎ কথার মাঝে বলে বসলাম, “তুমি টেগার্টকে গাঁড়াসা দিয়ে যেবার মারতে গিয়েছিলে, সেই ঘটনাটার কথা বলছো”? আমার কথা শুনে বাবা এমন হেসে ফেললেন, যে ব্যাপারটা লঘু হয়ে গেল। বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “তুই আর কোন অস্ত্র খুঁজে পেলি না, একবারে গাঁড়াসা”? এখানে বলে রাখা ভালো যে, আমাদের একটা অস্ত্র ছিল, বাবা-ই তৈরি করিয়েছিলেন, কাঠের হ্যান্ডেলে লোহার ধারলো একটা মোটা প্লেট বা ব্লেড লাগানো। সেটাকে কেন গাঁড়াসা বলা হ’ত জানি না, তবে সেটা দিয়ে গরুর খড় কাটা হ’ত।

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে ছোটমামুকে বললাম, আমরা যতই নকশালী করি না কেন, এই মতবাদ দেশকে সর্বনাশের পথে নিয়ে যাচ্ছে। মাও সে তুং চীনের সর্বনাশ করে ছেড়েছে। মাও সে তুং খারাপ করেছে, একথা ছোটমামু কিছুতেই মানতে রাজি নয়। আমি বললাম, জেন ইয়াচিং এর “লাষ্ট ডেজ অফ্ চায়না” পড়ে দেখ। অরিজিনাল বইটা না পেলে অনুবাদটা অন্তত পড়ে দেখ। তাতে পরিস্কার বলা আছে, মাও সে তুং কী ভাবে দেশের ক্ষতি করেছে। তুমি রুবেল ভদোভস্কির “রাশিয়া মাই রাশিয়া” পড়েছো? না পড়ে থাকলে পড়ে দেখ। অরিজিনাল না পাও অনুবাদ পড়ে দেখ, তাতে লেনিন সম্বন্ধে কী বলেছে। রাশিয়ার ভবিষ্যৎ লেনিন কী ভাবে নিজ হাতে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে জানতে পারবে। এমন ভাবে কথাগুলো বললাম, যেন আমি সত্যিই ঐ সব লেখকের ঐ সব বইয়ের অরিজিনাল কপি পড়েছি। লেখকও কাল্পনিক, বই এর নামগুলোও কাল্পনিক। বাস্তব, ছোটমামু আমার পান্ডিত্য দেখে অবাক। দেশ-বিদেশের এত অরিজিনাল বই পড়া ভগৎ সিং বা চন্দ্রশেখর আজাদের মতো একটা ভাগ্নে পেয়ে সে গর্বিত। ছোটমামু অত্যন্ত বিনয়ী, তাই একবারও সেই আপ্ত বাক্য স্মরণ করলো না— “নরনাং মাতুলক্রম”।

সুবীর কুমার রায়

২৪-০৪-২০১৭

বাল্য শিক্ষক (স্মৃতির পাতা থেকে) { লেখাটি অক্ষর-Akshar , গল্পগুচ্ছ , বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম , উইপোকার কলম, সাহিত্য সরণি, ও প্রতিলিপি বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত}

নতুন স্কুলে সুখে-দুঃখে বেশ দিন কাটছিল। কিন্তু এই সুখ বেশি দিন বিধাতার সহ্য হ’ল না। বাবা ঐ রেলওয়ে স্টেশন থেকে কলকাতায় বদলি হয়ে গেলেন। মন খুব খারাপ হয়ে গেল। বছরের মাঝখানে বদলি, আমাদের স্কুল নিয়ে কী হবে, তাই নিয়ে বাবা-মা চিন্তায় পড়লেন। হাওড়া স্টেশনের ঠিক আগের স্টেশনে বাড়ি ভাড়া নেওয়া হলো। তখন ই.এম.ইউ. কোচ চালু হয়নি। এখনকার মতো অত ট্রেন চলাচলও করতো না। মা তবু জেদ ধরলেন, ছেলের একটা বছর কিছুতেই নষ্ট করা ঠিক হবে না। তার জন্য এই বয়সে আমাকে অতগুলো স্টেশন কাঠের গাড়িতে যাতায়াত করতে দিতেও, তাঁর আপত্তি ছিল না। তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি।

