রঘুদা (স্মৃতির পাতা থেকে) { লেখাটি ছোটোবেলাতেই ভালো ছিলাম, বই পোকার কথা, বাংলায় লিখুন, ও উই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

নবম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীতে ওঠার সময় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলাম। আমার জীবনে এই প্রথম স্ট্যান্ড করে উত্তীর্ণ হওয়া। স্বপন রায় প্রথম স্থান অধিকার করে। ইকনমিক্স ও ভূগোল নিয়ে একটু ঝামেলা থাকলেও, অন্যান্য সব বিষয় আমার বেশ পছন্দের ছিল, তৈরিও ভালোই হয়েছিল। রঞ্জিত বাবু আমার সম্বন্ধে খুব ভালো ধারণা পোষণ করতেন, এবং ভবিষ্যতে আমার রেজাল্ট খুব ভালো হবে বলে আশাও করতেন। তাঁর এই আশা যে আমার পক্ষে কত বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সে কথা অন্য সময় বলা যাবে।

এই রকম একটা সময়ে সাধারণ নির্বাচন এসে পড়লো। এখনকার মতো স্কুলে তখন রাজনীতি হতো না। আমি আমার স্কুল জীবনে আমার স্কুলে কোন ছাত্র ইউনিয়ন বা ভোট দেখিনি। এ বিষয়ে বর্তমানের দাদা-দিদিরা কী বলবেন জানি না, তবে তাতে স্কুলের বা ছাত্রদের কোন ক্ষতি হয়েছিল বলে তো আজও মনে হয় না। আমরাও কংগ্রেস, সি.পি.আই., ফরওয়ার্ড ব্লক, ইত্যাদি কয়েকটা রাজনৈতিক দলের নাম ছাড়া, আর কোন খোঁজ রাখতাম না। সেই সময় এখানে পুরাতন পোস্ট অফিসের দোতলায়, কংগ্রেস তাদের একটা পার্টি অফিস করেছিল। রঘুদা নামে একজন দাড়িওয়ালা, রোগা, লম্বা লোক, লোকাল কংগ্রেস পার্টির বোধহয় নেতা ছিল। তার হাতে উল্কি করে দু’টো ছোট ছোট নীলচে ছোরা আঁকা ছিল। নিজের হাতে হঠাৎ খরচা করে, কষ্ট করে, কেন ছোরার ছবি উল্কি করে আঁকিয়েছিল জানি না। হয়তো সেই সময় সে উঠতি মস্তান ছিল। বেশ কয়েক বছর আগে রঘুদাকে দেখলাম, বুড়ো হয়ে গেছে, মরা হাড়গিলের মতো চেহারা হয়েছে। এখন আর রাজনীতি করে কী না জানি না, তবে দীর্ঘদিন তাকে কংগ্রেসের কোন মিটিং-মিছিলে দেখিনি। সে যাহোক্, এই রঘুদা একদিন হঠাৎ মুখার্জী পাড়ায় এসে আমাদের প্রস্তাব দিল, যে আমরা যদি তাদের প্রার্থী, শ্রী সুকমল মজুমদারের হয়ে ভোটের কাজে খাটা-খাটনি করি, তাহলে আমাদের সরস্বতী প্রতিমার দাম সে দিয়ে দেবে। সামনেই সরস্বতী পূজা, সব ছেলেরা সরস্বতী পূজা করবে বলে মেতে উঠেছে।

আমাদের ঠিক কী কী করতে হবে জিজ্ঞাসা করা হলে রঘুদা জানালো, যে রং ও তুলি সেই দিয়ে যাবে, আমাদের শুধু তাদের প্রার্থীর নামে দেওয়াল লিখন করতে হবে। আজও সাদা কাগজে ধরে ধরে কিছু লিখলেও, আমার হাতের লেখা অন্য কেউ পড়তে পারে না এবং লেখায় প্রায়শই সমভূমি ছেড়ে হিমালয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যায়, কাজেই সেই সময় দেওয়ালে বড় তুলি দিয়ে আমার লেখা কতজন পড়তে পারবে, যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কিন্তু ঐ যে, সরস্বতী প্রতিমার দাম, সেটাও তো ছেড়ে দেওয়া যায় না। ফলে কংগ্রেসের অফিস থেকে রং, তুলি, দরমা, পোস্টার সংগ্রহ করে আনা হলো। প্রতিদিনই প্রায় আমরা সেখানে যেতাম এবং কেক্, চা, ঘুঘনি ইত্যাদি খেয়ে আসতাম। চারিদিকে পোস্টার মারা ও দেওয়াল লিখন শুরু হলো। এমনকী স্নান করার সময় পুকুরে নেমে, অতি উৎসাহে এক কোমর জলে দাঁড়িয়ে পুকুরের পাশের বাড়ি ও পাঁচিলে পর্যন্ত লিখতে বাদ রাখলাম না। রঘুদাও বোধহয় তার রাজনৈতিক জীবনে এরকম কর্মনিষ্ঠ কর্মীদের আগে খুঁজে পায় নি। ফলে খাতির যত্ন আরও বেড়ে গেল। একটু ঘোরাঘুরি করতে হলেও, সরস্বতী প্রতিমার দামও পাওয়া গেল। গোপাল ধাড়ার কর্মী লক্ষণদা, বাঁশ আর খড় দিয়ে পাড়ার রাস্তার মাঝে মন্ডপও তৈরি করে দিল। পূজার আগের দিন রাতে তরুণ ঘোষ নামে একজনের বাড়ির বাগান থেকে ফুলকপি চুরি করতে যাওয়া হলো। সুন্দর দামি বাড়ির সামনে কিছুটা জমিতে, ফুল গাছ ও বেশ কিছু কপি গাছ। গেটের কাছে আবার “কুকুর হইতে সাবধান” বোর্ড লাগানো। রাতে বস্তা ও কাটারি নিয়ে বাগানে ঢুকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কিছু কপি কেটে আনা হলো। পঁচিশটা কপি কেটে আনা হলে, দেখা গেল তার পনেরোটাই ওলকপি। বাকি কিছু বাঁধাকপি, ফুলকপির সংখ্যা নিতান্তই কম। কেউ যে সাধ করে বাড়িতে ওলকপি চাষ করে জানা ছিল না।

বেশ চলছিল, হঠাৎ কী মতিভ্রম হলো, যেখানে যত সুকমল মজুমদারের নামে দেওয়াল লিখেছিলাম, সব মুছে দিয়ে যতদুর মনে পড়ে ফরওয়ার্ড ব্লকের সুদেব তালুকদারের নাম লিখে দেওয়া হলো। আমাদের আঁকা সিংহের ছবি দেখলে, সেটা যে কোন জন্তুর ছবি বোঝা কষ্টকর ছিল। জনে জনে ভোটারের বাড়ি গিয়ে, ওটা কিন্তু সিংহ, বলে আসার প্রয়োজন হতে পারতো। কিন্তু তার কোন প্রয়োজন হলো না। কারণ রঘুদা খবরটা পেয়ে, ডবল্ ছোরা আঁকা হাত নিয়ে, আমাদের খুঁজে বেড়াতে লাগলো। আর আমরাও তার ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম। আজ ভাবলেও বেশ অবাক লাগে, আমরা অত কষ্ট করে আঁকা ও লেখা মুছে, কেন নতুন করে লিখতে ও আঁকতে গেলাম। আমাদের কাছে তখন সুকমল মজুমদার জিতলেও যা, সুদেব তালুকদার জিতলেও তাই, এমনকী নির্দল নুরু মিঞা বা পাড়ার ভজা পাগলা জিতলেও একই ব্যাপার ছিল। যাহোক্, ভোটপর্ব মিটে যাবার পর, নতুন করে আর কোন ঝামেলা না হয়ে, সব আগের মতোই চলতে লাগলো।

***************************************************************************************************

সেদিনের দু’জন ভোটপ্রার্থীই অত্যন্ত পণ্ডিত ও সমাজহিতৈষী মানুষ ছিলেন, তাই সমস্ত চরিত্রের নাম পরিবর্তন করে দেওয়া হলো।

সুবীর কুমার রায়

২৩-০৪-২০১৮

 

Advertisements

খরগোশ পোষার হ্যাপা { লেখাটি ছোটোবেলাতেই ভালো ছিলাম পত্রিকায় প্রকাশিত }

 

লালু আর ভুলু নামে আমাদের অতি প্রিয় দুটো সাদা খরগোশ ছিল। লালু মহিলা, আমার খরগোশ, আর ভুলু পুরুষ, আমার ভাইয়ের খরগোশ। ধবধবে সাদা, চোখদুটো টকটকে লাল। পাঁউরুটি নিয়ে যাওয়ার ফাঁক ফাঁক হালকা কাঠের তৈরি বাক্সে তারা থাকতো। লালু-ভুলুর প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর, প্রথম নাতির মুখ দেখে ও দাদু হওয়ার সুযোগ পেয়ে আমরা খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম। কিন্তু পরে দেখা গেল, বাড়িতে খরগোশ পুষলে আর যারই অভাব হোক না কেন, নাতিপুতির অভাব হয় না। খরগোশের জন্মের হার, মশার থেকেও বেশি।

দু’দিন অন্তর অন্তর লালুর দু-তিনটে করে বাচ্চা হয়। বাচ্চাগুলো বোধহয় কোন রোগ নিয়ে জন্মাতো, কারণ একটু বড় হলেই নিজে নিজেই কাত হয়ে পড়ে গিয়ে মরে যেত। যোগমায়া সিনেমা হলের কাছে একজন পশু চিকিৎসক বসতেন। তাঁকে দেখিয়ে ওষুধ খাওয়ানোও হলো। কিন্তু তাতে ফল হলো উলটো। সুস্থ বাচ্চা ওষুধ খেয়ে মরে গেল। যাইহোক প্রতিবার একটা আধটা করে বাচ্চা বেঁচে থাকতো। ফলে ক্রমে আমাদের খরগোশের সংখা অনেক হয়ে গেল— লালু, ভুলু, দুলু, পলু, নীলু ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু সমস্যা হলো, এদের প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের ঝগড়া। কাছাকাছি হলেই মারামারি, চিৎকার করে ডাকা, ইত্যাদি লেগেই থাকতো। লালুর সঙ্গে ভুলুর ঝগড়া, ভুলুর সঙ্গে পলুর ঝগড়া, দুলু আবার লালুকে মোটেই সহ্য করতে পারে না। ফলে তাদের একসাথে রাখা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। ফলে ওদের আলাদা আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েই কাঠের তৈরি পাঁউরুটির বাক্সের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ানো ছাড়া, অন্য কোন উপায় রইলো না। সারা বারান্দা জুড়ে বড় বড় কাঠের বাক্স স্থান পেল। কিন্তু ততদিনে আমাদের দুই ভাইয়েরই খরগোশ প্রীতি প্রায় উবে গেছে। আমরা মাঝে মধ্যে বাঁধাকপির পাতা, কলমি শাক, ইত্যাদি এনে দেওয়া ছাড়া, তাদের জন্য বিশেষ কিছু করতাম না। ফলে মা’কে সব একা দেখাশোনা ও পরিস্কার করতে হতো। খরগোশের প্রস্রাবে ভীষণ বিশ্রী গন্ধ। মা রোজ রাগারাগি করতেন ও খরগোশগুলোকে বিদায় করতে বলতেন। কিন্তু ওই ভাবেই চলছিল, আর নাতি নাতনির সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

একদিন চ্যাটার্জীহাটে একটা পশুপাখির দোকানে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, একটা কালো কুচকুচে খরগোশ। চোখদুটো হলদে রঙের। হঠাৎ মনে হলো, নতুন ধরণের দেখতে, এটাকে নিয়ে গেলে হয়। তাছাড়া বাচ্চাগুলোও সাদা-কালো ছোপের বা অন্য ধরণের দেখতে হবে, ইচ্ছা করলে খরগোশের ব্যবসা করে দেশজুড়ে নাম করা যাবে, অনেক পয়সার মালিক হওয়া যাবে। গাড়ি, বাড়ি, একে একে সব কিছু, শুধু সময়ের অপেক্ষা। ব্যাস, যা ভাবা তাই কাজ। কিনে নিয়ে চলে এলাম।

খরগোশটা কুচকুচে কালো রঙের বলে নোংরা কিনা বোঝার উপায় না থাকায়, বাড়ি নিয়ে এসে ভালো করে সাবান দিয়ে স্নান করিয়ে ঝুড়ি চাপা দিয়ে রেখে দিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে গায়ের লোম শুকনো হলে বাক্সে রাখতে গিয়ে বুঝলাম খরগোশের মতো বর্ণ বিদ্বেষী প্রাণী, দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই। কোন বাক্সেই তার স্থান হলো না। শুধু তাই নয়, সাদা খরগোশগুলোকে ছেড়ে দিলে দেখা গেল সবাই নিজেদের মধ্যে শত্রুতা ভুলে গিয়ে, একজোট হয়ে কালো খরগোশটাকে আক্রমন করছে। তাদের দেখে বোঝার উপায় নেই, যে তাদের নিজেদেরও একে অপরের সঙ্গে আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক। সাদাগুলোর একটাও কালোটাকে মেনে নিতে পারলো না। শেষে বাধ্য হয়ে কালো খরগোশটাকে ওই দোকানেই ফেরৎ দিয়ে এলাম। যদিও ক্রয়মূল্য বিক্রয়মূল্যের থেকে অনেকটাই বেশি ছিল। নতুন ব্যবসায়ের লাভ-লোকসানের হিসাব বোধহয় আর দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

এরপরেও দীর্ঘদিন লালু-ভুলু সপরিবারে আমাদের বাড়িতে ছিল, সে গল্প এখন থাক।

সুবীর কুমার রায়

০১-০৫-২০১৮

 

গুরুচরণ সিং { লেখাটি ট্যুর অ্যান্ড ট্যুরিস্টস্ পত্রিকায় প্রকাশিত }

সালটা ১৯৮০, মাসটা সেপ্টেম্বর। এতো বছর পরে আর সঠিক মনে করতে পারছি না, সম্ভবত জ্বালামুখী থেকে বাসে পালামপুর যাবো। সঙ্গে বয়স্ক বাবা মা, দুই বন্ধু, ও আরও দু’জন বয়স্ক আছেন। বাসে বেশ ভিড়, দুরত্বও যথেষ্ট। কন্ডাক্টারের সহায়তায় একে একে সকলের বসার জায়গা হয়ে গেলেও, আমি তখনও দাঁড়িয়েই আছি। এমন সময় একবারে পিছনের সিটে বাসের বামদিকের জানালার ধারে বসা এক ভদ্রলোক হাতের ইশারায় আমায় ডেকে নিয়ে সবাইকে একটু সরে সরে বসতে অনুরোধ করে, জানালার ধারে তাঁর পাশে কোনরকমে আমার বসার জায়গা করে দিলেন। আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে, আমার বাবার বয়সি ভদ্রলোক আঠাশ বছরের আমাকে হাত তুলে নমস্কার করলেন। আমার যথেষ্ট অস্বস্তি হলেও চুপ করে থাকলাম, ও মনে মনে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করলাম।

কিছুক্ষণ বার বার আমায় লক্ষ্য করে, তিনি হঠাৎ হিন্দীতে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন আমি বাঙালি কী না। আমি তাঁকে আমি বাঙালি বলে জানাতে তিনি আবার আমাকে হাত তুলে নমস্কার করলেন, এবং সুভাষ চন্দ্র বসুর নাম শুনেছি কী না জিজ্ঞাসা করলেন। আমি ভালো হিন্দী বলতে না পারায় ভাঙা ভাঙা হিন্দীতে জানালাম, সুভাষ চন্দ্র বসুর নাম শোনেনি এমন একজন বাঙালিকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি আবার একবার হাত তুলে নমস্কার করে জিজ্ঞাসা করলেন আমি কলকাত্তার আলগিন রোড চিনি কী না। এবার দেখলাম তিনি ভাঙা ভাঙা বাংলাও সামান্য বলতে পারেন। আমি এলগিন রোড চিনি বলে জানাতেই তিনি বললেন ওখানে সুভাষ চন্দ্র বসুর বাড়ি, এবং তিনি সেখানে কয়েকবার গিয়েছেন ও দু’এক দিন থেকেওছেন।

  সাদা জামা ও প্যান্ট  পরিহিত ব্যক্তি।

এবার জানা গেল তিনি আই. এন্. এ. তে ছিলেন এবং বার্মায় বেশ কয়েক বছর জেলও খেটেছেন। সুভাষ চন্দ্র বসুর সম্বন্ধে কতো কথা যে বললেন ভাবা যায় না, ঠিক যেভাবে মেয়েরা লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়ে লক্ষ্মীর গুণকীর্তন করেন, উনিও সেভাবে একনাগাড়ে সুভাষ চন্দ্রের সাহসিকতা, সততা, দয়া মায়া, ব্যক্তিত্ব, ইত্যাদির বর্ণনা করে গেলেন। তবে সবচেয়ে যেটা আশ্চর্যের ও অবাক করার বিষয়, সেটা হলো সুভাষ চন্দ্র বসুর থেকেও তিনি সুভাষ চন্দ্র বসুর মা’র সম্বন্ধে অনেক বেশি কথা বললেন। তাঁর মতো দয়ালু মহিলা তিনি আর দেখেন নি একথাও অনেকবার জানিয়ে হাত তুলে নমস্কার করলেন। তাঁর মার দয়ার কথা জানাতে গিয়ে ছলছল চোখে কতবার যে তিনি বললেন যে আলগিন রোডে তাঁদের বাড়িতে যাওয়া ও থাকার সময় তাঁর মা তাঁকে সাবুন দিয়েছেন, মাথায় মাখায় মাখার তেল দিয়েছেন।

বাস যোগিন্দর নগরে এসে থামলে তিনি নেমে গেলেন, এখানেই তিনি থাকেন। আমিও তাঁর সাথে নামলাম, তাঁর ছবি তুললাম। বয়সের ভারে শরীর ভেঙে গেলেও, তাঁকে দেখলে বেশ বোঝা যায় অতীতে তিনি অসম্ভব রকমের স্বাস্থ্যবান ও সুপুরুষ ছিলেন। বিশাল চেহারার মানুষটি জানালেন তিনি এখন খুবই অর্থনৈতিক দুরাবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এতো বছর পরে সরকার থেকে কিছু পেনশনের ব্যবস্থা হলেও তাতে তাঁর সংসার চলে না। আরও অনেক কথা হলো। আমাদের বাস ছেড়ে দিল, মনে হলো তাঁকে একটা প্রণাম করি। সেই শেষ দেখা। পুরাতন ছবি ঘাঁটতে ঘাঁটতে তাঁর ছবি খুঁজে পেয়ে আজ তাঁর প্রতি আর একবার শ্রদ্ধা জানালাম।

সুবীর কুমার রায়

২১-০৪-২০১৮

কাক

অপরের ভ্যানরিক্সা চালিয়ে অতুল যা আয় করে, তাতে নিজের দু’বেলা পেট ভরে খাবার না জুটলেও, নিয়ম করে প্রতিদিন দুপুর বেলা যা জোটে তাই খাওয়ার পর, বস্তির টালির চালের ঘরের বাইরে সামান্য খোলা জায়গাটায় দু’-তিনটে কাককে দিয়ে দিয়ে ব্যাপারটা এমন একটা জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যে তার খাবার সময়, তার বা তার গৃহিনীর থেকে কাকগুলো অনেক ভালো বোঝে। প্রতিদিন ওই সময়টায় তিনটে কাক নির্দিষ্ট জায়গাটায় পায়ে ঘড়ি বেঁধে, ঘাড় কাত করে, অতুলের দরজার দিকে তাকিয়ে খাবারের অপেক্ষায় বসে থাকলেও, একবারের জন্যও তাদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার জন্য ডেকে বিরক্ত করে না। খাবার দেওয়ার পরে নিজেরা খেতে শুরু করার আগেই চিৎকার করে অনুপস্থিত ও খাবার আসরে নতুন অতিথিদের ডেকে আনে। এই করতে গিয়ে অনেক সময় নিজেদেরই খাওয়ার সুযোগ ঘটে না। অতুল ভাবতো কাকের মতো বোকা প্রাণী পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টা নেই। হয়তো এইসব কারণেই বস্তির সকলের কাছেই সে আধপাগলা অতুল হিসাবে পরিচিত, যদিও সে কোন প্রতিবাদ করে না।

***************************************************************************************************

একই বস্তির অপর একটি অস্বাস্থ্যকর ঘরে স্বামী পরিতক্তা নিঃস্ব মিনতি পাঁচ সাত বাড়ি বাসন মেজে, ঘর মুছে, পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে খুব কষ্ট করে সংসার চালায়। কিছুদিন ধরে ছেলে খাসির মাংস খাওয়ার বায়না ধরেছে। খাসির মাংস সে কখনও না খেলেও, মা’র সাথে একটা কাজের বাড়ি গিয়ে তাদের বাড়ির সমবয়সি বাচ্চাটার মুখে শুনেছে যে খুব ভালো খেতে। মিনতির পক্ষে ছেলের এই আবদার মেটানো খুব শক্ত, এমনিতেই তার আয়ে দু’বেলা পেট ভরে খেয়ে, ঘর ভাড়া দিয়ে সংসার চালানো মুশকিল, তার উপর আবার এই অতিরিক্ত খরচ করার কথা সে ভাবতেই পারে না।

আজ বোধহয় সেই সুযোগ এসে উপস্থিত হয়েছে। পাশের বড় রাস্তার ওপর নগেন বাবুর মেয়ের আজ বিয়ে। নগেন বাবু খুব ধনী, তার ওপর তাঁর একমাত্র মেয়ের বিয়েতে খাবার আয়োজন ও নিমন্ত্রিতের সংখ্যাও অনেক। ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে, যারা খাবার পরিবেশন করছে, ও যারা বিশাল বিশাল নৌকার মতো পাত্র করে উচ্ছিষ্ট খাবার পাশের ভ্যাটে নিয়ে গিয়ে ফেলছে, উভয় পক্ষকেই অনুরোধ করেও কিছু সুরাহা না হওয়ায়, সঙ্গে করে নিয়ে আসা পাত্র নিয়ে ভ্যাটের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এইসব বর্জ্য খাদ্য বাহকেরা বড় বড় পাত্রে বয়ে আনা উচ্ছিষ্ট খাদ্য বেশ কিছু কুকুর ও অভুক্ত ভিখারির ভিড় কাটিয়ে পাত্র উপুর করে ভ্যাটের গভীরে ফেললেও, মিনতির ছোট্ট পাত্রে বেছে বেছে দেওয়ার সময় বা ইচ্ছা, কোনটাই তাদের নেই। বাধ্য হয়ে মিনতি আর সকলের মতো ভ্যাট থেকেই কিছু পরিস্কার খাবার নিজের পাত্রে তুলে নেবে ভেবেছিল, কিন্তু উচ্ছিষ্ট খাবার সংগ্রহ নিয়ে সকলের কলহ, মারামারি ও কুকুরের তেড়ে আসা দেখে সে সাহস না হওয়ায়, খালি হাতে ছেলের হাত ধরে সজল চোখে ঘরে ফিরে আসে।

আজ মাসের মাইনে পেয়েই মিনতি ছেলের জন্য খাসির মাংস কিনতে যায়। তার প্রয়োজন মাত্র পঞ্চাশ গ্রাম। এমাসে অতিরিক্ত আঠাশ টাকা খরচ সে যেভাবে হোক সামলে নেবে। কিন্তু মাংস বিক্রেতা পঞ্চাশ গ্রাম মাংসের কথা শুনেই চিৎকার করে তাকে চলে যেতে বলে। অন্যান্য খদ্দেররা কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করে না, বরং মিনতির চাহিদার পরিমাণ শুনে হেসে ওঠে, কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে, “আজ তোমার বড় খদ্দের এসেছে হে” বলতেও ছাড়ে না। মিনতি কাকুতি মিনতি করে জানায়, যে এর বেশি কেনার সামর্থ তার নেই। ছোট ছেলেটাকে দেখিয়ে জানায় বাচ্চাটার বায়নায় সে মাংস কিনতে এসেছে, দয়া করে তাকে ওই অল্প পরিমাণ মাংস দেওয়া হোক, সে টাকা নিয়ে এসেছে, যা দাম লাগে দিয়ে দেবে।

অবশেষে দয়াপরবশ হয়ে তাকে পঞ্চাশ গ্রাম মাংস দিয়ে বত্রিশ টাকা দিতে বলা হয়। আর পাঁচজনের মতো ইচ্ছামতো পছন্দের জায়গা থেকে মাংস বেছে নেওয়ার কথা তো সে ভাবতেই পারে না, কিন্তু আর সকলের নীরবতা তাকে মাংস বিক্রেতার অশোভন আচরণ ও বেশি টাকা দাবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা থেকেও পিছিয়ে আসতে বাধ্য করে। দোকানের সামনে অতুল তার ভ্যানরিক্সায় বসে বিড়ি টানতে টানতে সব লক্ষ্য করলেও, আধপাগলা অপবাদ তাকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, প্রতিবাদ করা থেকে বিরত রাখলো।

রান্না করতে গিয়ে মিনতি বুঝতে পারে গরীব হওয়ার অপরাধে সে অতি অল্প পরিমাণ মাংস কিনতে, ও অল্প পরিমাণ মাংস কেনার অপরাধে সে মাংসের পরিবর্তে মাংসের ছাঁট ও কিছু অখাদ্য অংশ, অতগুলো লোকের চোখের সামনে দিয়ে বেশি দামে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। খাওয়ার পাতে শিশুটি অখাদ্য ছিবড়ে ফেলে, অন্যান্য দিনের মতোই মা’র সাথে তৃপ্তি করে ফেনমাখা ভাত আলুসিদ্ধ দিয়ে খেয়ে নেয়।

**************************************************************************************************

অতুল আজ কাককে খাবার দিতে গিয়ে তাদের অন্যান্য কাকদের চিৎকার করে ডেকে আনা দেখে প্রথম মনে হলো কাকেরা বোধহয় বোকা নয়, আসলে তাদের শরীরের ভিতর একটা হৃদয় বলে জিনিস আছে, যেটা হয়তো অন্যান্য অনেক প্রাণীর মতো মানুষের শরীরেও নেই।

সুবীর কুমার রায়।

০৮-০৫-২০১৮

মহাভোজ { লেখাটি বই পোকার কলম, বাংলায় লিখুন, ও উই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

প্রত্যেক মানুষের জীবনে তিনটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিন থাকে— জন্ম, মৃত্যু, ও বিবাহ। যদিও এই বিশেষ তিনটি দিনের, প্রথম দু’টি তার অজান্তে ও অগোচরে ঘটে। প্রথমটি নিয়ে হয়তো অনেক কিছুই সে পরবর্তীকালে গল্প শুনে জানতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয়টি তার আর দেখে, শুনে, বা জেনে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই এই তিনটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিনের তৃতীয়টি যে তার কাছে সত্যিই একটি স্বপ্নের, কল্পনার, ভাললাগার, ভালবাসার, ও সারা জীবন মনে রাখার মতোই দিন হয়ে থাকে, এ বিষয় কোন দ্বিমত থাকতে পারে না।

কলেজ জীবন শেষ করে বেকার অবস্থায় আমরা কয়েকজন সকাল-সন্ধ্যা নেপালদার দোকানে ভেরেন্ডা ভাজতে যেতাম। যদিও নেপালদা আমাদের থেকে বয়সে বেশ কিছুটা বড় ছিল, তবু সে ছিল আমাদের বন্ধুর মতো। তাকে নিয়ে কত স্মৃতি! একদিন আমার খুব কাছের বন্ধু সমর, যার সুত্রে নেপালদার সাথে পরিচয় ও ওই দোকানে আড্ডা মারতে যাওয়া, আমাকে জানালো যে বাদলদার বিয়ে এবং তাকে বরযাত্রী যাওয়ার জন্য বিশেষ করে ধরেছে। যদিও সে বৌভাতে যেতে রাজি থাকলেও, বরযাত্রী যেতে মোটেই আগ্রহী নয়, কিন্তু কিছুতেই কাটাতে পারছে না। তার ইচ্ছা তার সাথে আমিও বাদলদার বিয়েতে বরযাত্রী যাই। আমি পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দিলাম যে বিয়েটা তার নয় বাদলদার, আর বাদলদা আমায় তার বিয়েতে নিমন্তণও করেনি। যদিও বাদলদার বিয়তে নিমন্ত্রণ করলেও আমি বরযাত্রী যেতাম না।

বাদলদা ছিল ওই দোকানের মালিক, নেপালদার বিশেষ বন্ধু। বাদলদা যদিও ওই দোকানে খুব কমই আসতো, তবু আমাদের সাথে পরিচয় ছিল। যাহোক্, দু’দিন পরে দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছি, বাদলদা এসে হাজির। দোকানে এসেই সে আমাকে তার বিয়েতে বরযাত্রী যাওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করলো। এই নিমন্ত্রণ তার ইচ্ছায় না সমরের, বোঝা গেল না। অদ্ভুত ব্যাপার সে কিন্তু আমাদের কাউকেই তার বৌভাতে যাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করলো না। নিজের খরচ বাঁচিয়ে আমাদের নিমন্ত্রণ, না বিয়ের আসরে লোকবল বাড়ানো, কোনটা প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা গেল না।

এরপর থেকে বাদলদা ঘনঘন নেপালদার দোকানে আসা শুরু করলো এবং সুর করে ন্যাকা ন্যাকা গলায় সমরকে বলতে লাগলো যে তার বিয়ে করতে যেতে ভীষণ ভয় করছে, বিয়ে করার তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই, ইত্যাদি ইত্যাদি। সে বিয়ের আসরে সাহস যোগাবার জন্য সমরকে সাথে পেতে চায়। বাদলদা আমাদের থেকে বয়সে অনেকটাই বড়। এটা যে তার অত্যন্ত বিয়ে করার ইচ্ছা ও বুড়ো বয়সে বিয়ে করার ন্যাকামি ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ, বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। সে চলে গেলে আমি সমরকে পরিস্কার জানিয়ে দিলাম যে আর যেই সঙ্গে যাক, আমি অন্তত তার বিয়েতে বরযাত্রী যাচ্ছি না।

বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা বলে শুনি, কিন্তু বাদলদা ছুঁলে যে ছত্রিশ ঘা, তাকি ছাই আগে জানা ছিল! এরপর থেকে বাদলদা প্রায় রোজই আমাদের আড্ডার দোকানে এসে তার বিয়ে করার অনিচ্ছা, একা একা বিয়ে করতে যাওয়ার ভয়, লজ্জা, ইত্যাদি নিয়ে তার মূল্যবান মতামত শুনিয়ে যেত। বিয়ের পর সন্তানসন্ততি না হলে, বা হতে বিলম্ব হলে, বন্ধুবান্ধবরা অনেকের বাড়িতেই কার্তিক ঠাকুর ফেলে যায় বলে শুনি। অতি উৎসাহে কেউ কেউ আবার জোড়া কার্তিক ফেলে যায় বলেও শুনেছি, কিন্তু একা একা বিয়ে করতে যেতে ভয় করছে শুনে ভয় হলো, জোড়া কার্তিকের মতো বাদলদা সমরকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইছে নাতো?

সে যাহোক্ সমর কিছুতেই সঙ্গে যাওয়ার জাল থেকে বেরতে না পেরে, প্রবলভাবে আমায় আঁকড়ে ধরলো। স্বাভাবিক, ডুববার আগে মানুষ খড়কুটোও আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। ফলে বাদলদার হাত থেকে মুক্তি না পেয়ে সমর, ও সমরের হাত থেকে মুক্তি না পেয়ে আমাকেও বাদলদার বিয়ে করতে যাওয়ার একাকীত্ব, লজ্জা, ও ভয় ভাঙাতে সঙ্গে যাবার প্রতিশ্রুতি দিতেই হলো।

নির্দিষ্ট দিনে সন্ধ্যাবেলা সমরের সাথে বাদলদার বাড়িতে আমরা দুই ব্ল্যাকক্যাট গিয়ে হাজির হলাম। বাদলদা দেখলাম চন্দনচর্চিত কপাল নিয়ে, মাঞ্জা দিয়ে ধুতি পাঞ্জাবি পরে, এক কান থেকে অপর কান পর্যন্ত দাঁত বার করে হাসি মুখে, ভয় ভয়ে, ‘দুর বাবা আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবো একাই চলে গেলে ভালো করতাম’ ভাব নিয়ে বসে আছে। আমাদের দেখে বিরক্তি প্রকাশ করে জানালো, “দেখ্ না, এখনও গাড়ি এসে পৌঁছয়নি। আর কখন যাবো বলতো, দেরি হয়ে যাবে না?”

যদিও তিন-সাড়ে তিন কিলোমিটার দুরে বিয়ের আসর, তবু বাইরে কোন গাড়ির দেখা না পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “বরযাত্রীরা কিসে যাবে”? বরযাত্রীরা কিসে করে ও কখন বিয়ের আসরে যাবে, তা নিয়ে বাদলদার খুব একটা চিন্তা বা মাথাব্যথা আছে বলে মনে হলো না। “গাড়ি এসে যাবে”, খুব ক্যাজুয়ালি কথাক’টা বলে সে উদ্বিগ্ন হয়ে পায়চারি শুরু করে দিলো। আমার আবার অন্য চিন্তা শুরু হলো, বাদলদা যদি শেষপর্যন্ত প্রবল ভয় ও লজ্জা নিয়ে সমরকে সঙ্গী করে ফুলেঢাকা গাড়ি হাঁকিয়ে বিয়ের আসরে চলে যায়, তাহলে আমার কি করা উচিৎ?”

যাহোক শেষপর্যন্ত বাদলদার গাড়ি এসে হাজির হলো। একমুহুর্ত সময় অপচয় না করে, সে গাড়িতে ওঠার সময় আমাদের দু’জনকে বাস আসলেই চলে আসতে বললো। বাদলদা তো চলে গেল, কিন্তু ধীরে ধীরে রাত বাড়তে থাকলেও, আমাদের বাসের আর পাত্তা নেই। এইভাবে আরও অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল, আমাদের একটাই সান্তনা যে আমরা দু’জন ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন পুরুষ ও মহিলা, বরযাত্রী যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আরও দীর্ঘক্ষণ সময় কাটিয়ে ফিরে আসবো কী না যখন চিন্তা করছি, তখন আমাদের লজঝড়ে বাস এসে উপস্থিত হলো। এবার শুরু হলো বরযাত্রীদের যাওয়ার প্রস্তুতি। এর সাজের সামান্য ফিনিশিং টাচের বাকি আছে, তো ওর মেজো মেয়ে-জামাই এখনও এসে পৌঁছয় নি। সমরকে বললাম, “এরপর আমরা যখন পৌছবো, তখনতো ও বাড়ির সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। আমরা পৌঁছে চ্যাঁচামেচি করে তাদের ঘুম ভাঙাতে সক্ষম হলেও, ঘুম চোখে ‘কেএএএএএ’ বলে দরজা খুলে ঢুকতে দেবে তো? তার থেকে চল্ কেটে পড়ি। কোথাও খেয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাই।” সমর জানালো সেটা ঠিক হবে না। হয়তো ও না পৌঁছলে বাদলদা ভয় ও লজ্জায় বরাসনে না বসে সমরের অপেক্ষায় বসে থাকবে, এটাও কারণ হতে পারে।

অবশেষে বাস ছেড়ে দিলো। অল্পই রাস্তা, তবু আমরা যখন হাজিরা দিলাম, তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। ছোট্ট বাড়িটার ডানপাশে তেরঙা কাপড় দিয়ে তৈরি প্যান্ডেল, বুঝলাম এরা কংগ্রেসের ভক্ত। বিয়ে অনেকক্ষণ আগে শেষ হয়ে গেছে। শীতের রাতে বিয়ে বাড়ি প্রায় ফাঁকা, বাড়ির লোকজন ছাড়া বিশেষ কেউ আছে বলে তো মনে হলো না। বাস থেকে নামা মাত্রই বরকনের সাথে দেখা করার সুযোগ না দিয়ে, আমাদের প্রায় জোর করে প্যান্ডেলের ভিতর খাবার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো। খুব ইচ্ছা করছিল ভয় ও লজ্জা জয় করে বাদলদা এখনও সুস্থ আছে কী না, বলা ভালো বেঁচে আছে কী না, একবার দেখে আসতে, কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া গেল না।

আমরা বরযাত্রী ক’জনই বোধহয় খেতে বাকি আছি, আর বিশেষ কাউকে তো দেখলাম না। একজন একটা বড় ঝুড়ি নিয়ে এসে দু’টো করে বরফ শীতল লুচি দিয়ে গেল। তারই জেরক্স কপি আর একজন, সম্ভবত ছোলার ডাল দিয়ে গেল, তারপর সব নীরব। কিছুক্ষণ পরে সেই দু’জন আবার এসে লুচি বা ডাল নেবো কী না জিজ্ঞাসা করলো। তাদের উভয়ের বাহাত্তর ইঞ্চি বুকের ছাতি ও বাইসেপস্ ট্রাইসেপস্ দেখে আর লুচি বা ডাল চাওয়ার সাহস হলো না। একে একে ঠান্ডা চপ্, ফুলকপির তরকারি, মাছ, ইত্যাদি সবই পাতে দেওয়া হলো। মাইক টাইসন বা মহম্মদ আলীর মতো প্রায় একই চেহারার চারজন আমাদের খাবার পরিবেশন করলেও, সাহস করে বিশেষ কিছু চাওয়া ক্ষমতায় কুললো না।

অবশেষে পিতৃদত্ত প্রাণ না খুইয়ে নৈশভোজন সমাধা করে প্যান্ডেলের বাইরে এসে আজকের নায়ক, বাদলদার সাথে ভয় ভয়ে দেখা করতে গেলাম। জানি না সে এখনও টিক আছে কী না। প্যান্ডেলের পাশেই ছোট্ট ঘরটা বাসরঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। দু’টো সিঁড়ি ভেঙে লাল সিমেন্টের শুনশান চাতালটায় উঠেই ঘরের খোলা দরজা, একপাশে সিমেন্টের একটা বেঞ্চি মতো করা, যার দু’পাশে আবার বেশ মোটা পাশবালিশের মতো হাতলও আছে। খোলা ঘরটার কার্পেট পাতা মেঝেতে দেখলাম বাদলদা নববধূকে নিয়ে ঘর আলোকিত করে বসে আছে। আমাদের আসতে বিলম্ব হওয়াতেই বোধহয় শ্রীমান বাদল চন্দ্র সমরের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে আট-দশজন সুবেশিনী যুবতীকে, তার ভয় ও লজ্জার হাত থেকে বাঁচাবার পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করেছে। বাদলদা ভয় পায়, লজ্জা পায় জেনেছিলাম, কিন্তু সে যে গানও গায়, এ খবরটা জানা ছিল না। বাদলদা পাশের যুবতীদের সাথে গানের অন্ত্যাক্ষরি খেলায় ব্যস্ত ছিল। আমাদের দেখে চোখ তুলে তাকিয়ে একবার শুধু “তোরা এসে গেছিস, খাওয়া হয়ে গেছে তো?” বলেই গানের খেলায় মন দিলো।

এখানেই জানলাম আমাদের মাতৃসম বাদলবৌদির পাঁচ পাঁচটি ভাই আছে, যাদের সহস্তে খাদ্য পরিবেশন কিছুক্ষণ আগেই আমাদের উদর তৃপ্ত করেছিল। তারা প্রত্যেকেই রাজনীতির সাথে সাথে, শরীর চর্চাও করে। তাদের প্রত্যেকেই কেউ পাড়াশ্রী, কেউ জেলাশ্রী, কেউ বা আবার অন্য কোন শ্রী। একজন কোন কাজে আটকে গিয়ে আজকে উপস্থিত থাকতে পারেনি। বাদলদা সহচরীদের সাথে গানের ভেলায় ভেসে বেড়াচ্ছে, তাই তার আমাদের সাথে কথা বলে মূল্যবান সময় অপচয় করার অবকাশ নেই। এটাও তো মানতে হবে যে এই সুযোগ জীবনে রোজ রোজ, বার বার আসে না।

কি করা যায় ভাবছি, এমন সময় আমাদের ত্রাতা সেই চার ভাইয়ের একজন এসে বললো, “এই ঠান্ডায় বাইরে দাঁড়িয়ে কেন ভাই? রাতে থাকার জন্য ঘরের ব্যবস্থা তো করাই আছে, চলুন শুয়ে পড়বেন”। হাতে যেন চাঁদ পেলাম, যাওয়ার পথেই একবার এই ভাইটিকে একটা প্রণাম ঠুকে দেবো কী না ভাবছি, এমন সময় ভারতশ্রী না বিশ্বশ্রী জানি না, এই ভাইটি আমাদের প্রায় জোর করেই পাশের একটি ঘরে নিয়ে গেল। না, ভুল বললাম। ঘর নয় বাড়ি, কারণ ফাঁকা জমির একপাশে এই একটিই ঘর। সেখানে গিয়ে দেখি আমাদের মতোই অনাথ, অভাগা কয়েকজন এই ঠান্ডায় রাতের আশ্রয়ের জন্য বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তালা খোলার পর ঘরে ঢোকার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। অপেক্ষারত সকলের ঘরে স্থান সংকুলান হতে পারে জেনেও ঘরে প্রবেশ করতে যাবো, এমন সময় বিশ্বশ্রী জানালেন, “ঘরটা ভিতর থেকে বন্ধ করার কোন ব্যবস্থা নেই, তাই আমি বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে যাবো”। একটি মাত্র ঘর, ভিতরে কোন বাথরূম পর্যন্ত নেই। রাতে প্রয়োজন হলে তো বিপদে পড়বো। কিছুক্ষণ আগেও ভয়ে যাদের কাছ থেকে একটা ঠান্ডা লুচি বা একটু ডাল চাইতে সাহসে কুলয়নি, তাদেরকে মাঝ রাতে ঘুম ভাঙিয়ে ডাকার সাহস আমার কই? রাতে আমায় বাথরূমে যেতে হয় না ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজন হলেও যাওয়ার উপায় নেই জেনে শুতে গেলে ওই চিন্তায় রাতে ওঠার প্রয়োজন হবেই, আমি লিখে দিতে পারি।

এইভাবে কি করবো ভেবে বাদলদার ঘরের কাছে ফিরে এসে দেখি আমাদের বাস ফিরে গেছে। সম্ভবত বাদলদা বেঁচে আছে, সুস্থ আছে, স্বচক্ষে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে, সমস্ত বরযাত্রীরা ঠান্ডা লুচি, ছোলার ডাল খেয়েই বাড়ি ফিরে গেছে। খাদ্যাভাবে বাড়ি ফিরে ভাত চাপাতে হবে বলেও ফিরে যেতে পারে। বাধ্য হয়ে অসহায় আমরা দু’জন শীতের রাতে ওই ঠান্ডায়, ঘরের বাইরের ওই বেঞ্চে পাশবালিশের মতো সিমেন্টের হাতলে কাত হয়ে প্রচন্ড মশার উৎপাত সহ্য করে বসে থাকলাম। ভিতরের জলসা জোরকদমে চলছে। আমাদের অতি আপনারজন বাদলদাই আমাদের ভিতরে আসতে বললো না, কাজেই আর কারো কাছে আশা করা শুধু মূর্খামি নয়, অন্যায়ও বটে।

বাকি রাতটুকু ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে, মশার কামড় খেয়ে, বেসুরো গান শুনে কাটিয়ে দিলাম। গতকাল রাতে ঠান্ডা লুচি খেয়ে যে দশ ফোঁটা রক্ত উপার্জন করেছিলাম, তার বিশগুণ মশাদের দান করে, অন্ধকার থাকতে ফেরার পথ ধরলাম। ওই অন্ধকারেও দেখলাম একটা চায়ের দোকান খুলেছে। হয়তো ইনি কোন অবতার, আমাদের কষ্টের কথা ভেবে মাঝ রাতের ঠান্ডাতেও আমাদের রক্ষার্থে ধরায় অবতরণ করেছেন।

গরম গরম চা খেয়ে একটু চাঙ্গা হয়ে বড় রাস্তা ছেড়ে ভিতরের শর্টকাট সরু রাস্তা ও গলি দিয়ে একসময় নেপালদার বাড়িতে এসে হাজির হলাম। এতো ভোরে বাড়ি যাওয়ায় বেশ অসুবিধা আছে। সমরের পক্ষে তো অসম্ভবই বলা যায়, তাই একটু বেলা পর্যন্ত নেপালদার বাড়িতে একটা ছোট্ট ঘুম দিয়ে, চা খেয়ে যে যার বাড়ি ফিরে গেলাম। নেপালদাকে লজ্জায় আর জলখাবারের কথাটা মুখফুটে বলতে পারলাম না।

সুবীর কুমার রায়

১৪-০৫-২০১৮

শনিবারের বারবেলা

প্রায় বত্রিশ-তেত্রিশ বছর আগেকার ঘটনা। একটি চারতলা কোয়র্টার্সের তিনতলায় স্ত্রী ও শিশু কন্যাকে নিয়ে বসবাস করতাম। একটি চওড়া রাস্তার দুধারে পরপর চারতলা এই বাড়িগুলোর,  প্রতি ফ্লোরে মুখোমুখি দু’টি করে চারটি ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাট থেকে বেড়িয়ে একদিকে ওপরে ওঠার ও নীচে নামার সিঁড়ি, অপর দিকে চার-সাড়ে চার ফুটের রেলিং দেওয়া খোলা জায়গা, যেখান থেকে খোলা আকাশের নীচে বাইরের বড় রাস্তা, নীচের খানিকটা বাঁধানো জায়গা, ইত্যাদি দেখা যায়। প্রতি ফ্লোরেই এই রেলিঙের গায়ে হেলান দিয়ে যে যার সাইকেল রাখে। রাস্তা থেকে লোহার গ্রীলের দরজা দিয়ে ঢুকে, ওই বাঁধানো জায়গা দিয়ে এসে গ্রীলের গেট দিয়ে মূল বাড়িতে প্রবেশ করতে হয়। সাইকেল নিয়ে অফিস যাতায়াত করি। দুই-আড়াই কিলোমিটার রাস্তা, তাই কোন অসুবিধা বোধ করি না।

এক শনিবার কি একটা কারণে সকালে ভাত না খেয়ে অফিস যাই, কথা ছিল দুপুরে ফিরে এসে ভাত খাবো। অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরে এসে আর এক প্রস্থ স্নান করে ভাতের থালা নিয়ে বসে ডাল দিয়ে ভাত মেখে দু’এক গ্রাস মুখে তুলেছি, এমন সময় ফ্ল্যাটের বাইরে মনে হল চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ। দু’একবার যেন সাইকেল কথাটাও কানে গেল। ডালমাখা এঁটো হাতে দরজা খুলে সাইকেলগুলো দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসতে গিয়ে আমাদের ঠিক ওপরের ফ্ল্যাট থেকে চিৎকার শুনে ওপরে গিয়ে হাজির হলাম। আমাদের ঠিক  ওপরের ফ্ল্যাটে এক মুসলিম ভদ্রলোক স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান নিয়ে বাস করতেন। ভদ্রলোকের কলকাতায় একটি দোকান ছিল। খুব ভোরে তিনি দোকানে চলে যেতেন, ফিরতেনও বেশ রাত করেই।

ওপরে গিয়ে দেখি দরজা হাট করে খোলা। ভদ্রমহিলা চৌকির নীচে কারো উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বেরিয়ে আসতে বলছেন, কিন্তু চৌকির নীচ থেকে কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। আমায় দেখে ভদ্রমহিলা জানালেন যে তাঁর দরজা খোলা ছিল, একটি অচেনা ছেলে এসে চৌকির ওপর বিছানায় সটান শুয়ে পড়ে। তিনি চিৎকার চেঁচামেচি করায়, ছেলেটি চৌকির তলায় ঢুকে পড়েছে। অদ্ভুত ঘটনা, আমি চৌকির নীচে উঁকি দিয়ে দেখলাম একটি যুবক চৌকির নীচে টানটান হয়ে শুয়ে আছে। তাকে বার বার বেরিয়ে আসতে বলেও কোন ফল হলো না।

ইতিমধ্যে চারতলার চিৎকার চেঁচামেচিতে দোতলা থেকে কয়েকজন ও রাস্তা থেকে অন্যান্য বিল্ডিং-এর কিছু ছেলেও চারতলায় উঠে এসেছে। দোতলার বৃদ্ধ খগেন বাবু আবার নাতির ক্রিকেট ব্যাট হাতে করে এসে উপস্থিত। ঘরের ভিতর নাতির সাথে ক্রিকেট খেলছিলেন, না আত্মরক্ষার্থে ক্রিকেট ব্যাট হাতে উপস্থিত হয়েছেন, বোঝা গেল না। চারতলার ফ্ল্যাটের দরজার সামনে তখন পাঁচ-সাতজনের ভিড়। সকলেই যুবকটিকে বাইরে নিয়ে এসে সহবত শেখানোর জন্য উদগ্রীব, এমন সুযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না, কিন্তু শিক্ষার্থী চৌকির তলা থেকে বাইরে আসতে নারাজ। শেষে একজন ঘরে ঢুকে নীচু হয়ে তার পা দু’টো ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে এসে  হাজির করলো।

ধবধবে সাদা হাফ্ প্যান্ট ও ততোধিক সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত যুবকটি কমন প্লেসে টানটান হয়ে শুয়ে আছে। মৃগয়া ছবির মিঠুন চক্রবর্তীর মতো পেটানো ইস্পাতের মতো চেহারা, প্যান্ট ও গেঞ্জি দেখলে মনে হবে এইমাত্র দোকান থেকে কিনে এনে পরে এসেছে। সকলেই তাকে কি উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে জিজ্ঞাসা করছে, যদিও সে এর কোন উত্তর না দিয়ে, চুপচাপ শুয়ে থাকাটাই বেশি শ্রেয় বলে মনে করছে। খগেন বাবু তাঁর হাতের নাতির ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে সচীনের স্টাইলে সামনের পায়ের ওপর ভর দিয়ে ছেলেটির পায়ের তলায় আঘাত করে একভাবে বলে যাচ্ছেন, “বল শালা কি উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিস? চুরি করার মতলব ছিল তাই না”? একজন পুলিশ ডেকে পুলিশের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করলে অপর একজন মন্তব্য করলো, “পুলিশের হাতে দিয়ে কোন লাভ নেই, ব্যাটারা পয়সা খেয়ে ছেড়ে দেবে”। কথা শেষ হবার সাথে সাথে ছেলেটি চিৎকার করে অদ্ভুত গলায় “আমায় কেউ কিছু করতে পারবে না” বলেই মুহুর্তের মধ্যে যোগ ব্যায়াম করা অভিজ্ঞ মানুষের মতো হাতের সাহায্য ছাড়াই সটান উঠে দাঁড়িয়ে কিছু বোঝার আগেই লাফ দিয়ে বাঁপাশে নীচে নামার সিঁড়ি দিয়ে ছুটে নামতে শুরু করলো। আমি ঠিক সিঁড়ির মুখটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওর পিছনে গেঞ্জিটা ধরে ওর গতিরোধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। শুধু ওর পিঠে সাদা গেঞ্জির ওপর কংগ্রেস দলের প্রতীকের মতো, ডাল মাখা হলুদ রঙের আমার ডান হাতের চিহ্ন রয়ে গেল। ও এক একবারে লাফিয়ে দু’তিনটে করে সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় আমার ফ্ল্যাটের সামনে চলে আসলো, ওর ঠিক পিছনে আমি। ও কিন্তু আর বাঁদিকে ঘুরে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় না নেমে, কোন দিকে না তাকিয়ে লাফ দিয়ে সাইকেলগুলোর ওপর হাতের চাপ দিয়ে, রেলিং টপকে খোলা জায়গা দিয়ে নীচে লাফিয়ে পড়লো। আমার দু’হাত দুরত্ব থেকে অপরাধী ছেলেটা আমায় বোকা বানিয়ে  লাফ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু পরমুহুর্তেই মনে হলো, এটা তো তিনতলা, শুধু তিনতলাই নয়, চার-সাড়ে চার ফুটের রেলিং টপকে সে লাফ দিয়েছে, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিনতলার ওপর থেকে সে লাফ দিয়ে পালিয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনতলা কেন, হয়তো ত্রিশতলা বাড়ির ওপর থেকেও লাফ দিয়ে নামার মানুষ এই পৃথিবীতে আছে, কিন্তু সেই লাফ দেওয়ার জন্যও তো কিছু সতর্কতা, প্রস্তুতি, সবথেকে বড় কথা যেখানে লাফ দিয়ে অবতরণ করবে, সেই জায়গাটা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও তো অবশ্যই আছে। এই ছেলেটাতো কোন কিছু না দেখে, কোনরকম প্রস্তুতি ছাড়াই তিন হাত দুর থেকে সাইকেলগুলোর ওপর হাতের চাপ দিয়ে নীচে লাফিয়ে পড়লো। ভয়ে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। রেলিং থেকে নীচে লক্ষ্য করে দেখলাম, সিমেন্ট বাঁধানো চাতালের ওপর ছেলেটি চিৎ হয়ে পড়ে আছে, ঠিক তার পাশেই একটা সাইকেল তুবড়ে পড়ে আছে।

একমুহুর্ত সময় নষ্ট না করে দ্রুত ছুটে একতলায় নেমে এলাম। নীচে তখন বেশ ভিড়, ওপর থেকেও বাকি সবাই খগেনবাবুর নেতৃত্বে নীচে এসে উপস্থিত হয়েছে। টানটান হয়ে ছেলেটা পড়ে আছে, চোখদুটো বন্ধ। সম্ভবত ওপর থেকে সাইকেলটার ওপর পড়ায়, সাইকেলটা তুবড়ে গেলেও তার বিশেষ রক্তপাত হয়নি। চিৎ হয়ে পড়ে আছে তাই সকলে বুকের কাছে ঝুঁকে পড়ে নিশ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে বা ছাড়ছে কী না তাই নিয়ে ব্যস্ত। বুকের থেকেও আমার আগ্রহ ছেলেটির পিঠের ওপর, যেটা কণামাত্রও চোখে পড়ছে না। ছেলেটা যদি মরে গিয়ে থাকে, অথবা এরপর মারা যায়? ভাবতেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটা বরফের মতো ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। মরে গেলে তো সবার আগে আমায় দায়ী করা হবে। ওর গেঞ্জিতে যে আমার ডালমাখা হাতের চিহ্ন জ্বলজ্বল করছে, ঘরে সেই ডালতো এখনও অনেকটা রাখা আছে। ওঃ, কতবার গৃহকর্ত্রীকে বলেছি খাবার কম করে রান্না করতে, যাতে খাবার না বাঁচে। তা শুনলে তো সে কথা। এখন ঠেলা সামলাও। আগে জানলে ছেলেটাকে যেভাবে হোক বুঝিয়ে সুঝিয়ে আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়, অন্তত আমি যে আদৌ দায়ী নই লিখিয়ে, তারিখ দিয়ে সই করিয়ে নিয়ে, ল্যামিনেশন করিয়ে আমার বুকপকেটে রেখে দিতাম।

হঠাৎ মনে হলো ছেলেটা অল্প একটু চোখ খুললো। একতলার মহিলাটিকে খানিকটা জল নিয়ে আসতে বললাম। মহিলাটি বেশ বড় একটা ঘটি করে এক ঘটি খাবার জল নিয়ে আসলে দু’চারবার মুখেচোখে জলের ছিটে দেওয়ার সাথে সাথে সে অল্প হাঁ করলো। ঘটি থেকে তার মুখে জল ঢালা শুরু হলে সে একবারও বিরাম না দিয়ে, ঢকঢক্ করে একঘটি জল একফোঁটা বাইরে না ফেলে খেয়ে নিল। এরপর পাড়ার ছেলেদের তৎপরতায় তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। গাড়িতে তোলার আগে আমার হাতের ছাপের বেশ কিছুটা অংশ পরিস্কার নজরে পড়লো।

এরপর আর তাকে নিয়ে কোন আলোচনা নেই। গোটা দিনটা চিন্তায় চিন্তায়, ঘানি টানার ভয়ে কাটলো, কোন খবর পেলাম না। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে, জেলখানায় শুয়ে আছি কিনা বুঝবার চেষ্টা করলাম। কয়েকদিন পরে বিশদ খবর পাওয়া গেল। ছেলেটা এখন ভালো আছে। আঘাত সেরকম গুরুতর নয়। বেশ কিছুটা দুরে যে বিশাল খেলার মাঠ আছে, ঘটনার দিন সেখানে তাকে অনেকেই দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে দেখেছিল। অনেকেই তাকে চেনে, সে নাকি খুব নামী অ্যাথলিট, এবং সে নাকি ওই মাঠে প্রায়ই প্র্যাকটিশ করতে আসে। ঘটনার দিন সে সঙ্গে করে অনেক কাপ মেডেল ইত্যাদি নিয়ে এসেছিল, কিন্ত সবকিছু মাঠে ফেলে রেখে হঠাৎ ছুটতে ছুটতে চলে যায়।

আরও কিছুদিন পর জানা গেল সে নাকি প্রথম ডিভিশনের একজন নামজাদা ফুটবল খেলোয়ারের কিরকম ভাই। মাঝে মাঝে তার নাকি এরকম একটা সাময়িক মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। সে কেন ওই অচেনা ফ্ল্যাটে গিয়েছিল মনে করতে পারেনি, তবে পালাবার সময় ওটা যে তিনতলা সে বুঝতে পারেনি বলে জানিয়েছে। তার জন্য অনেকের অসুবিধা হওয়ায়, সে সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে।

খবরটা শুনে খুব ভালো লাগলো। নিজেকে বেশ চিন্তামুক্ত মনে হলো। তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করলাম।

সুবীর কুমার রায়

০৭-০৫-২০১৮

পাহাড়ের রোজনামচা {লেখাটি www.amaderchhuti.com , Tour & Tourists, Week end tours from Kolkata, Akshar-অক্ষর, বাংলায় লিখুন, উইপোকার কলম , বই পোকার কলম , Tour Planner , ও Bengal in Trekking পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত}

আজ   থেকে  প্রায়  দশ  বৎসর  আগের  কথা,  কেন  জানিনা  আমার  মনে  হিমালয়,  বিশেষ  করে  গঙ্গার  উৎপত্তি  স্থান  গঙ্গোত্রী-গোমুখী,  আর  যমুনোত্রী  দেখার  ঝোঁক  চেপে  বসে।  তখন  না  ছিল  সঙ্গী,  না  ছিল  সামর্থ।  এর  কিছু  পরে  শঙ্কু  মহারাজে  বিখ্যাত  কাহিনীটি   অবলম্বনে  নির্মিত  “জাহ্নবী  যমুনা,  বিগলিত  করুণা”  সিনেমা   দেখে,  আমার  এই  ঝোঁক  যেন  আরও  বেড়ে  যায়।

এরও  বেশ  কিছুদিন  পরে,  আমার  প্রথম  হিমালয়  দর্শনের  সুযোগ  ঘটে।  অবশ্য  গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী  নয়। সুযোগ  আসে  নৈনিতাল,  রানীক্ষেত,  আলমোড়া,  কৌশানি,  গোয়ালদাম  ইত্যাদি  জায়গা  দেখার।  সেই  দিনগুলোর  কথা,  আজও  ভুলতে  পারিনি।  চারিদিকে  পাহাড়ের  প্রাচীর।  বহুদুরে  ত্রিশুল,  নন্দাদেবী,  নন্দাঘুন্টি  প্রভৃতি  বরফে  ঢাকা  শৃঙ্গ,  চোখ  জুড়ানো  সূর্যদয়।  তবু মনে  হয়েছিল  আমার  কল্পনার  সাথে  যেন  মোটেই  মিল  নেই।  কোথায়  সেই  বন্ধুর  পথ?  কোথায়  চটিতে  রাত্রিবাস?   তবু  হিমালয়কে  অনেক কাছ থেকে  বাস্তবে  পেয়ে,  পুর্বের  ঝোঁক  যেন  আবার  নতুন  করে  প্রাণলাভ  করলো।  সময়, সুযোগ,  সঙ্গীর  অপেক্ষায়,  প্রতীক্ষা  করে  থাকলাম।

পরের  বৎসরেই  সুযোগ  এসে  গেল।  কিন্তু  সঙ্গে  বাবা-মা  থাকায়,  সে  ইচ্ছাকে  সাময়িক  ভাবে  ঘুম  পাড়িয়ে,  আমরা  দেখলাম  হরিদ্বার,  দেরাদুন,  মুসৌরী,  হৃষিকেশ।  সেটা  ছিল  সারা  দেশ  জুড়ে  বন্যা  প্লাবিত,  ১৯৭৮  সালের  নভেম্বরের  শেষ।  মুসৌরীর  লালটিব্বার  ওপর  থেকে  জাপানী  দুরবীক্ষণে,  দুরের  গঙ্গোত্রী,  যমুনোত্রী,  কেদার,  বদ্রীনারায়ণকে  কাছে  বরফ  ঢাকা  অবস্থায়  পেলাম।  তার  ওপর  আবার  হৃষিকেশে  কেদার,  বদ্রী,  গঙ্গোত্রী  ও  যমুনোত্রীগামী  বাসগুলোকে  আমাদের  ফেলে  চলে  যেতে  দেখে,  মনটা  হুহু  করে  উঠলো।  ঠিক  করলাম  আর  নয়,  সামনের  বছর  যেতেই  হবে।

আমার  প্রত্যেকবারের  ভ্রমণসঙ্গী,  মাধব  ব্যানার্জীকে  সঙ্গে  নিয়ে  দিনক্ষণ  স্থির  করে  ফেললাম।   সঙ্গী   হলো  আরও  একজন,  দিলীপ  পাল।  স্থির  হলো  প্রথমে  যাব  যমুনোত্রী,  তারপর  গঙ্গোত্রী-গোমুখী,  এরপর  কেদারনাথ,  সব  শেষে  নন্দন  কানন,  হেমকুন্ড  হয়ে বদ্রীনারায়ণ।  সেপ্টেম্বরের  প্রথম  দিকে  যাবার  দিন  স্থির  হয়ে  গেল।  দিন  আর  কাটে  না।  ক্রমে  ক্রমে  দিনটাকে  আরও  এগিয়ে  নিয়ে  আসা  হলো।  স্থির  হলো  তেরই  আগষ্ট,  ১৯৭৯  সাল।  উত্তর  প্রদেশ  টুরিষ্ট  বিভাগ  আমাদের  পরামর্শ  দিল  প্রথমে  নন্দন  কানন  যেতে,  কারণ  আগষ্ট  মাসের  মাঝামাঝি  থেকে  নন্দন  কাননের  সমস্ত  ফুল  ঝরে  যেতে  শুরু  করবে।  কাজেই  আমাদের  পূর্ব  পরিকল্পিত  পরিকল্পনাকে  ঠিক  উল্টো করে,  আমরা  আমাদের  রাস্তা  ঠিক  করলাম। স্থানীয়  একজন  ভদ্রলোকের  কাছ  থেকে  গঙ্গোত্রী,  যমুনোত্রী  সম্বন্ধে  অনেক  প্রয়োজনীয়  ও  নতুন  তথ্য  পেলাম,  যা  উত্তর  প্রদেশ  টুরিষ্ট  বিভাগেরও  অজানা।  যাহোক্,  নির্দিষ্ট  সময়ে  আমরা  দুন  এক্সপ্রেসে  হরিদ্বারের  তিনটি  টিকিট  কাটলাম।  হান্টার  শূ,  পলিথিন  শীট্,  ওয়াটার  প্রুফ্,  ওয়াটার  বটল্,  ইত্যাদি  কেনাকাটাও  করে  নিলাম।  প্রস্তুত  হলাম  শুভদিনের  শুভক্ষণের  জন্য।

আজ  ১৩ই  আগষ্ট,  ১৯৭৯  সাল।  আমরা  তিনজন  মালপত্র  নিয়ে  দুন  এক্সপ্রেসে  গিয়ে,  নিজেদের  আসন  দখল  করলাম ।  দিনটা  অনেকের  মতেই  শুভ  নয়।  তার  ওপর  আসবার  আগে  বেশ  এক  পশলা  বৃষ্টি  হয়ে  গেছে।  রেডিওর  খবরে  হরিদ্বারে  জলবৃদ্ধির  খবরও  অনেক  আগেই  পেয়েছি।  তাই  মনটা  অস্থির  ও খারাপ  হয়েই  ছিল। রাত  ন’টা  ত্রিশ  মিনিটে  ট্রেন  ছাড়তে,  কেন  জানি না,  আস্তে  আস্তে  সমস্ত  দুশ্চিন্তা  মন থেকে  দুর  হয়ে  গেল।  আমরা  আমাদের  আসন্ন  যাত্রাপথ  নিয়ে  আলোচনায়  মশগুল  হয়ে  রইলাম। রাস্তায়  ট্রাভেলার্স  চেক  ভাঙ্গানো  সম্ভব  নয়।  তাই  সমস্ত  টাকা  পয়সা  নগদ  সঙ্গে  থাকায়,  আর  এক  চিন্তা।

যাহোক্,  পনেরই  আগষ্ট  সকালে  আমরা  হরিদ্বার  পৌঁছলাম।  ট্রেন  থেকে  প্রচন্ড  বৃষ্টির  মধ্যে   নেমে  দেখলাম,  চারিদিক  ঘন  কালো  মেঘে  অন্ধকার  হয়ে  আছে। আমাদের  সঙ্গে  ছোট  তিনটে  হোল্ড্-অল্,  ও  তিনটে  ছোট  সুটকেস্।  মাঝপথে  কেউ  ফিরে  আসতে  চাইলে,  সে  একাই  ফিরে  আসবে,  তাই  এই  ব্যবস্থা।  নিজেরা  যে  যার  মাল  নিয়ে  স্টেশনের  বাইরে  এলাম।  বাসস্ট্যান্ড  কিছুটা  দুরে,  তাই  শেয়ার  ট্যাক্সিতে জায়গা  করে  নিলাম।  বৃষ্টিতে  ট্যাক্সির  কাচ  ঝাপসা  হয়ে  যাচ্ছে।  রাস্তার  চারিদিকে  বড়  বড়  গর্ত  হয়ে  আছে।  গঙ্গার  ধারে,  রাস্তার  পাশে,  একটা  অয়েল  ট্যাঙ্কার  কাত  হয়ে   রাস্তা  প্রায়  বন্ধ  করে  রেখেছে।  দুরের  পাহাড়  ঘন  মেঘে  কালো  হয়ে  আছে।  সব  কিছু  মিলে  গোটা  পরিবেশটাই  একটা  ভয়াবহ  আকার  ধারণ  করে  আছে।  বুঝতে  পারছি  আমাদের  কপালে  দুঃখ  আছে।  অল্প  কিছুক্ষণ  পরেই  আমাদের  ট্যাক্সি  কালী কমলি  ধর্মশালার  কাছে  আমাদের  ছেড়ে  দিল।  আমরা  একুশ  টাকা  ভাড়া  মিটিয়ে  দিয়ে,  গুটিগুটি  পায়ে  বৃষ্টিতে  ভিজে  ধর্মশালায়  পৌঁছলাম।  ধর্মশালার  নতুন  বাড়িটা  বেশ  ভালো।  সব  রকম  সুযোগ  সুবিধা  আছে।   কিন্তু  কী  কারণে  জানি না,  কর্তৃপক্ষ  আমাদের  নতুন  বাড়িতে  স্থান  দিতে  সম্মত  হলো  না।  তাই  স্থানীয়  একজনের  বাড়িতে  আঠারো  টাকা  ভাড়া  দিয়ে,  একখানা  ঘর  ঠিক  করলাম।  ভদ্রলোক  আমাদের  বাঙালিবাবু  বলে  সম্বোধন  করে  বললেন,  “আপনারা  ডিম  খাবেন?  আমার  কাছে  ডিম  পাবেন”।  আমরা  আশ্চর্ষ  হয়ে  গেলাম।

যাহোক্,  আমরা  বাইরে  কিছু  চা-জলখাবার  খেয়ে  নিয়ে  ঘরে  ফিরে  এলাম।  ভদ্রলোক আবার  জিজ্ঞাসা  করলেন  আমাদের  কিছু  প্রয়োজন  আছে  কী  না,  আমরা  কিছু  খাব কী  না।  আমরা  তাকে  জানালাম,  আমরা   খেয়ে  এসেছি,  এবং  এখন  তাকে  আমাদের  কোন  প্রয়োজন  নেই।  ভদ্রলোক  তবু  বললেন,  “এ  বাড়ি  আপনাদেরই  নিজস্ব  বাড়ি  বলে  মনে  করবেন।  কোন  রকম  অসুবিধা  হলেই,  আমাকে  জানাবেন”।  আমরা  কোনমতে  তাকে  তখনকার  মতো  বিদায়  করে,  দরজা  বন্ধ  করলাম।  একটু  পরে  আমরা  বাসস্ট্যান্ডে  গিয়ে  জানতে  পারলাম  যে,  বেলা  দু’টোয়  বদ্রীনারায়ণগামী  বাস  ছাড়বে  এবং  ঐ  বাস  সন্ধ্যায়  শ্রীনগরে  হল্ট্  করবে।  সঙ্গে  সঙ্গে  বাসায়  ফিরে  এলাম।  দরজা  বন্ধ  করে  যত  তাড়াতাড়ি  সম্ভব  মালপত্র  গোছগাছ  করতে  লেগে  গেলাম।  প্রত্যেকটা  হোল্ড-অল্  এর  ভিতরে  কম্বলগুলো  পলিথিন  শীট্  দিয়ে  মুড়ে  নিলাম।  হোল্ড্-অলটাও  একটা  পলিথিন  কভারে  পুরে  ফেললাম।  বৃষ্টিতে  কম্বল  ভিজবার  আর  কোন  সম্ভাবনাই  থাকলো  না।  সব  সময়  প্রয়োজন  হতে  পারে,  এমন  সমস্ত  জিনিস,  সামান্য  করে  শুকনো  খাবার,  চিকলেটস্,  ইত্যাদি  একটা  সুটকেসে  নিয়ে,  সমস্ত  জিনিস  অপর  সুটকেস  দু’টোয়  ভরে  নিলাম।  টাকার  হিসাব  করতে  গিয়ে  আমরা  মহা  বিপদে  পড়লাম।  একটা  পাঁচ  টাকার  প্যাকেট,  অর্থাৎ  পাঁচশ’  টাকা, কোথাও  খুঁজে  পেলাম  না।  আবার  সমস্ত  সুটকেস  ঘেঁটে,  শেষ  পর্যন্ত  একটা  ওয়াটার প্রুফের  ভিতরে  সেটাকে  পাওয়া  গেল।  চটপট্  ভালো  করে  সাবান  মেখে  তিনজনে  স্নান  করে  নিলাম।  জানিনা  কবে  আবার  এ  সুযোগ  পাবো।  সব  কিছু  কাজ  শেষ।  মালপত্র  ঘরেই  রেখে,  দুপুরের  খাবার  খেতে  গেলাম।  কিছুক্ষণ  আগেই  চা-জলখাবার  খাওয়ায়  খিদে  নেই,  তবু  সামান্য  কিছু  ভাত,  ডাল,  তরকারি,  একটা  পাঞ্জাবি  হোটেলে  খেয়ে  নিলাম।  মনে  মনে  স্থির  করলাম,  এরপর   থেকে  সব  জায়গায়  রুটি  খাব।  কারণ  ভাত  খেলে  ঘুম  পায়  এবং  হাঁটতে  কষ্ট  হয়।

খাওয়া  হলে  গেলাম  বাসের  টিকিট  কাউন্টারে।  আমাদের  সামনে  একজন  পাঞ্জাবি  সাধু,  পাঁচটা  গোবিন্দঘাটের  টিকিট  কাটলেন।  আমাদেরও  ওখানকারই  টিকিট  প্রয়োজন।  গোবিন্দঘাট  থেকেই  নন্দন  কানন  ও  হেমকুন্ড  যাবার  হাঁটা  পথের  শুরু।  মোটামুটি  খোঁজখবর  নিয়ে,  আমরা  তিনটে  গোবিন্দঘাটের  টিকিট  কাটলাম।  ভাড়া  লাগলো  পঁচাশি  টাকা  পঞ্চাশ  পয়সা।  সামনের  রাস্তা  আমাদের  সকলেরই  অজানা। গাইড  ম্যাপ  ও  কিছু  লোকের  মুখের  কথার  ওপর,  আমাদের  সমস্ত  ট্যুরটার  ভবিষ্যৎ  নির্ভর  করছে।  নিজেদেরও  এই  জাতীয়  ভ্রমণ,  এই  প্রথম।  তাই  বোধহয়  আমরা  একটু  অস্বাচ্ছন্দ  ও  অস্বস্তি   বোধ  করতে  লাগলাম।  ঘরে  ফিরে  এসে  সমস্ত  মালপত্র  নিয়ে  বাসের  উদ্দেশ্যে  যাত্রা  করার  আগে  আমাদের  বাড়িওয়ালা  ভদ্রলোককে  বললাম, “বাসের  টিকিট  পেয়ে  গেলাম,  তাই  আর  অপেক্ষা  না  করে  আমরা  চলে  যাচ্ছি।  আপনি  যদি  ভাড়ার  ব্যাপারটা  একটু  কনসিডার  করেন,  তাহলে  খুব  উপকার  হয়”।  যে  ভদ্রলোক  কিছুক্ষণ  আগেও  আমাদের  বলেছিলেন,  এ  বাড়িটা  নাকি  আমাদেরই,  তিনিই  এখন  বললেন  এটাতো হোটেল,  তাই  একঘন্টা   বা  একদিনের  একই  ভাড়া।  বললাম  আমাদের  জোর  করার  কিছু  নেই,  তবে  আমরা   আবার  হৃষিকেশেই  ফিরে  আসবো  এবং  কয়েকদিন  এখানে  থেকে  বিশ্রাম  নেব।  তবু  কোন  লাভ  হলো  না,  পুরো  ভাড়াই  দিতে  হলো।

দিলীপকে  বাসে  চাপিয়ে,  সামনের  দিকে  দু’টো  সিট  রেখে,  মালপত্র  সব  বাসের  ছাদে  তুলে,  আমি  ও  মাধব  গেলাম  পয়েন্টেড  লাঠি  কিনতে।  ওটা  সঙ্গে  থাকলে  হাঁটার  কষ্ট  অনেক  কম  হবে।  তিনটে  ভাল  লাঠি  ছ’টাকা  দিয়ে  কিনে,  আমরা  বাসে  ফিরে  এসে  জায়গা  দখল  করে  বসলাম।  আরও  আধঘন্টা  পরে  বাস  ছাড়ার  কথা।  সময়  আর  কাটে  না।  আমাদের  সামনে  দু’টো  করে  দু’দিকে  সিট  আছে।  সেগুলো সমস্ত  পাঞ্জাবি  ভদ্রলোক  ও   ভদ্রমহিলা  দ্বারা  অধিকৃত।  একবারে  সামনে,  ড্রাইভারের  বাঁপাশে  একটা  সিঙ্গল্  সিটে,  সেই  পাঞ্জাবি  সাধুবাবা  বসে  আছেন।  বাকি  সমস্ত  পাঞ্জাবিরা  তাঁকে  খুব  সম্মান  দেখাচ্ছেন,  তাঁর  সুবিধা  অসুবিধার  দিকে  লক্ষ্য  রাখছেন।  আমাদের  ঠিক  পিছনেই  মধ্যপ্রদেশ  থেকে  আগত  একটা  দল,  যাবে  বদ্রীনারায়ণ।  এদের  সব  ভালো,  কিন্তু  এরা  বড়  নোংরা।  অনবরত  এদের  থুথু  ফেলতে  হয়।  থুথু  ফেলার  বহর  দেখে  মনে  হয়,  প্রত্যেকে  তার  দেহের  ওজনের  থেকে  বেশি  থুথু  সারাদিনে  ফেলে।  পিছনে  ডানদিকে  উত্তরপ্রদেশের  কয়েকজন  আছে।  বাদবাকির  খবর  জানতে  পারলাম  না।  এখনও  ড্রাইভার  বাসে  আসে  নি।  বাস  থেকে  নেমে  কিছুটা  হেঁটে,  নিজেদের  মন  ও  শরীরকে  একটু  চাঙ্গা  করে  নিলাম।  উত্তেজনায়  বারবার  জল  পিপাসা  পাচ্ছে।  বাসে  ফিরে  এসে  জানালার  ধারে  বসে  রইলাম।

পৌনে  দু’টো  নাগাদ  ড্রাইভার  বাসে  এসে  বসলো।  টিকিট  নিয়ে  কয়েকজনের  সঙ্গে  কন্ডাক্টারের  বিতর্ক  শুরু  হলো।  এত  বিরক্ত  লাগছে  কী  বলবো।  যাহোক্,  অনেক  দিনের  স্বপ্নকে  বাস্তবে  রূপ  দিতে,  বাস  ছেড়ে  দিল।  সেই  মুহুর্তের  কথা  ঠিক  বোঝাতে  পারবো  না।  ক্রমে  লছমনঝোলা  পুলকে  ডানপাশে  রেখে,  বাস  এগিয়ে  চললো।  অনেকেই  জোর  গলায়  ভগবানের  নাম  করতে  লাগলো।  প্রতি  মুহুর্তে  নতুন  নতুন  দৃশ্যকে  পিছনে   ফেলে,  বাস  গন্তব্য  পথের  দিকে  এগিয়ে  চললো।  আমার  পাশে  মাধব,  অপরদিকে  জানালার  ধারে  দিলীপ।  যত  ভালো  ভালো  দৃশ্য,  সব  যেন  ওর  দিকেই  রয়েছে।  ওর  পাশে  একজন  স্থানীয়  ভদ্রলোক।  তিনি  এই  পথের  নানা  জায়গা  সম্বন্ধে  দিলীপকে  নানা  কথা  বলছেন।

একসময় আমরা দেবপ্রয়াগ এসে পৌঁছলাম। খুব সুন্দর জায়গা। সন্ধ্যা নাগাদ আমরা গাড়োয়ালের রাজধানী, পাহাড়ী শহর  শ্রীনগর  এসে  পৌঁছলাম।  চটপট  বাসের  ছাদ  থেকে  মালপত্র  নামিয়ে,  সামনেই একটা  ছোট  হোটেলে  রাতে  থাকবার  কথা  বলতে,  হোটেল  মালিক  এক  অদ্ভুত  প্রস্তাব  দিলেন।  তিনি  ঘরের  ভিতরে  মালপত্র  রেখে,  আমাদের  রাস্তার  পাশে  বারান্দায়,  খাটিয়ায়   শোবার  ব্যবস্থা  করতে  বললেন।  এটা  মোটেই  স্বাস্থ্যকর  প্রস্তাব  বলে  মনে  হলো  না।  কী  করবো  ভাবছি।  সমস্ত  পাঞ্জাবিরা  চলে গেছেন  সামনের  গুরুদ্বোয়ারায়।  হঠাৎ  একজন  ভদ্রলোক  আমাদের  জিজ্ঞাসা  করলেন  আমরা  বাঙালি  কিনা।  ভদ্রলোক  স্থানীয়,  কেদারনাথের  পথে  ট্র্যান্সপোর্টে  কাজ  করেন।  আমরা  জানালাম  আমরা  বাঙালি, হাওড়ায়  থাকি।  ভদ্রলোক  বললেন  তিনি  কালীকমলি  ধর্মশালায়  আজ  রাতটা  থাকবেন,  আমরা  ইচ্ছে  করলে  ওখানেই  থাকতে  পারি।  এবার  ভদ্রলোককে  চিনতে  পারলাম।  উনি  আমাদের  সাথে  একই  বাসে  এসেছেন,  যাবেন  শ্রীনগর  ছেড়ে  আরও  কিছুটা  দুরে।  আমরা  তাঁর  সাথে  যেতে  রাজি হয়ে  গেলাম।  ধর্মশালায়  আমাদের  তিনজনকে  প্রথমে  থাকতে  দিতে  সম্মত  হলো  না।  ভদ্রলোককে  একটা  ঘর  অবশ্য  দিয়ে  দিল।  শেষে  ঐ  ভদ্রলোকের  অনুরোধে,  আমাদেরও  একটা  ঘর  ধর্মশালা  কর্তৃপক্ষ  দিতে  রাজি  হলো।  ভদ্রলোককে  ধন্যবাদ  জানাতে  তিনি  বললেন,  তিনি  বাঙালিদের  খুব  পছন্দ  করেন,  সাহায্য  করতে  চেষ্টা  করেন,  কারণ  একসময়  তিনি  মাস  ছয়-সাতেক  কলকাতায়   ছিলেন।  কলকাতায়  তাঁর  তিক্ত  অভিজ্ঞতার  কথা  শুনে,  নিজেদের  খুব  ছোট  মনে  হলো।  তাঁর  আন্তরিকতা  থেকে  বুঝলাম,  ভদ্রলোক  বাজে  কথা  বলছেন  না।  আমরা  বললাম  যে  তাঁর  ভাগ্য  খারাপ  ছিল,  তাই  তিনি  খারাপ  লোকের  পাল্লায়  পড়েছিলেন।  যদিও  জানি  “ঠগ  বাছতে  গাঁ  উজড়”  এর  মতো,  এই  শ্রেণীর  যুবক  বাছতে  শহর  উজার  হয়ে  যাবে।  যাহোক্,  ভদ্রলোক  সবসময়  আমাদের  সাথেই  থাকলেন  এবং  সঙ্গে  করে  সমস্ত  শ্রীনগর  শহর  ঘুরে  দেখালেন।  সন্ধ্যার  শ্রীনগর  বড়  সুন্দর।  আজ  আবার  স্বাধীনতা  দিবস।  অনেক  জায়গা  নানাভাবে  সাজানো  হয়েছে।  আলাপ  হলো  এক  মিলিটারি  ভদ্রলোকের  সাথে।  রাতে  আমরা  পাঁচজন  একসাথে  একটা  হোটেলে  আহার  করলাম।   দাম  অবশ্য  আমরাই  দিলাম।  ভদ্রলোক  রাতে  ঘুমতে  যাবার  আগে  আমাদের  ঠিকানা  নিলেন,  নিজের  ঠিকানাও  দিলেন।  আমরা   হোল্ড-অল্  খুলে  শুয়ে  পড়লাম।

আজ  ষোলই  আগষ্ট।  ভোরবেলা  তৈরি  হয়ে  মালপত্র  নিয়ে  বাসে  গেলাম।  বাসের  ছাদে  মালপত্র  সাজিয়ে  রেখে  এসে  নিজের  সিটে  বসতে,  পাঞ্জাবি  সাধুবাবা  আমায়  জিজ্ঞাসা  করলেন,  আমরা  গতকাল  কেন  তাঁদের  সাথে  গুরুদ্বোয়ারাতে  উঠলাম  না?  বিড়ি-সিগারেট  খাওয়ার  অসুবিধার  জন্যই  কী?  গুরুদ্বোয়ারায়  ধুমপান  নিষেধ।  আমি  কী  উত্তর  দেব  ভেবে  না  পেয়ে  বললাম  যে,  তাঁদের  সঙ্গে  অনেক  লোক,  গুরুদ্বোয়ারায়  হয়তো  জায়গা  হবে  না।  তাই  আমরা  ওখানে  না  গিয়ে,  অন্যত্র  উঠেছিলাম।  অন্য  কোন  অসুবিধার  কথা  ভেবে  নয়।  সাধুবাবা  বললেন,  যত  লোকই  আসুক,  গুরুদ্বোয়ারায়  জায়গা  হবেই,  খাওয়ার  ব্যবস্থাও  হবে।  আমাদের  ধারণা  ভ্রান্ত।  বললাম  এরপর  থেকে  তাঁদের  সঙ্গে  গুরুদ্বোয়ারাতেই  থাকবো।  বলবার  একমাত্র  কারণ,  গোবিন্দঘাটে  একটা   গুরুদ্বোয়ারা  ছাড়া,  কোন  হোটেল  বা   থাকবার  জায়গা   নেই।  এঁরা  অসন্তুষ্ট  হলে  যদি  সেখানে  স্থান  না  পাই?  বাধ্য  হয়ে  আমরাও  তাঁকে  একটু  আলাদা  সম্মান  দেখিয়ে  কথা  বলতে  শুরু  করলাম।

বাস  আস্তে  আস্তে  একসময়  রুদ্রপ্রয়াগ  এসে  পৌঁছল।  আমরা  বাস  থেকে  নেমে,  চা-জলখাবার  খেয়ে  নিয়ে, জায়গাটা  এক  চক্করে  দেখে  নিলাম।  জায়গাটা  খুব  সুন্দর,  অলকানন্দা  ও  মন্দাকিনী  নদী  এখানে  মিশেছে।  তবে  একটা  কথা  বারবার  মনে  হচ্ছিল।  জিম  করবেট্  এর  “রুদ্রপ্রয়াগের  চিতা”  পড়েছি।  কত  বছর  আগেকার  ঘটনা।  জায়গাটা  এখনই  এই,  তাহলে  তখন  কী  ছিল?  করবেট   সাহেব  কিভাবে  ঐ  রকম  একটা  হিংস্র  চিতাকে  এখানে  মেরেছিলেন,  ভাবতেও  অবাক  লাগে।  মনে  হয়,  হয়  চিতাটা  স্বেচ্ছায়  তাঁর  হাতে  প্রাণ  দিয়েছিল,  না  হয়  করবেট  সাহেব  “অমনিপ্রেজেন্ট্”  ছিলেন।

কমে  গৌচর,  কর্ণপ্রয়াগ,  নন্দপ্রয়াগ  অতিক্রম  করে  আমাদের  বাস  এগিয়ে  চললো।  ড্রাইভারের  হাত  খুব  ভালো,  তবে  বড়  ওভারটেক  করার  নেশা।  বাস  চামোলী  নামে  একটা  জায়গায়  এসে  দাঁড়িয়ে  গেল।  সামনে  ধস  নেমেছে।  একটা  বুলডোজার  দেখলাম  রাস্তা  পরিস্কারের  জন্য  প্রস্তুত।  কিছুক্ষণের  মধ্যেই  রাস্তা  পরিস্কার  হয়ে  যাওয়ায়,  বাস  আবার  ছাড়লো।  কন্ডাক্টারের  কাছে  জানতে  পারলাম  সামনেই  পিপলকোঠি,  ওখানেই  দুপুরের  খাবারের  ব্যবস্থা  করে  নিতে  হবে।  ঠিক  সময়  বাস  এসে  নির্দিষ্ট  জায়গায় দাঁড়ালে,  আমরা  তিনজন  চটপট্  বাস  থেকে  নেমে,  সামনেই  একটা   ছোট্ট   হোটেলে  রুটি  তরকারির  অর্ডার  দিলাম।  একটু  পরেই  আমাদের  বাসের  পাঞ্জাবিরা  এসে  ঐ  হোটেলে  জায়গা  করে  নিল।  একসাথে অত  খদ্দের  পেয়ে,  দোকানদার  তাদের  আগে  খাবার  পরিবেশন  করা  নিয়ে  ব্যস্ত  হয়ে  পড়লো।  আমরা  বসেই  আছি।  শেষে  রাগ  করে  উঠে  গিয়ে  একটু  দুরেই  অন্য  একটা   ছোট   হোটেলে  রুটি,  সবজি  আর  টক  দই  খেয়ে  নিয়ে  বাসে  ফিরে  এলাম।  একটু  পরেই  বাস  ছেড়ে  দিল।  কিন্তু  সামান্য  এগিয়েই  বাস  থেমে  গেল।  বুঝলাম  আবার  পাহাড়  নেমে  এসেছে।  দেখলাম  দশ-বার  বৎসরের  কয়েকটা  বাচ্চা  ছেলে,  রাস্তা  পরিস্কার  করছে।  ভাবলাম  এত  বাচ্চাদের  দিয়ে  কাজ  হচ্ছে,  আর  হয়তো  আজ  এগিয়ে যাওয়া  যাবে  না।  কিন্তু  আশ্চর্য,  অল্পক্ষণের  মধ্যেই  ওরা  ওদের  ক্ষমতার  পরিচয়  দিল।  বাস  আবার  এগিয়ে  চললো।

কিন্তু হায় !  আমাদের  কপাল  সত্যিই  খুব  খারাপ।  দুর  থেকে  দেখলাম  লাইন  দিয়ে  বাস,  জীপ,  ট্রাক  দাঁড়িয়ে।  আমাদের  বাস  অনেকগুলো  গাড়িকে  কাটিয়ে,  একবারে  সামনের  দিকে  গিয়ে  দাঁড়ালো।  শুনলাম সামনে  এমন  ধস  নেমেছে,  যে  হেঁটেও  যাওয়া  সম্ভব  নয়।  ঘড়িতে  এখন  দুপুর  দু’টো  বাজে।  ধসটা  একটা  বাঁক  পেরিয়েই  দেখতে  পেলাম।  ওপর  থেকে  বিরাট  বড়  বড়  পাথর  রাস্তার  ওপর  পড়ে,  রাস্তাকে  নিয়ে  তলায়  চলে  গেছে।  একজন  পাঞ্জাবি  মিলিটারির  তত্বাবধানে  বেশ  কিছু  আগের  মতো  বাচ্চা,  রাস্তা পরিস্কারের  কাজ  করছে।  ধসটার  অপর  দিকে  হেলং  নামে  একটা  শহর।  ধসের  ওপারে  কতগুলো  বাস  দাঁড়িয়ে  আছে  জানি না,  তবে  আমাদের  এদিকে  বাস,  জীপ  ও  ট্রাক  মিলে  প্রায়  চল্লিশটা  গাড়ি  লাইন  দিয়ে  দাঁড়িয়ে  আছে।  আমাদের  বাসের  আমরা  তিনজন  ও  কয়েকজন  পাঞ্জাবি  ভদ্রলোক,  ঐ  মিলিটারিটাকে  জিজ্ঞাসা  করলাম,  আমরা  কাজে  হাত  লাগাবো  কী না।  কিন্তু  কেন  জানি না,  আমাদের  কোন  কাজে  হাত  লাগাতে  দেওয়া  হলো  না।

       হেলং                     

আসবার  পথে  অনেক  ঝরনা  দেখেছিলাম।  ভাবলাম  এই  ফাঁকে  আমাদের  তিনটে  ওয়াটার  বটল্  ভরে  নিয়ে  আসি।  কিন্তু  এখানে  দেখলাম  কাছেপিঠে  কোন  ঝরনা  নেই।  অনেক  লোক  বালতি,  হাঁড়ি,  ডেকচি,  নিয়ে  ইতস্তত  ঘুরে  বেড়াচ্ছে।  উদ্দেশ্য  একই,  খাবার  জল  সংগ্রহ  একান্ত  প্রয়োজন।  বেশ  কিছুটা  এগিয়ে  দেখলাম,  একটা  পাথর  জলে  ভিজে  রয়েছে।  খুব  সরু  একটা  জলের  ধারা  ঐ  পাথরটার   ওপর  দিয়ে  গড়িয়ে  রাস্তায়  পড়ছে।  একজন  পাথরটার  ওপর  একটা  গাছের  পাতা   এমন  ভাবে  পেতে  দিল,  যে  ঐ  সরু  জলধারা  পাথরের  ওপর  দিয়ে  গড়িয়ে  না  পড়ে,  পাতার  ডগা  দিয়ে  টপটপ্  করে  পড়তে  শুরু  করলো।  সেই  পাতা  থেকে  নিজেদের  বালতি,  হাঁড়ি  ভরে  নেবার  জন্য  অনেক  লোকের  ভিড়।  আমি  এগিয়ে  গিয়ে  আমার  দামি  ভাঙ্গা  ভাঙ্গা  হিন্দীতে  ওদের  বললাম,  “এত  লোক,  আর  এই  সামান্য  জল।  প্রত্যেকে  অল্প  অল্প  করে  জল  নাও”।  ওদের  সকলের  মধ্যে  আমার  জামাকাপড়  একটু  পরিস্কার  পরিচ্ছন্ন  বলে,  ও  চেহারা,  চালচলন  একটু  শহুরে  বলেই  বোধহয়,  ওরা  আমাকে  আগে  জল  নিতে  দিল।  প্রথমে  ভেবেছিলাম  আধ  ওয়াটার  বটল্  জল  ভরে  নেব।  কিন্তু  বিকেল  হয়ে  আসছে,  বাস  আজ  আর  ছাড়বার  আশা  খুবই  কম।  সঙ্গে  খাবার  বলতে  এক  শুকনো  চিড়ে  আছে।  ফলে  জল  অনেক  বেশি  প্রয়োজন।  আমার  ওয়াটার  বটল্  ভর্তি  হয়ে  গেলে,  দিলীপকে  ওর  বটলটা  ভরার  জন্য  দাঁড়  করিয়ে  দিলাম।  ইতিমধ্যে  মাধবও  তার  বটল্  নিয়ে  এসে  হাজির।  তিনজনের  বটলই  একরকম  দেখতে,  ফলে  ওরা  বুঝতে  পারবে  আমরা  একই  দলের   লোক।  তবু  মাধবকে  খুব  আস্তে  বললাম,  কোন  কথা  না  বলে  চুপচাপ  জল  ভরে  নিতে।

তিনজনের  ওয়াটার  বটল্  জলে  ভর্তি,  সঙ্গে  যথেষ্ট  চিড়ে  আছে।  কাজেই  চিন্তা  অনেক  কমে  গেল। চারিদিকে  খাবার  জলের  জন্য  হাহাকার।  বন্ধুদের  বললাম,  যে  যার  বটল্  নিজের  কাছে  রাখতে।  বাসে  রেখে  গেলে  অন্য  লোকে  এগুলো  ফাঁকা  করে  দেবার  সম্ভাবনা  যথেষ্ট।  ধীরে  ধীরে  সন্ধ্যা  নেমে  আসছে। অনবরত  ডিনামাইট  দিয়ে  পাথর   ভেঙ্গে  রাস্তা  পরিস্কারের  কাজ  চলছে।  অজানা  ভবিষ্যৎকে  প্রকৃতির  হাতে  ছেড়ে  দিয়ে,  একবার  বাস  একবার  ধস  করে  বেড়াচ্ছি।  সমস্ত   টাকা  পয়সা  বাসের  সিটে, সুটকেসে  রাখা  আছে।  ওয়াটার  বটলগুলো  আর  বয়ে  বেড়াতে  ভালো  লাগছে  না।  তাই  ওগুলোকে  বাসেই  রেখে   এলাম।  রাস্তায়  এক  বৃদ্ধ  ভদ্রলোকের  সাথে  আলাপ  হলো।  তিনি  কেদারনাথ  থেকে  বদ্রীনারায়ণ  চলেছেন।  কোন  একটা  বাসে  তাঁর  বৃদ্ধা  স্ত্রী  রয়েছেন।  ভদ্রলোক  বললেন  সারাদিন  তাঁদের  কিছুই  খাওয়া  হয়  নি।  একটু  খাবার  জলের  জন্য  ভদ্রলোক   খুব  ব্যস্ত।  গলার  স্বর  কাঁপছে।  শুনে  খুব  খারাপ  লাগছিল,  কিন্তু  প্রাণে  ধরে  একটু  জলও  তাঁকে  দিতে  পারলাম  না।

এরমধ্যে  ঠিক  হলো,  এদিকের  যাত্রীদের  ওদিকের  বাস  নিয়ে  যাবে,  ওদিকের  যাত্রীদের  এদিকের  বাস।  একটা  আশার  আলো  দেখা  গেল।  কিন্তু  সমস্যা  হলো,  এই  রাস্তায়  তিন-চার  রকম  কোম্পানীর  বাস  চলে।  একই  কোম্পানীর  বাস  দু’দিকে  থাকলে,  তবেই  এ  ব্যবস্থা  করা  যেতে  পারে।  আমরা  এ  সুযোগ পেলাম  না।  বেশ  কিছু  যাত্রী  মালপত্র  নিয়ে  এপার-ওপার  করতে  আরম্ভ  করে  দিল।  ফলে  রাস্তা  পরিস্কারের  কাজে  বিলম্ব  হতে  শুরু  করলো।  শেষে  মিলিটারি  ভদ্রলোক  ঘোষণা  করলেন,  আজ  আর  কাজ  করা  সম্ভব  নয়।  আগামীকাল  সকালে  আবার  কাজ  আরম্ভ  হবে।  আকাশও  কালো  মেঘে  ঢেকে  গেছে।  আমরা  বুঝতে  পারছি  এভাবে  চললে  খুব  বেশি  হলে  নন্দনকানন,  হেমকুন্ড  সাহেব,  কেদারনাথ,  ও বদ্রীনারায়ণ  যাওয়া  হবে।  গঙ্গোত্রী,  গোমুখ,  যমুনোত্রী  যাবার  সম্ভাবনা  খুব  কম।  মনটা  খারাপ  হয়ে  গেল।  বাসে  ফিরে  এলাম।  আসবার  সময়  দেখলাম  মহিলারা  রাস্তার  ওপর  স্টোভ  জ্বেলে  লুচি,  সুজি  তৈরি  করতে  শুরু  করে  দিয়েছে।  বাস  ড্রাইভার  বাসের  যাত্রীদের  বললো,  পিছনে  তিন  কিলোমিটার  দুরে  “লংসী”  নামে  একটা  গ্রাম  পাওয়া  যাবে।  ওখানে  গেলে  রাতে  থাকার  ও  খাবার  ব্যবস্থা  করা  যাবে।  এ রাস্তায়  রাতে  বাসে  থাকার  নিয়ম  নেই,  উচিৎও  নয়।  খবরটা শুনে  বাসের  সব  যাত্রীই  খুব  খুশি  হলো।

বাসটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে কথামতো লংসী গ্রামে আসা হলো। রাস্তায় দু’টো বড় ও একটা ছোট ঝরনা দেখলাম। গ্রাম মানে  দু’টো   ছোট  চায়ের  দোকান।  অন্ধকারে  বোঝা  যাচ্ছে  না,  হয়তো  কিছু  জনবসতি থাকতেও  পারে।  একটা  দোকানে  চা  আর  পকোড়া খেয়ে  নিলাম।  আজ  বুঝলাম  খিদে  পেলে  ঠান্ডা  ন্যাতনেতে  পকোড়াও  কত  উপাদেও  হয়।  যাহোক্,  পনের  টাকা  ভাড়ায়,  একটা  মাত্র  ঘর  পাওয়া  গেল। সে  ঘরে  দাঁড়িয়ে  থাকলেও,  বাসের  অর্ধেক  লোকের  জায়গা  হবে  না।  ফলে  সে  ঘরে  কেউই  থাকতে  রাজি হলো  না।  ঠিক  হলো  সবাই  রাস্তায়  ও  বাসেই  রাতটা  কাটিয়ে   দেবে।  বুঝতে  পারছি  বিপদে  পড়ে  আমরা  কখন   যেন  একই  পরিবারের  সদস্য  হয়ে  উঠেছি।

আমরা  তিনজন  আবার  হেলং  এর  দিকে  হাঁটতে  শুরু  করলাম।  আসার  পথে  ওদিকে  ঝরনা  দেখে  এসেছি।  কাল  সকালে  সূর্যালোকে  এখানে  সকালের  কাজ  সারতে  অসুবিধা  হতে  পারে,  কাজেই  এই  সময়  কাজটা  সেরে  ফেলার  চেষ্টা  করে  দেখা  যেতে  পারে।  ঝরনার  আশায়  প্রায় দেড়-দুই  কিলোমিটার  পথ  হেঁটে  এসেও,  ঝরনাগুলো  দেখতে  পেলাম  না।  এই  অন্ধকারে  আর  এগিয়ে  যেতেও  সাহস  হলো  না।  রাস্তার  ধার  দিয়ে  নালার  মতো  জল  যাচ্ছে।  বোধহয়  আমাদের  দেখা  ঝরনারই  জল।  রাস্তার  ধারে  তিনজন  লাইন  দিয়ে  বসে  পড়লাম।  পাশ  দিয়ে  গোটা  দু’তিন  মিলিটারি  জীপ  ফিরে  গেল।  আমরা  কাজ সেরে  বাসের  কাছে  ফিরে  এসে  দেখি,  তিনজন  পাঞ্জাবি  ভদ্রমহিলা  ও  একজন  পাঞ্জাবি  ভদ্রলোক,  বাসের  পাশে  বড়  একটা  পলিথিন  শীট্   পেতে  শুয়ে  আছেন।  ঐ  পরিবারের  আর  একজন  ভদ্রলোকের  সাথে  আলাপ  হলো,  নাম  তীরথ  সিং।  স্টেট  ব্যাঙ্ক  অফ্  পাতিয়ালায়  কাজ  করে,  পাতিয়ালাতেই  থাকে।  তার  কথাবার্তায়  বুঝলাম,  ভদ্রলোকের  অগাধ  পয়সা।  সে  জানালো  তার  সঙ্গে  তার  মা,  বোন,  ও  ভগ্নিপতি  আছে।  যাবে  হেমকুন্ড  সাহেব।  আমরা  জানালাম  আমরাও  হেমকুন্ড  যাব, নন্দনকাননও  যাব।  তীরথ  জানালো  তার  খুব  নন্দনকানন দেখবার   ইচ্ছা।  কিন্তু  আর  সব  পাঞ্জাবিরা  হেমকুন্ড  দেখে  ফিরে  আসবে।  আমরা  তাকে  আমাদের  সঙ্গে  যাবার  সুযোগ দিলে,  তার  ইচ্ছাপুরণ  হয়।  মা,  বোন,  ও  ভগ্নিপতি  ঘাঙরিয়া  গুরুদ্বোয়ারায়  থাকবেন।  ভগ্নিপতি  খুব  অসুস্থ,  তার  হাত,  পা,  সবসময়  কাঁপে।  আমরা  তাকে  আমাদের  সঙ্গে  নিতে  রাজি  হয়ে  গেলাম।

এইসব  জায়গা,  তার  দেশ,  তার  পরিবার,  আরও  বিভিন্ন  বিষয়  নিয়ে,  তার  সাথে  অনেক  কথা  হলো।  তীরথ  জানালো,  রাতে  সে  বাসের  নীচে  শোবে।  তাহলে  বৃষ্টি  আসলেও  ভিজবে  না,  বা   কোন  ক্ষতি  হবে  না।  ওর  বুদ্ধি   দেখে  অবাক  হয়ে  বললাম,  “রাস্তা   তো  ঢালু,  বৃষ্টি  হলে  ওপর  থেকে  বৃষ্টির  জল  গায়ে  পড়বে  না  বটে,  কিন্তু  ঢালু  রাস্তা  দিয়ে  জল  গড়িয়ে  যাবার  সময়  তুমি  তো  পুরো  ভিজে  যাবে”।  ও  কিছুক্ষণ   বোকার   মতো   তাকিয়ে  থেকে   হেসে  ফেললো।  কিছুক্ষণের  মধ্যেই  বৃষ্টি  নামলো।  বাসের  সবার খাওয়া  হয়ে  গেছে।  বৃষ্টিও  খুব  জোরে  হচ্ছে।  চট্  করে  বাস  থেকে  নেমে,  পাশেই  দোকানে  রাতের  খাবার  খেতে  যাওয়ার  জন্য   দৌড়  লাগাবো,  একজন  খৈনি  খেয়ে  জানালা   দিয়ে  থুথু   ফেললো,  ঠিক  আমার  ঘাড়ে,  গলা  ও  জামার  কলারের  মাঝখানে।  ভীষণ  রাগ  হয়ে   গেল।  কিন্তু  এই  বৃষ্টিতে  ঝগড়া  করার  সুযোগ  নেই,  মুডও  নেই।  দেখলাম  একটা  কালো  কোট  পরে  একজন  জানালার  ধারে  বসে  আছে।  ঠিক  করলাম  ফিরে  এসে  ব্যবস্থা  করা  যাবে।  ঐ  বৃষ্টিতে  আমার  জামার  কলার  ও  ঘাড়  ভালো  করে  ধুয়ে  ফেললাম।  পুরি  ও  তরকারি  খেয়ে  ছুটে  বাসে  ফিরে  এসে  দেখি,  জানালার  ধারে  কেউ  বসে  নেই।  অপর  দিকের  সিটে  তিনজন  কালো  কোট  পরে  বসে  আছে।  চিনতে  পারলাম  না,  কে  সেই  অপদার্থ।  আস্তে  আস্তে  সবাই  বাসে  ফিরে  এলো।  ঘুম  আসার   কোন  সম্ভাবনা  নেই।  কালও  যাওয়া  হবে  কিনা  সন্দেহ।  মহিলারা  দিব্বি  ম্যানেজ  করে  বাসের  মেঝেতে  বা  তিনজনের  জন্য  বসার  পিছনের  দিকের  সিটে  শুয়ে  পড়েছে।  আমি  আর  মাধব  আমাদের  নিজেদের  সিটে  বসে।   দিলীপ  অপর  দিকে  তার  নিজের  সিটে।  একটু কাত  হবো,  তার  উপায়  পর্যন্ত  নেই।  আমাদের  সামনের  সিটে,  এক  পাঞ্জাবি  ভদ্রমহিলা   মেঝেতে  একটা   বোঁচকা   পেতে   সিটটাকে  লম্বা  করে   নিয়ে,  পরম  সুখে  শুয়ে  নাক  ডাকাচ্ছেন।  সামনের  সিটের  ওপর  দিয়ে  হান্টার  শূ  পরা  পাদু’টো  ঝুলিয়ে  দিয়ে,  একটু  কাত  হয়ে  চোখ  বুজবার  চেষ্টা  করলাম।  বোধহয়  একটু  তন্দ্রা  মতো  এসেছিল,  হঠাৎ  ঘুমটা  ভেঙ্গে  গেল।  দেখি  আমার  হান্টার  শূ  পরা  শ্রীচরণদু’টো  সামনের  সিটের  ভদ্রমহিলার  পেটের  ওপর।  তাড়াতাড়ি  উঠে  সোজা  হয়ে  বসলাম।  পিছনের  সিটের  কালো  কোট  পরা  মধ্যপ্রদেশের  লোকগুলো,  এবং  তাদের  সঙ্গী  কতগুলো  মহিলা,  অকারণে  বিকট  শব্দ  করে  হাসছে।  সাধারণ  কথায়  এত  বিপদেও  কিভাবে  তাদের  এত  হাসি  পাচ্ছে  কে  জানে।  একবার  সোজা  হয়ে  বসে,  একবার  সামান্য  কাত  হয়ে,  সময়  কাটাতে  লাগলাম।  সব  কিছুরই  একটা  শেষ  আছে,  রাত্রিও  ক্রমে  শেষ  হয়ে  ভোর  হয়ে  এল।

ভোরের আলোয় দেখলাম, জায়গাটা খুব সুন্দর। একটা মিলিটারি ভাঙ্গাচুরা জীপকে একটা মিলিটারি ট্রাক টেনে নিয়ে যাবার  জন্য  প্রস্তুত।  দিন  দু’এক  আগে  নাকি  একটা  বাসের  সাথে  ধাক্কায়,  জীপটার  এই  হাল  হয়েছে।  জীপের  ড্রাইভার  আলমোড়ার  লোক।  বাসের  ধাক্কায়  জীপটা  একটা  ছয়-সাত  ফুট  গর্তে  পড়ে  যায়।  বাসের  সামনের  চাকা  জীপের  ছাদে  উঠে  গিয়ে  আটকে  যাওয়ায়, গভীর  খাদে  পড়া  থেকে  রক্ষা  পায়।  জীপের  ড্রাইভার  অজ্ঞান  হয়ে  গেলেও,  বিশেষ  কোন  আঘাত  পায়  নি।

এদিক  ওদিক  ঘুরে  ঘুরে  সময়  কাটছে।  অদ্ভুত  একটা  বেগুনি  রঙের  চার  পাপড়ির  ফুল,  চারিদিকে  ফুটে  আছে।  অনেকটা  প্রজাপতির  মতো  দেখতে।  এর  আগে  সমস্ত  রাস্তায়  হালকা  বেগুনি  রঙের  দোপাটির  মতো  একরকম  ফুল  দেখে  আসছিলাম।  এখানে  সে  ফুল  দেখছি  না।  সকাল  ন’টার  সময়  আমরা  দোকানটায়  খাবার  খেতে  গেলে,  দোকানদার  জানালো  পুরি  আর  তরকারি  পাওয়া  যাবে।  আটা  মাখার  সময়  লক্ষ্য  করলাম,  অজস্র  সাদা  রঙের  ছোট  ছোট  পোকা,  আটার  মধ্যে  মনের  সুখে  সংসার   পেতেছে।  অনেকটা  শুঁয়ো  ছাড়া  বাচ্চা  শুঁয়োপোকার  মতো  দেখতে।  দু’চারটে  আটা  থেকে  বেছে  বেছে  বাইরে  ফেলে  বুঝলাম,  বৃথা   চেষ্টা  করছি।  আটার  থেকে  সম্ভবত  পোকার  পরিমান  বেশি।  ওখান  থেকে  উঠে  এলাম।  পুরি  তৈরি  হলে  গরম  গরম  “আমিষ  পুরি”,  তরকারি  সহযোগে  খেতে  বাধ্য  হলাম। খাবারের  দাম  দেবার  সময়  দোকানদার  আমাদের  থেকে  দাম  নিতে  চাইলো  না,  কারণ  আমরা  নাকি  কিছুই  খাই  নি।  সে  বললো,  এত  অল্প  খাবারের  জন্য  আর  কী  দাম  নেব?  দাম  দিতে  হবে  না।  তাকে  জোর  করে  দাম  দিয়ে  ভাবলাম,  আমরা  ভারতবর্ষেই  আছি  তো?

যাহোক্,  বেলা  দশটা   নাগাদ,  আমরা  আবার  সেই  ধসের  কাছে  এলাম।  ড্রাইভারের  দক্ষতায়  এবারও  আমরা  প্রায়  সবার  আগেই  রইলাম।  চারিদিকে  মহিলারা  স্টোভে  খাবার  তৈরি  করছে।  এরা  সমস্ত  রাত  এখানেই  ছিল।  মাত্র  দু’টাকা  কিলোগ্রাম  দরে  একরকম  স্থানীয়  আপেল,  রাস্তার  পাশে  পাশে  প্রচুর  বিক্রি  হচ্ছে।  অনেক  বাস  আটকে  আছে  বলে  ওরা  এখানে  এসে  জুটেছে।   কিছুটা  সংগ্রহ  করে  রাখলাম।  খুব  হাল্কা  বৃষ্টি  আরম্ভ  হলো।  আজ   কিন্তু  কালকের   সেই  মিলিটারি  পাঞ্জাবি  ভদ্রলোক,  আমাদের   রাস্তা   পরিস্কারের  কাজে  হাত  লাগাতে  অনুমতি   দিলেন।  শুরু  হলো  বৃষ্টিতে  ভিজে  খাদে  পাথর   ঠেলে  ফেলা।  রাস্তা  থেকে  ঠেলে  ফেলা  পাথর,  তলায়  অনেক  নীচে  নদীতে  গড়িয়ে  পড়ছে।  উঃ!  সে  কী  ভয়ঙ্কর  শব্দ। এখানেই   দেখলাম  তীরথ  সিং  এর  ক্ষমতা।  আমরা  সবাই  কাজ  করছি।  তবু  তার  ক্ষমতার  তুলনা  হয় না।  একটা  শাবল  দিয়ে  পাথর  ভেঙ্গে,  একা  খাদে  ঠেলে  ফেলছে।  বেলচা  দিয়ে  রাস্তা  পরিস্কার  করছে।  মাঝে  মাঝে  ডিনামাইট্  দিয়ে  বড়  বড়  পাথর  ভাঙ্গা  হচ্ছে।  তখন  আমাদের  ঐ  জায়গা  থেকে  অনেক  দুরে  চলে  যেতে  বলা  হচ্ছে।  লম্বাটে  গোলাকার  ধুপকাঠির  প্যাকেটের  মতো  পাঁচ-সাতটা  জিনিস,  একসঙ্গে  তার  দিয়ে  জড়িয়ে  বড়  বড়  পাথরের  ওপর  রাখা  হচ্ছে,  এবং  পাহড়ের  ধার  থেকে  ভিজে  মাটি  নিয়ে  তার  ওপর  ভালো  করে  চাপা  দিয়ে   ঢেকে  দেওয়া  হচ্ছে।  এরকম  অনেকগুলো  বান্ডিল  বিভিন্ন বড়  বড়  পাথরের  ওপর  রেখে, প্রত্যেকটার  সঙ্গে  তার  যোগ  করে,  বেশ  কিছুটা  দুর  থেকে  ওই  মিলিটারি পাঞ্জাবি  ভদ্রলোক  ওগুলোকে  ব্লাষ্ট্  করাচ্ছেন।  আমার  মনে  হলো  পাথরগুলো  ভাঙ্গতে  গেলে ডিনামাইটগুলো তো  বড়  পাথরের  তলায়  রাখা  উচিৎ,  তাছাড়া  বারুদ  জাতীয়  যেকোন  জিনিস  তো  রোদে  দেওয়া  হয়, যাতে  সেগুলো  ভালোভাবে  ফাটে।  এ  ক্ষেত্রে  বান্ডিলগুলো  পাথরের  ওপর  রেখে,  পাঁক  জাতীয়  কাদামাটি  চাপা  দেবার  কারণ  কী  ভদ্রলোককে  জিজ্ঞাসা  করায়,  তিনি  শুধু  বললেন  এটাই  সিস্টেম।  ওগুলো  কী ভাবে  ভদ্রলোক  ব্লাষ্ট  করাচ্ছেন  দেখার  খুব  ইচ্ছা  থাকলেও,  অনেক  দুরে  গিয়ে  তাঁর  নির্দেশে  দাঁড়াতে  হচ্ছে।  বৃষ্টির  মধ্যে  প্রথমবার  তাঁর  নির্দেশে  অনেকটা  দুরে  মনক্ষুন্ন  হয়ে  রাস্তার  ধারে  দাঁড়িয়ে,  ঘাড়  উচু  করে,  তিনি  কিভাবে  ব্লাষ্ট  করাচ্ছেন  দেখবার  চেষ্টা  করছি।  একটু  পরে  দেখি  তিনি  বাঁশি  বাজিয়ে  আমাদের  আরও  দুরে  চলে  যেতে  বলে,  নিজে  দৌড়ে  অনেকটা  দুরে  গিয়ে  দাঁড়ালেন।  আমরা  অপেক্ষা  করছি।  বেশ  কিছুক্ষণ  পরে  খাদের  ওপারের  পাহাড়  থেকে  মনে  হলো  বিকট  একটা  বোমা  ফাটার  আওয়াজ  হলো।  আমরা  চমকে  উঠতেই, আমাদের  ঠিক  পাশে  উচু  পাহাড়টা   থেকে  আবার  সেই আওয়াজ।  মনে  হলো  খাদে  পড়ে  যাব।  সঙ্গে  সঙ্গে  আবার  খাদের  ওপার   থেকে  আওয়াজ।  এইভাবে  বেশ  কয়েকবার  প্রতিধ্বনি  হয়ে  সব  নীরব।

যাহোক,  ডিনামাইট  দিয়ে  ব্লাষ্ট  করাবার  পরে  আমরা  এগিয়ে  এসে  আবার  সেই  ভাঙ্গা  পাথর  তলায়  ফেলছি,  ফেলছি  কিন্তু  নিজেদেরই  স্বার্থে।  যত  তাড়াতাড়ি  রাস্তা  পরিস্কার  হবে,  তত  তাড়াতাড়ি  আমরা  এই  মরণফাঁদ  থেকে  মুক্তি  পাব।  বৃষ্টি  আবার  বেশ  জোরে  নামলো।  আমরা  পাথরের  আড়ালে  দাঁড়িয়ে  নিজেদের  বৃষ্টির  হাত  থেকে  বাঁচাবার  চেষ্টা  করছি।  জামাপ্যান্ট  ভিজছে,  তবে  খুব  অল্প।  তীরথ  কিন্তু  বৃষ্টিতেও  কাজ  করে  গেল।  ইচ্ছা  থাকলেও  আমাদের  কাজ  করার  উপায়  নেই।  কারণ  আমাদের  সঙ্গে  অতিরিক্ত  জামাপ্যান্ট  নেই।  পাঞ্জাবিরা  অনেক  বেশি  পরিশ্রম  করলো।  আমাদেরও  হাতের  অনেক  জায়গায়  কেটে  গেছে।  কিন্তু  মুশকিল  হলো, পাথর  যত  তলায়  ঠেলে  ফেলা  হচ্ছে,  সেগুলো  তত  ভাঙ্গা  রাস্তাকে  সঙ্গে  করে  নিয়ে  তলায়  নামছে।  ফলে  ওই  জায়গার  রাস্তা  আরও  সরু  হচ্ছে।  এবার  একজন  স্থানীয়  ছেলে  খাদের  দিকে  কিছুটা  নেমে,  ভাঙ্গা  রাস্তার  খাদের  দিকটায়,  কী  অদ্ভুত  কায়দায়  পাথরের  দেওয়াল  তৈরি  করে  দিল।  এটাকে  এখানকার  লোকেরা   দেখলাম  “পাক্কা  রাস্তা”  বলে।  রাস্তা  একটু  পরিস্কার  হতেই,  ধসের  ওদিক  থেকে  গোটা   দু’তিন   মোটর  সাইকেল,  এপারে  আমাদের  দিকে  চলে  এলো।  প্রতি  মোটর  সাইকেলে  দু’জন  করে  যুবক  যাত্রী,  হাতে  একগোছা  ফুল।  শুনলাম  এগুলোই  নাকি  ব্রহ্মকমল।  কী  আনন্দই  যে  হলো,  আমরা  তাহলে  ফুলের  দেশে  প্রায়  এসে  গেছি।

শেষ  পর্যন্ত  বিকেল  সাড়ে  চারটের  সময়, আমাদের  দিক  থেকে  প্রথম  একটা  মিলিটারি  জীপ, ওপারে গিয়ে  রাস্তা  উদ্বোধন  করলো। তারপর  সমস্ত  বাস  যাত্রীদের  বাস  থেকে  নামিয়ে,  একে  একে  সমস্ত ফাঁকা  বাস,  খুব  ধীর  গতিতে  ধসের  ওপারে  চলে  গেল।  ওপারে গিয়ে  দেখি,  ওপারের  যাত্রীদের  খুব  করুণ অবস্থা।  তাদের  আগে  ছাড়া  হয়নি  বলে  তাদের  খুব  দুঃখ।  তবে  এদের  গতকাল  রাতে খাবার  জুটেছে, কারণ  সামনেই  দু’একটা  দোকান  আছে।  খবর  পেলাম  গতকাল  রাতে  এদিকের  দোকান  থেকে আমাদের ওদিকের  কিছু যাত্রী  খাবার  কিনে  নিয়ে  গেছিল।  আগের  দিনের  ক্ষুধার্ত,  তৃষ্ণার্ত,  বৃদ্ধ  ভদ্রলোককে  কোথাও   দেখলাম  না।

আমরা  আমাদের  বাসে  উঠে  বসলাম।  সমস্ত  পাঞ্জাবিরা  আমাদের  খুব  প্রশংসা  করছিল।  তারা  সবাইকে  বলছে  যে,  আমরা  রাস্তা পরিস্কারের  জন্য  খুব  কাজ  করেছি।  এরপর  থেকে  তারা  সবাই  আমাদের  তিনজনকে  তাদের  দলভুক্ত  করে  ফেললো।  বিশেষ  করে   সেই  তীরথ  সিং।  সন্ধ্যা   নাগাদ  আমরা  যোশীমঠে  এসে  পৌঁছলাম।  আজ  সন্ধ্যায়  বাস  আর  যাবে  না,  কারণ  আজ  বাস  কোনমতেই বদ্রীনারায়ণ  পৌঁছতে  পারবে  না।  মাঝপথে  যদিও  গোবিন্দঘাট,  কিন্তু  সেখানে  রাত্রে  থাকার  জায়গার  অভাব,  তাই  যোশীমঠেই থাকতে  হলো।  চারিদিকে  ঘন  কুয়াশায়  ঢেকে  গেছে।  এক  হাত  দুরের  জিনিসও  দেখা  যাচ্ছে  না।

পাঞ্জাবিদের  সাথে  মালপত্র  নিয়ে  গুরুদ্বোয়ারায়  উঠলাম।  পাশেই  বিড়লা  গেস্ট্  হাউস।  অজস্র  ফুল  ফুটে আছে।  সেখানে  জায়গাও  আছে,  চার্জও  খুব  একটা  বেশি  নয়।  তবু  ভবিষ্যতের  কথা  ভেবে,  ওদের  সাথে গুরুদ্বোয়ারায়  গেলাম।  মাঝখানে  উপাসনা  কক্ষ।  সাধুবাবা  পাঞ্জাবি  তীরথের  গেস্ট্, তার  সঙ্গেই এসেছেন।  তিনি  আমাদের  জায়গা  করে  নিতে  বললেন।  ওদের  পাশেই   হোল্ড-অলগুলো  খুলে,  তিনজনের  শোয়ার  ব্যবস্থা  করে  নিলাম।  মাথা  থেকে  টুপি  খুলতে   গেলে  তীরথ  জানালো  গুরুদ্বোয়ারায়  খালি  মাথায়  থাকতে  নেই।  আমরা  রাস্তায়  এসে  চা  জলখাবার  খেয়ে, একটু  ঘুরে  বেড়ালাম।  খুব  কুয়াশা, জামাপ্যান্ট  ভিজে  যাচ্ছে।  বাধ্য  হয়ে  গুরুদ্বোয়ারায়  ফিরে  এলাম।  চুপচাপ  বসে  থাকা  ছাড়া  কোন  কাজ  নেই।  একটু  পরে  ওদের  উপাসনা  ঘরে  প্রার্থনা  শুরু  হলো।  “শতনাম  এ  হ্যায়  গুরু”,  আর  সকলের  সাথে  প্রার্থনা  ঘরে  আমরাও  সুর  করে  গাইলাম।  প্রার্থনা  শেষে  অবশ্য  সামান্য  সুজি  প্রসাদ  পেলাম।  তীরথের  মা,  বোন,  এবং  আর  সব  মহিলারা   গেলেন  সবার  জন্য  রুটি  বানাতে।  একসময়  ডাক  এলে,  আমরা  সবাই  একসাথে  খেতে  গেলাম।  খোলা  আকাশের  নীচে  লম্বা  শতরঞ্চি  পাতা।  একটা  কল  থেকে  বরফের মতো  ঠান্ডা  জল  পড়ছে।  হাত  ধুয়ে  বসে  পড়লাম।  হাল্কা  ঝিরঝিরে  বৃষ্টি  পড়ছে।  আমরা  সকলে  বৃষ্টিতে বসে  আছি।  একটু  দুরেই  রুটি  তৈরির  কাজ  জোর  কদমে  চলছে।  এবার  কয়েকজন  পাঞ্জাবি  খাবার  পরিবেশন  করা  শুরু  করলেন।  বিরাট  বিরাট  থালা  প্রত্যেকের  সামনে   রেখে  দিয়ে  যাওয়া  হলো।  এক  পাত্র  করে  ডাল  থালায়  ঢেলে  দিয়ে  যাওয়া  হলো,  সঙ্গে  একটু  করে  বিট-গাজরের  আচার।  এবার  ওরা  রুটি  নিয়ে  এলেন।  রুটি  কিন্তু  থালায়  দেবার  নিয়ম  নেই।  হাত  পাততে  হবে, ওরা  হাতে  দিয়ে  যাবেন।  একটা  রুটি  কেউ  বলেন  না,  এক  লাখ  রুটি,  বা  এক  লাখ  প্রসাদী  বলতে  হয়।  কারণ  জিজ্ঞাসা  করায়,  তীরথ  এক  অদ্ভুত  গল্প  শোনালো।  এত  কিছুর  পরেও  কিন্তু  খাওয়া  শুরু  হলো  না।  মাধবকে  বললাম,  দ্বিতীয়বার  যদি  এই  অবস্থায়  থাকতে  হয়,  তাহলে  নির্ঘাত  নিউমনিয়া  হবে।  যাহোক্,  খুব  তাড়াতাড়ি  দু’টো  রুটি  শেষ  করে  ফেললাম।  খিদে  থাকলেও  বৃষ্টিতে  ভিজে,  ডালরুটি  খাবার  ইচ্ছা  আর  রইলো  না।  তীরথ  আমাদের  একটু  বসতে  বললো।  একসাথে  উঠতে  হবে,  এটাই  প্রথা।  আমাদের  কান্না  পেয়ে  যাচ্ছে।  এ  জাতীয়  বিপদে  আগে  কখনও  পড়ি  নি।  কিন্তু  এরপর  যা  শুনলাম,  তাতে  তো  অজ্ঞান  হবার  উপক্রম।  বাসন  নিজেদের   মেজে  পরিস্কার  করে  দিতে  হবে।  ধনী,  দরিদ্র,  সবার  এক  নিয়ম।  এখনও   বুঝতে  পারছি  না  শুধু  নিজের  থালা   মাজতে  হবে,  না  রান্নার  সমস্ত  বাসন  নিজেদের  মাজতে  হবে।  এবার  দেখা  গেল  অনেকেই  ছাই  দিয়ে  বাসন  মাজতে  শুরু  করেছেন।  বড়  বড়  দু’টো   ড্রামে  গরম  ও ঠান্ডা  জল  রাখা   আছে।  আমরা  কোনমতে  জল  দিয়ে  থালা  ধুয়ে, একছুটে  ঘরে  ফিরে  এলাম।  নিজেদের  শোবার  জায়গায়  ফিরে  এসে  দেখি,  পাঞ্জাবিদের  নিজেদের  মধ্যে  কী  নিয়ে  খুব  তর্ক  বেধেছে। উত্তেজনা  ক্রমশঃ  বাড়ছে।  শিখরা  কোমরে  ছোট  তরবারি  রাখে, যাকে  কৃপাণ  বলে  জানতাম,  কিন্তু  এখানে  দেখি  তারা  বেশ  বড়  বড়  তরবারি  কোমরে  ঝুলিয়ে  এসেছে।  তরবারি  জীবনে  অনেক  দেখার সুযোগ  হয়েছে,  কিন্তু  তার  ব্যবহার  দেখার  সুযোগ  জীবনে  বোধহয়  এই  প্রথম   এলো।  দেখি  শিখরা  কোমরে  ঝোলা  খাপ থেকে  তরবারি  বার   করে,  “মাঠমে  আও   দেখ   লেঙ্গে”  ইত্যাদি  বলতে   শুরু  করেছে।  হাতে  খোলা  তরবারি ,  মুন্ডু  যাবে  কী  না  চিন্তায়  আছি।  শেষে  এক  সাধু  পাঞ্জাবি  ওদের  ঝগড়া  থামিয়ে  দিয়ে,  আমাদের  জানালেন  যে,  আমাদের  ভয়ের  কোন  কারণ  নেই।  এটা  ওদের  নিজেদের  ব্যাপার।  এতক্ষণে  বুঝলাম  ইনি  এই  গুরুদ্বোয়ারার  প্রধান।  গুরুদ্বোয়ারার  এতবড়  বাড়িতে  আমরা  তিনজনই  অভাগা  বাঙালি  এবং  সম্ভবত  হিন্দু।  আর  সবাই  শিখ।  ক্রমে  রাত  বাড়ছে।  শুয়ে  পড়লাম।  ভোরে  ঘুম  ভেঙ্গে  গেল   তীরথের   ডাকে।  চোখ   মেলে  দেখি,  সে  আমার  পায়ের   দিকে  দাঁড়িয়ে  আছে।  আমার   পাশে  সঙ্গীদের  দেখলাম  না,  সম্ভবত  প্রকৃতির  ডাকে  সাড়া  দিতে  গেছে।  সামনে  সবাই  “শতনাম  এ  হ্যায় গুরু”  সুর  করে  গেয়ে,  প্রার্থনা  করছে।  গতরাতে  খেতে  বসেও  এরা  বৃষ্টির  মধ্যে,  এই  সুরে  প্রর্থনা করছিল।  আমরা  রুটি  হাতে  তখন  চুপ  করে  বসে  ছিলাম।

চটপট্  হোল্ড-অল্  বেঁধে  নিলাম।  বন্ধুরাও  ইতিমধ্যে  ফিরে  এল।  তীরথের  বোন  আমাদের  চা   খেতে বললো,  গুরুদ্বোয়ারায়  চা  খেতে হয়।  সামান্য  কয়েক  চুমুক  চা  খেয়ে  মালপত্র  নিয়ে,  বাসে  চলে  এলাম। বাসের  ছাদে  মালপত্র  তুলে,  কিছু   জলখাবার   খেয়ে  নিলাম। আজই  আমরা   গোবিন্দঘাট   থেকে  হেঁটে  ঘাংরিয়া  যাব।  যোশীমঠ  থেকে  বাস  রাস্তা  খুব  সরু।  বদ্রীনারায়ণ  থেকে  সকালে  যে  সব বাস  ছেড়েছে,  সেগুলো  একে  একে  যোশীমঠ  এসে  পৌঁছলো।  সবার  শেষে  যে  গাড়িটা  আসলো , তাতে  একটা সবুজ  পতাকা  লাগানো আছে।  এটাই  এ  পথের  সিগনাল।  সবুজ  পতাকা  মানে,  এরপর  আর  কোন  গাড়ি ওদিক  থেকে  এদিকে  আসবে  না।  এবার  এদিক  থেকে  ওদিকে  যাবার  গাড়ি  ছাড়তে  পারে।  এবার  এদিক  থেকে  একে  একে  বাস  ছাড়তে  শুরু  করলো।  সব  শেষের  গাড়িতে  সবুজ  পতাকাটা  লাগানো  হবে।  এখান  থেকে  গোবিন্দঘাট  মাত্র  আঠার  কিলোমিটার  পথ।  সকাল  সাড়ে  দশটার  সময়  আমরা  গোবিন্দঘাটে  নামলাম।  সামান্য  দুরেই  গুরুদ্বোয়ারা।  তীরথ  চটপট্  ওদের  ও  আমাদের  মালপত্র  এক জায়গায়  গুছিয়ে  রেখে  দিল।  সিমেন্টের  ছোট   ছোট  খোপে,  মাল  রাখার  সুন্দর  ব্যবস্থা।  মাল  রাখার রসিদও  পেলাম।  একতলায়  নেমে  এসে  চা  খেলাম।  এখানে  আমাদের  রুটি  খাবার  কথা  বললেও,  এখন চা রুটি খাবার ইচ্ছা হলো না।

গোবিন্দ্ ঘাট

এবার  হাঁটতে  হবে।  কাঁধের  ঝোলাব্যাগে  ওয়াটার  প্রুফ্  ও  টুকিটাকি  জিনিস  নিয়ে  নিলাম।  তিনজনের  তিনটে  ঝোলাব্যাগের  একটার  ভিতরে  একটা  রামের  বোতল।  আমার  অফিসের  আর্মডগার্ড,  কল্যানদা এনে  দিয়েছিল।  একটা  ব্রিজ  পার  হয়ে  অপর  পারে  এসে,  এখান  থেকে  জায়গাটার একটা  ছবি  তুলে  নিলাম।  ইতিমধ্যে  তীরথ,  ওর  বোন,  ওর  মা,  ও   ভগ্নিপতি   এসে  উপস্থিত   হলো।   তীরথের   বোন  আমাদের  তিনজনকে  অনেকটা  মনাক্কা,  কিশমিশ,  পেস্তা,  মিছরি,  ইত্যাদি  দিল।  সঙ্গে  ছোট  এলাচ।  আমরা  হাঁটতে  শুরু  করলাম।  তের  কিলোমিটার  পথ  হেঁটে,  আজ  যাব  ঘাংরিয়ায়।  এই  জাতীয়  হাঁটা  পথে  এই  প্রথম।  ফলে  মনে  বেশ  হিরো  হিরো  ভাব।  হাঁটতেও  বেশ  ভালো  লাগছে।  অনেকটা  পথ  হেঁটে  আমরা  “জঙ্গলচটি”  তে  এসে  পৌঁছে,  সামান্য  পকোড়া  আর  চা  খেয়ে  নিলাম।  তীরথ  কিন্তু  কিছুতেই  দাম দিতে  দিল  না।  ওর  ভগ্নিপতি  অসুস্থ,  তীরথের  কাঁধে  ভর  দিয়ে  হাঁটছে।  ফলে  ওদের  হাঁটার  গতি  খুব  কম।  ওদের  সাথে  ওর  বোনও  হাঁটছে,  মা  যাচ্ছেন  কান্ডিতে।  এবার  “পাল্লুগাঁও”  বা  “পান্নাগাঁও”  এসে, আর  এক  দফা  চা,  বিস্কুট  ইত্যাদি  খেয়ে  নিয়ে,  তীরথদের  চা,  বিস্কুটের  দাম  অগ্রিম  দিয়ে,  ওদের  জন্য অপেক্ষা  করতে  লাগলাম।  কিছুক্ষণের  মধ্যেই  ওরা  এসে  হাজির  হলো।  তীরথরা  আসতেই  দোকানদার  ওদের  চা,  বিস্কুট  দিল।  তীরথ  দোকানদারকে  আমাদের  পয়সা  ফিরিয়ে  দিতে  বলে,  নিজে  দাম  দিতে  গেল।  ওর  ভগ্নিপতি  ওকে  বললো,  এতে  আমাদের  অপমান  করা  হবে।  পরের  বার  তীরথ  যেন   দাম  দিয়ে  দেয়।  আবার  দু’হাত  ভরে  পেস্তা,  মনাক্কা  ইত্যাদি  নিয়ে,  আমরা  এগিয়ে  গেলাম।  এত  পরিস্কার মিছরি,  এত  বড়  বড়   মনাক্কা  ও  কিশমিশ,  আমরা  আগে  খাওয়া  তো  দুরের  কথা, চোখেও  দেখি  নি।  “ভিউডাঁর”  নামে  একটা  ছোট্ট  গ্রামে  আমরা  এসে  পৌঁছলাম।  এখানে  তীরথ  আমাদের  আপেল,  পালক-পাতা  নামে  একপ্রকার  পাতার  বড়া  ও  চা  খাওয়ালো।  বড়াগুলো  অনেকটা  এখানকার  বেগুনির  মতো।  গরম  গরম  খেতেও  বেশ  ভালোই  লাগছিল।  ক্রমে  ক্রমে  শুধু  তীরথের  দলটাই  আমাদের  সঙ্গে  রয়ে  গেল।  ভাবতেও   বেশ  ভালো  লাগছে  যে,  কয়েকজন  পাঞ্জাবি  তাদের  আর  সব  পাঞ্জাবিদের  ছেড়ে,  আমাদের  সাথে  মিশে  গেছে।  এবার  আমরা  অনেকটা  এগিয়ে  গেলাম।  রাস্তা  যেন  আর  শেষই  হয়  না।  বেশ  কষ্টকর  রাস্তাও  বটে।  রাস্তায়  কয়েকজন  পাঞ্জাবি  আমাদের  ওয়াটার  বটল্  থেকে  জল  খেল।  আমরা  আবার  এগিয়ে  চললাম।  রাস্তা  যতই  খারাপ  হোক,  এই  প্রথম  হাঁটছি, তাই  সেরকম  কোন  কষ্ট  হচ্ছে  না।  সামনে  বেশ  খানিকটা  জায়গা  উপত্যকা  মতো।  সেটা  পার  হয়ে  আমরা  দাঁড়ালাম।  যতদুর  চোখ যায়  দৃষ্টি  প্রসারিত  করেও,  কোন  লোকজন  চোখে  পড়লো  না।  কিছুক্ষণ  অপেক্ষা  করে  চিৎকার  করেও  কারো  কোন  সাড়া  পাওয়া  গেল  না।  বেশ  কিছুক্ষণ  পরে  বহুদুরে  লোকজন  আসতে  দেখলাম।  এতদুর  থেকেও  আমাদের  সাথে  একই  বাসে  আসা  পাঞ্জাবিগুলোকে  চিনতে  অসুবিধা  হলো  না।  আমরা  নিশ্চিন্ত  হয়ে  এগিয়ে  চললাম।  আর  কিছুটা  পথ  হেঁটে  ঘাংরিয়া  এসে  পৌঁছলাম।

           ঘাংরিয়া গুরুদ্বোয়ারা         

একটা  দোকানে  বসে  চা  খেলাম  এবং  ডিম  পাওয়া  যায়  দেখে, আমাদের  তিনজনের  জন্য  তিনটে  ডিম  সিদ্ধ  করতে  বলে, তীরথদের জন্য  অপেক্ষা  করতে  লাগলাম।  কিছুক্ষণের  মধ্যেই  দুরের  সেই  পাঞ্জাবিরা এসে  উপস্থিত   হলো।  আমরা   ওদের  সঙ্গে   গুরুদ্বোয়ারায়   গেলাম।   তীরথও   তার  সঙ্গীদের  নিয়ে  এসে  পৌঁছল।  বাইরে  নোটিশ  বোর্ডে   বড়  বড়  করে  লেখা  আছে  যে,  গুরুদ্বোয়ারায়  মাদক ও  তামাকজাত  দ্রব্য  নিয়ে  প্রবেশ  নিষিদ্ধ।  ধুমপান  নিষিদ্ধ।  আমাদের  খুব  চিন্তা  হচ্ছিল  এই  ভেবে  যে,  আমার  কাপড়ের  ঝোলাব্যাগে রামের  বোতল  আছে,  তামাক  তো  আছেই।  ব্যাগে  একটু  হাত  লাগলেই  বোঝা  যাবে,  ভিতরে  কী  আছে।  আমরা  রামের  বোতল যতই  ওষুধ  হিসাবে  নিয়ে  আসি  বা  ব্যবহার  করি  না  কেন,  মাদক  দ্রব্য   তো  বটে।  গুরুদ্বোয়ারা  কর্তৃপক্ষ  আমাদের  দশ  নম্বর   ঘরটা  দিলেন।  টিনের  এই  ঘরগুলো   মূল  হলঘরের  মতো  ভালো  নয়।  ঘাংরিয়ার  উচ্চতা  সমুদ্র  পিষ্ঠ  থেকে  প্রায়  দশ  হাজার  ফুট উঁচু,  কাজেই  রাত্রে  বেশ  ঠান্ডা  পড়বে।  ঘর  নিয়ে  আমরা  বেশ  দুশ্চিন্তায়  পড়লাম।  যা  বুঝলাম,  মুল  হলঘরে  শুধু  পাঞ্জাবি  শিখদেরই জায়গা   দেওয়া  হয়।  তীরথ  কর্তৃপক্ষকে  জানালো   যে,  আমরা  তাদের  পরিবারের সঙ্গে  এসেছি।  ফলে  আমাদের  তীরথ  ও  আর  সব পাঞ্জাবিদের  সাথে, মুল  হলঘরে  স্থান  দেওয়া  হলো।  আমরা  কর্তৃপক্ষের  কাছ  থেকে  গোটা   বারো-তেরো  কম্বল   পেলাম।  মেঝেতে   বেশ কয়েকটা  পেতে,  গায়ে  দেবারগুলো  ভাঁজ  করে  সাজিয়ে  রেখে,  দু’টো  কাপড়ের  ঝোলাব্যাগ  ও  ওয়াটার  বটলগুলো  মাথার  কাছে  রেখে,  যে   ব্যাগটায়  রামের  বোতল  আছে,  সেটা  নিয়ে  বাইরে  যাব  বলে  প্রস্তুত  হলাম।  তীরথের  মা  বললেন,  “বেটা  সব  সামান এখানে  প্রেমসে  রেখে  যাও,  কোন  চিন্তা  নেই”।  কী  বলবো  ভেবে  না  পেয়ে  বললাম,  ব্যাগে  গরম   জামা  আছে।  ঠান্ডা  লাগলে  পরে নেব।  হলঘর  থেকে  বেড়িয়ে  আবার  সেই  চায়ের  দোকানে  আসলাম।  ডিম  সিদ্ধগুলো  এবার  কাজে  লাগানো  গেল।  সঙ্গে  আর  এক রাউন্ড  গরম  চা।  লক্ষ্য  করলাম  দোকানটার  পাশেই  একটা  ডাকবাংলো  আছে।  ঠিক  করলাম  আর  এক  মুহুর্তও  ঐ  গুরুদ্বোয়ারায় থাকা  নেই।  কোনভাবে  জানাজানি  হয়ে  গেলে  আমাদেরও  বিপদ,  তীরথও  খুব অপমানিত  হবে।  মাধব  ও  দিলীপ  গেল  ডাকবাংলোয় খোঁজ  নিতে।  কিন্তু  ওখানে  জায়গা  পাওয়া  গেল  না।  ওদের  বললাম,  গুরুদ্বোয়ারার  পাশেই  একটা  ছোট্ট  হোটেল  মতো  আছে,  ওখানে  একবার  চেষ্টা  করে  দেখতে।  ব্যবস্থা  হলে  তীরথকে  একটু  বুঝিয়ে  বলতে  যে,  আমাদের   গুরুদ্বোয়ারায়  থাকতে  অসুবিধা হচ্ছে।  ভাবছি,  তীরথ  চাইছে  কী  করে  আমাদের  আরও  বেশি  আরামে,  আরও  ভালোভাবে  রাখা  যায়,  আর  আমরা  চাইছি  কী  করে  ওদের  হাত  থেকে  মুক্তি  পাওয়া  যায়।  মাধব  ও  দিলীপ   চলে  গেল।  আমি  সমস্ত   বাধার  একমাত্র  কারণ,  ছোট্ট  একটা  রামের বোতল  আগলে,  দোকান  থেকে  একটু  দুরে  একটা  পাথরের  ওপর,  ওদের  ফেরার  অপেক্ষায়  বসে  থাকলাম।  হেমকুন্ড  সাহেব  প্রায় পনের  হাজার  দুশ’ ফুট উচ্চতায়  অবস্থিত।  ভেবেছিলাম  এখানে  থাকলে  সুবিধা  মতো  ঘর  না  পেলে,  ঠান্ডার  হাত  থেকে  বাঁচতে সামান্য  রামের  প্রয়োজন  হতে  পারে।  কল্যানদা  মিলিটারি  লোক,  সে  আমাদের  এ  কথা  বলেছিল।  এখন দেখছি  গোবিন্দঘাটে  ওটাকে সুটকেসে   রেখে  এলেই  ভালো  করতাম।  চুপ   করে  বসে  ওদের  জন্য  অপেক্ষা করা  ছাড়া  উপায়  নেই।  প্রায়  কুড়ি  মিনিট  কেটে  গেল, একা  একা  বসে  আছি,  ওদের  পাত্তা  নেই। বাধ্য  হয়ে  আবার  গুরুদ্বোয়ারার  দিকে  এগিয়ে  গেলাম।  গিয়ে  দেখি  মাধবরা   তীরথের সাথে  গল্প  করছে। আমাকে  দেখেই  তীরথ  বললো,  “রায়,  তোমার  কোন  চিন্তা   নেই  আমি  আছি।  ঘরের  মধ্যে  খেও  না।  বাইরে যতবার  ইচ্ছে  খেয়ে  এসো,  কেউ  কিছু  বলবে  না “।  বুঝতে  পারছি  না,  ওরা  তীরথকে  ঠিক  কী  বলেছে।  তবে  এটা  বেশ  বুঝতে পারছি,  যে  ওরা  নিশ্চই  বলেছে  যে  আমার  অসুবিধা  হচ্ছে,  তাই  ওরা এখান  থেকে  অন্য  কোথাও  চলে  যেতে  চায়।  আরও  বুঝলাম, যে  ওদের  সে  চেষ্টা  সফল  হয়  নি।  ভাবছি  ওদের  হাত  থেকে  মুক্তি  পেতে  আমাকে  ওরা  তীরথের  কাছে  মাতাল  বানিয়ে  ছাড়েনি তো? পরে  সব  শুনলাম।  ওরা  বুদ্ধিটা  ভালোই  বার  করেছিল।  ওরা  তীরথকে  বলেছিল,  আমি  প্রচন্ড  রকম  ধুমপান  করি।  এখানে সেটা  একবারে  নিষিদ্ধ।  তাই  আমি  চাই  এখান  থেকে  অন্য  কোথাও  চলে  যেতে।  অবশ্য  সারাদিন  আমরা  এক  সঙ্গেই  থাকবো,  এক  সাথেই  রাস্তা  চলবো।

পাশের  একমাত্র  হোটেলে  জায়গাও  ছিল।  ভাড়া  মাত্র  পনের  টাকা।  মাঝ  থেকে  লাভ  হলো  পালানো  তো গেলই  না,  অনবরত  তীরথ  মাধবকে  বলছে,  “এই  ব্যানার্জী,  রায়কো  সিগারেট   দেও”।   সে  এক  মহা অস্বস্তি।  ক্রমে  রাত  নেমে  আসলো।  আমাদের  নিয়ে  তীরথ  রাতের  খাবার  খেতে  গেল।  ভয়  হচ্ছিল এখানেও  খোলা  জায়গায়  বসে,  রুটি  হাতে  “শতনাম  এ  হ্যায়  গুরু”  গাইতে  হবে  কী  না।  পাশের  চায়ের দোকানে  গরম  আলুর  পরোটা  পাওয়া  যায়  শুনে  এসেছি।  তবু  গরম  আলুর  পরোটা  ছেড়ে,  তীরথের  সাথে ডাল,  রুটি  খেতে  যেতে  হোল।  এখানেও  দেখছি  সমস্ত  মহিলারা  রান্নার  কাজে  ব্যস্ত।  তবে  খাওয়ার জায়গাটা  খোলা  আকাশের  নীচে  নয়।  এখানে  ঠান্ডা  অবশ্যই  অনেক  বেশি।  বরফের  মতো  ঠান্ডা  জলে হাত  ধুয়ে,  সবার  সাথে  লাইনে  বসে  পড়লাম।  ডাল,  তরকারি  ও  রুটি।   দু’টো  রুটি  খেলাম।  তীরথ ভাবলো  আমরা  লজ্জা  পাচ্ছি।  সে  আমাদের  আরও  রুটি  খাবার  জন্য  জোর  করতে  লাগলো।  আমরা  কিন্তু  আর  রুটি  খেলাম  না।  সবার  খাওয়া  শেষ  হয়ে  গেলে,  ঠান্ডায়  কাঁপতে  কাঁপতে  গেলাম  বাসন  মাজতে।  তীরথের  বোন  কিন্তু  এবার  আমাদের  কিছুতেই  বাসন  মাজতে  দিল  না।  সে  বললো,  “হাম তুমকো  ভাইয়া  বোলা”,  ইত্যাদি।  যাক  ভাগ্য  ভালো,  এ  যাত্রা  বেঁচে  গেলাম।  তীরথ  পাশের  চায়ের  দোকানে  ছুটে  গিয়ে  আমাদের,  বিশেষ  করে  আমাকে,  সিগারেট  দিতে  বলে  আসলো।  এত  লজ্জা  করছিল কী  বলবো।  বৃষ্টি  শুরু  হলো।  ঘরে  ফিরে  এসে  কম্বল  চাপা  দিয়ে  শুয়ে  পড়লাম।

আজ  আগষ্ট  মাসের  ঊনিশ  তারিখ।  ঘুম  ভাঙ্গলো  তীরথের  “এ  রায়  উঠো”  ডাকে।  উঠতেই  কফির  গ্লাশ এগিয়ে  দিল।  ভাবলাম গুরুদ্বোয়ারা থেকেই  কফি  দেওয়া  হয়েছে।  পরে  শুনলাম  পাশের  চায়ের  দোকান থেকে  সবার  জন্য,  মানে  আমরা  তিনজন  ও  ওর পরিবারের  সবার  জন্য  কফি  কিনে  এনেছে।  ভোর বেলার  কাজ  সারবার  জন্য  ঘর  থেকে  বেড়িয়ে  এলাম।  তীরথদের  বলে  এলাম হেমকুন্ড  যাবার  জন্য তৈরি  হয়ে  নিতে।  চায়ের  দোকানটায়  তিন  কাপ  চায়ের  অর্ডার  দিলাম।  দাম  নিল  না।  জিজ্ঞাসা  করতে দোকানদার  জানালো,  পাঞ্জাবি  ভদ্রলোক  তিন  কাপ  চায়ের  দাম  দিয়ে  গেছেন।  আমরা  যে  আবার  চা খেতে  আসবো,  তীরথ  বুঝতে পেরেছিল।  দোকান  থেকে  বেড়িয়ে  সকালের  কাজ  সারতে  গেলাম গুরুদ্বোয়ারার  খাটা  পায়খানায়।  হেমকুন্ড  বা  নন্দন  কাননের  দিক থেকে  কোন  ঝরনার  জল,  রাস্তার  পাশ  দিয়ে  গড়িয়ে  এসে  গুরুদ্বোয়ারার  একটা  চৌবাচ্চায়  ভর্তি  হচ্ছে।  ফলে  চৌবাচ্চাটা  সবসময় জলে  ভর্তি  থাকে।  চৌবাচ্চার  অপর  দিকে  নালার   মতো  কাটা।  ফলে  অতিরিক্ত  জল  ঐ  পথে  পরপর  দু’টো পায়খানার  ঠিক  তলা দিয়ে  বেশ  জোরে  সবসময়  বয়ে  চলেছে।  এরকম  অদ্ভুত  ব্যবস্থা  আগে  কখনও কোথাও  দেখি  নি।  নতুন  এই  ব্যবস্থা  কিন্তু  বেশ  অস্বস্তিকর।  এর  থেকে  ফাঁকা  জায়গায়  গালে  হাত দিয়ে  বসা  অনেক  ভালো।  আমরা  ওপর  থেকে  ঝরনার  জল  আসা  নালাটা  অতিক্রম  করে,  একটু  ফাঁকা জায়গায়  তিনজনে  লাইন  দিয়ে  বসে  পড়লাম।  মাধবের  প্রথমে  এ  ব্যবস্থায়  যথেষ্ট  আপত্তি  ছিল।  কারণ এই  জলই  গুরুদ্বোয়ারায়  খাবার  জল  হিসাবে  ব্যবহার  করা  হয়।  কিন্তু  এ  ছাড়া  উপায়ই  বা  কী ?  অল্প কিছুক্ষণের  মধ্যে  আমরা তৈরি  হয়ে  নিলাম।  কিছু  খাওয়া  হলো  না।  ভাবলাম  রাস্তায়  যাহোক  খেয়ে  নেব।

হেমকুন্ড  যাবার  রাস্তা  একটু  ওপরে  উঠে,  ইংরাজী   “ওয়াই”  (Y)  অক্ষরের  মতো  দু’ভাগ  হয়ে  গেছে। বাঁদিকটা  নন্দন  কাননের  পথ, ডানদিক  গেছে  হেমকুন্ড  সাহেব।  এখানে  এসে  জানতে  পারলাম, হেমকুন্ডে  বিশাল  গুরুদ্বোয়ারা  স্থাপিত  হচ্ছে।  গুরুদ্বোয়ারা  তৈরি  শেষ  হতে  ১৯৮২-‘৮৩  সাল।  বর্তমানে ওখানে  থাকবার  ব্যবস্থা  নেই।  কাপড়ের  দু’টো  ঝোলাব্যাগে  ওয়াটার  প্রুফ  ও  টুকিটাকি  জিনিস  নিয়ে, তৃতীয়টায়  সোয়েটার  চাপা  দিয়ে  বোতলটাকে  রেখে,  আমরা   হেমকুন্ডের  উদ্দেশ্যে  যাত্রা  শুরু  করলাম।  হেমকুন্ডের  উচ্চতা  ১৫২১০  ফুট।  দুরত্ব  ঘাংরিয়া  থেকে  সাড়ে  পাঁচ  কিলোমিটার।  তীরথ  তার ভগ্নিপতিকে  নিয়ে  হাঁটা  শুরু  করার  আগে,  মুঠো   মুঠো  কিশমিশ,  পেস্তা,  মনাক্কা,  ছোট  এলাচ,  আমাদেরও  দিল,  নিজেরাও  নিয়ে  চিবতে  শুরু  করলো।

অনেকটা  পথ  হেঁটে  এসেছি।  আশ্চর্য,  এ  পথে  এত  লোকের  যাতায়াত,  কিন্তু  কোন  দোকান  নেই।  চারিদিকে  নানারকম  ফুলের সমারোহ।  বেশিরভাগ  ফুলের  রঙ  বেগুনি।  এমনকী  প্রজাপতিগুলো  পর্যন্ত বেগুনি  রঙের।  এতটা  রাস্তায়  ব্রহ্মকমল  কোথাও  দেখলাম না।  তীরথরা  পিছিয়ে  পড়েছে,  তাই  মাঝে-মাঝেই  ওদের  জন্য  অপেক্ষা  করছি।  দেখা  হলে  আবার  এগিয়ে  যাচ্ছি।  এতক্ষণে  একটা চায়ের  দোকান পাওয়া  গেল।  চা  খেয়ে  নিলাম।  তীরথের  মা  ও  বোন, দু’জনেই  দেখলাম  এবার  কান্ডি  নিয়েছেন। আমরা  বেশিরভাগ  বাইপাস্-ই  ব্যবহার  করায়,  অনেক  এগিয়ে  গেলাম।  এবার  রাস্তার  পাশে  গ্লেসিয়ার  নেমে এসেছে  দেখে  খুব  ভালো  লাগলো।  সাদা  বরফের  টুকরো  হাতে  নিয়ে  অনেকটা  পথ  গেলাম।  এখানে  দেখি  চারপাশে  একরকম  হলুদ  রঙের  থোকা   থোকা  ফুল  ও  হালকা  নীল  রঙের  একরকম  চার  পাপড়ির ফুল।  আমার  মনে  হয়  এই  নীল  রঙের  ফুলটাই,  এ  রাজ্যের  সবথেকে  সুন্দর  ফুল।  নন্দন  কানন,  যাকে ভ্যালি  অফ্  ফ্লাওয়ার্স  বলে,  সেখানেও  এত  সুন্দর  ফুল  আছে  কিনা  সন্দেহ।  সর্বাঙ্গে  কাঁটা,  আর  কী  যে অদ্ভুত  একটা  নীল  রঙ  কী  বলবো।  আর  কিছুটা  পথ  এগিয়েই  দুরে,  বহু  উপরে  হাল্কা  সবুজ  রঙের ফুলের  সাম্রাজ্য  চোখে  পড়লো।  একজন  যাত্রীর  কাছে  শুনলাম,  ওগুলোই  ব্রহ্মকমল।  এই  ফুলেই  কেদার নাথের  পূজা  হয়।  ১৪০০০–১৬০০০  ফুট  উচ্চতায়,  পাথুরে  জমিতে  এরা  জন্মায়।  হাঁটার  গতি  যেন বেড়ে  গেল।  রাস্তায়  দু’একটা  কেবল  তোলা  ব্রহ্মকমল  পড়ে  থাকতে  দেখলাম,  বোধহয়  কোন  যাত্রী  তুলে  ফেলে  রেখে  গেছে।  আমরা  কুড়িয়ে  নিলাম।  এত  উগ্র  গন্ধ,  বোঝাতে  পারবো  না।  আমার  মনে  হলো,  আমাদের  এখানকার  শিয়ালকাঁটা  ফুলের  গন্ধের  সাথে  কোথায়  যেন  একটা  মিল  আছে।  তবে  গন্ধের  তীব্রতা  বেশ  কয়েকগুণ  বেশি।  ফুলের  ভিতরে  চার-পাঁচটা  ফুলের  মতো  রেণুর  আধার।   খুব  হাল্কা  সবুজ  রঙ।  ভূট্টার  খোলা  ছাড়াতে  ছাড়াতে,  শেষের  দিকে  যেমন  সাদাও  নয়,  সবুজও  নয়  গোছের  রঙ  দেখা  যায়,  অনেকটা  সেরকম।  পাপড়িগুলো  এত  পাতলা,  যে  মনে  হয়  এদিক  থেকে  ওদিক  দেখা  যাবে। তীরথ  এসে  হাজির  হলো।  ও  বললো  পরে  অনেক  পাবে,  এগিয়ে  চলো।  ওর  হেমকুন্ড  এই  দ্বিতীয়  বার।  হেমকুন্ড  সাহেব  ওদের  ধর্মের  একটা  অতি  পবিত্র  জায়গা।  হাঁটতে  হাঁটতে  একসময়  আমরা  সত্যিই  ব্রহ্মকমলের  রাজত্বে  এসে  পৌঁছলাম।  গাছগুলো  অনেকটা  মুলো  গাছের  মতো,  গোটা  গাছটায়  ঐ  ফুলের  গন্ধ।  গাছে  হাত  দিতে  আমাদের  হাতে,  জামাকাপড়ে  তীব্র  ফুলের  গন্ধে,  ম’ম  করতে  লাগলো।  গাছের পাতার  মধ্যে  যে  শিরাগুলো  দেখা  যায়,  সেগুলো  বেশ  উচু  ও  স্পষ্ট,  অনেকটা  খরগোশের  কানের মতো।  হেমকুন্ডে  প্রায়  পৌঁছে  গেছি।  মেঘ  করে  আসছে  ছবি  তুলতে  হবে, তাই  ফুল  না  তুলে  হাঁটার  গতি  বৃদ্ধি  করলাম।  রাস্তা  এবার  দু’ভাগে  ভাগ  হয়ে  গেছে।  একটা  পথ  সিঁড়ি  ভেঙ্গে  ওপরে  উঠতে  হয় ।  অনেক-গুলো  সিঁড়ি,  তাই  সিঁড়ি  ভাঙ্গার  কষ্টও  প্রচুর।  তবে  অনেক  তাড়াতাড়ি  পৌঁছনো  যায়।  অপর  পথটা  রাস্তা  দিয়ে  ঘুরে  ঘুরে  যেতে  হয়।  কষ্ট  লাঘব  করতে  ও  প্রাকৃতিক  দৃশ্যকে  উপভোগ  করতে,  আমরা  রাস্তা  দিয়েই  এগলাম।  দুরে  একটা  নীল  ও  হলুদ  রঙের  পতাকা  উড়তে  দেখা  গেল।  সমস্ত  গুরুদ্বোয়ারায়  এই  দুই  রঙের  পতাকা  উড়তে  দেখেছি।  পতাকা  লক্ষ্য  করে  আমরা  গুরুদ্বোয়ারাতে  এসে  হাজির  হলাম।  কাজ  শেষ  হতে  এখনও  অনেকদিন  লাগবে।  এতবড়  এলাকা  নিয়ে,  এত  বিশাল  গুরুদ্বোয়ারা  এখানে  তৈরি  হচ্ছে,  ভাবতেও  পারি  নি।  খরচ  কত  হবে  ভাবা  যায়  না।  তার  থেকেও  বড়  কথা,  গুরুদ্বোয়ারা  তৈরির  এত  লোহার  রড,  ও  অন্যান্য  মালমশলা,  গোবিন্দঘাট   থেকে  এই  রাস্তায়  এত  উচ্চতায়  কী ভাবে  নিয়ে  আসা  হয়েছে।  তীরথ  জানালো,  পাঞ্জাবিরা  গুরুদ্বোয়ারার  জন্য  অনেক  দান  করে।  কয়েকটা  উদাহরণ  শুনে  মনে  হলো,  এটা  ওদের  পক্ষেই  সম্ভব।

বড়  বড়  লোহার  স্ট্রাকচার,  টিনের  ছাদ,  মাঝখানে  একপাশে  মন্দিরের  মতো।  ওখানে  ওদের  ধর্মগুরুর ছবি।  ছবিতে  প্রচুর  ব্রহ্মকমল  ফুল  দেওয়া  আছে।  ব্রহ্মকমলের  মালা  দিয়েও  সাজানো।  গুরুদ্বোয়ারার পিছনেই  কুন্ড।  ওপরের  পাহাড়  থেকে  এই  বিশাল বড় গ্লেসিয়ার,  লেক  বা  কুন্ডের   জলে  নেমে  এসেছে। কুন্ডের  পারে  দাঁড়িয়ে  মনে  হলো,  জলের  গভীরতা  খুব  বেশি  নয়।  এই এলাকাটা  সাতটা  পাহাড়ের  চুড়া দিয়ে  ঘেরা।  আগে  এ  জায়গাটা  লোকপাল  নামে  পরিচিত  ছিল।  দশরথ  পুত্র  লক্ষণ  এই  এলাকার  আরাধ্য দেবতা  ছিলেন।  যাহোক্,  কুন্ডের  একপাশে  অনেক  পাঞ্জাবির  ভিড়,  সবাই  কুন্ডে  স্নান  করতে  ব্যস্ত। আমাদের  বাসের  আর সব  পাঞ্জাবিরা  স্নান  সেরে  কাপড়  বদলাচ্ছেন।  মহিলারাও  কুন্ডে  স্নান  করছেন।  এই কুন্ডে  স্নান  করতেই,  সুদুর  পাঞ্জাব  থেকে  আসা। পাঞ্জাবিরা  সবাই  সঙ্গে  স্নানের  কাপড়,  গামছা  ইত্যাদি  নিয়ে  এসেছেন।  আমরা  স্নান  করার  মতলব  নিয়ে  আসি  নি।  কিন্তু  সকলে  আমাদের  এই  কুন্ডে  স্নান করার  জন্য  অনুরোধ  করতে  লাগলেন।  অনেকে  আবার  জানালেন,  যে  কুন্ডের  জল  গরম  এবং  এই  কুন্ডে স্নান  করলে,  সব  রকম  রোগ  মুক্তি  হয়,  শরীর  ভালো  হয়, পূণ্য  অর্জন  তো  আছেই।  রোগমুক্তি  হয়  কী না জানি  না,  তবে  কুন্ডের  জল  যে  গরম,  সে  তো  গ্লেসিয়ার  দেখেই  বুঝতে  পারছি।  একে  মেঘ  করে  আছে ও   বেশ  ঠান্ডা,  তার  ওপর  ঐ  বরফগোলা  ঠান্ডা  জলে  স্নান  করতে  আমরা  রাজি  হলাম   না।  ওনারাও ছাড়বার  পাত্র  নন।  সবাই  একসাথে  সাহস  ও  উৎসাহ  দিতে  লাগলেন,  দেখে  মনে  হয়  নিজেরা  স্নান  করে রোগমুক্তি  ও  পূণ্যলাভের  থেকে,  আমাদের  স্নান  করিয়ে  রোগমু্ক্ত  ও  পূণ্যলাভ  করানোয়,  তাঁদের  আগ্রহ  অনেক  বেশি।  একটা  জাপানি  ছেলেকে  দেখলাম,  ঐ  ঠান্ডা  জলে  মনের  সুখে  সাঁতার  কেটে  যাচ্ছে।  ওর  ক্ষমতা  দেখে  অবাক  হতে  হয়।  আমরা  যে  ঠিক  ঠান্ডার  জন্য  স্নান  করতে  চাইছিনা,  তা  কিন্তু  নয়, আসলে  আমাদের  সাথে  কোন  দ্বিতীয়  বস্ত্র,  এমনকী  গামছা  পর্যন্ত  নেই।  কুন্ডের  ধারে  ধারে   জলের  মধ্যে  অনেক  বড়  বড়  পাথর  পড়ে  আছে।  আমরা  একটা  পাথরের  ওপর  কিছুক্ষণ  বসে  চলে  আসবো  ঠিক  করলাম।

সমস্ত  পাঞ্জাবিদের  অনুরোধে  কাজ  না  হওয়ায়,  গুরুদ্বোয়ারার  সাধুবাবা  এগিয়ে  এসে  প্রায়  হাত  জোড় করে  আমাদের  স্নান  করতে অনুরোধ  করলেন।  তিনিও  বললেন,  এই  জলে  স্নান  করলে  রোগমুক্তি  হয়, অনেক  সুস্থ  বোধ  হয়।  তাঁর  বয়স,  সৌম্য  চেহারা, ধবধবে  সাদা  দাড়িগোঁফ,  এবং  সমস্ত  পাঞ্জাবি  সম্প্রদায়ের  কাছে  তাঁর  সম্মান  দেখে,  তাঁর  অনুরোধ  উপেক্ষা  করতে  পারলাম না। বিনয়ের  সঙ্গে  বললাম,  আগে  জানতাম  না  তাই  সঙ্গে  স্নান  করার  কোন  কাপড়  নিয়ে  না  আসায়,  স্নান  করার অসুবিধা  আছে। ভাবলাম  সবজান্তা  বাঙালি  বুদ্ধিতে  এ  যাত্রা  বেঁচে  গেলাম।  ও  বাবা,  আমাদের  বাসের পরিচিত  পাঞ্জাবিরা  আমাদের  শুকনো  ভাঁজ করা   ধুতি  দিয়ে,  স্নান   করতে  বললেন।  বাধ্য  হয়ে  প্রথমে আমি  প্যান্ট  জামা  ছেড়ে  ধুতি  পরে,  হাঁটু  জলে  নামলাম।  মনে  হলো  এক হাঁটু  বরফে  পা   দু’টো   ঢুকে  গেল।  ডুব  না  দিয়ে  পারে  উঠে  এলাম।  পাঞ্জাবিরা  পারে  দাঁড়িয়ে,  একসাথে  হাত  নেড়ে  উৎসাহ  দিয়ে আমাকে  ডুব  দিতে  বললেন।  আবার  নামলাম,  আবার  উঠে  এলাম।  ডুব  দেওয়া  ঠিক  হবে  কী না  বুঝে  উঠতে  পারছি  না।  এবার আবার  সেই  বৃদ্ধ  সাধুবাবার  অনুরোধ।  যা  আছে  কপালে  ভেবে  ডুব  দিয়ে  দিলাম।  এক  ডুবেই  কাত,  পঞ্চ  ইন্দ্রিয়  বন্ধ  হবার জোগাড়।  চোখে  যেন  ঝাপসা  দেখছি,  কানের ভিতর  লক্ষ  ঝিঁঝিঁ   পোকা  একসাথে  গলা  সাধতে  শুরু  করে  দিল।  ঢোক্  গিললে  গলা সাধা  সাময়িক বন্ধ  করেই,  আবার  শুরু  হয়।  পাথর  ধরে  মিনিট  খানেক  দাঁড়াতে,  একটু  সুস্থ  বোধ  করলাম।  উঠে  এসে  গা  মুছে প্যান্ট  জামা  পরে  নিলাম।  দিলীপ  ও  মাধব  জলে  নামলো।  ওরা  ডুব  দিয়ে  জল  থেকে  উঠে  এসে  কাঁপতে  শুরু  করলো।  ওদের  ছবি তুলে  নিলাম।  সবার  পোষাক  বদল  হলে,  গুরুদ্বোয়ারার  ভিতর  গেলাম।  সঙ্গে  সঙ্গে  বড়  বড়  গ্লাশে  করে  গরম  চা  দিয়ে  গেল। এবার বুঝছি  স্নান  না  করলে  কী  ভুল  করতাম।  মনে  হচ্ছে  না  সাড়ে  পাঁচ  কিলোমিটার  পথ  হেঁটে,  পাঁচ  হাজার  ফুট  উচ্চতা  পেরিয়ে  এসে, আমরা  এখন  ১৫২০০  ফুট  উচ্চতায়  দাঁড়িয়ে  আছি।  একবারে  নতুন  উৎসাহ  ফিরে  পেলাম।  শরীরও  খুব  সুস্থ  বোধ  হচ্ছে।  ওনারা জানালেন  গুরু  গোবিন্দ্  সিং  এর  আশীর্বাদ।

            

হেমকুন্ড সাহেব

আকাশে  বেশ  মেঘ  আছে।  তীরথ  বললো  এবার  ফেরা  প্রয়োজন,  বৃষ্টি  আসলে  রাস্তায়  কষ্ট  হবে।  আরও  কিছুক্ষণ  ওখানে  কাটিয়ে, বারবার  পিছনে  তাকাতে  তাকাতে,  আমরা  ফেরার  পথ  ধরলাম।  এত  কষ্ট,  রাস্তায়  বাসে  বসে  নিদ্রাহীন  রাত্রিবাস,  সারাদিন  বৃষ্টিতে ভিজে  খাদে  পাথর  ঠেলে  ফেলার  প্রথম  সুফল পেলাম।  মনে  অনেক  জোর  বেড়ে  গেল।  মনে  হলো  আজই  একবার  নন্দন  কানন  ঘুরে গেলে  বেশ  হয়। মনের  ইচ্ছা  মনে  রেখেই  নেমে  আসছি।  দু’হাত  ভরে  যত  পারি  ব্রহ্মকমল  তুলে,  পলিথিন  ব্যাগে  ভরে নিলাম।  নানা রকম  ফুলও  দু’চারটে  করে  তুলে  নিলাম।  এ  যেন  দীঘার  সমুদ্র  পারে  ঝিনুক  সংগ্রহের মতো।  এগুলো   নিয়ে  কী  হবে  জানি  না, জানি  না  ব্রহ্মকমলগুলো  এত  সব  জায়গা  ঘুরে  বাড়ি  নিয়ে আসতে  পারবো  কী না।  ধীরে  ধীরে  আগেকার  পথ  ধরে  নেমে  আসছি। সেই  পুরানো  দৃশ্য।  আকাশ এখন  কিছুটা  পরিস্কার  হয়েছে।  যাবার  পথে  যে  চায়ের  দোকানটা  দেখে  গেছিলাম,  সেটার  কাছে  ফিরে এলাম।  তীরথ  আমাদের  সাথে  দোকানটায়  চা  খেতে  এল।  ওর  মা  ও  বোনও  কান্ডিতে  এসে  গেছেন।  তীরথ  আমাদের  পকোড়া, পাঁপড়  ভাজা  ও  চা  খাওয়ালো।  চা  খেতে  খেতে  তীরথ  হঠাৎ  একটা  অদ্ভুত  প্রস্তাব  করে  বসলো।  সে  আমাদের  জানালো  যে  তার অফিসের  ছুটি  খুব  কম।  মা,  ভগ্নিপতি  ও  বোনকে   নিয়ে  বদ্রীনারায়ণ  যাবে,  গরম  কুন্ডে  স্নান  করে  পূণ্য  অর্জন  করতে।  তাই  ও চায়  আজই  নন্দন  কানন  ঘুরে  আসতে।

আমার  মনেও  এই  ইচ্ছা  অনেকক্ষণ  থেকেই  উঁকি  দিচ্ছিল।  কিন্তু  তীরথ  আমাদের  সাথে  নন্দন  কানন  যেতে  চায়,  আকাশের  অবস্থাও  ভালো  নয়,  ও  তার  অসুস্থ  ভগ্নিপতিকে  কোথায়  রেখে  যাবে,  ইত্যাদি  ভেবে  আজ  আর  ওখানে  যাওয়ার  কথা  চিন্তাও করি  নি।  তীরথের  প্রস্তাব  শুনে  ওকে  বললাম,  নন্দন  কাননের  কিছু  ছবি  তোলার  ইচ্ছা  আছে।  আকাশের  অবস্থা  মোটেই  ভালো নয়,  সন্ধ্যাও  নেমে  আসবে।  কাজেই  আজ  ওখানে  যাওয়া  যেতেই  পারে,  কিন্তু  আজ  যদি  ভালো  আবহাওয়া  না  পাই,  তবে আগামীকাল  সকালে  ওখানে  আবার  যাব।  কিন্তু  আজ  সে  তার  ভগ্নিপতিকে  ওখানে  কী  ভাবে  নিয়ে  যাবে ?  তীরথ  জানালো  যে, সে  ওখানে  একাই  যাবে।  সে  বললো,  আমরা  আজ  নিশ্চই  ভালো  ওয়েদার  পাব।  না  পেলে  ও  আমাদের  আগামীকালের  যাত্রায়  সঙ্গ  দেবে।  বেশ  বুঝতে  পারছি,  ও  আসলে  যত  তাড়াতাড়ি  সম্ভব,  জায়গাগুলো  দেখে  নিতে  চাইছে।  ওর   ছুটি  একে   কম,  তার  ওপর   পথে  দু’দিন  অযথা  নষ্ট  হয়েছে।  আমরা  ওকে  সঙ্গ  না  দিলে,  ওর  পক্ষে  একা  যাওয়াও  সম্ভব  নয়।  আকাশ  নিশ্চই  পরিস্কার  হবে, অন্তত  ভালোভাবে  দেখবার  ও  ছবি  তুলবার  মতো  পরিস্কার  হবে,  এই  আশা  নিয়ে  এগলাম।  রাস্তায়  হেমকুন্ডে  সাঁতার  কাটা  সেই জাপানির  সাথে  আলাপ  হলো।  ও  কী  একটা  পড়বার  জন্য  গত  দুই  বৎসর  আমেরিকায়  ছিল।  ওখান   থেকে  কয়েকটা  দেশ  ঘুরে এখানে  এসেছে।  এখান  থেকে  আবার   দু’একটা  প্রতিবেশী  দেশ  ঘুরে,  নিজের  দেশে  ফিরে  যাবে।  ও  জানালো  এত  সুন্দর   দেশ  ও   আগে  দেখে  নি।  বললাম,  “তোমার  দেশেও  তো  খুব  সুন্দর  ফুল  ফোটে”?   সে  জানালো   সে  ফুলও  এত  সুন্দর  নয়।  ভাবলাম  তুমি এসেছ  ফুলের  রাজ্যে,  তা  নাহলে  দেখতে  জবা,  গাঁদা,  অপরাজিতা   বা  কলাফুলে   চারিদিক  ঘিরে  আছে।  একসময়  যে  জায়গাটা  থেকে  রাস্তা  দু’দিকে  বেঁকে  ভাগ  হয়ে   গেছে,  আমরা  সেখানে  চলে  এলাম।  স্থির   হলো  আমরা  আজই  নন্দন  কানন  যাব।  দিলীপ  জানালো,  ওর  পক্ষে  আজ  আর  হাঁটা  সম্ভব  নয়।  আমাদের  পক্ষেও  যে  কতটা  সম্ভব  জানি না।  তবু   হেমকুন্ড  ঘুরে  এসেছি  বলেই  বোধহয়,  নিজেকে  কেমন  বীর  বীর  মনে  হচ্ছে।  আমরা  ওকে  বললাম,  আজ  আমরা  তীরথকে  নন্দন  কানন  দেখিয়ে  নিয়ে  আসি।  কাল  ওকে  বদ্রীনারায়ণ  পাঠিয়ে  দিলে  আমরা  মুক্ত।  কাল  সকালে  আমরা  তিনজন  আবার  নন্দন  কানন  যাব।  দিলীপের  হাতে  ফুলের  ব্যাগ  ও  কাপড়ের  ব্যাগদুটো  দিয়ে,  ওয়াটারপ্রুফ  হাতে  নিয়ে,  আমরা  নন্দন  কাননের  রাস্তা  ধরলাম।  ওরা  নীচে  গুরুদ্বোয়ারার  উদ্দেশ্যে  যাত্রা  করলো।

একটু  এগিয়েই  বৃষ্টি  শুরু  হলো।  গায়ে  ওয়াটারপ্রুফটা  চাপিয়ে  নিলাম।  মাথায়  একটা  সুর্যালোক  ঢাকবার জন্য  কাপড়ের  টুপি পরেছিলাম,  তার   ওপরে  বর্ষাতির  টুপিটা  দিয়ে  হাঁটতে  লাগলাম।  কিছুক্ষণ  পরে মাথা  ভিজে  যাচ্ছে  দেখে  মাথায়  হাত  দিয়ে  দেখি, হায়  কপাল,  সেটা  কখন  আমায়  ত্যাগ  করে  চলে গেছে।  মহা  চিন্তায়  পড়লাম।  এভাবে  পথ  চলা  অসম্ভব।  ভবিষ্যতেই  বা  কী করবো ?  তীরথকে  ডেকে বিপদের  কথা  বললাম।  ও  এখন  ভগ্নিপতি  ছাড়া  হয়ে,  এবং  আজই  নন্দন  কানন  দেখার  সুযোগ  পেয়ে, আনন্দে  তিনগুণ  গতিতে  চলেছে।  ও   যে  পাহাড়ি  রাস্তায়  কত   জোরে  হাঁটতে  পারে,  এতক্ষণে  বুঝতে পারছি।  ও  আমায়  বললো,  যে আমি  ওর  বর্ষাতির  টুপিটা  নিতে  পারি,  কারণ  ওর  বর্ষাতির  সঙ্গে আটকানো  আর  একটা  টুপি  আছে।  আমি  বললাম,  কিন্তু এরপর?   ও  জানালো,  ওর  দু’টো  বর্ষাতি টুপির  কোন  প্রয়োজন  নেই,  কাজেই  এই  টুপিটা  আমি  স্বচ্ছন্দে  নিজের  কাছেই  রাখতে পারি।  মুশকিল হলো  ওর  টুপির  মাপ  অনেক  বড়,  আমার  চোখ  ঢেকে  যাচ্ছে।  কোন  রকমে  চারপাশে  মুড়ে,  ছাই  রঙের বর্ষাতির সঙ্গে  গোলাপি  রঙের  টুপি  পরে,  জোকার  সেজে  এগতে  শুরু  করলাম।  সামনে  একটা  গ্লেসিয়ার পড়লো।  একটা  মাঠের  মতো  পাথুরে অংশের  ওপর  দিয়ে  গিয়ে  গ্লেসিয়রটা  পার  হতে   হবে।  সাবধানে  চলেছি।  দেখি  কতগুলো  ছেলে  গ্লেসিয়ার  কেটে  রাস্তার  মতো  তৈরি করছে।  ওরা  তীরথের  কাছে  কিছু  সাহায্য  চাইলো।  তীরথ  পকেট  থেকে  কিছু  খুচরো  পয়সা  বার  করে,  তাদের  দিয়ে  এগিয়ে  গেল।

হঠাৎ  লক্ষ্য  করলাম,  তীরথ   যে   জায়গাটায়  দাঁড়িয়ে  আছে,  সেখানকার  গ্লেসিয়ারটা  কিরকম  ঝুলছে। গ্লেসিয়ারের  ঐ  অংশের  বরফ কিরকম  গলে  গিয়ে  একটা  পাতলা  বরফের  তক্তার  মতো  হয়ে  রয়েছে। তক্তার  শেষ  দিকটা  পাতলা  হয়ে  বিপজ্জনক  অবস্থায়  ঝুলছে, আর  তীরথ  ঠিক  সেই  পাতলা  বরফের  তক্তাটার  ওপর  দাঁড়িয়ে  আছে।  তক্তার  অনেক  নীচ  দিয়ে  তীব্র  বেগে  জল  বয়ে  যাচ্ছে।  যে কোন  মুহুর্তে বরফের  তক্তাটা   ভেঙ্গে   গিয়ে  তীরথকে  নিয়ে  অনেক  নীচের  জলপ্রবাহে  পড়তে  পারে।  ভয়ার্ত  গলায় চিৎকার  করে  ওর নাম  ধরে  নীচ  থেকে  ডাকলাম।  ও  বোধহয়  ইশারা  বুঝতে  পেরে,  লাফ  দিয়ে অনেকটা  বাঁপাশে  চলে  গেল,  এবং  সেখানেই  সে  চুপ করে  দাঁড়িয়ে  রইলো।  আমরা  ওর  কাছে  যেতে  ও আমাকে  ওর  প্রাণ  বাঁচানোর,  অন্তত  পক্ষে  চরম  বিপদের  হাত   থেকে  রক্ষা  করার জন্য , বার   বার ধন্যবাদ  জানিয়ে,  দু’হাত  ভরে  মনাক্কা,  কিশমিশ  ইত্যাদি  দিয়ে,  আমাদের  সাথে  এগিয়ে  চললো।  ক্রমশঃ ওর  থেকে আমাদের  ব্যাবধান  আবার  বাড়তে  লাগলো।  সকাল  থেকে  শুধু  কয়েক  কাপ  চা   আর তীরথের  মনাক্কা,  কিশমিশ,  পেস্তা,  ছোট এলাচ খেয়ে  রয়েছি।  নিশ্বাস  নিতে  খুব  কষ্ট  হচ্ছে,  বোধহয় দম  ফুরিয়ে  এসেছে।  মাধব  আমার  থেকে  কিছুটা  এগিয়ে,  তীরথকে  বহুদুরে দেখা  যাচ্ছে।  একসময়  আমরা  আবার  মিলিত  হলাম।  তীরথ  আমাদের  জন্য  অপেক্ষা  করছিল।  একটা  ছেলে  নন্দন  কানন  থেকে ফিরছে।  সে  আমাদের  আর  এগতে  বারণ  করে  জানালো,  রাস্তা  খুব  খারাপ,  বৃষ্টি  হচ্ছে,  আর  এগলে  ফিরতে  অসুবিধা  হবে।  তীরথ জিজ্ঞাসা  করলো  আমাদের  কী  করা  উচিৎ।  মাধব  কিছু  বলার  আগেই  আমি  বললাম,  এতটা  পথ  কষ্ট  করে  এসে,  ফিরে  যাওয়া চলে  না।  যা  আছে  কপালে  হবে।  ওরা  রাজি হলো।  তীরথ   বললো,  ও  এগিয়ে  যাচ্ছে।  যাবার  আগে  ও  আবার  আমাদের  ওর  সেই বিখ্যাত  খাবার  দিতে  গেল।  আমরা  জানালাম  হাতে  এখনও  যথেষ্ট  পরিমান  আছে।  ও  বললো,  আমি  কী  এগুলো  একা খাবার  জন্য অত  দুর  থেকে  নিয়ে  এসেছি ?  ও  আমাদের  বর্ষাতির  পকেটে  অনেকটা  করে  ঐসব  দিয়ে, এগিয়ে  গেল।  এবার  দ্বিতীয়  একটা গ্লেসিয়ার  পড়লো।  সাবধানে   পার  হয়ে  রাস্তায়  উঠলাম।  এপথে  কান্ডি  বোধহয়  যায়  না,  তবে  ঘোড়া  বা  খচ্চরের  যাতায়াত  আছে বোঝা  যাচ্ছে।  রাস্তা  বলতে  অভ্রযুক্ত পাথরের  টুকরো  ইতস্তত  ভাবে  ফেলে  তৈরি।  অসম্ভব   ধারালো  পাথর,  খালি  পায়ে  হাঁটলে,  পা কেটে  যাবেই।  বৃষ্টির  জল  ও  ঘোড়ার  মলে  রাস্তা  আরও  পিছল  হয়ে  আছে।  দুরে  দেখলাম  সবুজ  বন।