কয়েকদিন পর থেকেই, শুরু হলো আমার নতুন স্কুল যাওয়া। বাড়ি থেকে সকালে বেড়িয়ে প্রায় আধ কিলোমিটার পথ হেঁটে স্টেশনে এসে, সেখান থেকে সাড়ে আটটা-ন’টা নাগাদ ট্রেন ধরে সাতটা স্টেশন দুরে যাওয়া। এর পরের ট্রেনে গেলে, স্কুলে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে যেত। নির্দিষ্ট স্টেশনে নেমে, মাইল দু’-এক পথ হেঁটে স্কুলে যাওয়া। আবার স্কুল ছুটির পর, একইভাবে ঘরে ফেরা। মা স্কুল ব্যাগে টিফিন দিয়ে দিতেন, তবে অধিকাংশ দিনই সে টিফিন, স্কুল পর্যন্ত পৌঁছত না। তার অনেক আগেই সেগুলো আমার উদরস্থ হতো। স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে, সন্ধ্যা পার হয়ে যেত। প্রায় রোজই দেখতাম মা বা অন্য কেউ বাড়ির কাছাকাছি লেভেল-ক্রসিং এর কাছে, আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন।

স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ার একমাত্র কারণ ট্রেনের অভাব। স্কুল ছুটির পর স্টেশনে এসে যে ট্রেনটা পাওয়া যেত, সেটা বাড়ির কাছের স্টেশনে দাঁড়াতো না। তার পরের ট্রেন ছিল অনেক পরে। ফলে বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হতো। স্কুল ছুটির মিনিট দশ-পনের আগে স্কুল থেকে বেরতে পারলে, আগের ট্রেনটা স্বচ্ছন্দে পাওয়া যেত। কিন্তু সেই ট্রেনটা কোনদিন আমার কপালে জোটেনি। হয়তো বারমাস বাতাসা আর জল একপাত্রে অন্যান্য দেবদেবীর সাথে ভাগ করে খেয়ে খেয়ে, সরস্বতীর কোপ আমার ওপর পড়েছিল। ঝিকে মেরে বৌকে শেখানোর মতো, ছেলেকে কষ্ট দিয়ে বাবা-মা’কে শেখানো।

স্কুলে প্রতিদিন শেষ পীরিয়ডটা ছিল ভূগোলের ক্লাশ। ধুতি, সাদা সার্ট, কেডস্ জুতো পরে সাধুবাবু ভূগোল পড়াতে আসতেন। পড়াতে না বলে, পড়া ধরতে বললেও খুব অন্যায় হবে না। তাঁর বাড়ি ছিল স্কুলে আসার পথে, স্কুলের কাছেই রাস্তার ঠিক পাশে। ছোট্ট বাড়ি, অনেক গাছপালা দিয়ে ঘেরা। তাঁর জমি ও রাস্তার মাঝে, নয়নজুলির মতো খাল জাতীয়। জল না থাকলেও গাছপালার পাতা আর আগাছায় ভরা। একটা পাতলা, ইঞ্চি আষ্টেক লম্বা, ইঞ্চি ছয়েক চওড়া, ভূগোল বই আমাদের শ্রেণীতে পড়ানো হতো। বেশ মনে আছে আমার ভূগোল বইটা “বেতার জগৎ” নামে একটা পত্রিকার কভার পেজ দিয়ে মলাট দেওয়া ছিল। চারপাশে হলুদ রঙের মধ্যে একটা সবুজ টিয়াপাখির ছবি। প্রতিদিন শেষ পিরিওডে সাধুবাবু ক্লাশে এসেই নিয়ম করে পড়া ধরতেন। ভূগোলের প্রতি একটা ভীতি আমার চিরকালই ছিল, আজও আছে। ফলে পড়া বলতে পারতাম না। পড়া না পারলেই তিনি কান ধরে দাঁড় করিয়ে দিতেন। কয়েকদিন এইভাবে কাটার পর, এই শাস্তি যথেষ্ট নয় বুঝে, কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করাতে শুরু করলেন। তিনি অবশ্য কথা দিয়েছিলেন যে, যেদিন আমি পড়া বলতে পারবো, সেদিনই আমাকে স্কুল ছুটির আগে ছেড়ে দেবেন। তিনি আমার ভালো চেয়েছিলেন, মঙ্গল চেয়েছিলেন ঠিক কথা, তবে শুধু পড়া ধরে আটকে রেখে আমার মঙ্গল না করে, পড়ালে এবং ভালো করে বোঝাবার জন্য একটু সময় ব্যয় করলে, অনেক ছেলের মঙ্গল হতে পারতো। সাধুবাবুর ক্লাশের পড়া কিন্তু তৈরি করবার আন্তরিক চেষ্টা করতাম। এরপর থেকে যেটুকু সময় পড়বার জন্য পেতাম, ভূগোল নিয়েই কাটাতাম। ফলে উপকার হলো এই, যে অন্যান্য বিষয়ের হাল ভূগোলের মতোই হলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় ভূগোল পড়াটা কোনদিনই দিতে পারলাম না। কিন্তু সাধুবাবু তাঁর একমাত্র কাজ, আমাদের ক্লাশে এসেই আমাকে পড়া ধরা, আর পড়া বলতে না পারলেই কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া অব্যাহত রাখলেন। শেষের দিকে সাধুবাবু ক্লাশে ঢুকলে, পড়া ধরার আগেই আমি নিজে থেকেই কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে, তাঁর কাজটা অনেক কমিয়ে দিয়েছিলাম। অথচ ভূগোল পড়া তৈরি করার জন্য, আমার কিন্তু চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিল না।