একটা  ব্রিজ  পার  হয়ে  তীরথের  কাছে  এসে  হাজির  হলাম।  বিরাট  এলাকা  নিয়ে  এই  ফুলরাজ্য।  এখান থেকে  ঘাংরিয়ার  দুরত্ব,  প্রায় সাড়ে  তিন  কিলোমিটার।  তবে  ভালোভাবে  নন্দন  কাননকে  দেখতে  হলে, আরও  দেড়-দুই  কিলোমিটার  পথ  এগতে  হবে।  এক  হাত থেকে  এক  বুক  পর্যন্ত  ফার্ণ  জাতীয়  গাছের মধ্যে  দিয়ে  পায়ে  হেঁটে  ঘুরতে  হবে।  দুর  থেকে  সবুজ  বন বলে  মনে  হবে।  দু’হাত  দিয়ে জঙ্গল  সরিয়ে  বনের মধ্যে  না  ঢুকলে,  ফুল  পাওয়া  যাবে  না।  বেশিরভাগ  ফুলের  আকারও  খুব   ছোট   ছোট।  বই এ পড়েছিলাম, এখানে  জোঁকের  উপদ্রব  খুব  বেশি।  একটা  সরু  ঝরনার  মতো  জলের  ধারার  জল  খেয়ে, আমরা  বনে  প্রবেশ  করলাম।  বুঝতেই পারছি  সমস্ত  জামা  প্যান্ট   ভিজে  যাবে।  বর্ষাতি  গায়ে  থাকায়, শুধু  প্যান্ট   ভিজতে  শুরু  করলো।  এক  এক  রঙের  ফুল,  এক  এক  জায়গায়  ফুটে  আছে।  কী  তাদের রঙ।  মনে  হয়  যেন  ফুলের  রঙ  অনুযায়ী  ফুলের  গাছ  বিভিন্ন  জায়গায়  লাগানো  হয়েছে।  মাইকের  চোং এর  মতো   দেখতে  একরকম  ফুল   দেখলাম।  যত  রঙ,  যত  কারুকার্য,  সব  ফুলের  ভিতরের  অংশে, ফুলের  বাইরেটা   কিরকম  বিশ্রী  ফ্যাকাশে   সবুজ  রঙের।  চারিদিকে  একরকম   হলুদ  ও  সাদা  রঙের ফুলের  ঝাড়  চোখে  পড়ছে।  রজনীগন্ধার  মতো  বড়  বড়  ডাঁটার  ওপর  থোকা  থোকা  ফুল,  অনেকটা এলাকাকে  হলুদ  বা  সাদা  করে,  সব  গাছের  ওপরে  মাথা  তুলে  দাঁড়িয়ে  আছে।  উপত্যকার  চারিদিকের পাহাড়ের  ওপরেও  সবুজ  বনের  রাজত্ব।  ওখানেও  হয়তো  এইসব  ফুল  পাওয়া  যাবে,  হয়তো  এর  থেকেও সুন্দর  ফুলেরা  লোকচক্ষুর  আড়ালে  ওখানেই  বসবাস  করে।  তীরথ  তার  মা,  ও  বোনকে  দেখাবার  জন্য যেসব ফুল  হেমকুন্ড  সাহেবে  দেখে  নি,  সেইসব  ফুল  তুলে  সংগ্রহ  করতে  শুরু  করলো।  এখানে  কিন্তু ব্রহ্মকমল  পাওয়া  যায়  না।  বিস্তীর্ণ  এলাকা  ঘুরেও,  আমাদের  অন্তত  একটাও   চোখে  পড়ে  নি।  সম্ভবত এখানকার  উচ্চতা  হেমকুন্ডের  তুলনায়  অনেক  কম   বলে,  এই  অঞ্চলে  এই  ফুল   ফোটে  না।   হেমকুন্ডে আরও  কিছু  ব্রহ্মকমল  তুলবার  ইচ্ছা  ছিল,  কিন্তু  দিলীপ  ও  মাধব  বলেছিল,  আজ  না  তুলে  আগামীকাল বরং  নন্দন  কানন  থেকে  তুলে  নেওয়া  যাবে।  শুধু  শুধু  আগে  থেকে  তুলে  শুকনো  করার  দরকার  কী? এখন  আফসোস  হচ্ছে।  এখন  হাজার  চেষ্টা  করলেও  আর  পাওয়া  যাবে  না।

            

নন্দন কানন (ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স)

হেমকুন্ডে  একরকম  বেগুনি  রঙের  দোপাটির  মতো  ফুল   দেখেছিলাম,  এখানে  সেই  ফুল  অজস্র  ফুটে  আছে,  তবে  সব  হলুদ  রঙের। এবার  বর্ষা   অনেক  দেরিতে  এসেছে,  এখনও  আসেনি  বললেই  ঠিক  বলা  হবে।  তাই  সব  ফুল  এখনও  ফোটে  নি।  অদ্ভুত  অদ্ভুত  সব ফুলের  কুঁড়ি  হয়ে  আছে।  ফুলের  বন  দিয়েই যাত্রীরা  ঘুরে  বেড়ায়,  ফলে  অনেক  গাছ  কাত  হয়ে  মাটিতে  শুয়ে  আছে।  আমরা  ঠিক করলাম  এবার ফেরা  উচিৎ।  বৃষ্টিত  ভিজে,  জামা  প্যান্ট  ভিজিয়ে,  এত  কষ্ট  করে  এতটা  পথ  হেঁটেও,  খুব  একটা  নতুন কিছু  উল্লেখযোগ্য  ফুল  পেলাম  না।  ঠিক  করলাম  কাল  আর  আসবো  না।  দিলীপ  হয়তো  আমাদের কথা  বিশ্বাস  করবে  না।  তাই  তীরথকে  বললাম,  ওকে  একটু  বুঝিয়ে  বলতে।  ও  বললো,  ওর  হাতের  ফুল  দেখিয়ে  দিলীপকে  বলবে,  এর  থেকে  বেশি  নতুন  ধরণের  ফুল,  নন্দন  কাননে  নেই।  জীবনে  আর হয়তো  দ্বিতীয়বার  এখানে  আসার  সুযোগ  হবে  না,  তাই  বৃষ্টির  মধ্যেও  তীরথকে  নিয়ে  নন্দন  কাননের  দু’টো  ছবি  তুলে  নিলাম।  হঠাৎ  জোরে  বৃষ্টি  নামতে  আমরা  দ্রুত  পা  চালালাম।  বৃষ্টির  তোড়ে  নিশ্বাস  নিতে  কষ্ট  হচ্ছে।  একে  বৃষ্টি,  তার  ওপর  ভীষণ  জোরে  হাওয়া  বইছে।  বৃষ্টির  ছাটে  ভাল  করে  তাকানো  পর্যন্ত  যাচ্ছে  না।  তিনজনে  লাইন  দিয়ে  হেঁটে  বন  পেরিয়ে  রাস্তায়  উঠলাম।  এই  অবস্থাতেও  তীরথ  ওর  মা   ও   বোনের  জন্য   নতুন  ফুলের  অনুসন্ধান  চালিয়ে  যাচ্ছে।  আমরাও  ওর  কাজে  সাহায্য  করতে  করতে  পথ  চলছি।  রাস্তার  সেই  ছেলেটা  ছাড়া  আর  কাউকে  এতক্ষণ  পর্যন্ত  চোখে  পড়ে  নি।  আমরা  তিনজনেই  এত  বড়  ফুলের  সাম্রাজ্যে  বিচরণ  করছি।  রাস্তা  আরও  পিচ্ছিল  হয়ে  গেছে।  টুকরো  টুকরো  পাথরগুলো  ফেলে  যেন  আরও   বিপদ  সৃষ্টি  করেছে।  যতটা  সম্ভব  মুখ  ঢেকে,  প্রায়  ছুটে  আমরা   নীচে নেমে  আসছি।  গ্লেসিয়ারগুলো  একে  একে  লাঠি  ঠুকে  ঠুকে  অতিক্রম  করে  এলাম।  বর্ষাতি   আমাদের  বৃষ্টির  হাত  থেকে  রক্ষা  করতে  পারছে  না।  আমরা  প্রায়  সম্পূর্ণ  স্নান  করে  গেছি।  অবশেষে  একসময়  সমস্ত  কষ্টের  সমাপ্তি  ঘটিয়ে  ছুটে  গুরুদ্বোয়ারার  হলঘরে  ঢুকলাম।

তীরথের মা, বোন ও দিলীপ ঘুমিয়ে পড়েছে বলে মনে হলো। বাইরে প্রবল বৃষ্টি, হলঘরের ভিতরে অসম্ভব ঠান্ডায়, মোটা মোটা কম্বল গায়ে দিয়ে ওরা আরামে শুয়ে আছে। আমরা বৃষ্টিতে সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে ঠান্ডায় কাঁপছি। আমাদের দু’জনের আবার ঐ অবস্থায় থাকা ছাড়া উপায়ও নেই। কারণ সঙ্গে কোন দ্বিতীয় পোষাক নেই। দিলীপকে ডেকে সব বললাম। আগামীকাল আর ওখানে যাবার কোন যুক্তি নেই, তাও জানালাম। আজ ও আমাদের সাথে বেগার যায়নি বলে, নিজেকে নিজে ধন্যবাদ জানালো, নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করলো। আমি আর মাধব বাইরের চায়ের দোকানে এসে, আলুর পরোটা আর কফি খেলাম। দোকানের একটা ছেলেকে দিয়ে তীরথদের জন্যও পাঠালাম। একটু পরেই দিলীপ দোকানে এল। দোকানদার আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, আমরা আজ নন্দন কানন গিয়েছিলাম কী না। বললাম গিয়েছিলাম, তবে ফুল সেরকম পেলাম না। আমাদের জায়গাটা খুব একটা ভালো লাগেনি। দোকানের বাইরের দিকে এক ভদ্রলোক বসে চা খাচ্ছিলেন। তিনি বললেন নন্দন কানন যেতে, একটা নদী পার হতে হয়। ঐ নদীর কাছে একটা গ্লেসিয়ার ভেঙ্গে গেছে। ভাঙ্গা গ্লেসিয়ারের ওপারে অনেক ফুল আছে। উনি ভাঙ্গা গ্লেসিয়ার পার হয়ে ওপারে যেতে সাহস করেন নি। তবে একজন ভদ্রলোক ওপারে গিয়েছিলেন, তার কাছ থেকে তিনি এ কথা শুনেছেন। দোকানদার আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, আমরা কবরখানা পর্যন্ত গিয়েছিলাম কী না। তার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। অনেক দিন আগেই একটা বইতে নন্দন কাননের কবর সম্বন্ধে পড়েছিলাম। যাঁর কবর, সেই জোয়ান মার্গারেট লেগি সম্বন্ধেও অনেক কিছু পড়েছিলাম। উনি নাকি ইংল্যান্ড থেকে ফুলের বীজ সংগ্রহে এখানে এসে মারা যান। ঠিক করে এসেছিলাম, কবরটা দেখতে যাব, ফুল দেব, ছবি তুলবো। আর কার্যক্ষেত্রে একবারে ভুলেই গেলাম? আসলে বৃষ্টি আর রাস্তার কষ্ট, আমাদের সব গোলমাল করে দিয়েছে। দোকানদার এবার বললো, ঐ কবরখানার কাছেই আসল ফুল পাবেন, আপনারা নন্দন কাননের আসল জায়গাটাই যান নি। দ্বিতীয় গ্লেসিয়ার থেকে নন্দন কাননের এলাকা শুরু হলেও, যত ভিতরে যাবেন, তত নতুন নতুন ও সুন্দর ফুলের সন্ধান পাবেন। এরপরেও সেখানে না গিয়ে ফিরে যাই কী করে? বন্ধুদের বললাম, কাল ভোরে এই দোকান থেকে পরোটা, ডিমসিদ্ধ কিনে নিয়ে, আমরা আবার নন্দন কানন যাব। তীরথকে বলবো ও যেন গোবিন্দঘাট চলে যায়, সম্ভব হলে বদ্রীনারায়ণ। আমরা নন্দন কানন থেকে সোজা গোবিন্দ ঘাট, সম্ভব হলে বদ্রীনারায়ণ চলে যাব।

গুরুদ্বোয়ারার হলঘরে ফিরে এসে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। তীরথকে আমাদের প্ল্যান জানালাম। ও রাজি হলো। ঠিক হলো আগামীকাল বিকেলে গোবিন্দঘাটে আবার আমাদের দেখা হবে। শুয়ে শুয়ে ভাঙ্গা গ্লেসিয়ারটা কিরকম জিনিস, তার থেকে বিপদের সম্ভাবনাই ব কতটা, চিন্তা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই তীরথ আমাদের খেতে যাবার জন্য ডাকাডাকি শুরু করলো। আমার আর মাধবের কিন্তু কম্বল থেকে বার হবার যথেষ্ট অসুবিধা আছে। জামা প্যান্ট একবারে ভিজে যাওয়ায়, আমি আর মাধব, খালি গায়ে জাঙ্গিয়া পরে কম্বলের তলায় শুয়ে আছি। এই হলঘরে সমস্ত পাঞ্জাবি পুরুষ ও মহিলারা আছেন। এই অবস্থায় কম্বল থেকে বার হওয়া মুশকিল। বললাম, আমাদের একদম খিদে নেই। ও কিন্তু কিছুতেই ছাড়বে না। এতবড় রাত না খেয়ে থাকা অন্যায় হবে, শরীর খারাপ হবে, এবং ওদের পক্ষেও অকল্যানকর হবে, ইত্যাদি বলতে শুরু করলো। সব বুঝছি, কিন্তু কী করে ওকে আমাদের আসল সমস্যার কথাটা বলি? আমরা জানালাম, সত্যিই আজ আমাদের খিদে নেই, তোমরা খেয়ে এস। কিছু মনে কোর না। তীরথের মা বললেন, “খিদে পেলে তোমরাই কষ্ট পাবে, আমাদের আর কী”? তাদের চিন্তা করতে বারণ করে, ভালো করে কম্বল চাপা দিলাম। শুয়ে শুয়ে বুঝতে পারছি, বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। কাল কী হবে কে জানে। ভীষণ জল পিপাসা পেয়েছে। কম্বলের তলায় শুয়ে শুয়ে আবার প্যান্ট জামা পরে, বর্ষাতি চাপিয়ে, ঘর থেকে ঠান্ডায় বার হয়ে জল খেয়ে, আবার সবার অগোচরে প্যান্ট জামা খুলে শুতে হবে ভেবে, জল খাবার ইচ্ছা ত্যাগ করলাম। শুয়ে শুয়ে কখন ঘুম এসে গেল।

অবশেষে আবার সেই তীরথের ডাক। ভোর হয়ে গেছে। আজ বিশ-এ আগষ্ট। আজ আমরা তিনজন নন্দন কানন যাব। রাস্তা আমাদের চেনা, অসুবিধা হবার কথা নয়। দোকান থেকে চা খেয়ে, তীরথদের জন্য চার কাপ চা পাঠিয়ে দিয়ে, আমরা গতকালের মতো রাস্তার ধারে ঝরনার নালার পাশে, সকালের কাজ সারতে গেলাম। ও বাবা! হেমকুন্ডে ব্রহ্মকমল যেমন চারিদিকে ফুটে ছিল, এখানেও বনের চারিদিকে লাল, সবুজ, নীল, সাদা পাগড়ির ফুল ফুটে আছে। ওরাও বনের এদিক ওদিক একই উদ্দেশ্যে বসে পড়েছে। আমরাও পছন্দ মতো জায়গা দেখে, কাজ সেরে নিলাম।

তীরথরা তৈরি, তৈরি আমরাও। তবে ওদের পথ গুরুদ্বোয়ারা থেকে বেড়িয়ে ডানদিকে, আর আমরা যাব বাঁদিকে। ওরা যাবে গোবিন্দঘাট, আমরা নন্দন কানন। তীরথকে বললাম, “তুমি যদি আজ বদ্রীনারায়ণ যাও, তাহলে গোবিন্দঘাটে আমাদের মালপত্র একজায়গায় সাজিয়ে রেখে ওদের বলে যেও, যাতে আমাদের মালপত্র নিতে কোন অসুবিধা না হয়। গোবিন্দঘাটে আমাদের সমস্ত মালপত্র, একই জায়গায়, একই খোপে সাজিয়ে রাখা আছে”। তীরথ আমাদের চিন্তা করতে বারণ করলো। আমরা তিনজনে কাঁধে যে যার ব্যাগ নিয়ে, হাতে লাঠি ও একটা মাত্র ওয়াটার বটল্ নিয়ে, শুভযাত্রা শুরু করলাম। গুরুদ্বোয়ারায় ফুলের পলিথিন ব্যাগ দু’টোর মুখে গিঁট দিয়ে একপাশে রেখে গেলাম। আর রেখে গেলাম, বাকি দু’টো ওয়াটার বটল্।

হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমরা দ্বিতীয় গ্লেসিয়ারটার কাছে পৌঁছলাম। আকাশ একবারে পরিস্কার, সুন্দর রোদ উঠেছে। এখনও সেই ভদ্রলোকের কাছে শোনা, নদী ও ভাঙ্গা গ্লেসিয়ারের কথা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। আস্তে আস্তে একসময়, গতকাল যেখান থেকে প্রথম ফার্ণ জাতীয় গাছের বনে ঢুকেছিলাম, ব্রিজ পার হয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হলাম। আজ আর বর্ষাতি গায়ে নেই, ফলে প্যান্টের সাথে জামা ও সোয়েটারও ভিজেছে। শুনেছিলাম জোঁকের উপদ্রব আছে, কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত জোঁকের দেখা না পেলেও, আর একটা জিনিসের উপদ্রব দেখছি অনেক বেশি। সামনে বিরাট অঞ্চল জুড়ে বেগুনি ও হলুদ রঙের দোপাটির মতো একপ্রকার ফুলের জঙ্গল। দেখলে মনে হবে কেউ চাষ করেছে, কারণ এখানে এ ছাড়া অন্য কোন ফুল নেই। অনেকটা অঞ্চল জুড়ে, যেন একটা বড় মাঠে, এই ফুলের চাষ করা হয়েছে। দিলীপকে বললাম ফুলের জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়াতে, উদ্দেশ্য একটা ছবি তোলা। একটা বড় পাথর পড়ে আছে। তার ওপরে উঠে ছবি নেব বলে প্যান্টটা যেই একটু তুলেছি, ব্যাস হাঁটু পর্যন্ত বিছুটি লেগে গেল। চুলকাতে চুলকাতে প্রাণ যায় আর কী। ছবি তুলে আবার এগিয়ে চললাম। গতকালের জায়গাটা পেরিয়ে প্রায় মাইল খানেক যাওয়ার পর চোখে পড়লো, ভাঙ্গা গ্লেসিয়ারটা। ভাঙ্গা বললে ভুল হবে। আসলে একটাই গ্লেসিয়ার ওপর থেকে নীচে নেমে এসেছে। কিন্তু মাঝখান থেকে দু’ভাগে বিভক্ত। মাঝখানটা দিয়ে একটা দশ-বার ফুট চওড়া নদী বা ঝরনার জল, প্রবল বেগে গড়িয়ে নেমে আসছে। কিছুটা এগিয়েই নদীটা আবার গ্লেসিয়ারের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। ঐ জায়গাটা কিরকম বিরাট একটা গর্ত মতো। যেন গ্লেসিয়ারটা নদীটাকে গ্রাস করবার জন্য বিশাল হাঁ করে আছে। ওখানে পড়লে গ্লেসিয়ারের ভিতর দিয়ে কোন্ রাজ্যে নিয়ে যাবে জানি না। কবরটার কাছে যেতে হলে, নদীটার অপর পারে যেতে হবে। একটু এগিয়ে দেখলাম দু’জন কুলি দু’টো তাঁবু খাটাচ্ছে। দুই যুবক এবং এক যুবতী তাঁবুর ধারে বসে আছে। বুঝলাম আজ রাতে ওরা এখানেই থাকবে। আলাপ করে জানলাম, এক যুবক এসেছে নৈনিতাল থেকে, আর এক যুবক বোম্বাই থেকে। কী ভাবে যোগাযোগ হলো ওরাই জানে। যুবতীটি মাদ্রাজ বা আসামের কী না জানবার ইচ্ছা হলেও, মনের ইচ্ছা মনেই চেপে রেখে, কুলিদের কাছে কবরখানার খোঁজ নিলাম।

নদীটার ওপর ছোট বড় অনেক পাথর পড়ে আছে। কোনটা জলের তলায়, কোনটা বা মাথা বার করে আছে। জলের গভীরতা না থাকলেও, গতি খুব বেশি। পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে, জলের রঙ দুধের মতো সাদা দেখাচ্ছে। দিলীপ ও মাধবকে বললাম, জুতো খুলে ফেলতে। আমি আগে নদী পার হয়ে গিয়ে, ওদের হাত থেকে মালপত্র নিয়ে নেব। তারপরে ওরা একে একে, আমার বাড়ানো লাঠি ধরে পাথরের ওপর দিয়ে পা ফেলে নদী পার হয়ে যাবে। এই ব্যবস্থা পাকা করে, পাথরের ওপর লাফ দিয়ে দিয়ে নদী পার হয়ে, অপর পারে গিয়ে দাঁড়ালাম। অদ্ভুত ব্যাপার, নদীর এপারটা আবার পুরো বরফে আচ্ছাদিত, খালি পায়ে দাঁড়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। মাধবকে বললাম একটা একটা করে জুতোগুলো ছুড়ে দিতে। মাত্র দশ-বার ফুট দুর থেকে ওগুলো আমি সহজেই লুফে নিতে পারবো। মাধবের কিন্তু অন্য মত। সে বললো, লোফালুফিতে যথেষ্ট ঝুঁকি আছে। ঠিকমতো লুফতে না পারলে, নদীতে পড়ে যেতে পারে। আর একবার নদীতে পড়লে, গ্লেসিয়ারের সেই হাঁ করা গর্ত দিয়ে গ্লেসিয়ারের ভিতর চলে যাবে। তাই ও ঠিক করলো একটা একটা করে জুতো, ও আমার দিকের পারে, বরফের ওপর ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। সেইমতো ও ওপার থেকে প্রথম পাটি জুতোটা দক্ষ ক্রিকেটারের স্টাইলে এপারে ছুড়লো, এবং আমরা চরম বিপদের মধ্যে পড়লাম। হান্টার শূ-এর পিছন দিকটা সামনের দিকের তুলনায় অনেক বেশি ভারী। ও জুতোর ফিতে ধরে জুতোটা এপারে বেশ জোরে ছোঁড়ায়, ওটা এপারে না এসে, সোজা ওপরদিকে অনেকটা উঠে গেল। আমি এক পা নদীতে বাড়িয়ে কোনমতে ওটাকে লুফে নেবার চেষ্টা করলাম। ক্রিকেট খেলায় ওভার বাউন্ডারি মারতে গিয়ে যেমন মাঝেমাঝে, বল মাঠের বাইরে না গিয়ে অনেক ওপরে উঠে মাঝমাঠে পড়ে, ঠিক সেই রকম ভাবে আমার প্রায় হাত খানেক দুর দিয়ে অনেকটা ওপর থেকে ওটা নদীতে গিয়ে পড়লো, এবং সঙ্গে সঙ্গে নদীর প্রবল স্রোতে, নীচের দিকে বরফের গহ্বরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। পা দিয়ে ওটাকে কোনমতে অপর পারে কিক্ করে পাঠাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু চোখের নিমেষে সেটা আমার পায়ের পাতার ওপর দিয়ে চলে গেল। নদীর ওপারে, যেখানে দিলীপ দাঁড়িয়ে, সেখানে ওটাকে এক মুহুর্তের জন্য দেখা গেল। চিৎকার করে ওকে লাঠি দিয়ে ওটাকে আটকাতে বললাম। কিন্তু ও দেখতে পাবার আগেই, সেটা আবার জলের তলায় চলে গেল। বুকের মধ্যে যেন কেমন করে উঠলো। টাকা পড়ে গেলে তবু টাকার যোগাড় করা যাবে, অন্তত ফিরে আসা যাবে। কিন্তু জুতো? জুতো কোথায় পাব? তিন তিনটে গ্লেসিয়ার পেরিয়ে, জোঁক ও বিছুটি বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গিয়ে, অভ্রযুক্ত ধারালো পাথরের ওপর দিয়ে পাঁচ কিলোমিটার পথ খালিপায়ে বা একপায়ে জুতো পরে হাঁটলে, তবে ঘাংরিয়া। সেখানে কোন দোকান নেই। ওখান থেকে তের-চোদ্দ কিলোমিটার পথ হাঁটলে, গোবিন্দঘাট। এ পথটাও উচুনীচু অসমান পাথুরে পথ। ওখানে চায়ের দোকান কয়েকটা আছে বটে, কিন্তু জুতোর দোকান কোথায়? ওখান থেকে বাসে পঁচিশ কিলোমিটার রাস্তা গিয়ে বদ্রীনারায়ণ। ওখানে বদ্রীবিশালের কৃপায়, জুতো হয়তো কিনতে পাওয়া যাবে, তবে ভালো নরম জুতো পাওয়া যাবে কী না, বা পায়ের মাপে পাওয়া যাবে কী না, যথেষ্ট সন্দেহ আছে। নন্দন কাননের রাস্তা ঘোড়ার মলে ভর্তি। এপথে খালিপায়ে হাঁটতে গেলে ধারালো পাথরে পা কাটবেই, আর তার ওপরে ঘোডার মলের প্রলেপ? স্বর্গের রাস্তা পরিস্কার।

হাঁ করে দাঁড়িয়ে চিন্তা করার সময় নেই। আমার দিকের পারে, একটু দুরে বরফের গহ্বরের কাছে, একটা পাঁচ-ছয় ফুট উচু প্রায় গোলাকার পাথর রয়েছে। পাথরটার পিছনে সাত-আট ফুট দুরে সেই মৃত্যু গহ্বরে নদীটা ঢুকে যাচ্ছে। দৌড়ে পাথরটার কাছে গিয়ে হাতের চাপ দিয়ে ওটার ওপরে উঠেই, দেখতে পেলাম আমাদের পরম আরাধ্য দেবতাটিকে। ফিতেটা একটা পাথরের তলায় কী ভাবে আটকে গিয়ে জলের স্রোতে বনবন্ করে ঘুরছে। যেকোন মুহুর্তে ফিতে ছিঁড়ে বা পাথর থেকে আলগা হয়ে, সঙ্গে সঙ্গে বরফের ভিতর চলে যাবে। চিৎকার করে মাধবকে ডাকলাম, উদ্দেশ্য ও এসে আমায় ধরবে। আমি নীচে নেমে ওটাকে তুলে আনবো। মাধব কী করবে ভেবে পেল না। সময়ও আর নষ্ট করা চলে না, যা করার এখনই করতে হবে। বিপদ মাথায় করে নীচে গহ্বরের কাছে বরফের ওপর লাফ দিলাম। যে গ্লেসিয়ারের ওপর একটু আগে হাঁটতে ভয় পাচ্ছিলাম, সমতল হওয়া সত্ত্বেও লাঠি দিয়ে ঠুকে ঠুকে হাঁটছিলাম, সেই গ্লেসিয়ার, তা আবার নীচের দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে, এবং একটু দুরেই ওরকম মৃত্যু গুহা থাকা সত্ত্বেও, অত উচু পাথরের ওপর থেকে কোন কিছু না ভেবে স্বচ্ছন্দে লাফ দিয়ে দিলাম। এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে, জুতোটাকে দু’হাতে চেপে ধরলাম। ওঃ! সেই মুহুর্তে কী যে আনন্দ পেলাম কী বলবো। আমার সামনে বড় পাথরটা, তাই মাধবরা কী করছে দেখতে পাচ্ছি না। জুতো হাতে উঠে দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ একভাবে খালিপায়ে বরফের ওপর লাফঝাঁপ করে, পা দু’টো ঠান্ডায় প্রায় অবশ হয়ে গেছে। উত্তেজনায় এতক্ষণ বুঝতে পারি নি। এখন দেখছি সোজা হয়ে দাঁড়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। মাধবরা এখন আমায় দেখতে পাচ্ছে। ওরা দুর থেকেও আমার অবস্থার কথা বুঝে ফেলেছে। মাধব দু’হাত নেড়ে চিৎকার করে আমায় বসে পড়তে বলছে। কিন্তু বসবো কোথায়? যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেটাও তো বরফ। শেষে হাতের চাপে পাথরটার ওপর উঠবার চেষ্টা করলাম। এদিক থেকে পাথরটার উচ্চতা অনেক বেশি হওয়ায়, পাথরের ওপর ওঠাও বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত হাতের চাপে বরফ থেকে পাথরটার ওপর উঠতে সমর্থ হলাম। জুতোর ওপর হাতের চাপ পরায়, জুতোর ভেতরের সমস্ত জল ছিটকে আমার মুখ, চোখ, সোয়েটার ভিজিয়ে দিল। এবার জুতোর ভেতর থেকে মোজাটা টেনে বার করলাম। আমার নয়, তবে সেটা কার সেই মুহুর্তে চিনতে পারলাম না। মনে হলো মাধবের। একটু সময় নিয়ে আবার আগের জায়গায়, মানে নদীর পারে ফিরে এলাম। এতকিছু ঘটনা ঘটতে বোধহয় পাঁচ মিনিটও সময় নিল না। মাধবকে বললাম আস্তে আস্তে বাকি জুতোগুলো ছুঁড়ে আমার হাতে দিতে। একটা একটা করে সবগুলো জুতো আমার পায়ের কাছে জড়ো করলাম। লাঠিতে ঝুলিয়ে ক্যামেরাটাও এপারে নিয়ে আসলাম। এবার এপার থেকে একটু জলে নেমে লাঠিটা বাড়িয়ে ধরলাম। ওরা লাঠি ধরে সহজেই এপারে চলে এল। জুতোটা জলে ভিজে নতুনদার পাম্প শূতে পরিণত হয়েছে। মাধব ভিজে জুতোর ভেতর থেকে মোজা বার করে ঘোষণা করলো— “এটা দিলীপের জুতো”। দিলীপের মুখের তখন কী শোচনীয় অবস্থা। ওর পায়ের মাপ অস্বাভাবিক বড়। জুতো হারালে, কষ্ট করে বদ্রীনারায়ণ গেলেও ওর পায়ের মাপের জুতো মিলতো না। কারণ কলকাতাতেই আমাদের পায়ের মাপের হান্টার শূ পাওয়া গেলেও, অনেক দোকানেই ওর মাপের জুতো পাওয়া যায়নি। ও আমাকে বারবার কৃতজ্ঞতা জানাতে লাগলো, আর আমি মনে মনে মাধবকে গালাগাল করতে লাগলাম। জায়গাটাকে স্মরণীয় করে রাখতে গোটাকতক ছবি নিয়ে নিলাম। এতক্ষণে বুঝছি উত্তেজনায় কী সাংঘাতিক ঝুঁকি নেওয়া হয়েছিল। জুতো পরে আবার হাঁটা শুরু হলো।

এবার কিন্তু সত্যিই নতুন নতুন ফুলের সন্ধান পেলাম। সব রকম ফুল কিছু কিছু করে তুলে, দিলীপের হাতে দিলাম। উদ্দেশ্য কবরখানায় ফুল দেব। টিপটিপ্ করে বৃষ্টি শুরু হলো। ওয়াটারপ্রুফ গায়ে চাপিয়ে, এক বুক ফার্ণ জাতীয় গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি। সাপখোপ বা জোঁকের চিন্তা একবারও মাথায় আসলো না। মধ্যে মধ্যে গাছে ঢাকা পাথরের টুকরোতে হোঁচট খাচ্ছি। এগুলো খুব বিপজ্জনকও বটে। অসাবধানে দুই পাথরের মধ্যে পা পড়লে, পা ভেঙ্গে যেতে পর্যন্ত পারে। দুরে একটা সাদা রঙের পতাকা উড়ছে। ওটাই সম্ভবত কবরখানা। আমি ওদের থেকে অনেকটা এগিয়ে আছি। সুন্দর একটা পাখির বাচ্চা দেখে ধরবার চেষ্টা করে বুঝলাম, সেটা মোটেই বাচ্চা নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা কবরখানার কাছে চলে এলাম। তুলে আনা সমস্ত ফুল কবরের বেদির ওপর দিয়ে, রোদের অপেক্ষায় রইলাম। অবশেষে সে আশা ছেড়ে একটা বড় পাথরের ওপর বসে, আলুর পরোটা ও ডিম সিদ্ধর গতি করতে লাগলাম। হঠাৎ একটু শরৎকালের মতো রোদ দেখা গেল। পরপর দু’টো ছবি নিলাম। একটা করে পরোটা খেয়ে, একটা করে ব্যাগে রেখে দিলাম।

একটা বেদির ওপর একটা ছোট মারবেল্ পাথরের ফলক। মাঝখান থেকে ফেটে গেছে। হাত দিয়ে ধুলো, গাছের শুকনো পাতা সরিয়ে, খুব কাছ থেকে আবার ছবি নিলাম। কবরটার পাশে, আমাদের এখানকার বনবেগুনের মতো দেখতে, অদ্ভুত নীল রঙের একরকম ফুল দেখলাম। শুধু ঐ একই ফুল। চারিদিকে আরও কিছুটা ঘুরে, আমরা ফিরবার পথ ধরলাম। সময় নষ্ট করে লাভ নেই। যদি সম্ভব হয়, আজই বদ্রীনারায়ণ চলে যাব। দু’টো জায়গা দেখা হলো। এবার তৃতীয় জায়গার জন্য তৈরি হতে হবে। একসময় আমরা আবার সেই নদীটার কাছে ফিরে এলাম। কোন রাস্তা না থাকায়, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আন্দাজে হেঁটে এসে দেখি, গতবার যেখান দিয়ে নদী পার হয়েছিলাম, সেখানে না এসে অন্য জায়গায় এসে হাজির হয়েছি। লাঠি ঠুকে বরফের ওপর দিয়ে নদীতে নামলাম। ওদের দাঁড়াতে বলে কোনদিক দিয়ে পার হওয়া সুবিধাজনক ভাবছি, মাধবই আবিস্কার করলো সেই সহজতম পথটা। সুন্দরভাবে পাথর পড়ে আছে। তিনজনই এবার জুতো পায়ে সহজেই নদী পার হয়ে এলাম। এপারে এক বৃদ্ধ ইংরেজ ভদ্রলোক, সঙ্গী ইংরেজ বৃদ্ধাকে নিয়ে খুব বিপদে পড়েছেন। কোনখান দিয়ে পার হলে তাঁদের সুবিধা হবে, ঠিক করতে পারছেন না। একটু দুরে এক হিন্দুস্থানি স্বামী-স্ত্রীরও সেই একই সমস্যা। ইংরেজ ভদ্রলোককে হাত ধরতে বললাম। ভাবলাম ওদের দেশের লোকের জনই তো আজ আমরা নন্দন কাননকে খুঁজে পেয়েছি, ওদের সাহায্য করা উচিৎ। ভদ্রলোক জানালেন তাঁকে ধরবার দরকার নেই। তিনি সঙ্গের বৃদ্ধাটিকে নদী পার করে দিতে অনুরোধ করলেন। বৃদ্ধার দিকে হাত বাড়াতে, তিনি এত জোরে আমার হাত চেপে ধরলেন, যে ভয় হলো তিনি পড়লে আমায় নিয়ে পড়বেন। একটা একটা করে পাথর টপকে এগচ্ছি, আর তাঁকে টেনে এগিয়ে নিয়ে আসছি। শেষ বড় পাথরটার ওপর থেকে ওপারে উঠলাম। বৃদ্ধাটি বড় পাথরটায় দাঁড়ালেন। তাঁকে একটানে এপারে নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে, সম্ভবত তাঁর পায়ের চাপে, পাথরটা গড়িয়ে জলে চলে গেল। খুব সামলানো গেছে যাহোক্। ওপথে আর ওপারে ফেরা গেল না। একটু ঘুরে আবার ওপারে গিয়ে, আমরা এগিয়ে গেলাম। বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে যতক্ষণ দেখতে পেলাম, দেখলাম হাত নেড়ে আমাদের বিদায় জানালেন। আবার সেই ফুল, আবার সেই বনজঙ্গল, ক্রমে ভাঙ্গা রাস্তা, গ্লেসিয়ার, ঝরনা ফেলে, আমরা সেই পুরাতন চায়ের দোকানে ফিরে এলাম।

            

নন্দন কানন (ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স)

পরোটাগুলো গরম করে নিয়ে কফির সাথে খেতে ভালোই লাগলো। মাধব গিয়ে কম্বলগুলো গুরুদ্বোয়ারা কর্তৃপক্ষকে ফেরৎ দিয়ে, আমাদের জিনিসগুলো নিয়ে আসলো। দোকানে বসেই ঘাংরিয়া গুরুদ্বোয়ারার একটা ছবি নিলাম। কয়েকজন মিলিটারি, দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। অনেকদিন হলো বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছি। গোটা পৃথিবীর কোন খবর আমরা এতদিন পাইনি। ওদের হাতে রেডিও দেখে খবর জিজ্ঞাসা করলাম, ওরা জানালো প্রধান মন্ত্রী চরণ সিং পদত্যাগ করেছেন। ওসব খবর তখন মোটেই মুখরোচক মনে হলো না। দাম মিটিয়ে গোবিন্দঘাটের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। নন্দন কানন থেকে ফিরবার পথে চারজন যুবকের সাথে দেখা হয়েছিল। তারা বোধহয় হেমকুন্ড সাহেব পরে যাবে। তাদের একজনের হাতে দেখলাম, সাদা বেশ কয়েকটা কাগজ যত্ন করে পলিথিন পেপারে মোড়া। আলাপ হলে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এই কাগজগুলো কী জন্য নিয়ে যাচ্ছে। উত্তরে একজন বলেছিল, এগুলো ব্লটিং পেপার, এটা দিয়ে মুড়ে ব্রহ্মকমল নিয়ে যাবে। তাতে নাকি ফুল অনেকদিন টাটকা থাকে। আমি হেসে বললাম “মৌয়া গাছের মিষ্টি ছায়া ব্লটিং দিয়ে শুষে, ধুয়ে মুছে সাবধানেতে রাখছি ঘরে পুষে”, গোছের ব্যাপার বলছেন। সত্যিই কী ব্লটিং পেপারে মুড়ে রাখলে, ফুল অনেকদিন ভালো ও টাটকা থাকে? ওরা বললো ওরা তো তাই শুনেছে। বললাম নন্দন কাননে কিন্তু ব্রহ্মকমল পাবেন না, ব্রহ্মকমল নিতে গেলে হেমকুন্ড সাহেব যেতে হবে। ওরা তবু বললো, না না, নন্দন কাননেই তো আসল ব্রহ্মকমল পাওয়া যায়। বললাম দু’-দু’বার ঘুরে আসলাম, আসল নকল একটাও তো চোখে পড়ে নি। দেখুন চেষ্টা করে, বেষ্ট অফ্ লাক্। এখন হঠাৎ ওদের কথা এসে পড়ায়, দিলীপ বললো আগে জানলে ব্লটিং পেপার নিয়ে আসতাম। একে ব্রহ্মকমল খুব একটা বেশি নেওয়া হয় নি, তাও আবার যদি ভালো না থাকে, তবে দুঃখের শেষ থাকবে না।

সকালবেলা তীরথ চলে যাবার আগে, আমাদের একটা পলিথিন ব্যাগে করে, ওদের বাড়িতে তৈরি ঘিয়ে ভাজা আটার মতো এক প্রকার খাবার দিয়ে গেছে। রাস্তায় খবর পেলাম বিকেল চারটের সময় শেষ বাস পাওয়া যাবে। হাতে সময় খুব অল্প। কোন দোকানে চা পর্যন্ত না খেয়ে, তীরথের দেওয়া নতুন খাবার মুখে পুরে, আমরা প্রায় ছুটে নেমে চলেছি। হেমকুন্ড, নন্দন কানন থেকে ফিরছি বলে, পথে হেমকুন্ডগামী পাঞ্জাবিরা আমাদের সাথে কথা বলছে, খোঁজখবর নিচ্ছে। অল্প কথায় আলাপ সেরে, আবার সামনে এগিয়ে চলেছি। জঙ্গলচটিতে এসে আমরা চা খেলাম, সঙ্গে তীরথের দেওয়া আটাভাজা। জিনিসটা নতুন হলেও, খেতে বেশ ভালোই। এখানে আবার শুনলাম বদ্রীনারায়ণ যাবার বাস, পৌনে পাঁচটার সময় পাওয়া যাবে। বুকে নতুন আশা নিয়ে দাম মিটিয়ে ছুটলাম। একনাগাড়ে নীচের দিকে নামতে নামতে, পাগুলো বেশ ব্যথা করছে। যতদুর দৃষ্টি যায় দেখবার চেষ্টা করছি নীচের গুরুদ্বোয়ারা দেখতে পাওয়া যায় কী না। এখনও কিছু নজরে পড়ে নি। আরও কিছু পথ চলার পর, হঠাৎ দুরে, বহুদুরে, আমাদের কাঙ্খিত গুরুদ্বোয়ারার দেখা মিললো। এবার আমাদের হাঁটার গতি আরও বেড়ে গেল। সবকিছু ঠিক থাকলে, আজই আমরা বদ্রীনারায়ণ পৌঁছচ্ছি। শেষ পর্যন্ত আমরা গুরুদ্বোয়ারার সামনে এসে হাজির হলাম। সামনে কয়েকজন পাঞ্জাবি বসে আছে। তীরথকে দেখলাম না। সময় নষ্ট না করে, দোতলায় মাল রাখার ঘরে গেলাম। বাইরে থেকে দরজায় তালা ঝুলছে। এদিকে প্রায় সাড়ে চারটে বাজে। দৌড়ে গেলাম কুলি ডাকতে। একজন কুলির কাছেই জানতে পারলাম, একজন পাঞ্জাবির কাছে মাল রাখার ঘরের চাবি থাকে, এবং সে বাস রাস্তায় গেছে। মাধবকে ডুপ্লিকেট চাবি কার কাছে থাকে জেনে মাল নেবার ব্যবস্থা করতে বলে, ছুটলাম বাস রাস্তার দিকে। কুলিটা জানালো ঐ পাঞ্জাবিটা মিলিটারি রঙের জামা ও পায়জামা পরে আছে। মাধবকে বললাম “আমি ভদ্রলোককে খুঁজে পাঠিয়ে দিচ্ছি এবং বাস রাস্তায় বাস থামাবার জন্য অপেক্ষা করছি। দেখি যদি অনুরোধ করে বাসটাকে পাঁচসাত মিনিট বেশি সময় দাঁড় করানো যায়”। বাস রাস্তায় যাবার পথেই পাঞ্জাবিটার সাথে দেখা হয়ে গেল। হাতজোড় করে তাকে শীঘ্র ঘর খুলে মালপত্র বার করে দেবার জন্য অনুরোধ করলাম। এও জানালাম যে আমার দু’জন সঙ্গী গুরুদ্বোয়ারায় কুলি নিয়ে অপেক্ষা করছে। সে সম্মতি জানিয়ে জোর কদমে গুরুদ্বোয়ারার দিকে পা চালালো। আমি বাস রাস্তার দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, আমরা তীরথের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। ও আমাদের জন্য যতই করুক, তবু গুরুদ্বোয়ারায় থাকার দৌলতে, আমাদের ওপর ওদের একটা নিয়ন্ত্রণ ছিলই। এখন আমরা স্বাধীন। বদ্রীনারায়ণ গিয়ে আমাদের পছন্দ মতো যেকোন হোটেলে ওঠা যাবে। আর আমাদের গুরুদ্বোয়রায় মালপত্র নিয়ে লাইন দিয়ে উদ্বাস্তুদের মতো রাত কাটাতে হবে না। এইসব ভাবতে ভাবতে বাস রাস্তায় এসে, সামনে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। সামনে তীরথ দাঁড়িয়ে। ওর মা, বোন ও ভগ্নিপতি একটা চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে আছেন। তীরথ আমায় দেখেই প্রায় ছুটে এসে, নন্দন কানন সম্বন্ধে নানারকম প্রশ্ন করতে শুরু করে দিল। ওকে জুতো হারানোর গল্প বললাম। ও তার মাকে নিজের ভাষায় ঘটনাটা বললো। নতুন নতুন ফুল কী কী দেখেছি, এবং কবরখানার কথা বলতে, ও এগুলো দেখতে না পাওয়ার জন্য আপশোস করে বললো, গতকাল আর একটু কষ্ট করে এগিয়ে গেলেই ভালো হতো। ফুল কেন তুলে নিয়ে আসিনি জিজ্ঞাসা করায়, বললাম ওর সাথে আবার এভাবে দেখা হবে ভাবি নি। ও জানালো ও আজ এখানেই থাকবে বলে স্থির করেছিল। কিন্তু ভগ্নিপতি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায়, আজই বদ্রীনারায়ণ যাচ্ছে। কাল ভোরে গরমকুন্ডে স্নান সেরে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। ও চলে যাচ্ছে, এবং কেন চলে যাচ্ছে জানিয়ে, গুরুদ্বোয়ারায় একটা চিঠি লিখে রেখে এসেছে, আমাদের দেবার জন্য।

অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল, মাধবদের পাত্তা নেই। তীরথকে বললাম একটু এগিয়ে দেখি। ও বললো চিন্তা করো না, ওরা ঠিক সময়ে চলে আসবে। একটু পরেই অনেক দুরে মাধব, দিলীপ ও কুলিকে লাইন দিয়ে আসতে দেখা গেল। সবার জন্য চায়ের অর্ডার দিয়ে, এগিয়ে গিয়ে মাল নিলাম। হাল্কা বৃষ্টি শুরু হওয়ায়, দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির তলায় মালপত্রগুলো ঢুকিয়ে রাখলাম। চা দিয়ে গেল। একটাও চুমুক দেবার আগেই বাস এসে গেল। চা ফেলে রেখে বাসের ছাদে উঠে মালপত্র সাজিয়ে রাখলাম। কুলির পয়সা দিতে গিয়ে দেখা গেল খুচরো পয়সা বা টাকা নেই। তীরথের বোনের কাছ থেকে দু’টো টাকা নিয়ে, কুলিকে বিদায় করলাম। আমি ও মাধব বাসের ছাদে মাল তোলায় ব্যস্ত ছিলাম। মালপত্র তুলে রেখে এসে দেখি, তীরথের মা আমাদের জন্য কাপড় পেতে বসার জায়গা সংরক্ষণ করে রেখেছেন। আমরা সবাই বাসে বসার জায়গা পেলাম। বদ্রীনারায়ণ পর্যন্ত বাস ভাড়া মাত্র দু’টাকা পঁচাত্তর পয়সা। তীরথ আমাদের বাস ভাড়াও দিতে গেল। আমরা কিছুতেই রাজি না হওয়ায় ও বললো, “ঠিক আছে, তাহলে তোমরা তোমাদের ভাড়া দাও, আমি আমাদের চারজনের ভাড়া দিচ্ছি”।

বাস ছেড়ে দিল। আগামীকাল সকালের পর আর আমাদের কোন দিন দেখা হবেনা বলে, তীরথের মা খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললাম মন খারাপ করবেন না। পৃথিবীটা গোল, একদিন না একদিন আবার দেখা হবেই। তাছাড়া কোনদিন পাঞ্জাবে যাওয়ার সুযোগ আসলে আপনাদের ওখানে তো যাবই। তিনি খুব খুশি হয়ে বললেন, তোমাদের যতদিন ই্ছা, আমার ওখানে প্রেমসে থাকতে পার। তীরথ এবার বললো, “রায় তুমি তো গান জানো। সামনেই আমার বিয়ে। তুমি তোমার বন্ধুদের নিয়ে আসবে, হারমোনিয়াম বাজাবে”। “নতুনদার” সাথে কোথায় যেন নিজের মিল খুঁজে পেলাম। একটু থেমে, তীরথ হঠাৎ বললো, “যদি কিছু মনে না করো তো একটা কথা বলতাম। তোমরা তিনজনেই চাকরি করো, যাবেও অনেক জায়গা। হেলং এর মতো, পথে আরও বিপদ আসতে পারে। আমার কাছে যথেষ্ট টাকা আছে, প্রয়োজন হলে কিছু রেখে দাও। পরে কোন কারণে প্রয়োজন হলে আর আমার সাথে দেখা হবে না, বিপদে পড়বে”। ওর মা’ও বললেন “তীরথের থেকে কিছু টাকা নিয়ে রেখে দাও বেটা”। বললাম “কথাটা শুনে খুব ভালো লাগলো। আমাদের টাকার আর প্রয়োজন হবে না, ধন্যবাদ”। তবু তীরথ আবার বললো, “নাহয় ধার হিসাবেই রাখ, বাড়ি ফিরে গিয়ে ফেরৎ দিয়ে দিও”। আমরা তাকে জানালাম, আমরা প্রয়োজনের বেশিই টাকা নিয়ে এসেছি, দরকার হবে না। এবার তীরথের বোনকে কুলিকে দেওয়া টাকা দু’টো ফেরৎ দিতে গেলে, ও কিছুতেই নেবে না। সে বললো, মাত্র দু’টো টাকা, তাও ফেরৎ দেবে? ভাইয়ার কাছ থেকে ও টাকা আমি ফেরৎ নিতে পারবো না। কী বিপদ, এরা আমাদের ভেবেছেটা কী? বললাম টাকা ভাঙ্গানো ছিলনা বলে নিয়েছিলাম, ফেরৎ না নিলে খুব দঃখ পাব। ও আর কথা না বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে নিল।

তীরথ জানালো, আজ রাতটা বদ্রীনারায়ণে কোন একটা ভালো হোটেলে উঠবে, আমরা যেন তার সাথে একই হোটেলে উঠি। কিছু না বলে চুপ করে বসে, সামনের দিকে উদাসভাবে তাকিয়ে রইলাম। সন্ধ্যাবেলা বাস এসে বদ্রীনারায়ণ পৌঁছলো। কুলিরা ছুটে এল। একজন পান্ডা পরিস্কার বাংলায় আমাদের বললো তার ওখানে উঠতে। মন্দিরের পাশেই সে থাকে। ঘন কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। জিজ্ঞাসা করলাম, মন্দিরটা কোথায়? ও দুরে হাত তুলে দেখালো। কুয়াশায় কিছুই দেখা গেল না। পান্ডাটা বললো, আপনারা বাঙালি বলেই বলছি। ওর কথা শুনে বুঝতে পারছি, বাংলা বললেও ও বাঙালি নয়। ব্যবসার খাতিরে বাংলাটা শিখেছে। কত টাকা দিতে হবে জিজ্ঞাসা করায় সে জানালো, আমাদের যা ইচ্ছা দিলেই হবে। তার নাম জিজ্ঞাসা করায় সে জানালো, “পঞ্চভাই” বললে এখানে যে কেউ তাকে দেখিয়ে দেবে। জানি না পাঁচ ভাই মিলে পার্টনারশিপ্ ব্যবসা ফেঁদেছে কী না। এবার তীরথকে বললাম যে তারা কাল সকালেই চলে যাবে, কিন্তু আমরা তো এখানে তিন-চার দিন থাকবো। দামি হোটেলে তিন-চার দিন থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। কাজেই আজ আমরা এই ভদ্রলোকের বাড়িতেই উঠি। পছন্দ না হলে কাল অন্য কোথাও ঠিক করে নেওয়া যাবে। তারা যেন কিছু মনে না করে। কাল প্রথম বাসে তাদের হৃষিকেশ যাবার সময় আমরা এসে, তাদের বিদায় জানিয়ে যাব। তীরথ কুলির হাতে তাদের মালপত্র্র দিয়ে, মা, বোন ও ভগ্নিপতিকে নিয়ে এগিয়ে গেল।

পঞ্চভাই এর সাথে একটা বাচ্চা ছেলে এসেছিল। সম্ভবত ওর অ্যাসিস্টেন্ট। কুলির হাতে মালপত্র দিয়ে, তার সাথে কথা বলতে বলতে আমরাও এগলাম। মাধবের লাঠির নালটা আলগা হয়ে গেছিল। কুলিটা লাঠিগুলোর ওপর ভর দিয়ে হাঁটছিল। মাধবকে বললাম লাঠিগুলো ওর হাত থেকে নিয়ে নিতে। ও বললো, থাক্ কিছু হবে না। মন্দিরে এসে পৌঁছলাম। ও বাবা, এ তো রীতিমতো শহর। মন্দিরের সঙ্গেই ডানপাশে বিরাট একটা হোটেল। দু’টোর মাঝখান দিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে আমাদের যেতে হবে। পাশের একটা দরজা দিয়েও মন্দিরে ঢোকা যায়। একটু ওপরেই পঞ্চভাই-এর আস্তানা। একটা ঘেরা বারান্দা, শতরঞ্চি পাতা আছে। একজন মোটাসোটা যুবক ও একজন বৃদ্ধ তাতে বসে গল্প করছেন। তাদের পাশ দিয়ে পরপর দু’টো ঘরের দ্বিতীয়টায় গিয়ে ঢুকলাম। ছোট ঘর, দু’টো দরজা একটা জানালা। একটা দরজা দিয়ে বারান্দায় বেরতে হয়। অপরটা পাশের ঘরে যাবার। এই দরজাটা বন্ধ। বুঝলাম বাইরে বসে থাকা দু’জন ঘরটা নিয়েছে। পাশের ঘর থেকে ঘন ঘন কাশির আওয়াজ আসছে। তারমানে ওরা সংখ্যায় তিনজন। আমাদের ঘরটা ভালোই। যারা বাইরে যাওয়া বলতে শুধুই বিলাসবহুল হোটেলের ঘর বোঝেন, তাদের কথা বলতে পারবো না। কিন্তু আমাদের মতো যারা এপথে শুধু দেখতেই এসেছে, এবং ঘর বলতে রাতের নিশ্চিন্ত আশ্রয় বোঝে, তাদের পক্ষে ঠিক আছে, অন্তত আমাদের চলে যাবে। যাহোক, পঞ্চভাই লেপ এনে দিল। আমাদের মালপত্র একটা তাকে গুছিয়ে রাখলাম। বারান্দায় আসতেই ওরা জিজ্ঞাসা করলো আমরা কোথা থেকে আসছি। আমরা আজকের সমস্ত ঘটনা বলে বললাম, আজ বদ্রীনারায়ণের বাস ধরবার জন্য প্রায় ছুটে ছুটে আসার জন্যই বোধহয়, পায়ে বেশ ব্যথা হয়েছে। পায়ে ব্যথার কথা শুনেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক বললেন, তাহলে আর এখানে বসা যাবে না। কেন বসা যাবে না জিজ্ঞাসা করায়, তিনি বললেন ইয়ং ছেলে, এইটুকু পথ হেঁটেই পায়ে ব্যথা হয়ে গেল? মোটা যুবকটি জানালো বৃদ্ধ ভদ্র্রলোকটি তার কেউ হন না। একতলায় একটা ঘর নিয়ে থাকেন। নয় বৎসর বাড়ি ছাড়া হয়ে, হিমালয় দর্শন করে বেড়াচ্ছেন। বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে বললাম, এপথে আসার জন্য শারীরিক শক্তি কোন কাজে লাগে না। মনোবলই সব। ভদ্রলোকের বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করাতে, তিনি বলতে চাইলেন না। পরে জানলাম তাঁর বাড়ি নদীয়া জেলায়। ভদ্রোলোকের পায়ের পাতায় বিরাট বিরাট ঘা, লাল রঙের ওষুধ লাগানো আছে। তাঁর কাছেই শুনলাম জোঁক তাঁর এই অবস্থা করেছে। তাঁকে দু’মাস হাসপাতালেও থাকতে হয়েছিল। একটু পরেই ভদ্রলোক একতলায় চলে গেলেন। মোটা যুবকটি জানালো যে, তার বাড়ি বর্দ্ধমানের মেমারীতে। তার সোনার দোকান আছে। তারা কেদারনাথ যাবার জন্য গিয়েও, রাস্তার ধসের জন্য বাস যেতে না পারায়, বদ্রীনারায়ণ চলে এসেছে। আমরা এখান থেকে কেদারনাথ যাব শুনে, মোটা যুবকটি জানালো যে, সেও আমাদের সঙ্গে কেদারনাথ যেতে চায়। তার সঙ্গে তার এক কর্মচারী এসেছে, তাকে খচ্চর ভাড়া করে দেবে।

আমরা একবার বাইরে যাবার জন্য নীচে নেমে দেখি, একতলার বৃদ্ধটি ঐ ঠান্ডায় বাসন ধুচ্ছেন। তিনি আমাদের এখানে কী কী দেখবার আছে জানালেন। আমরা মন্দিরে এলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই চন্দন চর্চিত বদ্রীবিশালকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে, নতুন বস্ত্র পরানো হলো। তাঁর গলার পুরাতন মালার চাহিদা দেখলাম খুব। সমস্ত ভক্তরা হাত বাড়িয়ে মালা বা ফুলের টুকরো নিতে চাইছে। মুর্তির মাথার মুকুটটা দুর থেকে দেখলেও চোখ ঝলসে যাবে। শুনলাম ওটার মূল্য নাকি এক কোটি টাকা। হতেই পারে, মন্ত্রীদের যেখানে কোটি টাকার সম্পত্তি থাকে, নারায়ণের থাকতে আপত্তি কোথায়?

একজন কালো পোষাক পরিহিত পুরোহিত দ্বারা সমস্ত কাজ সম্পাদিত হচ্ছে। এরপর সামান্য আরতি মতো হলো। শুনলাম এবার মন্দিরের দরজা বন্ধ করা হবে। আমাদের সাথে পঞ্চভাই পান্ডাও মন্দিরে গেছিল। তার প্রচেষ্টায় আমরা সবার আগে দাঁড়াবার সুযোগও পেয়েছিলাম। কয়েকজন লোক মুর্তির একটু দুরেই, আমাদের আর মুর্তির মাঝখানে বসে আছে। শুনলাম তারা নাকি ভি.আই.পি. মানুষ। একজন লম্বা চওড়া লোক মন্দিরে প্রবেশ করলো। সঙ্গে তার আবার বডিগার্ড। শুনলাম তিনিও একজন ভি.ভি.আই.পি। মন্দিরের ভেতর এই আলাদা ব্যবস্থা দেখবো আশা করি নি। পাঞ্জাবিদের কোন গুরুদ্বোয়ারায় কিন্তু এ ব্যবস্থা দেখি নি। অথচ দেশে শিখ ধর্মাবলম্বি পাঞ্জাবি ভি.ভি.আই.পি-র অভাব আছে বলে তো মনে হয় না। জয় বদ্রীবিশাল কী জয়। মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলাম।

ঘরে ফিরে গিয়ে ঠিক করলাম আগামীকাল সকালে ভারতীয় শেষ গ্রাম, “মানা”র ওপর দিয়ে “বসুধারা” যাব। মোটা যুবকটি এ কথা শুনে জানালো, সেও কাল একা আমাদের সাথে ওপথে যেতে চায়। একতলার সেই নদীয়ার বৃদ্ধ ভদ্রলোক জানালেন, এখানে বেশ কয়েক কিলোমিটার দুরে “শতপন্থ” লেক্। খুব সুন্দর জায়গা, তবে ওখানে যেতে গেলে “চামোলী’ থেকে অগ্রিম অনুমতি পত্র নিয়ে আসতে হয়। জানা ছিল না, তাই ওখানে যাবার চেষ্টা করেও লাভ নেই।

একটু পরে মন্দিরের পাশের দোকানে রুটি, তরকারি খেতে গেলাম। দেখা হলো ঘাংরিয়ার সেই বাঙালি ভদ্রলোকের সাথে, যিনি আমাদের ভাঙ্গা গ্লেসিয়ার ও নদীর কথা বলেছিলেন। তাঁর সাথে আবার হেমকুন্ডে সাঁতার কাটতে দেখা, সেই জাপানি ছেলেটাও জুটেছে। শুনলাম ওরা দু’জনে একই হোটেলের একই ঘরে রয়েছেন। জাপানির কোন সঙ্গী নেই, সঙ্গী নেই সেই ভদ্রলোকেরও। ভদ্রলোক মধ্যপ্রদেশে, ভারত হেভী ইলেকট্রিকালস্ লিমিটেড-এ কাজ করেন। এরা দু’জনেই একা একা ঘুরতে এসেছেন, তাই দু’জনে দু’জনকে সঙ্গী হিসাবে জুটিয়ে নিয়েছেন। ভদ্রলোক, আমরা নন্দন কাননের ভাঙ্গা গ্লেসিয়ারটা পার হয়ে গেছিলাম কী না জিজ্ঞাসা করায়, তাঁকে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বললাম। ভদ্রলোকের উলটো দিকের চেয়ারে আর এক ভদ্রলোক বসেছিলেন। তাঁকে দেখতে অনেকটা বাঙালিদের মতোই। ভদ্রলোক জাপানির সঙ্গী ঘাংরিয়ার সেই ভদ্রলোকটিকে ইংরাজীতে জিজ্ঞাসা করলেন যে, আমরা কী বলছি। বুঝলাম ইনি বাঙালি নন্। আমাদের পরিচিত ভদ্রলোক তাঁকে সমস্ত ঘটনা বলাতে, তিনি বললেন খুব রিস্ক্ নিয়েছিলেন। দেশের জন্য, দশের জন্য লোকে প্রাণ দেয়, আপনি তো একটা জুতোর জন্য প্রাণ দিতেন। যাহোক্, শুনলাম জাপানি ও বাঙালি দু’জনও কাল বসুধারা যাবেন।

আজ একুশে আগষ্ট। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা গেলাম তপ্তকুন্ডে স্নান করতে। মাঝখানের চৌবাচ্চাটায়, আমরা তিনজনে জলে নামলাম। চৌবাচ্চাটার ডানপাশে মন্দিরের দিকে মুখ করে বসলে, এক কোনে একটা সিমেন্ট বা পাথরের স্ল্যাব জলের মধ্যে আছে। ওটায় সুন্দর বসে থাকা যায়। আমি হঠাৎ ওটা আবিস্কার করে, ওর ওপর বসে গরম জলে শরীর ডুবিয়ে, সমস্ত দেহ ম্যাসাজ করতে শুরু করলাম। মাধব ও দিলীপ একটু পরেই গেল মন্দিরে পূজো দিতে। আমি গরম জলে বসে গায়ের ব্যথা কমাতে লাগলাম। কয়েক মিনিট বাদেই পঞ্চভাই এসে আমায় ডেকে পূজো দেবার জন্য মন্দিরে যেতে বললো। মাধবের কথা বলে বললাম, ও আমার আত্মীয়, ও আমার হয়ে পূজো দিয়ে দেবে। পঞ্চভাই চলে গেল। বাঙালি ও জাপানি এসে হাজির হলেন। বাঙালি ভদ্রলোক গরম জলে নামলেন। আর কিছুক্ষণ কাটিয়ে, জল থেকে উঠে জাপানিকে প্রশ্ন করলাম, সে কেন জলে নামছে না। জাপানি ছেলেটা ইংরাজীতে কথা বললেও, থাওল থাওল বলে কী বলতে চাইছে, বুঝতে পারছি না। হঠাৎ বুঝলাম ওর সঙ্গে টাওয়েল নেই। বললাম ওর সঙ্গীর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে স্নান করতে, শরীর একবারে সুস্থ হয়ে যাবে। কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে তাকে একটু আমসত্ত্ব দিলাম। তার চোখ বুজে খাওয়া দেখে বুঝলাম, এ পদার্থটির সঙ্গে তার আগে পরিচয় না থাকলেও, আমসত্ত্ব তাকে যথেষ্ট তৃপ্ত করেছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে ঘরে ফিরে এসে দেখি, আমার সঙ্গী দু’জন তখনও ফেরে নি। অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে তারা প্যাকেটে করে প্রসাদ নিয়ে ফিরে এল। আমরা মন্দিরের পাশে হোটেলে গেলাম। ওরই বাঁপাশ দিয়ে বসুধারা যাবার রাস্তা। এখানে দেখি ধোসাও পাওয়া যায়। গরম গরম ধোসা আর চা খেয়ে আমরা রওনা দিলাম। মোটা যুবকটিও আমাদের সঙ্গী হলো। পরিস্কার আকাশ। মন্দিরের একবারে কাছে, সামনের রেলিং এর ওপর থেকে মন্দিরের একটা ছবি নিয়ে নিলাম।

এখান থেকে তিন কিলোমিটার দুরে ভারতীয় শেষ গ্রাম “মানা”। মন্দিরের বাঁপাশে, অর্থাৎ হোটেলটার কাছে একটা নোটিশ বোর্ডে লেখা আছে—“বিদেশীদের ঐ নোটিশ বোর্ডের ওপারে যাওয়া নিষেধ”। শুনলাম চামোলী থেকে অনুমতি পত্র আনলে বিদেশীদের বসুধারা যেতে দেওয়া হয়। বুঝলাম জাপানিটার আর বসুধারা দেখা হলো না। যাওয়ার পথে অনেকে বললো, ক্যামেরা নিয়ে যেতে দেওয়া হয়, আবার অনেকেই বললো, ক্যামেরা নিয়ে বসুধারা যেতে দেওয়া হয় না। আমাদের সাথে অতি সাধারণ একটা ভারতীয় ক্যামেরা। সেটা গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে চললাম। ডানপাশে মিলিটারি আড্ডা, প্রচুর ঘোড়া ও ট্রাক দাঁড়িয়ে। একটা ব্রিজ পার হয়ে ওখানে যেতে হয়। একসময় আমরা মানা গ্রামে এসে হাজির হলাম। কেউ কিন্তু ক্যামেরা চাইলো না। অনেকগুলো বাচ্চা পিছন পিছন পয়সার জন্য আসছে। শুনলাম এখান থেকে ঊনচল্লিশ কিলোমিটার দুরে তীব্বত বর্ডার।

একটু এগতেই ছোট একটা মিলিটারি ক্যাম্প। আমাদের থেকে মোটা যুবকটি একটু এগিয়ে গেছিল, ও দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে। কাছে যেতে আমার গলায় ঝোলানো ক্যামেরাটা মিলিটারিগুলো চেয়ে নিল। মোটা যুবকেরটা আগেই নিয়েছে। আরও বেশ খানিকটা পথ হেঁটে আমরা “ভীমপুল” এসে পৌঁছলাম। সরু নদী, কিন্তু ভীষণ তার গতি। অসম্ভব রকম গর্জন করে বয়ে যাচ্ছে। নদীর দু’পারের দু’টো বড় পাথরের উপর একটা বিশাল পাথর যেন শুইয়ে রাখা হয়েছে। এটাই একটা দশ-বার ফুটের ব্রিজ বা পুল। ব্রিজের বেশ খানিকটা নীচ দিয়ে সেই ভয়ঙ্কর নদী বয়ে যাচ্ছে। নীচে নদীর দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যায়। আসবার পথে শুনেছি এটা নাকি সরস্বতী নদী। মহাপ্রস্থানের পথে যাবার সময় ভীম এই বিশাল পাথরটা ফেলে, এই পুল তৈরি করেন। যাহোক্, ওখানে বসে ভাবছি সরস্বতী নদী কী সারা দেশের ওপর দিয়েই বয়ে গেছে? তাহলে সর্বত্র তার স্বাস্থ্য এত খারাপ কেন? এই ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে কী ভাবেই বা সে এতটা পথ পাড়ি দেয়? এখানে এই ভয়ঙ্কর নদীর ওপর কী অদ্ভুত একটা ব্রিজ। কত কম খরচে নদীর ওপর ব্রিজ তৈরি করা যায়, এখনকার বড় বড় ইঞ্জিনীয়ারদের ভীমের কাছ থেকে শেখা উচিৎ। কোনরকম রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ছাড়াই, যুগের পর যুগ দিব্বি ব্যবহারযোগ্য হয়ে টিকে আছে।

এমন সময় সেই বাঙালি ভদ্রলোক গলায় এক দামি বিদেশি ক্যামেরা ঝুলিয়ে এসে হাজির হলেন। আমরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি কী ভাবে ক্যামেরা নিয়ে এখানে এসেছেন। তিনি তো আমাদের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তিনি জানালেন যে, তিনি এই ভাবেই গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে এখানে এসেছেন। পথে এক মিলিটারি তাঁর সাথে আলাপও করেছে। কিন্তু কেউ তাঁকে ক্যামেরা রেখে যেতে বলে নি। দিলীপকে বললাম তার মানে ক্যামেরা নিয়ে এখানে আসতে না দেওয়ার কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। আমরা দু’জনে আমাদের ক্যামেরা ফেরৎ আনতে আগের ক্যাম্পটার উদ্দেশ্যে ফিরে গেলাম। মাধব, মোটা যুবক ও বাঙালি ভদ্রলোক ভীমপুলে বসে থাকলেন। ক্যাম্পে এসে আমি ওখানকার মিলিটারি প্রধানটিকে বললাম, “আমরা সাধারণ ভারতীয়, আমাদের সঙ্গের ক্যামেরাটাও অতি সাধারণ ভারতীয় ক্যামেরা। বহুদুর থেকে এখানে এসেছি। যদি অনুমতি দেন তাহলে ভীমপুল বা বসুধারার ছবি নিয়ে গিয়ে, বাড়ির লোকদের দেখাতে পারি”। ভদ্রলোক খুব শান্ত ও ভদ্রভাবে জানালেন, বসুধারার ছবি তোলা গভর্ণমেন্টের কড়া বারণ। তাঁর কিছু করার নেই। আমরা জানালাম এক ভদ্রলোক ক্যামেরা নিয়ে ভীমপুলে অপেক্ষা করছেন, তাকে কেন নিয়ে যেতে দেওয়া হলো? মিলিটারি ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে তাঁর সঙ্গীদের ডাকলেন। ক্যাম্পের ভিতর থেকে দু’জন সঙ্গী বেরিয়ে এসে সব শুনেই, ঘোড়া নিয়ে ঐ বাঙালি ভদ্রলোককে ধরতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। ভাবলাম কেন বলতে গেলাম। কিন্তু কথাটা বলে ভদ্রলোকের বোধহয় মঙ্গলই করেছি। নাহলে ফিরবার সময় তাঁর বিপদ হতোই। আমি খুব শান্ত ভাবে নরম গলায় মিলিটারিদের বললাম, আমি গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে বসুধারা যাচ্ছিলাম। আপনারা ক্যামেরাটা এখানে জমা রেখে যেতে বলেছেন, আমি জমা দিয়ে দিয়েছি। আমার মতো ঐ ভদ্রলোকও তাঁর ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে নিয়েই এখান দিয়ে গেছেন। ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া নিষেধ বলে কোন নোটিশ বোর্ড কোথাও নেই, আপনারাও তাঁর কাছ থেকে ক্যামেরা চেয়ে নেন নি। ফলে তিনি না জেনে ক্যমেরা নিয়ে গেছেন। আমার কাছে না চাইলে, আমিও তো ক্যামেরা নিয়েই চলে যেতাম। প্রথম যে মিলিটারি অফিসারের সাথে আমরা কথা বলছিলাম, তিনি এবার বেশ কড়া সুরে বললেন “অসম্ভব, এদিক দিয়ে গেলে আমরা ক্যামেরা চেয়ে নিয়ে জমা রাখবোই। ওপাশ দিয়ে আর একটা রাস্তা আছে, সে দিকেও একটা ক্যাম্প আছে। ওদিক দিয়ে গেলে, ঐ ক্যাম্পের কর্মীরা ক্যামেরা জমা নিয়ে নেবে। ক্যামেরা ইচ্ছা করলে আপনারা নিয়ে যেতে পারেন, তবে রীলে কত নম্বর পর্যন্ত ছবি তোলা হয়েছে নোট করে রাখা হবে। ফিরবার পথে দেখে নেওয়া হবে নতুন করে আর কোন ছবি তোলা হয়েছে কী না। যদি কেউ ভুল করে ক্যামেরা নিয়ে চলেও যায়, তবু তার ক্যামেরা থেকে রীলটা খুলে নেওয়া হবে”। বললাম ঠিক আছে তাঁদের যাওয়ার দরকার নেই। কোন সভ্য ভারতীয়, ভারত সরকারের নিষেধ অমান্য করে না। ভদ্রলোককে আমি আপনাদের কথা বলে ছবি তুলতে বারণ করে দেব। আমার কথা শুনে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ঐ ভদ্রলোক আমাদের লোক কিনা, বা আমাদের সঙ্গে এসেছেন কী না। বললাম তিনি আমাদের লোক নন, আমাদের সাথেও আসেন নি। তবে তিনি বাঙালি, আমাদের ভাষা বোঝেন। আমি বারণ করলে তিনি কখনই ওখানকার ছবি তুলবেন না। অফিসারটি এবার অনেকটা নরম হয়ে বললেন, ঠিক আছে, আমি যেন তাঁকে ওখানকার কোন ছবি তুলতে বারণ করি। চলে আসছিলাম, হঠাৎ মনে হলো ব্যাপারটা আরও একটু পরিস্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করলাম, ভদ্রলোক আমার কথায় কোন ছবি তুলবেন না কথা দিতে পারি। কিন্তু ফেরার পথে তাঁরা বিশ্বাস করবেন তো? পরে কোন ঝামেলা হবে না তো? অবিশ্বাসের প্রশ্ন থাকলে তাঁরা গিয়ে ভদ্রলোকের ক্যামেরা নিয়ে আসতে পারেন। অফিসারটি বললেন ঠিক আছে তাকে যেন ছবি তুলতে বারণ করে দেওয়া হয়। পরে কোনরকম ঝামেলা করা হবে না।

ফিরে এসে দেখি মাধব ও মোটা যুবকটি আমাদের জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে। ক্যামেরার মালিক অনেকক্ষণ ক্যামেরা নিয়ে বসুধারার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। মহা চিন্তায় পড়লাম। মাধবকে সব বললাম। মাধব জানালো, একটু আগে তিনি  তাকে সামনে দাঁড় করিয়ে ভীমপুলের একটা ছবি তুলেছেন। কী করা উচিৎ ভেবে না পেয়ে, এগিয়ে চললাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে, বহুদুরে নীল জ্যাকেট পরা ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম। একবারে ফাঁকা রাস্তা। মাঝে মাঝে মানা গ্রামের লোকেরা যাতায়াত করছে। দুরে বরফাচ্ছাদিত একটা শৃঙ্গ চোখে পড়ছে। হাত নেড়ে চিৎকার করে ভদ্রলোককে দাঁড়াতে বললেও, তিনি কিন্তু শুনতে পেলেন না। ভাবলাম রাস্তায় ছবি তুললে স্থানীয় লোকেরা যদি লক্ষ্য করে, তবে তারা হয়তো মিলিটারি ক্যাম্পে খবর দেবে। তখন আমিও না এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ি। যাহোক্ ভদ্রলোক বোধহয় হাঁপিয়ে গিয়ে একটা জায়গায় বসে পড়লেন। আমরা জোর পায়ে আরও এগিয়ে গিয়ে, চিৎকার করে তাঁকে অপেক্ষা করতে বললাম। শেষে তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। ভদ্রলোক সব শুনে খুব ভয় পেয়ে গিয়ে বললেন, ইতিমধ্যে তাঁর দু’টো ছবি তোলা হয়ে গেছে। একটা ভীমপুলে, আর একটা মাঝপথে। আর মাত্র একটা ছবি তুললেই, এই ফিল্মটা শেষ হয়ে যাবে। তাঁকে আর কোন ছবি তুলতে বারণ করে বললাম, ফিরবার পথে ওরা জিজ্ঞাসা করলে সত্যি কথা বলতে। কারণ কোন কারণে অবিশ্বাস করে ফিল্ম্ খুলে নিয়ে ওয়াশ করলে তিনি খুব বিপদে পড়বেন। ভদ্রলোক বললেন তার ওয়াশিং চার্জ দেওয়াই আছে। সেরকম হলে তিনি অনুরোধ করবেন যে, ফিল্ম্ খুলে নিয়ে ওয়াশ করে আপত্তিকর ছবি রেখে দিয়ে, বাকি ফটো নষ্ট না করে তাঁকে পাঠিয়ে দিতে। শেষ পর্যন্ত তাই ঠিক হলো।

আমরা আবার এগিয়ে চললাম। বহুদুরে বসুধারা ফলস্ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যতই হাঁটছি, দুরত্ব একই থাকছে বলে মনে হচ্ছে। রাস্তা খুব একটা কষ্টকর না হলেও, হাঁটতে আর ভালো লাগছে না। মানা গ্রামে একটা বোর্ডে লেখা ছিল— বসুধারা পাঁচ কিলোমিটার। অর্থাৎ বদ্রীনারায়ণ থেকে বসুধারা আট কিলোমিটার পথ। কিন্তু রাস্তা যেন আর শেষ হতেই চায় না। অবশেষে আমরা বসুধারা ফলস্ এর তলায় এসে হাজির হলাম। পাহাড়ের চুড়ায় ভেন্টিলেটারের মতো একটা গর্ত থেকে সাদা মিল্ক পাউডারের মতো সাদা জল পড়ছে। কোনকালে হয়তো পাহাড় বেয়েই জলের ধারা নামতো। মনে হয় পাহাড়ের ক্ষয়ের ফলেই এখন পাহাড়ের গা বেয়ে না পড়ে, ওপর থেকে সোজা তলায় জল পড়ছে। ওপর থেকে সরাসরি জল যেখানে পড়ছে, সেখান থেকে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান পর্যন্ত সাদা গ্লেসিয়ার। পাশ দিয়ে গ্লেসিয়ারের ওপর গেলে, ফলস্ এর ঠিক তলায় যাওয়া যায়। শুনেছি বসুধারার তলায় দাঁড়ালে গায়ে যদি জল না লাগে, তাহলে বুঝতে হবে সে পাপী। ফলস্ এর ঠিক নীচে দাঁড়ালে একটুও জল গায়ে না লেগে কী ভাবে তলায় পড়তে পারে, বা কী ভাবে তলায় পড়া সম্ভব, ভেবে পেলাম না। মনে হলো তবে কী সারা দুনিয়ার মানুষই কোন পাপ কাজ করে নি? পাপের জন্য আদালতে বিচার, সাক্ষীর হাস্যকর প্রহসন না করে, অযথা সময় ও অর্থ নষ্ট না করে, এখানে জলের তলায় দাঁড় করিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। সে যাহোক্, গ্লেসিয়ার বেয়ে লাঠি নিয়ে খানিকটা উঠলাম। মাধবের লাঠি আগের দিন কুলির ধকল সইতে না পেরে, নালছাড়া হয়েছে। বুঝলাম লাঠি নিয়ে চেষ্টা করলে ওঠা যাবে, কিন্তু নেমে আসা খুব কঠিন হবে। পা হড়কে রাস্তার ওপর, যেখানে সবাই দাঁড়িয়ে আছে, ওর ওপর দিয়ে গড়িয়ে নীচের চাষের জমিতে চলে যেতে হবে। আস্তে আস্তে সাবধানে নীচে নেমে এলাম। সঙ্গে আমসত্ত্ব আছে, সকলে মিলে খানিকটা খেলাম। ভাবলাম জাপানি ছেলেটাকে আর একটু খাওয়ালে হয়। একটু পরে আমরা ফিরবার পথ ধরলাম।

রাস্তায় কোন জলের ব্যবস্থা নেই। কাজেই ঐ ঝরনার জলই একটু খেয়ে, এগিয়ে চললাম। মাধব, দিলীপ ও মোটাবাবু আস্তে আস্তে অনেক পিছিয়ে পড়লো। আমি ও ক্যামেরা কেলেঙ্কারির নায়ক, গল্প করতে করতে এগিয়ে চলেছি। একসময় মোটাবাবুও এগিয়ে এসে আমাদের দলে যোগ দিল। মাধব ও দিলীপ এত পিছনে পড়ে গেল, যে ওদের আর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। মাধবের হাঁটুতে একটা ব্যথা হয়েছে। চিন্তা হলো কোন অসুবিধায় পড়লো কী না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর, ওদের আবার বহুদুরে দেখতে পেলাম। একসময় আমরা সেই মিলিটারি ক্যাম্পের কাছাকাছি চলে এলাম। কোনরকম ঝামেলা হলে আমিও ঝামেলায় পড়তে পারি ভেবে, কায়দা করে ওদের থেকে পিছিয়ে গেলাম। আমরা তিনজন যখন ক্যাম্পে এসে পৌঁছলাম, দেখলাম মোটাবাবু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বাঙালি ভদ্রলোক তাঁর ক্যামেরা সমেত ভালোভাবে ফিরে গেছেন। বুঝলাম কোন ঝামেলা হয় নি, মিলিটারিরা তাদের কথা রেখেছে। আমরা আমাদের ক্যামেরা ফেরৎ নিলাম। পাশেই কয়েকজন বৃদ্ধা ভেড়ার লোম দিয়ে কম্বল বা ঐ জাতীয় কিছু তৈরি করছে। কয়েকটা বাচ্চা তাদের ঘিরে খেলা করছে। একজন বৃদ্ধা একটা বালতি নিয়ে এসে আমায় কী বললো, বুঝতে পারলাম না। আবার জিজ্ঞাসা করাতে সে বললো, আমার ওয়াটার বটলটার কত দাম? আমাদের দেশে এগুলো সস্তা কী না? বললাম এটার দাম সাত টাকা। সে বললো যে সে আমাকে সাতটা টাকা দিচ্ছে, আমি যেন তাকে এটা দিয়ে দেই। আমি ইচ্ছা করলে তার বালতিটা নিয়েও এটা তাকে দিতে পারি। এরকম যে কোন প্রস্তাব আসতে পারে, স্বপ্নেও ভাবি নি। বললাম আমরা আরও অনেক জায়গায় যাব। রাস্তায় খাবার জলের প্রয়োজন হবে। বালতি করেও জল নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কাজেই আমি এটা তাকে দিতে পারছিনা বলে দুঃখিত। ওদের সরলতা দেখে অবাক হতে হয়।

আমরা আবার হাঁটতে শুরু করে কিছুক্ষণের মধ্যেই মানা গ্রামে এসে উপস্থিত হলাম। আই.টি.বি. পুলিশ ক্যাম্পের উলটো দিকের একটা চায়ের দোকানে বসে কয়েক বৎসরের পুরানো চানাচুর কিনে, চা করতে বললাম। চানাচুরই এই দোকানের একমাত্র খাদ্যবস্তু। আমরা চায়ের অপেক্ষায় বসে আছি। বসে আছে আই.টি.বি. পুলিশে পোষ্টেড দু’জন ভদ্রলোক। একজনের বাড়ি বেনারস, অপরজন বিহারের লোক। তারা আমাদের সব কথা শুনে বললো, আমাদের ক্যামেরাটা জামার তলায় ঢুকিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল। ওপর থেকে দেখা না গেলে, কেউ সার্চ করতো না। ভাবলাম একই কাজে নিযুক্ত দু’জন কী সুন্দর দু’রকম কথা বলছে। ধন্য আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সাহস একটু বেড়ে গেল। পুলিশ ক্যাম্পকে সাক্ষী রেখে, দুরের গ্রামের ছবি নিলাম। দোকানদার এখনও চা তৈরি করছে। হঠাৎ দেখি পাথরে থেঁতো করে, সে কী যেন চায়ের কেটলিতে দিয়ে দিল। পরিমানেও অনেকটা। জিজ্ঞাসা করতে দোকানদার জানালো, মশলা। ভাবলাম এখানকার অনেক চায়ের দোকানের মতো, এলাচ বা গরম মশলা জাতীয় কিছু দিয়েছে। ও বাবা! চায়ে একটা চুমুক দিয়েই অবস্থা শোচনীয়। খাবে কার সাধ্য। একগাদা গোলমরিচ চায়ে থেঁতো করে দেওয়া হয়েছে। জীবনে এই প্রথম ঝাল চা খেয়ে ধন্য হলাম। যাহোক্, চা শেষ করে যথাসময়ে মন্দিরের পাশের হোটেলে ফিরে এলাম। অনেক বেলা হয়ে গেছে। পরোটা আর চা খেয়ে, গেলাম “শোণপ্রয়াগ” যাবার বাসের খবর নিতে। তীরথের কথা খুব মনে পড়ছে। আজ সকালে আমাদের ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। ওর বাস খুব ভোরে বদ্রীনারায়ণ ছেড়ে চলে গেছে। কেদারনাথ যেতে হলে, শোণপ্রয়াগ পর্যন্ত বাসে যাওয়া যাবে। খবর পেলাম বাস ছাড়ার ঘন্টাখানেক আগে টিকিট দেওয়া হয়। কেদারের রাস্তা খুব খারাপ হয়ে আছে। ওদিক থেকে কোন বাস আসছে না। ওদিক থেকে বাস আসলে, তবে এদিকের বাসের টিকিট দেওয়া হবে। ঘরে ফিরে এসে দেখি একতলায় সিঁড়ির পাশে, বৃদ্ধ ভদ্রলোকের পাশের ঘরে, চার-পাঁচজন যুবক বসে আছে। পঞ্চভাই ও ঐ বৃদ্ধ ভদ্রলোকও আছেন। বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাদের কথা বোধহয় এদের আগেই বলেছেন, কারণ আমরা আসতেই তারা আমাদের ডেকে কথা বলতে শুরু করলো। সবাই বাঙালি। দু’জনের বাড়ি আসানসোলে। ওদের মধ্যে দু’জন নাকি অমরনাথ ও কেদারনাথ হয়ে এখানে এসেছে। বাকিরা কেদারনাথেই প্রথম গেছিল। সেখান থেকে একটু আগে এখানে এসে পৌঁছেছে। একসাথে অমরনাথ, ও কেদার-বদ্রী যেতে, আগে কারো কথা শুনেছি বলে মনে করতে পারছি না। তবু মনটা বেশ পুলকিত হয়ে গেল। বাস তাহলে কেদারনাথ থেকে এসেছে। ওরা জানালো, মাঝ রাস্তায় ধসের জন্য তাদের অনেকক্ষণ আটকে থাকতে হয়েছিল। গত দু’দিন কোন বাস আসে নি। কেদারনাথ থেকে আজই প্রথম বাস আসে তাদের নিয়ে। ওরা এখান থেকে নন্দন কানন, হেমকুন্ড সাহেব যাবে। ওদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, আমরা কেদারের রাস্তার একটা মোটামুটি অবস্থা জেনে নিলাম।

বিকালে, প্রায় সন্ধ্যার সময় আমরা আবার বাস স্ট্যান্ডে গেলাম। মোটাবাবু তার কেদার যাবার জন্য শোনপ্রয়াগের দু’টো টিকিট কাটার টাকা দিয়ে দিল। বাস স্ট্যান্ডের টিকিট কাউন্টারের ভদ্রলোক আমাদের জানালেন যে, এই পথে প্রথমে যমুনোত্রী, তারপর গঙ্গোত্রী, তারপর কেদারনাথ হয়ে সব শেষে বদ্রীনারায়ণ যাওয়া সুবিধাজনক। তাই সকলে ঐ ভাবেই এই চার জায়গায় যায়। যারা শুধুমাত্র কেদার-বদ্রী যায়, তারাও প্রথমে কেদারনাথ গিয়ে, সেখান থেকে বদ্রীনারায়ণ আসে। কেদার থেকে বদ্রী আসার বাস অনেক আছে। আজ রাস্তা পরিস্কার হয়ে যাওয়ায়, ওদিক থেকে কিছু বাস এসেছে। আগামীকালও বেশ কিছু বাস আসবে। তবে এদিক থেকে সোজা শোনপ্রয়াগ যাওয়ার বাস নেই। কাল সকাল ন’টায় সোজা শোনপ্রয়াগ যাওয়ার একটাই বাস ছাড়বে, এবং সেটা সন্ধ্যাবেলা শোনপ্রয়াগ পৌঁছবে। কাল সারাদিনে ঐ একটাই ডিরেক্ট্ বাস, বা এখানকার ভাষায় “যাত্রাবাস” আছে। আর একভাবে আমরা যেতে পারি। সকাল ছ’টার বাসে রুদ্রপ্রয়াগ গিয়ে, ওখান থেকে শোনপ্রয়াগের বাস ধরতে পারি। পৌঁছতে পৌঁছতে সেই সন্ধ্যাই হয়ে যাবে। ভাবলাম দু’ভাবেই পৌঁছতে যদি সন্ধ্যা হয়ে যায়, তবে যাত্রাবাসেই যাওয়া ভালো ও সুবিধাজনক। বাস বদল করবার ঝামেলা নেই, বসবার জায়গা না পাওয়ার ঝুঁকি নেই। এতক্ষণে জানা গেল, যাত্রাবাসের টিকিট কাল সকাল আটটায় পাওয়া যাবে।

ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলাম। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলো। মাধব ও দিলীপ গেল মন্দিরে আরতি দেখতে। আমি ঘরে বসে সুটকেস গোছাতে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে সঙ্গীরা ঘরে ফিরে এল। তারাও আমার কাজে সাহায্য করতে শুরু করে দিল। সুটকেস ও কাঁধের একটা ব্যাগ গুছিয়ে রাখলাম। কাল সকালে হোল্ড-অল্ বেঁধে ফেললেই হবে। পঞ্চভাই একটা বদ্রীনারায়ণের মালা নিয়ে ঘরে এল। আমাদের তিনজনের নামধাম ওর খাতায় টুকে নিল। নাম, বাবার নাম, গোত্র ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় বিষয় জেনে নিয়ে, মন্ত্র পড়ে তিনজনকেই কপালে চন্দনের ফোঁটা পড়িয়ে দিল। হাতে খানিকটা করে পূজোর চরণামৃতও দিল। মাধব ও দিলীপ তাকে ভক্তিভরে প্রণাম করলো। পঞ্চভাই একটু পরে ঘর ছেড়ে নিজের কাজে চলে গেল। আমরা আরও কিছু পরে সেই হোটেলে গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে এলাম। কিছুক্ষণ নিজেরা গল্পগুজব করে সময় কাটালাম। আজ একুশে আগষ্ট, বাড়ি থেকে দিন আষ্টেক হলো এসেছি। বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে। যে যার বাড়িতে চিঠি লিখে, শুয়ে পড়লাম।

আজ বাইশে আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো বেশ সকালে। দাঁত মেজে, একতলায় সকালের কাজ সেরে, একবারে সব মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে এলাম। পাশের ঘরের মোটাবাবু ও তার বৃদ্ধ সঙ্গীও আমাদের সাথে পথে নামলো। পঞ্চভাই-এর দক্ষিণা ও ঘরভাড়া বাবদ কুড়ি টাকা, গতকাল রাতেই দিয়ে দিয়েছি। সন্ধ্যাবেলা শোনপ্রয়াগ পৌঁছবার কথা। আগামীকাল কেদারনাথ দর্শন। আগে কেদার গেলে, মোটাবাবুর মতো ধসে আটকে হয়তো ফিরে আসতে হতো। আমাদের ভাগ্য ভালো বলেই মনে হলো। বাস স্ট্যান্ডে এলাম। কোন বাস যাবে এখনও ঠিক হয় নি। প্যাসেঞ্জার হলে বাসের টিকিট দেওয়া হবে। কথায় কথায় মোটাবাবু গতকালের বসুধারা যাবার কথা তুলে বললো, “কালকের চায়ের দোকানের চা টা কী সুন্দর করেছিল বলুন, এখনও মুখে লেগে আছে। ব্যাটাকে গড়তে বললাম ভগবান, গড়ে আনলো হনুমান। বলুন তাই নয়? আচ্ছা, ঐ পথটা কী সত্যিই মহাভারতের মহাপ্রস্থানের পথ? সত্যিই কী ভীম ঐ পুলটা তৈরি করেছিল”? আমি আর কী বলবো, বললাম “লোকে তো তাই বলে”। মোটাবাবু বললো, “গতকাল আমরা তাহলে একপ্রকার পঞ্চপান্ডবের ভূমিকায় ছিলাম বলুন”। আমি বললাম “অবশ্যই, আপনি দ্বিতীয় পান্ডব ছিলেন”। মোটাবাবু একটু চুপ করে থেকে গম্ভীর হয়ে গেল।

এতক্ষণে কোন বাসটা যাবে জানা গেল। একবারে ড্রাইভারের বাঁ পাশে সিঙ্গল সিট ও তার ঠিক পিছনের দু’জনের বসার      চেয়ার সিটটা দখল করে, রাস্তায় নেমে বাসের ছাদে মালপত্র গুছিয়ে রাখলাম। দু’জনে বসার আমাদের চেয়ার সিটটার পিছনের সিটটা, মোটাবাবু ও তার বৃদ্ধ সঙ্গীটি দখল করলো। এতক্ষণ চারিদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিল। এখন ধীরে ধীরে আকাশ পরিস্কার হচ্ছে। বাস স্ট্যান্ডের পিছনে, অর্থাৎ মন্দিরের বাঁপাশে বরফমন্ডিত শৃঙ্গ সূর্যালোকে নিজেকে প্রকাশ করলো। একজন দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ, কয়েকজন মাঝ বয়সি ভদ্রলোক ও একজন যুবতীকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। বাসের ছাদ থেকে নেমে আসতে, ঐ বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাদের বাড়ি কোথায়, কোথা থেকে এখানে এসেছি, এখান থেকে আর কোথায় কোথায় যাব, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করলে, আমরা সব উত্তর দিলাম। বৃদ্ধের কথায় জানতে পারলাম, তাঁরা সোজা বদ্রীনারায়ণ এসেছিলেন। এখান থেকে এই বাসেই কেদারনাথ যাচ্ছেন। সেখান থেকে দেরাদুন ও মুসৌরী যাবেন। তিনি আরও জানালেন যে, এই নিয়ে তাঁর দু’-তিনবার কেদারনাথ যাওয়া হবে। যদিও দু’বার না তিনবার, স্পষ্ট করে বলতে পারলেন না। তাঁর মধ্যে একটু সবজান্তা সবজান্তা ভাব। যাহোক একটু পরে টিকিট কাউন্টার খুললো। আটষট্টি টাকা নব্বই পয়সা দিয়ে আমরা তিনটে শোনপ্রয়াগের টিকিট কাটলাম। রাস্তার ধারে একটা দোকান থেকে চা-জলখাবার খেয়ে নিয়ে বাসের কাছে অপেক্ষা করছি। বাসও ইতিমধ্যে বাস স্ট্যান্ডের মাঠ মতো ফাঁকা জায়গা থেকে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। একটু পরেই বাস ছাড়বে বললেও, বাস ছাড়ার কোন লক্ষণ চোখে পড়ছে না। টাটার বেশ বড় ও নতুন বাস। কাল সময় করে বদ্রীনারায়ণ মন্দিরের পূর্ণাঙ্গ ছবি নেওয়া হয়ে ওঠেনি। এখন বেশ ভালো রোদ ওঠায়, ভাবলাম মন্দিরের একটা ছবি তুলে আনি। এখান থেকে মন্দির অনেকটা পথ। দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ছুটেই মন্দিরের সামনে, ব্রিজের ওপর গেলাম। খুশিমতো ছবি তুলে খুব দ্রুত বাসের কাছে ফিরে এসে দেখলাম, সেই একই ভাবে ড্রাইভারহীন বাস দাঁড়িয়ে আছে। শুনলাম ওয়ান ওয়ে, অর্থাৎ যোশীমঠে যেরকম দেখেছিলাম, সেইরকম ওদিক থেকে আজ বাস প্রথমে আসবে। যাহোক্ কপাল ভালো, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই লাইন দিয়ে বেশ কয়েকটা বাস, ট্রাক ইত্যাদি এসে হাজির হলো। আমাদের বাসও আর সময় নষ্ট না করে ছেড়ে দিল।

খুব ভালো লাগছে, মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে আমরা চলেছি। হনুমান চটি যমুনোত্রীর পথে পড়ে জানতাম, এপথেও দেখি আছে। একজন পুরোহিত গোছের লোক, বাসের সবার কপালে লাল রঙের ফোঁটা পরিয়ে দিয়ে গেল। গোবিন্দঘাটের ঠিক আগের স্টপেজে বাস এসে থামলো। আমরা বাস থেকে নেমে এলাম। তীরথের সঙ্গে গোবিন্দঘাট থেকে বদ্রীনারায়ণ যাবার দিনও বাস এখানে অনেকটা সময় দাঁড়িয়েছিল। এখানে একটা আপেল গাছে, সামান্য লাল রঙের একটা আপেল দেখে গেছিলাম। আজও একটু খুঁজতেই সেটা চোখো পড়লো। রাস্তার পাশে একটু সমতল জমি, ধান চাষ হয়েছে। আমরা দাঁড়িয়েই আছি, বাস আর ছাড়ে না। খবর নিয়ে জানা গেল, এখান থেকে এই বাসে মেল যাবে। চিঠিপত্র সম্ভবত সর্টিং করা হচ্ছে। আমরা, এই বাসের সমস্ত যাত্রীরা চেঁচামিচি শুরু করে দিলাম। সমস্ত বাস ছেড়ে দিয়ে এই বাসটাকে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য, ড্রাইভারও বিরক্ত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ডাক না নিয়েই বাস ছেড়ে দিল। আমাদের বাসটা নতুন, কিন্তু গতি সব সময় সীমিত। আমাদের পিছনের সিটের মোটাবাবু জানালো, ধস নামার জন্য কেদারনাথ যেতে না পারায়, তারা যখন বদ্রীনারায়ণ চলে আসছিল, তখন “গৌচর” নামে একটা জায়গায় তাদের বাস ধসে বেশ কয়েক ঘন্টা আটকে ছিল। একসময় আমরা সেই অভিশপ্ত “হেলং” শহরের কাছে এসে পৌঁছলাম। আশ্চর্য, এখানে কিছু হয়েছিল বলে মনে হলো না। এখানকার পাথরে বোধহয় চুনের ভাগ খুব বেশি। ঐ ধসের জায়গায় রাস্তাটা দেখলাম সাদা হয়ে আছে। তবে এখন রাস্তাটা বেশ চওড়া ও পরিস্কার হয়ে গেছে। গৌচরে বাস আসলে মোটাবাবুও, কোনখানে ধস নেমেছিল দেখালো। শুনলাম গৌচরে নাকি দেখার মতো মেলা বসে। এখানে এসে শুনলাম, বদ্রীনারায়ণে আর কিছুদিন পরেই বিষ্ণুযজ্ঞ হবে। প্রচুর সাধুসন্ত, ভক্ত ও সাধারণ মানুষের আগমন হবে সেই সময়। আমরা ফাঁকায় ফাঁকায় ভালোই ঘুরেছি।

একসময় বাস এসে “পিপলকোঠি”তে থামলো। সেই পিপলকোঠি, যেখানে শ্রীনগর থেকে যাবার সময়, দুপুরের আহার সেরেছিলাম। এবারেও এখানে বাস থামার সেই একই উদ্দেশ্য, দুপুরের আহার এখানেই সেরে নিতে হবে। আশ্চর্য, জায়গাটা আগে চিনতেই পারি নি। গতবারের বাস ড্রাইভারের সাথে বোধহয় ঐ ছোট হোটেলগুলোর কোন কমিশনের ব্যাপার ছিল। তা নাহলে এত বড় বড় দোকানপাট থাকতে, ঐ ছোট ছোট দুটো দোকানের কাছেই বা বাস দাঁড় করাবে কেন? এখন দেখছি বেশ বড় শহর, বেশ বড় বড় দোকান আছে। একটা হোটেলে দিব্বি মনের সুখে গরম গরম মাংস আর রুটি খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিলাম। কী ভালো যে লাগলো কী বলবো। মনে হলো যেন অমৃত খেলাম। বাস ড্রাইভার জানালো, একটু তাড়াতাড়ি বাসে ফিরে আসতে, তা নাহলে আজ শোনপ্রয়াগ পৌঁছনো যাবে না। গুপ্তকাশীর পর থেকে ওদিকের রাস্তা একবারে কাঁচা। তার ওপর অনবরত ধসে, রাস্তার অবস্থাও খুবই খারাপ। নিজেদের স্বার্থে আমাদের বাসের যতগুলো যাত্রীকে কাছাকাছি দেখতে পেলাম, ড্রাইভারের কথা বলে বাসে উঠতে বললাম। সেই দাড়িওয়ালা বৃদ্ধের দু’একজন সঙ্গীর জন্য, বাস আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। ড্রাইভার আবার বললো, বিকেল চারটে-সাড়ে চারটের মধ্যে গুপ্তকাশী পৌঁছতে না পারলে, এখানকার ট্রাফিক আইন অনুযায়ী, আজ আর শোনপ্রয়াগ যেতে দেওয়া হবে না। যাহোক্ কিছুক্ষণ পর সবাই বাসে ফিরে আসায়, বাস আবার এগিয়ে চললো।

অনেক রাস্তা পার হয়ে একসময় আবার আমরা রুদ্রপ্রয়াগ এসে পৌঁছলাম। এই জায়গাটাকে জংশন বলা যেতে পারে। এখান থেকে কেদারনাথ ও বদ্রীনারায়ণ যাবার রাস্তা ভাগ হয়ে দু’দিকে বেঁকে গেছে। এখন প্রায় পৌনে পাঁচটা বাজে। আকাশে অবশ্য যথেষ্ট রোদ আছে। কেবল বিকেল হয়েছেও বলা যায়। কিন্তু এখানকার ট্রাফিক আইন অনুযায়ী, আজ আর শোনপ্রয়াগ যাবার কোন সম্ভাবনা নেই। বাস কিছুক্ষণের জন্য এখানে দাঁড়াবে। বাস থেকে নেমে চা খেয়ে নিয়ে, জায়গাটা একটু ঘুরে দেখলাম। দেখা হয়ে গেল সেই অমরনাথ, কেদারনাথ ফেরৎ দু’জন যুবকের সঙ্গে। তারা জানালো যে তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। তাদের পক্ষে এবার আর নন্দন কানন, হেমকুন্ড যাওয়া সম্ভব হলো না। এদের বাকি সঙ্গীদের দেখলাম না। তারা বোধহয় হেমকুন্ডের দিকে গিয়ে থাকবে। যাওয়ার সময়ও এই জায়গাটা এক চক্কর ঘুরে দেখেছিলাম। সত্যিই খুব সুন্দর জায়গা। এখানে দাঁড়িয়ে আবার সেই একই কথা মনে হচ্ছে। এখন এত বছর পরেই জায়গাটার এই অবস্থা, তাহলে জিম করবেট যখন এখানে চিতা মেরেছিলেন, তখন এখানকার অবস্থা কী ছিল? চিতাটাকে উনি মারলেন কী ভাবে? চিতাটা নিশ্চই প্রাণ দেবার জন্য খাদ থেকে রাস্তার ওপর আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে এসে দাঁড়িয়ে ছিল না। যাহোক্, বাস ছেড়ে দিল। গন্তব্য স্থান, এখান থেকে সম্ভবত আটষট্টি কিলোমিটার দুরের শোনপ্রয়াগ। একবার মনে হচ্ছে আজ হয়তো শোনপ্রয়াগ পৌঁছে যাব। আবার মনে হচ্ছে এতটা পথ যাওয়ার মতো হাতে সময় কোথায়? এদিকের রাস্তা কিন্তু বেশ ভালো। ড্রাইভার জানালো, গুপ্তকাশীর পর থেকে রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। আজ বাস নিয়ে শোনপ্রয়াগ যাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। নীচে রাস্তার বাঁপাশে বিরাট একটা সমতল মাঠ। অনেক ছেলে সেখানে সাইকেল চালাচ্ছে। একধারে ভলিবল খেলা হচ্ছে। অনেকদিন পরে সমতল জমি দেখলাম।

গুপ্তকাশী যখন পৌঁছলাম, তখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। রাস্তার এদিক থেকে ওদিক, লেভেল্ ক্রসিং এর গেটের মতো, একটা কাঠের গেট ফেলা। আজ আর এদিক ওদিক, কোন দিকেরই বাস যাতায়াত করবে না। ড্রাইভার জানালো, এখানে হোটেল, ধর্মশালা, পাওয়া যাবে। কাল সকালে আবার বাস ছাড়বে। বাসের কিছু লোক আজই বাস নিয়ে শোনপ্রয়াগ যাবার জন্য, বাসের ড্রাইভারকে জোর করতে লাগলো। দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ এদের নেতৃত্ব দিতে শুরু করলেন। তিনি জানালেন যে তিনি এপথে অনেকবার এসেছেন। এদিকের রাস্তা এমন কিছু খারাপ নয়, যে আজ যাওয়া যাবে না। এতক্ষণ বাসের সামনের সিঙ্গল সিটে বসে ঘুম আসছিল। মাধব আমাকে পেছন থেকে ডেকে দিল। ড্রাইভারের পাশের ও ঠিক পেছনের দু’দিকের সিটে বসে ঘুমানো নিষেধ। ঠিক হয়ে বসলাম। ড্রাইভার যাত্রীদের জানালো যে সামনের রাস্তা একবারে কাঁচা। একটু এদিক ওদিক হলে, বাস গভীর খাদে গড়িয়ে যেতে পারে। সবজান্তা বৃদ্ধও নাছোড়-বান্দা। আমরা বললাম ড্রাইভার যখন বাস নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছে, তখন নাহয় আজ রাতটা এখানেই কাটিয়ে যাই। সবজান্তা বৃদ্ধ জানালেন, যে তিনি এপথে অনেকবার এসেছেন। ধস নামলেও কোন ক্ষতি হবে না, বাস ঠিক চলে যাবে। আমরা বললাম প্রত্যেকবার তো রাস্তা একই রকম থাকে না। ড্রাইভার যখন চাইছে না, কী দরকার অযথা ঝুঁকি নেবার। বৃদ্ধ সেই একই কথা আবার বললেন যে, তিনি আগে এপথে অনেকবার এসেছেন। ভয় পেলে এপথে যাওয়া যায় না। বিরক্ত হয়ে বললাম, বাস খাদে পড়লে, তাদের ও আমাদের একই দশা হবে। কিন্তু মাঝ রাস্তায় বাস কোন কারণে যেতে না পারলে, বিপদ বা ঝুঁকি তাদেরই বেশি, কারণ তাদের সাথে অনেক বয়স্ক লোক ও একজন যুবতী আছে। আমরা একটা রাত অন্ধকারে বাসে বসে কাটিয়ে দিতে পারবো। এখনও প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পথ যেতে বাকি। অচেনা অজানা রাস্তায়, অন্ধকার বাসে বসে রাত কাটানো, তাদের পক্ষে ঠিক বা নিরাপদ হবে তো? শেষে ড্রাইভার বেচারা অনেকের চাপে পড়ে জানালো, সবাই যদি এই অন্ধকারে যেতে চা্‌য়, তবে সে স্পেশাল পারমিশান নিয়ে বাস এগিয়ে নিয়ে যেতে রাজি আছে। তবে আজ না গেলেই বোধহয় সবাই ভাল করতো। সবজান্তা বৃদ্ধ জয়ের হাসি হাসলেন। যাহোক, ড্রাইভার নিজে বাস থেকে নেমে গিয়ে কী ভাবে ব্যবস্থা করে, বাসে ফিরে এসে বসলো। বাসের স্টিয়ারিং এর ওপর হাত দিয়ে বিড়বিড় করে কী সব বলে, বারকতক নমস্কার করে, আবার একবার “রাস্তা খুব খারাপ, আজ না গেলেই ভাল করতেন” বলে, বাস ছেড়ে দিল।

চারিদিক ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সামনের জোরালো হেডলাইটের আলোয় বাস এগিয়ে চলেছে। ড্রাইভার বাসের গতিও অসম্ভব বাড়িয়ে দিয়েছে। বাস খানিকটা পথ এগোতেই, একটা বেড়াল রাস্তার একদিক থেকে অপরদিকে চলে গেল। ব্যাস, বিল্লি রাস্তা কাট্ দিয়া বলে ড্রাইভার বাস থামিয়ে, ইঞ্জিন বন্ধ করে, সব আলো নিভিয়ে দিল। উঃ, বাসের একবারে সামনে ড্রাইভারের বাঁপাশে বসে দেখতে পাচ্ছি চারিদিকে কী ঘন অন্ধকার। কিছুক্ষণ সময় এইভাবে থেকে, বারবার বিল্লি রাস্তা কাট্ দিয়া, বিল্লি রাস্তা কাট্ দিয়া বলতে বলতে, বাসের ইঞ্জিন চালু করে, ড্রাইভার আবার বাস এগিয়ে নিয়ে চললো। মনে পড়ে গেল, গত বছরের কথা। আমরা দিল্লী থেকে বাসে হরিদ্বার যাচ্ছি। অসম্ভব গতিতে বাস ছুটছে, হঠাৎ ড্রাইভার প্রচন্ড জোরে ব্রেক কষে, বাস থামিয়ে দিল। আমরা একে অপরের গায়ে গিয়ে পড়লাম। অনেকে বেশ গুরুতর আঘাতও পেল। কী ব্যাপার, না বিল্লি রাস্তা কাট্ দিয়া। এটা সমস্ত রাজ্যে, সমস্ত গাড়ির ড্রাইভারের কাছে একটা অশুভ ইঙ্গিত। বাসের চল্লিশ পঞ্চাশজন যাত্রী আহত হোক ক্ষতি নেই, তবু বাস না দাঁড় করিয়ে, একটু না থেমে, এক ইঞ্চিও বাস এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিৎ নয়। অনেকে আবার বলে বিল্লিকে চাপা দিয়ে চলে যেতে পারলে নাকি আর কোন বিপদের সম্ভাবনাই থাকে না। যাহোক্, সেই বিল্লি আবার এবারেও রাস্তা কেটে দিল। তা আবার অন্ধকার রাতে এরকম দুর্গম পথে।

ড্রাইভার একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেছে বলে মনে হলো। ওকে একটা সিগারেট দিলাম। ভাবলাম, ওর ঐ দুশ্চিন্তা থেকে মনটাকে যদি ফিরিয়ে আনা যায়। প্রথমে নেবে না বলে, পরমুহুর্তেই হাত বাড়িয়ে সিগারেটটা নিল। এবার একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে, আমাদের সাথে বকবক্ করতে করতে, ঐ গতিতে বাস নিয়ে এগিয়ে চললো। চোখ যদিও সামনের দিকে, তবু এটা বিপজ্জনক তো বটে। তাই আমরা কথা বন্ধ করলাম। রাস্তার অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ। রাস্তার ওপর দিয়ে দু’এক জায়গায় জোরালো ঝরনা বয়ে যেতেও দেখলাম। ঐ কেদারের পথ বিশেষজ্ঞ বৃদ্ধও বোধহয় এবার একটু ভয় পেয়ে চুপ করে সামনের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। আগের মতো এক নাগাড়ে কথা বলাও বন্ধ হয়ে গেছে। বেশ কিছুটা দুরে দেখলাম, রাস্তার ওপর কী যেন রাখা আছে। বাস আরও কাছে আসতে বুঝলাম রাস্তার ওপর গাছের বেশ বড় বড় গুঁড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। ড্রাইভার ব্রেক কষে বাস দাঁড় করিয়ে, আমাদের বাস থেকে নামতে বারণ করলো। সম্ভবত এই পথে এত রাতে বাস বা অন্যান্য গাড়ি চলাচল করে না বলেই বোধহয়, সকালে সরিয়ে নিয়ে যাবে ভেবে কেউ গাছ কেটে রাস্তায় রেখেছে। ড্রাইভার তো সেই অদৃশ্য ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে শুরু করে দিল। কন্ডাক্টার বাস থেকে নেমে একপাশে গুঁড়িগুলো ঠেলে সরিয়ে দিতে শুরু করে দিল। ড্রাইভার চিৎকার করে তাকে গাছের গুঁড়িগুলো খাদে ফেলে দিতে বললো। কন্ডাক্টার তার কথা না শোনায়, সে তাকেও গালিগালাজ করতে লাগলো। যহোক্, শেষ পর্যন্ত বাস আবার ছেড়ে দিল। মধ্যে মধ্যে রাস্তার পাশে গ্রাম পড়লে, সেখানে বাচ্চা-বুড়ো সবাই দেখি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, অবাক হয়ে বাসের দিকে তাকিয়ে দেখছে। বোধহয় এত রাতে এ রাস্তায় বাস দেখে, তারাও অবাক না হয়ে পারছে না। শেষ পর্যন্ত রাত প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা অক্ষত অবস্থায়, শোনপ্রয়াগ এসে পৌঁছলাম। একটা উদ্বেগ ও বিপদ কেটে গেল।

এখানে নেমে শুনলাম, এখানে ইলেকট্রিক্ আলোর ব্যবস্থা থাকলেও, যেকোন কারণে গত দু’দিন ধরে আলো জ্বলছে না। চরিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। দুরে দুরে কেরোসিন তেলের আলো জ্বলছে। কোনদিকে হোটেল বা ধর্মশালা পাওয়া যাবে ভেবে পেলাম না। ঐ অন্ধকারেও দেখলাম প্রচুর বাস দাঁড়িয়ে আছে। মনে হলো জায়গাটা বেশ বড়, অনেক হোটেল পাওয়া যাবে। অন্ধকারে বাসের ছাদে উঠে হাতড়ে হাতড়ে মালপত্র নামালাম। দিলীপ একজনের সঙ্গে রাতে থাকবার জায়গা নিয়ে কথা বলছে। এত রাতে এপথে বাস আসে না। তাই বোধহয় অনেক কৌতুহলী লোকের ভিড় বাসটার কাছে। খোঁজ পাওয়া গেল বাসগুলো যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে পোস্ট অফিসে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে। একে অন্ধকার, তার ওপর রাত প্রায় ন’টা বাজে। তাই কথা না বাড়িয়ে, নিজেরাই মালপত্র হাতে নিয়ে পোস্ট অফিসের খোঁজে পা বাড়ালাম। বাড়িটা খুব কাছেই। একটা পোস্ট অফিসের সঙ্গে লাগোয়া তিনটে ঘর। দশ টাকা ভাড়া। এখানে আবার মালপত্র রেখে যাবার, অর্থাৎ ক্লোক্ রুমের ব্যবস্থাও আছে। তার ভাড়া মাত্র ছ’টাকা। মোটাবাবুও আমাদের সাথে এসেছে। তার ইচ্ছা যে, তারা দু’জনেও আমাদের সাথে এক ঘরে থাকে। আমাদের এটা মোটেই ইচ্ছা নয়। দিলীপের ওপর ওদের আলাদা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করার ভারটা দেওয়া হলো। ও বেশ সহজেই দু’দলের দু’ঘরে আলাদা থাকার ব্যবস্থা পাকা করে ফেললো। যাহোক্ এখানেই আমরা দু’টো দল দু’টো ঘরে, রাত্রে ঠাঁই নিলাম।

এ বাড়ির মালিকই বোধহয় পোস্ট অফিসের পোস্টমাষ্টার বা কোন কর্মচারী। তিনি আবার পান্ডার কাজও করেন। কথায় কথায় তিনি জানালেন, দশ টাকা দিলে তিনি নিজে বা অন্য কোন পান্ডাকে আমাদের সাথে ত্রিযুগীনারায়ণ পাঠিয়ে আমাদের পূজো দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। মাধব কী করা উচিৎ জিজ্ঞাসা করলে বললাম, পান্ডার কোন প্রয়োজন নেই। নিজেরাই ওখানে যাব এবং ওখানে যদি তারা পূজো দিতে চায়, তখন ওখান থেকেই কোন পান্ডা ঠিক করে নেওয়া যাবে। তাই ঠিক হলো। মোটাবাবু জানালো তারা ত্রিযুগীনারায়ণ যাবে না, কাল সকালে এখান থেকে সোজা কেদারনাথ চলে যাবে। আমরা ঠিক করলাম কাল খুব ভোরে ত্রিযুগীনারায়ণ চলে যাব। ওখান থেকে ফিরে ট্যাক্সিতে গৌরীকুন্ড, এবং সম্ভব হলে হেঁটে কেদারনাথ। শুনলাম এখান থেকে ত্রিযুগীনারায়ণ মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ। এই ব্যবস্থা পাকা করে, আমরা রাতের খাবার খেতে রাস্তায় এলাম। একটা ঘর মোটাবাবু ও তার বৃদ্ধ সঙ্গী নিয়েছে। আর দু’টো ঘরের একটা আমরা নিয়েছি। তৃতীয় ঘরটা ও আমাদের ঘরটার মাঝখানে, সাত-আট ফুট উচু কাঠের পার্টিশন। যে কেউ ইচ্ছা করলেই, অপর ঘর থেকে আমাদের ঘরে সহজেই চলে আসতে পারে। তাই টাকার ব্যাগ হাতে নিয়ে বাইরে এসেছি। কোন হোটেল দেখলাম না। দু’দুটো দোকানে বললো, অর্ডার দিলে রুটি তরকারি বানিয়ে দেবে। বাধ্য হয়ে তাই অর্ডার দিয়ে বসে রইলাম। অনেকটা আটামাখা হাতে নিয়ে, হাতে দু’চার বার চাপড় মেরে এক ইঞ্চি মোটা রুটির আকারে পরিণত করে, কাঠের আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হলো। রুটির যে অংশটা আগুনের দিকে রয়েছে, সেদিকটা পুড়ে কালো হয়ে গেল, কিন্তু অপর দিকটা যেমনকার কাঁচা, প্রায় সেরকমই রয়ে গেল। আমরা সঙ্গে করে মাখন নিয়ে এসেছি। ছোট ছোট আলুর তরকারিতে একটু করে মাখন ফেলে, তাই দিয়ে দু’টো করে রুটি খেয়ে, দাম মিটিয়ে নিজেদের ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম। কাল ভোরে আবার উঠতে হবে।

আজ তেইশে আগষ্ট। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে আমরা তৈরি। পোস্ট্ অফিসের মালিক এসে উপস্থিত হলেন। দশ টাকা ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। কাঁধের তিনটে ব্যাগে টুকিটাকি জিনিসপত্র নিয়ে, ওয়াটার বটল্, হোল্ড্-অল্, ও সুটকেসগুলো ভদ্রলোকের হাতে ছেড়ে দিয়ে, মাল রাখা বাবদ ছ’টাকা ভাড়া দিয়ে, আমরা বেরিয়ে পড়লাম। শোনপ্রয়াগে মন্দাকিনী ও শোনগঙ্গা মিলিত হয়েছে। এখান থেকে বাঁদিকে ত্রিযুগীনারায়ণ যাবার পথ বেঁকে গেছে। ব্রিজ পার হয়ে ডানদিকে কেদারনাথ যাবার পথ। এখান থেকে গৌরীকুন্ড পর্যন্ত ট্যাক্সি পাওয়া যায়। গৌরীকুন্ড থেকে পায়ে হেঁটে কেদারধাম যেতে হবে। ব্রিজের ঠিক আগেই আমরা বাঁদিকে ত্রিযুগীনারায়ণ যাবার পথ ধরলাম। বোর্ডে লেখা—ত্রিযুগীনারায়ণ ৩.৬ কিলোমিটার। গোবিন্দঘাট যাবার পথে যখন ধসে আটকে গেছিলাম, তখন দেখেছিলাম বহু লোক পাহাড়ের গা থেকে এক প্রকার গাছের সরু সরু পাতা ছিঁড়ে নিচ্ছে। জিজ্ঞাসা করে জেনেছিলাম ওগুলো সিদ্ধি গাছ। সিদ্ধি গাছের কাঁচা পাতা খেলে নেশা হয় কী না তারা-ই বলতে পারবে। এখানেও দেখলাম ঐ সিদ্ধি গাছের জঙ্গল। অনেকে আবার এগুলোকে গাঁজা গাছ বললো। তা গাঁজাই হোক্ আর সিদ্ধিই হোক্, এপথে এই গাছ না থাকাটাই অস্বাভাবিক, কারণ এখানে বামে ত্রিযুগীনারায়ণ ডানে কেদারনাথ। গোটা এলাকাটাই ভোলে বাবার রাজত্ব। অনেক ওপরে দেখলাম বেশ কয়েকজন লাইন দিয়ে ওপর দিকে উঠছে। মধ্যে মধ্যে ইলেকট্রিকের তার নিয়ে যাবার জন্য মোটা মোটা ইস্পাতের পোস্ট্। পোস্ট্ লক্ষ্য করে সোজা রাস্তা ও বাইপাশ দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। এখানকার রাস্তা পায়ে হাঁটার রাস্তা হিসাবে খারাপ নয়। মধ্যে মধ্যে ওপর থেকে রাস্তার ওপর দিয়ে ঝরনা নেমে এসেছে। মূল ঝরনা বা এই ঝরনাগুলোর উৎস কিন্তু কোথাও চোখে পড়লো না। রাস্তা বেশ খাড়াই। ঝরনার জলে জুতো মোজা ভিজে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটে আছে, তবে সংখ্যায় বড় অল্প। সমস্ত রাস্তার পাশে পাশে ঐ সিদ্ধি গাছের জঙ্গল। রাস্তার ওপর বেশ কয়েক জায়গায় কয়েকটা সজারুর কাঁটা কুড়িয়ে পেলাম। এখানে সজারু আছে, না এপথে যাওয়ার সময় কেউ এগুলো ফেলে গেছে, বুঝতে পারলাম না। প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই সাধারণ। ফলে হাঁটতে ভালোও লাগছে না, কষ্টও হচ্ছে। আরও আধঘন্টা কী পঁয়তাল্লিশ মিনিট হাঁটার পর, উল্টো দিক থেকে আগত একজন স্থানীয় মানুষকে জিজ্ঞাসা করলাম— আর কত দুর? উত্তর পেলাম, তিন মিল্। অর্থাৎ এখনও তিন মাইল রাস্তা। কী করে এতটা পথ হাঁটার পরও তিন মাইল রাস্তা বাকি থাকে, স্বয়ং ত্রিযুগীনারায়ণই বলতে পারবেন। বেশ কিছু পুরুষ ও মহিলার একটা দল দেখলাম রাস্তার ওপর বসে আছে। এখনও অনেকটা পথ বাকি আছে শুনে তারা কেমন মুষড়ে পড়লো। আমরা এগিয়ে চললাম।

হাঁটতে আর ভালো লাগছে না। বেশ কষ্টকর রাস্তা। এবার আমরা একটা ছোট মন্দির, ও মন্দির সংলগ্ন খানিকটা ঘেরা জায়গা দেখতে পেলাম। খুব খুশি হলাম শিবদূর্গার বিবাহ স্থানে এসে গেছি ভেবে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ওই জায়গায় এসে হাজির হলাম। অবাক হয়ে গেলাম যখন শুনলাম, এটা মোটেই ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দির নয়। আরও অবাক হলাম, যখন শুনলাম এখান থেকেও মন্দির মাত্র তিন মিল্ রাস্তা। এটা “শাকম্ভরী” মন্দির। ইনি স্বর্গের কোন বিভাগের ভারপ্রাপ্তা জানি না, জানার ইচ্ছাও এখন আর নেই। খোলা ঘেরা জায়গাটায় দেখলাম একজন বৃদ্ধ সাধু গোছের লোক একটা বই পাঠ করছেন, এবং রাস্তায় দেখা সেই দলটার মতো অনেক ভক্ত, মন দিয়ে তাঁর পাঠ শুনছেন। যতদুর মনে হলো, রামায়ণ পাঠ হচ্ছে। সামনে একটা বোর্ড লাগানো। তাতে দেখলাম লেখা আছে— ত্রিযুগীনারায়ণ ৩.৬ কিলোমিটার পথ। একবারে নীচে ব্রিজের কাছে যত দুরত্ব দেখেছিলাম, সকাল থেকে এতটা পথ হেঁটে এসে, এখানেও দেখি সেই একই দুরত্ব লেখা আছে। সত্যি সত্যি আরও ৩.৬ কিলোমিটার পথ যেতে বাকি আছে কী না কে জানে। এখানে সবই সম্ভব। আমরা আবার এগিয়ে চললাম।

রাস্তার পাশে একটা ঝরনার জলে জাঁতা ঘুরিয়ে সম্ভবত গম ভাঙ্গা হচ্ছে। কোন লোকজনকে অবশ্য দেখলাম না। হঠাৎ কানে তালা লাগানো আওয়াজ। প্রথমে একটু ভয় পেলেও, একটু পরেই হেলং এর কথা মনে পড়লো। বুঝলাম কোথাও ব্লাষ্টিং হচ্ছে। সকালে সামান্য চা বিস্কুট খেয়ে বেড়িয়েছি। খিদেও পেয়েছে খুব। সঙ্গে গতকালের কেনা কিছুটা ঝুড়িভাজা ছিল। নরম হয়ে গেলেও, তাই সামান্য করে খেয়ে, আবার এগিয়ে চললাম। উলটো দিক থেকে একজন স্থানীয় যুবককে কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে আসতে দেখলাম। তাকে আর কত দুর জিজ্ঞাসা করায় উত্তর পেলাম, “দু’ই-ঢাই মিল্ হোগা”। যাক্, তবু আধ কিলোমিটার পথ অন্তত কমানো গেছে। আবার এগিয়ে চলা। বেশ কিছুক্ষণ পরে দুরে, বহু দুরে, একটা মন্দিরের সাদা পতাকা নজরে এল। দেখে বেশ আনন্দ হলেও ভয় হলো, কাছে গিয়ে হয়তো দেখবো কোন কাদম্বরী বা ধন্বন্তরি দেবীর মন্দির। আজই আমাদের কেদারনাথ যাবার ইচ্ছা, তাই সময় নষ্ট না করে গতি বৃদ্ধি করলাম। অবশেষে ওদের কথামতো ৩.৬ কিলোমিটার পথ পার হয়ে, মন্দিরে এসে পৌঁছলাম।

উড়িষ্যার পুরী বা আশেপাশের অন্যান্য মন্দিরগুলোর মতো অনেকটা দেখতে হলেও, মনে হয় যেন কী রকম সিমেন্টের তৈরি। যদিও মন্দিরটা পাথরেরই তৈরি। মন্দিরের বাইরে উঁচু চাতালে গোটা দু’-তিন চায়ের দোকান। বাদবাকি, দোকানের মতো অনেক গুলো ঘর। তবে সবকটা ঘরেই পান্ডার ভিড়। একটা কল থেকে একভাবে জল পড়ে যাচ্ছে। যদিও তার চারপাশে ভীষণ নোংরা, তবু খানিকটা করে জল খেয়ে, মন্দিরে যাবার জন্য তৈরি হলাম। মোটা মোটা লাল কাপড়ে বাঁধানো চিত্রগুপ্তের খাতা হাতে পান্ডারা এসে হাজির হলো। তাদের প্রয়োজন আমাদের নাম, ধাম, বাবার নাম ইত্যাদি। আমরা পূজো দিতে আসিনি, কাজেই ঐ সবের আমাদের কোন প্রয়োজন নেই, ইত্যাদি বলতে বলতে, আমরা সিঁড়ি দিয়ে নীচে মন্দিরের চাতালে এলাম। মন্দিরে ঢুকবার আগে জুতো, মোজা খুলে, ব্যাগ তিনটে ও লাঠিগুলো এক জায়গায় রেখে গেলাম। মন্দিরের ভিতর সব সময় একটা প্রদীপ জ্বলে। শিবদূর্গার বিবাহের সাক্ষী হিসাবে, নারায়ণ তিন যুগ ধরে এখানে অবস্থান করছেন বলে শুনলাম। নারায়ণের কী অন্য কোন কাজ নেই, না শিবের বিয়ের সময় ভালো বিয়ে বাড়ি পাওয়া যেত না জানি না। ডানপাশে বাঁধানো চৌবাচ্চা মতো। সেখানে স্নান সেরে বহু হিন্দুস্থানী পূর্ণার্থী, গোল হয়ে বসে আছেন। পান্ডারা তাদের লাল খাতা খুলে, নাম ধাম ইত্যাদি খুঁজে বার করে, মন্ত্র পাঠ করাচ্ছে। আকাশে বেশ মেঘ করেছে। রোদের জন্য ক্যামেরা হাতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে শেষে রোদের আশা ছেড়ে দিয়ে, মেঘের মধ্যেই বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। এবার ফেরার পালা। জুতো মোজা পরে, ব্যাগ ও লাঠি নিয়ে বাইরে এলাম। আবার সেই কান ফাটানো ব্লাষ্টিং এর আওয়াজ। জানা গেল শোনপ্রয়াগ থেকে ত্রিযুগীনারায়ণ, বাস রাস্তা তৈরির কাজ চলছে। সামনের চায়ের দোকানে বসে তিনজনে চা খাচ্ছি, দু’জন পান্ডা এসে বললো পূজো না দেবেন তো কী হয়েছে, প্রসাদ নিন। তারা সামান্য প্রসাদ দিয়ে গেল। কথা না বাড়িয়ে প্রসাদগুলো ব্যাগে রেখে দিলাম। এবার সত্যিই ওঠার পালা। আমরা পুরানো রাস্তা ধরে নামতে শুরু করলাম। আমাদের কাছে ইউ.পি.হিলস্ এর যে গাইড ম্যাপ ছিল, তাতে দেখলাম শোনপ্রয়াগ থেকে ত্রিযুগীনারায়ণের দুরত্ব, মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পথ। মনে হয় এ ম্যাপটাই ঠিক। এর আগেও অনেক হেঁটেছি। ৩.৬ কিলোমিটার পথ এটা যে নয়, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আসবার সময় যে বাইপাসগুলো ব্যবহার করিনি, এবার সেগুলো দিয়ে নেমে আসায়, খুব দ্রুত নীচে নেমে আসতে শুরু করলাম। সেই ঝরনা, গাঁজা বা সিদ্ধির জঙ্গল পেরিয়ে, একসময় আমরা নীচের ব্রিজের কাছে এসে পৌঁছলাম।

গতকাল রাতে যেখানে খাবার খেয়েছিলাম, সেই দোকানেই খাবার খেতে গেলাম। মাখনের প্যাকেটটা নিয়ে আসা হয় নি। তাছাড়া মাধবের পায়ে ব্যথার জন্য নী-ক্যাপটাও আনা প্রয়োজন। মাধব ও দিলীপ আমাদের আস্তানায় গিয়ে ওগুলো নিয়ে ফিরে আসলো। রুটি আর আলুর তরকারি খেয়ে, আমরা গৌরীকুন্ড যাবার জন্য একটা ট্যাক্সি ঠিক করলাম। এখানে প্রচুর ট্যাক্সি শোনপ্রয়াগ-গৌরীকুন্ড যাতায়াত করে। দুরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। তিনজনের ভাড়া লাগলো বার টাকা। গৌরীকুন্ড জায়গাটা দেখে মনে হলো, শোনপ্রয়াগের থেকে ছোট হলেও অনেক উন্নত। এখানেও ইলেকট্রিক আলো আছে, তবে কোথাও কিছু খারাপ হওয়ায় শোনপ্রয়াগের মতোই জ্বলছে না। শোনপ্রয়াগে শুনেছিলাম, গৌরীকুন্ডে মন্দির কমিটির বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা নাকি ভালো। ডানপাশে গৌরী দেবীর মন্দির ছেড়ে একটু এগিয়ে রাস্তার ডানপাশে মন্দির কমিটির ঘর। আজই কেদারনাথ চলে যাবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু স্থানীয় লোকেদের উপদেশ, আজ অনেক বেলা হয়ে গেছে, আজ আর কেদারনাথ যাওয়া ঠিক হবে না। এখান থেকে চোদ্দ কিলোমিটার হাঁটা পথ। ঠিক করলাম আজ গৌরীকুন্ডে থেকে, কাল সকালে কেদারনাথ যাব। মন্দির কমিটির একটা ঘর ষোল টাকা দিয়ে ভাড়া নিলাম। কাঠের মেঝে। কম্বল ও লেপ পাওয়া গেল। এখানে আমরা সঙ্গে কিছু নিয়ে আসি নি। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে একটু বিশ্রাম নেব ভাবলাম।

মাধব শুয়ে পড়লো। আমি আর দিলীপ কিন্তু শুয়ে না থেকে, ক্যামেরা হাতে জায়গাটা এক চক্কর ঘুরে দেখতে বেরলাম। গৌরীদেবীর মন্দিরের সামনে একটা চৌবাচ্চা মতো আছে। তাতে অবশ্য ঠান্ডা জল। সামনেই গৌরীকুন্ড, গরম জলের কুন্ড। এখানেই পূজা, তর্পন, পিন্ডদান ইত্যাদি দেবার ব্যবস্থা আছে। এখানেই একটা দোকানে রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে ঘরে ফিরে এসে, আমরাও লেপ চাপা দিয়ে পরম আরামে শুয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙ্গলো বেশ বিকালে। দুপুরে ঘুমিয়ে শরীরটা খারাপ লাগছে। মাধবের ইচ্ছা কেদারনাথে একদিন থাকার। আমরা ভেবেছিলাম যেদিন যাব, সেইদিনই সন্ধ্যায় ফিরে আসবো। শেষ পর্যন্ত কেদারনাথে রাতে থাকার ব্যবস্থাই পাকা হলো। দুপুরের দিকে খুব হাল্কা এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তা এখনও অল্প অল্প ভিজে আছে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এল। রাত আটটা নাগাদ আমরা রাতের খাবার খেতে নির্দিষ্ট দোকানে গেলাম। দোকানদার ভদ্রলোক খুব ভালো মানুষ, নাম প্রতাপ সিং। তিনি জানালেন তাঁর দোকানের ওপরে দোতলায় থাকার ব্যবস্থা আছে। সীজনের সময় ভাড়া বাবদ সামান্য কিছু টাকা নেন। এখন অফ্-সীজন এর সময়, থাকার জন্য কোন চার্জ লাগে না। এরকম প্রস্তাব যে কেউ, কোথাও, কোনদিন দিতে পারে, স্বপ্নেও ভাবিনি। এখানে থাকলে আমাদের সুবিধাও হতো। টপ্ করে দোতলা থেকে এক তলায় নেমে রাতের খাবার খাওয়াও যেত, ঠান্ডায় এতটা আসার প্রয়োজনও হতো না। আর ষোল টাকা ভাড়া তো বেঁচে যেতই। যাহোক্, পুরি, তরকারি খেয়ে, পরের দিন সকালের জন্য জলখাবারের অর্ডার দিয়ে, আমরা ঘরে ফিরে এলাম। রাতে খুব আরামে লেপের তলায় ঘুমলাম।

আজ চব্বিশে আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো খুব সকালে। আমাদের ঘরের একটু পাশেই পরপর তিনটে বাথরুম পায়খানা আছে। হাত মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে ঘরের ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে, কাঁধের ঝোলাব্যাগ সঙ্গে নিয়ে, আমরা সেই দোকানে খাবার খেতে গেলাম। গরম গরম পুরি, তরকারি আর লাড্ডু দিয়ে প্রাতরাশ সেরে, হাঁটার জন্য প্রস্তুত হলাম। দোকানদার বললেন, ফেরার সময় গৌরীকুন্ডে রাত কাটালে, আমরা তার ওখানে থাকলে তিনি খুশি হবেন। আমরা সম্মতি জানিয়ে কেদারনাথের রাস্তা ধরলাম। আকাশ পরিস্কার। একদিন অনেকটা সময় বিশ্রাম পাওয়ায়, শরীরও বেশ চাঙ্গা। হাঁটতে কোন কষ্ট হচ্ছে না। পাশ দিয়ে ঘোড়া ও কান্ডিতে বুড়োবুড়ি এমন কী যুবক যুবতীদেরও, কেদারনাথের দিকে যেতে দেখলাম। বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে, বদ্রীনারায়ণের মোটা বাবু ও তার বৃদ্ধ সঙ্গীটিকে ফিরতে দেখলাম। তারা জানালো যে তারা কেদারনাথে বিড়লা গেষ্ট হাউসে গতকাল রাতে ছিল। আমরা সামনের দিকে পা বাড়ালাম। এবার একটা বিরাট ঝরনা দেখতে পেলাম। প্রাণভরে ঠান্ডা জল খেয়ে আবার এগলাম। সামনেই “রামওয়ারা” চটি। এখানে রাত কাটাবার ভালো ব্যবস্থা আছে। এখানে এসে দেখলাম, বেশ কিছু লোক শোনপ্রয়াগ যাবার উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে। গতকাল রাতে তারা এখানেই ছিল। দুরে বরফ ঢাকা শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে। এখানে ঝুড়িভাজা ও চা খেয়ে, সামনের রাস্তা ধরলাম। প্রাকূতিক দৃশ্য বেশ সুন্দর। রাস্তাও বেশ চওড়া ও ভালো। ফলে মনের আনন্দে চলেছি। আর কিছুটা পথ এসে, “গড়ুর” চটিতে হাজির হলাম। এখানে আলাপ হলো হাওড়া কদমতলার চারজনের সঙ্গে। একজন একটা স্কুলের শিক্ষক, বাকি সবাই ব্যবসা করে। চেনাশোনা অনেকের কথাই তারা জিজ্ঞাসা করলো। তারা জানালো, হাওডা থেকে মোটরে গৌরীকুন্ডে এসে, ওখানে গাড়ি রেখে, হেঁটে কেদারনাথ এসেছে। এখন ফিরে যাবে গৌরীকুন্ডে। হাতে কেদারনাথের পূজার ব্রহ্মকমল। আমরা জানালাম, আমরা ব্রহ্মকমলের রাজত্ব পার হয়ে এসেছি। সব শুনে তারা হেমকুন্ড-নন্দন কানন যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। বললাম অনেক হাঁটতে হবে। ওরা জানালো, ওদের সঙ্গে গাড়ি আছে। মনে মনে ভাবলাম সঙ্গে গাড়িই থাক্ আর টাকাই থাক্, সৌন্দর্য কুড়তে গেলে, হাঁটতে তোমাদের হবেই। অবশ্য ঘোড়া বা কান্ডি নিতে পার।

কেদারনাথের উচ্চতা ৩৫৮৪ মিটার। গৌরীকুন্ড মাত্র ১৯৮১ মিটার। কিন্তু কেদারনাথের রাস্তা খুব ধীরে ধীরে ওপর দিকে ওঠায়, হাঁটার কষ্ট বেশ কম। বহুদুরে বরফ ঢাকা শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে। শুনলাম ঐ শৃঙ্গের পাদদেশেই কেদারনাথ মন্দির। অনেকক্ষণ হাঁটছি, পথের যেন আর শেষ নেই। ডান্ডি বা কান্ডিগুলোকে পিছনে ফেলে, জোর কদমে আমরা এগিয়ে চলেছি। অবশেষে বহুদুরে ছোট্ট মন্দির চোখে পড়লো। মনে হলো যেন ছাই এর গাদার উপর একটা ছোট্ট মন্দির, নির্জন পরিত্যক্ত একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। পরে শুনলাম এই জায়গা থেকে মন্দিরটা প্রথম দেখা যায়, তাই এই জায়গাটাকে “দেবদেখনি” বলা হয়। একসময় আমরা উত্তর প্রদেশ সরকারের ট্রাভেলার্স লজের কাছে এসে পৌঁছলাম। পাশেই হোটেল “হিমলোক”। এখানে খাওয়ার ব্যবস্থাও বেশ ভালো। সম্ভবত এটাও উত্তর প্রদেশ সরকার দ্বারাই পরিচালিত। সামনে সামান্য দুরেই, কেদারনাথ মন্দির। দুর থেকে যেটাকে ছাইয়ের গাদা ভেবেছিলাম, সেটা আসলে হাল্কা কুয়াশা। মন্দিরের পেছনে কিন্তু কোন বরফ ঢাকা পাহাড় দেখলাম না। চারিদিক মেঘ ও কুয়াশায় ঢেকে গেছে। এই মুহুর্তে বরফ দুরে থাক, মন্দিরের পেছনে যে পাহাড় আছে, বুঝবার উপায় নেই। ট্রাভেলার্স্ লজে একটা ঘর, আঠারো টাকা ভাড়ায় বুক করলাম। ভালো বিছানা, প্রত্যেকের জন্য তিনটে করে মোটা ভালো কম্বল। ঘরে ব্যাগ রেখে, দরজা বন্ধ করে, মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মন্দিরের একটু আগে একটা ব্রিজ পার হতে হয়। এখানে দুধগঙ্গা, মধুগঙ্গা, স্বর্গদুয়ারী, সরস্বতী, ও মন্দাকিনী, বোধহয় এই পাঁচটা নদী এসে মিশেছে। মন্দিরের সামনে রাস্তার দু’পাশে পরপর দোকান। মন্দির এখন বন্ধ, সন্ধ্যা নাগাদ খুলবে। কয়েকটা ছবি তুলে, কিছু খাওয়ার ধান্দায় একটা দোকানে গেলাম। রাস্তার দু’পাশে দু’টো মিষ্টির দোকান মতো আছে। একমাত্র এখানেই কিছু খাবার মিলতে পারে। একটা দোকানে একটা ছেলে বসে আছে। সে জানালো, লুচি, তরকারি ও মিষ্টি পাওয়া যাবে, তবে লালাজী না আসলে হবে না। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও লালাজীর দর্শন পেলাম না। বাধ্য হয়ে অপর দিকের দোকানটায় গেলাম। এটা অপেক্ষাকৃত অপরিস্কার। এই দোকানের মালিকের আবার বেশ গরম মেজাজ। সে জানালো লুচি হবে না, পুরিও হবে না। আগের থেকে অর্ডার না দিলে পাওয়া যায় না। বললাম আমরা এইমাত্র এখানে এসে পৌঁছলাম, আগের থেকে অর্ডার দেব কী ভাবে? আমাদের কথায় তার মন গললো না। সে জানালো, নিমকি আছে খেতে পারেন, লুচি এখন পাওয়া যাবে না। অপরদিকে তখনও লালাজীহীন দোকানে, তুলনামুলক ভাবে একটু ভালো মিষ্টি ও অন্যান্য খাবার শোভা পাচ্ছে। শেষে বাধ্য হয়ে কবেকার ভাজা কে জানে, ঠান্ডা নিমকি, গরম মেজাজের দোকনদারের থেকে পয়সা দিয়ে কিনে ধন্য হলাম। সঙ্গে লাড্ডু আর চা। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে ঘরে ফিরে এলাম।

ট্রাভেলার্স লজের সামনে অনেকটা ফাঁকা মাঠের মতো জায়গা, রেলিং দিয়ে ঘেরা। সামনের খোলা জায়গাটায়, কয়েকটা চেয়ার ও একটা বেতের টেবিল পাতা আছে। লজে আমাদের অপর দিকের ঘরে একটা মাদ্রাজি পরিবার আছে। তারা সমস্ত চেয়ারগুলো দখল করে বসে আরামে চা খাচ্ছে। বাইরে বেশ ঠান্ডা। আমরাও চায়ের অর্ডার দিলাম। রেলিং এর কাছে, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, গলা ছেড়ে গান জুরে দিলাম। মনটা বেশ খুশি খুশি। হেমকুন্ড, নন্দন কানন, বদ্রীনারায়ণ, ত্রিযুগীনারায়ণ দেখা হয়েছে। কেদারনাথও দেখা হলো। আগামীকাল বাসুকীতাল দেখতে যাবার ইচ্ছা আছে। হিমলোক হোটেলের ছেলেগুলো জানালো, বাসুকীতাল মাত্র পাঁচ-ছয় কিলোমিটার পথ। এই সামান্য রাস্তা হাঁটার ভয় এখন আর নেই। মনে শুধু একটাই চিন্তা, গঙ্গোত্রী, গোমুখ, যমুনোত্রী যাওয়া হবে তো? আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নেমে এল। ঘরে এসে দেখলাম, পাশের ঘরে মিটমিট্ করে ইলেকট্রিক লাইটগুলো জ্বলছে। আমাদের ঘরের বাল্বটা বোধহয় কেটে গেছে। কেয়ারটেকারকে বাল্বটা বদলে দেবার কথা বলে, আমরা মন্দিরে গেলাম। চা জলখাবার খেয়ে কিছুক্ষণ মন্দিরের চাতালে ঘুরে, ঘরে ফিরবার কথা বললাম। দিলীপের খুব ইচ্ছা সন্ধ্যা আরতি দেখে যাবার। আমার কিন্তু ঘরে ফিরে যাবার ইচ্ছা ছিল, কারণ আমরা হাওয়াই চটি পরে ঘর থেকে মন্দিরে এসেছি। অনেকটাই পথ, তার ওপর অসম্ভব ঠান্ডা পড়েছে। আমার সঙ্গী দু’জনেরই আবার একটু ঠান্ডার বাতিক আছে। ফলে ওদের শরীর খারাপ হবার সম্ভাবনাও যথেষ্ট। কিন্তু মাধবও দিলীপের সাথে যোগ দিয়ে, আরতি দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। এরপর আর আমার না বলার কোন জায়গা নেই। তাই তিনজনে একটা দোকানে আরতি আরম্ভ হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকলাম।

এখানে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে বাসুকীতাল সম্বন্ধে খোঁজখবর নিলাম। বাসুকীতালের দুরত্ব সম্বন্ধে এক একজনের এক একরকম বক্তব্য। কেউ বলে বারো মাইল, কেউ বলে ছয় মাইল, কেউবা আবার অনেক বেশি বলে জানালো। তবে সকলেই কিন্তু একটা কথা বললো যে, ওখানে পর্বতারোহনের অ্যাডভান্স ট্রেনিং হয়। কাজেই ওখানে যাওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজসাধ্য নয়। তার ওপর ওখানে যাওয়ার কোন নির্দিষ্ট রাস্তাও নেই। একটু মেঘলা করে আসলে, রাস্তা চিনে ফিরে আসা খুব সহজ কাজ নয়। ভাল গাইড সঙ্গে নিলে অবশ্য আলাদা কথা। শুনলাম ওখানকার লেকের আয়তন নাকি এখনও হিসাব করা যায় নি। বাসুকীতাল সম্বন্ধে বিশেষ জানাও ছিল না, আসার আগে খোঁজখবরও নিয়ে আসা হয় নি। ফলে একটা কথা বেশ বুঝতে পারছি যে, আগামীকাল শোনপ্রয়াগ ফিরতে হলে, এবার আর বাসুকীতাল দেখা সম্ভব নয়, উচিৎও নয়। সন্ধ্যা আরতি শুরু হলো প্রায় রাত সাড়ে সাতটা নাগাদ। ঠান্ডাও বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। এই ঠান্ডাতেও অনেক লোকই মন্দিরে এসে হাজির হয়েছে। লাইন দিয়ে সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে, ডান পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে হয়। আস্তে আস্তে হাঁটার ফলে যেটুকু দেখা যায়। দর্শনার্থীর সংখ্যা যত কম হবে, তত বেশি সময় নিয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে। অবশ্য পূজা দেবার সময় মূর্তি স্পর্শ করতে দেওয়া হয়, যেটা বদ্রীনারায়ণে দেওয়া হয়না। তবে এখানে আবার বদ্রীনারায়ণের মতো ঘটা করে আরতি হয় না, অন্তত এখন তো হতে দেখলাম না। খালিপায়ে এইটুকু পথ হাঁটতে হয়। আমরা মন্দিরের বাইরে এসে চটি পরে ঘরের পথে পা বাড়ালাম। এখানকার স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী সম্বন্ধে কোন ধারণা পাওয়া গেল না, পাওয়া যাবে বলেও মনে হলো না। ওদের হাবভাব দেখে মনে হলো, এখানকার কেউ কোনদিন এদিক থেকে ওপথে যায়ও নি। এদের কাছ থেকে একটা ধারণা পেলে সুবিধা হতো। যাহোক্, আমরা ঘরে ফিরে দেখলাম আমাদের ঘরে নতুন বাল্ব লাগিয়ে দেওয়া হয় নি। পাশের হিমলোক হোটেলে রাতের খাবার খেতে গেলাম। আধা ভাত, আধা রুটি, দু’রকম তরকারি, বেশ ভালো ডাল ও পাঁপড় ভাজা দিয়ে গেল। কায়দা কানুনও আধুনিক হোটেলের মতো। দাম লাগলো মাথাপিছু চার টাকা পঞ্চাশ পয়সা। বাল্বের কথা জিজ্ঞাসা করতে জানা গেল বাল্ব আনতে গেছে, আপাতত মোমবাতি দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাস হলো না। ঘরে ফিরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। বাল্ব বা মোমবাতি কোন কিছুই দিয়ে না যাওয়ায়, বাইরে মেন সুইচের কাছ থেকে একটা বাল্ব খুলে এনে নিজেদের ঘরে লাগিয়ে নিয়ে, দরজা বন্ধ করে, আলো জ্বেলেই শুয়ে পড়লাম। মনে হলো বিছানা যেন ভিজে গেছে। তিনটে কম্বলও যথেষ্ট বলে মনে হলো না।

আজ পঁচিশে আগষ্ট। বেশ ভোরেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাড়ির পিছন দিকে হাত, মুখ ধুতে গিয়ে প্রথম নজরে পড়লো একবারে হাতের কাছে সূর্যালোকে লাল-হলুদ রঙের বরফের চুড়া। তাড়াতাড়ি চা খেয়ে তৈরি হয়ে মন্দিরে গেলাম। ভোরের মন্দিরের রূপ একবারে অন্যরকম। মন্দিরের ঠিক পিছন থেকে বরফের চাদর ঢাকা পাহাড় উঠেছে। প্রাণভরে  ছবি তুললাম। মাধব ও দিলীপ পি.সুক্লা নামে এক পান্ডার খোঁজ করে পূজো দিতে গেল। আমি মন্দিরের পিছনে শঙ্করাচার্যের সমাধি দেখতে গেলাম। একপাশে শ্বেত পাথরের শঙ্করাচার্যের দণ্ড। একটা সাদা পাথরের হাত, দণ্ডটা ধরে আছে। সমাধিটা বাঁপাশে। একটা ছোট মন্দিরের মতো ঘরে, শঙ্করাচার্যের মুর্তিটা রাখা আছে। চারপাশের দেওয়ালে শ্বেত পাথরের ফলকে, সম্ভবত তাঁরই বাণী লেখা। ঘুরে ফিরে ছবি নিয়ে ফিরে এলাম। বন্ধুরাও তৈরি। এবার ফেরার পালা। হোটেলে এসে, বিল মিটিয়ে, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে, ফেরার রাস্তা ধরলাম। আমাদের সাথে বদ্রীনারায়ণ থেকে এক বাসে আসা সেই সবজান্তা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধের দলের দেখা হলো। তারাও আমাদের মতোই ফেরার পথে।

রাস্তায় একপ্রকার ছোট ছোট ঝোপ হয়ে আছে। তাতে অজস্র ছোট ছোট, লাল লাল, করমচার মতো ফল হয়ে আছে। স্থানীয় লোকেরা দেখি টপাটপ্ ঐ গাছ থেকে ফল ছিঁড়ে মুখে পুরছে। আমরাও কয়েকটা ফল তুলে খেলাম। বোধহয় ওগুলো পাহাড়ি করমচা। যত বাইপাস চোখে পড়ছে, ব্যবহার করে বেশ দ্রুত নেমে আসছি। গতকাল যাওয়ার সময় একটা গুহা মতো পাথরের খাঁজে, একটা উলঙ্গ সন্যাসীকে বসে থাকতে দেখেছিলাম। সামনে কয়েকটা ঠাকুর দেবতার ছবি টাঙ্গিয়ে, গায়ে ছাই মেখে বসে ছিল। আমরা পাশ দিয়ে যাবার সময় চোখ পিটপিট্ করে দেখছিল। এখন ফেরার পথে তার কাছাকাছি আসতে, সে দিলীপ ও মাধবের কাছে পয়সা চাইলো। ওরা কোন কথা না বলে এগিয়ে গেল। একটু পিছনেই আমি। আমার কাছেও পয়সা চাইলো। আমিও কিছু না দেওয়াতে, সে বেশ কড়া সুরে অভিশাপ দেবার ভঙ্গিতে আমায় বললো— “তুই যেমন আছিস, তেমন থাকবি”।

ভীষণ রাগ হয়ে গেল। যাবার সময় কিছু বলে নি। ভেবেছিল এপথে ফিরতে তো হবেই, ট্যাক্সটা তখনই আদায় করা যাবে। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। ভাবলাম বেশ দু’ঘা দিয়ে ব্যাটাকে ওপর থেকে নীচে ফেলে দেই। মাধব এগিয়ে এসে আমায় কিছু বলতে বারণ করলো। আবার হাঁটতে শুরু করলাম। বাইপাস ব্যবহার করে বেশ দ্রুত ফিরছিলাম। কিন্তু আরও শর্টকাট্ করতে গিয়ে মহা বিপদে পড়লাম। বাইপাস নয়, এমন একটা পায়ে চলা রাস্তার মতো দাগকে বাইপাস ভেবে, হাত দিয়ে লতাপাতা সরিয়ে হাঁটতে গিয়ে, ডান হাতের কব্জির কাছ থেকে কনুই পর্যন্ত মক্ষম বনবিছুটি লাগলো। মনে হলো ভীষণ জোরে ইলেকট্রিক শক্ খেলাম। অল্প সময়ের মধ্যে সমস্ত জায়গাটা শক্ত হয়ে ফুলে উঠলো। মনে হচ্ছে হাতের দু’দিক থেকে দু’জন যেন মক্ষম ভাবে চামড়াটা দু’দিকে টানছে। গোটা জায়গাটা গরম হয়ে ভীষণ কষ্টকর যন্ত্রণা শুরু হলো। একজন স্থানীয় বৃদ্ধ কাছেই একটা পাথরের ওপর বসেছিল। কী ভাবে জানিনা, সে কিন্তু বুঝে গেছে যে আমার বিচ্ছু লেগেছে। তাকেই জিজ্ঞাসা করলাম কী করবো। সে বললো হাতের ক্ষত জায়গায় পিসাব্ কর দেও। এখন এই মুহুর্তে সেটা করা সম্ভব নয়। তাই আস্তে আস্তে সাবধানে রাস্তায় ফিরে এসে, হাতে ভালোভাবে বোরোলিন লাগালাম। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রামওয়ারা চটিতে এসে উপস্থিত হলাম। স্থানীয় কী একটা উৎসবের জন্য, পুরুষ ও মহিলারা নেচে নেচে টাকা পয়সা, চাল, ডা্‌ল, আটা ইত্যাদি আদায় করছে। এখানে চা বিস্কুট খেয়ে, বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম, হাতে বিছুটি লেগেছে কী করবো? সে বললো কিছু হবে না। যাই লাগান না কেন, আজ যখন লেগেছে কাল সেই সময় কমে যাবে। অর্থাৎ পুরো চব্বিশ ঘন্টা যন্ত্রণা থাকবে। আঁতকে উঠে ভাবলাম পুরো চব্বিশ ঘন্টা এই যন্ত্রণা আমার সঙ্গী হলেই হয়েছে আর কী। উঠে পড়ে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। দিলীপ অনেক এগিয়ে গেছে, মাধবের হাঁটুর ব্যথাটা বেশ বেড়েছে। ওর সঙ্গে তাল রেখে ধীরে ধীরে নামছি। ক্রমে ওর হাঁটার গতি এত কমে গেল যে, ইচ্ছা না থাকলেও এগিয়ে গেলাম। একটু এগিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করে, আবার ওর সঙ্গে একটু হাঁটলাম। আবার এগিয়ে গেলাম। এইভাবে একসময় গৌরীকুন্ডে এসে, পরিচিত সেই দোকানে গিয়ে বসলাম। দিলীপ আগেই এসে গেছে। মাধব একটু পরেই এসে হাজির হলো।

চায়ের অর্ডার দিয়ে দোকানদারকে বললাম, আমরা আজই উত্তরকাশী যাবার বাস ধরতে চাই, কখন বাস পাব? দোকানদার জানালেন বিকাল পাঁচটায় শেষ বাস পাওয়া যাবে। দাম মিটিয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে এলাম। এখানে এখন কোন প্যাসেঞ্জার না থাকায়, আমাদের তিনজনকে নিয়ে কোন ট্যাক্সি যেতে রাজি হলো না। আরও অন্তত দু’তিনজন প্যাসেঞ্জারের প্রয়োজন। কিন্তু কেউ আর আসে না। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে উত্তরকাশীর বাসের কথা জিজ্ঞাসা করতে সে জানালো, উত্তরকাশীগামী শেষ বাস শোনপ্রয়াগ থেকে বিকাল পাঁচটায় ছাড়ে। হাতে অনেক সময় আছে, তাই দু’তিনজন প্যাসেঞ্জারের আশায় তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে রইলাম। একজন টাকমাথা, বেঁটে, মোটা মতো মাঝবয়সি ভদ্রলোক, শোনপ্রয়াগ যাবার জন্য ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে এসে হাজির হলেন। কেদারনাথ থেকে আরও যদি কেউ আসে, সেই আশায় ট্যাক্সি ড্রাইভার তবু দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পরে নতুন কোন যাত্রী না পাওয়ায়, আমাদের চারজনকে নিয়েই ট্যাক্সি ছেড়ে দিল। মাধব আমার পাশে, তার পাশে ঐ নতুন ভদ্রলোক। মাধব জানালো যে তার পায়ের ব্যথাটা বেশ বেড়েছে, সঙ্গে জ্বরও এসেছে বলে মনে হচ্ছে। আমি বললাম শোনপ্রয়াগ গিয়ে সঙ্গে আনা ওষুধ দেওয়া যাবে। ভদ্রলোক পাশ থেকে বললেন আমায় বলুন না, আমি ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। অনেকক্ষণ ব্যাগ হাতড়ে খুঁজেপেতে একটা ট্যাবলেট বার করে বললেন, চট্ করে গিলে ফেলুন। মাধব আমার দিকে আড়চোখে তাকাতে, আমি চোখের ইশারায় তাকে ট্যাবলেটটা খেতে বারণ করলাম। কারণ ভদ্রলোকের আচরণ কেমন যেন অদ্ভুত রকমের, তার ওপর ঐ ওষুধটার নামও আগে কখনও শুনি নি। মাধব তাঁকে জানালো যে সে ওটা খেয়ে নিয়েছে। ভদ্রলোক বললেন তিনি বদ্রীনারায়ণ যাবেন। আমরা তাঁকে কী ভাবে বদ্রীনারায়ণ যেতে হবে, সেখানে কী কী দেখার আছে, সব জানালাম। ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন, যদিও এই তাঁর প্রথম বাইরে বেড়াতে আসা, তবু তিনি কল্পনার চোখে সব দেখতে পাচ্ছেন, কারণ তিনি শিল্পী, ছবি আঁকেন। একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ তিনি প্রস্তাব দিলেন, শোনপ্রয়াগে আমাদের সঙ্গে তিনি একই জায়গায় থেকে যেতে চান। তাঁর সঙ্গে এক জায়গায় থাকার ইচ্ছা আমাদের মোটেই নেই। তার ওপর আজই আমরা উত্তরকাশীর উদ্দেশ্যে রওনা দেব। তাঁকে বললাম, আজই আমরা সন্ধ্যার বাসে চলে যাব, কাজেই আমাদের একসাথে থাকার কোন সুযোগ নেই। অবশেষে শোনপ্রয়াগে পূর্বপরিচিত জায়গায়, ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো।

আমরা বাসের টিকিট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম। মাধব গেল আমাদের মালপত্রগুলো পোষ্ট অফিস থেকে ছাড়াতে। হায়! টিকিট কাউন্টারে এসে জানতে পারলাম, আজ কোন বাস নেই। কাল সকাল পাঁচটায় প্রথম বাস ছাড়বে। সেই টেহেরী গাড়োয়ালের রাজধানী শ্রীনগর পর্যন্ত ঐ বাসে গিয়ে, ওখান থেকে উত্তরকাশীর বাস পাওয়া যাবে। গত বৎসর বন্যার আগে এই সমস্ত রাস্তায় “যাত্রা বাস” বা ডিরেক্ট বাস সার্ভিস ছিল। এখন প্যাসেঞ্জারের অভাবে যাত্রা বাস পাওয়া যায় না। ফলে সময় ও খরচ দু’টোই অনেক বেড়ে গেছে। কষ্ট তো বেড়েইছে। কাউন্টারে জানালাম, গৌরীকুন্ডে এবং ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে আমরা শুনেছি যে বিকাল পাঁচটায় লাষ্ট্ বাস পাওয়া যাবে। ভদ্রলোক বললেন, ওরা ভুল বলেছে, সকাল পাঁচটায় ফার্ষ্ট বাস পাওয়া যাবে। অহেতুক আজ শোনপ্রয়াগে এলাম। এখানে না পাওয়া যায় ভালো খাবার, না পাওয়া যায় ভালো থাকার জায়গা। গৌরীকুন্ডে রাতে থাকলে, অনেক আরামে থাকা যেত।

টিকিট কাউন্টারের বাঁপাশে একটু ওপরে, একটা ভালো থাকার জায়গা পাওয়া গেল। কিন্তু এখানে আবার খাটিয়া পাওয়া গেলেও, আলাদা ঘর পাওয়া যাবে না। অগত্যা আবার সেই পোস্ট্ অফিসের পুরাতন ঘরটায় রাতের আশ্রয় নিতে হলো। আগেরবার যে ঘরটায় মোটাবাবু ও তার বৃদ্ধ সঙ্গীটি আশ্রয় নিয়েছিল, সেই ঘরটায় একটা দক্ষিণ ভারতীয় পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এদের লোক সংখ্যা অনেক। সঙ্গে আবার একগাদা বাচ্চা। কান্নার আওয়াজ সব সময় লেগেই আছে। আমাদের পিছনে, মাঝখানে খানিকটা পার্টিশন দিয়ে আলাদা করা যে ঘরটি আছে, সেখানে কয়েকজন যুবক এসে জায়গা নিয়েছে। এদের সঙ্গে ট্যাক্সির সেই আর্টিষ্ট ভদ্রলোক কিভাবে ম্যানেজ করে জায়গা করে নিয়েছে। সবকটা যুবকই খুব আধুনিক ধরণের, এসেছে কলকাতা থেকে। আর্টিষ্ট ভদ্রলোক দেখলাম তাদের খুব বড় বড় কথা বলে চলেছে। তারাও খুব চতুরতার সঙ্গে তাঁকে ব্যাঙ্গ করছে, মুরগি করছেও বলা যেতে পারে।

মাধবের গায়ে মোটামুটি ভালোই জ্বর আছে। ওকে বাইরে যেতে বারণ করে, আমি আর দিলীপ ঘরে মালপত্র ভালোভাবে গুছিয়ে রেখে, বাইরে এলাম। এখানে ঠান্ডা খুব একটা বেশি নয়। আগের দোকানে রাতের সেই একই খাবার খেয়ে, অপর একটা দোকানে মগ নিয়ে গেলাম মাধবের জন্য দুধ কিনতে। দোকানদার জানালো দুধ নেই, দুধ পাওয়া যাবে না। আমরা বললাম, আমাদের এক বন্ধুর বেশ জ্বর, একটু দুধ না পেলে সারারাত তাকে না খেয়ে থাকতে হবে। আমাদের কথা শুনে দোকানদার কিন্তু একবারে অন্যরকম ব্যবহার করলো। সে বললো, গায়ে জ্বর? তাহলে অসুবিধা হলেও একটু দুধ তো দিতেই হয়। দুধ গরম করতে করতে, কী কী ওষুধ খাওয়ানো প্রয়োজন, বা কী কী করা উচিৎ, নিজে থেকেই বলতে শুরু করে দিল। চায়ের জন্য রাখা সামান্য দুধ থেকেও, কিছুটা দুধ গরম করে আমাদের মগে ঢেলে দিল, শুধু একজন অসুস্থ লোক না খেয়ে থাকবে বলে। এদের সরলতা, আন্তরিকতা বা মনুষ্যত্ব দেখলে, নিজেদেরকে খুব ছোট মনে হয়। আমাদের এখানে শুধু লোক ঠকানো ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করা ছাড়া, আমরা আর কিছুই শিখলাম না। যাহোক্, ঘরে ফিরে এসে গরম দুধে কিছুটা বোর্ণভিটা দিয়ে মাধবকে দিলাম। সঙ্গে নিয়ে আসা ওষুধ থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধও দিলাম। মাধব জানালো দুধটা খুব ভালো। আমরা আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।

পাশের ঘরে তখনও আলো জ্বলছে। পার্টিশনের ফাঁক দিয়ে পাশের ঘরটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। আমাদের ঘরটা অন্ধকার, তাই পাশের ঘর থেকে আমাদের দেখার কোন সুযোগ নেই। দেখলাম একটা মদের বোতল খুলে সবাই গোল হয়ে বসেছে। তারা আর্টিষ্ট ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলো, এটা তার চলে কী না। আর্টিষ্ট বললেন তাঁর অভ্যাস নেই। তিনি আরও বললেন, যে তাদের এত খাওয়া উচিৎ হচ্ছে না। কিন্তু বোতলটা নিয়ে কথা বলতে বলতে, বেশ কয়েকবার অনেকটা করে নিজের গ্লাশে ঢেলে, গ্লাশ খালি করলেন। মাধব বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার ঘুম আসছে না। উপুড় হয়ে শুয়ে ওদের কাজকর্ম লক্ষ্য করতে লাগলাম। আর্টিষ্ট ভদ্রলোককে একজন জিজ্ঞাসা করলো, এপথে তিনি আগে কখনও এসেছেন কী না। উত্তরে আর্টিষ্ট বললেন, এপথে তিনি এই প্রথম, তবে কল্পনার চোখে তিনি এসব জায়গার ছবি অনেক স্কেচ্ করেছেন। এখন বাস্তবে দেখে বুঝছেন, তিনি যেরকম ছবি এঁকেছেন, জায়গাটা আসলে তত সুন্দর মোটেই নয়। তাঁর আঁকা কেদারের ছবি, যদিও কল্পনায় আঁকা, তবু হুবহু এক এবং অনেক প্রাণবন্ত। যুবকরা বললো, “আপনার মধ্যে এরকম প্রতিভা লুকিয়ে আছে, আর আপনি সেটা নষ্ট করছেন? আপনাকে দেখলে বোঝাই যায় না, আপনি এত গুণের অধিকারী”। তাদের ব্যাঙ্গ গায়ে না মেখে, ভদ্রলোক আর একবার কারণসুধা গলায় ঢেলে শুয়ে পড়লেন। যুবকরাও আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো। রাতের খাবার খেতে যাবার সময় কাল সকালে কোন বাস যাবে খোঁজ নিয়ে এসেছি। গাড়ির নম্বরও নোট করে এনেছি। ড্রাইভারের সাথে আলাপ হয়েছে। সে বলেছে কাল সকালে বাসের সামনের দিকে তিনটে ভালো সিট, সে আমাদের জন্য রেখে দেবে এবং ভোরে আমাদের সে ঘুম থেকে ডেকে তুলেও দিয়ে যাবে। ফলে অত ভোরে ঘুম না ভাঙ্গার কোন ভয় আর নেই। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হবে, ফলে ঘুমবার চেষ্টা করলাম।

আজ ছাব্বিশে আগষ্ট। ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ, দিলীপের ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো। আমাদের কথাবার্তায় পাশের ঘরের       ওরাও উঠে পড়েছে। দক্ষিণ ভারতীয় পরিবার বোধহয় অনেক আগেই উঠেছে। বাইরে এলাম চায়ের খোঁজে। কোন দোকান খোলে নি। বাসটাও দেখতে পেলাম না। ড্রাইভারের সাথে দেখা হলো। সে বললো, “আপনারা উঠে পড়েছেন? আমি ঠিক ডেকে দিতাম। বাসে গিয়ে জায়গাটা বরং একটু রেখে আসুন”। খোঁজ নিয়ে বাসে গিয়ে দেখলাম বাস একবারে ভর্তি। ব্যাটা ড্রাইভার জায়গা রাখে নি। পিছন দিকে একটা তিনজন বসার সিটে জায়গা রেখে এসে দেখি, একটা চায়ের দোকান খুলেছে। অনেক লোকের ভিড়। তিনজনে চা খেয়ে, মুখ হাত ধুয়ে, বাথরুম সেরে, পোস্ট্ অফিসের মালিককে ভাড়া মিটিয়ে, বাসে ফিরে এসে জায়গায় বসলাম। আমাদের ঠিক সামনের তিনজন বসার সিটে, একজন বৃদ্ধ ও একজন বৃদ্ধা পরম সুখে বসে আছেন। বাসে বেশ ভিড়, ফলে অনেকেই ওখানে বসতে চায়। কেউ ওখানে বসতে চাইলেই, বৃদ্ধ দম্পতি জানাচ্ছেন, এখানে একজনের জায়গা আছে। কার জায়গা আছে বোঝা যাচ্ছে না। বোঝা গেল বাস ছাড়ার পরে, কন্ডাক্টার যখন একজনকে ওখানে বসাতে গেল। জানা গেল যে ওদের পায়ের কাছে, দুই সিটের মাঝে, একজন মহিলা শুয়ে ঘুমচ্ছে। ঘুম ভাঙ্গলে তাকে ওখানে বসানো হবে। বাসের সব লোক হেসে উঠতে, বৃদ্ধ বৃদ্ধা কিরকম বোকা বোকা মুখে বসে রইলেন। সত্যিই এরা অদ্ভুত মানুষ। আমরা একত্রিশ টাকা পঁচানব্বই পয়সা দিয়ে তিনটে শ্রীনগরের টিকিট কাটলাম। এসব জায়গায় যে কী হিসাবে ভাড়া নেওয়া হয়, স্বয়ং আইনস্টাইনও হিসাব করে বলতে পারবেন না। আজ আমরা কতদুর যেতে পারবো জানি না। বাস গুপ্তকাশী, অগোস্তমুনি হয়ে এক সময় আবার সেই রুদ্রপ্রয়াগ এসে পৌঁছলো। আজ যেন মনে হলো, রুদ্রপ্রয়াগ নতুন রূপে সেজেছে। সত্যি জায়গাটা কী অপূর্ব সুন্দর। বাসের ভিড় ক্রমশঃ বাড়ছে। তিনজনের বসার সিটে, চারজন করে বসছে। কোনরকমে কষ্ট করে শ্রীনগরে এসে পৌঁছলাম। বাস থেকে চটপট্ নেমে, ছাদে উঠে দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে মালপত্র রাস্তায় নামালাম। হৃষিকেশ থেকে যে জামাপ্যান্ট পরে বেরিয়েছি, সেই পোষাক পরেই আজও আছি। ওই পোষাক পরেই প্রয়োজনে রাস্তায় শুয়ে বসে বিশ্রাম নিতেও হয়েছে। বাসের ধুলোয়, পথের ধুলোয়, তার আগের রঙ ঠিক কিরকম ছিল, মনে করতে পারছি না। গায়ের ধুলো ঝেড়ে দৌড়ে গেলাম টিকিট কাউন্টারে। মাধব একপাশে দাঁড়িয়ে মালপত্র পাহারা দিচ্ছে। ওর শরীর বেশ খারাপ, বিশ্রামের প্রয়োজন।

কাউন্টারে এসে গঙ্গোত্রী যাবার বাসের খোঁজ করলাম। পথে শুনেছিলাম গঙ্গোত্রী যাওয়া যাচ্ছে না। এক বৃদ্ধা জানিয়েছিলেন, বন্ডে সই করে, তবে ওখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে। তাঁকে গঙ্গোত্রী যেতে দেওয়া হয় নি। মিলিটারিরা ওখানে যেতে বারণ করেছিল। সব শুনে আমরা ঠিক করেছিলাম, সেরকম অসুবিধা বুঝলে, প্রথমে যমুনোত্রী চলে যাব। তারপর সম্ভব হলে, গঙ্গো্ত্রী, গোমুখ যাওয়ার চেষ্টা করা যাবে। কাউন্টারের ভদ্রলোক জানালেন, গঙ্গোত্রী যাবার যাত্রাবাস পাওয়া যাবে না। ভদ্রলোক একটা বাসের নম্বর দিয়ে বললেন, “এখনই এই বাসটা ছেড়ে দেবে। চটপট্ এই বাসে করে টেহেরি চলে যান। ওখান থেকে বাস পাবেন”। কোথা দিয়ে কিভাবে যেতে হবে, সত্যিই এভাবে যাওয়া যাবে কী না, আমাদের কোন ধারণাই নেই। খোঁজ নেওয়ার সময়ও নেই। একজনের মুখের কথার ওপর ভরসা করে, দৌড়ে গিয়ে, নির্দিষ্ট নাম্বারের বাসের ছাদে উঠে, মালপত্র গুছিয়ে রাখলাম। বাসে ড্রাইভার ইঞ্জিন চালু করে বসেই ছিল। ছাদ থেকে নেমে দেখলাম, মাধব একটা বসার জায়গা ম্যানেজ করে নিয়েছে। দিলীপও ওর পাশে একটা জায়গা পেয়ে গেল। বাসে খুব ভিড়, ফলে সবার পরে আমি বাসে ওঠায়, আমার বসার জায়গা মিললো না। বাসের অধিকাংশ যাত্রীই, স্থানীয় অধিবাসী বলে মনে হলো। এদের দু’একজনকে অনুরোধ করলাম, একটু সরে বসে আমায় একটু বসার জায়গা করে দিতে। কিন্তু কেউ কোন আগ্রহ প্রকাশ করলো না। সারাদিন খালিপেটে বাস জার্নির পর, দাঁড়িয়ে যেতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। খুব গরম লাগছে। বুক, পিঠ, মু্‌খ, ঘামে ভিজে গেছে। হাফহাতা সোয়েটারটা খুলে ফেললাম। গায়ের এক ইঞ্চি পুরু ময়লার ওপর ঘাম গড়িয়ে লেগে হাত, মুখ, গলা, কালো হয়ে গেছে। নিজেকে এই মুহুর্তে নিজেরই ঘেন্না করছে। ভিড় ক্রমশঃ বাড়ছে। বাসের সামনের দিকে মাধব আর দিলীপের পাশেই আমি দাঁড়িয়ে আছি। এদিকে কোন সিট খালি হচ্ছে না। খালি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে, পিছনের দিকের সিটগুলো। কিন্তু ভিড় ঠেলে পেছনে যাবারও কোন উপায় নেই। এইভাবে পঁচিশ কিলোমিটার পথ যাওয়ার পর, পিছনের দিকে এগিয়ে গিয়ে একবারে পিছনের সিটে, একটা বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। এই ভিড়ে এখানে একসাথে প্রায় সবাই বিড়ি খাচ্ছে। গরমে, ধোঁয়ায়, নিশ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছে। তবু মনে একটাই আশা, গঙ্গোত্রীও তাহলে যাওয়া হচ্ছে। বন্ডে সই করে যেতে হবে শুনে রাস্তার বিপদ ও বন্ধুরতার কথা ভেবে, দিলীপ একটু মুষড়ে পড়েছিল, এখন ও কী চিন্তা করছে জানতে ইচ্ছা করছে। তিনটে টিকিট আঠারো টাকা পঁচাত্তর পয়সা দিয়ে কাটা হলো। জলের মতো পয়সা খরচ হচ্ছে। তবু কপাল ভালো গোবিন্দঘাট, যোশীমঠ, ঘাংরিয়া, বা নন্দনকানন ও হেমকুন্ডের পথে পাঞ্জাবিদের দয়ায়, থাকা খাওয়ার কোন খরচ লাগে নি। অন্যান্য জায়গাতেও দু’তিন টাকার মধ্যে তিনজনের এক বেলার খাওয়া হয়ে গেছে। প্রচন্ড খিদেয় পেট জ্বালা করছে। এর নামই বোধহয় তীর্থ। এই কষ্ট স্বীকার করলেই বোধহয়, ষোল আনা পূণ্য অর্জন করা যায়। সুন্দর রাস্তার ওপর দিয়ে এখন বাস ছুটছে। যতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম ধুলোয় ভরা মেঠো রাস্তা দেখছিলাম। এবার দেখছি প্রকৃতির সাজানো বাগানকে ভেদ করে, কী সুন্দর রাস্তাই না তৈরি করা হয়েছে। রাস্তা আরও চওড়া করার কাজও চলছে। বেশ দুপুর নাগাদ বাস এসে,  “টেহেরি” পৌঁছলো।

আশ্চর্য, খিদেয় সেই পেট জ্বালা করা ভাবটা আর অনুভব করছি না। বাস থেকে মালপত্র নামিয়ে, দৌড়ে নতুন বাসের খোঁজে গেলাম। শুনলাম সন্ধ্যার আগে উত্তরকাশী যাবার কোন বাস নেই। এদিকে মাধব যেন ক্র্রমশঃ কেমন ঝিমিয়ে পড়ছে। এত চিন্তার ওপর মাথার ওপর আর এক চিন্তা, বাড়িতে ওর বাবাকে অসুস্থ দেখে এসেছি, এখন আবার ওকে নিয়ে না এখানে কোন বিপদে পড়তে হয়। একটা জায়গায় মালপত্র জড়ো করে রেখে, কোথায় খাওয়া যায় ভাবছি, এমন সময় খোঁজ পাওয়া গেল, কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বাস যাবে। একবারে খালি একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। ভালভাবে খোঁজখবর নিয়ে বাসের ছাদে গিয়ে চড়লাম। মালপত্র সাজিয়ে রেখে, একটা হোটেলে গেলাম। জায়গাটা বেশ বড়। একসময় এটা একটা স্বাধীন এস্টেট্ ছিল। বড় বড় অনেক হোটেল, দোকানপাট আছে। অনেক দিন পরে মনপ্রাণ ভরে মাংস রুটি খেলাম। জানি না আবার কবে এ সুযোগ আসবে। দাম মিটিয়ে বাসে এসে বসলাম। একবারে সামনের সিটে আমি ও মাধব। ঠিক তার পেছনের সিটটাতে দিলীপ। নির্দিষ্ট সময়েই বাস ছাড়লো। মাধবের গা বেশ গরম, চোখও বেশ লাল। কথা বলার শক্তিও যেন অনেক কমে গেছে। এখনও পর্যন্ত নিজেরাই ডাক্তারি করেছি। জানালার কাচ টেনে দিয়ে, ওয়াটার বটল্ থেকে একটু জল দিলাম, সঙ্গে সেই নিজেদের বুদ্ধিমতো ওষুধ। তিনজনের বাস ভাড়া চব্বিশ টাকা পঁয়তাল্লিশ পয়সা মিটিয়ে দিলাম। রাস্তাও অনেকটাই। বাস বেশ জোরে ছুটছে। টেহেরি আসার পথে দেখলাম, একটা বাস গভীর খাদে পড়ে আছে। একটা মোটা শক্ত দড়ি দিয়ে বাসটাকে ওপরে একটা মোটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে, যাতে বাসটা আর নীচে গড়িয়ে পড়তে না পারে। শুনলাম কেউ মারা যায় নি। ড্রাইভারও লাফিয়ে প্রাণে বেঁচেছে। আমরাও আমাদের বাসের ড্রাইভারের হাতে নিজেদের প্রাণ সঁপে দিয়ে বসে থাকলাম। একসময় বাস “ধরাসু” এসে পৌঁছলো। এখান থেকে যমুনোত্রী যাবার রাস্তা বেঁকে গেছে। বাস থেকে নেমে, তিনজনে চা খেয়ে বাসে ফিরে এলাম। একটু পরেই বাস ছেড়ে দিয়ে আবার আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললো। মনে মনে ভাবছি কখন বাস উত্তরকাশী পৌঁছবে। ওখানে পৌঁছে প্রথম কাজ, মাধবকে ডাক্তার দেখানো। আরও বেশ কিছু পথ পার হয়ে, সব চিন্তার অবসান ঘটিয়ে, বাস নিরাপদে উত্তরকাশী এসে পৌঁছলো।