গাব, পেয়ারা, ফলসা ইত্যাদি গাছ থেকে ফল পাড়ার সুযোগটাও আমার একদম কমে গেছিল। বিশেষ করে রবিবাবুর সাথে রিক্সা করে স্কুলে যাওয়া ছিল, এই সব কাজের প্রধান অন্তরায়। একদিন, তখন সবে নতুন বাসস্থান থেকে যাতায়াত শুরু করেছি, গরম কাল, রবিবাবুর সাথে রিক্সাভ্রমন তখনও শুরু হয় নি। স্টেশন থেকে হেঁটে স্কুল যাওয়ার পথে, সাধুবাবুর বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, সাধুবাবুর বাড়ির একটা আম গাছ থেকে একটা লম্বা, বেশ বড়, সামান্য লাল রঙের আম, গাছ তলায় একটু দুরে পড়ে আছে। শুকনো পাতার মধ্যে চট্ করে আমটা চোখে পড়ছে না। কিন্তু আমার শকুনের দৃষ্টি সেটাকে ঠিক খুঁজে বার করলো। সামনে পিছনে অনেক ছাত্রছাত্রী স্কুলে যাচ্ছে। এখন আমটা নিলে অনেককে ভাগ দিতে হবে। তার ওপর সাধুবাবুর কানে খবরটা যাবেই। কাজেই স্থির করলাম টিফিনের সময় এক ফাঁকে এসে আমটা নিয়ে যাব। ওটা এমন জায়গায় পড়ে আছে যে, ওটার ওপর কারো নজর পড়বে না। টিফিনের সময় অকুস্থলে এসে অনেক খুঁজেও আমটা সেই জায়গায় আর খুঁজে পেলাম ন। সম্ভবত শ্রীমতী সাধু আমটা তুলে নিয়ে গেছেন। একেই বোধহয় রাজযোটক বলে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের কেউ এতটুকু শান্তি আমাকে দেন নি।

স্কুলের আর এক বিভীষিকা ছিলেন রবিবাবু। তাঁর নাম রবি ঘোষ হলেও, বাস্তবে তিনি চিত্রাভিনেতা রবি ঘোষের মতো মজাদার, আমুদে মানুষ মোটেই ছিলেন না। বরং সব সময় অন্য মেরুতে বিচরণ করতেই তিনি বেশি পছন্দ করতেন। কলকাতার কোথায় যেন তিনি থাকতেন। তিনিও আমার সাথে একই ট্রেনে স্কুলে যেতেন। তিনি ছিলেন ইংরাজী শিক্ষক। সাধুবাবুর মতো তাঁরও ক্লাশে এসে পড়া ধরার একটা বদ রোগ ছিল। তবে পড়া না পারলে, তাঁর আবার শুধু কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করানোর মতো নিরামিষ পদ্ধতির ওপর গভীর অনাস্থা ছিল। তাঁর পছন্দের আমিষ ও কন্টিনেন্টাল মেনুতে ছিল, রাক্ষুসে চিমটি, কানের লতি নিয়ে খেলা করা, জুলফি ধরে ওপর দিকে টানা, ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ পদ।