বাসের ছাদ থেকে মাল নামিয়ে, একটা বাচ্চা ছেলের হাতে মালপত্র দিয়ে, সামনের ট্রাভেলার্স লজে এসে হাজির হলাম। এখানেই একটা ঘর নেওয়া হলো। অশ্চর্য, এতবড় বাড়িটাতে আমরাই একমাত্র বোর্ডার। এখানেও সেই আঠারো টাকা ভাড়া। যে ভদ্রলোক ভাড়া নিয়ে রসিদ দিলেন, তাঁকে গঙ্গোত্রী, গোমুখী সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, গত বছরের বন্যায় গঙ্গোত্রীর রাস্তা খুবই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মাঝখানে তের কিলোমিটার রাস্তা, একবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। আগে বাস “লঙ্কা” পর্যন্ত সরাসরি যেত। এখন এখান থেকে বাসে “ভুখি” নামে একটা জায়গা পর্যন্ত যাওয়া যাবে। ভুখি থেকে তের কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হবে “ডাবরানী” নামে একটা স্থানে। ডাবরানী থেকে আবার লঙ্কা পর্যন্ত বাস পাওয়া যাবে। তবে প্যাসেঞ্জার হলে তবেই বাস পাওয়া যাবে, অবশ্য জীপ পাওয়া যায়। এ খবর অনেক আগেই আমাদের বাড়ির কাছে  এক ভদ্রলোকের কাছে শুনে এসেছিলাম। উনি শুধু এই কারণেই গঙ্গোত্রী যেতে পারেন নি। কলকাতার ইউ.পি.টুরিজিম্ কিন্তু এ খবর জানেই না। আসবার আগে তাদের কাছে এই খবরের সত্যতা জিজ্ঞাসা করলে, তারা একটু ব্যাঙ্গ করেই বলেছিল, “কী জানি মশাই, এত বড় একটা খবর আপনারা জানেন, আর আমরাই জানিনা”? যাহোক্, মালপত্র রেখে, একটু মুখ হাত ধুয়ে পরিস্কার হয়ে, ট্রাভেলার্স লজের ভদ্রলোকের কাছে ভালো ডাক্তারের খোঁজ করলাম। ভদ্রলোক জানালেন, একটু এগিয়ে স্টেট্ ব্যাঙ্কের একতলায়, একজন ভাল ডাক্তার বসেন। মাধবকে সঙ্গে করে গেলাম সেই ডাক্তারের খোঁজে। আজ রবিবার, রবিবারে ঐ ডাক্তার বসেন না। স্থানীয় লোকেদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ট্রাভেলার্স লজের পিছন দিকে একটু এগিয়ে ডান দিকের রাস্তায়, ডাঃ শিব কুমার বসেন। তিনি খুব ভালো ডাক্তার। আমরা তাঁর কাছেই গেলাম। বাড়ির বাইরে নেমপ্লেটে দেখলাম, ওনার অনেক ফরেন ডিগ্রী আছে। তাছাড়া উনি কনসালট্যান্ট্। অপর কোন ডাক্তারের মাধ্যমে ওনাকে দেখাতে হয়। দরজায় নক্ করলাম, কেউ সাড়া দিল না। দরজায় আবার নক্ করে, ওনার বাচ্চা ছেলেটার কাছে জানা গেল, উনি এখন বাড়িতে নেই। শেষে ওনার স্ত্রীকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, কখন এলে ওনাকে পাওয়া যাবে। ওনার স্ত্রীর কথা মতো রাত্রে আবার গেলাম। ডাক্তার সাহেব তখন রাতের খাবার খেতে বসেছেন। আমাদের একটু বসতে বললেন।

বিকেলবেলা মাধবকে ঘরে রেখে, আমি আর দিলীপ শহরটা একটু ঘুরে দেখে এসেছিলাম। খুব সুন্দর শহর। পাহাড়ের কোলে সবরকম সুযোগ সুবিধা নিয়ে শহরটা গড়ে উঠেছে। স্থানীয় এক ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হলো। ভদ্রলোক শিবপুর বি.গার্ডেনের কাছে দু’এক বৎসর ছিলেন। অদ্ভুত বাংলা বলেন। এখন পর্যন্ত সব জায়গায় দেখলাম, এখানকার মানুষ মোটামুটি বাংলা বোঝেন, অল্পবিস্তর বাংলা বলতেও অনেকেই পারেন। শুধু তাই নয়, বাঙালিদের এরা বেশ খাতির ও সম্মানও করেন। যাহোক্‌ ডাক্তার সাহেব খাওয়া সেরে এসে, ডিসপেন্সারীর দরজা খুলে, আমাদের ঘরের ভিতর নিয়ে গেলেন। সাজানো গোছানো খুব সুন্দর দু’টো ঘর। সামনের ঘরে সোফাসেট্ আছে, ওখানে রোগী বা সঙ্গে আসা বাড়ির লোকেরা বসেন। ভিতরের ঘরে রোগী দেখা হয়। মাধবকে একটা বেডে শুতে বলে, উনি অনেক রকম ভাবে পরীক্ষা করলেন, প্রেসারও মাপলেন। মাঝবয়সী এই ডাক্তারটিকে রাজপুত্রের মতো দেখতে। কথা বলার কায়দাও খুব। মাধবকে পরীক্ষা করে তিনি বললেন, প্যারাটাইফয়েড্। দিলীপ অনেকক্ষণ থেকেই বলছে রিস্ক্ না নিয়ে ফিরে যেতে। আমি ভাবছিলাম ওকে একটু সুস্থ করে যদি গঙ্গোত্রীটা অন্তত ঘুরে আসা যায়। এত কাছে এসে ফিরে যাব? আমরা পাশেই বসে আছি। প্যারাটাইফয়েড শুনে আমি ও দিলীপ নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়াচায়ি করলাম। আমি খুব আস্তে আস্তে দিলীপকে বললাম, আমাদের ওখানকার ডাক্তারদেরও চট্ করে প্যারাটাইফয়েড বলার একটা স্বভাব আছে। ঘাবড়াবার কিছু নেই। ডাক্তার সাহেব এবার অনেকক্ষণ ধরে মাধবের চোখ ও জিভ পরীক্ষা করে বললেন, যদিও ন্যাচারাল আলো, অর্থাৎ সূর্যালোক ছাড়া সঠিক বলা সম্ভব নয়, তবু মনে হচ্ছে এর জন্ডিস্ হয়েছে। মরেছে, একেই বোধহয় জন্ডিস্ কেস্ বলে। ভয় হলো এরপর ম্যালেরিয়া, নিউমোনিয়া, কলেরা, ইত্যাদি আর পাঁচটা রোগের নাম না একে একে বলে বসেন। শেষে তিনি বললেন, “কাল সকাল পর্যন্ত ওষুধ আমি আমার কাছ থেকেই দিয়ে দিচ্ছি। এখন আর কোথায় ওষুধ কিনতে যাবেন? এগুলো খেলে খিদে হবে, জ্বরও কমে যাবে। কাল সকালে আবার একবার এসে দেখিয়ে নিয়ে যাবেন”। কাল সকালেই আমাদের ভুখি যাবার কথা। সকাল সাতটায় বাস। ওনাকে সব খুলে বললাম। সব শুনে উনি বললেন, আগামী কাল না যাওয়াই ভালো। কাল সকালে উনি যদি দেখে বোঝেন, তবে পরশু যাওয়া যেতে পারে। কত ফীজ্ দেব জিজ্ঞাসা করায়, উনি বললেন, আমি এইভাবে ডিরেক্টলি রোগী দেখি না। আপনারা টুরিষ্ট, যাতে কোন অসুবিধায় না পড়েন, তাই দেখে দিলাম। যদিও রাতে আমার ফীজ্ কিছু বেশি, তবু আপনারা ঐ সকালের চার্জ, অর্থাৎ পনেরো টাকাই দিন। আমরা তাঁকে কুড়ি টাকা দিতে, উনি দশ টাকা রেখে বললেন, খুচরো নেই, কাল সকালে দিয়ে দেবেন।

বাইরে এসে আমরা একটা হোটেলে খেয়ে নিয়ে, মাধবকে একটা দোকানে দুধ, পাউরুটি খাইয়ে, লজে ফিরে এলাম। মাধব শুয়ে পড়লো, আমি ও দিলীপ অনেক রাত পর্যন্ত জেগে, চিঠি লিখলাম। আগামীকাল সকাল সকাল ওঠার কোন তাড়া নেই। মনে শুধু একটাই চিন্তা, তাহলে কী শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়েও হলো না? আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। মাধবের গায়ে হাত দিয়ে মনে হলো জ্বর নেই। মনে মনে ঠিক করলাম, ওকে উৎসাহ দিয়ে, সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েও, গঙ্গোত্রী গোমুখ যাবই। দরকার হলে ওকে কান্ডি বা ডান্ডিতে নিয়ে যাওয়া যাবে। ভুখি থেকে ডাবরানী, এই তের কিলোমিটার পথ খচ্চরে করে নিয়ে যাব। রাতে ট্রাভেলার্স লজের ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এখানে মালপত্র রেখে যাবার খরচ কী রকম? ভদ্রলোক বলেছিলেন পার লাগেজ পার ডে, এক টাকা ভাড়া। কত টাকা লাগেজের জন্য খরচ হতে পারে, ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম।

আজ সাতাশে আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো যথারীতি বেশ সকালেই। মাধবের গায়ে জ্বর নেই, শরীরও অনেক সুস্থ। বাইরের ঘেরা জায়গায় এসে চা খেলাম। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সকাল ন’টায় একটা বাস আছে বটে, তবে সেটা “ভাটোয়ারী” নামক একটা জায়গা পর্যন্ত যাবে। ওখান থেকে ভুখি অল্প কয়েক কিলোমিটার পথ। এখান থেকে সকাল সাতটার বাসটাই একমাত্র সোজা ভুখি পর্যন্ত যায়। সাতটার বাসটা ধরার কোন সুযোগ নেই। ন’টার বাসটা ধরতে গেলেও, তৈরি হওয়া দরকার। দিলীপকে পাঠালাম মাধবকে সঙ্গে করে ডাক্তারের কাছে। ওকে বললাম আজ সকাল ন’টার বাসটায় আমরা যেতে চাই জানিয়ে, প্রয়োজন মতো ওষুধপত্র নিয়ে আসতে। আমি একটা হোল্ড্ অল্-এ সব জিনিসপত্র সমেত অন্য হোল্ড্-অল্ দু’টো ঢুকিয়ে বাঁধতে বসলাম। তাহলে তিনটের জায়গায় একটা লাগেজ হয়ে যাবে। সুটকেস তিনটেকে তো আর কিছু করার উপায় নেই। সব খুলে আস্তে আস্তে ভাঁজ করে একটা হোল্ড্ অল্-এ মালপত্র গুছিয়ে দেখলাম, তিনটে হোল্ড্-অলকে দু’টো করা যেতে পারে, একটার মধ্যে সব কিছু ঢোকানো সম্ভব নয়। সেইভাবেই বেঁধে নিয়ে, কাঁধের ঝোলা ব্যাগগুলো গোছালাম। মাধবের ব্যাগটা যতটা সম্ভব হাল্কা করলাম। সঙ্গে নেওয়ার মধ্যে, তিনটে ওয়াটার প্রুফ, কিলোখানেক চিড়ে, এক প্যাকেট আমসত্ব, এক প্যাকেট খেজুর, কিছু লজেন্স্ ও চিকলেটস্, তিনটে গামছা, ও সেই রামের বোতলটা। আসবার সময় তিনটে প্যাকেটে এক কিলোগ্রাম করে, তিন কিলোগ্রাম শুকনো চিড়ে নিয়ে এসেছিলাম। এখনও একটুও খরচ হয় নি। সুটকেসে বাকি দু’টো প্যাকেট রেখে দিলাম। সব কাজ শেষ হলে, ভালোভাবে সাবান মেখে স্নান সারলাম। এই লজটায় অনেকগুলো বাথরুম পায়খানা থাকলেও, জলের বেশ অভাব। বিকেলবেলা বড় বড় ড্রামে জল ধরে রাখা হয়। দু’টো ড্রাম আছে, বোর্ডারের সংখ্যা বেশি হলে অসুবিধা হবেই। সকালে অবশ্য জল যথেষ্টই পাওয়া যায়। স্নান সেরে সেই পুরাতন জামা প্যান্ট পরেই ট্রাভেলার্স লজের অফিস ঘরে গেলাম। এখানে ভালোভাবে যাত্রাপথের খোঁজ খবর নিলাম। এখানেই জানতে পারলাম, গত বৎসরের ভয়াবহ বন্যার পর, এদিকের যাত্রাবাস ব্যবস্থা প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। আরও জানা গেল যে, ডাবরানীতে বুদ্ধি সিং নামক এক ব্যক্তির কাছে ভালো থাকবার জায়গা পাওয়া যাবে।

দিলীপ ও মাধব ডাক্তার দেখিয়ে ফিরে এল। ডাক্তার শিব কুমার ওদের জানিয়েছেন, অন্য কেউ হলে আজ এই বিপজ্জনক, ভাঙ্গা, অনিশ্চিত রাস্তায় যেতে তিনি বারণ করতেন। কিন্তু যেহেতু আমরা টুরিষ্ট, এবং ঝুঁকি নিয়েও গঙ্গোত্রী ও গোমুখ দেখবার জন্য এতটা পথ এসেছি, তাই তিনি ওখানে যাবার অনুমতি দিচ্ছেন। তবে সময় মতো ওষুধগুলো যেন অবশ্যই খাওয়ানো হয়। বেশ কিছু ট্যাবলেট, ক্যাপশুল ইত্যাদি তাঁর প্রেসক্রিপশন মতো ওরা কিনেও এনেছে। তবে সুখের কথা, ডাক্তার জানিয়েছেন যে, মাধবের জন্ডিস্ হয় নি। দিলীপ জানালো আজ তিনি কোন ফীজ্ নেন নি। গতকালের বাকি পাঁচ টাকা কেবল তাঁকে দেওয়া হয়েছে। দিলীপ স্নান সেরে নিল। মাধবকে খুব বেশি স্নান করতে বারণ করলাম। সাবধান হওয়া ভালো।

ক্লোকরুমে তিনটে সুটকেস ও দু’টো হোল্ড্-অল্ রেখে, তিনজনে তিনটে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ ও তিনটে ওয়াটার বটল্ নিয়ে, লাঠি হাতে রাস্তায় এলাম। হোটেলে খাওয়া দাওয়া সেরে, টিকিট কাউন্টারে গেলাম টিকিট কাটতে। ভাটোয়ারী পর্যন্ত তিনটে টিকিটের দাম নিল ন’টাকা ত্রিশ পয়সা। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার মতো রাস্তা। একটু পরে বাস ছেড়ে দিল। আমাদের পাশে এক বাঙালি ভদ্রলোক বসেছিলেন। তাঁর কাছে শুনলাম, একটু এগিয়ে এক বিরাট বাঁধের কাজ চলছে। গত বৎসর বাঁধের কাজ চলাকালীন বন্যায় গঙ্গার জল ঢুকে, সমস্ত নষ্ট হয়ে যায়। তিনি ওখানে কনট্র্যাকটারী করেন। যাহোক্, এক সময় বাস এসে ভাটোয়ারী পৌঁছলো। বাসের দু’একজন মাত্র যাত্রী ভুখি যেতে চায়। আমরা তিনজন নিজেদের গরজে বাস থেকে নেমে, বাসের অফিসে গিয়ে, ভুখি পর্যন্ত বাস নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করলাম। প্রথমে ওরা এই প্রস্তাবে কানই দিল না। পরে আরও কিছু প্যাসেঞ্জারের অনুরোধে, ওরা জানালো কুড়ি-পঁচিশজন যাত্রী হলে, বাস ভুখি নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। ব্যাস, আর সময় নষ্ট না করে, লেগে পড়লাম প্যাসেঞ্জারের সন্ধানে। ভুখিগামী যে কোন লোককে দেখলেই আমরা তাকে ডেকে এনে, বাস এক্ষুণি ছাড়বে জানিয়ে বাসে বসতে বলছি। এইভাবে অনেক কষ্টে গোটা পনের লোক যোগাড় করা গেল। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর, ভুখি যাবার জনা কুড়ি-পঁচিশজন যাত্রী যোগাড় হলো। কিন্তু বাস ছাড়ার কোন লক্ষণ কিন্তু দেখা গেল না। ফলে দু’চারজন আগ্রহী যাত্রী আবার বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলো। যাহোক্, কর্তৃপক্ষের অশেষ কৃপা, শেষ পর্যন্ত এই রাস্তাটার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে এক টাকা করে ভাড়া নিয়ে, বাস ছাড়লো। অল্পই রাস্তা, কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস এসে ভুখি পৌঁছলো।

আকাশটা আজ আবার বেশ মেঘে ঢেকে আছে, তবে এক্ষুণি বৃষ্টি নামার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। এক যুবক আমাদের সাথে এই বাসেই এসেছে। সে নিজেই আমাদের সাথে আলাপ করলো। লক্ষ্ণৌতে বাড়ি, যাবে গরমকুন্ডে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম গরমকুন্ডটা কোথায়? সে জানালো, “গাংগানী” নামক জায়গাটার গঙ্গার অপর পারটার নাম গরমকুন্ড। যুবকটি খুব সুন্দর কথাবার্তা বলে, দেখতেও বেশ সুন্দর। হাতে একটা ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে, আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে, একসাথে হেঁটে চলেছে। আমরা কিছু কলা ও আপেল নিয়ে এসেছিলাম রাস্তায় প্রয়োজন হতে পারে ভেবে। খিদেও বেশ ভালোই পেয়েছে। ভাবলাম কোথাও বসে সেগুলো খাওয়া যাবে। যুবকটি জানালো যে, সে গরমকুন্ডে ওয়্যারলেসে কাজ করে। হাওড়া শিবপুরে রেমিংটন ব্যান্ডে, তার বাবা কাজ করতেন। ফলে সে নিজেও হাওড়া কলকাতা ঘুরে এসেছে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, সে মিলিটারিতে কাজ করে কী না। সে জানালো, যে ওটা মিলিটারির আন্ডারে পড়ে না। ওদের কাজ গঙ্গার জল হ্রাসবৃদ্ধির খবর, ওয়্যারলেসে উত্তরকাশীকে জানানো, ও ঐ এলাকার ওপর লক্ষ্য রাখা। তাছাড়া রাস্তা মেরামতির জন্য পাহাড় ব্লাষ্টিং করলেও উত্তরকাশীকে খবর পাঠানো, যাতে ঐ সময়ে কোন যাত্রীকে আসতে দেওয়া না হয়। আরও হয়তো কিছু কাজকর্ম আছে, বিশদভাবে জানতে চাইলাম না। যুবকটি সামনে একটা দোকানে আমাদের নিয়ে চা খেতে ঢুকলো। খুব হাল্কা এক পশলা বৃষ্টি শুরু হলো, সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া। চা খাওয়া হলে দাম দিতে গেলে, যুবকটি বাধা দিয়ে বললো “তাই কখনও হয়? আমাদের জায়গায় এসে আপনারা দাম দেবেন কী? আপনাদের ওখানে গেলে, তখন আপনারা দাম দেবেন”। বললাম, “এটাও তো আপনার এলাকা নয়, লক্ষ্ণৌ গেলে আপনি  দাম দেবেন”। যুবকটি বললো, “ওখানে গেলে আমার খরচায় সমস্ত লক্ষ্ণৌ শহর ঘুরে দেখাবো”। বললাম, “আপনাদের লক্ষ্ণৌ শহর আমার দেখা, খুব ভালো জায়গা”। বৃষ্টি আর পড়ছে না, আমরা উঠে পড়ে দোকান থেকে রাস্তায় নামলাম।

বাস থেকে নেমে যুবকটির সঙ্গে এতক্ষণ আমরা কিন্তু বাস রাস্তা ধরেই হেঁটে আসছি। এদিকে বাস কেন আসেনা, বুঝলাম না। আরও কিছুটা পথ হাঁটার পর কারণটা বোঝা গেল। শুধু বোঝা গেল তাই নয়, সঙ্গে গঙ্গোত্রী যাত্রার ভবিষ্যৎ নিয়েও আমাদের মনে সংশয় দেখা দিল। রাস্তা একেবারেই নেই। কোন কালে ছিল বলেও বোঝার উপায় নেই। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির কাজ চলছে। বড় বড় শাবলের মতো লোহার রড দিয়ে ড্রিল করে পাহাড়ের গায়ে গর্ত করা হচ্ছে। পরে ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ভেঙ্গে, রাস্তা তৈরি হবে। তখন লোক চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। এবড়ো-খেবড়ো ভাঙ্গা পাথরের ওপর দিয়ে অনেকটা পথ পার হয়ে যেতে হলো। পাশেই গভীর খাদ। অনেক নীচ দিয়ে গঙ্গা আপন মনে বয়ে চলেছ। সেই গঙ্গা, যার উৎস দেখতেই আমাদের এত কষ্ট করে যাওয়া। খুব সাবধানে এই পথটুকু পার হয়ে এলাম। একটু পা হড়কালেই গঙ্গা মাইকী জয় হয়ে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এ জায়গাটায় রাস্তা বলে কিছু নেই। কখনও নীচুতে নেমে, কখনও বা বড় পাথর টপকে একটু ওপরে উঠে, এগিয়ে যেতে হয়। বেশ কিছুটা পথ এইভাবে পার হয়ে, আবার বাস রাস্তায় পড়লাম। গল্প করতে করতে জোর কদমে এগিয়ে চলেছি। বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি শুরু হলো। সঙ্গে ওয়াটার প্রুফ আছে বটে, কিন্তু যুবকটি ভিজে ভিজে আমাদের সাথে যাবে, আর আমরা বর্ষাতি গায়ে দিয়ে তার সাথে যাব? তাই আমরাও ভিজে ভিজেই তার সাথে পথ চলছি। কোথাও যে একটু দাঁড়াবো, তারও উপায় নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেজার থেকে, ভিজে ভিজে হাঁটাই বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের জন্য যতটা না চিন্তা, তার থেকে অনেক বেশি চিন্তা মাধবকে নিয়ে। যুবকটি জানালো, আমরা প্রায় গাংগানী এসে গেছি, আর সামান্যই পথ। একটু এগিয়েই একটা ঝোলা পোর্টেবল্ ব্রিজ পার হয়ে, গঙ্গার অপর পারে এলাম। পরপর দু’টো চায়ের দোকানের একটার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যুবকটি আমাদের একটা পাকা বড় ঘরে ছেড়ে দিয়ে বললো, “এখানে রাতটা কাটাতে পারেন। আজ আর এগবেন না, কারণ এখান থেকে আগেকার পাকা বাস রাস্তা আর নেই। বাস রাস্তা ছিল গঙ্গার অপর পার দিয়ে,  যেদিক দিয়ে আমরা এতক্ষণ হেঁটে আসলাম। এই ব্রিজের ঠিক পরেই আগেকার বাস রাস্তাটা গঙ্গার সাথে মিশে গেছে”। যুবকটি জানালো, গত বছর বন্যার পর পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করে, এই ব্রিজটা তৈরি করা হয়েছে। গঙ্গার এপার থেকে ডাবরানী পর্যন্ত নতুন পায়ে হাঁটার পথ তৈরি করা হয়েছে। এটা একবারেই স্থানীয় লোকেদের প্রয়োজন মেটাতে, তাদের উপযুক্ত হাঁটাপথ তৈরি করা হয়েছে। এখন গঙ্গোত্রী যাবার যাত্রী নেই। তাছাড়া রাতে ঐ রাস্তায় ভাল্লুকের উৎপাত আছে। কাজেই আমাদের আজ আর এগিয়ে না গিয়ে, এখানেই থেকে যাওয়াই ঠিক হবে। সামনেই একটা পাকা বাড়ি দেখিয়ে যুবকটি জানালো যে, ওটাই তাদের অফিস, এবং ওখানেই মেস্ করে তারা কয়েকজন থাকে। যুবকটি তার নিজের আস্তানায় এগিয়ে গেল।

আমাদের সর্বাঙ্গ বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। যুবকটির দেখানো বড় ঘরটায় রাত্রিবাস করার সিদ্ধান্ত পাকা করে, ঘরে ঢুকে নিজেদের সব জামাপ্যান্ট খুলে, দরজা, জানালা ও মাটিতে মেলে শুকতে দিয়ে, জাঙ্গিয়া পরে বসে রইলাম। যদিও বুঝতে পারছি শুকনো হবার কোন সম্ভাবনাই নেই, তবু যদি কিছুটা শুকনো হয় এই আশায়, ওগুলো মেলে দিলাম। এতক্ষণে কলা, আপেলগুলো যথাস্থানে স্থান পেল। খিদেটা অনেকটাই কমে গেল। ঘরটার সামনেই একটা বড় চৌবাচ্চা মতো। তার জল কিন্তু গরম। চারপাশ দিয়ে অল্প অল্প ধোঁয়াও উঠছে। ডানপাশে, উপর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে একটা ঝরনার ধারা নেমে এসেছে। পরে শুনলাম ঐ ঝরনার জল গরম এবং ঐ জলই এ অঞ্চলে সর্বত্র ব্যবহার করা হয়। আমাদের ঘরটার ভিতরে একপাশে মুখোমুখি দু’টো করে, মোট চারটে বাথরুম বা পায়খানা কিছু একটা হবে। চারটের দরজাই তালা দেওয়া। কার কাছে চাবি থাকে জানি না, তবে ওগুলোর দেওয়াল ছাদ থেকে বেশ খানিকটা নীচে শেষ হয়েছে। বন্ধুদের বললাম, প্রয়োজনে দেওয়াল টপকে ভিতরে নেমে ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু সবার আগে রাতের খাবারের একটা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মাধবকে বসিয়ে রেখে, জাঙ্গিয়া পরা অবস্থায় গায়ে ওয়াটার প্রুফ চাপিয়ে দোকান দু’টোর কাছে গেলাম। নীচের দোকানটা জানালো, চা ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। ওপরের দোকানটায় দেখলাম কয়েকজন বসে চা খাচ্ছে। একপাশে পাঁচটা খাটিয়া পাতা। কিছু পাওয়া যাবে কী না জিজ্ঞাসা করায়, দোকানদার জানালেন চা পাওয়া যাবে। এই দোকানের একমাত্র খাদ্যবস্তু চা আর বিড়ি। দেশলাই পর্যন্ত নেই। আমরা জানালাম, রাতে আমরা এখানে থাকবো, আমাদের খাবার কিছু ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বৃদ্ধ দোকানদারকে লালাজী বলে সম্বোধন করায়, তিনি খুব খুশি হলেন। দোকানের বাইরে ডানপাশে, একটা নল থেকে ঐ ঝরনার গরম জল একভাবে পড়ে যাচ্ছে। তার পাশে কিছু ছোট ছোট শুকনো আলু পড়ে আছে, হয়তো বা রাখা হয়েছে। দেখে মনে হলো পচে গেছে, তাই দোকানের বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা গেল প্রত্যেকটা আলুর গা থেকে শিকড়ের মতো কল্ বার হয়েছে। এতক্ষণে লালাজী জানালেন যে, আমরা যেখানে উঠেছি, সেটা আসলে মহিলাদের গরমকুন্ডে স্নান সেরে কাপড় ছাড়ার জায়গা। ওখানে রাত্রে থাকতে দেওয়া হয় না, বিশেষ করে পুরুষদের তো নয়ই। দিলীপ আর আমি পাশাপাশি বসে। হাতে এই দোকানের একমাত্র খাদ্য, চায়ের কাপ। শোচনীয় অবস্থা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বৃষ্টি পড়ছে, দারুণ শীত, চারপাশে কালো হিমালয় ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না, অনেক নীচু থেকে গঙ্গার বীভৎস আওয়াজ এক নাগাড়ে কানে বাজছে, এই অবস্থায় এখনও আমরা জানি না, রাত্রে কোথায় থাকবো, কী খাবো। এখানে কাছেপিঠে কোন মানুষ বাস করে না, থাকা বা খাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই, এখানে কোন্ মহিলা পাহাড় ভেঙ্গে রাতে কুন্ডে স্নান সেরে কাপড় ছাড়তে আসবে ভগবান জানেন। অপরদিকে একটা খাটিয়ায়, একজন পায়জামা সার্ট পরা লোক বসে আছেন। তাঁর দৃষ্টিটা কিরকম যেন সন্দেহজনক। দিলীপকে সাবধান করে দেবার জন্য বললাম, লোকটার চাউনি মোটেই সুবিধার নয়, রাতে সতর্ক থাকতে হবে। দিলীপও আমার কথায় সায় দিল। সঙ্গে এত টাকা, মাধবের ও আমার মানি ব্যাগে বেশ কিছু টাকা আছে। আর বেশিরভাগ টাকাই অবশ্য রাখা আছে খালি একটা বিস্কুটের প্যাকেটে। এমন জায়গায় এসে হাজির হয়েছি যে, চিৎকার করে আমাদের সতর্ক করে, ঢাক ঢোল পিটিয়ে আমাদের খুন করে ফেললেও, কারো জানার উপায় নেই। মাঝেমাঝে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি লোকটা একভাবে আমাদের লক্ষ্য করছেন। আমরা যে ফাঁদে পড়েছি, তিনি বুঝে গেছেন। লালাজী বললেন, ভাত, ডাল ও সবজি পাওয়া যাবে। আমরা বললাম, ভাত না করে চাপাটি বানানো যায় না? লালাজী বললেন, বাঙালি আদমি রুটি খাবে? আমরা জানালাম যে রুটিই আমরা ভালবাসি। তিনি জানালেন যে তিনি রুটি তৈরি করে দেবেন। একটা সমস্যা মিটলো, অন্তত খালিপেটে লোকটার হাতে মরতে হবে না। আমরা বললাম রাতে তিনটে খাটিয়া চাই, সঙ্গে লেপ্ কম্বল। সামনের ঐ ঘরে আমাদের এক বন্ধু আছে, সে অসুস্থ। খাটিয়া লেপ ঐ ঘরে নিয়ে যাব। লালাজী জানালেন, সব কিছুই মিলবে, তবে ওখানে রাতে থাকতে দেওয়া হয় না, কাজেই দোকানেই থাকতে হবে। আসলে ঐ ঘরটায় থাকতে চাওয়ার একটাই উদ্দেশ্য, ঘরটায় দরজা আছে, এবং সেটা ভিতর থেকে বন্ধ করা যায়। আর এই দোকানটা একটা অতি সাধারণ চায়ের দোকান। সামনে তিনটে বাঁশের খুঁটি। সামনে ও ডানপাশটা পুরো খোলা। পিছন ও বাঁপাশটা খড়ের ও মাটির দেওয়াল মতো। খড়ের চাল। সঙ্গে এত টাকা পয়সা নিয়ে এখানে থাকা বেশ বিপজ্জনক বলেই মনে হয়। দিলীপ বললো মাধবের সাথে পরামর্শ করে, পরে এখানে আসা যাবে। আমি কিন্তু তাতে রাজি হলাম না। পাঁচটাই মাত্র খাটিয়া আছে। তার মধ্যে একটা নিশ্চই লালাজীর। বাকি রইলো চারটে। আমরা তিনজন আছি। এরমধ্যে কেউ এসে হাজির হলে, জায়গা পাওয়া যাবে না। তখন সারারাত বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকারে রাস্তায় বসে কাটাতে হবে।

আগে এসে খাটিয়া দখল করে, পরে অন্য চিন্তা করা যাবে। ঘরে ফিরে এসে দলা করে সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে, দোকানে  ফিরে চললাম। মাধবকে সন্দেহজনক লোকটার সম্বন্ধে সংক্ষেপে সব বললাম। দোকানে এসে তিনজনে তিনটে খাটিয়ায় সরাসরি উঠে বসে, লেপ-তোষক দিতে বললাম। পরপর তিনটে খাটিয়ায় আমরা তিনজন। আমার আর দিলীপের খাটিয়া দু’টোর মাথার দিকে, আর দু’টো খাটিয়া। স্থানাভাবে সবগুলো খাটিয়াই প্রায় গায়ে গায়ে লাগানো। লালাজী জানালেন, একটু পরেই লেপ তোষক বার করে দেবেন। বৃষ্টিটা বন্ধ হয়েছে। আমরা যে যার খাটিয়ায় চুপ করে বসে আছি। সন্দেহজনক লোকটি কিন্তু এখনও বসে আছেন, আর মাঝেমাঝেই আমাদের লক্ষ্য করছেন। ভুখি থেকে একসাথে যে যুবকটির সঙ্গে এতটা পথ হেঁটে আসলাম, তার থাকার ঘরটা যদিও এক মিনিটের পথ, তবু সে আর একবারও দেখা করতে এল না। ভেবে খুব আশ্চর্য লাগলো যে, যে লোকটা এতটা পথ একসঙ্গে এল, চায়ের দাম পর্যন্ত দিতে দিল না, সে আমাদের এই বিপদের সময়, একবারও দেখা করতেও এল না?

এতক্ষণে সন্দেহজনক লোকটি উঠে চলে গেলেন। আমরাও নিশ্চিন্ত হয়ে যে যার খাটিয়ায় শুয়ে, গল্পগুজব করতে লাগলাম। লালাজী জানালেন, খাটিয়া আর লেপ তোষকের ভাড়া, মাথাপিছু চার টাকা পঞ্চাশ পয়সা করে দিতে হবে। আজ রাতে আমরা যে জায়গায়, যে অবস্থায় এসে হাজির হয়েছি, তাতে চল্লিশ টাকা বললেও দিতে হবে। আকাশ একবারে পরিস্কার হয়ে, অসংখ্য তারা ফুটে গেছে। ঘরের খড়ের ছাদ দিয়েই নানা জায়গায় আকাশ দেখা যাচ্ছে। ভালো করে খুঁজলে হয়তো কালপুরুষ, সপ্তর্ষি মন্ডল-ও দেখা যেতে পারে। ভয় হলো, রাতে জোরে বৃষ্টি আসলে আমাদের কী অবস্থা হবে ভেবে। হাতে কোন কাজ নেই, সময় আর কাটে না। এক বান্ডিল বিড়ি নিয়ে, তিনজনে শেষ করতে বসলাম। কী করবো, কিছু একটা তো করা চাই। লালাজী একটা থালায়, লাল, সবুজ, হলদে, কালো, নানা রঙের মেশানো ডাল নিয়ে একবার করে ফুঁ দিচ্ছেন, আর দোকান ঘরে একরাশ ধুলো উড়ে যাচ্ছে। এর থেকেও অনেক খারাপ খাবার খাওয়ার অভ্যাস আমাদের হয়ে গেছে। তাছাড়া খিদেও পেয়েছে যথেষ্ট। তাই খাবার তৈরির আশায় বসে রইলাম।

সব শান্তির অবসান ঘটিয়ে, সেই সন্দেহজনক মক্কেল, আবার এসে হাজির হলেন। দিলীপ বললো ওর সাথে কথা বলে দেখলে হয়। আমরা বললাম, যেচে ওর সাথে আলাপ করার দরকার নেই। কিন্তু লোকটাকে দেখে মনে হলো, সে আমাদের সাথে কথা বলতেই চায়। তাই আমরাই প্রথম জিজ্ঞাসা করলাম— তিনি কোথায় থাকেন, কী করেন ইত্যাদি। লোকটি এবার এগিয়ে এসে আমাদের সামনে একটা খাটিয়ায় বসলেন। তাঁর কাছে জানতে পারলাম যে, তিনি এখানে ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। বাড়ি মিরাটে। বছরে দু’একবার এর বেশি বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না। এখানে ওয়্যারলেস কর্মীদের সাথে একই মেসে থাকেন। শীতকালে এখানকার অনেকেই বাড়ি চলে যায়। তখন এখানে তিনি প্রায় একাই থাকেন। একা একা তাঁর একদম ভালো লাগে না। কথাবার্তা শুনে বুঝলাম, লোকটি ভালো। একা একা থেকে, কথা বলার অভ্যাস কমে গেছে, সুযোগও নেই। আমাদের সাথে তিনি কথা বলতেই চাইছিলেন, তবে নিজে থেকে আগে কথা বলা ঠিক হবে কী না ভেবে, এতক্ষণ কোন কথা বলেন নি। ওঁর কাছ থেকে গত বছরের বন্যার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা শুনলাম।

গত বছর পাঁচই আগষ্ট রাত্রিবেলা, এই গাংগানীর কিছুটা আগে ডাবরানীর দিকে পাহাড়ের একটা চুড়া গঙ্গার ওপর ভেঙ্গে পড়ে। ওখানকার গঙ্গা খুব সরু, ফলে গঙ্গার জল চলাচল একবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকালে ওরা দেখে গাংগানীতে গঙ্গা একবারে শুকিয়ে গেছে। দু একটা ঝরনার জল, ও গঙ্গার যেটুকু জল লিক্ করে আসতে পারে, সেই জলই সামান্য ধারায় বয়ে যাচ্ছে। ঐ দিন, অর্থাৎ ছয় তারিখে প্রায় বিকেল নাগাদ, গঙ্গার জমে থাকা বিপুল জলের চাপে, ঐ ভেঙ্গে পড়া পাথরের একটা অংশ ঠেলে ভেঙ্গে ফেলে, প্রবল বেগে জল নীচের দিকে, অর্থাৎ গাংগানী, ভুখি, বা উত্তরকাশীর দিকে ধেয়ে আসে। বর্ষাকালের প্রায় বার-চোদ্দো ঘন্টার জমে থাকা জলের স্রোত, হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভীষণ আকার ধারণ করে সমস্ত শহর ভেঙ্গে, গুঁড়িয়ে দিয়ে বয়ে চলে যায়। এই গাংগানীতে, যেখানে আমরা এখন বসে আছি, তার অপর পারে দু’টো গেষ্ট হাউস, একটা আয়ুর্বেদিক কলেজ, একটা ইন্টার হাইস্কুল, কালীকমলির ধর্মশালা ও বেশ কয়েকটা হোটেল ছিল। এক কথায় ওটা একটা বেশ বড় পাহাড়ি শহর ছিল। এখন এই মুহুর্তে আমরা যে জায়গাটায় আছি, তার নাম গরমকুন্ড। গঙ্গার অপর পারটার নাম গাংগানী। এ দিকটায় খাড়া পাহাড়, অপর দিকে প্রায় গঙ্গার লেভেলেই ছিল গাংগানী শহর, বাস রাস্তা। ফলে গঙ্গার জল ঐ বিশাল পাথর ঠেলে যেতে না পেরে, ডানদিকে বেঁকে গাংগানীর ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে, সমস্ত শহরটাকে ভেঙ্গে নিয়ে যায়। আসবার সময় এত ঘটনা আমরা জানতাম না। তবে আমাদের বাড়ির কাছে যে ভদ্রলোক গঙ্গোত্রী যেতে না পেরে ফিরে এসেছিলেন, তাঁর কাছে এর অনেকটাই শুনে, আমরা ইউ.পি.টুরিজিম্ অফিসে জিজ্ঞাসা করে হাসির খোরাক হয়েছিলাম। দোষটা তাদের নয়, তারা এ খবর জানতো না বা জানবার চেষ্টাও করে নি। আসবার সময় দেখেছিলাম, একটা ছোট মন্দির ও একটা ভাঙ্গা বাড়ির দেওয়াল ছাড়া আর কিছুই ওদিকে নেই। ভদ্রলোক জানালেন, পাঁচজন টুরিষ্ট মারা যায়, তারা সবাই বাঙালি। স্থানীয় লোকেরা বিপদের আশঙ্কা করে আগেই বাড়িঘর, জিনিসপত্র ফেলে, ওপর দিকে পালিয়ে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে রক্ষা পায়। যাহোক্, ভদ্রলোক এবার মেসে ফেরার জন্য উঠলেন। আমরা ডাবরানী আর কতটা রাস্তা, রাস্তায় দোকান পাব কী না, ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করায়, ভদ্রলোক জানালেন ভুখি থেকে এই গাংগানী পাঁচ কিলোমিটার পথ। আবার এখান থেকে ডাবরানী আট কিলোমিটার পথ। পথে কোন দোকান পাওয়া যাবে না। রাস্তাও খুবই কষ্টকর। এবার ভদ্রলোক বাসায় ফিরে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, কোন ভয় নেই। আপনারা ঠিক ভালোভাবে পৌঁছে যাবেন, আমার শুভেচ্ছা রইলো। ফিরবার পথে অবশ্যই দেখা হবে।

এদিকে লালাজীর রান্নাও শেষ। পাশের কাপড় ছাড়ার ঘরটা থেকে, চেঁচামিচির আওয়াজ আসছে। শুনলাম একদল পুরুষ ও মহিলা ওখানে এসে উঠেছে। আগেভাগে এখানে এসে জায়গা নিয়েছি বলে, নিজেদেরকে এখন ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে। আমরা খাবার খেতে উঠতেই, লালাজী বললেন, ওখানে বসেই প্রেমসে খানা খাও। ডাল, ছোট ছোট আলুর তরকারি, যার অধিকাংশ আলুই শক্ত এবং পচা, আর শোনপ্রয়াগের দোকানের পদ্ধতিতে তৈরি একপিঠ পোড়া অপর পিঠ কাঁচা সেই উপাদেয় রুটি। আলুর তরকারিতে একটু করে মাখন দিয়ে নিয়ে, মৌজ করে খাওয়া শুরু করলাম। এরকম একটা জায়গায় এই পরিবেশে বিনা পরিশ্রমে খাটিয়ায় বসে এই খাবার পেয়ে, লালাজীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আর সত্যি কথা বলতে, কী ভালোই যে লাগলো, মনে হলো অমৃত খাচ্ছি। জানিনা একেই “খিদে পেলে বাঘে ধান খায়” বলে কী না। অসুস্থ মাধব তিনটে রুটি মেরে দিল। এখানকার মতো বড় বড় রুটি না হলেও, আমি বোধহয় খান ছয়-সাত উদরস্থ করে ফেললাম। আমরা দোকানের বাইরে একটু দাঁড়িয়ে, আকাশে অসংখ্য তারার মেলা ও নীচে গঙ্গার গর্জন, উপভোগ করে, খাটিয়ায় ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম। এর কাছে দিল্লীর লালকেল্লার “লাইট অ্যান্ড্ সাউন্ড্” ও তুচ্ছ মনে হলো। আকাশে একসাথে এত তারা আগে কখনও কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না। চারপাশে যে কী অন্ধকার বলে বোঝানো যাবে না। মনে হচ্ছে দরজা জানালা হীন একটা ঘরে, অমাবস্যার রাতে, আলো না জ্বেলে, আমরা শুয়ে আছি। মাধবের মানিব্যাগ, আমার মানিব্যাগ ও বিস্কুটের প্যাকেটটা আমার পিঠের তলায়, তোষকের ওপর রেখে, লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। উচু হয়ে থাকায় শুতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। লেপ-তোষকের সাদা রঙ বোধহয় বাইরের অন্ধকারের কালো রঙকেও হার মানাবে। তেমনি তার সুগন্ধ। ঘুম আসছে না। একটু পরেই নতুন বিপদ এসে হাজির হলো। অসংখ্য ছাড়পোকার মতো এক রকম পোকা, সর্বাঙ্গ জ্বালিয়ে দিল। লালাজী আশ্বাস দিয়ে জানালেন, ও কিছু না, পিসু আছে। তাঁর বলার ধরণ দেখে মনে হলো বাস্তু সাপের মতো, এগুলো বাস্তু পিসু। এগুলোকে একপ্রকার রক্তচোষা উকুন বলা যায়। হাওড়া-কলকাতায় এ জাতীয় এক প্রকার ছোট্ট, অতি পাতলা পোকাকে, চামউকুন বলতে শুনেছি। এরা লোমকূপে আটকে থেকে রক্ত চুষে খায়। নখ দিয়ে খুঁটেও এদের লোমকূপ থেকে তুলে ফেলা যায় না। লালাজীর মুখে পিসুর কথা শুনে মনে হচ্ছে পাহাড়ি চামউকুনের খপ্পরে পড়েছি। রাতদুপুরে খাটিয়ায় উঠে বসে খস্ খস্ করে সারা শরীর চুলকাতে শুরু করলাম। এর আবার আর একটা অন্য যন্ত্রণাও আছে। গলা, কান, মুখ বা দেহের অন্য কোন অংশের চামড়ার ওপর দিয়ে এরা হেঁটে যাবার সময় একটা অস্বস্তি হয়। হাতের তেলো দিয়ে ঘষে ফেলে দেবার চেষ্টা করলে, এরা হাঁটা বন্ধ করে দেয়। মনে হবে শরীর থেকে পড়ে গেছে বা মরে গেছে। কিন্তু একটু পরেই আবার সেই পুরানো জায়গা থেকেই শরীর ভ্রমন শুরু করে। আমরা যেমন মাংস কেনার সময়, নিজের নিজের পছন্দ মতো খাসির শরীরের অংশ দিতে বলি, মনে হয় এরাও বোধহয় নিজেদের পছন্দের লোমকূপ খুঁজতে মানুষের শরীরে হেঁটে বেড়ায়। মাধব ও দিলীপ ঘুমিয়ে পড়েছে। হতভাগ্য আমি একা জেগে বসে গা, হাত, পা চুলকে যাচ্ছি। বন্ধুদের দেখে মন হচ্ছে, ওরা মহানন্দে ঘুমচ্ছে। মনে হয় পিসুদের আমায় বেশি পছন্দ হয়েছে। এইভাবে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা, হঠাৎ মনে হলো আমার মাথাটা কে যেন কিছু দিয়ে খুব জোরে ঘষে দিল। ধরমর্ করে উঠে বসে দেখি, আমার মাথার কাছের খাটিয়াটায় কখন একজন এসে রাতের আশ্রয় নিয়েছে। তার মাথাটা আমার মাথার সাথে ঘুমের ঘোরে ঐ ভাবে ঘষে গেছে। ঘুম মাথায় উঠলো। নতুন করে আবার গা চুলকাবার পালা শুরু হলো। লোকটাকে মনে মনে অভিশাপ দিয়ে ঘুমবার চেষ্টা করলাম। ঘরের ছাদের ফাঁক দিয়ে একটা জ্বলজ্বলে তারাকে পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি। ওটা শুকতারা না মঙ্গল গ্রহ ভাবতে বসলাম। মাধব ও দিলীপ ঐ নোংরা লেপই মাথা পর্যন্ত ঢাকা দিয়ে দিব্যি ঘুমচ্ছে। আমার পেটটা আবার কেমন ব্যথা ব্যথা করতে শুরু করলো। একবার বাইরে যেতে পারলে হতো। আসবার সময় জায়গাটা ভালোভাবে দেখবার সুযোগ হয় নি। টর্চ সঙ্গে থাকলেও, অন্ধকারে একা একা কোথায় যাব ভেবে পেলাম না। একবার ভাবলাম মাধবকে ডাকি, তারপর ওকে আর বিরক্ত না করে চুপচাপ শুয়ে থাকলাম।

আজ আটাশে আগষ্ট। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, এক কাপ চা পর্যন্ত না খেয়ে, লালাজীকে থাকা খাওয়া বাবদ তেইশ টাকা পঞ্চান্ন পয়সা মিটিয়ে দিয়ে, ব্যাগ নিয়ে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বাঁ হাতে রাস্তা। একটু ওপরে উঠে রাস্তায় পড়লাম। তিনজনে লাইন দিয়ে এক কাঁধে ব্যাগ, এক কাঁধে ওয়াটার বটল্ নিয়ে, লাঠি হাতে আস্তে আস্তে হেঁটে চললাম। সামান্য কিছু রাস্তা হাঁটার পরই, রাস্তার ডানপাশে একটা ঝরনা পাওয়া গেল। মাধব ও দিলীপকে বললাম, রাস্তায় আর ঝরনা পাওয়া যাবে কী না জানি না। কাজেই এখানেই সকালের কাজটা সেরে ফেলার ব্যবস্থা করা যাক। রাস্তা একবারে ফাঁকা। তিনজনে সমস্ত জিনিসপত্র একপাশে রেখে, প্যান্ট, জুতো খুলে পছন্দ মতো তিন জায়গায় বসে পড়লাম। আহা কী সুবিধা, ভাবাই যায় না। আবার তৈরি হয়ে নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু মস্ত বড় একটা ভুল করলাম, ওয়াটার বটলগুলোয় জল না ভরে নিয়ে। অনেকটা রাস্তা পার হয়ে এসেও, সত্যিই কোন ঝরনার দেখা পেলাম না। অথচ আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল, ঝরনা নাও পাওয়া যেতে পারে। তার ওপর এরকম রাস্তার কথা স্বপ্নেও ভাবি নি। বোধহয় ৬৫-৭০ ডিগ্রী অ্যাংগেলে রাস্তা সোজা ওপর দিকে উঠেছে। মাঝে মাঝে স্থানীয় লোকেরা বেশ দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে। আমাদের কিন্তু এর মধ্যেই দম বেরিয়ে যাবার উপক্রম। এখনও পর্যন্ত এত কষ্টকর রাস্তায় কখনও হাঁটতে হয় নি। স্থানীয় লোকেদের কাছে শুনেছিলাম, গাংগানী পর্যন্ত বাস রাস্তা হয়তো সামনের বছরেই তৈরি হয়ে যাবে, কিন্তু গাংগানী থেকে ডাবরানী বা ডাবরানী থেকে লঙ্কা পর্যন্ত রাস্তা কবে হবে, বলা খুব মুশকিল। ভুখি থেকে হেঁটে আসার সময় দেখলাম গাংগানী পর্যন্ত রাস্তা তৈরির কাজও হচ্ছে। নদীর ওপার দিয়েই রাস্তা ছিল। কিন্তু এখন আর ওপারের পুরাতন রাস্তা মেরামত করা সম্ভব নয়। নতুন করে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা সম্ভব কী না জানিনা। নদীর এপার দিয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করলেও, যে রাস্তা দিয়ে আমরা এখন হাঁটছি, সেটা কোন কাজে আসবে বলে মনে হয় না। কারণ, একে এটা একবারে কাঁচা পাহাড়, তার ওপর এ যা রাস্তা, এ রাস্তায় জীপও উঠতে পারবে বলে মনে হয় না। যাহোক্, এক সময় আমাদের ওপরে ওঠার পালা শেষ হলো। এবার ঠিক আগের মতো ৬০-৬৫ ডিগ্রী অ্যাংগেলে, রাস্তা নীচে নামতে শুরু করলো। রাস্তার পাশ দিয়ে ওয়্যারলেস্ বা টেলিগ্রাফের তার গেছে। নীচে, অনেক নীচে ভয়ঙ্কর রূপিণী রূপালি গঙ্গা, আপন খেয়ালে নেচে নেচে বয়ে চলেছে। পায়ের আঙ্গুলের ওপর চাপ দিয়ে ব্রেক কষার মতো করে নীচে নামার গতি রোধ করে করে, আমরা এগিয়ে চললাম। নীচে নামার সময় আমার কোন কষ্ট হয় না, তাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। মাধবের আবার ঠিক উল্টো। ওপরে ওঠার সময় ওর বিশেষ কোন কষ্ট হয় না। কিন্তু এবার এই ভাবে নীচে নামতে, ওর বেশ কষ্ট হচ্ছে। এইভাবে একভাবে নীচে নামতে নামতে, আমরা একবারে নীচে, প্রায় গঙ্গার কাছাকাছি নেমে এসে দেখলাম, রাস্তা আবার ঐ আগের মতো একই ভাবে, ওপরে উঠতে শুরু করলো। কোথাও কোন গ্রাম, দোকান, এমন কী লোকজনও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে পাশ দিয়ে মালবোঝাই দু’একটা খচ্চর যাতয়াত করছে। হাঁটতে যে কী কষ্ট হচ্ছে বোঝাতে পারবো না। আমরা রাস্তার ধারে বিশ্রাম নিতে বসলাম।

মাধব জানালো, তার ভীষণ জল পিপাসা পেয়েছে। এগিয়ে গিয়ে ঝরনার অনেক খোঁজ করলাম, কিন্তু কোথাও কোন ঝরনা বা জলের সন্ধান করতে পারলাম না। গঙ্গার জল ঘোলাটে, তবু সে জলও যে একটু নিয়ে আসবো, তারও উপায় নেই। ওখানে নামা আমাদের কর্ম নয়। ওখানে নামার চেষ্টা করা সুইসাইডের নামান্তর। রাস্তার একপাশে পাথরে বসে তিনজনে আমসত্ব চুষে, লজেন্স্ খেয়ে, জল পিপাসা কমাতে ও বিশ্রাম নিতে লাগলাম। কিন্তু এর পরেও মাধব জানালো, একটু জল না পেলে, ওর পক্ষে আর এক পাও হাঁটা সম্ভব নয়। বললাম এখানে বসে থাকলেও তো জল পিপাসা কমবে না। কাজেই বাঁচতে গেলে কষ্ট হলেও এগিয়ে যেতে হবে। রাস্তায় জল পাওয়া গেলেও যেতে পারে, কিন্তু এখানে সে সম্ভাবনা মোটেই নেই। আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। মধ্যে মধ্যে জলের আওয়াজ কানে আসছে বলে মনে হচ্ছে। খুব আশা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বুঝতে পারছি ভুল শুনেছিলাম। কী রাস্তারে বাবা, আট কিলোমিটার পথে একটাও ঝরনা বা জলের দেখা নেই। আমরা যেন এক হিমালয়ান ডেজার্টের ওপর দিয়ে হাঁটছি। মরীচিকা তো দেখার ভুল বলেই জানতাম, শোনার ভুলের মরীচিকাও হয় বলে তো কখনও শুনি নি। এক জায়গায় গঙ্গা দেখলাম বেশ চওড়া, এবং আমাদের হাওড়া-কলকাতার গঙ্গার থেকেও স্রোতোহীন। কী ব্যাপার বুঝলাম না। হয়তো এখানে গঙ্গায় বড় বড় পাথর পড়ে নেই বলে, স্রোতোহীন। রাস্তার পাশে কোথাও কোথাও, বড় বড় পাথরের গায়ে সাদা রঙ করে, আলকাতরা দিয়ে কত রাস্তা বাকি আছে লেখা আছে। এগুলোই এপথের মাইলস্টোন। এবার রাস্তার পাশে একটা ঝরনার দেখা মিললো। মনে হচ্ছে আমরা প্রায় এসে গেছি। আর ভালোও লাগছে না। এতবড় রাস্তার শুরুতে আর শেষে দু’টো ঝরনা, আর এই কষ্টকর রাস্তা। তবু ভুললে চলবে কেন-“সব ভালো যার শেষ ভালো”। মাধব তো ঝরনা দেখে প্রায় লাফিয়েই উঠলো। পারলে ছুটে গিয়ে সব জল খেয়ে নিতে চায়। ওকে ঝরনার জল খুব বেশি না খেয়ে, শুধু গলা ভেজাতে বললাম। যদিও বাড়ি থেকে আসার সময় ভেবে এসেছিলাম, কোথাও ঝরনার জল খাব না। প্রয়োজনে খেতে হলে জিওলিন মিশিয়ে খাব। কিন্তু বাস্তবে একটু পরিস্কার ভাবে জল তোলা যায়, এমন জল দেখলেই, আমরা দু’হাত ভরে জল নিয়ে পান করেছি। জিওলিনের কথা মনেও আসে নি। তবু মাধবের শরীরটা তো ভালো নয়, ওষুধ খেয়ে পথ চলছে। এখানে আমরাও অল্প অল্প জল খেলাম। জল ভর্তি কাঠি, খড়কুটো। এবার কষ্টের পরিমান অনেকটাই লাঘব হলো। একটু এগিয়ে একটা ব্রিজ দেখলাম গঙ্গার মাঝখানে কাত হয়ে পড়ে আছে। সম্ভবত বন্যার সময় ওটা জলের তোড়ে ভেঙ্গে পড়েছিল। গঙ্গা এখানে এখন এত চওড়া হয়ে গেছে যে, যে ব্রিজ আগে গঙ্গার ওপর এপার-ওপার করার জন্য ব্যবহৃত হতো, সেই ব্রিজ এখন নদীর মাঝখানে পড়ে আছে। ব্রিজের দু’দিকেই অনেকটা দুরে ডাঙ্গা। যাহোক্, রাস্তা এবার ভীষণ ভাবে নীচের দিকে নামতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে রাস্তা যেন রুপো দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। লাঠির ওপর ভর দিয়ে হাঁটলে কষ্ট অনেক কম হচ্ছে। পাথর ফেলা রাস্তা। এদিকে বোধহয় অভ্র থাকতে পারে। মনে হচ্ছে রাস্তা যেন অভ্রের পাত দিয়ে মোড়া। এতটা রাস্তার কোথাও একটু সূর্যের আলো পড়ে না। ফলে স্যাঁতস্যেঁতে, ভিজে ও বিপজ্জনক রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। বড় বড় গাছের জন্যই কোথাও একটু সূর্যালোক পড়ে না। মাইলস্টোন অনুযায়ী, আর সামান্যই পথ বাকি আছে। অবশ্য যদি না এখানেও ত্রিযুগীনারায়ণের মতো রাস্তার মাপ হিসাব করা হয়ে থাকে। যতদুর দৃষ্টি যায়, কোথাও কিন্তু পাকা রাস্তা, বাস, দোকানপাট, বা লোকজন চোখে পড়ছে না। এতটা পথ আসলাম, একবারে লালাজীর দোকানের একটু ওপরে সামান্য রাস্তা হেঁটে একটা চায়ের দোকান ছাড়া, সত্যিই আর কোন দোকানও নেই। এবার সামনে একটা ব্র্রিজ চোখে  পড়লো। গাংগানী থেকে গরমকুন্ড আসার জন্য যেমন পোর্টেবল্ ব্রিজ পার হতে হয়েছিল, সেরকমই একটা ব্রিজ। এই ব্রিজ পার হয়ে আমরা আবার গঙ্গার ওপারে, বাস রাস্তায় এসে উঠলাম। গাংগানী থেকে ডাবরানী, এই আট কিলোমিটার পথ, গঙ্গার ওপার দিয়ে হাঁটতে হয়। অর্থাৎ এই দু’টো জায়গার মধ্যে পুরাতন বাস রাস্তার অবস্থা গত বৎসরের ঘটনায় এমন হয় যে, বাস তো দুরের কথা, হেঁটেও যাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে এই নতুন রাস্তা দিয়েই হেঁটে আসতে হয়। আর সত্যিই এটা একেবারেই স্থানীয় লোকেদের হাঁটার পথই বটে। ব্রিজটা পার হয়ে, রাস্তা ধরে একটু এগিয়েই দেখলাম একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। লঙ্কা যাবে কী না জিজ্ঞাসা করায় উত্তর পেলাম, আরও এগিয়ে গেলে বাস পাওয়া যাবে। কথাটা শুনে মনে হলো আমরা লঙ্কা প্রায় পৌঁছেই গেছি।

ব্রিজটার কাছে একটা গাছের তলায় একটা চায়ের দোকান। ঐ দোকানে একজন সাধু গোছের লোককে দেখলাম। একে গতকাল গাংগানীতে দেখেছিলাম। গরমকুন্ডে রান্নাবান্না করতেও দেখেছিলাম। আর একটু এগিয়েই একটা আধা শহর দেখলাম। গোটা তিনেক বাস দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে এখন সোয়া দশটা বাজে। কোন বাস যাবে জিজ্ঞাসা করে বাস নাম্বার জেনে নিয়ে, বাসে উঠে জায়গা দখল করলাম। এই প্রথম দেখলাম ড্রাইভারের একটু পিছনে, গ্রীলের পার্টিশন দিয়ে প্রথম শ্রেণী। পিছনে চারটে লম্বা রো। এগুলো দ্বিতীয় শ্রেণী। ভাড়া হয়তো কিছু কম। প্রথম শ্রেণীতে একটা লম্বা বড় সিট্, ও ড্রাইভারের পাশে দু’জনের বসার সিট্। নীচে এসে দেখলাম দু’পাশে কয়েকটা দোকান আছে। কিন্তু কোন খাবার দোকান দেখলাম না। সকাল থেকে এক কাপ চা পর্যন্ত পেটে পড়ে নি। কাল রাতে ছয়-সাত খানা কাঁচা রুটি খাওয়া বোধহয় ঠিক হয় নি। শরীরটায় খুব জুৎ নেই। এ রাস্তায় পেট খারাপ হওয়া খুব বিপজ্জনক। তার ওপর আবার এখন যাচ্ছি সব থেকে বিপদ সঙ্কুল স্থানে। লোকে বলে গোমুখী গেলে মানুষ নাকি আর ফিরে আসে না। ওখানে পৌঁছে ফিরে আসতে না পারলে দুঃখ নেই, কিন্তু ওখানে পৌঁছনোর আগেই কোন বিপদ ঘটলে, মৃত্যুটা বড়ই দুঃখজনক ও লজ্জাকর হবে। তাই ঠিক করলাম দুপুরে কিছু খাব না। একটু পকোড়া ও এক কাপ চা খেয়ে এসে, বাসে বসলাম। মনে মনে বেশ একটা আনন্দ অনুভব করছি। লঙ্কা যাবার বাস যখন পেয়ে গেছি, তখন গঙ্গোত্রী, গোমুখ পৌঁছেই গেছি বলা যায়। ক্রমে ক্রমে বেলা প্রায় বারটা বাজলো। পিছনের দ্বিতীয় শ্রেণীর সিটে সেই সাধু গোছের লোকটা এসে উঠেছে। আরও উঠেছে একজন গেরুয়া রঙের ধুতি পাঞ্জাবি পরা সাধু, তার একজন বাচ্চা শিষ্য ও বছর ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের একজন চেলা। মাধব ও দিলীপ ভাত রুটি যা পায়, খেতে গেল। আমি লম্বা সিটটায় চুপচাপ্ শুয়ে থাকলাম। পিছন থেকে গেরুয়াধারীর মাহাত্ম্য, তার নিজের মুখেই শুনছি। ভীষণ বিরক্ত লাগছে। নিজেকে সে মহাত্মা বলে সম্বোধন করছে। অপর সাধু গোছের লোকটা, যাকে আগে গাংগানীতেও দেখেছি, তার কথায় সায় দিচ্ছে বটে, তবে বেশ বোঝা যাচ্ছে, সে গেরুয়াধারীর একটা কথাও বিশ্বাস করছে না। শুয়ে শুয়েই শুনলাম, সাধু গোছের লোকটা গঙ্গোত্রী থেকে ফিরে যমুনোত্রী যাবে। আমি তার কাছে যমুনোত্রী সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়ে বুঝলাম, তার ঐ পথ সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। মাধব ও দিলীপ ফিরে এসেছে। ওরা ভাত, ডাল ও তরকারি খেয়ে এসেছে। ওরাও শুয়ে, বসে বিশ্রাম নিতে লাগলো। গেরুয়াধারীর কথার ফুলঝুড়ি যেন বেড়েছে। সে সাধু গোছের লোকটাকে বোঝাচ্ছে যে, সে জহরলাল নেহেরুকে বলেছিল যে, সে একটা অপদার্থ। তার দ্বারা দেশ চালানো সম্ভব নয়। শুনে শুনে আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। আমি ও দিলীপ তাকে একটু উস্কে দিতেই, সে জানালো যে, সে ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিল, “ইন্দিরা তোর দ্বারা দেশের কোন ভালো কাজ হবে না। তুই যা করছিস, তাতে তোর বিপদ হবে”। যা বুঝলাম, সে সুভাষ, গান্ধী, জহরলাল, সবাইকেই ভালোভাবে চিনতো, এবং সবার সাথেই “তুই তোকারি” সম্পর্ক ছিল। ভাবছিলাম, এবার কেনেডি, কার্টার বা ব্রেজনেভকে কী কী বলেছিল তার ফিরিস্তি দেবে। সে জানালো যে, সে একবার ধ্যানে বসে জানতে পারে যে, তার মা প্রায় মৃত্যু শয্যায়। তার মা’কে সাপে কেটেছে। ধ্যানে সে তার মা’কে বাঁচাবার জন্য দেবতাদের স্মরণ নেয়। মা বেঁচেছিল কী না জানবার আর আগ্রহ নেই। এই মুহুর্তে কখন বাস ছাড়বে, সেটা জানার আগ্রহ আমার অনেক বেশি। তবু মনে হলো ওর মা’কে সাপে না কেটে, যদি ওকে কাটতো, তাহলে ওর মা এবং আমরা, উভয়পক্ষই শান্তি পেতাম।

শুয়ে বসে কোমরে বাত ধরার উপক্রম। বাস থেকে নেমে খোঁজ নিতে গেলাম। এবার জানা গেল, গতকাল কোন বাস লঙ্কা যায় নি। এখানে বাসের তেল ভুখি থেকে খচ্চরের পিঠে বয়ে আনতে হয়। একটা খচ্চর এক ব্যারেলও তেল আনে না। তার জন্য ভাড়া দিতে হয়, চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা। তাছাড়া উত্তরকাশী থেকে ভুখি পর্যন্ত তেল বয়ে আনতেও বাস খরচ অনেক লেগে যায়। কাজেই পঁচিশ-ত্রিশজন প্যাসেঞ্জার না হলে বাস ছাড়বে না। গতকালও এই একই কারণে কোন বাস ছাড়ে নি। একজন আবার বললো, গভর্নমেন্টের আদেশ অনুযায়ী, প্যাসেঞ্জার না হলেও, রোজ একটা অন্তত বাস ছাড়ার কথা। শুনে একটু আশার আলো দেখলাম। কোন কথাটা যে সত্যি আর কোন কথাটা যে মিথ্যে, বোঝার উপায় নেই। আরও শুনলাম লঙ্কা পর্যন্ত জীপ যায়। কিন্তু কোথাও কোন জীপের চিহ্ন দেখলাম না। আবার বাসে এসে বসলাম। একটু পরে লঙ্কা থেকে প্যাসেঞ্জার নিয়ে সত্যিই একটা জীপ এল। এবার জানা গেল অন্তত ছয়জন প্যাসেঞ্জার না হলে, জীপ যাবে না। ভাড়া মাথাপিছু কুড়ি টাকা। বাসে ভাড়া নেয় দশ টাকা মতো। ইতিমধ্যে বাসে একজন যুবক এসে উঠেছে, যাবে হরশীল। দেখে মনে হলো, সে এখানকার লোক নয়। প্যাসেঞ্জারের আশায় পথ চেয়ে বসে থাকা ছাড়া, আর কোন কাজও নেই। এবার আমার বেশ খিদে পাচ্ছে। মাধবকে নিয়ে গেলাম কিছু খাবারের সন্ধানে। ভাবলাম কিছু বিস্কুট আর চা খেয়ে নেব। কোন দোকানে বিস্কুট পেলাম না। কিন্তু সব দোকানেই অনেক রকম গায়ে মাখার সাবান আছে। এত সাবান এখানে কে মাখে জানি না। অনেক নীচে সমতল এলাকায়, গোটাকতক মিলিটারি ক্যাম্প্। রাস্তার পাশে একটা কল থেকে অবিরাম জল পড়ে যাচ্ছে। শেষে একটা দোকানে বিস্কুটের প্যাকেট পাওয়া গেল। গ্লুকোজ বিস্কুট। প্যাকেটটা খুলতেই অর্ধেক বিস্কুট গুঁড়ো হয়ে পড়ে গেল। কত সালে এই প্যাকেটটা তৈরি হয়েছিল ভগবান জানেন। বাসের সেই মহাত্মা গেরুয়াধারী জানলেও জানতে পারে। উপায় নেই, তাই খেয়ে নিলাম।

এইভাবে বেলা তিনটে বেজে গেল। ঠিক করলাম আর অপেক্ষা না করে, জীপেই যাব। বাসের সেই নবাগত যুবকটি খুব আগ্রহ প্রকাশ করলো। বাসে গিয়ে সাধু গোছের লোকটাকে, গেরুয়াধারী সাধু ও তার দু’টো চেলাকে জীপে যাবার কথা বললাম। ওরা পরিস্কার জানালো এত ভাড়া দিয়ে তারা জীপে যাবে না। বললাম বাস কবে ছাড়বে তার ঠিক নেই। ওরা জানালো, ওদেরও কোন তাড়াহুড়া নেই, এখানেই দু’টো চাল ডাল সেদ্ধ করে খেয়ে থেকে যাবে। রাগ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রকাশ করলে চলবে না। কারণ ওরা না গেলে কিছুতেই ছ’জন খদ্দের হচ্ছে না। বললাম এখানে বাসে থাকতে দেওয়া হয় না, রাতে কোথাও থাকতেও তো পাঁচ-সাত টাকা খরচ হবে। তাছাড়া কবে বাস যাবে, তারও তো কোন ঠিক নেই। তাই রোজ থাকা খাওয়া বাবদ এত টাকা খরচ করার থেকে, দশটা টাকা বেশি দিয়ে জীপে চলে যাওয়াই লাভজনক। কিন্তু ভবি ভুলবার নয়, ওরা কিছুতেই রাজি হলো না। এইভাবে প্রায় সাড়ে তিনটে পর্যন্ত খদ্দেরের আশায় কাটালাম। গতকাল ও আজ, দু’দিনে মোট আটজন প্যাসেঞ্জার জুটেছে। কাজেই পঁচিশ-ত্রিশজন যাত্রী যোগাড় হতে কতদিন লাগতে পারে হিসাব করে, মনস্থির করলাম যেভাবে হোক জীপে যাবই। শেষ পর্যন্ত অনেক বোঝাবার পরে, সাধু যুগল ও চেলাদ্বয়, জীপে যেতে রাজি হলো। সামনে ড্রাইভারের পাশে জায়গা নিয়ে বসলাম। আমার পাশে আর একটা বাচ্চা ছেলে কোথা থেকে এসে আসন দখল করলো বুঝলাম না। তারপাশে, দরজার ধারে, যুবকটি বসলো। পিছনে মাধব, দিলীপ, দুই সাধু ও দুই চেলা। অবশেষে সব অশান্তির সমাপ্তি ঘটিয়ে, জীপ ছেড়ে দিল। ও মা, এবার দেখি এদিক ওদিক থেকে দু’একজন এসে জীপের পেছনে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। রাস্তায় অসংখ্য গিরগিটি এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। এখানে ওদের এত আধিপত্য কেন বুঝলাম না। রাস্তার ওপর অনেকগুলো আবার জীপ বা মিলিটারি ট্রাক চাপা পড়ে মরেও গেছে। আমরা মিলিটারি ট্রাকে অনুরোধ করে লঙ্কা যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু ওরা সাধারণ মানুষকে কখনও তাদের ট্রাকে জায়গা দেয় না জেনে, সে অনুরোধ আর করি নি। একপাল ছাগল, ভেড়া রাস্তায় চড়ে বেড়াচ্ছে। অনেক চেষ্টার পর তাদের সরিয়ে, জীপ আবার সামনে এগিয়ে চললো।

এইভাবে দেড় কিলোমিটার মতো পথ এসে, জীপের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। বন্যার আগে রাস্তা যখন স্বাভাবিক ছিল, তখন সমস্ত বাস ও জীপ উত্তরকাশী-লঙ্কা যাতায়াত করতো। উত্তরকাশীতেই গাড়িগুলোর সার্ভিসিং বা মেরামতের কাজ হতো। বন্যার সময় ডাবরানীর দিকে পাঁচটা বাস ও দু’টো জীপ ছিল। এগুলো আর রাস্তার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত উত্তরকাশী যেতে পারছে না। ফলে গাড়িগুলো তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমতো মেরামত করে নেয়। মিলিটারিদের সাথে এদের খুব সুসম্পর্ক, সেরকম বড় কোন অসুবিধা হলে, মিলিটারিরা তাদের কাজে যথেষ্ট সাহায্য করে। জীপ মেরামত করতে করতে, জীপের ড্রাইভার এ তথ্য জানালো। ওর কথাবার্তায় মনে হলো, সম্ভবত গাড়ি ও তেলই ওদের মধ্যে এত গভীর সুসম্পর্ক তৈরি করেছে। যাহোক্, ড্রাইভার ও যুবকটির চেষ্টায়, জীপ আবার সচল হয়ে অসংখ্য গিরগিটি ও ছাগল ভেড়াকে কাটিয়ে, নিজের রাস্তায় এগিয়ে চললো। পাশে গভীর খাদ। আরও দেড়-দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, জীপ আবার দেহ রাখলো। ডাবরানী থেকে লঙ্কা ঊনচল্লিশ কিলোমিটার পথ। তিন-চার কিলোমিটার পথ আসতেই, জীপ দু’-দু’বার খারাপ হলো। উলটো দিক থেকে একটা মিলিটারি ট্রাক এসে দাঁড়ালো। একজন মিলিটারি যুবক ট্রাক থেকে নেমে পড়তে, ট্রাকটা ডাবরানী চলে গেল। এই যুবকটির চেষ্টায় জীপ আবার প্রাণ ফিরে পেল। শুনলাম যুবকটি মিলিটারি ট্রাক চালায়। জীপ আবার এগিয়ে চললো। আমরাও খুব খুশি। আরও খানিকটা পথ পাড়ি দিয়ে, ডাবরানী থেকে সাত কিলোমিটার দুরে, আমাদের রথ আবার বিগড়ে গেল। আমরা জীপ থেকে রাস্তায় নেমে দাঁড়ালাম। জীপটাকে একবার পিছন দিকে, একবার সামনের দিকে ঠেলে অনেক চেষ্টা করেও, তার হৃতপিন্ড সচল করা গেল না। পাইপ দিয়ে তেল বার করে ড্রাইভার তার বুদ্ধি মতো অনেক চেষ্টা করলো। ফল কিছু হলো না। তখন আবার ঠেলে জীপের মুখ ডাবরানীর দিক করে, ঢালু রাস্তায় জীপ গড়িয়ে অনেকটা রাস্তা এসে বার বার স্টার্ট নেওয়ার চেষ্টা করেও, কোন সুফল পাওয়া গেল না। জীপেই মালপত্র,‌ টাকা পয়সা ছিল, আমরা হেঁটে হেঁটে জীপের কাছে এলাম। ড্রাইভার জানালো ফিল্টারে ময়লা জমেছে। সে ফিল্টার খুলে রাস্তায় বসে পরিস্কার করতে শুরু করলো। শক্ত একটা কাঠি দিয়ে খুঁটে খুঁটে, কফি রঙের জমাট বাঁধা পাথরের মতো শক্ত ময়লা বার করে, পেট্রল দিয়ে ধুয়ে ধুয়ে পরিস্কার করা হলো। যে পরিমান পেট্রল নষ্ট হলো, ভয় হচ্ছে যে জীপ চালু হলেও, তেলের অভাবে না ইঞ্জিন আবার বন্ধ হয়ে যায়। ড্রাইভার ও যুবকের চেষ্টায় ফিল্টারটা ঠিক জায়গায় লাগানো হলো। আমাদেরও হেল্পারের কাজ করতে হলো। কিন্তু এত কিছুর পরেও জীপ চালু করা সম্ভব হলো না। ড্রাইভার কিন্তু হাল ছেড়ে না দিয়ে, একটা পাইপ দিয়ে ট্যাঙ্ক থেকে আমাদের পেট্রল টানতে বললো। সম্ভবত সাইফন্ প্রক্রিয়ায় তেল বার করে কোন কাজ করবে। মুখ দিয়ে খুব জোরে টান দিতেই আমার মুখ, জামা, প্যান্ট পেট্রলে ভিজে গেল। ড্রাইভার আমায় সান্তনা দিয়ে বললো, পেট্রলে কাপড়ে দাগ পড়ে না। আর ভালো লাগছে না, হাল ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় বসে পড়লাম।

এতক্ষণ চুপ করে থেকে, গেরুয়াধারী আমায় বললো— “বাঙালিবাবু, যে সব কাজে তাড়াহুড়া করে, সে সফল হতে পারে না, পূর্ণতা অর্জন করতে পারে না”। বললাম, “তা হয়তো ঠিক, তবে যে চেষ্টা করে, সে পূর্ণতা অর্জন করলেও করতে পারে, কিন্তু যে বসে থাকে, তার ভাগ্যও বসে থাকে। তার পক্ষে কোনদিনই পূর্ণতা অর্জন সম্ভব নয়”। ড্রাইভার এখনও গাড়ি চালু করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। গেরুয়াধারী পকেট থেকে একটা ছোট বই বার করে পড়ার ভান করছে। মাঝেমাঝে কান, নাক, বুক, পেটে আঙ্গুল দিয়ে প্রণাম করছে। এদিকে ক্রমশঃ সন্ধ্যা নেমে আসছে, বুঝতে পারছি সামনে সমুহ বিপদ। গেরুয়াধারী এবার ড্রাইভারকে বললো, “আমি মহাত্মা, সব কাজ সময় মতো করতে হয়। যে কাজে মন দেয় না, সময় মতো কাজ করে না, তার কখনও উন্নতি হয় না”। এই মুহুর্তে এইসব জ্ঞানবাক্য অসহ্য মনে হচ্ছে, বিরক্ত লাগছে। ড্রাইভার বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে বললো, একটু  অপেক্ষা করুন, গাড়ি ঠিক হবেই। গেরুয়াধারী উত্তরে বললো, “এই জন্যই এই গাড়িতে আসতে চাইছিলাম না। বাঙালিরা বেশি চালাক, তাই নিজেরা এসে আমাদেরও বিপদে ফেললো। আমি মহাত্মা, আমি সব আগে থেকে বুঝতে পারি। কী বাঙালিরা, কতদুর পৌঁছলে? লঙ্কা পৌঁছে গেছ”। রাগে গা জ্বলে গেল। বললাম “তুমি শালা গরুখেকো মহাত্মা। তোমায় সঙ্গে নেওয়াটাই আমাদের চরম ভুল হয়েছে”। মাধব আমাকে এসব কথা বলতে বারণ করলো। ড্রাইভার এবার বেশ কড়া সুরে বললো, কথা না বলে একটু  চুপ করে বসুন। গাড়ি ঠিক হয়ে যাবে। গেরুয়াধারী কিন্তু চুপ করে থাকতে নারাজ। ফলে ড্রাইভারের কাজে অসুবিধা হচ্ছে। সে দম নিয়ে নতুন করে বলতে শুরু করলো, বাঙালিরা বেশি পন্ডিত হয়, তাই ফল পাচ্ছে। আমি আবার বললাম, “একবারে চুপ করে থাক্ শালা মহাত্মা”। বলিহারি মাধবের সহ্যশক্তি। চুপ করে বসে কাজ দেখছে। গেরুয়াধারী  আবার মুখ খুলতেই, দিলীপ হঠাৎ চূঊঊঊঊপ বলে চিৎকার করে ধমক দিতেই, ও কিরকম ঘাবড়ে গিয়ে মুখে কুলূপ এঁটে দিল। অবশেষে জীপ ড্রাইভার ঘোষণা করলো, জীপ আর যাবে না। যুবকটি আর সাধুরা ঠিক করলো, তারা শর্টকাট্ রাস্তায় হরশীলের দিকে হেঁটে যাবে। হরশীলের দুরত্ব কত তাও জানা নেই। তাছাড়া এই সন্ধ্যায় যাওয়া ঠিক হবে কী না, তাও বুঝতে পারছি না। যুবকটিকে জিজ্ঞাসা করলাম হরশীলে রাতে থাকা খাওয়ার জায়গা পাওয়া যাবে কী না। সে জানালো পাওয়া যেতে পারে। পাওয়া যাবেই কিন্তু বললো না। ড্রাইভারও সেরকম জোর দিয়ে কিছু বললো না। কী বিপদেই যে পড়লাম। ঠিক করলাম ডাবরানী ফিরে যাব। ওরা হরশীলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো।

ড্রাইভারকে বললাম, ডাবরানীর দিকে তো ঢালু পথ, জীপ গড়িয়ে নিয়ে চলো। সে জীপে উঠে বসলো। আমরা তিনজনে জীপ ঠেলতে শুরু করলাম। ঢালু রাস্তায় জীপ বেশ গতি নিলে, লাফিয়ে জীপে উঠে বসলাম। আবার চড়াই এর রাস্তা এলে, জিভ বার করে জীপ ঠেলতে শুরু করলাম। আবার উতরাই এর রাস্তায় এসে জীপ অসম্ভব গতিতে গড়াতে শুরু করলে, লাফিয়ে উঠে বসলাম। এইভাবে একবার ঠেলে, একবার দৌড়ে, একবার জীপে বসে আমরা পিছচ্ছি। লোকে শুনলে বলবে কী? সবাই গাড়ি নিয়ে এগোয়, আমরা পিছচ্ছি। এইভাবে একসময় অনেকটা রাস্তা উতরাই পাওয়া গেল। জীপ অসম্ভব গতিতে এগিয়ে চলেছে। অনবরত বাঁক। আমার একটাই চিন্তা, জীপে কোন হর্ণ নেই। উল্টোদিক থেকে মিলিটারি ট্রাক আসলে, চোখের নিমেষে খাদে চলে যাব। মাধবকে অফিসের কাজে গাড়ি করে অনেক ঘুরতে হয়। কাজেই ওর ধারণা থাকতে পারে ভেবে জিজ্ঞাসা করলাম, গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ থাকলে ব্রেক কাজ করে কী না। ও জানালো এ বিষয়ে ও নিশ্চিত যে, গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ থাকলেও ব্রেক কাজ করে। গলার ঝোলা ব্যাগ সিটে রেখে, জীপের বাইরে একটা পা ঝুলিয়ে, রেডি হয়ে বসলাম। প্রয়োজনে যাতে সহজেই লাফিয়ে নেমে পড়তে পারি। যাহোক্, কোন বিপদ না ঘটিয়ে জীপ রাস্তার একপাশে এসে দাঁড়ালো। ড্রাইভার বললো, জীপ আর যাবে না। এখান থেকে ডাবরানী প্রায় চার কিলোমিটার পথ। ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটতে শুরু করলাম। একসময় ডাবরানী ফেরৎ চলে এলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সারাদিনের নেট লাভ, অন্তত পাঁচজন যাত্রীকে হারানো। অর্থাৎ আমাদের তিনজনকে বাদ দিয়ে কাল আবার নতুন করে সতেরো থেকে বাইশজন নতুন যাত্রী যোগাড় করা।

ডাবরানীতে এসে একটা দোকানে বুদ্ধি সিং এর খোঁজ করলাম। যে ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বললেন আপনারা ঠিক জায়গায় এসেছেন। জিজ্ঞাসা করলাম— “আপনার নামই কী বুদ্ধি সিং”? তিনি জানালেন যে তিনি বুদ্ধি সিং নন্। বললাম আমরা উত্তরকাশী ট্রাভেলার্স লজে বুদ্ধি সিং এর নাম শুনে এসেছি। আজ রাতে আমাদের থাকার জন্য তিনটে খাটিয়া, লেপ, তোষক চাই। ভদ্রলোক যেন বিনয়ের অবতার। একগাল হেসে তিনি বললেন, আপনারা একটু কষ্ট করে বসুন। বুদ্ধি সিং এক্ষুণি এসে সব ব্যবস্থা করে দেবেন। একটু পরেই ভদ্রলোক সামনে একটা বড় তাঁবু দেখিয়ে বললেন, এখানে কষ্ট করে না বসে, আপনারা তাঁবুতে গিয়ে বিশ্রাম নিন। আমরা তাঁর কথা মতো তাঁবুর ভিতরে গিয়ে দেখলাম, দু’টো সারিতে পরপর অনেকগুলো খাটিয়া পাতা। আরও বেশ কয়েকটা দাঁড় করানো আছে। একদিকের রোতে পরপর দু’টো খাটিয়ায়, এক বয়স্ক স্বামী-স্ত্রী জায়গা নিয়েছেন। অপর দিকের রোতে পরপর তিনটে খাটিয়ায়, আমরা তিনজনে জায়গা দখল করে বসলাম। বুদ্ধি সিং এসে হাজির হলেন। আমরা তাঁকে উত্তর-কাশীর কথা বললাম। তিনি দু’হাত তুলে নমস্কার করে বেশ নতুন ধবধবে সাদা কভার লাগানো লেপ, তোষক বার করে দিলেন। এত আরামে এখানে থাকা যাবে স্বপ্নেও ভাবি নি। বুদ্ধি সিং বললেন নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করুন, কোন চিন্তা করবেন না। আমরা তাঁকে ব্যস্ত হতে বারণ করলাম। তিনি চলে গেলেন। অনেকটা জায়গা নিয়ে তাঁবুটা খাটানো হয়েছে। সুন্দর ভাবে কেটে দরজা-জানালাও করা হয়েছে। এ জায়গায় এটাকে রীতিমতো গ্র্যান্ড্ হোটেল বলা চলে।

আমরা নিজেদের খাটিয়ায় বসে অপর দিকের ঐ স্বামী-স্ত্রীর সাথে আলাপ করলাম। আজ লঙ্কা থেকে আমাদের দেখা যে অভিশপ্ত জীপটা এসেছে, ঐ জীপেই তাঁরা লঙ্কা থেকে এসেছেন। ভদ্রলোক জানালেন তিনি খুব অসুস্থ বোধ করছেন। পায়ের জুতো থেকে অনেকগুলো ফোস্কা হয়ে ঘা হয়ে গেছে। বললাম এক সাইজ বড় জুতো কেনা উচিৎ ছিল। জায়গাগুলো ভালো করে পরিস্কার করে, ওষুধ লাগাতে বললাম। ভদ্রলোক ওষুধ খেয়ে, ভালো করে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে, আমাদের সাথে গল্প শুরু করলেন। থাকেন বোম্বাই শহরে। ব্যবসা করেন। অমরনাথ হয়ে গঙ্গোত্রী গোমুখ গিয়েছিলেন। অমরনাথের আগেও অনেকগুলো জায়গা ঘুরে এসেছেন। যদিও সব জায়গায় ঘোড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। এখান থেকে যমুনোত্রী যাবেন। আরও অনেকগুলো জায়গা যাবার পরিকল্পনা আছে। তিনি জানালেন যে, তিনি বিয়াল্লিশ দিন হলো বাড়ি থেকে বেড়িয়েছেন। কথাবার্তায় বোঝা গেল ভদ্রলোক অগাধ পয়সার মালিক, তবে দেশ ভ্রমণের ইচ্ছাও যথেষ্ট। ভদ্রলোককে গঙ্গোত্রী, গোমুখের রাস্তাঘাট সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম। তিনি জানালেন, তিনি প্রথম দিনই এখান থেকে লঙ্কাগামী বাস পেয়েছিলেন। লঙ্কা থেকে গঙ্গোত্রীর জীপও পাওয়া যাবে। আমরাই বোধহয় ঘোর পাপী, তাই ওই রকম একজন সাধুসঙ্গেও কাজ হয় নি। ভদ্রলোক জানালেন, গোমুখ যেতে হলে, গঙ্গোত্রী পুলিশ স্টেশনে নাম, ঠিকানা ইত্যাদি লিখে, তবে যেতে দেওয়া হচ্ছে। একজন পান্ডার সাথে এক ভদ্রলোক গোমুখ গিয়েছিলেন। তাঁদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তা খুব কষ্টকর। ভূজবাসার লালবাবার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। ভদ্রলোক বললেন ওই রকম একজন মানুষ তিনি জীবনে কোনদিন দেখেন নি। অতিথিদের তিনি দেবতাজ্ঞান করেন। ভদ্রলোক বললেন, প্রথমে তিনি লালবাবার ওপর ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলেন। অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে তাঁরা লালবাবার আশ্রমে পৌঁছলে, লালবাবা তাঁদের অনেকটা করে চা খেতে দেন। তাঁরা কোনদিন চা পান করেন না, তাই তাঁরা চা খেতে রাজি হন নি। কিন্তু লালবাবা তাঁদের বলেন, চা খেলে শরীর ভালো থাকবে। তাঁরা এরপরও চা খেতে অস্বীকার করলে, লালবাবা তাঁদের বলেন, এখানে এসে চা পান না করলে, এখানে তাঁদের থাকতে দেওয়া হবে না। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁরা চা পান করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের ক্লান্তি দুর হয়ে যায়, এবং বেশ সুস্থও বোধ করেন। লালবাবা তাঁদের বলেন এত কষ্ট করে এখানে আসার পর গরম চা পান করলে, শরীর অনেক সুস্থ হয়ে যায়। তাই তাঁদের জোর করে চা পান করানো হলো। রাতে তাঁদের অনেকগুলো রুটি খেতে দেওয়া হয়। তাঁরা রুটি কমিয়ে দিতে বললেও, রুটি কমিয়ে নেওয়া হয় নি। ওখানে অত কষ্ট করে অত মূল্যবান খাবার নিয়ে যাওয়া হয়, তার জন্য কোন দাম পর্যন্ত নেওয়া হয় না। ফলে তাঁরা রুটি ফেলে দিতেও পারছেন না। ওখানে ভীষণ ঠান্ডা, তাঁর স্ত্রী লালবাবাকে জিজ্ঞাসা করেন, রাতে ক’টা কম্বল পাওয়া যাবে। উত্তরে তিনি বলেন, যতগুলো রুটি খাবে, ঠিক ততগুলো কম্বল। বাধ্য হয়ে ইচ্ছা না থাকলেও তাঁরা চার-পাঁচটা করে রুটি খেয়ে নেন। রাতে কিন্তু তিনি অনেকগুলো করে কম্বল, পেতে শোবার ও গায়ে দেবার জন্য দিয়ে বলেছিলেন, “এখানে আসার পর বেশিরভাগ যাত্রীই পথশ্রমে রাত্রে না খেয়ে শুয়ে পড়তে চান। এখানে খালিপেটে এতবড় রাত কাটালে শরীর খারাপ হবেই, তাই তাঁকে ভয় দেখিয়ে খাবার নিয়ে জোর করতেই হয়”। তীর্থযাত্রীদের সুস্থ রাখার জন্য তিনি সব সময় চিন্তা করেন। তিনি ওখানে একজনের কাছে শুনেছেন যে, খুব বেশি পায়ে ব্যথা হলে, তাকে সুস্থ করার জন্য তিনি নাকি পা পর্যন্ত টিপে দেন। যাহোক্, এবার ভদ্রলোক আমাদের পরামর্শ দিলেন যে, আমরা যেন ওখানে পৌঁছেই তাঁকে জানাই যে আমরা খেয়ে এসেছি এবং শরীরও ভালো নয়, কাজেই খুব অল্প করে খাব। খেতে বসে শরীর খারাপ বললে তিনি বিশ্বাস করবেন না। এত কথা শুনে তাঁকে খুব দেখবার ইচ্ছাও হলো। দিলীপ ও মাধব তাঁকে জিজ্ঞাসা করলো, ভূজবাসা থেকে গোমুখ যাবার জন্য গাইড নিতে হবে কী না। আমি বললাম, দু’বৎসর আগে আমার পরিচিত একজন গোমুখ গিয়েছিল, সে বলেছে গাইড নেবার প্রয়োজন হয় না। ভদ্রলোকও বললেন, শেষ আধ মাইল কোন রাস্তা নেই বটে, তাহলেও নিজেরাই যাওয়া যায়। গাইডের প্রয়োজন হয় না। যাহোক্, তখনকার মতো আমরা কথা থামিয়ে, তাঁবুর বাইরে এলাম।

দোকানে এসে দেখি প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন আদিবাসী গোছের পুরুষ ও নারী একটা পালকির মতো কী নিয়ে, ঐ দোকানে এসে উঠেছে। দুটো লাঠির মাঝখানে পালকির মতো আকারের একটা মন্দিরের মতো ঘর। তার মধ্যে কী একটা দেবদেবী আছে। স্থানীয় কোন গ্রাম থেকে ওরা এখানে এসেছে, যাবে গঙ্গোত্রী। দেখলাম দোকানে বসে বেশ কয়েকজন হালুয়া তৈরি করছে, ঐ দেবতার প্রসাদ। দোকানদার জানালো, ইচ্ছা করলে আমরাও খেতে পারি। ভাবলাম খেয়ে দেখলে মন্দ হয় না। এটা তো মানতেই হবে, ইনি যে দেব বা দেবীই হ’ন না কেন, অত্যন্ত জাগ্রত। যাত্রীর অভাবে আমরা ভয়ঙ্কর বিপদ ও শোচনীয় কষ্টের মধ্যে আছি জানতে পেরেই, প্রয়োজনীয় সংখ্যার বেশিই লোকজনকে গঙ্গোত্রী পাঠাবার  ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আগামীকাল আমাদের লঙ্কা যাওয়া কে আটকায়? যাহোক্, আমরা আমাদের খাবারের অর্ডার দিয়ে, দোকানদারকে আগামীকালের বাসের খোঁজখবর দিতে বললাম। দোকনদার জানালো পরপর দু’দিন কোন বাস যায় নি, কাজেই কাল নিশ্চয় বাস ছাড়বে। বললাম, এরা সবাই গঙ্গোত্রী গেলে, প্যাসেঞ্জারের তো অভাব হবার কথা নয়। দোকানদার জানালো, এরা স্থানীয় মানু্‌ষ, এরা সবাই হেঁটেই যাবে। ব্যাস, বাড়া ভাতে ছাই হয়ে গেল। আমাদের মুষড়ে পড়তে দেখে, দোকানদার আশ্বাস দিয়ে জানালো, আগামীকাল পঁচিশ-ত্রিশ বস্তা ময়দা ও চার-পাঁচ টিন ডালডা নিয়ে যাওয়া হবে, ফলে বাস ছাড়বেই। প্যাসেঞ্জারের বদলে ময়দা ও ডালডা? সবই কপাল। যা খুশি, যে খুশি যাক, বাস গেলেই হলো। তাঁবুর ভদ্রলোক বলেছিলেন, রাতে তিনি কিছু খাবেন না। আমরা খেতে যাবার সময় তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে, তাঁর খুব উপকার হয়। তাঁর স্ত্রীকে ডাকতে গিয়ে শুনলাম, তাঁবুতেই তাঁর খাবার দিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। আমরা দোকানে ফিরে গেলাম। দোকানে গিয়ে সেই একঘেয়ে রুটি আর আলুর তরকারি, সঙ্গে অবশ্য ডাল আছে। হালুয়া আর খেলাম না। একবার ভেবেছিলাম অন্য একটা দোকান থেকে পরোটা কিনে খাব। শেষ পর্যন্ত তা আর খাওয়া হলো না। তাঁবুতে ফিরে এসে একটু গল্পগুজব করে শুয়ে পড়লাম। আজ আমরা সত্যিই বড় ক্লান্ত। তার ওপর এত আরামে এ পথে ঘুমবার কথা ভাবতেও পারি নি। আগে ডাবরানীতে কেউ নামতোও না। বন্যার পর সবাইকে ডাবরানী আসতেই হবে, আর প্যাসেঞ্জারের অভাবে বাস না পেলে দু’এক রাত থাকতেও হবে। ফলে বুদ্ধি সিং, বুদ্ধি করে খাসা ব্যবসা খুলে বসেছেন। অবশ্য ব্যবস্থাও খুবই ভালো করেছেন। সব থেকে বড় কথা খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, যেটার এপথে খুবই অভাব।

আজ ঊনত্রিশ-এ আগষ্ট। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, বুদ্ধি সিংকে তার তাঁবু ভাড়া বাবদ বার টাকা মিটিয়ে দিয়ে, একবার বাইরে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে আসবো ভাবছি, বুদ্ধি সিং বললেন, যতক্ষণ না বাস ছাড়ে এখানেই বিশ্রাম নিন। বাস ছাড়লে এখান থেকে বাসে উঠে পড়বেন। মাধব ও দিলীপ অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠেছে। ফলে তাদের চা খাওয়া ও সকালের কাজ সারা হয়ে গেছে। আমি চায়ের দোকানে গেলাম। দিলীপকে বললাম ওরা কাজ সারতে কোথায় গিয়েছিল আমাকে দেখিয়ে দিতে। দিলীপ বললো একটু দুরে যেখানে কলটায় অবিরাম জল পড়ে, সেখানে রাস্তার ধারেই কতগুলো চট্ দিয়ে ঘেরা পায়খানা আছে। দিলীপকে একটা মগ্ কোথায় পাওয়া যাবে জিজ্ঞাসা করাতে, ও কোন রকম ভণিতা না করে হিন্দীতে বললো, এ পায়খানা যাবে একে একটা লোটা দাও। দোকানদার তার কাজ করতে করতেই, চায়ের গ্লাশের একটা গ্লাশ আমার হাতে দিল। তার গ্লাশ দেওয়ার ভঙ্গী দেখে বুঝলাম, এখানে এটাই চল্। তবু আমি একটু অবাক হতে দিলীপ জানালো, ওদেরও সকালে এইসব গ্লাশ থেকেই দু’টো গ্লাশ দেওয়া হয়েছিল। সত্যি কী ভালো ও স্বাস্থ্যকর পরিষেবা। ওয়াটার বটলে এক বটল্ জল ভর্তি করে, দোকানদারের দেওয়া প্লাস্টিক গ্লাশ হাতে করে, গাইড দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে, নির্দিষ্ট জায়গায় গেলাম। দেখলাম চট্ দিয়ে ঘেরা পরপর তিনটে পায়খানা একই সারিতে রয়েছে। চটগুলো এত পাতলা ও পরিস্কার, যে একটার ভিতর দিয়ে পাশেরটা, এমন কী চোখের জ্যোতি ঠিক থাকলে, তার পাশেরটার ভিতরও পরিস্কার দেখা যায়। বোধহয় গল্প করার সুবিধার্থে এই ব্যবস্থা। একটু দুরে মেয়েদের জন্যও একই রকম সুব্যবস্থা। লজ্জার মাথা খেয়ে, “তিনে মিলি করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ” ভেবে একটার ভিতর ঢুকলাম। কিন্তু পায়খানাগুলো অদ্ভুত ভাবে তৈরি। দু’দিকে দু’টো তক্তা পাতা, কিন্তু তক্তাগুলো পিছন দিকে বেশ ঢালু। ফলে ওর ওপরে বসলে, পিছনের চট্ ছিঁড়ে বেশ কিছুটা নীচে, মাটিতে পড়ে যাবার সম্ভাবনা যথেষ্ট। অথচ সামনে পাতলা চট্ ছাড়া এমন কিছু নেই, যা ধরে বসা যায়। পিছন দিকে কাত হয়ে বসে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কোনরকমে কাজ সারতে হয়। যাহোক্, ওখান থেকে উদ্ধার পেয়ে, কলের জলে গ্লাশটা ধুয়ে এনে, দোকানদারকে ফেরৎ দিলাম। সে আমার দিকে না তাকিয়ে, হাত বাড়িয়ে গ্লাশটা নিয়ে, গ্লাশ রাখার জায়গায় আর সব গ্লাশের সাথে রেখে দিল। ভাবলাম আমরা যে গ্লাশে করে চা খাচ্ছি, সেগুলো কত রাজ্যের, কত মানুষের না পিছনে জল দিয়ে সাহায্য করেছে। বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।

বাস ছাড়ার কিন্তু কোন লক্ষণ দেখছি না। ভোরবেলা সেই ত্রিশ-চল্লিশ জনের আদিবাসী দলটা গঙ্গোত্রীর উদ্দেশ্যে রওনা  হয়ে গেছে। জানা গেছে গতকালের সেই বাসটাই যাবে। বাসে গতকালের মতো একবারে সামনে জায়গা রেখে, এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছি। বাস ছাড়ার কোন আয়োজন চোখে পড়ছে না। চায়ের দোকানে গিয়ে খোঁজ করলাম। ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম, একটু অপেক্ষা করে দেখা হবে, যদি ভুখি থেকে কোন প্যাসেঞ্জার আসে। তবে বাস আজ যাবেই, কোন সন্দেহ নেই। গতকাল যখন জীপ খারাপ হওয়ায় হেঁটে হেঁটে ফিরছিলাম, মাধব ও দিলীপের কথাবার্তায় বুঝতে পারছিলাম, ওদের বাড়ির জন্য মন খারাপ করছে। গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী আর এবার ওদের যাবার ইচ্ছা নেই। গতকাল ঐ বাসে যখন অপেক্ষা করছিলাম, তখনও ওরা সেইরকম একটা আভাস দিয়েছিল। যার জন্য আমি সাধু গোছের লোকটাকে যমুনোত্রী সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করছিলাম। যাতে আমার কথায় ওরা বুঝতে পারে, যে আমি গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী যাবই। আমি জানি যে, আমাকে ফেলে ওদের পক্ষে ফিরে যাওয়া খুব মুশকিল। আসলে ওরা চাইছে আমি নিজে থেকে ফিরে যাবার প্রস্তাবটা পেশ করি। দিলীপ গতকাল জীপ ছেড়ে হেঁটে হেঁটে ফিরবার পথে আমায় জিজ্ঞাসা করেছিল, আমি কী করবো। শুনে ভীষণ রাগ হয়ে গিয়েছিল। মাধব একে ফিরে যাব ফিরে যাব করছে, তার ওপর ও আবার মাধবের সাথে পোঁ ধরেছে। আমি বলেছিলাম, ”আমি তোদের মতো অত সহজে ভেঙ্গে পড়তে বা হাল ছেড়ে দিতে শিখি নি। আমার মতো তোরাও আসবার সময় বলেছিলি, যতক্ষণ টাকা থাকবে ও শরীর ঠিক থাকবে, ততক্ষণ সবক’টা জায়গা না দেখে ফিরবি না। এখন পর্যন্ত সব জায়গা সহজ ভাবেই ঘোরা গেছে। এখনও এমন কিছু ঘটে নি, যে এর মধ্যেই ভেঙ্গে পড়ে ফিরে যাবার চিন্তা করতে হবে। আমাদের হাওড়া কলকাতাতেও মাঝ রাস্তায় বাস খারাপ হলে, সব প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে দেওয়া হয়। আর এখানে তো এমন হতেই পারে”। দিলীপ মাধবকে জানালো যে সে ইন্টারেষ্ট পাচ্ছে না। মাধব কী করবে তাও জানতে চাইলো। মাধব এবার আমায় জিজ্ঞাসা করলো— আমি কী করবো। আমি সরাসরি উত্তর দিলাম, “তোরা এক কাজ কর। আমায় কিছু টাকা দিয়ে, তোরা বরং ফিরে যা। আমার বাড়িতে একটা খবর দিয়ে দিস। আমি শেষ চেষ্টা না করে ফিরবো না, আর এটাই আমার শেষ কথা”। চোখের সামনে লঙ্কা, গঙ্গোত্রীর মাইল স্টোন দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি দুরত্ব, মাত্র ঊনচল্লিশ কিলোমিটার। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, ভবিষ্যতে যেখানেই যাই না কেন, দিলীপকে আর সঙ্গে নেওয়া নেই। কোথায় ও এই মুহুর্তে আমার পাশে থেকে মাধবকে মনোবল যোগাবে, উৎসাহ দেবে, তা না, মাধবকে উস্কে দিচ্ছে ফিরে যাবার জন্য। মাধবকে খুব ভালোভাবে বোঝালাম যে, আর একটু কষ্ট করলে চরম ফল আমরা লাভ করবোই। সে যেন একটু ধৈর্য ধরে আমার পাশে থাকে। পরে এ কষ্ট আর থাকবে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাধব জানালো, সে আমার সাথে বাকি জায়গাগুলো যেতে রাজি আছে।

মনে মনে বাস ছাড়ার জন্য প্রার্থনা করছি। আজও যদি বাস না যায়, তাহলে ওদের সঙ্গে রাখা সত্যিই কঠিন হবে। অবশেষে অনেকগুলো, প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বস্তা আটা বা ময়দা ও পাঁচ-ছয় টিন ডালডা, সত্যিই বাসের ছাদে ও বাসের মধ্যে তোলা হলো। ওঃ! কী আনন্দ, কী শান্তি যে পেলাম, বলে বোঝাতে পারবো না। বাসের মুখ ঘুরিয়ে লঙ্কার দিকে করা হলো। ড্রাইভার আবার বাস থেকে নেমে চলে গেল। আরও দু’কাপ করে চা শেষ করলাম। অবশেষে বাস সত্যিই ছাড়লো। আজ দেখলাম কিছু প্যাসেঞ্জারও হয়েছে। ড্রাইভারের পাশেই আমি বসেছি। আমার পাশে বাসেরই একজন কর্মী। আমার ঠিক পিছনের সিটে, ড্রাইভারের পিছনে মাধব ও দিলীপ। মাঝেমাঝেই বাসটায় কী রকম একটা বিশ্রী আওয়াজ হচ্ছে। মনে হচ্ছে বাসের ইঞ্জিন বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে। ভয় হলো, গতকাল জীপ ঠেলেছি, আজ বাস ঠেলতে হলে আর বাঁচবো না। আগে হলুদ রঙের ছিল, বর্তমানে প্রায় কালো রঙের গায়ের মোটা গেঞ্জি ও সোয়েটারটা প্যান্টের ভিতর গুঁজে পরতে হচ্ছে। এই ক’দিনেই কোমর এত সরু হয়ে গেছে যে, তা নাহলে প্যান্ট নেমে আসছে। তিনজনের বাস ভাড়া বাবদ একত্রিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা মিটিয়ে দেওয়া হলো। অবশ্য তার জন্য কোন টিকিট দেওয়া হলো না। সেই গিরগিটি, ভেড়া ও ছাগলের পাল কাটিয়ে, বাস গতকালের সেই রাস্তার ওপর দিয়ে এগিয়ে চললো। ড্রাইভার অনবরত গীয়ার চেঞ্জ করছে এবং গীয়ারের রডটা বারবার আমার পায়ে বেশ জোরে জোরে আঘাত করছে। বাধ্য হয়ে গীয়ারের দু’দিকে দুটো পা রেখে, প্রথম শ্রেণীর সিটে কষ্টেসৃষ্টে বসে আছি। হঠাৎ, আচমকা গীয়ারের রডটা নীচের দিকে নামাতে, আমার হাতে লেগে খানিকটা কেটে, রক্ত পড়তে শুরু করলো।

হরশীল এসে বাস দাঁড়ালো। সেই ত্রিশ-চল্লিশজনের আদিবাসী দলটা এখানে এসে হাজির হয়েছে। একটা গাছে কুলের মতো কী একটা ফল, অসংখ্য ফলে আছে। ওরা পাথর ছুঁড়ে ওগুলো পাড়ছে আর টপাটপ্ মুখে পুরছে। আমার পাশে বসা বাসের লোকটাও, বাস থেকে নেমে ওগুলো পাড়তে শুরু করে দিল। আমি দু’টো ফল চাইতে, সে অনেকগুলো ফল আমার হাতে দিয়ে দিল। টক্ টক্, কষা কষা খেতে। আদিবাসী দলটা ঠিক করলো, তারা এখান থেকে এই বাসেই লঙ্কা যাবে। আগে, সকালে এটা ঠিক করলে, আমাদের এতটা সময় নষ্ট হতো না। ড্রাইভার জানালো, এত লোকের বাসে জায়গা হবে না। দু’দিন পরে বাস ছেড়েছে বলেই বোধহয়, আসবার পথে ভালোই প্যাসেঞ্জার হয়েছে। ওরা কিন্তু ড্রাইভারের কথায় কান না দিয়ে, বাসের ভিতরে ও ছাদে উঠে পড়লো। পালকির মতো জিনিসটা, বাসের ভিতরে ঢোকানো হলো। বাস ছেড়ে দিতেই তারা ভেঁপু, শিঙ্গা, ঢোল, ব্যান্ড পার্টির বাঁশির মতো দেখতে কী একটা জিনিস, একসাথে বাজাতে শুরু করে দিল। ঐ ভিড়ে কানের কাছে শিঙ্গার বিভৎস আওয়াজ, বিড়ির ধোঁয়া, সে এক নরক যন্ত্রণা। এক জায়গায় বাস দাঁড় করিয়ে, বাসের ইঞ্জিনে অনেক জল ঢালা হলো। ভাগ্য আমাদের খুব ভালোই বলতে হবে, নতুন কোন বিপদ না ঘটিয়ে, বাস লঙ্কায় এসে পৌঁছলো। আমরা বাস থেকে নামতেই, ডাবরানীর দিকে যাবার জন্য লঙ্কায় যে ক’জন প্যাসেঞ্জার ছিল, তাদের নিয়ে বাস ডাবরানীর উদ্দেশ্যে চলে গেল। শুনলাম কোন বাস বা জীপকে লঙ্কায় থাকতে দেওয়া হয় না, তারাও লঙ্কায় থাকতে চায় না। প্যাসেঞ্জার না পেলেও, এখানে বাস আসার সঙ্গে সঙ্গে ডাবরানী ফিরে যায়। ভয় হলো ফিরবার সময় আবার বাস পাব তো? কবে ডাবরানীতে প্যাসেঞ্জার জমা হবে, বা ডালডা, ময়দা ইত্যাদি লঙ্কায় নিয়ে আসা হবে, তবে বাস লঙ্কায় আসবে। আবার লঙ্কায় বাস আসার সেই শুভ মুহুর্তটাতে আমাদেরও লঙ্কায় উপস্থিত থাকতে হবে, তা নাহলে এক মুহুর্তও অপেক্ষা না করে, বাস ডাবরানী ফিরে যাবে। এ এক কঠিন অঙ্ক।

ছোট্ট জায়গা। পরপর দুটো মিষ্টির দোকান কাম হোটেল। ভাত, ডাল, তরকারি খেয়ে নিলাম। পালকির মতো জিনিসটাকে কাঁধে নিয়ে ঐ দলটাও এদিকে এল। তাতে কেউ পয়সা দিয়ে নমস্কার করলে, সেটাকে ঝাঁকিয়ে কাত করে ঐ ব্যক্তির বুকে বা মাথায় পালকির মতো মন্দিরটাকে ঠেকানো হচ্ছে। যেন দেবতা নিজেই কাত হয়ে আশীর্বাদ করছেন। আমরা এবার এগিয়ে গেলাম। এখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে ভৈরবঘাঁটীর চড়াই পার হতে হবে। শুনেছি খুবই কষ্টকর চড়াই। আস্তে আস্তে হেঁটে পথ চলতে শুরু করলাম। এই মুহুর্তে রাস্তা খুব কষ্টকর বলে মনে হচ্ছে না। তবে ভাত খাওয়ার পরেই হাঁটতে তো একটু কষ্ট হবেই। চারপাশে একই দৃশ্য, এই সব দৃশ্য আর নতুন করে কী দেখবো? ক্রমে মালুম পেতে শুরু করলাম, কত কষ্টের এই চড়াই। শেষে ধীরে ধীরে একসময় এই চড়াই পার হয়ে, আমরা ভৈরবঘাঁটী এসে পৌঁছলাম। রাস্তার শেষে একটা বোর্ড দেখলাম। তাতে হিন্দীতে লেখা “কষ্টকে লিয়ে ধন্যবাদ”। এ কিরকম তামাশা বুঝলাম না। এত কষ্টের পর, কষ্টের জন্য শুধু শুকনো ধন্যবাদ জানানো। এতদিনে আমাদের প্রতি ভাগ্যদেবতা বোধহয় প্রসন্ন হয়েছেন। ভৈরবঘাঁটী থেকে গঙ্গোত্রীর জীপ শুধু পাওয়াই যায় না, একটা জীপ কয়েকজন যাত্রী নিয়ে বোধহয় আমাদের জন্যই অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যেতেই আমাদের নিয়ে জীপ ছেড়ে দিল। মাত্র নয়-দশ কিলোমিটার পথ, কাজেই দেখতে দেখতেই আমরা গঙ্গোত্রী পৌঁছে গেলাম। তিনজনের ভাড়া লাগলো, আঠারো টাকা। জীপ থেকে নেমেই, গোমুখ যাবার ব্যাপারে খোঁজখবর নিলাম। স্থানীয় পান্ডারা কিন্তু আজ ওদিকে যেতে নিষেধ করলো। যদিও দু’একজন বললো চলে যেতে পারেন। আমি বললাম তাহলে আজই গোমুখ চলে যাই। এই প্রথম দেখলাম দিলীপ আমার সাথে হাত মেলালো, সেও আজই যেতে প্রস্তুত। মাধব বললো আজ যেতে রাত্রি হয়ে যাবে। আমরা বললাম, এদিকে অন্ধকার হতে অনেক দেরি হয়, আমরা অন্ধকার নামার আগে ঠিক পৌঁছে যাব। মাধব বললো রাস্তায় থাকবার জায়গা নাও পাওয়া যেতে পারে, তাই কাল সকালে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যদিও এখন সবে দুপুর, তবু শেষ পর্যন্ত আমরা আগামীকাল ভোরে রওনা হওয়াই ঠিক করলাম। একটা দোকানে বসে চা খেলাম। এখানেই শুনলাম গোয়ালীয়রের একজন বড়লোক টুরিষ্ট, গঙ্গোত্রীর সত্য নারায়ণ প্রসাদ নামে একজন পান্ডাকে সঙ্গে করে দু’দিন হলো গঙ্গোত্রী গেছেন। তাঁদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এখানকার বেশিরভাগ পান্ডাই, তাঁদের খোঁজে গঙ্গোত্রী গেছে। সকলেরই ধারণা, তাঁরা ওখানে মারা গেছেন। এরা আমাদের জানালো, ওখানে যেতে হলে, যাবার আগে পুলিশ স্টেশনে নাম ধাম লিখে অনুমতি নিয়ে যেতে হবে। এখন এটাই নিয়ম, ফিরতে দেরি হলে যাতে তারা খোঁজ করতে পারে। ঠিক হলো আগামীকাল সকালে ওখানে যাবার আগে, কাজটা সেরে নেওয়া যাবে।

একটু ওপরে ট্রাভেলার্স লজে আঠারো টাকা ভাড়ায়, একটা তিনটে বিছানার ঘর ভাড়া নিলাম। স্থানীয় পান্ডারা অবশ্য তাদের ঘরে থাকতে অনেক অনুরোধ করেছিল। তবু একটু আরামে থাকার আশায়, ট্রাভেলার্স লজই বুক করলাম। এখানে আমরাই একমাত্র বোর্ডার। চাবি নিয়ে নিজেদের ঘরে এলাম। তিনটে খাট, গোটা ছয়েক কম্বল দেওয়া আছে। মাধবের আবার সামান্য জ্বর এসেছে। পথে একবারও ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ খায়নি। ওকে এক ডোজ ওষুধ খাইয়ে, আমি ও দিলীপ বাইরে এলাম। চারিদিকে খুব আরাম দায়ক রদ্দুর। একটু নীচেই বাঁদিকে গঙ্গোত্রী মন্দির। এখান থেকে মন্দিরের পিছন দিকটা দেখা যায়। মন্দিরের সামনে, দুরে বরফ ঢাকা শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে। একবারে ডানদিকে সুদর্শন শৃঙ্গ, তার বাঁপাশে কালো, একটু বাঁকা মতো গনেশ শৃঙ্গ। কয়েকটা ছবি নিয়ে, পোস্ট্ অফিসের খোঁজে গেলাম। উত্তরকাশী থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে চিঠি লিখে এনেছিলাম। ছুটি বাড়াতে হবে। ভাবলাম আন্ডার সার্টিফিকেট্ অফ্ পোস্টিং করে পাঠাবো। মন্দিরের ডানদিকে ব্রিজ পেরিয়ে পোস্ট্ অফিস। একটা বেঞ্চে বসে এক ভদ্রলোক পরম নিশ্চিন্তে উল বুনছেন। আর কাউকে দেখলাম না। মনে হয় এই একজনই পোস্ট্ মাষ্টার জেনারল কাম পিওন। ছোট্ট অন্ধকার একটা ঘরে অফিস। অপর একটা ঘরে সম্ভবত তাঁর থাকার ব্যবস্থা। আমরা তাঁকে দু’টো আন্ডার সার্টিফিকেট্ অফ্ পোস্টিং এর ফর্ম দিতে বললাম। ভদ্রলোক জানালেন, ঐ ফর্মের কথা তিনি আগে কখনও শোনেন নি, এবং জানেনও না। অনেকভাবে তাঁকে বোঝাবার পর, তিনি উল বোনা ছেড়ে অফিস ঘরে ঢুকে, কোনবার পার্শেল ফর্ম, কোনবার আবার অন্য কোন ফর্ম নিয়ে আসেন। এত মহা বিপদ। কোন ফর্মটাই আমাদের পছন্দ হচ্ছেনা দেখে, তিনি বেশ অসন্তুষ্ট হলেন। শেষে, দু’টো মোড়া, প্রায় পাঁপড় ভাজার মতো মড়মড়ে, লালচে রঙের ফর্ম নিয়ে এসে বললেন, এই দু’টো ফর্মই আছে, আর কোন রকম ফর্ম এখানে পাওয়া যাবে না। এই ফর্ম দু’টোই আমাদের প্রয়োজন। রঙ বদলে গেলেও কাজ চলে যাবে। তবে সোজা করে, যাতে ভাঁজ না পড়ে, সেইভাবে যত্ন করে রাখতে হবে। ফর্ম ভর্তি করে ভদ্রলোকের হাতে দিলাম। উনি জানালেন, উনি ইংরাজী পড়তে পারেন না। বললাম, আমরা পড়ে দিচ্ছি, দরকার হলে তিনি মিলিয়ে নিতে পারেন। ভদ্রলোক এবার পরিস্কার জানালেন, এভাবে করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে বললাম, আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী, আমাদের সঙ্গে আইডেন্টিটি কার্ড আছে। ভদ্রলোক এবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডাকটিকিট লাগিয়ে, ঐ ডাকঘরের ছাপ মেরে দিয়ে, বাইরের ডাক বাক্সে ফেলে দিতে বললেন। আমরা ডাকবাক্সে চিঠি দু’টো ফেললাম কী না, তিনি সেটাও ঘাড় বেঁকিয়ে লক্ষ্য করলেন। একেই বোধহয় “জাতে মাতাল, তালে ঠিক” বলে। চিঠি পোস্ট্ করে এক চক্করে মন্দির ঘুরে দেখে, ঘরে ফিরে এলাম।

মাধব ঘুমচ্ছে। গায়ে এখনও জ্বর আছে। আমরাও একটু বিশ্রাম নেবার জন্য শুয়ে পড়লাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে দরজায় কড়া নেড়ে কে একজন আমাদের ডাকতে, দরজা খুলে দেখি ট্রাভেলার্স লজের একজন কর্মী। তিনি বললেন, “এই তো পাহাড় দেখার সময়, আপনারা ঘরে শুয়ে আছেন”? ঘরের বাইরে এসে দেখি, সূর্যাস্তের আভা বরফের ওপর পড়ে, লাল-হলদে রঙ ছড়াচ্ছে। ঘর থেকে মাধবকে ডেকে আনলাম। কর্মীটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ঐ দৃশ্য উপভোগ করলাম। অন্ধকার না নামা পর্যন্ত ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করলো না। শেষে ঘরে ফিরে এসে মাধবকে ঘরে একা রেখে, টাকা নিয়ে নীচের দোকানে রাতের খাবারের অর্ডার দিতে গেলাম। চা খেয়ে, রাতের পুরি তরকারি ঘরে পাঠিয়ে দিতে বলে ঘরে এসে দেখি, ঘর অন্ধকার, মাধব দরজা খুলে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমচ্ছে। ওকে ডেকে দিলাম। একজন একটা হ্যারিকেন দিয়ে গেল। এখানে বিদ্যুৎ নেই। একটু জ্বলেই হ্যারিকেনটা দপ্ দপ্ করে নিভে গেল। দেখলাম হ্যারিকেনে যথেষ্টই তেল আছে। আবার জ্বাললাম। কিছুক্ষণ ভালোভাবে জ্বলে, দপ্ দপ্ করে আবার নিভে গেল। বাইরে গিয়ে বাঁপাশে কর্মীটির ঘর থেকে অন্য একটা হ্যারিকেন বদলে আনলাম। কিন্তু আশ্চর্য, এটাও সেই একই ভাবে নিভে যাচ্ছে। দিলীপকে বললাম হয়তো অক্সিজেনের অভাব। কাচটা খুলে দিয়ে জ্বাললাম, তাতেও কোন লাভ হলো না। ঘর অন্ধকার রেখেই চুপ করে শুয়ে থাকলাম। একটু পরে আমি আর দিলীপ আরতি দেখতে মন্দিরে গেলাম। ঘরে ফিরে এসে আবার শুয়ে আছি, খাবার আর দিয়ে যায় না। শেষে নিজেরাই খাবার আনতে যাব বলে তৈরি হচ্ছি, দোকানদার কী একটা পাতা করে একগাদা পুরি তরকারি দিয়ে গেল। দোকানদারের কাছে শুনলাম ওটা ভূজপাতা।

এ রাস্তায় দেখেছি মোমবাতি অনেকক্ষণ জ্বলে। যে মোমবাতি কলকাতায় এক ঘন্টা জ্বলে, সেটা এসব জায়গায় স্বচ্ছন্দে দেড়-দু’ঘন্টা জ্বলবেই। একটা মোমবাতি জ্বেলে, কোনরকমে অল্প কয়েকটা পুরি খেয়ে, বাকিগুলো রেখে দিলাম। মাধবতো মাত্র দু’টো পুরি খেল। দিলীপ বললো, আগামীকাল রাস্তায় কাজে লাগবে। আমরা কিন্তু তাতে রাজি হলাম না। ঠিক হলো, কাল সকালে নতুন পুরি, তরকারি সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হবে। এগুলোও ফেলে না দিয়ে সঙ্গে রাখা হবে, দরকার হলে কাজে লাগানো যাবে। দোকানদার এতক্ষণ আর কিছু লাগবে কী না জানার জন্য, বসে বসে কথা বলছিল। তাকে সেইমতো অর্ডার দিয়ে, দরজা বন্ধ করে, কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। পান্ডাদের বাড়িতে না থেকে, এখানে উঠলাম একটু আরাম খোঁজার জন্য। কিন্তু এখানে বিছানায় এত পিসু, ভাবা যায় না। নাক, কান, গলা ইত্যাদি দিয়ে হেঁটে হেঁটে গিয়ে, শরীরের বিশেষ বিশেষ পছন্দের জায়গাগুলো রক্ত চোষার জন্য বেছে নিয়ে, জ্বালিয়ে দিল। হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেললে বোধহয় চামড়া বা লোমকূপের সাথে লেপ্টে থাকছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ্ থেকে, পরিবেশ আবার শান্ত হলে, আবার আমাদের মতোই পথ পরিক্রমায় বার হচ্ছে। শুয়ে শুয়ে ঠিক করলাম, আজ এত রাতে আর কিছু করার নেই, তবে ফেরার সময় গঙ্গোত্রীতে থাকতে হলে, এখানে আর নয়। এর থেকে লালাজীর দোকানের পিসুরা অনেক ভদ্র, অনেক নির্লোভী ছিল। এদের আমাকে এত বেশি কেন পছন্দ, এরাই জানে। মাধব ও দিলীপ দিব্বি ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি রাত দুপুর পর্যন্ত পিসু নিধন নিয়ে ব্যস্ত। একবার ঘুম আসে, আবার ওদের অত্যাচারে ঘুম ভেঙ্গে যায়। এইভাবে একসময় রাত কেটে ভোর হলো।

আজ ত্রিশে আগষ্ট। ঘুম থেকে উঠে সুদর্শন শৃঙ্গের দর্শন লাভ করলাম। সুদর্শন শৃঙ্গ আজ ভোরের আলোয় যেন এক অন্য রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তৈরি হয়ে দোকানে এলাম। চা খেয়ে পুরি তরকারি গুছিয়ে নিলাম, সঙ্গে মাইশোর পাক গোছের একরকম মিষ্টি। এখানে এসে খবর পেলাম, যে কাল রাতে খবর পাওয়া গেছে, সত্য নারায়ণ প্রসাদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। গোয়ালীয়রের সেই ধনী যাত্রীটিকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায় নি। বড় বরফের চাঁই চাপা পড়ে সত্যনারায়ণ পান্ডা মারা গেছেন। তিনি কানে খুব কম শুনতেন, বয়স বছর পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন মতো হবে। বরফ ভেঙ্গে পড়ার আওয়াজ তিনি হয়তো শুনতে পান নি। গোয়ালীয়রের ভদ্রলোকও সম্ভবত মারাই গেছেন। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় নি। গঙ্গার জলে ভেসে গিয়েই থাকুক বা কোথাও বরফ চাপা পড়েই থাকুক, তাঁকে খোঁজা হচ্ছে। দোকানদার আমাদের সাবধান করে দিয়ে বললো, এখন বরফ গলার সময়, কাজেই আমরা যেন গোমুখের খুব কাছে না যাই। দুর থেকে দেখাই ভালো। শুনলাম এখানকার সব পান্ডারা সত্য নারায়ণের শেষকৃত্য করতে গোমুখ চলে গেছে। সব খবর শুনে পুলিশ স্টেশনে এলাম। এটা ট্রাভেলার্স লজের পাশেই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার যে পুলিশ স্টেশনে তালা দেওয়া। শুনলাম সবাই গোমুখ চলে গেছে। ভেবে দেখলাম পুলিশের জন্য অপেক্ষা করতে গেলে, একটা দিন অন্তত নষ্ট। গঙ্গোত্রী ঝেঁটিয়ে সবাই যখন গোমুখ গেছে, তখন আমরা আর পড়ে থাকি কেন? কাজেই আমরাও সেই একই পথে পা বাড়ালাম। বুকের মধ্যে যেন কেমন একটা ভয় দানা বেঁধে উঠছে, সেটা রাস্তার বিপদের ভয়, না পুলিশের ঝামেলার ভয়, বলতে পারবো না। দোকানে দেখা হয়ে গেল ডাবরানী, গরমকুন্ডে দেখা সেই সাধু গোছের ভদ্রলোকটির সাথে, যিনি আমাদের অভিশপ্ত জীপেও সঙ্গী হয়েছিলেন। এখন জানতে পারলাম তাঁর নাম রামজী। এখানে ভৈরবঘাঁটী থেকে লঙ্কা আসার জীপ ড্রাইভারকেও চা খেতে দেখলাম। তার কাছে জানা গেল, এপথে ঐ একটাই জীপ যাতায়াত করে। আমরাও গতকাল ঐ জীপেই গঙ্গোত্রী এসেছিলাম। তাকে বললাম, আমরা আগামীকাল দুপুর নাগাদ এখান থেকে লঙ্কা ফিরবো, সে যদি দয়া করে সেই সময় জীপটা গঙ্গোত্রী নিয়ে আসে, তাহলে খুব ভালো হয়। সে জানালো, লঙ্কা থেকে গঙ্গোত্রীর প্যাসেঞ্জার না পেলে সে গঙ্গোত্রী আসে না। তবু আমাদের অনুরোধে সে এখানে জীপ নিয়ে আসার চেষ্টা করবে। এখান থেকে লঙ্কা যেতে, বা লঙ্কা থেকে ডাবরানী যেতে প্যাসেঞ্জারের অভাবে যাতে অসুবিধায় পড়তে না হয়, তাই রামজীকেও অনুরোধ করলাম আগামীকাল আমাদের সাথে লঙ্কা ফিরতে। এবার আমরা উঠে দাঁড়ালাম।

দোকানদার ও স্থানীয় কিছু পান্ডা আমাদের যাত্রার শুভ কামনা জানালো। আমরা ফিরে না আসার দেশ, গোমুখের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম। ট্রাভেলার্স লজ, পুলিশ স্টেশনের পাশ দিয়ে রাস্তা এগিয়ে চলেছে সুদর্শন ও গনেশ শৃঙ্গের দিকে। মাধব ও দিলীপকে এগিয়ে যেতে বলে গঙ্গোত্রী মন্দিরের সামনের দিক থেকে খানকতক ছবি নিলাম। কেন জানিনা, গঙ্গোত্রী মন্দিরের গঠন শৈলীতে কোথায় যেন একটা মুসলমান স্থাপত্যের নিদর্শন বা মিল আছে বলে মনে হয়। এটা অবশ্য আমার মনে হলো, আর সবার মনে নাও হতে পারে। সঙ্গের সেই রামের বোতলের ছিপিটার আবার প্যাঁচ কাটা। কাঁধের ঝোলা ব্যাগে একবার কাত হয়ে পড়ছে, একবার বেঁকে যাচ্ছে। পলিথিন ব্যাগে ওটাকে যত্ন করে মুড়ে রাখা সত্ত্বেও, সামান্য তরল পদার্থ ব্যাগে পড়েছে। এটা আবার এক অতিরিক্ত বোঝা। তবু ওটাকে হাতছাড়া করতেও পারছি না। কল্যানদার উপদেশ, রাত্রে ঘুমবার আগে এটা সামান্য পরিমান ওষুধের মতো খেলে, ভালো ঘুম হয়, সমস্ত ক্লান্তি দুর হয় এবং পায়খানা পরিস্কার হয়, মনে হবে না আমরা এতদিন ধরে এত পথ ঘুরে আসছি। তাছাড়া ঠান্ডা লেগে শরীর খারাপ হলে, এটা মহৌষধের কাজ করে। ধীরে ধীরে অনেকটা পথ পার হয়ে, আমরা একটা বিরাট ঝরনার কাছে এসে হাজির হলাম। এখানে রাস্তা বেশ চওড়া। ঝরনার পাশে বসে দোকান থেকে কিনে নিয়ে আাসা পুরি ও তরকারি খেলাম। মাধব এক ডোজ ওষুধও খেয়ে নিল। ওয়াটার বটলে জল ভরে নিয়ে, গুটি গুটি পায়ে আবার এগিয়ে চললাম। কোথাও কোন লোকজন নেই। সঙ্গে রোদচশমা ছিল, কারণ অনেকেই উপদেশ দিয়েছিল, গোমুখে কালো কাচের সানগ্লাশ পড়ে থাকতে। তা নাহলে বরফের ওপর সূর্যালোক পড়ে যে উজ্জল আকার ধারণ করে, তাতে চোখের ভীষণ ক্ষতি হয়, এমনকী অন্ধ পর্যন্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। দিলীপ আবার চশমা পরে। ওর চোখের পাওয়ারও অত্যন্ত বেশি। খালি চোখে প্রায় অন্ধই বলা যায়। ফলে একই পাওয়ারের একটা কালো কাচের চশমা সে তৈরি করে নিয়ে এসেছে। আজ দিলীপ তার নতুন বানানো কালো কাচের চশমা পরে, দিলীপ কুমারের স্টাইলে রাস্তা হাঁটছে। আমরা কিন্তু রোদচশমা ছাড়াই পথ হাঁটছি। রাস্তা এখানে বেশ সরু। বাঁদিকে খাড়া পাহাড়, ডানদিকে গভীর খাদ। বহু নীচে গঙ্গা। এতটা পথ আসলাম, এখনও পর্যন্ত একটা লোকও চোখে পড়লো না। গঙ্গোত্রী থেকে ভূজবাসা প্রায় পনের কিলোমিটার পথ। ওখানেই লালবাবার আশ্রম। ওর আগে কোন বিশ্রাম নেবার বা প্রয়োজনে থেকে যাবার জায়গা নেই। ভূজবাসা থেকে গোমুখ তিন কিলোমিটার রাস্তা। অনেকটা পথ চলে এসেছি। এখানে রাস্তা বেশ সরু হলেও, রক্ষণাবেক্ষণ ভালোভাবেই করা হয় বলেই মনে হয়। এক জায়গায় একটা বেঞ্চ মতো তৈরি করা হয়েছে। আমরা একটু বিশ্রাম নিতে তিনজনে ঐ বেঞ্চে বসলাম। মনের ভিতর সেই ভয় ভয় ভাবটা এখন আর নেই। একটা কিরকম অদ্ভুত আনন্দ ও উত্তেজনা, সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। বহুদুরে সাদা বরফের চূড়া দেখা যাচ্ছে। ডানদিকে গঙ্গার ওপারে একটু দুরেও একটা পাহাড়ের চূড়ায়, হাল্কা বরফের আস্তরণ। এগিয়ে যাবার জন্য তৈরি হলাম। আমরা এখনও খালি চোখে। দিলীপ কিন্তু কালো চশমা পরেই হাঁটছে। বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে আসলাম। প্রথমে আমি, আমার একটু পিছনে মাধব, সব শেষে দিলীপ। হঠাৎ মাধবের ডাকে চমকে উঠে পিছনে ফিরে দেখি, দিলীপ কপাল চাপড়ানোর মতো ভঙ্গীতে লাঠিতে ভর দিয়ে নীচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাধবকে জিজ্ঞাসা করলাম ওর কী হয়েছে। মনে একটা ভয় হলো, ওর যদি এখানে এখন শরীর খারাপ হয়, তাহলে কী করবো। ওকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, আবার যতটা পথ এগিয়ে এসেছি, তাতে ফিরে যাওয়াও সম্ভব নয়। সব থেকে বড় কথা, এখানে থাকাও সম্ভব নয়। মাধব ইশারায় জানালো সে জানে না কী হয়েছে। আমি দিলীপকে জিজ্ঞাসা করলাম তার কী হয়েছে, মাথা ঘুরছে কী না। উত্তরে দিলীপ যা বললো, তাতে আমারই মাথা ঘোরা শুরু হলো। দিলীপ জানালো, তার চশমাটা জামার পকেট থেকে রাস্তায় কোথায় পড়ে গেছে। যখন আমরা বেঞ্চ থেকে উঠে আসি, তখন আমি খুব ভালোভাবে দেখে নিয়েছিলাম কোন কিছু পড়ে আছে কী না। এটা আমার চিরকালের অভ্যাস। কাজেই চশমা হয় তার আগেই কোথাও পড়েছে, নয়তো সেই বেঞ্চ থেকে এখানে, যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তার মধ্যে কোথাও পড়েছে। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম বেঞ্চে বসার সময় চশমা পকেটে ছিল কী না। সে জানালো যে সে লক্ষ্য করে নি। চশমা ছাড়া ওতো প্রায় অন্ধ। দিনের বেলা নাহয় পাওয়ার দেওয়া কালো চশমা পরে চলে গেল, কিন্তু রাতে? রাতে কালো চশমা পরে তো কিছুই দেখতে পাবে না, লোকেই বা কী বলবে? একটা চশমার জন্য ফিরে যেতে হতে পারে ভেবে, ওর ওপর এত রাগ হচ্ছে যে মনে হচ্ছে, যা হয় হোক, ওকে ফেলে এগিয়ে যাই। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস, এত অসাবধানে কিভাবে নেয়? মাধবের শরীর এখন আগের থেকে অনেক ভালো। ঠিক করলাম ফেলে আসা বেঞ্চ পর্যন্ত খুঁজে দেখবো। তাও কী একটুখানি পথ? অনেকটা রাস্তা পার হয়ে এখানে এসেছি। তাছাড়া এখান থেকে বেঞ্চের মধ্যে কোথাও যে পড়েছে, তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? ওর ব্যাগ ভালো করে ঘেঁটে দেখলাম, সেখানে পাওয়া গেল না। বাধ্য হয়ে আমি বেঞ্চের দিকে এগলাম। আমার একটু পিছনে দিলীপ। ভরসা একটাই, রাস্তায় চশমা পড়লেও, কেউ কুড়িয়ে নিয়ে যাবার, বা না দেখে চশমার ওপর দিয়ে হেঁটে যাবার সম্ভাবনা নেই। ওর ভাগ্য ভালো, না আমার জানি না, একটু এগিয়েই দেখলাম চশমাটা রাস্তার ওপর পড়ে আছে। ভাগ্য সত্যিই খুব ভালো যে খুব বেশি পিছোতে হয় নি, বা মোটা কাচ বলেই বোধহয়, পাথরের ওপর পড়েও ভাঙ্গে নি। চশমাটা কুড়িয়ে নিয়ে দিলীপের কাছে এসে ওর হাতে দিয়ে বললাম, ভালোভাবে ব্যাগে তুলে রাখতে।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে, আবার এগিয়ে চললাম। রাস্তা এখানে কোথাও কোথাও অসম্ভব সরু। এইভাবে অনেকটা রাস্তা হেঁটে এসে দুরে, অনেক দুরে, বহু নীচে গঙ্গার পাশে, একটা টিনের ঘর দেখতে পেলাম। চারপাশে অনেক গাছপালা দিয়ে ঘেরা। মনে হয় এটাই চীরবাসা। এরপর তাহলে ভূজবাসা। প্রায় দশ কিলোমিটার পথ চলে এসেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই চীরবাসা পৌঁছে গেলাম। মাধবকে বললাম যত ঠান্ডাই পড়ুক, লালবাবার আশ্রমে এই রামের বোতল নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। ঠিক করলাম এখানে পাথরের আড়ালে কোথাও রেখে দিয়ে যাব। আর একটু এগিয়েই, একটা বেশ বড় পাথরে লাল রঙ দিয়ে “VIMAL” লেখা আছে দেখলাম। দু’দিকে যতদুর চোখ যায়, কোন লোকজন চোখে পড়লো না। রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট গর্ত, অনেকটা গুহার মতো হয়ে আছে। সামনে ছোট বড় অনেক পাথর। একটা বড় পাথর সরিয়ে, তার পিছনে বোতলটা সোজা করে রেখে, পাথর দিয়ে আড়াল করে, আমরা আবার এগলাম। হঠাৎ মাধব আমাকে আকাশের দিকে হাত দেখিয়ে বললো “ওটা কী বলতো”? কোথাও কিছু দেখলাম না। ওর চেষ্টায় একটু পরেই জিনিসটা দেখতে পেলাম। এখন বেলা প্রায় দশটা-সাড়ে দশটা হবে। সমস্ত আকাশ একবারে পরিস্কার নীল। কোথাও সাদা, কালো, এতটুকু মেঘ নেই। চারিদিকে পরিস্কার সূর্যালোক জ্বলজ্বল্ করছে। ডানদিকে পাহাড়ের একটু ওপরে, তারার মতো কী একটা জ্বলজ্বল্ করছে। বরফ নয়, কারণ পাহাড়ের উচ্চতা জিনিসটার অনেক নীচে শেষ হয়ে থেমে গেছে। মেঘ নয়, কারণ কোথাও এতটুকু মেঘ নেই। তাছাড়া ওখানে অতটুকু এবং তারার মতো গোল ও উজ্জল মেঘ হবে না। পাখি নয়, কারণ ওটা একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। ঘুড়িও নিশ্চয় নয়, কারণ ওটা স্থির ও উজ্জল। তাছাড়া ঐ শৃঙ্গ জয় করে, ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়াবার শখ কারো মনে আসলেও আসতে পারে, কিন্তু ঘুড়ি ওড়াবার চিন্তা পাগল ছাড়া কেউ করবে না। তাহলে ওটা কী? ওটা কী কোন তারা? দিনের বেলা রোদ থাকলেও অনেক সময় চাঁদকে দেখা যায় দেখেছি, কিন্তু তারা? কাউকে বললে আমাদের পাগল বলবে। শেষ পর্যন্ত ওটা কী পদার্থ বুঝতে না পেরে, এগিয়ে যাওয়াই উচিৎ বলে মনে হলো। খানিকটা এগিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই পিছন ফিরলাম। বস্তুটা একই জায়গায়, একই ভাবে জ্বলজ্বল্ করছে। হঠাৎ মনে হলো এই রাস্তায়, পিছন দিকে ঘুরে তাকিয়ে হাঁটা উচিৎ নয়। বন্ধুদেরও ঐভাবে হাঁটতে বারণ করে, দৃষ্টি সামনে ফেরালাম। রাস্তা এখানে কোন কোন স্থানে, বারো থেকে আঠারো ইঞ্চি মতো চওড়া। বাঁপাশে নরম ঝুড়ো মাটির উচু পাহাড়। তাতে ইতস্তত ছোট বড় পাথর। ডানদিকে তরোয়াল দিয়ে এক কোপে কাটা হয়েছে, এরকম প্রায় সমান খাদ নেমে গেছে বহু নীচে গঙ্গায়। পড়ে গেলে ধরবার মতো একটা ছোট আগাছা পর্যন্ত নেই। মাঝেমাঝে, যদি পা পিছলে যায় ভেবে, বাঁপাশের পাহাড়ের দেওয়ালে হাত রেখে, খুব সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। এখানে রাস্তাও ধুলোয় ভরা, খুব মজবুত বলে মনে হয় না। এতক্ষণে উল্টোদিক থেকে একটা আদিবাসী গোছের লোককে আসতে দেখলাম। তাকে তারার মতো জিনিসটা দেখাবার চেষ্টা করলাম। মিনিট পাঁচেক চেষ্টার পরেও, সে দেখতে পেল না। আমারও আর দেখাবার ধৈর্য রইলো না। আরও বেশ কিছুটা এগিয়ে দেখলাম, কিছু লোক রাস্তা পরিস্কার করছে। এবার একটা ব্রিজ পার হয়ে, গঙ্গার আরও কাছে গেলাম। বোধহয় অন্য কোন ছোট নদীর ওপর দিয়ে ব্রিজটা পার হতে হয়। ব্রিজটা পার হয়েই, বড় বড় অনেক পাথর ফেলা একটা জায়গায় এলাম। কোন রাস্তা নেই। যে রাস্তায় এতক্ষণ হেঁটে আসছিলাম, সেটা ব্রিজ পর্যন্ত এসে হঠাৎ থেমে গেছে। এপারে কোন রাস্তা চোখে পড়ছে না। মাধবকে এদিকটা একটু দেখতে বলে, পাথরগুলোর ওপর উঠে, রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করলাম। চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেও, এপারে কোন রাস্তা দেখতে পেলাম না। নীচে ডানদিকে, মাধবও কোন রাস্তা আবিস্কার করতে পারলো না। নীচ থেকে দিলীপ চিৎকার করে আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো, কী করবে। এত রাগ হলো কী বলবো। কী আর করবে, একটাই তো কাজ করবার আছে, সেটা রাস্তা খুঁজে বার করা, এবং সেটা নিজেদেরকেই করতে হবে। কারণ এখানে কাছেপিঠে কোথাও কোন লোক নেই। এতক্ষণের এই বার-তের কিলোমিটার পথে, একজন আদিবাসী ও কয়েকজন কুলি গোছের লোকের দেখা মিলেছে, তাও আবার বেশ কিছুক্ষণ আগে। নীচের দিকে নেমে এলাম এবং হঠাৎই খুঁজে পাওয়া গেল, বেশ চওড়া রাস্তাটা। আসলে ব্রিজ পার হয়েই আমরা পাথরগুলোর ওপর রাস্তা খুঁজছিলাম। পাথর ফেলা পাহাড় জাতীয় উচু ঢিবিটার পিছন দিক দিয়েই আবার রাস্তা গেছে।

মাধব ও দিলীপকে পিছনে ফেলে, এগিয়ে গেলাম। বহু দুরে একটা ছোট্ট ব্রিজ। ওটাকে ব্রিজ না বলে সাঁকো বললেই বোধহয় ঠিক বলা হবে। ওটার ওপারে গিয়ে ওদের জন্য একটু অপেক্ষা করলাম। ওদের আসতে দেখে, আবার এগলাম। হাঁটার ইচ্ছা ও আনন্দ যেন ক্রমে কমে যাচ্ছে। আর এইভাবে হাঁটতেও ভালো লাগছে না। একটু দুরে রাস্তার ওপর একটা দোকান বলে মনে হলো। বেশ জোরে খানিকটা এগিয়েই বোঝা গেল, ওটা আসলে একটা বড় কালো পাথর। পাশের গাছগুলোর মধ্যে ওটাকে একটা ছোট দোকান ঘর বলে মনে করেছিলাম। ফলে অপেক্ষা না করে সামনে এগিয়ে চললাম। মাধবরা অনেক পিছিয়ে পড়েছে। ওদের আর দেখতেও পাচ্ছি না। বাঁপাশে কাত হয়ে ধুলোর পাহাড় উঠে গেছে। যেন ধুলো জমা করে করে, ওটাকে উচু করে তৈরি করা হয়েছে। আমাদের এখানে যেমন বালি রাখা হয়। তবে এর উচ্চতা অনেক, এবং সেই ধুলো মাটির পাহাড়ে ইতস্তত প্রচুর ছোট বড় পাথর। হঠাৎ দেখলাম একগাদা পাথর গড়িয়ে রাস্তা পার হয়ে, খাদে চলে গেল। পাথরের আঘাতে মৃত্যু না হলেও, মাথা ঘুরে বা গড়িয়ে পড়া পাথরের ধাক্কায় খাদে চলে যাবার সম্ভাবনা যথেষ্ট। এই রকম বিপজ্জনক রাস্তাটা বেশ খানিকটা দুর পর্যন্ত গেছে, এবং সেখান থেকে অনবরত পাথর গড়িয়ে পড়ছে। আসলে একটা ছোট পাথর সরে গেলেই, পরপর ব্যালেন্সে আটকে থাকা সব পাথর, লাইন দিয়ে নেমে এসে, চোদ্দো-পনেরো ইঞ্চি রাস্তা পার হয়ে, গভীর খাদে গঙ্গার বুকে আশ্রয় নিচ্ছে। মাধবদের এ জায়গাটায় সতর্ক করার জন্য, দাঁড়িয়ে রইলাম। অনেকক্ষণ পরে ওরা এল। ওদের জায়গাটা দেখিয়ে বললাম, খুব তাড়াতাড়ি, পারলে ছুটে জায়গাটা পার হয়ে যেতে। প্রথমে আমি, আমার পিছনে দিলীপ, সব শেষে মাধব। একটু এগতেই, মাধব আমার নাম ধরে চিৎকার করে উঠলো। পিছনে না তাকিয়েও বুঝলাম ব্যাপারটা কী। জোরে ছুটে অনেকটা এগিয়ে গিয়ে পিছন ফিরে দেখলাম, বেশ কিছু ছোট বড় পাথর ঐ জায়গা দিয়ে গড়িয়ে নীচে নেমে গেল। বাঁপাশে ঠিক মতো লক্ষ্য রাখা হয় নি, একটুর জন্য চরম বিপদের হাত থেকে মাধবের জন্য রক্ষা পেলাম। মনে মনে ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে, আবার এগিয়ে চললাম। আস্তে আস্তে ওদের থেকে আবার অনেকটা এগিয়ে গেলাম। ঠিক করলাম আর কোথাও বিশ্রাম নেবার জন্য দাঁড়াবো না। দেখি ভূজবাসা পৌঁছনো যায় কী না। লালবাবার আশ্রমের কোন চিহ্নই কিন্তু চোখে পড়ছে না। এবার রাস্তা হঠাৎ নীচের দিকে গাংগানী-ডাবরানীর রাস্তার থেকেও বেশি অ্যাংগেলে নেমে গেছে। ছুটে নামতে শুরু করলাম। সরু রাস্তা, ছুটে নামায় যথেষ্ট ঝুঁকি আছে, তবু কম কষ্টে তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যাবে। এইভাবে অনেকটা রাস্তা ছুটে নেমে এসে ওদের জন্য দাঁড়ালাম। ওরাও বেশ জোরেই নেমে আসতে শুরু করলো। তবে মাধব ওর পায়ের ব্যথাটার জন্য ভালোভাবে নামতে পারছে না। এবার একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখতে পেলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল যে, লালবাবার আশ্রম এখান থেকে আরও এক কিলোমিটার দুরে। আসলে “ভূজবাসা শুন্য কিলোমিটার” মাইল স্টোন, বেশ খানিকটা আগেই দেখেছি। কিন্তু লালবাবার আশ্রম ঠিক ভূজবাসায় নয়, ভূজবাসা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ দুরে। গোমুখ থেকে দুই-আড়াই কিলোমিটার আগে। পিছনদিক থেকে একজন অল্প বয়সি, সাদা ধুতি সার্ট, সাদা চাদর, সাদা পাগড়ি পরিহিত সাধু এসে আমাদের সাথে মিলিত হলেন। ভদ্রলোকের হাঁটার গতিবেগ, আমাদের থেকে অনেক বেশি। তিনি জানালেন, লালবাবা তাঁর আশ্রমে নেই। গতকাল তিনি গঙ্গোত্রী গেছেন। ওখান থেকে একটা কাজে হরশীল যাবেন। কাজ না মিটলে, তিনি উত্তরকাশী যাবেন। কথায় কথায় জানতে পারলাম, ইনি লালবাবার গুরুভাই, বদ্রীনারায়ণের ওদিকে কোথায় থাকেন। এখন ইনিই আশ্রম দেখাশোনা করবেন। ভদ্রলোক এবার এগিয়ে গেলেন। বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে, বাঁদিকে রাস্তা বেঁকেই নজরে পড়লো, অনেক নীচে টিনের একটা লম্বা ঘর। ওটাই লালবাবার আশ্রম। রাস্তার ওপর বাংলায় লেখা একটা বোর্ড “লাল বিহারী দাসের আশ্রম”। বোর্ডটা দেখলাম “নিতাই” নামে একজন লিখেছে। আশ্রমের বাঁপাশে সবুজ সবজির খেত। আমরা সোজা রাস্তা ধরে নীচের দিকে নেমে, আশ্রমে এসে পৌঁছলাম।

বিরাট জায়গা নিয়ে আশ্রম ও সবজি খেত। আশ্রমের প্রায় মাঝখান দিয়ে নালার মতো কাটা, এবং ঐ নালা দিয়ে ঝরনার জল বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মাটির মেঝে, মাঝখান দিয়ে মধ্যে মধ্যে খুঁটি পুঁতে পুঁতে, দু’ভাগে ভাগ করা। একদিকে ছোট্ট মন্দির, অপর দিকে কাঠের আগুনে রান্নাবান্না, হাত সেঁকা চলছে। খুঁটির ওদিকে চটের ওপরে অনেক লোক বসে আছেন। ওদিকে গেলাম। এক ভদ্রলোক আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, গঙ্গোত্রীতে আমরা পুলিশের কাছে নাম, ঠিকানা লিখে এসেছি কী না। বললাম ওখানে কেউ নেই। ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা সাদা কাগজের টুকরো বার করে, আমাদের তিনজনের নাম, ঠিকানা লিখে দিতে বললেন। বুঝলাম ইনি পুলিশের লোক। জানা গেল, সমস্ত পান্ডা ও কিছু পুলিশ গেছে সত্যনারায়ণ প্রসাদের শেষকৃত্য করতে। একজন একটা বাঁকাচোরা অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাশে, এক গ্লাশ করে গরম চা দিয়ে গেল। চা বললে বোধহয় ভুল বলা হবে, এই মুহুর্তে এটাকে অমৃত বলাই উচিৎ হবে। আমরা জানালাম, এখনই আমরা গোমুখ ঘুরে আসতে চাই। লালবাবার গুরুভাই বললেন, খাওয়া দাওয়া করে যেতে। আমরা তবু বললাম, খেয়ে উঠে হাঁটতে কষ্ট হবে, আমরা বরং ঘুরে এসেই খাব। তিনি জানালেন, অল্প কিছু না খেয়ে যাওয়া উচিৎ হবে না। বাধ্য হয়ে খেয়ে যাওয়াই ঠিক হলো। পুলিশের লোকটি আমাদের বার বার সাবধান করে দিয়ে বললেন, অন্তত আধ মাইল দুর থেকে গোমুখ দর্শন করতে। ওখানকার অবস্থা মোটেই ভালো নয়। এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে। যে কোন সময় আবার বিপদ হতে পারে। কথা না বাড়িয়ে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে, তাই হবে। এবার আমাদের বাঁকাচোরা অ্যালুমিনিয়ামের থালায় ভাত ও ডাল, খেতে দেওয়া হলো। অল্প করে খাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এই ভাত আমার দু’দিনের খাবার। বাধ্য হয়ে বলতেই হলো, এত ভাত খেতে পারবো না। গুরুভাই বললেন, “খুব অল্পই ভাত দেওয়া হয়েছে, খেয়ে নিন, তা নাহলে শরীর খারাপ হবে”। আমরা আবার বললাম, “এত ভাত এখন খেতে পারবো না, ফিরে  এসে বরং আবার খাব”। ভদ্রলোক একটা খালি থালা নিয়ে আসলেন। আমরা তিনজনেই বেশ কিছুটা করে ভাত তুলে দিয়ে খুব অল্পই ভাত নিলাম। মনে হলো খেতে পারবো। কিন্তু শেষে দেখি আর খেতে পারছি না। ফ্যান সুদ্ধ ভাত, অল্প খেলেই পেট ভরে যায়। দিলীপ দেখি লক্ষী ছেলের মতো সব ভাতটা দিব্বি খেয়ে নিল। আমি ও মাধব ওকে আমাদের থেকে একটু তুলে নিতে বললাম। ও রাজি হলো না। শেষে বাধ্য হয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ঐ নালার জলে থালা ধুয়ে দিলাম। জলের স্রোতে সব ভাত, ডাল চলে যাবে। এই জলই এখানে পান করা হয়। এবার রওনা দিতে হয়। একটা ব্যাগে এক প্যাকেট খেজুর পুরে নিয়ে, ওয়াটার বটল্ ও লাঠিগুলো নিয়ে, বাকি দু’টো ঝোলা ব্যাগ খুঁটিতে টাঙ্গিয়ে রাখলাম। গুরুভাইকে বললাম, “রাস্তায় প্রয়োজন হতে পারে ভেবে, আমরা কিছু শুকনো চিড়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। কাজে লাগে নি। আপনার যদি আপত্তি না থাকে, ওটা রেখে দিতে পারেন”। ভদ্রলোক বললেন, “এখানে কোন কিছু দিয়ে যেতেও মানা নেই, প্রয়োজনে নিয়ে যেতেও মানা নেই”। চিড়ের প্যাকেটটা তাঁর হাতে দিয়ে বোঝামুক্ত হলাম। লালবাবার কথা অনেক পড়েছি, অনেকের কাছে অনেক শুনেওছি। এত কষ্ট করে তাঁর আশ্রমে এসেও, তাঁর সাথে দেখা হলো না, তাই মনে একটা দুঃখ থেকেই গেল।

আমরা গোমুখ দর্শনে বেড়িয়ে পড়লাম। সবজি বাগানের মাঝখান দিয়ে সরু রাস্তা পেরিয়ে ওপরের সেই বড় রাস্তায় পড়লাম। লালবাবার একটা টিনের বোর্ডে রাস্তার নির্দেশ দেওয়া আছে। একটু এগিয়েই দেখলাম, কয়েকজন পুলিশের লোক গোমুখের দিক থেকে আসছে। কাছে এসে তারা আমাদের সাবধান করে দিয়ে বললো, আমরা যেন অনেক দুর থেকে দেখি এবং সাদা পতাকার পরে আর না যাই। তারা আরও বললো, আমরা যেন ওপর দিয়ে না গিয়ে গঙ্গার পার দিয়ে যাই, এবং বড় পাথরের ওপর ছোট ছোট পাথর রেখে রাস্তায় চিহ্ন রেখে রেখে যাই, যে কোন্ পথে আমরা গিয়েছিলাম। তাহলে ফিরবার সময় রাস্তা চিনে ফিরে আসতে কোন অসুবিধা হবে না। তাদের সমস্ত কথায় সায় দিয়ে আমরা এগলাম। ভালোই রাস্তা, তবে প্রায় দেড় কিলোমিটার মতো পথ এগিয়েই রাস্তা শেষ। একটু দুরেই সাদা বরফের পাহাড় দেখা যাচ্ছে। ওখান থেকেই গঙ্গার জন্ম। এবার রাস্তা মানে বড় বড় এলোমেলো পাথর ফেলা। প্রায় প্রত্যেক বড় পাথরের ওপরেই ছোট ছোট পাথর রাখা। আগে যারা যারা এপথে এসেছে, যাত্রা পথের বড় পাথরের ওপর ছোট পাথর থাকুক বা না থাকুক, ওদের কথা শুনে বাধ্য ছেলের মতো নিজেরাও ছোট পাথর সাজিয়ে চিহ্ন রেখে গেছে। ফলে এটাই এখন সব থেকে অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারিদিকে খুব কম সংখ্যকই বড় পাথর আছে, যার ওপর ছোট পাথর রাখা হয় নি। যাহোক্, এখানে রাস্তা বলে কিছু নেই। পাথরের ওপর পাথর, তার ওপরে আবার পাথর ফেলে ফেলে, কেউ যেন এই রাস্তা পাহাড় তৈরি করার চেষ্টা করেছে। অনবরত পাথর গড়িয়ে পড়ে, এই রাস্তা বা পাহড়ের নতুন রূপ তৈরি হচ্ছে। আবার পাথর গড়াচ্ছে, আবার নতুন সাজে সাজছে। আমরা আগের রাখা পাথরের চিহ্ন লক্ষ্য করে, সাদা শৃঙ্গের দিকে এগলাম। এইভাবে আধ কিলোমিটার বা তার কিছু বেশি পথ পার হয়ে, সাদা পতাকাটা দেখতে পেলাম। পাথর সাজিয়ে তৈরি, বড় একটা ঢিবির মতো জায়গার ওপরে, লাঠির মাথায় পতাকাটা উড়ছে। পাথর বেয়ে ওপরে উঠলাম। দিলীপ ও মাধবকে বললাম অপেক্ষা করতে। এদিক দিয়ে এগনো সত্যিই বেশ শক্ত ও ঝুঁকির ব্যাপার। বন্ধুরা আমাকে আর এগতে বারণ করছে। ওরা কিন্তু ওখান থেকে এখনও গোমুখের আসল রূপটা দেখতেই পায় নি। কিন্তু ঢিবির ওপর পতাকাটার কাছে গিয়ে, চোখের সামনে গোমুখের রূপ দেখে, না এগিয়ে পারা যায়? গঙ্গার দিকে নেমে একবারে গোমুখের কাছে গেলাম। ওরাও এবার একই ভাবে আস্তে আস্তে আমার পাশে চলে এল। ডানদিকে বড় বড় দু’টো গহ্বর, তার বাঁপাশে দু’টো লম্বা লম্বা ফাটল। পুরো জায়গাটা কালো ধুসর রঙের। কিন্তু ওটা আসলে বরফ। বরফের রঙ কালচে সাদা কেন বুঝলাম না। ওপরেই সাদা বরফের চুড়া। আমরা দু’চোখ ভরে এই দৃশ্য শুষে নিলাম। জানি না এ জীবনে আর দ্বিতীয়বার দেখার সুযোগ পাব কী না। নিজেদের এখন ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে। সরু গঙ্গা ফাটল থেকে বেরিয়ে, নিজের খেয়ালে বয়ে যাচ্ছে। গঙ্গার মধ্যে অনেক বড় বড় পাথর পড়ে আছে। পাথরের ওপর উঠে অনেক ছবি তুললাম। কিন্তু এখানে গঙ্গার জল অসম্ভব রকমের ঘোলা। পাশে পাশে বরফ জমে আছে। তিনজন তিনটে ওয়াটার বটলে গঙ্গার জল ভরে নিলাম। এখানে কী ভাবে বিপদ হতে পারে, বা সত্যনারায়ণ প্রসাদ ও তাঁর সঙ্গী কী ভাবে বরফ চাপা পড়ে মারা গেলেন, তাও বোঝা গেল না। বরফ ভেঙ্গে পড়লেও তো এখানে ছিটকে আসতে পারে বলে মনে হয় না। কানে শুনতে না পেলেও, বরফ চাপা পড়লেন কিভাবে, রহস্যই থেকে গেল। আসবার পথে গঙ্গার ধারে একটু আগেই একটা শ্মশান দেখেছি। সম্ভবত ওখানেই সত্যনারায়ণ পান্ডাকে শেষবারের মতো ঘুম পারানো হয়েছে। তিনি সত্যিই ভাগ্যবান।

মাধব ও দিলীপ এবার ফিরতে বললো। আমার কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না। নন্দন কাননে তাঁবু খাটিয়ে তিনজনকে থাকতে দেখেছি। মনে হচ্ছে আমরা তিনজনও যদি ওরকম তাঁবু ফেলে দু’একটা দিন এখানে থাকতে পারতাম, কী ভালো হতো। প্রতিদিন যে নোংরা, বীভৎস গঙ্গাকে আমরা দেখি, তার এত সুন্দর রূপ? আরও মিনিট পনের-কুড়ি ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে গঙ্গার রূপ ও পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্য উপভোগ করে, ভূজবাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মনে হলো স্বর্গ বলে সত্যি যদি কোথাও কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেটা নিশ্চয় এখানেই। স্বর্গ সুখ যদি পেতে হয়, সব দুঃখ জ্বালা ভুলে যদি শান্তি পেতে হয়, তাহলে এখানেই আসা উচিৎ। একটু এগিয়ে সাদা পতাকার ঢিবিতে উঠবার চেষ্টা করলাম। ঢিবিতে পা দিয়ে উঠবার চেষ্টা করলেই, ছোট বড় পাথর ওপর থেকে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। শেষে এক পা তুলে, পাথরকে নীচে গড়াতে দিয়ে, না থেমে, চটপট্ ওপরে উঠে গেলাম। ঠিক যেন একটা গড়িয়ে যাওয়া ড্রামের ওপর দিয়ে হেঁটে, এখানে এলাম। তিনটে ওয়াটার বটলই আমার কাঁধে। দিলীপও একটু চেষ্টার পর উঠে এল। মাধব পাথর পড়ার দৃশ্য দেখে আর উঠতে পারে না। অনেক চেষ্টায়, ঐ গড়ানো পাথরের মধ্যে দাঁড়িয়েই, লাঠি বাড়িয়ে ওকে টেনে তুলে আনা হলো। কিছুক্ষণ পরে একইভাবে বিপদ মাথায় নিয়ে, নীচে নেমে এলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, বাঁদিকে একটা উচু ঢিবির ওপর একটা প্রজাপতি ধরার জাল, হাওয়ায় উড়ছে। চিনতে পারলাম। গঙ্গোত্রী থেকে আসবার পথে এক জাপানিকে গোমুখ আসতে দেখেছিলাম, তাঁর হাতে এরকম প্রজাপতি ধরার জাল ছিল। ওনার ইংরাজী উচ্চারণ ছিল অদ্ভুত। একটা শব্দও বোঝা যায় ন। অনেক সময় নিয়ে জেনেছিলাম, তিনি জাপানে শিক্ষকতা করেন। এখান থেকে স্যাম্পেল হিসাবে বেশ কিছু প্রজাপতি সে দেশে নিয়ে যাবেন, এবং সেই জন্যই তাঁর এখানে এত কষ্ট করে আসা। জানি না জাপানে প্রজাপতির অভাব আছে কী না। গোমুখ যে প্রজাপতির আড়ৎ, এ তথ্যই বা তিন কোথায় পেলেন, তাও জানি না। সত্যি, কত রকমের লোকই যে এই দুনিয়ায় আছে। আমরা কলকাতায় থাকি শুনে উনি বলেছিলেন—“কালখাতা? এ ড্যানঝারাস্ সিতি”। ১৯৭২ সালে তিন কলকাতা এসেছিলেন বলেই কী কলকাতাকে তাঁর ডেঞ্জারাস সিটি বলে মনে হয়েছিল? যাহোক্‌, জাপানিটাকে দেখলাম পাথরের ধারে শুয়ে থাকতে। একটা কুলি পিঠে টেন্ট্ বয়ে এনে, এখানে খাটাচ্ছে। অর্থাৎ আজ রাতে তিনি এখানেই থাকবেন। আমরা এবার এগলাম। মাধব বললো পাথরের ওপর পাথর রাখা চিহ্নগুলো ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। ওকে বললাম, যে যেদিক দিয়ে এসেছে, সে সেদিকে পাথর রেখে চিহ্ন রেখে গেছে। ফলে চরিদিকে অজস্র এই চিহ্ন দেখা যাওয়ায়, আরও অসুবিধার সৃষ্টি করছে। ঐ চিহ্ন দেখে হাঁটতে গেলে গোলকধাঁধার মতো একবার ওপরে, একবার নীচে, একবার ডানদিকে, একবার বাঁদিকে ঘুরে মরতে হবে। চিহ্নের কোন প্রয়োজন নেই, গঙ্গাকে বাঁপাশে রেখে এগিয়ে গেলেই, লালবাবার আশ্রম পাওয়া যাবে। নতুন হান্টার শূ এর অনেক জায়গায় আঠা খুলে ফাঁক হয়ে গেছে। একটু এগিয়ে গঙ্গার ধারে একটা পাথরের ওপর বসে, মনের সুখে খেজুর খেলাম। দিলীপকে জিজ্ঞাসা করলাম, এবার তার কেমন লাগছে? ডাবরানী থেকে এখানে আসতে না চেয়ে ফিরে যেতে চেয়েছিল বলে, আর একবার মন ভরে গালিগালাজ করলাম। ও অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে স্বীকার করলো, আমি জোর না করলে ওর এখানে আসা হতো না। এ দৃশ্য উপভোগ করার পর, আমি জানি আমায় কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে ওর উপায় নেই। আমি গর্ব করে বলতে পারি, ওদের থেকে আমার মানসিক জোর অনেক বেশি। আবার পথ চলা শুরু করলাম। এঁকেবেঁকে পাথর ডিঙ্গিয়ে, একসময় আমরা রাস্তায় এসে পড়লাম। বারবার পিছন ফিরে, এ জীবনে শেষবারের মতো গোমুখকে দেখতে দেখতে, একসময় লালবাবার আশ্রমের সামনে এসে হাজির হলাম। আশ্রমটা অনেক নীচে, ফলে ওখানে সূর্যালোক নেই। মনে করেছিলাম আশ্রমের ফটো পরে নেব। এখন জায়গাটা সূর্যালোকহীন। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত আমরা আশ্রমে অক্ষত অবস্থায় ফিরতে, সমস্ত লোক ও গুরুভাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। ভাবলাম যাত্রীদের জন্য এরা সত্যি কত চিন্তা করে। শুনলাম পুলিশ ও সকালের প্রায় সব লোক গঙ্গোত্রী ফিরে গেছে। কিছুলোক এখনও আছে। এরা সত্যনারায়ণ পান্ডার শেষকৃত্য সেরে ফিরেছে। আজই গঙ্গোত্রী ফিরে যাবে। সত্যনারায়ণ পান্ডার ভাইপো নিজেও এই দলে আছে। ওদের গোমুখ থেকে ফিরে আসা পুলিশের দলটায় দেখেছিলাম বলে মনে করতে পারলাম না। তাহলে ওরা কোন দিক দিয়ে ফিরে আসলো, তাও বুঝলাম না। যাহোক্, ওদের বললাম, আমরা ওদের সাথে গঙ্গোত্রী ফিরে যেতে চাই। উত্তরে ওরা জানালো যে, ওদের হাঁটার গতি অনেক বেশি, আমরা ওদের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারবো না। অন্ধকার নেমে আসলে রাস্তায় বিপদ হতে পারে, তাই আমাদের আগামীকাল ফেরাই উচিৎ হবে। ফলে হাতে আর কোন কাজ নেই, চা খেয়ে চট্ পেতে বসে থাকলাম। আগুনের পাশে বসে থাকতে বেশ ভালোই লাগছে। একটু পরেই ঐ দলটা গঙ্গোত্রী ফিরে গেল। বসে বসে চিন্তা করছি, ভালোয় ভালোয় যমুনোত্রী যেতে পারলে বাঁচি। আজকের অভিযানের পর, দিলীপকে নিয়ে আর কোন সমস্যা হবে না। এখন আমি নিজে যেতে না চাইলেও, ওই আমায় জোর করে টেনে নিয়ে যাবে। মাধবের শরীর নতুন করে খারাপ না হলে, ওকে নিয়েও কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু আসল সমস্যা তো এই মরণফাঁদ থেকে বেরনো। আর এই ফাঁদের বিস্তৃতি তো বিশাল। এখান থেকে সেই ভুখি পর্যন্ত। ওখানে না পৌঁছনো পর্যন্ত শান্তি নেই। কবে কিভাবে ফিরবো জানি না।

গুরুভাই আমাদের একটা বেশ বড় ঘরে নিয়ে গেলেন। আমরা আগুনের পাশ থেকে উঠে এসে, এই ঘরে এসে বসলাম। কাঠের মেঝে, কাঠের দেওয়াল। মেঝেতে কিছুটা ফাঁক ফাঁক অন্তর, সরু সরু কাঠের পাটাতন লাগানো। মনে হচ্ছে কড়ি-বরগার ছাদ যেন মেঝে হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর কারণ জিজ্ঞাসা করায় গুরুভাই জানালেন, ভিড়ের সময় যাতে কেউ বেশি জায়গা দখল করতে না পারে, তাই এ ব্যবস্থা। এক একটা ফাঁকে, এক একজনের শোবার ব্যবস্থা। ধনী, দরিদ্র, সবার জন্য একই ব্যবস্থা। এত সরু জায়গায় মোটাসোটা লোক হলে, কিভাবে শোবে ভেবে পেলাম না। ঘরে ঢুকবার ব্যবস্থাটাও ভারী অদ্ভুত। প্রথম ঘরের মধ্যে ঢুকে, ডানদিকের দেওয়ালে আর একটা দরজা দিয়ে দ্বিতীয় ঘরে যেতে হয়। আমরাও ঐ ভাবেই দ্বিতীয় ঘরে এসে উপস্থিত হলাম। দ্বিতীয় ঘরটায় কোন জানালা বা তৃতীয় দরজা নেই। প্রথম ও দ্বিতীয় ঘরের মাঝের দরজা বন্ধ করে দিলে, বাইরের এতটুকু ঠান্ডা হাওয়া, দ্বিতীয় ঘরে ঢোকার অবকাশ নেই। যাহোক্, এই দ্বিতীয় ঘরে ব্যাগ রেখে, ছোট্ট মন্দিরের মতো ঠাকুর ঘরের কাছে এলাম। আরতি শুরু হলো। লালবাবার গুরুভাই আরতি করছেন। মন্দিরের ভিতরে কোন চেনা জানা দেবদেবীর ছবি বা মুর্তি স্থান পায় নি। ভিতরে দেখলাম একটা হনুমান, গঙ্গাদেবী ও লালবাবার গুরুদেব, শ্রী বিষ্ণু দাসের ছবি। এখানেই শুনলাম লালবাবার গুরুদেব, শ্রী বিষ্ণু দাস বাঙালি ছিলেন। সম্প্রতি তিনি দেহ রেখেছেন। গোমুখ থেকে কিছুটা ওপরে, তপোবনে উনি আশ্রম করে থাকতেন। আরও শুনলাম, গোমুখ পেরিয়ে দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায় চল্লিশ কিলোমিটার পথ হেঁটে, বদ্রীনারায়ণ যাওয়া যায়। যাহোক্, আরতি শেষ হলো। এখানে আরতি কিন্তু অনেক সময় নিয়ে, লোক দেখানো ভড়ং করা নয়। খুব অল্প সময়ের জন্যই প্রদীপ ঘুরিয়ে, আরতি শেষ।

নালার জলে হাত দিয়ে মনে হলো, বরফ বোধহয় এর থেকে গরম। আগুনের সামনে বসে থাকাই আরামদায়ক। আশ্রমের কয়েকজন সেই একই প্রক্রিয়ায় রুটি তৈরি করছেন। বরঞ্চ এখানকার রুটি আরও স্বাস্থ্যবান। আমরা আর এক দফা চা খেলাম। মনে হয় এখানে অনেকটা চা একবারে করে, আগুনের পাশে রেখে দেওয়া হয়। যার যখন প্রয়োজন বা ইচ্ছা, পাত্রে চা ঢেলে খেয়ে, পাত্র ধুয়ে রাখে। চা শেষ হয়ে গেলে, নতুন করে আবার তৈরি করা হয়। রাত্রে এই স্বাস্থ্যবান রুটি ও সকালের সেই ডাল। এখানে একবার ডাল তৈরি হয় এবং সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত, অন্য কিছু তৈরি করা হয় না। ওটা শেষ হয়ে গেলে, আবার নতুন কিছু তৈরি করা হবে। গঙ্গোত্রীর পান্ডারা প্রায়ই এখানে আসা যাওয়া করে, ফলে বেশিদিন এ ডাল থাকবেও না।

আবার ঘরে এসে বসলাম। গুরুভাই একটা হ্যারিকেন দিয়ে যাবার সময় বলে গেলেন যে, তিনি আমাদের রাতের খাবার ঘরেই দিয়ে যাচ্ছেন, আমাদের আর কষ্ট করে ঠান্ডায় বাইরে যাবার দরকার নেই। আমরা বললাম, আমাদের কোন কষ্ট হবে না। বাইরে এসে আগুনের ধারে চট্ পেতে বসলাম। ভাবতেও অবাক লাগছে, কোথায় আমাদের বাড়ি, আর কোথায় কোন বরফের রাজ্যে, আগুনের ধারে চট্ পেতে বসে, ডাল রুটি খাচ্ছি। এই মুহুর্তে বাড়ির লোকেরা কী করছে কল্পনা করবার চেষ্টা করলাম। দু’টো মাত্র রুটি খেলাম। গুরুভাই বললেন, আমরা নিশ্চই লজ্জা করে কম খাবার খাচ্ছি। আমরা জানালাম, এই আতিথেয়তা আমরা কোনদিন ভুলবো না। এরপর লজ্জা করার কোন উপায়ই থাকে না। সত্যি সত্যিই আমাদের আর খিদে নেই। মনে মনে লালবাবা এখানে এখন নেই বলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। তিনি থাকলে দু’টো রুটি খেয়ে, এত সহজে কিছুতেই নিষ্কৃতি পেতাম বলে মনে হয় না। আবার এরকম একটা মানুষকে একবার চোখের দেখা দেখতে পেলাম না বলে, কিরকম একটা কষ্টও অনুভব করলাম। খাওয়া হয়ে গেলে, বরফ গোলা ঠান্ডা নালার জলে, নিজেরাই থালা ধুয়ে দিলাম। জল এত ঠান্ডা যে মুখে দেবার উপায় নেই, তবু ঐ ঠান্ডা জলই অনেক সময় নিয়ে বেশ কিছুটা করে পান করলাম। গুরুভাই এবার যে ঘরটায় আমরা ছিলাম, তার বাঁপাশে একটা  দরজা দিয়ে আমাদের নিয়ে গেলেন। দরজাগুলোর উচ্চতা খুব বেশি হলে, চার ফুট। দিলীপতো বারকতক মাথায় আঘাত পেল। যাহোক্, ঐ দরজা দিয়ে ঢুকে, বামদিকে ঐ রকম আর একটা দরজা দিয়ে, আমরা আর একটা কাঠের ঘরে প্রবেশ করলাম। বাইরের সঙ্গে এ ঘরেরও কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই। ফলে এই ঘরটাও বেশ গরম। গুরুভাই তাঁর ঘর থেকে, মেঝের ঐ দু’টো পাটাতনের ফাঁকের মাপে তৈরি লম্বা, সরু তোষক ও একগাদা কম্বল বার করে দিলেন। প্রায় দু’ভাঁজ করে তোষক পেতে, তার ওপরে কম্বল পেতে, শোয়ার রাজকীয় আয়োজন করে নিলাম। গুরুভাই আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আর কম্বলের প্রয়োজন আছে কী না। আমরা জানালাম, আমাদের আর কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। এতক্ষণে গুরুভাইকে আসবার পথে দেখা তারার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি জানালেন যে, তিনি ওরকম কিছু কখনও দেখেন নি। হয়তো কোন জ্যোতি হবে, ভগবানের আশীর্বাদ হিসাবে এখানে নেমে এসেছে। ঠিক খবর পাওয়া গেল না। আমরা তিনজন পরপর শুয়ে পড়লাম। আরও দু’একজন এই ঘরে শুতে এল। এখানেও পিসুর উৎপাত যথেষ্টই আছে। এই ক’দিনে আমার সারা গায়ে কালো কালো, উচু উচু, দাগ হয়ে গেছে।

ঘুম ভেঙ্গে গেল। জানি না ভোর হয়ে গেছে কী না। কারণ বাইরের আলো এই ঘরে প্রবেশ করতে পারে না। ঘরের বাইরে এসে দেখি, ভোর হয়ে গেছে। বেশ সুন্দর ভোরের আলোয়, দুরে গোমুখের সাদা পাহাড়, বেশ পরিস্কার নীল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আছে। আজ আগষ্ট মাসের একত্রিশ তারিখ। এবার আমাদের ফিরতে হবে। আমরা ফিরবার জন্য তৈরি হয়ে নিলাম। গুরুভাই চা খেয়ে যেতে বললেন। দেখলাম চা তৈরি হচ্ছে। চায়ের মধ্যে কী একটা কাঠের গুঁড়োর মতো দেওয়া হলো। জানি না পাইন গাছের গুঁড়ো কী না, কারণ এখানকার চায়ে, একটা পাইন গছের গন্ধ পাওয়া যায়। গুরুভাই এবার ডাল, রুটি খেয়ে যেতে বললেন। আমরা অনেক কষ্টে এই সকালে ডাল রুটি খাওয়ার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেলাম। এখানে থাকা খাওয়ার জন্য কোন পয়সা লাগে না। ছোট মন্দিরটার কাছে একটা দানবাক্স আছে। ইচ্ছা হলে দান বাক্সে কিছু দেওয়া যেতে পারে। কত দেওয়া হলো, আদৌ দেওয়া হলো কী না, কেউ দেখতে বা জানতেও চাইবে না। না দিলেও কোন ক্ষতি নেই। একটা বোর্ডে দেখলাম, বড় বড় বিখ্যাত সব মানুষের নাম, যাঁরা এই আশ্রমকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, সুষ্ঠুভাবে চলার জন্য, অনেক টাকা আশ্রমকে দান করেছেন। বেশিরভাগই বাঙালির নাম। বেশ ভালো লাগলো, ঊমা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, কমল গুহ (শঙ্কু মহারাজ) ইত্যাদি অনেকের নাম লেখা আছে দেখে। এঁরা আড়াই হাজার টাকা করে দান করেছেন। আমরা সামান্য মানুষ, অতি সাধরণ লোক। তাই আমরা মাত্র পনের টাকা দানবাক্সে রেখে দিলাম।