নির্দিষ্ট স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমেই, তিনি আমাকে পাকড়াও করতেন। তারপর আমাকে সঙ্গে করে রিক্সা স্ট্যান্ডে এসে, রিক্সা করে স্কুলে নিয়ে যেতেন। বাধ্য হয়ে আমি এক এক দিন, এক এক কামরায় উঠতে শুরু করলাম। কিন্তু তিনি বোধহয় আগের স্টেশন থেকেই আমার খোঁজে ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন। স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে সটকে পড়ার আগেই, তিনি চিৎকার করে অদ্ভুত সুরে ডাকতেন—“সু-উ-উ-বী-ঈ-ঈ-র”। তারপর রিক্সা স্ট্যান্ডে গিয়ে আবার প্রায় সেই একই সুরে—“রিক্সো-ও-ও-ও”। রিক্সাকে সাহেবরা কী বলে জানিনা, তবে তিনি রিক্সো বলতেন। আর তারপর? তারপর ঐ প্রায় দুই কিলোমিটার পথ তিনি আমায় পাশে বসিয়ে, ইংরাজী গ্রামার ধরতেন। তার সাথে স্যালাড হিসাবে—নখ কাটিস নি কেন? চুল আঁচড়াস নি কেন? ভালো করে দাঁত মাজিস নি কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। অধিকাংশ দিনই পড়া বলতে পারতাম না। পারবো কী করে? যার জীবনে সরস্বতী বিরূপ ও সাধুবাবুর মতো একজন শিক্ষক কপালে জুটেছে, সে আর যাই পারুক, পড়া বলতে পারবে না। কিন্তু এত কিছুর পরেও আমার একটা মহা সুবিধা ছিল এই, যে রবিবাবু রিক্সোয় বসে চিমটি কাটতে, জুলফি ধরে টানতে পারতেন না, বা অপছন্দ করতেন। কিন্তু স্কুলের ক্লাশে আর নতুন করে পড়া ধরতেন না। ফলে আর সকলে যখন স্কুলের ক্লাশে রবিবাবুর আমিষ খাবার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, আমি তখন প্রতিদিন অনাহারে থেকে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতাম।

সেইসব কড়া শাসন, হয়তো বা কিছু অন্যায় শাসন সত্ত্বেও, আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তাঁদের ভুলতে পারলাম কই? ভুলতে পারিনি কারণ সেদিন না বুঝলেও, সেদিন চরম রাগ ও কষ্ট হলেও, আজ পরিণত বয়সে এসে বুঝি, সেদিনের সেই শাসন ন্যায় বা অন্যায় যাই হোক না কেন, তার পিছনে একটা মঙ্গল কামনা ছিল, একটা আন্তরিক ভালোবাসার টান অবশ্যই ছিল। আজ নিশ্চই তাঁরা আর ইহ জগতে নেই, কিন্তু তবু আজ তাঁদের অন্তরের শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাতেই এই স্মৃতি চরণা।

সুবীর কুমার রায়।

০৬-০৪-২০১৬

মনোকষ্ট { লেখাটি বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় বছরের মাঝামাঝি বাবা কলকাতার ই.পি.এম্. রেলওয়ে বুকিং অফিসে বদলি হয়ে যান। হাওড়ার ঠিক আগের রেলওয়ে স্টেশনে আমরা একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করি। তখনও ই.এম.ইউ. কোচ চালু হয় নি, কাঠের ট্রেনে আটটা স্টেশন অতিক্রম করে প্রায় দু’মাইল পথ হেঁটে আমায় স্কুল যাতায়াত করতে হতো। রাস্তায় হঠাৎ প্রয়োজন হতে পারে ভেবে, আমার ব্যাগে মাঝে মধ্যে সামান্য কিছু পয়সা দেওয়া হতো। যদিও অতি অল্পই পয়সা, তবু সে সময় আমাদের হাতে বাবা-মা’কে পয়সা দেবার কথা ভাবাই যেত না।