বছর দু’এক আগে, কৌশানীতে, গান্ধী আশ্রমে আমরা অনেকে ছিলাম। ওখানেও শুনেছিলাম কোন চার্জ নেই, যার যা ইচ্ছা দেবে। অথচ বাস্তবে, আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতিদিন দশ টাকা করে চেয়ে নেওয়া হয়েছিল। আমরা সেবার তেত্রিশজন ছিলাম। চার্জ অবশ্যই নেওয়া উচিৎ, তা নাহলে আশ্রম চলবে কিভাবে? মাথাপিছু দশ টাকাও মোটেই বেশি চাওয়া হয় নি। কিন্তু কোন চার্জ নেওয়া হয় না বলে ঢাক পিটিয়ে, একটা নির্দিষ্ট হারে চার্জ বাধ্যতা মুলক ভাবে নেওয়া হলে, ব্যাপারটায় কিরকম একটা বদ গন্ধ পাওয়া যায় না কী? ওরাও মানব সেবা করে, এবং ওদের সাহায্য করার অনেক স্পনসর আছে বলেও শোনা যায়। এরা আরও বিপৎসংকুল এলাকায়, অনেক কষ্টের মধ্যে থেকে, মানব সেবা করে। এদের পিছনে সাহায্য করার কে আছে? অথচ এই দু’ই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কত ফারাক। সবজি বাগানের ওপাশে অনেক খরচ করে বিরাট পাকা বাড়ি তৈরি হচ্ছে দেখে ভেবেছিলাম, লালবাবার আশ্রমকে আরও বেশি যাত্রীর সুবিধার্থে বড় করা হচ্ছে। গুরুভাই জানালেন, উত্তর প্রদেশ সরকার ওখানে ষোল কামরার ট্রাভেলার্স লজ্ বানাচ্ছে। এখানে লালবাবার আশ্রম না থাকলে, কতজনের গোমুখ দেখার সৌভাগ্য হতো, সন্দেহ আছে। আজ যেহেতু অনেক যাত্রী এখানে আসতে শুরু করেছে, তাই ব্যবসার খাতিরে বড় প্রাসাদ বানানো হচ্ছে। শুনলাম এই আশ্রম, সরকারের কাছ  থেকে কোন আর্থিক সাহায্য পায় না, বরং সরকারি জমিতে আশ্রম, চাষ ও জলের ব্যবহারের জন্য, সরকারকে ট্যাক্স্ দিতে হয়। তবে মিলিটারিদের কাছ থেকে এরা অনেকভাবে সাহায্য পায় বলে গুরুভাই জানালেন। অদ্ভুত, আমার তো মনে হয় না যে, যে একবার লালবাবার আশ্রমে থেকেছে, সে শুধু আরামে থাকার জন্য, পরের বার ঐ সরকারি ট্রাভেলার্স লজে থাকবে। যাহোক্, লালবাবার ডায়েরিতে নিজেদের নাম ধাম লিখে, লালবাবার তিনটে ভিজিটিং কার্ড নিয়ে, আমরা গঙ্গোত্রীর উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম।

আবার সেই কষ্টকর রাস্তা। এবার আবার সঙ্গে খাবার জলও নেই। লালবাবার ভিজিটিং কার্ডে কলকাতায় কখন, কোথায়, কোন সময়, তাঁর সাথে দেখা করা যাবে, সব লেখা আছে। এরকম একজন মানুষকে একবার দেখতে না পাওয়ায়, মনে একটা দুঃখ নিয়েই ফিরতে হচ্ছে। ঠিক করলাম কার্ডের সময় মতো, কলকাতায় তাঁর সাথে দেখা করে আসবো। গতকাল এ রাস্তার শেষ দিকে, ভীষণ ভাবে নীচের দিকে নামতে হয়েছিল। বেশ আরামে, বিনা কষ্টে, প্রায় ছুটেই নেমেছিলাম। এবার তার কুফল ভোগ করতে হচ্ছে। উপরে উঠতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। এর আগেও লক্ষ্য করেছি, নতুন কোন জায়গায় যাওয়ার সময় খুব কষ্টকর রাস্তাও খুব একটা কষ্টকর বলে মনে হয় না। অথচ ফিরবার সময় যেন আর হাঁটার শক্তি বা ইচ্ছা থাকে না। ফিরবার সময় যেন কষ্ট আর সহ্য করা যায় না। মাধব আর দিলীপ অনেক এগিয়ে গেছে। আমি সেই বিপজ্জনক রাস্তাটার কয়েকটা ছবি তুলবো ভেবে, আস্তে আস্তে ওদের অনেক পিছন পিছন হাঁটছি। এইভাবে এক সময় সেই ধুলো পাহাড়, যেখানে বড় বড় পাথর অনবরত নীচে নেমে এসে গভীর খাদে গড়িয়ে পড়ে, যেখানে আসবার সময় মাধবের কৃপায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছি, সেই জায়গায় এসে পৌঁছলাম। দেখি মাধব ও দিলীপ দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকার কারণ অন্য কিছু নয়, ঐ সরু বিপজ্জনক রাস্তায়, লাইন দিয়ে পরপর এক পাল গরু হেঁটে চলেছে। বিপজ্জনক রাস্তাটার ওদিক থেকে এদিক পর্যন্ত, সারিবদ্ধ গরুর পাল। যাচ্ছে গঙ্গোত্রীর দিকেই। হয়তো চীরবাসা বা অন্য কোথাও যাবে। একবারে পিছনে একটা লোক, সঙ্গে একটা বাচ্চা ছেলে। গরুগুলো কিন্তু একটুও এগচ্ছে না। ওরা না এগলে, আমাদের পার হয়ে যাবার উপায় নেই। একে অত্যন্ত সরু রাস্তা, তার ওপর গরুগুলো খাদ বাঁচিয়ে, ধুলো পাহাড় ঘেঁসে যাচ্ছে। ওদের পাশ দিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হলে, খাদের দিক দিয়ে যেতে হবে। এদের চরিত্রও সঠিক জানা নেই। একটু ঠেলে দিলে, একবারে সোজা গঙ্গায় চলে যাব। গরুর মালিক ও বাচ্চা ছেলেটা আমাদের পাশ থেকে একেবারে সামনের গরুগুলোর দিকে পাথর ছুঁড়ছে। পাথরের আঘাতে বা ভয় পেয়ে সামনের গরু একটু এগলে, গোটা লাইনটা একটু এগবে। এই চেষ্টাতেও গরুগুলো খুব একটা এগচ্ছে না। ভাবলাম, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে, জীবনে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। এ যেন মহাত্মা গান্ধী রোডের জ্যামে, বাসে করে কলেজ স্ট্রীট যাচ্ছি। লোকটা অভয় দিয়ে বললো, গরুগুলো খুব শান্ত, কোন ভয় নেই। পাশ দিয়ে চলে যেতে পারেন। অথচ সে নিজে বা তার চেলা, কেউ কিন্তু গরুগুলোর পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে, ওদের তাড়িয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে না। ওর কথাটা “মাথায় আমার শিং দেখে ভাই ভয় পেয়েছ কতই না- জানো না মোর মাথার ব্যারাম, কাউকে আমি গুঁতই না”, বা “মুগুর আমার হালকা এমন মারলে তোমার লাগবে না” গোছের সান্ত্বনা বাক্য বলে মনে হলো। ভয় হচ্ছে এত ধীর গতিতে গরুগুলোর পিছন পিছন বা পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে, গরুগুলো কিছু না করলেও, গতকালের মতো পাথর নেমে আসলে কী করবো? ছুটে পালাবার উপায়ও তো থাকবে না। শেষ পর্যন্ত কোন উপায় না দেখে, বাধ্য হয়ে পাশ দিয়ে এগিয়ে যাওয়াই স্থির করলাম। প্রথমে আমি, তারপর দিলীপ, সব শেষে মাধব। আমরা কিন্তু খাদের দিক দিয়ে গেলাম না। গরুগুলোর পিঠে চড় চাপড় মেরে, ডানপাশ দিয়ে, অর্থাৎ ধুলো পাহাড়ের ধার ঘেঁসে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এগিয়ে চললাম। গরুগুলো কিন্তু সত্যিই খুব শান্ত ও ভদ্র। আমাদের এগিয়ে যাবার রাস্তা না দিলেও, আক্রমন করার কোন ইচ্ছাই প্রকাশ করলো না। এরমধ্যে আবার নতুন এক বিপদ দেখা দিল। একটা গরু হঠাৎ কিরকম ভয় পেয়ে, খাদের দিকে খানিকটা কাত হয়ে নেমে গেল। গরুটা খাদে তলিয়ে গেল না। অসহায় ভাবে রাস্তায় উঠে আসার জন্য চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু হাঁচর পাঁচর করে রাস্তায় উঠে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, পা পিছলে যাওয়ায় উঠে আসতে পারছে না। পিছন থেকে লোকটা চিৎকার শুরু করে দিল। ভয় হলো গরুটা তলায় চলে গেলে, তার দায় না আবার আমার ওপর বর্তায়। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত গরুটা সম্পূর্ণ নিজের একক চেষ্টাতেই, আবার রাস্তায় উঠে আসতে সক্ষম হলো। আমরা ধরে প্রাণ ফিরে পেয়ে, আবার এগিয়ে চললাম। বেশ কিছুটা রাস্তা পার হয়ে এসে দেখলাম, স্থানীয় একটা ছেলে ঝরনার পাশে পাথরের ওপর বসে, কাপড় কাচছে। আমরা ঝরনার পাশে বসে, গতকালের সঙ্গে আনা পুরি ও খেজুর খেলাম। এই সাত সকালে একদিন আগেকার তৈরি ঠান্ডা, শক্ত পুরি খেতে ইচ্ছা করছে না। যে ছেলেটা কাপড় কাচছে, তাকে খানিকটা দিতে, সে জানালো যে সে খাবে না। কী আর করবো, ছুড়ে গঙ্গায় ফেলে দিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে আমরা সেই পাথর ফেলা জায়গাটায় এসে হাজির হলাম। এখানেই গতকাল আমরা রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পাথরগুলোর পিছন দিক দিয়ে পরিস্কার রাস্তা ধরে ব্রিজে এসে উঠলাম। এখান থেকে আর একবার দেখবার চেষ্টা করলাম যে কিভাবে গতকাল আমরা যাবার সময়, রাস্তা হারিয়ে গোলোকধাঁধায় ঘুরছিলাম। একসময় চীরবাসার সেই টিনের ছাদের ঘরটা চোখে পড়লো। আজকেও বেশ পরিস্কার আকাশ, সুন্দর রোদ উঠেছে।। খুব ভালো করে আগের দিনের দেখা তারার মতো জিনিসটা খুঁজলাম। গতকাল আর আজকের আবহাওয়া প্রায় একই রকম। আকাশের অবস্থা, সূর্যালোকও প্রায় একই রকম, এমন কী সময়টা এক না হলেও প্রায় কাছাকাছি, অথচ আজ কিন্তু তারাটা কোথাও দেখা গেল না। মনে মনে কিভাবে লঙ্কা থেকে ভুখি, এই মরণ ফাঁদ থেকে বার হবো, সেই চিন্তা করতে করতে পথ চলছি। চীরবাসার খুব কাছে এসে, ডানপাশে লাল রঙে “VIMAL” লেখা বড় পাথরটা চোখে পড়লো। দিলীপ ও মাধব একটু আগেই এখানে এসে গেছে। দিলীপকে বোতলটা বার করে আনতে বললাম। ও জানালো যে, সে আগেই কাজটা সেরে রেখেছে। ওটাকে ব্যাগে ভালোভাবে সোজা করে রেখে দিলাম। কাঁধের ব্যাগটা এখন বেশ ভারী বলে মনে হচ্ছে। কাঁধে যেন চেপে বসে যাচ্ছে। ওরা আবার এগিয়ে গেছে, আমি ধীরেসুস্থে পথ চলছি। তাড়াতাড়ি হাঁটতে গেলে বোতলটা কাত হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর ছবি তোলা আছে। একসময় ওদের আর চোখে না পড়ায়, বাধ্য হয়ে জোরে পা চালালাম। এঁকে বেঁকে বিপজ্জনক সরু রাস্তা পার হয়ে, একসময় মাধবের সাথে দেখা হলো। আমরা দু’জনে এবার একসাথে হাঁটতে লাগলাম। দিলীপ এগিয়ে গেছে। রাস্তা আর শেষ হয় না। এইভাবে একই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে, একসময় পুলিশ স্টেশনের কাছে এসে হাজির হলাম। পুলিশের দু’জন লোক আমাদের দেখে জিজ্ঞাসা করলেন “ফিরে এসেছেন? তিনজনেই এসেছেন তো”? আমরা জানালাম, আমরা তিনজনই ভালোভাবে ফিরে এসেছি। তাঁরা বললেন বাঁচা গেল, যেন একটা বড় চিন্তার হাত থেকে মুক্তি পেলেন। নীচে নেমে এসে, সেই চায়ের দোকানে বসে চায়ের অর্ডার দিলাম, সঙ্গে ঝুড়িভাজা।

কয়েকজন বেশ ভালো চেহারার যুবক এলো। থাকে হরিদ্বার। ওখান থেকে হেঁটে গঙ্গোত্রী এসেছে। আগেও নাকি একবার হেঁটে কেদার, বদ্রী, গঙ্গোত্রী, গোমুখ, যমুনোত্রী গিয়েছিল। এবার কয়েকজনের সামনে পরীক্ষা থাকায়, অন্য কোথাও যাবে না। আমরা জানালাম, আমরা এইমাত্র গোমুখ থেকে ফিরছি। যাহোক্, চা খেয়ে দিলীপ ও মাধব গেল জীপ এসেছে কী না খোঁজ করতে। জীপ এখান থেকে কিছুটা রাস্তা আগে দাঁড়ায়। দোকানদার জানালো “গতকাল ভোরে জীপ একবার এসেছিল। তারপর থেকে জীপ আর আসে নি। আজ হয়তো আসতে পারে। প্রায় প্রতিদিনই জীপটা আসে”। রামজীকে কোথাও দেখলাম না। মাধবরা ফিরে এসে খবর দিল, জীপ আসে নি। মাধব বললো জীপের জন্য অপেক্ষা করবে। আমি ও দিলীপ, দু’জনেই হেঁটে চলে যাবার কথা বললাম। কারণ, আজ যদি লঙ্কায় ডাবরানী থেকে বাস আসে, তবে সেটা ধরতেই হবে। কবে আবার দয়া করে আসবে বলা যায় না। মাধবের দেখলাম হেঁটে যাওয়ার কোন ইচ্ছা নেই। আমাদেরও যে হাঁটতে খুব ভালো লাগছে তা নয়, তবু আজ বাস আসলে সেটা ছেড়ে দেওয়া কোনমতেই উচিৎ হবে না। দু’দিন আগে আমরা বাসে লঙ্কায় এসেছিলাম। কাজেই গতকাল না আসলেও, আজ লঙ্কায় বাস আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। প্রায় সতের কিলোমিটর পথ হেঁটে সবে এসেছি। কিন্তু সবদিক চিন্তা করে, শেষ পর্যন্ত হেঁটে যাওয়াই স্থির হলো। ঠিক করলাম রাস্তায় জীপ আসতে দেখলে, তাতেই চলে যাব। আস্তে আস্তে লঙ্কার দিকে পা বাড়ালাম। হাঁটতে আর ভালো লাগছে না। আগেও শুনেছি, এবার রাস্তাতেও শুনলাম, যমুনোত্রীর প্রাকৃতিক দৃশ্য নাকি মোটেই সুন্দর নয়। ওখানে নাকি কিছুই দেখার নেই। তাই বোধহয় যমুনোত্রীর জন্য কষ্ট করতেও আর ভালো লাগছে না। বন্ধুদের মানসিক অবস্থা পরখ করবার জন্য বললাম, সবাই বলছে যমুনোত্রীতে দেখার মতো কিছুই নেই, তাই ওখানে এবার তারা যেতে চায় কী না। আশ্চর্য, এবার কিন্তু ওরা দু’জনেই, যমুনোত্রী যাবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলো। মনে মনে একটু নিশ্চিন্ত হলাম। তবে জানি না এই ফাঁদ থেকে বেরবার পর ওরা তো দুরের কথা, আমার নিজেরই কতটা ক্ষমতা বা ইচ্ছা থাকবে, যমুনোত্রী দেখার। প্রায় দশ কিলোমিটার পথ হাঁটলে, আমরা ভৈরবঘাঁটী চড়াই পৌঁছব। কয়েকজন হিন্দুস্থানী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও দেখলাম হেঁটে চলেছে। লঙ্কাগামী রাস্তা পাকা, তার ওপর খুব একটা উতরাই না হলেও, চড়াই নয়। কাজেই হাঁটার কষ্ট অনেক কম। তবু সতের কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে, নতুন করে দশ কিলোমিটার এই পথ, তা যতই ভালো রাস্তা হোক, হাঁটতে আমাদের বেশ কষ্টই হচ্ছে। ভৈরবঘাঁটী থেকে লঙ্কা আবার প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পার হতে হবে। আসবার সময় ঐ পথে আসতে কষ্ট হয়েছে ঠিক, কিন্তু ফিরবার সময় ঐ পথে মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। রাস্তা এবার সোজা উপর দিকে উঠতে শুরু করেছে। দিলীপ একটু এগিয়ে গেছে। আমি আর মাধব খুব আস্তে আস্তে, গল্প করতে করতে চলেছি। এ রাস্তায় জীপ যায়, কাজেই বিপদের সম্ভাবনা প্রায় শুন্য। বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে ডানপাশে, ওপর থেকে একটা বড় ঝরনা নেমে এসেছে। সঙ্গে তিন-তিনটে ওয়াটার বটল্ থাকলেও, সবকটাতেই গোমুখের পবিত্র গঙ্গাজল ভরে আনা হয়েছে। এপথে জলের কষ্ট খুব একটা হবে না। কিন্তু চিন্তা হচ্ছে, ডাবরানী থেকে ভুখি পর্যন্ত জল ছাড়া যাব কী ভাবে? আসবার সময় তিনটে ওয়াটার বটল্ সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও, জল ভরে না নিয়ে আসার জন্য, প্রচন্ড জলকষ্টে ভুগেছি। আট কিলোমিটার হাঁটা পথের দুই প্রান্তে দু’টো ঝরনা। ওই পথে ফিরবার সময় ওয়াটার বটল্ সঙ্গে থাকলেও, খাবার জল ভরে নিয়ে যাবার উপায় নেই। এখানে এখন নতুন কোন ওয়াটার বটল্ কিনতে পাওয়াও যাবে না। সঙ্গী দু’জনকে বললাম, একটা বটল্ খালি করে ঝরনার জল ভরে নেব। যমুনোত্রী থেকে বটলটায় যমুনার জল ভরে নেওয়া যাবে। ওরা কিন্তু যমুনার জল বয়ে নিয়ে যেতে রাজি হলো না। তিনটে বটলেই গোমুখের জল ভরে নিয়ে যেতে চায়। অগত্যা আকন্ঠ ঝরনার জল পান করে, এগিয়ে চললাম। বাঁপাশে গভীর খাদ। রাস্তার বাঁপাশে মাইল স্টোন। প্রতি কিলোমিটার রাস্তাকে, পাঁচ ভাগে ভাগ করে করে, মাইল স্টোনগুলো রয়েছে। যেমন, ভৈরবঘাঁটী ৯ কিলোমিটার। এরপর ২/৯, ৪/৯, ৬/৯, ৮/৯ । এরপর ভৈরবঘাঁটী ৮ কিলোমিটার। একটা মাইল স্টোন পার হয়ে কখন দুই দেখবো, তারপর চার দেখবো, তারপর কখন ছয় দেখবো, এই আশা নিয়ে ক্রমে এগতে লাগলাম। মনে হয় এই আশায় আমাদের হাঁটার গতিও অনেক বেড়ে গেল, অপর দিকে হাঁটার কষ্টও কিছু লাঘব হলো। “ধন্য আশা কুহকিনী”। আহা এই সময় যদি সুকুমার রায়ের “খুড়োর কল” একটা সঙ্গে থাকতো, তাহলে কত সুবিধাই না হতো।

রাস্তা একবারে ফাঁকা, কোথও কোন লোকজন নেই। সুন্দর সবুজ গাছপালা দিয়ে সাজানো নীচের খাদ যেন সেজেগুজে তার রূপ প্রদর্শন করছে। দিলীপ পাকা রাস্তা পেয়ে, বার বার অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার যেন আর শেষ নেই। এতদুর চলে এলাম, এখনও পর্যন্ত জীপটা ওদিক থেকে এলো না। ওটার জন্য অপেক্ষা না করে হেঁটে যাব স্থির করেছিলাম বলে বেঁচে গেলাম। কবে যে ওটা আবার গঙ্গোত্রী আসবে ভগবান জানেন। কয়েকজন বৃদ্ধ বৃদ্ধা রাস্তার একপাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। ওঁরাও লঙ্কার দিকেরই যাত্রী। আমরা না থেমে, ওঁদের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলাম। দিলীপকে দেখা যা্ছে না। ও বোধহয় সোজা জীপ রাস্তা পেয়ে, লাগাম ছাড়া হয়ে ছুটছে। রাস্তার উভয় পাশেই, নতুন কোন দৃশ্য চোখে পড়ছে না। একপাশে খাড়া পাহাড়, অন্য দিকে খাদ। কিন্তু সবুজ বনজঙ্গলে ঢাকা খাদ এখানে খুব গভীর নয়। রাস্তায় এমন কেউ নেই, যার কাছে নতুন কোন খবর পাওয়া যায়, পাওয়া যায় একটু উৎসাহ। একমাত্র রাস্তার মাইল স্টোনগুলো ভৈরবঘাঁটী থেকে তাদের নিজ নিজ দুরত্ত্ব জানিয়ে যেন ইশারায় আমাদের বলছে, জোরে, আরও জোরে, আর বেশি পথ নেই। একটু পরেই তোমরা পৌঁছে যাবে। ওগুলোর ওপর চোখ পড়লে যেন নতুন করে উৎসাহ পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আর সামান্য কয়েকটা দিন কষ্ট করলেই, আমরা আমাদের দীর্ঘদিনের মনস্কামনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবো। বাঁপাশে রাস্তা থেকে একটু নীচে, একটা দোকান চোখে পড়লো। ওখান থেকেই আসবার সময় জীপ ছেড়ে ছিল। ওটাই ভৈরবঘাঁটী, ওর পাশেই ভৈরবঘাঁটী মন্দির। গতি বৃদ্ধি হয়ে গেল। অনেকটা পথ ঘুরে ওখানে যেতে হবে। মাধবকে বললাম রাস্তার পাশ দিয়ে, ঢালু জায়গার ওপর দিয়ে, সাবধানে নেমে আসতে। পা পিছলে যাচ্ছে, পড়ে যাবার সম্ভাবনাও যথেষ্ট। পড়ে গেলে হাত পা কেটে ছড়ে যাবে। কোনমতে দু’জনে ওপর থেকে শর্টকাটে নেমে এসে দোকানে ঢুকলাম। দিলীপ আগেই চলে এসেছে। চা, বিস্কুট দিতে বললাম। সকাল থেকে একভাবে হেঁটে আসছি। প্রায় ছাব্বিশ-সাতাশ কিলোমিটার পথ হেঁটে এখানে এসেছি। এখন পর্যন্ত পেটে একটু ঝুড়িভাজা, একটা ঠান্ডা শক্ত পুরি, খান তিন-চার খেজুর আর দু’কাপ চা পড়েছে। খিদেও পেয়েছে খুব। তবে আমার মাথায় এখন ও চিন্তার থেকেও অনেক বড় চিন্তা, আজ লঙ্কা থেকে ডাবরানী যাবার বাস পাওয়া যাবে তো? এই দোকানে আলাপ হলো এক ভদ্রলোকের সাথে। থাকেন দেরাদুনে। ওখানেই ব্যবসা করেন। সময় পেলেই সোজা গঙ্গোত্রী চলে আসেন। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, হাওড়া ফেরার জন্য দুন এক্সপ্রেসে সহজে রিজার্ভেশন পাওয়ার জন্য, কোথায় যাওয়া ঠিক হবে, হরিদ্বার, না দেরাদুন? ভদ্রলোক বললেন, হরিদ্বার গেলে পেয়ে যাবেন। দেরাদুন থেকে তো অবশ্যই পাবেন, কারণ মুসৌরীতে এখন খুব কম টুরিষ্ট আসেন। ভরা সীজনেও টুরিষ্টের সংখ্যা হাতে গোনা যায়। এর কারণ মাদক বর্জন আইন অনুযায়ী, মুসৌরীতে এখন সোরাব বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ওখানে ভ্রমনার্থীর ভিড় একবারে নেই। যে কোন হোটেলে বেশ সস্তায় ঘর পাওয়া যায়। ওদের মনে তাই প্রচন্ড ক্ষোভ। আমরা ঠিক করলাম, যমুনোত্রী হয়ে সোজা হরিদ্বার চলে যাব। ওখান থেকেই ফেরার টিকিট কাটা যাবে। কয়েকদিন নির্ভেজাল বিশ্রাম নিয়ে, একটু চাঙ্গা হয়ে বাড়ি ফেরা যাবে। কিন্তু সে অনেক পরের কথা, আগে তো লঙ্কা পৌঁছই।

কাঁধের ঝোলা নিয়ে রাস্তায় নামলাম। লঙ্কা থেকে ভৈরবঘাঁটী আসার সময় আমাদের খুব একটা উল্লেখযোগ্য কষ্ট হয় নি। আসবার সময় ভৈরবঘাঁটীর কাছাকাছি বেশ কিছুটা রাস্তা নেমে এসেছিলাম। রাস্তাটা সিমেন্ট দিয়ে একটু পাকা করা হয়েছে। বেশ কিছু চওড়া চওড়া সিঁড়িও আছে। এবার সেগুলো ভেঙ্গে ওপর দিকে উঠতে হবে ভাবতেই, বুকের ভিতর কেমন একটা শিরশির করে উঠলো। হাঁটার গতিও বেশ কমে গেছে। সঙ্গীদের বললাম একটু জোরে পা চালাতে। এত কষ্টের শেষে বাস ধরতে না পারলে, আপশোসের আর সীমা থাকবে না। মাধব সরাসরি জানালো যে, ওর পক্ষে আর জোরে হাঁটা সম্ভব নয়। আমি আর দিলীপ এগিয়ে গেলাম। মাধব ধীরে ধীরে পেছনে আসছে। এবার একটা ব্রিজ পার হয়ে এলাম। এখানে ডানদিক থেকে একটা নদী এসে গঙ্গার সাথে মিশেছে। শুনলাম আগে এখানে এত ভালো ব্রিজ ছিল না। যদিও এখনও এটা একটা কাঠের তৈরি ব্রিজ, তবে বেশ চওড়া ও মজবুত। আগে নাকি লম্বা লম্বা, মোটা মোটা, গাছের ডাল ফেলে এখানে ব্রিজ তৈরি করা হয়েছিল। দু’টো নদীরই প্রকৃতি এখানে খুব একটা অশান্ত নয়, তবু নীচে তাকালে কিরকম একটা গা ছমছম করে। জানতে পারলাম, ডানদিকের নদীটাকে “নীলগঙ্গা” বলা হয়। কেউ কেউ আবার ওটাকে “জাহ্নবীগঙ্গা”ও বলে। যেদিক থেকে নদীটা এসেছে, সেদিকের বাসিন্দারা, ওটাকেই আসল গঙ্গা বলে দাবি করে। নদীটার জল, গঙ্গার তুলনায় বেশ পরিস্কার ও একটু নীল। আমরা ধীরে ধীরে, দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে ও জানতে জানতে, পথ চলছি। এই দু’-তিন কিলোমিটার রাস্তার পরেই, আজকের মতো বিশ্রাম। অবশ্য যতক্ষণ না ডাবরানী যেতে পারছি, ততক্ষণ এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তি পাব না। কারণ ততক্ষণ আমরা এখানকার পরিবহণ ব্যবস্থার হাতের পুতূল। তাদের মর্জির ওপর আমরা নির্ভরশীল। এখানেও দেখছি কিছু বৃদ্ধ বৃদ্ধা রাস্তায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। নিজের মুখ আজ প্রায় দিন পনের হলো দেখার সৌভাগ্য হয় নি। হাত পায়ের রঙ দেখে বেশ বুঝতে পারছি, শ্রীমুখের অবস্থা কী হতে পারে। পথে বসে থাকা এই অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের মুখে ক্লান্তির ছায়া। ওঁদের মুখমন্ডলকে আয়না হিসাবে ধরে বুঝতে পারছি, আমাদের এই অবসাদ, এই নিরুৎসাহ ভাব, অস্বাভাবিক কিছু নয়। লঙ্কার যত কাছাকাছি আসছি, গতি যেন তত কমে আসছে। শেষে ক্লান্ত, অবসন্ন দেহে লঙ্কার সেই পুরানো মিষ্টির দোকান কাম হোটেলে এসে বেঞ্চে বসে পড়লাম। প্রথমেই খবর নিলাম, আজ বাস এসেছিল কী না। দোকানদার জানালো, গতকাল কোন বাস ডাবরানী থেকে লঙ্কায় আসে নি। আজও কোন বাস আসে নি। আজ আর কোন বাস আসার সম্ভাবনা আছে কী না জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, আজকে সম্ভবত বাস আসবে। মনে মনে একটাই সান্ত্বনা, এখান থেকে একটাও প্যাসেঞ্জার না পেলেও, বাস আসার সঙ্গে সঙ্গে ডাবরানী ফিরে যাবে।

এখন বিকেল তিনটে বাজে। জানা গেল, দোকানে এখন কোন খাবার পাওয়া যাবে না। সারাদিনের শেষে প্রধান খাদ্য হিসাবে আবার সেই ঝুড়িভাজা ও চা দিতে বললাম। বসে বসে কোমর ব্যথা হয়ে গেল। বাস বোধহয় আজ আর আসবে না। হয়তো এদিকের লোকেদের এখন ময়দা, ডালডা, ইত্যাদির বিশেষ প্রয়োজন নেই। বুঝতে পারছি বাস আসার সম্ভাবনা ক্রমশঃ কমে আসছে। বন্ধুরা দোকানেই বসে রইলো। আমি যেদিক থেকে বাস আসবে, রাস্তা ধরে সেদিকে অনেকটা পথ এগিয়ে গেলাম। হঠাৎ মনে হলো দুরে, গাছপালার ফাঁক দিয়ে, একটা হর্ণের আওয়াজ এলো। কান খাড়া করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে মনে বেশ ফুর্তি হচ্ছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বুঝলাম, সারাক্ষণ বাসের চিন্তা, আমায় পাগল করে ছেড়েছে। আরও কিছুক্ষণ পায়চারি করে, দোকানে ফিরে এলাম। ওদের বাসের হর্ণের কথা বললাম। হঠাৎ আবার সেই হর্ণের আওয়াজ শুনলাম মনে হলো। এবার ওরাও আমার মতোই হর্ণের আওয়াজ শুনতে পেয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বুঝলাম, ওরাও আমার মতোই একই রোগের রোগী। এবার আমরা তিনজনেই একসাথে ভুল শুনেছি। এরমধ্যে আবার দোকানদার আমায় এসে জানালো যে, তার কপালে খুব যন্ত্রণা করছে, আমরা কোন ওষুধ দিতে পারবো কী না। এখন না হয় ঝুড়িভাজা খেয়ে কাটিয়ে দিলাম, কিন্তু রাতে থাকতে হলে, এই দোকানদার ছাড়া গতি নেই। তাই ওর সুস্থ থাকা, আমাদের থেকেও বেশি জরুরি। এসব জায়গার লোকেরা কোনদিন ওষুধ ব্যবহার করে না, বা ব্যবহার করার সুযোগও পায় না। তাই সাধারণ মাথা ব্যথার ওষুধেই তার যন্ত্রণার উপশম হবে জানি। তবু বিজ্ঞ ডাক্তারের মতো জিজ্ঞাসা করলাম, জ্বর আছে? হাতটা ধরে নাড়ি দেখার ভান করে, তাকে একটা স্যারিডন ট্যাবলেট দিয়ে খেয়ে নিতে বললাম।

মাধব তিতিবিরক্ত হয়ে বললো, বাসের দরকার নেই, চল্ ট্রাভেলার্স লজ বুক করি। একটু শুয়ে থেকে বিশ্রাম নেওয়া যাক। আমি বললাম, সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত দেখবো। ক্লান্তি আমারও খুব কম লাগছে না। তবে এখনই ঘর বুক করা বোকামি হবে, কারণ দেখা যাবে ঘরও বুক করলাম, আর বাসও এসে হাজির হলো। তার থেকে ছ’টা পর্যন্ত এখানে বসে অপেক্ষা করে, তারপর ঘর বুক করা যাবে। ও আর কথা বাড়ালো না। আমরা আর এক দফা চা খেয়ে, দোকানের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। দোকানটার সামনে বেশ কিছু পুরুষ ও মহিলা, বাসের অপেক্ষায় বসে আছে। একপাশে পরপর দু’টো কুঁড়েঘরের মতো, তার মধ্যেও অনেকে একই উদ্দেশ্যে বসে আছে। গতকাল থেকেই হয়তো ওরা এখানে বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা যে দোকানটায় বসে ছিলাম, তার ভিতরে একটা কাঠের মাচায়, কম্বল পেতে দু’জন শুয়ে আছে। পোষাক দেখে মনে হয়, ওরাও বাসে যাবে এবং গতকাল এখানেই রাত কাটিয়েছে। এখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে, স্থানীয় কিছু যুবক এল দোকানে আড্ডা মারতে। হঠাৎ তীব্র একটা হর্ণের আওয়াজ। নাঃ, এবার আর কোন ভুল হবার সম্ভাবনা নেই। উঃ! সে যে কী আনন্দ হলো, ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। মরণফাঁদ থেকে উদ্ধার করার জন্য, রথ এসে হাজির। এবার মনে হচ্ছে, আগের দু’বার এই বাসেরই হর্ণের আওয়াজ শুনেছিলাম। পথে থেমে থেমে, লোক নামিয়ে আসতে এত সময় নিল। বাসটা এসে লোক নামিয়েই, ফিরে যাবার জন্য ডাবরানীর দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ালো। আমি মহানন্দে ছুটে গিয়ে ড্রাইভারের হাতটা চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করলাম, “বাস আজ যাবে তো”? ড্রাইভার জানালো, একটু পরেই বাস ডাবরানী ফিরে যাবে। একবারে সামনে জানালার ধারে আমাদের জায়গা রেখে, নীচে নেমে দোকানে এলাম। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, দেখি গোটাকতক মিলিটারি এসে ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে শুরু করলো। একটু পরেই জানা গেল, মিলিটারিরা বলেছে আগামীকাল সকালে হরশীল থেকে ওদের ক্যাম্পের ত্রিশ-পঁয়ত্রিশজন মিলিটারির একটা দল, ডাবরানী যাবে। কাজেই এই বাস যেন কাল সকালে ছাড়ে। সকলের সব অনুরোধকে উপেক্ষা করে, ড্রাইভার ঘোষণা করলো, বাস আজ আর যাবে না, কাল ভোরে বাস ছাড়বে। ব্যাস, হয়ে গেল বাড়া ভাতে ছাই। আমরা বললাম, কাল সকালে বাস হরশীল গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, কবে মিলিটারিরা তৈরি হবে, তবে বাস ছাড়বে? ড্রাইভার জানালো, ওরা খুব ভোরে তৈরি হয়েই থাকবে। বাস হরশীল পৌঁছলেই, ওরা বাসে উঠে পড়বে। ড্রাইভারের কথা বলার ধরণ দেখে মনে হলো, এ ঘটনা এখানে আকছারই ঘটে, এবং বাস নিয়ে আজ ডাবরানী ফিরে আসার ক্ষমতা বা সাহস, কোনটাই তার নেই।

হায়! বহু আকাঙ্খিত রথ হাতে পেয়েও, সব হারালাম। কাল ওদের জন্য বাস যদি দেরিতে ডাবরানী পৌঁছয়, তবে কাল আর এগনো যাবে না। রাতে আবার বুদ্ধি সিং এর তাঁবুতেই থাকতে হবে। কিন্তু কিছু করারও তো উপায় নেই। তাই সেই ট্রাভেলার্স লজেই একটা ঘর বুক করলাম। ঘরটায় চারটে বেড, তাই কুড়ি টাকা ভাড়া লাগবে। প্লাইউডের দেওয়াল, অ্যাটাচ বাথ। বেশ ভালোই ব্যবস্থা, তবে সবই প্রায় অসমাপ্ত। গত বৎসর বন্যার আগে কাজ আরম্ভ হয়েছিল। বন্যার পর যাত্রী আসার সম্ভাবনা না থাকায়, কাজও বন্ধ হয়ে আছে। তাছাড়া উত্তরকাশীর সঙ্গে পরিবহণ ব্যবস্থার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকায়, মালপত্র নিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না। ঘরটা ভিতর থেকে বন্ধ করার কোন ব্যবস্থা নেই। কেয়ারটেকার জানালো, কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, ওটা করা হয়ে ওঠে নি। অ্যাটাচ বাথটা অর্ধেক তৈরি হয়ে পড়ে আছে। ওটা এখন স্টোর রুমের কাজ করছে। বাথরুমটার ভিতর প্লাইউড ও কাঠের টুকরো, বেশ কিছু ছোট বড় টিন, সরু-মোটা নানারকম তার, এবং এটা সেটা নানা জিনিসে ভর্তি। বাথরুম ছাড়া, আর সব কাজই তো মোটামুটি শেষ, তাহলে ঐটুকু একটা ছিটকিনি লাগাতে কেন এত অনীহা, বোধগম্য হলো না। ঠিক করলাম, একটা বেডকে টেনে এনে দরজার সঙ্গে চেপে পেতে দেব। কেয়ারটেকার পরামর্শ দিল, দরজা ও দেওয়ালের প্লাইউডের ফাঁকে ছোট একটা পাতলা কাঠের টুকরো গুঁজে দিয়ে দরজা বন্ধ করতে, তাহলে দরজা সহজে খুলবে না। মনে মনে ঠিক করলাম, দু’রকম ব্যবস্থাই করবো। ঘর ভাড়া এখন দিতে হলো না। কাল সকালে যাবার সময় দিলেই হবে। ঘরে ঢুকে একটা হ্যারিকেন দিতে বলে, তিনজন তিনটে খাটে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। এত ক্লান্তিকর দিন, এর আগে কোনদিন বোধহয় কাটাতে হয় নি। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ্ শুয়ে থেকে, মালপত্র ঘরে রেখে, বাইরে থেকে তালা দিয়ে দোকানে ফিরে এলাম। বৃদ্ধ দোকানদারের সাথে দেখা হতে, দুই হাত তুলে নমস্কার করে “ডাগতার সাব্” বলে সম্বোধন করে জানালো, তার কপাল যন্ত্রণা একবারে কমে গেছে। রাতের খাবারের অর্ডার দিলাম। আজও সেই আলুর তরকারি আর রুটি। এখানে অবশ্য দেখলাম, তরকারিটা একটা প্যানে, কাঠের আগুনে বসিয়ে, একটু নেড়েচেড়ে বেশ ঘন করা হয়। এরা এটাকে তরকারি ফ্রাই বলে। রুটিগুলো একটু পাতলা পাতলা করে করতে বলে, তরকারিটা ফ্রাই করে দিতে বললাম। দোকানটায় এখন অনেকগুলো যুবকের ভিড়। দেখে তো এদের স্থানীয় বলেই মনে হয়। কোথায় থাকে কে জানে। সন্ধ্যার পর হয়তো রোজই এরা এখানে এসে ভিড় করে।

যে বাসটা এসেছিল, সেটা দেখি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমরা খুব চিন্তায় পড়লাম। একবার কেটে পড়তে পারলে, আর হয়তো দু’চার দিনের মধ্যে কোন বাসের টিকি দেখা যাবে না। এগিয়ে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানলাম, বাসটা আজই রাতে আবার ফিরে আসবে। রাস্তা পরিস্কারের কাজ করার সময়, একজনের পায়ে একটা বড় পাথর পড়ে গেছে। বাসটা তাকে হরশীল পৌঁছে দিয়ে, আবার এখানে ফিরে আসবে। খুব ভাবনা হলো, সত্যি কথা বলছে তো? বাস সোজা ডাবরানী চলে যাবে না তো? যাহোক্, সঙ্গে নিয়ে আসা মাখন দিয়ে, যদিও তারও অবস্থা আমাদেরই মতো কাহিল, তরকারি ফ্রাই আর রুটি খেয়ে, ক্লান্ত দেহে, লজে ফিরে এলাম। কেয়ারটেকার বললো, আমরা যেন বাথরুমটা ব্যবহার না করি। ওটার কাজ এখনও শেষ হয় নি, এবং ওই ঘরে অনেক মালপত্র আছে। যদিও ওই ঘরে কী কী আছে, আমাদের মোটামুটি আগেই সব দেখা হয়ে গেছে, আমরা তার কথায় সম্মতি জানিয়ে, ঘরে ঢুকে প্ল্যান মাফিক দরজা বন্ধ করলাম। একটা খাটকে টেনে এনে দরজার সাথে ঠেকিয়েও রাখলাম।

কত রাত জানিনা, বাসের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল। শুয়ে শুয়েই বুঝতে পারলাম, হরশীল থেকে বাসটা কথামতো ফিরে এল। যাক্ নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এতগুলো রাত এ যাত্রায় কাটালাম, কোথাও কোনদিন রাত্রে বাথরুম যাবার প্রয়োজন হয় নি। আজ কেয়ারটেকার বাথরুমটা ব্যবহার করতে নিষেধ করাতেই বোধহয় পেট ফুলে গেছে। একবার ছোট বাইরে না গেলেই নয়। এ যেন, “প্রস্রাব করিবেন না” লেখা দেখলে, প্রস্রাব করার প্রবনতার মতো। ঐ রাতে মোমবাতি জ্বেলে, খাট টেনে, দরজা ও দেওয়ালের খাঁজে গোঁজা কাঠের টুকরো টেনে খুলে, বাইরে যাবার ইচ্ছা কার করে? এতগুলো কাজ করতে করতেই তো ভোর হয়ে যাবে। চুপ করে শুয়ে থাকাই শ্রেয় মনে হলো। ঘুমও আসে না, কী করা যায় ভেবে ভেবে, ব্যাপারটা আরও তীব্র আকার ধারণ করলো। একটা কিছু না করলেই নয়। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম আলো না জ্বেলে, চুপচাপ বাথরুমেই কাজটা সারতে হবে। সেইমতো হাতড়ে হাতড়ে বাথরুমে ঢুকলাম। বাথরুমে কোথায় কী আছে দেখেছিলাম বটে, কিন্তু এখন আর মনে করতে পারলাম না। মনে করবার চেষ্টা করার মতো অবস্থাতেও নেই। বাথরুমের ভিতরে সবে একটু ঢুকেছি, তারে পা জড়িয়ে গেল। মনে পড়লো তার দেখেছিলাম বটে। অন্ধকারে নিজেকে যত তারমুক্ত করতে চাইছি, টিনের পাতে তারের ঘষা লেগে, তত বিকট আওয়াজ হতে শুরু করলো। যে কেউ ঐ নিঝূম রাতে অনেক দুর থেকেও, সে আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পাবে। অথচ যে কাজে গেছি, সে কাজ থেকে বিরত হলেও তো, ঘরের খাটে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু আমার সামান্য নড়াচড়া, অসামান্য শব্দের সৃষ্টি করছে। সারারাত না নড়ে, ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো কী না ভাবছি। শেষ পর্যন্ত একটুও না নড়ে কাজ সেরে, মরিয়া হয়ে যা আছে কপালে ভেবে, আওয়াজ উপেক্ষা করেই তার থেকে পা ছাড়িয়ে, বিছানায় ফিরে এলাম।

আজ পয়লা সেপ্টেম্বর। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে, একবারে সামনের সিটে ও ঠিক তার পিছনের দু’জন বসার চেয়ার সিটে নিজেদের জায়গা রেখে এসে, দোকানে গেলাম। মাধব চা খেয়ে, দোকানের টেবিলের ওপর মানিব্যাগটা রেখে, আমাদের দাম দিয়ে দিতে বলে, একটু দুরে সকালের কাজ সারতে চলে গেল। একটু দুরে ট্রাভেলার্স লজের পাশেই, পরপর গোটা তিনেক পায়খানা। একটু ওপাশে মহিলাদের জন্য একই ব্যবস্থা। এখানেও ডাবরানীর মতোই ব্যবস্থা। দোকানে এখন কয়েকজন স্থানীয় যুবকের ভিড়। আমি চা খেয়ে, দিলীপকে দাম দিয়ে দিতে বলে, মাধবের মতো একই কাজে চলে গেলাম। অনেকক্ষণ পরে দিলীপ চা খেয়ে কাজ সেরে এসে বললো, “তোরা টাকা দিয়ে আসিসনি বলে চায়ের দাম দিতে পারলাম না”। শুনে তো আমার মাথা ঘুরে গেল। ও আসার পর, অন্তত দশ-পনের মিনিট কেটে গেছে। এতক্ষণে মানিবাগ নিশ্চয় অন্য কারো পকেট সঙ্গী হয়ে গেছে। দিলীপকে বললাম ছুটে দোকানে গিয়ে, বেঞ্চের ওপর দেখতে। ও চলে গেল। ব্যাগে প্রায় শ’চারেক টাকা তো ছিলই, তাও আবার একবারে নতুন নোট। ফলে ব্যাগের মুখ সবসময় ফাঁক হয়ে থাকে। একটু পরে দিলীপ, ফেলে আসা মানিব্যাগ হাতে নিয়ে ফিরে এল। ঠিক কত টাকা ছিল, এখনই বলা সম্ভব নয়, তবে মনে হয় টাকা পয়সা ঠিকই আছে। কারণ কেউ হাত দিলে সবটাই নিয়ে নিত, কয়েকটা নোট বার করে নিত না। অথচ ব্যাগটা মাধব যেখানে রেখে এসেছিল, দোকানদার ও ঐ যুবকদের চোখ পড়তে বাধ্য। দিলীপ জানালো, দোকানে এখনও সবাই বসে গল্প করছে। ও দোকানের বেঞ্চের ওপর থেকেই ব্যাগটা নিয়ে এসেছে। এদের সততা, আমাদের অসততা কমাতে পারলো না, এটাই দুঃখ। যাহোক্ ঘর থেকে ব্যাগ, লাঠি, ওয়াটার বটলগুলো নিয়ে এসে, বাসে উঠে বসলাম। কেয়ারটেকার এসে ভাড়ার টাকা নিয়ে গেল। আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর বাসও ছাড়লো। কিন্তু এ ওঠে তো সে ওঠে না, ফলে বারবার বাস দাঁড় করাতে হচ্ছে। ড্রাইভারও বিরক্ত হচ্ছে। এখন বাসে অল্প কয়েকজন মিলিটারিও আছে। এবার বাস সত্যিই ছেড়ে দিল এবং অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই, হরশীল এসে পৌঁছল। রাস্তার বাঁপাশে মিলিটারি ক্যাম্প। ওরা তৈরি হয়েই ছিল। নানা আকারের বন্দুক, রাইফেল, ইত্যাদি অস্ত্র, গোটা ও খোলা অবস্থায় নিয়ে বাসের ভিতরে ও ছাদে চটপট্ উঠে পড়লো। এদের সঙ্গে দেখলাম মদের বোতল, রেডিও, ইত্যাদিও আছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ক্যাম্প প্রায় ফাঁকা। এরা কোথায় যাবে জানি না, তবে এখানে বোধহয় একসাথে অনেকদিনই ছিল, কারণ যে দু’চারজন গেল না, তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে এবং মনে হলো তাদের চোখে জল। বাস ছেড়ে দিল। এরা কিন্তু আমাদের কোন অসুবিধা সৃষ্টি করলো না। আমরা আগের মতোই বেশ আরামে বসে আছি। একটু এগিয়েই রাস্তার ডানপাশে দেখলাম, গতকালের আহত ছেলেটাকে, একটা গাছের ডাল কেটে তৈরি স্ট্রেচারে শুইয়ে রাখা হয়েছে। জানালা দিয়ে তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। খুব কষ্ট পাচ্ছে। ওকে এই বাসে ডাবরানী নিয়ে যাবার জন্য, তার কয়েকজন সঙ্গী ড্রাইভারকে অনুরোধ করলো। ড্রাইভার জানালো, আহত ছেলেটাকে বাসে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না, শুইয়ে নিয়ে যেতে হবে। অথচ বাসের ভিতরে ও ছাদে কোথাও এতটুকু জায়গা নেই, যেখানে তাকে শুইয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। ড্রাইভার অবশ্য জানালো, ডাবরানী পৌঁছেই, হয় সে নিজে বাস নিয়ে ফিরে আসবে, না হয় অন্য কাউকে বাস নিয়ে পাঠাবে, আহত যুবকটিকে ডাবরানী নিয়ে যাবার জন্য। বাস ছেড়ে দিল। স্বার্থপর আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

একটু এগিয়েই এক সাধু হাত দেখিয়ে বাস দাঁড় করালেন। তাঁকে দেখেই চিনতে পারলাম। বাসে উঠে উনি আমাদের একবারে কাছে এসে দাঁড়াতেই, ওদিকের একজন একটু সরে বসে তাঁকে বসবার জায়গা করে দিল। আমি আমার বিশুদ্ধ হিন্দীতে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা, আপ্ কী, মানে….”। মাধব আমায় বললো, “তোর হিন্দী বুঝবেন না, বাংলাতেই জিজ্ঞাসা কর”। আমি আবার বললাম, “আচ্ছা, আপ্ কী…”, ব্যাস, সাধু আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই ভাঙ্গা ফ্যাঁসফেসে গলায় বাংলায় বললেন, “ভুজবাসার লালবাবা। তা তোরা তো তিনজনে গিয়েছিলি”? আমরা দিলীপকে দেখালাম। আসলে ভুজবাসায় লালবাবার ছবি দেখায়, তাঁকে চিনতে আমাদের কোন অসুবিধা হয় নি। লালবাবা এবার জাপানি ছেলেটা আশ্রমে উঠেছিল কী না, আশ্রমে আমাদের কোন অসুবিধা হয়েছে কী না, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন শুরু করে দিলেন। বুঝলাম ভুজবাসা থেকে আসার সময় তিনি গঙ্গোত্রীতে, ক’জন যাত্রী গোমুখ গেছে বা যাবে, তারা কোথা থেকে এসেছে, ইত্যাদি সমস্ত খবরাখবর নিয়েছেন। এবার তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, গতকাল তাঁর আশ্রম থেকে সকালে ফিরে আসার সময় আমরা রুটি খেয়ে এসেছিলাম কী না। বললাম “অত সকালে কিছু খেতে ইচ্ছা করছিল না, তাই শুধু চা খেয়েই আমরা বেড়িয়ে ছিলাম”। শুনে তিনি বললেন “খুব অন্যায় করেছিলি, ওপথে খালি পেটে হাঁটতে নেই। তার মানে সারাদিন কিছু খাওয়া হয় নি”? বাধ্য হয়ে বলতেই হলো, “বিকেলবেলা লঙ্কা পৌঁছে ঝুড়িভাজা খেয়েছিলাম। রাতে রুটি তরকারি খেয়েছিলাম”। উনি আবার বললেন, “খুব অন্যায় করেছিস”। ভাবলাম এর নামই বোধহয় মানব সেবা। কোন রকম পয়সা কড়ি না নিয়ে, নিস্বার্থভাবে এরকম মানব সেবা আর কেউ করেন কী না জানিনা, তবে লালবাবা না থাকলে যে গোমুখ দেখার নিশ্চিন্ত সুযোগ কারো ভাগ্যে জুটতো না, অন্তত আমাদের মতো সহায় সম্বলহীন, তাঁবুহীন যাত্রীদের পক্ষে, এটা বোধহয় বলা-ই যায়। অথচ গঙ্গোত্রীতে এবং লঙ্কাতেও দেখলাম, দোকানের সবাই, বিশেষ করে স্থানীয় পান্ডারা, লালবাবাকে নিয়ে কী ঠাট্টা বিদ্রুপই না করে। হয়তো লালবাবার নিস্বার্থ মানব সেবা, স্বার্থান্বেষী এই পান্ডাদের যাত্রীদের নিয়ে রমরমা ব্যবসার প্রধান অন্তরায়, তাই এত ঈর্ষা, তাই এত বিদ্রুপ। এবার আমি তাঁকে তাঁর আশ্রমে যাওয়ার পথে দেখা তারার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। উনি বললেন, “তোরা দেখেছিস? খুব পরিস্কার আকাশ থাকলে দিনের বেলায় ওটা দেখতে পাওয়া যায়”। আমি বললাম, “ফিরবার পথে প্রায় একই রকম পরিস্কার আকাশেও ওই তারাটা আমরা দেখতে পাই নি”। লালবাবা বললেন, “ওটার নাম পুচ্ছল। পুচ্ছল তারাকে রোজ দেখা যায় না। খুব পরিস্কার আকাশ থাকলে, মাঝে মাঝে দেখা যায়”। লালবাবার আশ্রমে এত কষ্ট করে গিয়েও তাঁকে দেখতে না পাওয়ার একটা দুঃখ বা মন খারাপের ব্যাপার ছিলই, সেই আকাঙ্খাও পুরণ হলো।

আমাদের এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তিদানের উদ্দেশ্যে, বাস তার নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছে। কাজেই যমুনোত্রী দেখতে পারলেই এ যাত্রা ষোল আনা পূর্ণ তো হবেই, হয়তো ফাউ হিসাবে কিছু বেশিই হবে। এই সব চিন্তা করতে করতে বেশ যাচ্ছিলাম, হঠাৎ চিন্তায় ছেদ টানলো আমাদের পরম আরাধ্য বাস দেবতাটি। ড্রাইভারের পাশে বসায়, অনেকক্ষণ থেকেই খুব পেট্রলের গন্ধ পাচ্ছিলাম। এখন বাসের ইঞ্জিন বন্ধ করে, সামনে ইঞ্জিনের ঢাকনা খুলে, ড্রাইভার জানালো, ইঞ্জিনে তেল বহনকারী পাইপটা ফেটে গেছে। বোঝ ঠ্যালা, এখনি হয়তো বলে বসবে বাস আজ আর যাবে না। ড্রাইভার সাহেব, বাসের ক্লীনার কাম কন্ডাক্টার কাম হেল্পারকে আগে এটা লক্ষ্য না করায় এবং প্রচুর তেল নষ্ট হওয়ায়, খুব একচোট গালিগালাজ করে, ওপর থেকে একটা নতুন পাইপ বার করে দিল। অনেক চেষ্টার পর ক্লীনার জানালো, মাপে গোলমাল আছে, ফিট করছে না। ড্রাইভার বাস থেকে নেমে অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও লাগাতে না পেরে, মেজাজ হারিয়ে, ক্লীনারকে গালিগালাজ করতে শুরু করে দিল। খুব ভয় পেয়ে গেলাম। হাজার হোক ঘর পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘের মতো, এ পথের বাস, জীপে একটু গোলমাল দেখলে, ভয় তো হবেই। যাহোক্, আরও বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর, পাইপটা লাগানো হলে, বাসের ইঞ্জিনে অনেক জল ঢালা হলো। এবার সুস্থ হয়ে, বাস ছেড়ে দিল।

লালবাবার সাথে মিলিটারিদের দেখলাম, খুব সুন্দর সম্পর্ক। তারা লালবাবাকে খুব সম্মান করে, বিনয়ের সাথে কথা বলছে। বাইরে আসা প্রসঙ্গে লালবাবা একজন যাত্রীকে বললেন, “মন্দির দেখতে চাও তো বদ্রীনারায়ণ যাও। মন্দির দেখে কী হবে? প্রকৃতির রূপ দেখতে চাও তো গোমুখ যাও, তপোবন যাও। এখন যাওয়া অনেক ঝামেলার তাই, না হলে যোশীমঠ থেকে মানস সরোবর কৈলাস যাও”। সত্যিই তাই, কত আশা নিয়ে বদ্রীনারায়ণ গিয়েছিলাম, ঐ কী মন্দির? মন্দির আর হোটেল গায়ে গায়ে বিরাজ করছে। কেদারনাথ সেই তুলনায় সত্যিই সুন্দর, পাগল করা সৌন্দর্য। লালবাবা বললেন, হরশীলকে আগে হরপ্রয়াগ বলা হতো। আরও কত কথা যে তিনি বললেন। কথায় কথায় একসময় আমরা ডাবরানী এসে গেলাম। ব্যাস্ মুক্তি। এবার আর অন্য কারো ওপর নির্ভর করতে হবে না। আমাদের পা দু’টোই  আমাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবে। লালবাবার একটা ছবি তুলবো বলে  দিলীপের কাছ থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে তৈরি হয়েই ছিলাম। উনি বাস থেকে নেমে আমাদের চেনা বুদ্ধি সিং এর দোকানে ঢুকলেন। সঙ্গে একজন লোক। পরে শুনলাম উনি লালবাবার গুরুভাই, ডাবরানীতেই থাকেন। দেখা হয়ে গেল বুদ্ধি সিং এর সঙ্গেও। বুদ্ধি সিং অনেকক্ষণ ধরে করমর্দন করে, সমস্ত খবরাখবর নিলেন। ভালোভাবে সমস্ত ঘুরে ফিরছি শুনে, তিনি খুশি হলেন। হঠাৎ দেখা হয়ে গেল গাংগানী-গরমকুন্ডের সেই সন্দেহজনক ব্যক্তিটির সাথে। একগাল হেসে এগিয়ে এসে, সব খবর জানতে চাইলেন। ভীষণ খারাপ লাগছে। তাকে অহেতুক ঐ রকম সন্দেহ করার জন্য, নিজেদের সত্যিই খুব অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আমাদেরও দোষ দেওয়া যায় না, আমরা যে সভ্য শহরের লোক, ঠগ্ দেখে দেখে, ভালো লোকও যে দেশে থাকতে পারে, বিশ্বাস করতেই ভুলে গেছি। যাহোক্, এবার একটা দোকনে চা আর বনরুটি খেয়ে, হাঁটার জন্য তৈরি হয়ে নিলাম। হঠাৎ দেখি লালবাবা তাঁর গুরুভাইয়ের সাথে এগিয়ে আসছেন। তিনি তাঁর ছবি তুলতে দেন কী না জানিনা, তাই সরাসরি বললাম, যদি অনুমতি করেন তো আপনার একটা ছবি তুলতাম। উনি বললেন, “আমার ছবি? আমার ছবি নিয়ে কী করবি”? বললাম, বাঁধিয়ে রাখবো। উনি ছবি তুলতে বললেন। গুরুভাই, মাধব ও দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর একটা ছবি নিলাম। মাধব তার জায়গায় আমাকে দাঁড় করিয়ে, আর একটা ছবি তুললো। তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, এগিয়ে চললাম সেই প্রাণান্তকর কষ্টের, আট কিলোমিটার রাস্তার উদ্দেশ্যে।

এবার আর ভুল করা নেই। একটু এগিয়েই প্রথম ঝরনার জল পেট ভরে খেয়ে নিলাম। পথে আর জল পাওয়া যাবে না। ধীরে ধীরে বেশ একটা খুশির মেজাজে হেঁটে চলেছি। উল্টো দিক থেকে অনবরত মিলিটারি ঘোড়া ও খচ্চর, মাল বয়ে নিয়ে আসছে। একটা খচ্চরকে রক্তাক্ত অবস্থায়, খুব ধীরে ধীরে আসতে দেখলাম। শুনলাম সেটা খাদে পড়ে গিয়েছিল। এবার এই ফাঁদ থেকে বেরবার তাগিদেই বোধহয়, হাঁটতে সেরকম কষ্ট অনুভব করছি না। এ পথটা আবার অদ্ভুত, কোথাও সমতল রাস্তা নেই। হয় একবারে জিভ বার করে ওপরে ওঠো, না হয় একবারে সোজা নীচের দিকে নামো। আমরা এখন ওপর দিকে উঠছি। প্রথমে মাধব, তার ঠিক পিছনে আমি, সব শেষে দিলীপ। ওপর থেকে বেশ কয়েকটা খচ্চর, পিঠে অনেক মালপত্র নিয়ে, লাইন দিয়ে নেমে, আমাদের দিকে আসছে। মাধব রাস্তার একপাশে সরে দাঁড়ালো। রাস্তার ডানপাশে গভীর খাদ। অনেক নীচ দিয়ে রুপালি ফিতের মতো গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। বাঁপাশে খাড়া পাহাড় ও রাস্তার মাঝখানে একটু নীচুতে, খানিকটা কাঁচা জায়গা, হয়তো বৃষ্টি বা বর্ষার জল বয়ে যাওয়ার জন্য নালার মতো করে রাখা। যাহোক্, মাধব একপাশে সরে গিয়ে, আমাকেও সরে দাঁড়াতে বললো। আমি দেখলাম খাদের দিকে দাঁড়ানো ঠিক হবে না। নীচের ঐ সরু নালার মতো কাঁচা জমিটায় না নেমে, শরীরটাকে একটু কাত করে, খচ্চরগুলোকে যাবার জায়গা ছেড়ে দিলাম। খচ্চরগুলো পরপর মাধব ও আমাকে অতিক্রম করে চলে গেল। সামনের দিকে এগোতে যাচ্ছি, হঠাৎ কী রকম একটা আওয়াজ হতে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, দিলীপ একটা খচ্চরের মালপত্রের ধাক্কায়, বাঁপাশের সেই নীচু সমতল কাঁচা জমিতে নেমে গেছে। খচ্চরগুলোর পিছন পিছন একটা লোক, ওগুলোকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে ঠিকমতো নিয়ে যাচ্ছে। দিলীপ খুব কড়া দৃষ্টিতে ভ্রু কুঁচকে, ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, রাস্তায় উঠে এসে, আমাদের পিছন পিছন আবার ওপর দিকে হেঁটে চললো। বেশ কিছুটা পথ যাওয়ার পরে মাধব হঠাৎ আবিস্কার করলো, যে দিলীপের ওয়াটার বটলের ঢাকনা-কাম গ্লাশটা, বটলের সাথে নেই। বটলটার মুখে একটা পাতলা চাকতি চেপে বসানো থাকে। তার ওপরে গ্লাশটা প্যাঁচ দিয়ে লাগাতে হয়। কাজেই গ্লাশ বিহীন ঐ ওয়াটার বটলের কোন মূল্যই নেই। আমি বললাম খচ্চরের ধাক্কায় নিশ্চই ঢাকনাটা ওখানে পড়ে গেছে। দিলীপ আর বৃথা সময় নষ্ট না করে, আবার নীচের দিকে অকুস্থলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। আমরা পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে দিলীপ ফিরে এলো বটে, তবে গ্লাশ বিহীন। ওটাকে খুঁজে পাওয়া যায় নি। এখন পর্যন্ত আমার বর্ষাতির টুপি, মাধবের লাঠির নাল, আর দিলীপের ওয়াটার বটলের গ্লাশ, তাদের নিজ নিজ প্রভুদের ত্যাগ করে, হিমালয়ে চলে গেছে। আর কে কে, কাকে কাকে ছেড়ে চলে যাবে জানি না। দিলীপকে বললাম মন খারাপ না করে সামনের দিকে এগতে। উত্তরকাশীর আগে কিছু করার উপায় নেই। উত্তরকাশী গিয়ে বটলের মুখটা, পলিথিন সিট ও কাগজ দিয়ে ভাল ভাবে শক্ত করে বেঁধে দেবো। এবার আমরা বেশ জোরে হাঁটা শুরু করলাম। আজ কিন্তু সেরকম উল্লেখযোগ্য পরিশ্রম বোধ হচ্ছে না। একসময় মাধব দেখালো কিছুটা পিছনে, নীচের দিকে লালবাবা হেঁটে আসছেন। ওনার হাঁটার গতি এত দ্রুত, যে এর মধ্যে আমাদের ধরে ফেলেছেন। এখন বুঝতে পারছি, সেদিন সন্ধ্যার সময় লালবাবার আশ্রম থেকে সত্যনারায়ণ পান্ডার দাহ শেষে, ওরা আমাদের কেন ওদের সাথে গঙ্গোত্রী নিয়ে যেতে রাজি হয় নি। আমি বেশ দ্রুত হেঁটে চলেছি। রাস্তা অনবরত বাঁক নিচ্ছে, ফলে একটু পরেই দিলীপ ও মাধব, আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। কতটা পথ এইভাবে এগিয়েছি জানি না, সামনে জনা ছয়-সাত যুবক যুবতীকে আসতে দেখলাম। সবাই বাঙালি। এই প্রথম এই রাস্তায় বাঙালি কোন মহিলা যাত্রী, যাত্রী না বলে তীর্থযাত্রীকে বলা বোধহয় ঠিক হবে, আসতে দেখলাম। ওরা নিজেরাই আলাপ শুরু করে দিল। হাওড়া-কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ওরা এসেছে। যমুনোত্রী হয়ে গঙ্গোত্রী যাচ্ছে, ক্ষমতায় কুলোলে গোমুখ যাবে। তবে এদের কথাবার্তায়, গোমুখ যাবার মতো ক্ষমতা থাকলেও, মনোবল আছে বলে মনে হলো না। প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্যই জানালাম। ওরা জিজ্ঞাসা করলো, ডাবরানী থেকে আজ বাস পাওয়া যাবে কী না। আমাদের অভিজ্ঞতার কথা বলে জানালাম, ভাগ্য ভালো থাকলে, প্যাসেঞ্জার পাওয়া গেলে, ড্রাইভারের মর্জি হলে, আজই বাস পাওয়া যেতে পারে। প্যাসেঞ্জার না পেলে, দশ দিনও অপেক্ষা করতে হতে পারে। ইতিমধ্যে মাধব ও দিলীপ এসে গেছে। এই দলটার কাছে আমরা এবার যমুনোত্রীর পথ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলাম। একজন শ্রীরামপুরের যুবক জানালো, যমুনোত্রীর পথ খুবই কষ্টকর। সেই তুলনায় এ পথে কষ্ট অনেক কম। যুবকটি আরও বললো, ও পথে দেখার বিশেষ কিছু নেই, শুধু মাত্র যাওয়ার জন্যই যাওয়া। চেষ্টা করে দেখুন, পৌঁছে যেতে পারেন। ওর বাচনভঙ্গি সহ্য হলো না। বললাম, আমরা হেমকুন্ড সাহেব, ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স, বদ্রীনারায়ণ, বসুধারা, ত্রিযুগীনারায়ণ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী ও গোমুখ হয়ে, যমুনোত্রীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছি। এতগুলো জায়গার পথের কষ্ট নিশ্চই যমুনোত্রীর পথের কষ্টের চেয়ে কিছু বেশিই হবে। কাজেই আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন, আমরা ওখানে পৌঁছে যাব। ওরা এই মরণফাঁদ থেকে কম কষ্টে, সহজে ফিরে আসুক কামনা করে, শুভেচ্ছা জানিয়ে, আমরা আবার এগিয়ে চললাম। একে গোটা রাস্তাটাই খুব চড়াই উতরাই ভাঙ্গতে হয়, তার ওপর আমরা আবার বাইপাস্ ব্যবহার করতে শুরু করলাম। ফলে প্রাণান্তকর কষ্ট হলেও, খুব তাড়াতাড়ি এগতে লাগলাম। তবু যেন যাওয়ার সময়ের কষ্টের কাছে কিছুই কষ্ট নয় বলে মনে হচ্ছে। সব জায়গায় দেখেছি, যাওয়ার সময় একটা নতুন জায়গা দেখার আগ্রহেই বোধহয়, হাঁটার কষ্ট ফেরার সময়ের তুলনায় অনেক কম বলে মনে হয়। একমাত্র এই পথে, ফাঁদ থেকে বেরবার তাগিদেই বোধহয়, ঠিক তার উল্টো অনুভুতি হচ্ছে। আসবার সময় কিছুটা এগিয়ে একটা ছোট ব্রিজ পার হতে হয়েছিল। ব্রিজটার তলায় অল্প নীচু দিয়ে কোন একটা ঝরনা বা ছোট পাহাড়ি নদীর জল, নীচে গঙ্গায় গিয়ে পড়ছে। মাধব অনেক ওপর থেকে চিৎকার করে আমায় ডেকে, খাবার জল সংগ্রহ করতে বললো। আর কিছুটা এগলেই, যাবার সময় দেখা প্রথম ঝরনাটা পাওয়া যাবে। তবু ওর কথায় দাঁড়িয়ে পড়লাম। কয়েকজন স্থানীয় ছেলে মগ হাতে ব্রিজের শেষে দাঁড়িয়ে আছে। ওরাও বোধহয় এই ব্রিজের নীচ থেকেই জল তুলে এনে পান করেছে। পাত্রটা চেয়ে নিয়ে খুব ঢালু পথ বেয়ে নেমে, খানিকটা জল এনে আমরা তিনজনই অল্প করে জল পান করলাম। পাত্রটা ফেরৎ দিয়ে আবার এগিয়ে চললাম। আরও খানিকটা পথ এগিয়ে গাংগানীর সেই জলপাই রঙের নতুন ব্রিজটা চোখে পড়লো। গতি বৃদ্ধি করে এগিয়ে গিয়ে, গাংগানীর একটু আগে একটা চায়ের দোকানে, একজনের ডাকে ঢুকলাম। আসবার সময় গাংগানী বা গরমকুন্ড থেকে একটু ওপরে উঠে অনেকগুলো সম্ভবত মিলিটারি তাঁবু দেখেছিলাম। এই দোকানটা তখন বন্ধ ছিল। এখন শুনলাম, ওই তাঁবুতে রাতে থাকার ব্যবস্থা আছে এবং খাটিয়া ভাড়া পাওয়া যায়। যে ভদ্রলোক আমাদের ডাকলেন, তিনি বললেন, “আপনারা তো যাবার সময় গরমকুন্ডে ছিলেন। ওই দোকানে আমি আপনাদের দেখেছিলাম”। আমরা ভালোভাবে ঘুরেছি শুনে উনি খুব খুশি হলেন। এমন সময় পাশ দিয়ে লালবাবাকে যেতে দেখলাম। ওনার আসতে এত বিলম্ব হলো কেন বুঝলাম না। দোকানের ভদ্রলোক লালবাবাকে চা খেয়ে যাবার জন্য ডাকলেন। লালবাবা জানালেন, গরমকুন্ডে স্নান সেরে উনি চা খাবেন। আমরা চা খেয়ে, ভদ্রলোকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, এগিয়ে গেলাম। যাবার পথে লালাজীর দোকানে একবার উঁকি দিয়ে গেলাম। লালাজীর দেখা মিললো না। আমরা ব্রিজ পার হয়ে, সোজা ভুখির উদ্দেশ্যে এগলাম।

এবারের রাস্তা ভাঙ্গা হলেও বাস রাস্তা। সঙ্গীদের বললাম পা চালাতে। সম্ভব হলে আজই ভুখি থেকে সোজা উত্তরকাশী চলে যাব। যথেষ্ট সময় হাতে আছে। একসময় আমরা ভাঙ্গা এবড়ো খেবড়ো জায়গাটা পার হয়ে, যেখানে ড্রিল করে ব্লাষ্টিং করিয়ে, পাহাড় কেটে, রাস্তা তৈরি হচ্ছে, সেই জায়গায় এসে হাজির হলাম। দুর থেকে দেখলাম কয়েকজন লোক, ঐ ব্লাষ্টিং করা জায়গাটার আগের বাঁকটায় বসে আছে। আমি ও দিলীপ আর একটু এগতেই, লোকগুলো ভাঙ্গা জায়গাটায় কর্মরত লোকগুলোর ইঙ্গিত পেয়ে এগিয়ে চললো। একটা বুলডোজার দাঁড়িয়ে আছে। ওটা ব্লাষ্টিং করে ভাঙ্গা পাহাড়ের টুকরোগুলো, গভীর খাদে ঠেলে ফেলছে। মাধবের পায়ের ব্যথাটা বোধহয় আবার বেড়েছে। চিৎকার করে ওকে তাড়াতাড়ি আসতে বললাম। বুলডোজারটা লোক চলাচলের জন্য কিছুক্ষণ কাজ বন্ধ করে দাঁড়িয়েছে। ওটা কাজ শুরু করলে আবার অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমি প্রায় পার হয়ে গিয়ে, মাধবকে হাত নেড়ে তাড়াতাড়ি আসতে বলছি, কারণ আমি ও দিলীপ পার হয়ে গেলেও কোন লাভ নেই। মাধব না আসলে, ওর জন্য অপেক্ষা করে সেই বসে থাকতেই হবে। বুলডোজারটা আর অপেক্ষা না করে, নড়ে উঠে কাজ শুরু করে দিল। একজন পাঞ্জাবি ভদ্রলোক কাজ তদারকি করছেন। ভদ্র্রলোক আমাকে ডেকে এদিকে ফিরে আসতে বললেন। আমি ফিরে চলে এলাম। ইতিমধ্যে মাধব এসে গেছে। পাঞ্জাবি ভদ্রলোক বললেন—“একটু অপেক্ষা করে যান। এখন পার হওয়া বিপজ্জনক”। বুলডোজারটা পাথরগুলো খাদে ঠেলে না ফেলে, রাস্তার ধারে, খাদের দিকে জড়ো করে রাখছে। সম্ভবত একবারে ঠেলে সব পাথর তলার খাদে ফেলবে। ঐ জড়ো করা পাথরের ওপর দিয়েই আমাদের পার হতে হবে। অর্থাৎ একবারে রাস্তার ধারে, শেষ প্রান্ত দিয়ে যেতে হবে। ভয় হচ্ছে কোন পাথরে পা দিয়ে, পাথর সমেত খাদে না চলে যাই, কারণ সমস্ত পাথরই ভাঙ্গা ও আলগা নড়বড়ে। অনেক নীচ দিয়ে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। তলায় গড়িয়ে পড়লে গঙ্গার জল মুখে ঢোকার আগেই, গঙ্গাপ্রাপ্তি হবে। আমরা ভাঙ্গা জায়গাটা পার হবার জন্য এগলাম। প্রথমে আমি, আমার পিছনে দিলীপ ও সবশেষে মাধব। খুব সাবধানে আমরা জায়গাটা পার হয়ে এলাম। এবার রাস্তা পাকা ও বেশ ভালো। বাস যাবার উপযুক্ত। এবার আর হাঁটায় কোন অসুবিধা নেই। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ভুখি চলে এলাম।

হায় কপাল! একটা বাসকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম না। টিকিট কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানলাম, আজ কোন বাস যাবে না। কাল ভোরে বাস ছাড়বে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আজ বাস না পাওয়া মানে পুরো একটা দিন নষ্ট। তাও আবার ভুখির মতো একটা অখ্যাত গন্ডগ্রামে। আজ উত্তরকাশী যেতে পারলে, আগামীকালই আমরা যমুনোত্রী যাবার হাঁটাপথের শুরু, সায়নাচট্টি চলে যেতে পারতাম। এখন তো মনে হচ্ছে এর থেকে গরমকুন্ডে লালাজীর দোকানে থেকে গেলেই ভালো করতাম। কোন উপায় নেই। বাঁপাশের ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে ঢুকে চায়ের অর্ডার দিলাম। এই দোকানের সাথে কথা বলে, এখানেই রাতের বিশ্র্রাম নেবার ব্যবস্থা প্রায় পাকা করে ফেললাম। এখানেও কোনরকম আমিষ খাবার পাওয়া যাবে না। তার মানে সেই রুটি আর পচা আলুর তরকারি কপালে নাচছে। একটু কিছু ভালো খাবারের জন্য, জিভ একবারে ছটফট করছে। থাকা খাওয়ার কথা পাকা করার ব্যাপারে কথা বলছি, এমন সময় একটা বাস উত্তরকাশীর দিক থেকে এসে হাজির হলো। আবার টিকিট কাউন্টারে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বাস আজ যাবে, তবে ঊত্তরকাশী পর্যন্ত যাবে না। আজ “ভাটোয়ারী” পর্যন্ত যাবে। ওখানে বাস কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে, সম্ভব হলে উত্তরকাশী যাবে। এখানে থাকা খাওয়ার প্রোগ্রাম চটজলদি বাতিল করে, তিনটে ভাটোয়ারী পর্যন্ত টিকিট কাটা হলো। কাউন্টটার থেকে উত্তরকাশী পর্যন্ত কোন টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। ভাটোয়ারী পর্যন্ত তিনজনের সেই মোট তিন টাকা ভাড়া লাগলো। বাস পেয়েও আজ আর উত্তরকাশী বোধহয় যাওয়া হলো না। বাসে অনেক প্যাসেঞ্জার উঠেলেও, বাস ছাড়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। “না আঁচালে বিশ্বাস নেই” কথাটার প্রকৃত অর্থ বাস্তবে বুঝতে হলে, এইসব এলাকার বাসে চাপতে হবে। বাস ছাড়ার আগে যে কোন মুহুর্তে, আজ আর বাস যাবে না, বা বাস আজ অতদুর না গিয়ে এই জায়গা পর্যন্ত যাবে, শোনার সম্ভাবনা পদে পদে। বাসের সব প্যাসেঞ্জার তাড়াতাড়ি বাস ছাড়ার জন্য অনুরোধ করছে। দেরি হলে উত্তরকাশী যাবার আর কোন সম্ভাবনাই থাকবে না। বাসে বেশ কয়েকজন মিলিটারি যাত্রীও আছে। এমন সময় বাসটার ঠিক পিছনে, খুব উঁচু একটা ট্রাক এসে দাঁড়ালো। ট্রাকটার একবারে ওপর পর্যন্ত, কাঠের গুঁড়ি বোঝাই। একে একে মিলিটারিরা প্রায় সবাই, ট্রাক ড্রাইভারকে বলে, ট্রাকের ভিতরে ও ওপরে কাঠের গুঁড়ির ওপর চেপে বসলো। জানা গেল ট্রাকটা সোজা উত্তরকাশী যাবে। আমরাও ঠিক করলাম ট্রাক ড্রাইভারকে অনুরোধ করে, এই ট্রাকেই উত্তরকাশী চলে যাব। মাধব বললো ওতে করে যাওয়া, খুব বিপজ্জনক হবে। দিলীপের কিন্তু ট্রাকে যাবার বাপারে খুব উৎসাহ দেখলাম। আমিও বুঝতে পারছি, ঐ উঁচু ট্রাকে কাঠের ওপর কোন কিছু না ধরে অতটা পথ যাওয়া সত্যিই খুব ঝুঁকি সম্পন্ন। কিন্তু এই মুহুর্তে উত্তরকাশী যাবার জন্য, যে কোন ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। শেষ পর্যন্ত আমাদের ভাবতে ভাবতেই, অনেক সাধারণ যাত্রীও ট্রাকে গিয়ে উঠে পড়লো। ওরা ট্রাকের একবারে ওপরে, গাছের গুঁড়ির ওপর উঁচু হয়ে বসে, গাছের মোটা গুঁড়ি ধরে রয়েছে। ট্রাক একটু লাফালে, টাল সামলানো সত্যিই খুব কষ্টকর হবে। ভাবলাম, এগুলো নিয়ে ট্রাকে বসে ভাবা যাবে, আগে ট্রাকে যাবার ব্যবস্থাটা পাকা করে নেওয়া যাক। শেষ পর্যন্ত দিলীপ গিয়ে ড্রাইভারকে অনুরোধ করলো বটে, কিন্তু ওর সেই দুর্বল অনুরোধ নাকচ করে দিয়ে, ড্রাইভার জানালো, ভাটোয়ারীতে ট্রাক একটু খালি হবে, তখন সে আমাদের তার ট্রাকে তুলে নেবে। আরও বেশ কিছুক্ষণ বাস ও ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকার পর কী হলো বুঝলাম না, বেশ কিছু লোক ট্রাক থেকে নেমে এসে আবার বাসে উঠে বসলো। একটু পরেই ট্রাকটা ছেড়ে দিল। বাস ড্রাইভার জানালো, ভাটোয়ারীর পরে পাহাড় ব্লাষ্টিং করানো হয়েছে। কাজেই ট্রাকের সব যাত্রীকেই ওখানে নেমে যেতে হবে। আজ আর কোন গাড়িকেই ভাটোয়ারীর ওদিকে যেতে দেওয়া হবে না। সামান্যই পথ, একটু পরেই আমরা ভাটোয়ারী পৌঁছে গেলাম। বাস কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিল, আজ আর বাস যাবে না। কাল ভোর বেলা বাস ছাড়বে। বাসের অফিসের সামনে অনেক প্যাসেঞ্জারের ভিড়। সকলেই বাসকে আজই উত্তরকাশী নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করছে। বাস ড্রাইভারের কথাবার্তায় বেশ বুঝতে পারছি, ও ইচ্ছা করেই আজ বাস নিয়ে যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত অত লোকের অনুরোধে, কর্তৃপক্ষ জানালো, ওদিক থেকে কোন বাস আসলে, এই বাস যাবে। ট্রাক থেকে সত্যিই সব লোককে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাধব বললো, অনেক লোক, জায়গাটাও খুবই ছোট, আগে থেকে একটা থাকার জায়গা ঠিক করা উচিৎ। কিন্তু ওই যে, আশায় মরে চাষা। আমাদের এখনও আশা, বাস হয়তো যাবে। এর মধ্যে উত্তরকাশীর দিক থেকে সত্যিই একটা বাস এসে উপস্থিত হলো। কথামতো এবার আমাদের বাস ছাড়ার কথা। সমস্ত প্যাসেঞ্জার বাসে উঠে পড়লো। এবার কিন্তু ড্রাইভার অন্য চাল চাললো। আমাদের বাসের ড্রাইভার ও কন্ডাক্টার, ভুখিগামী বাস ড্রাইভারকে বললো, এই বাসের প্যাসেঞ্জারদের উত্তরকাশী নিয়ে যেতে। সে নিজে তার বাসে ভুখিগামী প্যাসেঞ্জারদের, ভুখি পৌঁছে দেবে। অর্থাৎ এ বাসের প্যাসেঞ্জারদের ওই বাস, এবং ওই বাসের প্যাসেঞ্জারদের এই বাস নিয়ে যাবে। এই ব্যবস্থায় আমাদের আপত্তি করার কিছু নেই। কিন্তু আপত্তি জানালো, ওই বাসের ড্রাইভার। সে এই প্রস্তাবে রাজি হলো না। ফলে আমাদের উত্তরকাশী যাবার বাড়া ভাতে, ঐ ড্রাইভার জল ঢেলে দিল। সকলের সমস্ত অনুরোধ উপেক্ষা করে, আমাদের বাস ড্রাইভার জানালো, ওদিকের রাস্তা ভালো নেই, বাস আজ আর যাবে না। কাল খুব ভোরে বাস যাবে। ট্রাকটা চলে গেল। আমাদের অজানা, অচেনা, ছোট্ট একটা আধা শহরে বাস থেকে নামিয়ে দিয়ে, ড্রাইভার ও কন্ডাক্টার বাস কর্তৃপক্ষের অফিসে আড্ডা দিতে চলে গেল।

ওই অফিস ঘরের ঠিক পাশের ঘরটা, আমরা রাতের আস্তানা হিসাবে ভাড়া নিলাম। এখানে থাকার মতো কোন হোটেল নেই। ঘর বাড়ির সংখ্যাও খুব কম। কোন গেষ্ট হাউস বা ট্রাভেলার্স লজও নেই। ঘরের মালিকের সাথে কথা বলে ঠিক করলাম, আমরা তিনজন থাকবো। আর কাউকে ঘরে ঢোকানো যাবে না। মালিক জানালো ছ’টাকা ভাড়া দিলে সে রাজি আছে। আমরাও রাজি হয়ে গেলাম। ঘরের মালিক ভাঁজ করা করা কাঠের দরজা খুলে দিল। আমাদের এখানে অনেক দোকানেই এরকম দরজা দেখা যায়। এটা একটা গুদামঘর বলে বলে মনে হলো। এর দরজাও, দোকানের দরজার মতোই একদিক থেকে অপর দিক পর্যন্ত বিস্তৃত, এবং একদিক থেকে অপর দিক ভাঁজ করে করে খুলতে হয়। ঘরের ভিতরে একপাশে, ঘরের প্রায় অর্ধেক জায়গা জুড়ে, সম্ভবত ময়দার বস্তা, একটার ওপর একটা করে, প্রায় ছাদ পর্যন্ত সাজিয়ে রাখা আছে। পাশে দুটো চওড়া তক্তাপোশ। তক্তাপোশে গরমকুন্ডের লালাজীর দোকানের মতোই নোংরা, ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত তোষক পাতা ও একই মানের লেপ ভাঁজ করে রাখা আছে। ঘরের পিছন দিকে, অর্থাৎ মূল দরজার বিপরীতে আর একটা সরু দরজা, বন্ধ করা আছে। তক্তাপোশ ও ময়দার বস্তার মাঝ দিয়ে ঘরের পিছন দিকের ঐ দরজার কাছে যাওয়া যায়। রাশীকৃত ময়দার বস্তা ও তক্তাপোশের মধ্যে হাঁটাচলার জায়গা এতই কম ও সরু যে, পাশ দিয়ে পিছন দিকের দরজার কাছে যেতে গিয়ে, গোটা প্যান্টে ময়দা লেগে সাদা হয়ে গেল। ঘরের মালিক পাশ দিয়ে গিয়ে পিছনের ছোট দরজার শিকলটা খুলে দিল। এখানে বেশ গরম। রাতে এই বদ্ধ গুদাম ঘরে ঘুম আসবে বলে মনে হয় না। দরজা খুলতে পিছনে এক অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়লো। দরজা দিয়ে বেড়িয়েই, টানা সরু বারান্দা। আমাদের ডানপাশের বাসের অফিস ঘরেরও একই রকম একটা দরজা দিয়ে, এই বারান্দায় আসা যায়। আমাদের এই বাড়িটা যদিও একতলা, বাস রাস্তার ওপরে একই লেভেল-এ অবস্থিত, তবু পিছনের বারান্দায় দাঁড়ালে বোঝা যা্‌য়, অন্তত তিন-চার তলা উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছি। বারান্দার ঠিক পিছনেই খাদ। বেশ নীচ দিয়ে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। দোকানটার পিছনেই খাদের মতো নীচু, এবং বারান্দাটা যেন ঐ খাদের ওপর ঝোলানো। দোকানের মালিককে বিদায় করে, বারান্দায় বসে, প্রাকৃতিক শোভা দেখতে দেখতে, মনের সুখে এখান থেকে কেনা চিনাবাদাম খেলাম। আহা কী সুখ! বাদামের খোলা ফেলার কোন ঝামেলা পর্যন্ত নেই। হাত বাড়িয়ে নীচের খাদে ফেলে দিলেই হলো। কত সুবিধা। দোকানের মালিক নিজে থেকে উপযাচক হয়ে এসে, বেগন বা ফ্লিট জাতীয় কিছু একটা, ঘরের তক্তাপোশের উপর বেশ ভালো করে স্প্রে করে দিয়ে গেল। এতদিন অন্যান্য সব জায়গায় দেখে এসেছি, দোকান, হোটেল বা লজে, পিসু নামক ভয়ঙ্কর প্রাণীটিকে কোন ধর্তব্যের ব্যাপার বলে মনে করে না। এ বাবু আবার কিছু বলার আগেই বিছানায় স্প্রে করে দিয়ে যেতে, এখানে মহাপিসু বা রামপিসু জাতীয় কিছু আছে কী না ভেবে ভয় হলো। এখানে আসার সময়, বাস থেকে নেমেই একটা ছোট্ট হোটেল জাতীয় দোকানে, ডিম সাজানো আছে দেখেছিলাম। তাই বোধহয় সন্ধ্যাবেলাতেই প্রচন্ড খিদে খিদে পাচ্ছে। বাইরে যাব বলে ঘরের পিছন দিকের ছোট দরজাটা বন্ধ করে শিকল দিতে গিয়ে দেখি, শিকলটা মাপে বেশ ছোট। মালিক যে কী  কায়দায় ওটা আটকে ছিল বুঝতে না পেরে, দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে, সামনের বিরাট চওড়া দরজাটা হাট করে খুলে রেখে, সমস্ত জিনিসপত্র ঘরের একপাশে রেখে, জলখাবার খেতে গেলাম। সামনের দরজা খুলে রাখার কারণ, যাতে পিছনের দরজা দিয়ে পাশের ঘরের কেউ ঢুকলে, রাস্তার লোক দেখতে পায়। রাস্তার দু’পাশে অনেক দোকান। রাস্তার ওপাশে স্টেট ব্যাঙ্ক। রাস্তার এপাশে একটু দুরেই একটা চটে ঘেরা আগের জায়গাগুলোর মতো পায়খানা। সুন্দর রাস্তা,  পাহাড় ও গঙ্গার পাশ দিয়ে চলে গেছে। আমরা তিনজন বুভূক্ষু সোজা সেই দোকানে গিয়ে, তিনটে অমলেট, পাঁউরুটি সেঁকা আর চায়ের অর্ডার দিলাম। মনটা বেশ খুশিতে ভরে গেছে। ডিমের অমলেট আমাদের উত্তরকাশী না যেতে পারার দুঃখ, অনেকটাই ভুলিয়ে দিয়েছে। রাতের খাবার কী পাওয়া যাবে খোঁজ করতে গিয়ে তো দেখি, আমাদের জন্য আরও অনেক বড় বিষ্ময় অপেক্ষা করছে। এখানেই থেকে যাব কী না ভাবতে হবে। এই দোকানে মাংস পাওয়া যায়, দাম পাঁচ টাকা প্লেট্। এক মুহর্ত সময় নষ্ট না করে, তিন প্লেট্ মাংসের অর্ডার দিয়ে, জলখাবার খেয়ে, এদিক ওদিক একটু ঘুরতে গেলাম। আকাশে বেশ মেঘ করেছে, বৃষ্টি আসলেও আসতে পারে। একটু ঘুরেফিরে, দোকানের আস্তানায় ফিরে গেলাম।

রাত সাড়ে আটটা নাগাদ দোকানে খেতে গেলাম। এতদিন পেট ভরাবার জন্য খেতে গেছি, আজ অনেক দিন পরে, খাবার জন্য খেতে গেলাম। দোকানে গিয়ে দেখি তিনটে বেঞ্চ, তিনটেতেই খদ্দের ভর্তি। এইসব এলাকার লোকেরা যেমন পরিশ্রমী হয়, এদের আহারও সেইরকম দেখার মতো। একজন লোক সেই পুরানো কায়দায় রুটি তৈরি করে যাচ্ছে। আর একজন, এদের খাবার থালায় রুটি দিয়ে যাচ্ছে। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। এদের রুটির যোগান দিতে গিয়ে, দু’জনেই হাঁপিয়ে যাচ্ছে। এক একজন বোধহয়, গোটা পনের-কুড়ি করে রুটি খেয়ে নিল। কাঠের আগুনের তেজ ক্রমে কমে আসছে, আমরা দাঁড়িয়েই আছি। অন্য কোথাও যাবারও উপায় নেই, কারণ অন্য কোথাও এমন সুখাদ্য মিলবে কী না জানা নেই। এবার রুটি খাওয়া শেষ করে, ওরা চাউল আনতে বললো। তা বলুক, যা খুশি আনতে বলুক, মাংস আনতে না বললেই হলো। কিন্তু ভয় হলো রুটির মতো চাউল খেলে, আমাদের রাত এগারোটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ভেবে। বোধহয় আমাদের তিনজনের ক্ষুধার্ত, অসহায়, অবাক হওয়া মুখগুলো লক্ষ্য করে, লজ্জায় ওরা আজকের মতো খাওয়ায় ইতি টানলো।