মনে পড়ে, যখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তাম, তার কয়েক বছর আগে পুরানো পয়সা উঠে গিয়ে, নয়া পয়সা চালু হয়েছিল। টাকা-আনা বন্ধ হয়ে, টাকা-নয়া পয়সা চালু হয়েছিল। মা’র ঠাকুর দেবতার তাকে, একটা সিঁদুর মাখা কৌটোয়, অনেক পয়সা ছিল। কেন, কী কারণে, বলতে পারবো না, চেঙ্গাইল রেলওয়ে স্টেশনে ঐ পুরাতন পয়সা বদল করে, সম মূল্যের নয়া পয়সা দেওয়া হতো। হয়তো তখন এখনকার মতো, সর্বত্র ব্যাঙ্কের শাখা না থাকায়, রেলের ওপর এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। সে যাহোক্, এই তথ্য যেদিন  জানতে পারলাম, সেদিন থেকে মাঝে মধ্যেই কৌটো থেকে পুরাতন পয়সা বার করে, স্টেশনে গিয়ে পুরাতন পয়সা দিয়ে, নয়া পয়সা নিয়ে আসতাম। লক্ষীর সেই অমূল্য সম্পদ, লক্ষীর জন্য ব্যয় না করে, মনের সুখে লাল তুলো, আম লজেন্স, ল্যাক্টো-বনবন্ লজেন্স, হজমীগুলি, ইত্যাদি খাওয়ার একটা সুবন্দোবস্ত করে ফেলেছিলাম। নিজের সম্পদ অন্যকে অন্যায় ভাবে ব্যয় করতে দেখলে, কার না রাগ হয়? লক্ষীদেবীও তাই আমার প্রতি বিরূপই  হয়েছিলেন। তাঁকে দোষ দেওয়াও যায় না। কিন্তু তিনি নিজে টাকা পয়সার দেবী হয়েও, এ কাজটা নিজে করতে পারেন নি বলেই তো আমাকেই দায়িত্বটা নিতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর কোপে এ সুখ বেশি দিন স্থায়ী হলো না। স্টেশনে বাবার কোন সহকর্মী, বাবাকে ঘটনাটা জানান। ফলে বাবার হাতে উত্তম মধ্যম প্রহার জুটেছিল। অথচ অবশিষ্ট অচল পয়সাগুলো পাল্টে, নতুন নয়া পয়সা আনার ব্যাপারে বাবার বা লক্ষীদেবীর, কারো কোন আগ্রহ দেখি নি।

সে যাহোক্, যা বলছিলাম, এতটা পথ যাতায়াতে যদি কোন বিপদ আপদ হয় ভেবে, এই অল্প পয়সা দিয়ে একটা এমারজেন্সি ফান্ড তৈরি করা হতো। যদিও ঐ ফান্ড ভেঙ্গে কোন খাদ্যবস্তু কেনা ছাড়া, আর কী কাজে সেটা লাগতে পারে, ভেবে পেতাম না। মনে পড়ে আমার খুব ইচ্ছা ছিল, ঐ জমানো পয়সা দিয়ে বাড়ির সকলের জন্য একটা করে টিফিন কেক কিনে আনার। তখন লর্ডস কোম্পানীর টিফিন কেক ভারী সুন্দর খেতে ছিল। কিন্তু সে মনবাঞ্ছা কিছুতেই পুরণ করতে পারি নি। পরবর্তী কালে ঐ সামান্য লর্ডসের কেক-এর থেকে অনেক দামি, অনেক সুখাদ্য বাড়ির সকলের জন্য কিনে আনলেও, সেদিনের সেই মনোকষ্ট আজও ভুলতে পারলাম কই?

সুবীর কুমার রায়

০৪-০৪-২০১৭

 

অপাঙক্তেয় খেলা (স্মৃতির পাতা থেকে) { লেখাটি বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত। }

ছোটবেলায় সাতগুটি, হুস্ হুস্, শিরগীজ, ইত্যাদি নানা খেলা নিয়ে বিকেলবেলাটা মেতে থাকতাম। গুলি খেলারও খুব নেশা ছিল, কিন্তু গুলি কেনার সামর্থ ছিল না। তাছাড়া বাবা গুলি খেলা পছন্দও করতেন না। মা’কে পটিয়ে পাটিয়ে নানাভাবে গুলি কিনতাম। আজ আমি মানুষ হয়েছি কী না জানি না, তবে আমি জোর গলায় একথা বলতে পারি, মা না থাকলে আমি বড়ই হতাম, মানুষ হতে পারতাম না। আমি আমার সুন্দর, নানা অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ ছেলেবেলাটা হারাতাম। আমার সব ভাইবোন আজ স্বীকার করবে কী না জানি না, তবে এটা সত্য যে, আমরা যে আজ বড় হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি, তার পিছনে মা’র প্রত্যক্ষ মদত, সহযোগীতা ও আত্মত্যাগ, মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। আমরাই বোধহয় সেই স্নেহ ও আত্মত্যাগটুকু নিংড়ে নিয়ে বড় হয়ে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান, আশা আকাঙ্খা থেকে বঞ্চিত করেছি, অবহেলা করেছি, মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের মতো করে নতুন ধারায় বয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।

ভাবলে খুব কষ্ট হয় যে, আজকালকার একটা ছেলেও সাতগুটি, পিট্টু, শিরগীজ, রুমাল চোর খেলার নামই শোনে নি। আজ একটা মেয়েকেও আর এক্কা-দোক্কা খেলতে দেখি না। অথচ এই খেলাটা, আমরাও ছোটবেলায় বোন ও তার বান্ধবীদের সাথে খেলতাম। মাঠের অভাবে নাহয় ছেলেদের খেলা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু মেয়েদের এই এক্কা-দোক্কা খেলতে বাধা কোথায়? এই খেলাটাতো একসময় মেয়েদের জাতীয় খেলা ছিল বলা যায়। খেলতে মাঠ বা স্টেডিয়ামও লাগে না, ঘরের মধ্যে, দালান, ছাদ, বা উঠনেও ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বর্গফুট ফাঁকা জায়গা পেলেই খেলা যায়। এখন ক’টা ছেলে সাইকেলের রিম নিয়ে চাকা চালায়? চোখে তো পড়ে না। অথচ হাজার বাধা বিপত্তির মধ্যেও, এটা ছিল আমাদের একটা অতি প্রিয়, আনন্দের, ও আকর্ষণীয় খেলা। তবে কী আজকালকার ছেলেমেয়েরা সব সভ্য, আমরাই অসভ্য ছিলাম? কী জানি, রাস্তাঘাটে পোষাক, কথাবার্তা, আলাপ আলোচনা দেখলে ও শুনলে তো তা মনে হয় না।

আসলে আমরা, সাহেব বাবা-মা’রা আমাদের একটা বা দু’টো সন্তানকেও সাহেব ব মেমসাহেব বানাতে ব্যস্ত। নীগারদের ঐ সব নোংরা খেলা আমাদের সহ্য হবে কেন? তাই আমরা খেলার জন্য ভিডিও গেম বা মুঠো ফোন কিনে দিতে, নন্টে ফন্টে, হাঁদা ভোঁদা, বা বাঁটুল দি গ্রেট এর পরিবর্তে হ্যারি পটার, স্পাইডার ম্যান ইত্যাদি কিনে দিতে বেশি পছন্দ করি। যেখানে বাড়ির আশেপাশে খেলার মাঠই নেই, সেখানে তেপান্তরের মাঠের মতো অবাস্তব মাঠের প্রয়োজনীয়তা দেখি না। ঠাকুরমার সাথেই সম্পর্ক নেই, তো তার আবার ঝুলি!

সুবীর কুমার রায়।
০৪-০৫-২০১৬

Like

 

Like

 

Love

 

Haha

 

Wow

 

Sad

 

Angry

Comment

এক টুকরো কৈশোর {লেখাটি বাংলায় লিখুন ও বই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত}

একদিন বার্ষিক পরীক্ষা শেষে আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠলাম। নতুন নতুন বই হ’ল। নতুন বই কিনে দেবার ক্ষমতা বাবার ছিল না। আমরা অনেক ভাইবোন, সকলের পড়াশোনার খরচ চালাতে, বাবা হিমশিম খেতেন। তাছাড়া তখন একটা রেওয়াজ ছিল, সেকেন্ড হ্যান্ড বই কেনা। বেশির ভাগ ছেলেমেয়েই নতুন শ্রেণীতে উঠে, ওপরের শ্রেণীর কোন ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে তার বইগুলো অর্ধেক দামে কিনে নিত। আর তারা নিজেরাও পুরাতন বই অর্ধেক দামে বেচে দিয়ে, তাদের নিজেদের নতুন শ্রেণীর বই একই প্রথায়, ওপরের শ্রেণীর কোন ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে, অর্ধেক দামেই কিনে নিত। এইভাবে প্রতিটি বই-ই বেশ কয়েকবার হাত ফেরি হ’ত। কিন্তু সেকেন্ড হ্যান্ড বই কখনও থার্ড, ফোর্থ, বা ফিফথ্ হ্যান্ড হিসাবে গণ্য হ’ত না, এবং বইয়ের দাম সব সময়েই বই এর আসল দামের অর্ধেকই থাকতো। এখনকার মতো তখন বই নিয়ে প্রকাশক, স্কুল, বা প্রশাসনের মধ্যে পার্টনারশীপ ব্যবসা চালু না থাকায়, বছর বছর বই পরিবর্তন করার রেওয়াজ একেবারেই ছিল না।

মনে পড়ে বইগুলোর পাতায় কত কী যে লেখা থাকতো। বই এর পাতায় কবিতার ছন্দে লেখা— “এই বই যেইজন করিবে হরণ, ভগবানের হাতে হবে নিশ্চিত মরণ”। খাসা কবিতা, তবে কবির পরিচয় আজও জানা হ’ল না। আবার কোন বই এর পাতায় লেখা— বই এর মালিককে চিনতে হলে ১২ পৃষ্ঠা খুলুন। ১২ পৃষ্ঠা খুলে দেখা গেল লেখা আছে— আমাকে চিনতে হলে ৫৫ পৃষ্ঠা খুলুন। ৫৫ পৃষ্ঠায় লেখা আছে— আমাকে চিনতে হলে ২১ পৃষ্ঠা খুলুন। এইভাবে বহুবার বিপুল আগ্রহে বই এর মালিকের নির্দেশ মতো সামনে পিছনে পাতা উল্টিয়ে দেখা গেল তার নাম লেখা আছে। বইটা এত পুরানো, যে খোঁজ নিলে দেখা যাবে সে হয়তো আমার বাবা বা কাকার ক্লাশমেট ছিল।

আমাদের বাড়িতে পূজাআর্চার চল, কোন কালেই ছিল না, আজও নেই। মা’কে দেখেছি এক জায়গায় কতগুলো ঠাকুর-দেবতার বাঁধানো ছবি রাখতে। ঠাকুর দেবতাদের অবস্থাও আমাদের মতোই অসচ্ছল ছিল। সামান্য ফুল বাতাসা ছাড়া, তাঁদের তেমন কিছুই জোটেনি। লক্ষীপূজার দিন আমাদের বাড়ির একটা সিঁদুর মাখা, রঙচটা লক্ষীনারায়ণের বাঁধানো ফটো কাকার বাড়ি নিয়ে যাওয়া হ’ত। কাকার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই ভালো ছিল। ঠাকুরমা সেখানেই থাকতেন। কাকার বাড়িতে খুব ধুমধাম করে লক্ষীপূজা হ’ত। আমাদের হতশ্রী, হতদরিদ্র লক্ষীনারায়ণ, সেই পূজার জায়গায় বি ক্লাশ সিটিজেনের মর্যাদায়, একপাশে বসবার অধিকার পেতেন। বড়লোক মেয়ে জামাই আর দরিদ্র ঘরজামাই ও মেয়ে, জামাই ষষ্ঠিতে একই শ্বশুর বাড়িতে, যে ধরণের বৈষম্যমুলক খাতির যত্ন পায়, এই দুই লক্ষীনারায়ণ যুগলও সেই ধরণের খাতির যত্ন পেতেন। ফলে তাঁদের কৃপাদৃষ্টি, তাঁদের আনুকুল্য, আমাদের ভাগ্যে তেমন জোটেনি। লক্ষী সারা জীবন মুখ ঘুরিয়েই থেকেছেন, নারায়ণ কী উপকারে লাগেন জানি না, তবে আমাদের জন্য তিনি কিছুই করেন নি। তাঁকে দোষ দেওয়াও যায় না। তাঁর প্রতি আমার ব্যবহার, তাঁকে হয়তো আমাদের সুনজরে দেখা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেছিল। সেকথা সময়, সুযোগ থাকলে পরে বলা যাবে। সরস্বতী বোধহয় কিছুদিন আশায় আশায় থেকেছিলেন। তাই বাবা ও বড়দিদিকে তাঁর ভান্ডার থেকে যথেষ্ট ত্রাণ সামগ্রী উজাড় করে দিতে, কার্পণ্য করেন নি। তবে সেটা যে সরস্বতীরই দান, সে কথা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারবো ন। কারণ এই দু’জনেই ছিলেন ইংরাজী ভাষায় পারদর্শী।

সুবীর কুমার রায়

০৩-০৪-২০১৭