আমরা তিনজন মহানন্দে বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। আমাদের তিনজনকে তিনটে প্লেটে, চার টুকরো করে মাংস ও ঝোল দেওয়া হলো। হাওড়া কলকাতায় অমানুষ পাঁপড় নামে, এক প্রকার পাঁপড় বিক্রি হয়, ভাজলে হলদেটে গোল নলের মতো দেখতে। চার টুকরো মাংসের, তিন টুকরো করে ঐ রকম নালি। হয়তো শ্রীমান পন্টক চন্দ্রের খাদ্যনালি বা শ্বাসনালি, কিছু একটা হবে। তার থেকেও খারাপ কোন অংশের নালি হবার সম্ভাবনাও, একবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। লম্বা কোন নালিকে পিস্ পিস্ করে কেটে, মাংসের পিস্ হিসাবে খেতে দেওয়া হয়েছে। তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, নালিগুলোকে ঘষে মেজে বেশ পরিস্কার করা হয়েছে। ওর ভিতরে কোন ময়লা নেই, চোখের কাছে দুরবীনের মতো ধরলে, দুরের জিনিস একবারে পরিস্কার দেখা যায়। বাধ্য হয়ে ফেলে দিলাম। বলতে খুব লজ্জা করলেও, বলতে বাধা নেই, ফেলবার আগে চুষে নিতে কিন্তু ভুল করি নি। কাঠের উননে আগুন তখন প্রায় নিভে এসেছে। ফলে প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট অন্তর, তিনজনের তিনটে করে আধ পোড়া, আধ কাঁচা রুটি নিয়ে আসছে। তিনজনের তিন-চারটে করে রুটি পেতেই, বেশ দেরি হয়ে গেল। অগত্যা আর রুটি খাবার আশা ত্যাগ করে উঠে পড়লাম। মাংসের কথা বলতে দোকানদার জানালো, এখানে একমাত্র সেই মাংস রাখে। উত্তরকাশী থেকে মাংস আসে। ফলে যা পাঠায় তাই নিতে হয়। মিলিটারিরা মাঝে মধ্যে পাঁঠা কাটে। তারা সমস্ত ভালো মাংস নিয়ে, তাকে এই জাতীয় মাংসই বিক্রি করে। স্থানীয় লোকেরা বাধ্য হয়ে এই মাংসই কিনে খায়। সে ইচ্ছা করে আমাদের খারাপ মাংস দেয় নি। এরপর তাকে আর কিছুই বলার থাকতে পারে না। খাওয়া সেরে মৌড়ি মুখে দিয়ে পরম সুখে গুদাম ঘরে ফিরে এলাম।

এরকম গুরুপাক খাবার পর একটু নেশা না করলে চলে না। দেখি একটাও সিগারেট সঙ্গে নেই। আমি ও মাধব, দিলীপকে গুদাম ঘরে বসিয়ে রেখে, গেলাম সিগারেটের দোকানের খোঁজে। আশেপাশে কোন দোকান খোলা নেই। অত রাতে, রাত বলতে তখন প্রায় দশটা বাজে, যে ক’টা দোকান খোলা আছে, সব ক’টা টেলারিং সপ্। এখানে এত জামা প্যান্ট কারা তৈরি করতে দেয়, ভগবান জানেন। আশা ছেড়ে দিয়ে গুদাম ঘরে ফিরে এসে দেখি, দিলীপ একজন ভদ্রলোকের সাথে তক্তাপোশে বসে কথা বলছে। আমরা ফিরে আসায়, ও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো বলে মনে হলো। ভদ্রলোক অনেকক্ষণ বসে আমাদের সাথে গল্প করলেন। তিনি জানালেন যে তাঁর বাবার আমল থেকে তাঁরা এখানকার বাসিন্দা। সৎপথে ব্যবসা করায়, আজ আর তাঁর কোন অভাব নেই। তাঁকে গত বৎসরের বন্যার কথা বলতেই, তিনি জানালেন, এরকম ভয়ঙ্কর বন্যা তিনি কোনদিন দেখেন নি। গত বৎসর আগষ্ট মাসের ছয় তারিখে, ভোর বেলা এখানকার লোকেরা দেখে গঙ্গা একেবারে শুকিয়ে গেছে। এখানকার লোকেরা খুব ভয় পেয়ে যায় এবং কী করা উচিৎ, তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বেলার দিকে উত্তরকাশী থেকে ডি.এম., জীপে করে গাংগানীতে জায়গাটা দেখে, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে যান। যাবার সময় শুধু হাত নেড়ে ইশারায় সকলকে পালাতে বলেন। তারপরে সমস্ত জমা জল, প্রবল আকার ধারণ করে, ওখানকার পাথর ভেঙ্গে, গাছপালা, গরু, ছাগল বয়ে নিয়ে এখানকার অনেক ঘর বাড়ি ভেঙ্গে দিয়ে চলে যায়। ভদ্রলোক আরও জানালেন, কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে ও কয়েক হাজার মানুষ, গৃহহীন হয়েছে। প্রায় রাত এগারোটা পর্যন্ত বকবক্ করে, তিনি যাবার জন্য উঠলেন। আমাদের কাছে সিগারেট নেই শুনে, তিনি নিজের কাছ থেকে বেশ কয়েকটা বিড়ি দিয়ে গেলেন।

আমরা জল খেয়ে, বাইরের বড় দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। দিলীপ জানালো ভদ্রলোক এসে তার ঘড়িটার খুব প্রশংসা করে, হাতে নিয়ে দেখতে চান এবং কত দাম ইত্যাদি খোঁজখবর করেন। ভদ্রলোকের ঘড়িটা ছিনতাই করার মতলব আছে ভেবে, ও খুব ভয় পেয়ে যায়। পরে অবশ্য সব ক্ষেত্রেই আমাদের অনুতাপ হয়। আমরা সবাইকে কলকাতার কলুষিত মন নিয়ে বিচার করি, সন্দেহ করি। এখানে পিসু আছে কী না এখনও জানার সৌভাগ্য না হলেও, ছারপোকার দৌরাত্ম্য যথেষ্টই আছে। তাদের বিছানার ওপর দিয়ে স্বপরিবারে মার্চ-পাষ্ট্ করতেও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ছারপোকারা বোধহয় পিসুর এঁটো খায় না, তাই রাতে ওরা আমাদের খুব একটা অত্যাচার করে নি। মাঝরাতে আজ আবার ছোট বাইরে যাবার প্রয়োজন দেখা দিল। দোকানের ওই বিশাল দরজা, পাট পাট করে ভাঁজ খুলে রাস্তায় যাওয়ার থেকে, পিছনের দরজা খুলে বারান্দা থেকে তিন-চারতলা নীচে কাজটা সেরে নেওয়া অনেক সুবিধাজনক। কিন্তু বাদাম ভাজার খোলা নীচে ফেলার সময় লক্ষ্য করেছিলাম, পিছন দিকের একতলায়, বা মাটিতে, ঘর আছে এবং ওখানে লোক বাস করে। কাজেই বারান্দার একদিক থেকে অপর দিক পায়চারি করতে করতে, বহু নীচে একতলায় কাজটা সেরে নিলাম, যাতে কোন আওয়াজ না হয় এবং চট করে কেউ বুঝতেও না পারে।

আজও বেশ ভোরেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। আজ সেপ্টেম্বর মাসের দুই তারিখ। আজ আমরা সম্ভবত সায়নাচট্টি পৌঁছবো। তার মানে আগামীকাল আমরা যমুনোত্রী যাচ্ছি। দিলীপ ও মাধবকে বিছানায় দেখতে পেলাম না। বালিশের তলায় দেখলাম ওদের ঘড়িদুটো রাখা আছে। ওগুলো পকেটে নিয়ে, দরজা খুলে রেখেই রাস্তায় এলাম। সকালের কাজকর্ম সেরে, হাতমুখ ধুয়ে, চা জলখাবার খেয়ে আমরা তৈরি হয়ে নিয়ে, বাসে গিয়ে নিজেদের আসন দখল করে বসলাম। ঠিক সময়েই বাস ছেড়ে দিল। আমরা তিনটে উত্তরকাশীর টিকিট বার টাকা ত্রিশ পয়সা দিয়ে কাটলাম। উত্তরকাশী ট্রাভেলার্স লজ থেকে মালপত্রগুলো নিতে হবে। বাস আবার সেই আগের দেখা রাস্তা দিয়ে উত্তরকাশীর পথে এগিয়ে চললো। একসময় আসবার পথে দেখা ড্যামটাকে বাঁপাশে রেখে, আমরা এগিয়ে গেলাম। আসবার পথে এ রাস্তা আমরা দেখে গেছি, কাজেই নতুন করে দেখার কিছু নেই। তাছাড়া ভয়ঙ্কর খাদ, সুন্দরী ঝরনা, মন মাতানো রঙ্গিন ফুল, কোন কিছুই আর আমাদের আগের মতো পাগল করছে না। মনে শুধু একটাই চিন্তা, কখন উত্তরকাশী পৌঁছব, আজ সায়নাচট্টি পৌঁছতে পারবো তো? ভাবতে ভাবতেই উত্তরকাশীতে বাস এসে দাঁড়ালো।

মাধবকে জলখাবার ও সঙ্গে নেবার জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করতে বলে, আমি ও দিলীপ, ট্রাভেলার্স লজে লাগেজ ছাড়াতে গেলাম। যাওয়ার পথে দেখা সেই অফিসার ভদ্রলোককে এখন আর দেখলাম না। যে কর্মচারীটি আমাদের মালপত্র রেখেছিল, একটু পরেই তার খোঁজ পাওয়া গেল। আমাদের দু’টো হোল্ড্-অল্ ও তিনটে সুটকেস্ আছে। যাওয়ার সময় শুনেছিলাম পার লাগেজ পার ডে একটাকা ভাড়া। সেই হিসাবে অনেক টাকাই ভাড়া নেওয়া উচিৎ। কিন্তু কর্মচারীটি আমাদের কাছ থেকে দশ টাকা ভাড়া চাইলো। ভাড়া মিটিয়ে বাইরে এলাম। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, যমুনোত্রী যেতে হলে হয় “ধরাসু” যেতে হবে, আর তা নাহলে  “বারকোট” যেতে হবে। এই দুই জায়গা থেকেই সরাসরি সায়নাচট্টি যাবার বাস পাওয়া যাবে। এও জানা গেল যে, ঐ দু’টো জায়গার মধ্যে বারকোট বেশ বড় জায়গা। কাজেই আমরা বারকোট যাব স্থির করে, কাউন্টার থেকে তিনটে বারকোটের টিকিট কাটলাম। তিনটে টিকিটের ভাড়া লাগলো, পঁচিশ টাকা আশি পয়সা। বাসের ছাদে মালপত্র গুছিয়ে রেখে, আসন দখল করে বসলাম। পছন্দ মতো সামনের দিকে ড্রাইভারের ঠিক পিছনে, বাঁদিকে আমরা তিনটে আসন দখল করলাম। এবার বাস থেকে নেমে, পাঁউরুটি, কলা ও ডিম সিদ্ধ খেয়ে, একটা ওয়াটার বটল্ কিনে তাতে জল ভরে, জল খেয়ে, বাসে এসে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে বাস ছেড়ে দিল। মনে বেশ আনন্দ, শেষ পর্যায় প্রায় উপস্থিত। এখানে পৌঁছতে পারলে, এ পথের সমস্ত দর্শনীয় স্থান আমাদের দেখা হয়ে যাবে। আঁকাবাঁকা রাস্তা পার হয়ে, একসময় আমরা আবার সেই ধরাসু এসে পৌঁছলাম। আসলে ধরাসু হচ্ছে একটা জংশন। এখান থেকে একটু এগিয়েই রাস্তা দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে। একটা যাচ্ছে উত্তরকাশী হয়ে গঙ্গোত্রী, অপরটা যমুনোত্রী। এখন আমাদের ধরাসু যাবার কোন প্রয়োজন ছিল না। বোধহয় আরও কিছু যাত্রীর আশায়, বাস ধরাসু গিয়ে অহেতুক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। ড্রাইভারের সাথে আলাপ হলো। ভদ্রলোকের খুব সুন্দর ব্যবহার। দেখতে অনেকটা আমার অফিসের আর্মড-গার্ড, কল্যান সাহার মতো। আমরা নিজেদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে কথা বলার সময়, তাঁকে কল্যানদা বলে উল্লেখ করতে শুরু করলাম। এখানে একটা বড় হোটেল আছে। আমরা সেখানে সামান্য কিছু খেয়ে নিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে, কল্যানদা বাসটা অনেকটা পথ এগিয়ে নিয়ে গেলেন, বাসের মুখ ঘুরিয়ে আনার জন্য। অর্থাৎ যেদিক থেকে এসেছি, বাস আবার সেই দিকেই বেশ কিছুটা এগিয়ে, বাঁদিকে বারকোটের উদ্দেশ্যে বাঁক নেবে। আমরা দোকানেই বসে ছিলাম। বাস ঘুরিয়ে আনলে, বাসে উঠে বসলাম। সুন্দর রাস্তা, সুন্দর আবহাওয়া, ‌মনটাও বেশ ভালো আছে। আমাদের ঠিক সামনে, বাসের সব থেকে সামনে, ড্রাইভারের আসনের বাঁপাশের সিঙ্গল সিটটা একজন যুবক দখল করে বসেছে। হাতে ম্যাগাজিন, চোখে রোদ চশমা। বাস যখন বেশ কিছুটা এগিয়েছে, যুবকটি ঘুমতে শুরু করলো। আমরা ভাবছি ড্রাইভার হয়তো রেগে গিয়ে দু’টো কটু কথা শোনাবেন। ঐ সিটে বসে ঘুমনো নিষেধ। আমরা যে সিটে বসে আছি, এবং আমাদের ঠিক ডানপাশের সিটটাও, ঐ একই নিয়মের অন্তর্ভুক্ত। যাত্রীটি খুব সম্ভবত এইসব অঞ্চলেরই বাসিন্দা, সম্ভবত উত্তরকাশীর। ড্রাইভার ভদ্রলোক ঘন ঘন সিগারেট খান। তিনি পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে, যুবকটিকে দিলেন। যুবকটি খুব লজ্জা পেয়ে একটু হেসে, হাত বাড়িয়ে সিগারেটটা নিল। এই রাস্তাটার দেখছি একটা বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে রাস্তা খুব সুন্দর এবং একভাবে ওপর দিকে উঠেছে। এখনও পর্যন্ত রাস্তা কখনও নীচের দিকে নামে নি। একভাবে ওপরে উঠতে হচ্ছে বলেই বোধহয়, বাসের ইঞ্জিন থেকে একটা বিশ্রী আওয়াজ হচ্ছে। আবার সেই পুরাতন ভয়টা, মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো— বাস আবার না খারাপ হয়, আবার না বলে বসে, বাস আজ আর যাবে না। এ পথের সৌন্দর্য বেশ ভালো। রাস্তা থেকে অনেক নীচের জমিকে, খুব সুন্দর দেখতে লাগছে। দু’পাশে বড় বড় পাইন জাতীয় গাছ। আর এইসব গাছ থেকেই আসছে একভাবে সেই পোকার ডাক। কখনও বিরাম নেই। পরে দেখলাম এটা কোন পোকার ডাক নয়। ধুসর রঙের বেশ বড় আকারের গঙ্গা ফড়িং জাতীয় এক রকম পোকা, নীচের দিকে মুখ করে পিছন দিকটা ওপরের দিকে উচু করে, একভাবে দ্রুত পাখা নেড়ে চলেছে। আর তার আওয়াজেই কানে তালা লাগিয়ে দেবার মতো অবস্থা। একসাথে প্রচুর ঐ জাতীয় পোকা, বিভিন্ন গাছের ডালে বসে সব কাজ ফেলে, সারাদিন একভাবে পাখা নেড়ে চলেছে। এতে যে কী সুখ ওরা পাচ্ছে ওরাই জানে।

বাস একভাবে ওপর দিকে উঠছিল। আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই বোধহয়, এইবার শুরু হলো নীচে নামার পালা। একভাবে এঁকেবেঁকে, বাস নীচে নামতে শুরু করেছে। অনেকটা পথ পার হয়ে আসার পর দেখলাম, একটা গাছ কিভাবে ভেঙ্গে রাস্তার ডান দিক থেকে বাঁদিকে, রাস্তা বন্ধ করে শুয়ে আছে। গাছটা এত প্রকান্ড আকারের, যে ওটাকে ঠেলে সরিয়ে একপাশে রেখে দেবার ক্ষমতা আমাদের নেই। কল্যানদা ও কন্ডাক্টার বাস থেকে নেমে ব্যাপারটা উপলব্ধি করে, বাসের সবাইকে বাস থেকে নেমে আসতে বললেন। একে একে বাসের প্রায় সকল পুরুষ যাত্রী বাস থেকে নেমে হাত লাগালো। শেষে অনেক চেষ্টার পর, গাছটা একপাশে সরে গিয়ে, আমাদের এগিয়ে যাবার অনুমতি দিল। আমরা আবার এগিয়ে চললাম। দু’পাশের সারিবদ্ধ গাছে, রাস্তা ছায়ায় ঢাকা। রাস্তার পাশে মাইল স্টোনগুলো ক্রমশঃ বারকোটের নিকটবর্তী হওয়ার সংবাদ জানাচ্ছে। বারকোট পৌঁছতে যখন আর মাত্র দশ-বার কিলোমিটার পথ বাকি, আমাদের বাস দেহ রাখলো। এই মুহুর্তে নিজেকে বড় অসহায়, বড় দুর্বল মনে হচ্ছে। আবার সেই অশান্তি। কিন্তু দক্ষ বাস ড্রাইভার ও কন্ডাক্টারের যৌথ প্রচেষ্টায়, বাসের ইঞ্জিন আবার প্রাণ ফিরে পেল। কন্ডাক্টার রাস্তার পাশের ঝরনার জল টিনে করে এনে, বাসের ইঞ্জিনের সামনে ছেটাতে শুরু করলো। বাস থেকে অস্বাভাবিক রকমের ধোঁয়া বার হচ্ছে। বোধহয় ইঞ্জিন কোন কারণে খুব গরম হয়ে গেছে। এবার যদিও বাস ছাড়লো, ভয় কিন্তু গেল না। একটা বিশ্রী রকমের আওয়াজ করতে করতে, খুব ধীর গতিতে বাস এগিয়ে চলেছে। বেশ কিছুক্ষণ অন্তর একটা করে মাইল স্টোন অতিক্রম করছে, আর আমরা অস্থির মন নিয়ে মনে মনে ভাগ্য বিধাতার দয়া ভিক্ষা করছি— আর কয়েকটা মাইল স্টোন এগিয়ে নিয়ে চলো। আসলে ভয়টা বেশি পাওয়ার একটাই কারণ, আমাদের সঙ্গে এখন সমস্ত লাগেজ আছে। তা নাহলে এই সামান্য কয়েক কিলোমিটার রাস্তা, তাও আবার পাকা বাস রাস্তা, আমাদের কাছে এখন কোন ব্যাপার নয়। অন্তত এখন তো  নয়ই। ডানপাশে একটা রাস্তাকে ফেলে, আমরা বেশ কিছুটা নীচে বারকোট এসে পৌঁছলাম।

বাস থেকে মালপত্র নামিয়ে ভরদুপুরে একপাশে দাঁড়ালাম। কতদিন স্নান করি নি, অসহ্য লাগছে। খিদেও বেশ ভালোই পেয়েছে। পাশেই “রাওত” হোটেল। তিনতলা বাড়ি, এরই একটা অংশে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ্ ইন্ডিয়ার শাখা। হোটেলে ঢুকে বাসের খবর নিয়ে জানা গেল, সাড়ে তিনটে-চারটে নাগাদ, হৃষিকেশ থেকে বাস আসবে। হৃষিকেশ থেকে বাস ধরাসু হয়ে সায়নাচট্টির পথ ডানপাশে ফেলে বারকোট আসবে। তারপর আবার ব্যাক করে বাঁহাতে সায়নাচট্টির ফেলে আসা পথ ধরবে। এই সায়নাচট্টি থেকেই যমুনোত্রী যাবার হাঁটা পথের শুরু। এখানে আরও একটা সুসংবাদ পাওয়া গেল— ভালো চালের গরম ভাত ও মাংস পাওয়া যাবে। পাশেই একটা টেবিলে দেখলাম, একজন তুষার শুভ্র লম্বা লম্বা ভাত নিয়ে খাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতদিনের অতৃপ্ত ক্ষুধা চাঙ্গা হয়ে পেটের ভিতর লাফ ঝাঁপ করে বিদ্রোহ শুরু করে দিল। সময় নষ্ট না করে, তিন প্লেট মাংস আর ভাত দিতে বললাম। মাংস পাঁচ টাকা প্লেট্, হোটেল কাউন্টারে বসা লোকটা জিজ্ঞাসা করলো, মাংস কী হাফ্-হাফ্-হাফ্? অর্থাৎ হাফ্ প্লেট করে তিনজনকে দেবে কী না? এখানে বোধহয় এত দাম দিয়ে, ফুল প্লেট্ করে মাংস সচরাচর কেউ খায় না, বা খাওয়ার খুব একটা চল্ নেই। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের গুলিয়ে ফেললে চলবে কেন? আমরা পাঁচ টাকা প্লেটে খাসির খাদ্য নালি খাওয়া পাবলিক। ভালো মাংস দিলে আজ দশ টাকা প্লেট হলেও, কুছ পরোয়া নেহি, ফুল প্লেটই খাব। আধ প্লেটে মন ভরবে কেন? বললাম, “না, ফুল্-ফুল্-ফুল্, একটু দেখে দেবেন”। এবার দোকানদারও খুশি, আমরাও খুশি। তার হাবভাব দেখে মনে হলো, সে বোধহয় আমাদের টাটা-বিড়লা জাতীয় কেউকেটা বলে মনে করছে। যাহোক্ খাবার এল। রান্না কেমন হয়ছে এই মুহুর্তে বর্ণনা করে সময় নষ্ট করতে পারবো না, তবে মনে হচ্ছে জীবনে এত সুস্বাদু খাদ্য কখনও কোথাও খাই নি।

হোটেলের বাইরে আমাদের মালপত্র ও লাঠি সাজিয়ে রাখা আছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আশেপাশে ইতস্তত ঘুরে ফিরে, আর হোটেলে বসে বসে, একসময় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল, এল না আমদের বাস। এবার আমরা অস্থির হয়ে উঠলাম। হোটেল মালিক কিন্তু এখনও একই সুরে বলে যাচ্ছে, “বাস আসবে। এখান থেকে সায়না চট্টি সামান্যই পথ, তাই সন্ধ্যা হলেও বাস ওখানে যাবে”। বাস কিন্তু আসবে সেই হৃষিকেশ থেকে। হঠাৎ মনে হলো, বাসটা আমাদের আগের সব বাসের মতো রাস্তায় কোন কারণে আটকে পড়েনি তো? হোটেলের পাশেই বাঁহাতে একটা গুমটি ঘর। ওখান থেকেই বাসের টিকিট বিক্রি হয়। ওখানে গিয়ে বাসের খবর জিজ্ঞাসা করাতে, ওরাও বেশ জোরের সঙ্গেই জানালো বাস আসবে। সামনে বাঁপাশের রাস্তা ক্রমশঃ এঁকেবেঁকে উপরে উঠেছে। ওই দিক থেকেই আমরা এখানে এসেছি। ওই দিক থেকেই এখন বাস আসবার কথা, আবার ওই বাসে আমরা ওই দিকেই যাব। যতদুর লক্ষ্য করা যায়, কোন বাস আসতে দেখা যাচ্ছে কী না নজর রাখছি। নাঃ, বাস এল না, তার পরিবর্তে রাত এসে হাজির হলো। সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমশঃ ঘন হতে হতে, রাত্রির রূপ নিল। আশা ছেড়ে দিয়ে হোটেলে একটা ঘর নেওয়াই মনস্থ করলাম। রাওত হোটেল আমাদের তিনতলায়, ঠিক বাস রাস্তার ওপরে একটা ঘর দিল। খাটে বসে বড় জানালা দিয়ে ঠিক নীচে অসংখ্য লোকের যাতায়াত, ট্রাকের যাওয়া আসা, ইত্যাদি লক্ষ্য করতে করতে সময় কেটে যাবে, এটাই সান্ত্বনা।

বিকেল প্রায় চারটে নাগাদ, একটা লোক সাইকেল নিয়ে বিড়ি বিক্রি করতে, আমাদের হোটেলের ঠিক নীচে, বাস রাস্তার ওপর এসেছিল। লোকটার একটা হাত কাটা। সাইকেলের কেরিয়ারে একটা বেশ বড় টিনের বাক্স লাগানো। ঐ বাক্সে অসংখ্য বিড়ি। সামনে অদ্ভুত ভাবে একটা রেকর্ড প্লেয়ার লাগানো। সাইকেল দাঁড় করিয়ে, লোকটা তার ছোট্ট মাউথপিসটার মাধ্যমে, সামনের ছোট মাইকটায়, বিড়ির গুণগান গেয়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিল, আর মাঝেমাঝে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে, “নাগিন” এর একটা লং প্লেয়িং রেকর্ড বাজাচ্ছিল। এই অবস্থাতেও এত দুরের হোটেলের ঘরে বসে, আমরা আমাদের ঘরের হেমন্ত মুখার্জীর কন্ঠস্বরে, এই মুহুর্তে নিজের শহরের স্বাদ, গন্ধ অনুভব করছি। রাত আরও বাড়তে, লোকটা তার সাইকেলে, সমস্ত কিছু গুছিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। এতক্ষণ লোকটাকে ঘিরে রাখা লোকের ভিড় পাতলা হয়ে গেল। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার, এত লোকের ভিড়েও, তার বিড়ি বিক্রির পরিমান কিন্তু অতি সামান্য। নাঃ, বাস আজ আর এল না। সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ কেটে গেল। এতদিনে খুব ভালো করে সাবান শ্যাম্পু মেখে, তিনজনে পর পর অনেকক্ষণ ধরে স্নান করলাম।

হাতে অনেক সময় পেয়ে, নতুন করে মালপত্র গোছাবার জন্য সুটকেস খুললাম। আমার সুটকেসে জামাকাপড় ছাড়া, হেমকুন্ড থেকে পলিথিন ব্যাগে বয়ে নিয়ে আসা একগাদা ব্রহ্মকমল ছিল। ফুলগুলো গাছ থেকে তুলে পলিথিন ব্যাগে পুরে সুটকেসে নেবার পর থেকে, পনের দিন পরে এই প্রথম সুটকেস খোলা হলো। এগুলো নিয়ে আসার সময় এক ভদ্রলোকের হাতে ব্লটিং পেপার দেখে, এবং তার কাছে, ব্লটিং পেপার দিয়ে মুড়ে ফুল নিলে অনেক দিন ভালো ও টাটকা থাকে শুনে, সবজান্তা বিজ্ঞের মতো তাকে বলেছিলাম, “মৌয়া গাছের মিষ্টি ছায়া ‘ব্লটিং’ দিয়ে শুষে, ধুয়ে মুছে সাবধানেতে রাখছি ঘরে পুষে” গোছের ব্যাপার বলছেন? এখন বুঝতে পারছি, অত সহজে এই মূল্যবান ফুল নিয়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। সুটকেসটা খুলতেই, একটা তীব্র পচা গন্ধে ঘর ভরে গেল। সুটকেসের নীচের দিকটা কালো জলে ভিজে গেছে। পলিথিন ব্যাগটা বেশ খানিকটা ফেটে গেছে, না ফেটে না বলে, গলে গেছে বলাই বোধহয় ঠিক হবে। বোধহয় পচে অ্যাসিড ফর্ম করেই এটা হয়েছে। ছেঁড়া পলিথিন ব্যাগের ভিতর ফুলগুলো, পচে গলে কালো জলীয় পদার্থে পরিণত হয়েছে। আর সুটকেসের তলার অংশটা পুরো ভিজে এবং কালো রঙের দেখতে হয়ে গেছে। সমস্ত পচা ফুল সমেত পলিথিন ব্যাগটা ফেলে দিতে হলো। সুটকেসটাও ফেলে দিতে পারলেই বোধহয় ভালো হয়, কিন্তু এখন মাঝপথে তা সম্ভব নয়। ভিজে ন্যাকড়া দিয়ে অনেকবার ভালো করে মুছেও, সুটকেসটা পরিস্কার করা গেল না। পচা গন্ধটা সামান্য কমলো বলে মনে হয়। শেষে নীচে গিয়ে একটা দামি ভালো পাউডার কিনে এনে, নিজের গায়ে না মেখে, পরম স্নেহে আদরের সুটকেসকে অর্ধেক মাখিয়ে, কাগজ পেতে ওটাকে মোটামুটি ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হলাম। ফুলগুলো নিয়ে যেতে পারলাম না বলে খারাপও লাগছিল। অফিসের একজন আমাকে বার বার করে একটা ব্রহ্মকমল, তার জন্য কষ্ট করে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেছিল। ইচ্ছা থাকলেও, তাকে আর তার কাঙ্ক্ষিত জিনিস এনে দিতে পারলাম না।

একটু রাত করেই একতলায় হোটেলে খেতে নামলাম। আমার আজ রাতেও আবার সেই সকালের খাবার খাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বন্ধুরা একই দিনে দু’-দু’বার মাংস খেতে ভয় পেল। আমি জানি না রোজ রোজ পচা আলুর তরকারি, কাঁচা রুটি আর ঝুড়িভাজা খেলে যদি কোন ক্ষতি না হয়, তবে একদিনে দু’বার মাংস ভাত খেলে, কতটা ক্ষতি বৃদ্ধি হতে পারে। তবু তাদের ইচ্ছায়, ডিমের ঝোল ভাত খেতে রাজি হতে হলো। তবে হোটেল মালিক বোধহয় সব খদ্দেরের মন জুগিয়ে ব্যালান্সড্ করে চলেন। ডিমের ঝোলটা ভালোই খেতে হয়েছে। তবে ডিমের ঝোলের ভিতর থেকে ছোট সাইজ হলেও, এক টুকরো মাংস উদ্ধার হওয়ায়, রাতের খাবারটাও আমার ভালোই জমলো। বেশ বুঝতে পারছি, ডিমের ঝোলে ওবেলার মাংসের ঝোল মেশানো হয়েছে। তা হোক, ভদ্রলোককে বেশ সৎই বলতে হবে। ডিমের  ঝোলে মাংসের টুকরো দিয়েছেন, মাংসের ঝোলে ডিমের টুকরো দেন নি, এবং খেতেও বেশ উপাদেয় হয়েছে। যাহোক্, কিছুক্ষণ বাস রাস্তায় পায়চারি করে, তিন তলায় নিজেদের ঘরে ফিরে এলাম। ওপরে উঠবার সময় হোটেল মালিক আশ্বাস দিলেন— আগামীকাল বাস পাওয়া যাবেই। মনে মনে, ‘তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক’ বলে, ওপরে উঠে এলাম। গল্পগুজব করে অনেকক্ষণ কাটলো। আবার আমার সঙ্গীদের মধ্যে ফিরে যাবার পুরানো ঝোঁকটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। মাধবের বক্তব্য, এখানে খরচের পরিমাণ অনেক বেশি। তাই আগামীকাল আমাদের ফিরে যাওয়াই উচিৎ। আমি বললাম, কাল নিশ্চই বাস পাওয়া যাবে। আর বাস না পাওয়া গেলেও, জীপ বা অন্য কিছুর একটা ব্যবস্থা নিশ্চই করা যাবে। তাছাড়া খরচ তো আমাদের হাতে। ডাল ভাত খেলেই খরচ কমে যাবে। অবশ্য ঘর ভাড়া প্রতিদিন পনেরো টাকা করে লাগবেই। ওদের অবস্থা দেখে ভয় হলো, আগামীকাল বাস না এলে, যমুনোত্রী যাওয়ার আশা শেষ। ঘরের বাঁপাশের জানালা দিয়ে দুরে, অনেক দুরে, মিটমিট্ করে অনেক আলো জ্বলছে। আমাদের ধারণা, ওখানেই হয়তো যমুনোত্রী। ঘরটায় মাত্র দু’টো খাট। একটায় দিলীপ, অপরটায় আমি আর মাধব শুয়ে পড়লাম। মশার উপদ্রব উপেক্ষা করে, একসময় ঘুমিয়েও পড়লাম।

আজ সেপ্টেম্বর মাসের তিন তারিখ। বেশ ভোরে ঘুম থেকে উঠে, মুখ ধুয়ে যাবার জন্য তৈরি হয়ে নীচে নেমে এলাম। হোটেল মালিক বললেন, গতকাল নিশ্চই রাস্তায় কোথাও ধসে বাস আটকে গিয়েছিল। চিন্তা করবেন না, আজ অবশ্যই বাস এসে যাবে। জিজ্ঞাসা করলাম, বাসের কোন খবর পাওয়া গেছে কী না। ওদের কথাবার্তায় মনে হলো, এখানে বাসের খবর ওভাবে রাখা হয় না, হয়তো রাখাও যায় না। আশ্চর্য, এই বিপজ্জনক রাস্তায়, অতগুলো প্যাসেঞ্জার নিয়ে, বাসটা কেন এল না, রাস্তায় খাদে তলিয়ে গেল কী না, জানার ইচ্ছা বা দায়িত্ব কারো নেই? জানার উপায়ও বোধহয় নেই। অনেকক্ষণ রাস্তায় অপেক্ষা করে, আবার হোটেলে ফিরে এলাম। আমার দু’জন সঙ্গী যেন বুঝে ফেলেছে যে, আজও আমাদের নিতে কোন বাস আসবে না। এবার আমি খুব নার্ভাস ফীল করতে লাগলাম। বাঁদিকের জানালা দিয়ে কোন গাড়ির আওয়াজ আসলেই, বাসের আশায় সেদিকে তাকাই। কিন্তু হয় ট্রাক, নাহয় জীপ আসে। বাসও কয়েকটা পরপর এলো বটে, তবে সেগুলো সায়নাচট্টি যাবে না। রাওত হোটেলকে ডানপাশে রেখে, সেগুলো সোজা এগিয়ে যাবে। শুয়ে বসে আর সময় কাটে না। বাসও আসে না। বোর্ণভিটা আর আমসত্ত্বের ধ্বংস হতে লাগলো। এগুলো আর সংরক্ষণ করার প্রয়োজনও নেই। একসময় স্নান সেরে একতলায় খেতে গেলাম।

মানসিক কষ্ট, সময় সময় শারীরিক কষ্টের থেকেও কষ্টকর হয়, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। কিছু না খেয়ে, সারাদিন পরিশ্রম করে, পিসু ভর্তি নোংরা বিছানায় শুয়ে, আমরা যে কষ্ট ভোগ করেছিলাম, এখন ভালো হোটেলে থেকে, ভালো খাবার খেয়ে, ভালো বিছানায় শুয়ে, তার থেকে অনেক বেশি যন্ত্রণা ভোগ করছি, সামান্য একটা বাসের অনুপস্থিতির জন্য। খাওয়া দাওয়া সেরে, আবার নিজেদের ঘরে বসে, ফিরে যাওয়া না যাওয়া, ইত্যাদি আলোচনায় বারোটা, একটা, দু’টো, ক্রমে বিকেল তিনটে বাজলো, বাস কিন্তু এল না। মাধব বেশ অধৈর্য হয়ে পড়ছে। শেষে বাস আসার আশা ছেড়ে, গতকালের সেই বিড়িওয়ালার আসার অপেক্ষায় রইলাম। অন্তত তার সেই রেকর্ডের গান শুনে অনেকটা সময় কাটবে। গতকাল শুনেছিলাম, বিকেল সাড়ে তিনটে-চারটে নাগাদ বাস আসে। আমি ভাবছি আর ঘন্টা খানেকের মধ্যে যদি বাস না আসে, তবে এদের সঙ্গে ফিরে যাবার যুদ্ধে, আর হয়তো নিজেকে জিতিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। বিড়িওয়ালা তার গানের ডালি, বিড়ির ঝুলি নিয়ে, সময় মতো এসে হাজির হলো। গানের না বিড়ির আকর্ষণে জানি না, লোকের ভিড়ও বাড়লো। আমরা নীচে নেমে এলাম। হোটেলের বাঁপাশে বাসের টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চা খেয়ে মাধব ওপরে চলে গেল। একটু দুরে রাস্তায় একটা জীপ দাঁড়িয়ে আছে। অনেকেই ওতে করে সায়নাচট্টি যাবার চেষ্টা করছে। মাথাপিছু দশ টাকা ভাড়া। আমি ও দিলীপ ঠিক করলাম, হোটেলে থাকতেও তো অনেক খরচ হচ্ছে, কাজেই জীপেই চলে যাব। জীপের কাছে যখন পৌঁছলাম, তখন অনেক পুরুষ ও মহিলা আসন দখল করে নিয়েছে। ড্রাইভারের সাথে কথা বললাম। সে রাজিও হলো, কিন্তু আমাদের অত মালপত্র, সে জীপে নিয়ে যেতে রাজি হলো না। রাজি হলো না, কারণ খদ্দেরের অভাব নেই। রাস্তার একপাশে কাল যে বাসটায় আমরা এসেছিলাম, দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের জীপ ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে, ও কী করবো ঠিক করতে করতেই, জীপটা লোক ভর্তি করে নাকের ডগা দিয়ে চলে যেতে, যমুনোত্রী যাবার শেষ আলোও নিভে গেল। আগের দিনের বাস ড্রাইভার, কল্যানদার সাথে বাস কর্তৃপক্ষের বেশ উত্তেজক আলোচনা হচ্ছে শুনলাম। কল্যানদার বক্তব্য, দু’দিন ধরে এত লোক আটকা পড়ে আছে, তার বাস তো আজ আর কোথাও যাবে না, কাজেই সে বাস নিয়ে সমস্ত প্যাসেঞ্জারকে সায়নাচট্টি পৌঁছে দিতে চায়। কর্তৃপক্ষের তাতে ভীষণ আপত্তি। আমরা মনে মনে কল্যানদার জয়লাভ কামনা করলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কল্যানদা পরাজয় বরণ করে অসহায় ভাবে ফিরে এলেন। আমরা আবার বাসের অপেক্ষায় রাস্তায় বসে রইলাম।

আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে আমি ও দিলীপ ওপরে নিজেদের ঘরে ফিরে আসতে যাব, হঠাৎ দেখি পাল পাল লোক ছুটে গিয়ে কল্যানদার বাসে উঠছে। বাস কোথায় যাবে, আদৌ যাবে কী না, খোঁজ নেবার সময় নেই। দিলীপকে প্রায় ঠেলে বাসে উঠে জায়গা দখল করতে পাঠিয়ে, আমি ওপরে নিজেদের ঘরে ছুটলাম মালপত্র নামাতে। তখনও কিন্তু জানি না বাস আদৌ যাবে কী না, বা গেলেও কোথায় যাবে। তবে কল্যানদা যেহেুতু সায়নাচট্টি যাবার আগ্রহ দেখিয়ে ছিলেন, তাই ধরে নেওয়া যায়, বাস সায়নাচট্টি যাচ্ছে। তবে সে চিন্তা পরে করলেও চলবে।

ওপরে এসে মাধবকে বললাম, তাড়াতাড়ি মালপত্র নামাতে। আকাশে আবার এখন বেশ মেঘ করে এসেছে। মাধব বললো, মালপত্র এখানেই রেখে যেতে। আমার তাতে একবারেই মত নেই। বললাম কোন কারণে ফিরতে দেরি হলে, প্রতিদিন পনেরো টাকা করে অহেতুক ভাড়া গুনতে হবে। মাধব কিন্তু সেই খরচ করেও, মালপত্র এখানেই রেখে যাওয়া ঠিক বলে মনে করলো, কারণ সায়নাচট্টিতে হয়তো মাল রাখার ভালো জায়গা নাও পাওয়া যেতে পারে। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, তবু এখানে মালপত্র রেখে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ও আমার যুক্তি মেনে না নিলেও, বেজার মুখে আমাকেই মেনে নিল। শুধু বললো, রাস্তায় বৃষ্টি নামলে বিপদে পড়তে হবে। হাতে হাতে মাল নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি আমরা নীচে নেমে এসে, হোটেলের বিল মেটালাম। হোটেল মালিক আমাদের শুভ যাত্রা কামনা করলেন। আমি বাসের ছাদে মাল সাজিয়ে রেখে, নীচে নেমে এসে দিলীপের নাম ধরে চিৎকার করেও কোন সাড়া পেলাম না। বাসে এত ভিড়, যে ওকে বাসে উঠে দেখারও কোন উপায় নেই। এই বাসে এখন অফিস টাইমের হাওড়া-কলকাতার মতো মানুষ ঝুলছে। দরজার দিকে এসে দেখলাম, দিলীপ একবারে পিছনের সিটে জানালার ধারে জায়গা দখল করে বসে আছে। আমাদের দেখতে পেয়ে, তাড়াতাড়ি জানালা দিয়ে উঠে পড়তে বললো। ও আমাদের জন্য জানালার ধারে একটু জায়গা রেখে বসেছে। ও আমাদের দু’জনের জন্যই দু’টো বসার জায়গা রেখে, তারপরে নিজে বসেছিল। কিন্তু ওর ডানপাশে অনেকেই ওকে ঠেলে বাঁপাশে সরিয়ে, বসার জায়গা করে নিতে চাইছে। স্বাভাবিক, কারণ তারা দেখতে পাচ্ছে এত ভিড় বাসে দিলীপের বাঁপাশে জানালার ধারে দু’জন বসার মতো জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। রোগা পটকা দিলীপ যতই ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী’ পণ করে বসে থাকুক, তারা শুনবে কেন? ক্রমাগত চাপে তখন ওর বাঁপাশে কোন মতে একজন বসার মতো জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। এদিকে বাসে এত ভিড়, যে দরজা দিয়ে উঠে ভিতরে যাবার কোন উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত জানালা দিয়ে বাসে ঢুকে, কোনক্রমে জানলার ধারে বসে পড়লাম। এবার মাধবও জানালা গলে উঠে এসে আমার বাঁপাশে, জানালার ধারে জোর করে চেপে বসে পড়লো। পাঁচ-ছ’জন বসার জায়গায়, এগিয়ে পিছিয়ে আটজন বসেছি। জানালার ধারে মাধব, তারপরে আমি, আমার পরে দিলীপ। দিলীপের ডানপাশে একবারে নোংরা কতগুলো নারীপুরুষ। ওর পাশেই একটা স্ত্রীলোকের কোলে একটা বছর বারো-তেরো বয়সের মেয়ে।

এপথের একটা সুন্দর ব্যবস্থা, বাসে যতই ভিড় হোক না কেন, বাস ছাড়ার আগে বাসের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবেই। আমাদের এই বাসটায় একটাই মাত্র দরজা, এবং সেটা একদম সামনের দিকে। পিছন দিকে কোন দরজা না থাকায়, আমার ও মাধবের ঠিক সামনে, দরজার পরিবর্তে একটা দু’জন বসার চেয়ার সিট করা হয়েছে। এই সিটটায় দু’জন লোক বসে আছে। একটু পরেই দেখি অন্য একজন লোক কিভাবে ম্যানেজ করে, ঐ সিটটার জানালার ধারে দিব্বি নিজের বসার ব্যবস্থা করে নিল। বাসে কোথাও একটু দাঁড়াবার জায়গা পর্যন্ত নেই। পিলপিল্ করে লোক বাসের ছাদে উঠছে। কল্যানদা একবার আমাদের সিটের পাশে জানালার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, সিট মিলেছে তো? আমরা অবাক হয়ে গেলাম। ওর সাথে আমাদের কতটুকুই বা পরিচয়। বললাম হ্যাঁ মিলেছে। কল্যানদা বললেন বাস ছেড়ে দিই? আমরা বাস ছেড়ে দিতে বললাম। বুঝলাম না বাসে এত লোক থাকতে, উনি হঠাৎ আমাদেরই বা কেন জিজ্ঞাসা করলেন। কন্ডাক্টার কিন্তু এত ভিড়েও ঠিক কায়দা করে বাসের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। বাসের ছাদে এত লোক উঠছে যে ভয় হচ্ছে, আমাদের সুটকেস বা হোল্ড্-অল্ গুলো, লোকে বসে বা পায়ের চাপে নষ্ট না করে দেয়। যাহোক্, এবার বাস ছেড়ে দিল। কোথাও একটু বাস দাঁড়ালেই, একগাদা করে লোক বাসের ছাদে উঠছে। এত লোক কোথায় ছিল জানি না। মাধব আর আমি মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে শরীরের অনেকটা অংশ বার করে বাসের ছাদে আমাদের লাগেজ ঠিক আছে কী না লক্ষ্য করছি। একবার দেখলাম দু’টো সুটকেস ছাদের একপাশে দাঁড় করানো আছে। অর্থাৎ কেউ ওগুলো ওখানে সরিয়ে রেখেছে। আকাশে প্রচন্ড মেঘ করেছে, সঙ্গে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। একটাই ভয় হচ্ছে, হোল্ড্-অল্ গুলো পলিথিনে মোড়া, কিন্তু বৃষ্টি হলে সুটকেসগুলো ভিজবে, আর মাধবের কাছে গালাগালি খেতে হবে। তা খেতে হলেও এখন আর আমার কোন দুঃখ নেই, কারণ এখন এটা নিশ্চিত যে আমরা এবারের শেষ গন্তব্যস্থল, যমুনোত্রী যাচ্ছিই।

হঠাৎ দিলীপের পাশের মহিলার কোলে বসা সেই মেয়েটা, উল্টি, অর্থাৎ বমি করবে বলে জানালো। আমি দিলীপকে বললাম, খুব গম্ভীর হয়ে চোখ পাকিয়ে ওদের দিকে তাকাতে, তা নাহলে মেয়েটা আমাদের গায়েই উল্টি করবে। মহিলাটিকে বললাম, মেয়েটাকে ডানপাশে জানালার ধারে দাঁড় করিয়ে দিতে। মেয়েটা কাঁদতে এবং ঘামতে শুরু করলেও, নিজের জায়গা ছেড়ে নড়লো না এবং একটু পরেই মহিলাটির কোলে বমি করলো। আমাদের সামনের চেয়ার সিটের একজন, নিজের সিটটা ছেড়ে দিয়ে তাকে বসতে বললো। কিন্তু মেয়েটার বোধহয় ইচ্ছা, কোথাও না গিয়ে আমাদের গায়েই বমি করা। বাধ্য হয়ে মহিলাটিকে খুব মেজাজ দেখিয়ে, সামনের সিটে জানালার ধারে পাঠাতে বললাম। কিন্তু ওরা নীরব। এদিকে মেয়েটা একভাবে কেঁদে যাচ্ছে ও মাঝে মাঝে বমি করার মতো ওয়াক্ ওয়াক্ করে আওয়াজ করে যাচ্ছে। সামনের সিটের সেই ম্যানেজ করে জানালার ধারে বসা লোকটি আমাদের বললো, আমাদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে ওকে জানালার ধারে বসতে দেওয়া উচিৎ। দিলীপ তাকে ধমকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললো, “তোমার যদি এত দয়া, তবে তুমি তোমার সিটটা ছেড়ে দিয়ে ওকে বসতে দাও না”। লোকটা বিপদের আঁচ পেয়ে চুপ করে গেল। মনে হলো দিলীপের হিন্দী বলার ক্ষমতাই, এক্ষেত্রে লোকটাকে চুপ করাতে সাহায্য করেছে। ইতিমধ্যে কন্ডাক্টার এসে টিকিট দিয়ে ভাড়া নিয়ে গেল।। তিনজনের মোট ন’টাকা ভাড়া লাগলো। সন্ধ্যা অনেকক্ষণ পার হয়ে গেছে। বেশ অন্ধকার নেমে এসেছে। প্রতিমুহুর্তে মনে হচ্ছে, এই বোধহয় বৃষ্টি শুরু হলো। একসময় একটা ঝরনার তলা দিয়ে বাসটা গেল। পাহাড়ের একটা অংশ রাস্তার উপর ছাদের মতো ঝুলে আছে, আর সেইখান থেকেই খুব জোরে রাস্তায় জল পড়ছে। কিন্তু সেটা খুব সামান্য জায়গা জুড়ে হওয়ায়, বাসের ছাদে জল পড়ে জানালা ভিজিয়ে দিলেও, মালপত্রের খুব একটা ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। এইভাবে এক সময় বেশ অন্ধকারে বাস এসে সায়নাচট্টি উপস্থিত হলো।

চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাস থেকে নেমেই দু’জন বাঙালি ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হলো। এই বাসে আমরা তিনজনই একমাত্র টুরিষ্ট। আর সকলেই স্থানীয় বা আশেপাশের বাসিন্দা, কেউ কেউ হয়তো কাজেও এসে থাকতে পারে। ভদ্রলোক দু’জন একটা কুলি ডেকে, আমাদের ট্রাভেলার্স লজে নিয়ে গেলেন। এখানকার ট্রাভেলার্স লজে দেখলাম অনেকগুলো ঘর আছে। ব্যবস্থাও, এখন পর্যন্ত যতগুলো টুরিষ্ট লজ বা ট্রাভেলার্স লজে উঠেছি, তার মধ্যে সবথেকে ভালো। আমরা একটা তিন শয্যা বিশিষ্ট ঘর নিলাম। এই ভদ্রলোকরাও দেখলাম সংখ্যায় তিনজন। আমাদের ঘরের দু’একটা ঘর পরেই, ওনাদের ঘর। একটু পরে ওনাদের ঘরে গেলাম খোঁজখবর নিতে। একজন ডায়েরি লিখছেন বলে মনে হলো। আলাপ করে জানলাম, ওনারা জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার কর্মচারী। অফিসের কাজেই এদিকে এসেছেন, এবং এই ফাঁকে যমুনোত্রী দেখে, গঙ্গোত্রী যাবার ধান্দায় আছেন। গত দু’দিন কোন বাস না আসায়, ওনাদেরও আমাদের মতোই অবস্থা। তাই আজ বাস আসতে ওনারা আনন্দে ছুটে গিয়েছিলেন। যমুনোত্রী ওনাদের ভালো লাগেনি। আমাদের কাছে হেমকুন্ড ও নন্দন কাননের কথা শুনে, ওনারা ঐ দু’টো জায়গায় যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। আমরা নিজেদের ঘরে ফিরে এসে মালপত্র গুছিয়ে রাখলাম। বাসে আসবার সময় ছাদে অত লোক উঠতে দেখে, কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সুটকেসগুলো বোধহয় আর বাড়ি ফিরে যেতে পারবে না। কিন্তু আশ্চর্য, একটা পায়ের দাগ পর্যন্ত কোন লাগেজে পড়ে নি। ওরা মালপত্র সাবধানে সরিয়ে রেখে ছাদে বসছিল। বলতে লজ্জা করলেও, সত্যি কথা বললে বলতেই হবে, আমি হলে হয়তো সুটকেসের ওপরেই আরাম করে বসতাম। বিশেষ করে যেখানে কোন দেখার বা বলার লোক নেই। আকাশে মেঘ থাকলেও, বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। আমরা তিনজনে ঘুটঘুটে অন্ধকারে, খানিকটা মাঠের মতো ফাঁকা জায়গা পেরিয়ে, ডান হাতে একটা চায়ের দোকানে চা খেয়ে, রাতের খাবারের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। একজন যুবক দোকানটা চালায়। সে জানালো যে, সে আমাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়ে আসবে। আমরা জানালাম, আমরা নিজেরাই আসবো। ঘরে ফিরে এসে, যে যার খাটে আরামে শুয়ে থাকলাম। লোহার খাটে, স্পঞ্জের গদি। অনেকদিন বাদে নিশ্চিন্তে ঘুমনো যাবে। দিলীপের খাটটার একটা ঠ্যাং আবার নড়বড়ে, কোথাও শান্তি নেই। রাত প্রায় ন’টা নাগাদ তিনজনে দোকানে গিয়ে ডাল, তরকারি ও রুটি খেয়ে, ঘরে ফিরে এলাম। আগামীকালের প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস কাঁধের ঝোলা ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে, যাবার প্রস্তুতি শেষ করলাম। এরপর পরম আরামে দু’চোখের পাতা বুজে শুয়ে রইলাম।

আজ সেপ্টেম্বর মাসের চার তারিখ। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সমস্ত মালপত্র ট্রাভেলার্স লজের ক্লোক রুমে রেখে দিলাম। আজ আমরা যমুনোত্রী যাব। আজ আর ফিরবো না। কাজেই শুধু শুধু ঘরভাড়া গোনার কোন মানে হয় না। গতরাতের জন্য আঠারো টাকা ভাড়া মিটিয়ে, মালপত্র একজন অল্পবয়সি কেয়ারটেকারের কাছে জমা দিয়ে, আমরা গতরাতের চায়ের দোকানে এলাম, চা খেতে। এখানে এসে দেখলাম সামনে একটা বড় বোর্ড লাগানো আছে।

K.Metre              Height inMetre

Hunuman Chati                            8                           2124

Phul Chati                                  13                           2453

Janaki Chati                               16                           2575

Jamunatri                                   21                           3185

আগে হনুমান চটি পর্যন্ত জীপ ও বাস যেত। এখন যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ এখানেও আমাদের যাতায়াতে ৮+৮=১৬ কিলোমিটার পথ, অতিরিক্ত হাঁটতে হবে। চায়ের দোকানে জানা গেল, যদি বাস রাস্তা ধরে যাই, তাহলে হনুমান চটি আট কিলোমিটার পথ হাঁটতে হবে। আর যদি ডানদিকের হাঁটা পথে যাই, তবে দুই-আড়াই কিলোমিটার মতো পথ, কম হাঁটতে হবে। আমরা শেষ পর্যন্ত হাঁটা পথেই, আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তা মোটেই খাড়া নয়। ভোরের সূর্যালোকে প্রফুল্ল মনে আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি। বন্ধুদের কথা বলতে পারবো না, তবে আমার মনে এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। এবারও আমারই জয় হলো। যমুনোত্রী যাবার জন্য হাঁটা যখন শুরু করেছি, তখন যমুনোত্রী শুধু পৌঁছনোর অপেক্ষা মাত্র। একসময় হাঁটা পথ এসে বড় পাকা রাস্তায় মিশে গেল। আর কিছুটা এগিয়েই হনুমান চটি। গঙ্গোত্রী যাবার পথে লঙ্কায় এক দোকানদার, আমাদের হাতে একটা চিঠি দিয়ে, হনুমান চটির এক দোকানদারকে চিঠিটা দিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ করেছিল। এখন সেই দোকানদারের খোঁজ করে, তার হাতে চিঠিটা দিলাম। দোকানে চা ও ঝুড়িভাজা খেয়ে রওনা হবার আগে, মাধব ও দিলীপ ঐ দোকানে ফেরার পথে রাত্রে থাকার ব্যবস্থাও পাকা করে ফেললো। দোকানদার খুব খুশি হয়ে রাজি হয়ে গেল। রাতে আমাদের জন্য সে চাপাটি ও তরকারি বানাবে বললো। আমিও এই উত্তম প্রস্তাবে সায় দিলাম বটে, তবে মনে একটা আশা, ঠিকমতো হাঁটতে পারলে, আজ রাতে সায়নাচট্টির ট্রাভেলার্স লজের নরম গদিতে শান্তির ঘুম কে আটকায়? আগে পথেও শুনেছি, এখানেও আবার সেই সাবধান বাণী শুনলাম যে, যমুনোত্রীতে একজন বাঙালি সাধুবাবা থাকেন। সবাই তাঁকে মাধব বাবা বলে। তিনি পথিকদের খিচুড়ি খাওয়ান। তবে সে খিচুড়ি না খাওয়াই ভাল, কারণ ঐ খিচুড়ি খেলেই নাকি হজমের গন্ডোগোল হয়। অত কষ্টকর জায়গায় কষ্ট করে থেকে, নিজের গ্যাঁটের কড়ি খরচা করে, কেন তিনি যাত্রীদের অসুস্থ করার ব্রত নিয়ে ওখানে পড়ে আছেন জানি না। জানি না এই গল্পটা এত প্রচারই বা পেল কিভাবে। তবে সাবধানের মার নেই। আমরাও ঠিক করলাম, মাধব বাবার কাছে কিছু খাব না। আস্তে আস্তে একসময় “ফুল চটি” এসে পৌঁছলাম। রাস্তা হনুমান চটি থেকে পাঁচ কিলোমিটার। রাস্তা আস্তে আস্তে ওপরে উঠে আবার নীচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ আমরা একুশ কিলোমিটার পথের, তের কিলোমিটার পথ শুধু হেঁটেই এলাম, উচ্চতায় কিন্তু অতি সামান্যই উঠেছি। বুঝতে পারছি এ রাস্তার শেষে বেশ ভোগান্তি আছে। শেষ পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে, আমরা মাত্র ৩২৯ মিটার উচ্চতায় উঠেছি। অথচ রাস্তা কিন্তু কোথাও সমতল ছিল না। তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই, কারণ আমরা বেশ ভালো গতিতেই এগচ্ছি। আঁকাবাঁকা, চওড়া রাস্তা দিয়ে আমরা লক্ষ্যস্থলের দিকে এগিয়ে চলেছি। ডানহাতে অনেক নীচে যমুনা। এর চলার পথটা শক্ত পাথরের ওপর দিয়ে গেছে বলেই বোধহয়, এর জল এত পরিস্কার নীল। গঙ্গা গেছে নরম কাদামাটির পথ দিয়ে। গঙ্গার জলও তাই বেশ অপরিস্কার।

দেখতে দেখতে আমরা “জানকী চটি” এসে পৌঁছলাম। এখানে একটা টুরিষ্ট লজ্ থাকায়, রাতে থাকার বেশ ভালো ব্যবস্থা আছে। রাস্তার ডানপাশে একটা দোকান। এক বৃদ্ধ এই দোকানের মালিক। এখানে আমরা চা খেলাম এবং ফেরার পথে খাবার জন্য চাপাটি বানাতে বললাম। বৃদ্ধ একবার চাউলের কথা বললেও, আমরা তাঁকে চাপাটিই বানাতে বলে, রাস্তায় নামলাম। এখন পর্যন্ত রাস্তা বেশ আরাম দায়ক বললে ভুল বলা হবে না। কারণ রাস্তা কিছুটা ওপরে উঠে, আবার নীচের দিকে নামায়, খুব একটা কষ্টকর নয়। বৃদ্ধ দোকানদার জানালেন, আর মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পথ বাকি আছে। এঁকেবেঁকে রাস্তা হেঁটে চলেছি। পথের সৌন্দর্য বলে কিছু নেই। সেই একঘেয়ে বন, লতাপাতা, পাথর, আর ডানদিকে বহু নীচে, নীল যমুনা। আমরা এতদিন বিভিন্ন জায়গায় যে সৌন্দর্য দু’চোখ ভরে দেখে এসেছি, তারপর এই জায়গা ভালো লাগার কথাও নয়। আরও পাঁচ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হবে। এবার কিন্তু হঠাৎ রাস্তা ওপর দিকে উঠতে শুরু করলো। আমরা যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি, তখন আকাশে রোদ ও ছায়ার খেলা শুরু হয়ে গেছে। মাধব ও দিলীপ বেশ হাঁপিয়ে পড়েছে। আমার অবস্থাও খুব শোচনীয়। তবু ওদের ফেলে আমি প্রায় ছুটেই বলা যায়, এগিয়ে গেলাম। কারণ আকাশে বেশ মেঘ করে আসছে। সমস্ত জায়গার অনেক ছবি তুলেছি। এখন এই শেষ জায়গার ছবি, মেঘ করলে আমাদের এই অতি সাধারণ ভারতীয় ক্যামেরায় তোলা যাবে বলে মনে হয় না। উঠলে্ও, সে ছবি ভালো হবে বলে মনে হয় না। অনেকক্ষণ একা একা এগচ্ছি। হঠাৎ রাস্তার ওপর ছোট একটা সাপকে দেখলাম, রাস্তার একপাশ থেকে অপর পাশে যাচ্ছে। আমার হাতের লাঠি দিয়ে ওটার পথরোধ করতেই, সে তার ছোট্ট ফণা তুলে দাঁড়িয়ে পড়লো। দেহ কিন্তু মাটি থেকে একটুও উঠছে না, শুধু মাথাটা সামান্য তুলছে। মনে হয় একবারে বাচ্চা। হঠাৎ ভয় হলো, এটার মা যদি প্রতিবাদ করতে আসে। লাঠির নালে ওটাকে আটকে নিয়ে, ছুঁড়ে অনেক নীচের যমুনায় ফেলে দিলাম। জানি এটা অন্যায় করলাম, কিন্তু এই পান্ডব বর্জিত জায়গায় এটা কাউকে ছোবল মারলে, তাকেই যমুনার পারে শেষকৃত্য করতে নিয়ে যেতে হবে। আবার নিজের পথ ধরলাম। এবার দেখছি রাস্তা, বোধহয় সত্তর ডিগ্রী অ্যাংগেলে, সিঁড়ির মতো উঠতে শুরু করেছে। এই রাস্তাতেও আমি সাধ্য মতো যত তাড়াতাড়ি পারা যায়, ওপরে উঠতে শুরু করলাম। বাড়ির সিঁড়ি যেমন প্রথম একদফা উঠে, বাঁক নিয়ে নতুন করে আর একদফা উঠতে হয়, আবার বেঁকে নতুন আর এক দফা, এই রাস্তাও ঠিক সেই ভাবে ওপরে উঠেছে। বেশ কয়েক পাক ওঠার পর, দুরে মন্দির দেখতে পেলাম। মন্দিরের মাথায় লাল পতাকা উড়ছে। মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। চিৎকার করে সঙ্গীদের ডাকতে শুরু করলাম। ওরা কতটা পিছনে আছে জানি না, কোন উত্তর আসলো না। মন্দিরে গেলাম। একজন বসে আছেন, বোধহয় পুরোহিত হবেন। তবে তাঁর কাছে প্রথম যেটা জানতে পারলাম, তাতে আমার হার্ট অ্যাটাক হবার উপক্রম। আমি তখন প্রায় জিভ বার করে কুকুরের মতো হাঁপাচ্ছি, সেই অবস্থায় শুনলাম, এটা যমুনোত্রী মন্দির নয়। যমুনোত্রী মন্দির এখান থেকে আরও প্রায় দুই কিলোমিটার দুরে। কথাটা শুনে প্রথম অবস্থায় ভেঙ্গে পড়লেও, এখানে আর বৃথা সময় নষ্ট না করে, নতুন উদ্দমে এগতে শুরু করলাম। রাস্তা ঠিক একই ভাবে ওপরে উঠে যাচ্ছে। এত কষ্ট অন্য কোথাও বোধ হয়নি। রাস্তা আর শেষ হয় না। একভাবে চড়াই ভাঙ্গতে নিশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে। শেষে অনেক দুরে, ছোট্ট যমুনোত্রী মন্দির চোখে পড়লো। ডান হাতে একটা ব্রিজ যমুনার ওপর দিয়ে গেছে। ব্রিজটা কিন্তু ভেঙ্গে গেছে। ব্রিজের দু’পাশেই গাছের ডালপালা দিয়ে, রাস্তা বন্ধের নির্দেশ। একটু বাঁপাশে অনেক নীচে, যমুনার ওপর দিয়ে একটা সাময়িক ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। ব্রিজটা গাছের ডাল দিয়ে তৈরি। এই ব্রিজটার ওপর দিয়ে হাঁটার সময়, ব্রিজটা বেশ লাফাচ্ছে। পড়ে গেলে আর কিছু না হোক্, হাত-পা ভাঙ্গার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। গাছের দু’টো মোটা ডালের ওপর, সরু সরু ডালপালা ফেলে, ওগুলো যাতে সরে না যায় তাই, মধ্যে মধ্যে পাথর ফেলে রাখা হয়েছে। পরে মনে হলো, এটা বোধহয় যমুনা নয়, কোন শাখা নদী। জানি না এটার কী নাম। যাহোক্, ব্রিজ পার হয়ে আরও বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে, মন্দিরের বেশ কাছে এসে দেখলাম, আরও একটা ব্রিজ। এই ব্রিজটা বোধহয় যমুনার ওপর দিয়েই গেছে। আমি যখন ব্রিজটার প্রায় এক চতুর্থাংশ পার হয়ে গেছি, তখন বাঁপাশ থেকে চিৎকার শুনে তাকালাম। দেখি বাঁপাশে বেশ খানিকটা নীচে মন্দির, এবং একজন হাত নেড়ে আমায় রাস্তা দেখাচ্ছে। আসলে মন্দিরে যেতে হলে, ব্রিজটা পার হতে হবে না। ঠিক ব্রিজটার আগে থেকে বাঁপাশে নেমে আসতে হবে। ফিরে এসে নীচে নেমে, মন্দির চত্বরে এসে হাজির হলাম। পাশ দিয়ে নদী বয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে সঙ্গী দু’জন চলে এলো। ওদের কাছে শুনলাম, ওরাও আমার মতোই আগের মন্দিরটাকে, যমুনোত্রী মন্দির ভেবেছিল। ইতিমধ্যে আমার কয়েকটা ছবি তোলাও হয়ে গেছে। সব জায়গার ছবি বেশ ভালোভাবে তুলতে পেরেছি বলে, বেশ ভালো লাগছে। এই ছবিগুলোই সারা জীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে।

যমুনোত্রী মন্দির বলতে ছোট্ট একটা ঘর, সাদা দেওয়াল, ভিতরে যমুনার মুর্তি। যমুনোত্রীকে নিয়ে যতই হৈ-চৈ করা হোক্, যতই যাত্রী সেখানে যাক না কেন, মানুষ ও প্রকৃতি, উভয়ই তাকে উপেক্ষা করেছে, বঞ্চনা করেছে। মাধব বাবার সাথে পরিচয় হলো। তিনি আমাদের স্নান করে নিতে বললেন। একবারে মন্দিরের কাছে ছোট্ট একটা কুন্ড থেকে, গরম জল বার হচ্ছে। এখানকার কুন্ডের জল কিন্তু গঙ্গোত্রীর মতো হালকা গরম নয়। এই কুন্ডের জল এত গরম, যে ন্যাকড়া করে চাল ডাল বেঁধে জলে ফেলে দিয়ে ভাত, ডাল সিদ্ধ করা হয়। অনেকটা “মণিকরণ” এর মতো। জল ফুটলে যেমন টগবগ করে আওয়াজ হয়, এই কুন্ডের জল থেকে সেরকম একটা আওয়াজ হচ্ছে। ঐ তপ্ত কুন্ডের জল গড়িয়ে এসে একটু নীচে একটা চৌবাচ্চায় পড়ছে। এই চৌবাচ্চার জল অত গরম না হলেও, স্নান করা যায় না। এই দ্বিতীয় চৌবাচ্চা থেকে আরও নীচে, আর একটা চৌবাচ্চায়, জল গড়িয়ে পড়ছে। এই তৃতীয় চৌবাচ্চার জল খুব আরামদায়ক গরম। আমরা জামা প্যান্ট ছেড়ে, জলে নেমে পড়লাম। মাধব বাবা বললেন, তিনি খিচুড়ি তৈরি করছেন, আমরা যেন স্নান সেরে খাওয়াদাওয়া করে, যমুনোত্রী ত্যাগ করি। আমরা সবিনয়ে জানালাম যে আমরা রাস্তায় খেয়ে এসেছি, কাজেই এখন আমরা আর কিছুই খাব না। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন যে আমরা কোথায় খেয়েছি। একটু ইতস্তত করে বললাম, জানকী চটিতে। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, “তোমরা ওখানে কী খেয়ে এসেছ”? আমরা জানালাম যে আমরা ওখানে রুটি তরকারি খেয়েছি। তিনি বললেন তবে দু’টো খিচুড়ি খেয়েই যাও। এতো মহা মুশকিল, এক মাধবকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে, সব জায়গা ঘুরে এসে এখানে এলাম, তো আর এক মাধবের খপ্পরে পড়লাম। জয় মাধবায় নম। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত তাঁকে রাজি করানো গেল। তিনি বললেন তবে চা করি। আমরা বারণ করলাম। তিনি বোধহয় এবার একটু দুঃখই পেলেন। বললেন, “এত দুরে এসে কিছুই খাবে না”? আমরা জানালাম, এর জন্য তাঁকে ব্যস্ত হতে হবে না। যে জায়গাটায় স্নান করছি, তার পিছন দিকটায় মাধব বাবার মন্দির-কাম-আশ্রম। মাধব বাবার সাথে আমরা তাঁর আশ্রমে গেলাম। অনেক কথা হলো। উনি দেখলাম হাওড়া শিবপুরের প্রায় সমস্ত রাস্তা ঘাট চেনেন। এমনকী হাওড়া বাকসাড়া-ব্যাতরের কয়েকজনের নাম করে করে খোঁজখবরও নিলেন। তারাও আগে যমুনোত্রী দেখতে এসেছিল। তাঁর কাছ থেকে জানতে পারলাম, যে তিনি প্রায় নয়-দশ বছর যমুনোত্রীতে আছেন। ভদ্রলোক বাঙালি। হয়তো সন্ন্যাসী হয়ে বাড়ি থেকে চলে এসেছিলেন।

এবার আমরা ওপরে যমুনোত্রী মন্দিরে গেলাম। পূজা হয়ে গেছে, তাই মন্দিরের দরজা বন্ধ। একজন এসে দরজা খুলে দিল। মাধব ও দিলীপ ঠাকুর দর্শন করে, প্রসাদ নিল। আমি আরও কয়েকটা ছবি নিলাম। এরপর আমরা তিনজন মনের আনন্দে অনেকটা করে আমসত্ত্ব খেলাম। এবার ওঠার পালা। একটা হৃষ্টপুষ্ট ছেলে এসে আমায় বললো, তার একটা ছবি তুলে দিতে। মন্দিরের অনেক ছবি তোলা হয়েছে বলে, তাকে আশ্রমের কাছে দাঁড়াতে বললাম। সে কিন্তু মন্দিরের কাছে দাঁড়িয়েই, ছবি তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। কথা বলে বোঝা গেল যে, সে মন্দিরের কেয়ারটেকার মতো। নাম, “রাই সিং”। সে আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে, পোষাক বদলে আসলো। গায়ের কোটটা অনেক জায়গায় তালি দেওয়া। এবার সে আমায় বললো, আমার গায়ের হলুদ রঙের গেঞ্জিটা তাকে দিতে। বললাম, ছবি তুললে কিছু বোঝা যাবে না। ছেঁড়া জামা ছবিতে উঠবেও না, বোঝাও যাবে না। একটা ছবি নিলাম। তার অনুরোধে ছবির একটা কপি তাকে পাঠিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, তার ঠিকানা নিয়ে, ফিরবার পথ ধরলাম। একটু এগিয়েই আমার হাতের লাঠিটা আমায় ত্যাগ করে, নীচে যমুনায় চলে যাচ্ছিল। ওটাকে ধরে আবার আমার সঙ্গে নিয়ে চললাম। মাধব ও দিলীপ অনেক এগিয়ে গেছে। আমি বেশ ধীরে সুস্থে পথ চলছি। বেশ বুঝতে পারছি, চেষ্টা করলে আজই সায়নাচট্টি ফেরা সম্ভব হবে। আর এও বুঝতে পারছি, আজ যাওয়া আসা নিয়ে চল্লিশ-বিয়াল্লিশ কিলোমিটার পথ হাঁটতে বললেও, ওরা দু’জনের কেউই আজ আপত্তি করবে না।

আমার এখন একটাই ভাবনা, আগামীকাল ফেরার বাস পাওয়া যাবে তো? কল্যানদা যদি বাসটা আবার নিয়ে আসে, তো খুব ভালো হয়। হাঁটতে হাঁটতে যখন একসময়, সেই ভুল করে যমুনোত্রী মন্দির ভাবা, মন্দিরটার কাছে এলাম, তখন দেখি, একদল স্ত্রী ও পুরুষ, সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে আসছে। ওরা যমুনোত্রী যাবে। আরও অনেকটা পথ হাঁটার পর, আর একজনের সাথে দেখা হলো। সে আমার কাছে একটা সিগারেট চাইলো। তাকে একটা সিগারেট দিয়ে পকেট থেকে দেশলাই বার করে দেবার আগেই, সে সিগারেটটা ছিঁড়ে ফেলে, মশলাটা খৈনির মতো হাতে পিষে, মুখে ফেলে দিল। একসময় জানকী চটির সেই দোকানে এসে হাজির হলাম। মাধব ও দিলীপ দোকানে বসেই ছিল। আমাদের খাবার তৈরিই ছিল, তাই অহেতুক সময় নষ্ট না করে, ডাল আর রুটি খেয়ে আবার নিজেদের চলার পথ ধরলাম। ওদের এবার একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে বলে বললাম, আজই সম্ভব হলে সায়নাচট্টি ফিরে যাব। এবার উতরাই-এর পথই বেশি, কাজেই হাঁটার কষ্ট অনেক কম। কিন্তু মাধবের আবার এই এক রোগ, ওপরে ওঠার সময় কিছু হয় না বটে, কিন্তু নীচে নামতে হলেই ওর হাঁটুর ব্যথা শুরু হয়। হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরানো পথ ধরেই একসময় ফুলচটি এসে পৌঁছলাম। বেশ বুঝতে পারছি যে, যে কারণেই হোক, আজ কিন্তু আমাদের হাঁটার গতিবেগ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই পুরানো একঘেয়ে পথ ধরে, একসময় আমরা এঁকেবেঁকে হনুমান চটির সেই দোকানে ঢুকে, চা, ঝুড়িভাজা আর মিষ্টি খেয়ে, বেঞ্চে শুয়ে পড়লাম। এখন সবে বিকেল, তার মানে হাতে অনেক সময় আছে। দোকানদারকে জানালাম যে, আমরা আজই   সায়নাচট্টি চলে যাব, কাজেই আজ রাতে আর এখানে থাকবো না।

হঠাৎই লক্ষ্য করলাম, আকাশের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। আর সময় নষ্ট না করে উঠে পড়লাম। সঙ্গীদের বললাম, খুব জোরে বৃষ্টি আসবে, তাড়াতাড়ি পা চালাতে। দিলীপকে নিয়ে এখন আর কোন সমস্যা নেই। কিন্তু মাধবের হাঁটার গতি ক্রমশঃ কমে আসছে। দাঁড়িয়ে পড়লে দাঁড়িয়েই থাকতে হবে, কাজেই হাঁটতে শুরু করলাম। আমি আর দিলীপ একটু আগে আগে হাঁটছি, মাধব কিছুটা পিছনে। মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে ওকে গতি বাড়াতে বলছি। বড় রাস্তা থেকে যেখানে ডানদিকে পায়ে হাঁটার সেই শর্টকাট পথটা নেমেছে, সেখানে পৌঁছে বুঝলাম, বৃষ্টি নামলো বলে। মাধবকে আরও তাড়াতাড়ি নামতে বলে, আমি আর দিলীপ খুব জোরে পা চালিয়ে নামতে শুরু করলাম। এইভাবে যখন আমরা প্রায় নেমে এসেছি, তখন ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির ভয়ে মাধবও দেখি তার পায়ের ব্যথা ভুলে, আমাদের ধরে ফেললো। আমরা এবার ছুটতে শুরু করলাম। এইভাবে আমরা যখন প্রায় ট্রাভেলার্স লজের সামনে এসে পৌঁছলাম, তখন বেশ বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি শুরু হলো। আমরা ছুটে ট্রাভেলার্স লজে গিয়ে ঢুকলাম। এবার শুরু হলো প্রচন্ড শিলাবৃষ্টি। আমাদের দেখে তো কেয়ারটেকার অবাক। সে জিজ্ঞাসা করলো, এত তাড়াতাড়ি আমরা কিভাবে ফিরে আসলাম? সে আমাদের ভাগ্যবান আখ্যা দিয়ে বললো, দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টির পর, আজই প্রথম বৃষ্টি নামলো। আমরা আমাদের মালপত্র নিয়ে আগের সেই ঘরটায় চলে এলাম। ঘরে ঢুকেই যে যার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। এখন বেশ ঠান্ডা লাগছে। কম্বল চাপা দিয়ে আরাম করে শুয়ে থাকতে খুব ভালো লাগছে। শুয়ে শুয়ে ঘরের ছাদে, জানালায়, একভাবে শিল পড়ার শব্দ শুনতে শুনতে ভাবছি, বৃষ্টি নামায় এরা এত খুশি, কিন্তু রাস্তায় যদি ধস নামে তাহলে আমাদের কী হবে? আবার বাস বন্ধ হয়ে যাবে না তো? এই বৃষ্টিতেই সেই দোকানদারটা ছুটে এসে জিজ্ঞাসা করলো যে, সে আমাদের খাবার নিয়ে আসবে কী না। বললাম, একটু পরে আমরা নিজেরাই যাব। রাত ন’টা নাগাদ দোকানে গিয়ে রুটি, তরকারি খেয়ে, সমস্ত দাম মিটিয়ে ঘরে ফিরে এসে, মালপত্র গুছিয়ে রেখে শুয়ে পড়লাম।

আজ সেপ্টেম্বরের পাঁচ তারিখ। আজও বেশ সকালেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে নিয়ে চা খেতে গেলাম। দেখলাম আমাদের বাস গতকাল সন্ধ্যায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। গতকাল অন্ধকার আর মেঘবৃষ্টির মধ্যে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাসটাকে লক্ষ্য করি নি। মালপত্র নিয়ে লজের বিল মিটিয়ে, বাসে এসে মালপত্র্র গুছিয়ে তুললাম। আর কোন চিন্তা নেই। চা জলখাবার খেয়ে বাস ছাড়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলাম। বাসে আস্তে আস্তে লোক উঠছে। আমরাও বাসে উঠে বসলাম। একটু পরেই বাস ছেড়ে দিল। আগের দিন এ পথ সন্ধ্যার অন্ধকারে এবং ভীষণ ভিড়ে এসেছিলাম। তাই রাস্তাঘাট, নদীনালা, ভালোভাবে দেখার সুযোগ হয় নি। আজ খুশি মনে চারিদিক লক্ষ্য করতে করতে, ফুরফুরে মেজাজে চলেছি। অনেকটা পথ এসে, বাসটা একটা বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে গেল। গতকালের প্রবল বর্ষণে ছোট হলেও, ভয়ঙ্কর ধস নেমেছে। ঠিক বাঁকটার মুখে, রাস্তার খাদের দিকটায়, অনেকটা অংশ বহু নীচে নেমে গেছে। পাশ দিয়ে একটা জীপ চলে যেতে পারে, কিন্তু বাস নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। জায়গাটার নাম দেখলাম “পালিগড়”। বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া, আমাদের আর করার কিছুই নেই। এ রাস্তা সারানো আমাদের কর্ম নয়। এর জন্য স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও যথেষ্ট দক্ষতা থাকার বিশেষ প্রয়োজন। বাসের কয়েকজন বাস ড্রাইভারকে বললো, বাস খালি করে, সাবধানে ভাঙ্গা জায়গাটা পার হয়ে যেতে। সকলকে বাস থেকে নামিয়ে, বাস খালি করাও হলো। কিন্তু ঐ ভাঙ্গা অংশ পার করে বাস নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। তখন স্থানীয় বাস যাত্রীরা উপর থেকে বড় বড় পাথর বয়ে নিয়ে এসে, ভাঙ্গা জায়গা মেরামত করতে শুরু করে দিল। পাহাড়ের দিক, অর্থাৎ খাদের উল্টোদিকে রাস্তার একবারে পাশ থেকে পাথর সরিয়ে, ঐ জায়গার রাস্তা, খানিকটা চওড়া করার চেষ্টাও করা হলো। বুঝতে পারছি এটা সম্পূর্ণ সাময়িক, হয়তো দু’চারটে গাড়ি পার করার মতো ব্যবস্থা হচ্ছে। তা হোক, তবু একটা গাড়ি পার করা সম্ভব হলেও, আমরাই পার হচ্ছি। এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ কাজ করার পর, বাস চলাচলের মতো অবস্থা তৈরি করা সম্ভব হলো। ড্রাইভার খুব সাবধানে ভাঙ্গা জায়গাটা দক্ষ হাতে পার করে নিয়ে গেল। জানি না সামনে আবার আমাদের জন্য আর কোন দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে কী না। আস্তে আস্তে এঁকেবেঁকে আগের দিনের সেই পুরানো পথ ধরে, আমরা বারকোট ফিরে এলাম। সমস্ত লোক বাস থেকে নেমে পড়লো। মাধব ও দিলীপ রাস্তায় নেমে পড়েছে। প্রত্যেক বারের মতো, আমি বাসের ছাদে উঠেছি মালপত্র নামাতে। আমাদের ছাড়া আর সকলের মালপত্র বলতে ঝুড়ি, ছোট ছোট কাপড়ের পোঁটলা ইত্যাদি। কাজেই ওরা চটপট্ নিজেদের মালপত্র নিয়ে বাসের ছাদ থেকে নেমে পড়লো। আমাকে অতগুলো হোল্ড-অল্, ও সুটকেস নামাতে হবে। একটা মালও নীচে নামানো হয় নি, বাসের মুখ ঘুরিয়ে আনার জন্য, বাস ছেড়ে দিল। সঙ্গীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলো। আমি বাসের ছাদে উবু হয়ে বসে আছি। ড্রাইভার খুব জোরে বাস চালিয়ে নিয়ে চললো। অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়েও, বাসের মুখ উল্টোদিকে ঘোরানোর কোন লক্ষণ দেখছি না। কোন জায়গা থেকে বাসকে আবার মুখ ঘুরিয়ে বারকোট নিয়ে যাওয়া হয় তাও জানি না। বাসটা আদৌ মুখ ঘুরিয়ে আনতে যাচ্ছে কী না, তাও সঠিক জানা নেই। ভয় হচ্ছে, এখন যদি বলে এবেলা বাস এখানেই থাকবে, তাহলে এত মালপত্র নিয়ে কী করবো? হঠাৎ রাস্তায় বাসের ছাদে হনুমানের মতো আমার বসে থাকার ছায়া দেখে, ড্রাইভার জানালা দিয়ে মুখ বার করে, অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, বাসের ছাদে বসে আমি কী করছি। বললাম আমাদের মালপত্র এখনও নামানো হয় নি। বুঝলাম ড্রাইভার বা কন্ডাক্টার, কেউই জানতো না যে, আমি বাসের ছাদে বসে আছি। যাহোক্, এতক্ষণে একটা জায়গায় এসে, বাসের মুখ আবার বারকোটের দিকে ঘোরানো শুরু হলো। এই জায়গার রাস্তাও কিন্তু বেশ সরুই। বাসটা একবার সামনে উচু পাহাড়ের দিকে এগোয়, আবার খাদের দিকে পিছিয়ে এসে, ব্রেক কষে হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়ায়। এইভাবে এগিয়ে পিছিয়ে, অনেক কসরত করে বাসের মুখ ঘোরানো পর্ব চলছে। আমি খুব সাবধানে ছাদের একটা পাটাতন ধরে বসে আছি। ড্রাইভার আমাকে ধার থেকে সরে গিয়ে বাসের মাঝখানে বসতে বললো। বাসটা যখন পিছিয়ে খাদের দিকে এসে থেমে যাচ্ছে, বাসের ছাদ থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, বাসের পিছন দিকের অনেকটা অংশ, পিছনের চাকার প্রায় আগে পর্যন্ত, আমাকে নিয়ে খাদে ঝুলছে। বুঝতে পারছি না, সেই যদি সরু রাস্তার ওপরেই বাস ঘোরাতে হয়, তাহলে বারকোট থেকে তেল পুড়িয়ে এতটা পথ কষ্ট করে পার হয়ে, এই সুইসাইডাল্ পয়েন্টে আসার দরকার কী। বাসের ছাদে উবু হয়ে বসে, প্রায় দম বন্ধ করে ড্রাইভারের কেরামতি দেখছি। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত ওই ভাবে এগিয়ে পিছিয়ে বাসের মুখ ঘরিয়ে, বাসকে আবার বারকোটের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। বারকোটে ফিরে এসে, মালপত্র নামিয়ে, হোটেলে ঢুকলাম। আগের দিনের সেই ঘরটা পাওয়া গেল না। ঠিক তার উল্টো দিকে একটা ঘর পেলাম। এ ঘরটা থেকে বাথরুম পায়খানা কাছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, একে একে তিনজনে খুব ভালো করে স্নান করে, অবশিষ্ট বোর্ণভিটাটা শেষ করলাম। তারপরে একতলায় গিয়ে খেয়েদেয়ে, আবার ঘরে ফিরে এলাম। আগেরবার লক্ষ্য করেছি, বিকেল তিনটে-সাড়ে তিনটে নাগাদ, একটা স্টেট বাস বারকোট আসে। বাসটা কিন্তু আসে, যেদিক থেকে আমরা প্রথম দিন বারকোট এসেছিলাম, তার উল্টো দিক থেকে। অর্থাৎ বাসের ছাদে বসে আমাকে যেদিকে যেতে হয়েছিল, সেই দিক থেকে। বাসটা রাতে বারকোটে থেকে, পরদিন সকালে ঐ পথে মুসৌরী হয়ে, দেরাদুন যায়। অপর দিকে যে বাসটা হৃষিকেশ থেকে বারকোট হয়ে, সায়নাচট্টি যায়, সেটা আবার বারকোট থেকে হৃষিকেশ ফিরে যায়। আমরা আর কোন ঝুঁকির মধ্যে না গিয়ে ঠিক করলাম যে, সকালে যে বাসটা আগে ছাড়বে, তাতেই দেরাদুন বা হৃষিকেশ চলে যাব। কারণ এ যা রাস্তা, বাছাবাছি করতে গিয়ে দু’টোই হারাতে হতে পারে।

খাটে শুয়ে শুয়ে গল্প গুজব করে সময় কাটছে। বাড়িতেও ফিরে যাবার খবর দিয়ে চিঠি লিখলাম। গাড়ির আওয়াজ কানে আসলেই, জানালা দিয়ে মুখ বার করে লক্ষ্য করছি, আমাদের কাঙ্খিত যানটি এল কী না। এইভাবে বিকেল হয়ে গেল। হঠাৎ মাধব জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললো, “বাহন রেডি”। তাকিয়ে দেখি দেরাদুন যাবার স্টেট বাস এসে গেছে। কী যে খুশি হলাম, কলকাতা-হাওড়ায় নিজের এলাকায় বসে ভাবা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে নীচে নেমে এলাম। একটু দুরেই বাসটা দাঁড় করানো আছে। ড্রাইভারকে আগামীকাল সকালে বাস কখন ছাড়বে জিজ্ঞাসা করলাম। প্রথমে সে খুব একটা পাত্তা না দিলেও, কিছুক্ষণ পরে নিজে থেকেই জানালো, বাস কাল সকালে ছাড়বে, এবং সন্ধ্যা নাগাদ দেরাদুন গিয়ে পৌঁছবে। রাস্তা ঠিক থাকলে বিকাল নাগাদই পৌঁছে যেতে পারে। ভাড়া লাগবে মাথাপিছু তের টাকা সত্তর পয়সা। সব খবর পেয়ে ওখান থেকে ফেরার পথে জলখাবার কিনে, হোটেলে নিজেদের ঘরে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ বাদে হৃষিকেশ যাবার বাসও এসে হাজির হলো। মনের জোর অনেকটাই বেড়ে গেল। রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে বাড়ি ফেরার জন্য পুরোপুরি তৈরি হলাম।

আজ সেপ্টেম্বর মাসের ছয় তারিখ। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে মালপত্র নিয়ে নীচে এলাম। হোটেলের বিল মিটিয়ে বাসের টিকিট কাটবো ঠিক করলাম। হৃষিকেশগামী বাস ড্রাইভার আমাদের জানালো, দেরাদুন যাবার স্টেট বাসের ভাড়া অনেক বেশি। সে আমাদের তার বাসেই যেতে বললো। দেরাদুনগামী স্টেট বাস ড্রাইভারকে সব কথা বলতে, সে শুধু বললো আমরা যা ভালো বুঝবো তাই করতে। আমরা ঠিক করলাম, হৃষিকেশের বাসেই যাব। কিছুক্ষণ পরে দেরাদুনগামী বাস ড্রাইভার আমাদের বললো, “হৃষিকেশের বাস ভাড়া সামান্যই কম, কিন্তু ঐ বাস যেখানে সেখানে প্যাসেঞ্জারের আশায় দাঁড়ায়, কারণ ওটা প্রাইভেট বাস। প্যাসেঞ্জার কম থাকলে, কায়দা করে মাঝপথে হল্ট্ পর্যন্ত দিতে পারে। এটা স্টেট বাস, কাজেই প্যাসেঞ্জার হোক না হোক, তার কোন যায় আসে না। কাজেই ঐ বাসের কম ভাড়ার লোভ না করে, স্টেট বাসে যাওয়াই ভালো”। মহা সমস্যা। শেষ পর্যন্ত আমরা ভেবে দেখলাম, হাওড়া ফেরার ট্রেনের টিকিট দেরাদুন থেকে কাটাই সুবিধাজনক। কারণ হৃষিকেশ থেকে আবার হরিদ্বার বা দেরাদুন যেতে হতে পারে। আমরা দেরাদুন যাবার স্টেট বাসে মালপত্র তুলতে শুরু করলাম। হৃষিকেশগামী বাস ড্রাইভার আমায় ডেকে বললো, যে সে হৃষিকেশের বাস ভাড়া আরও দু’টাকা করে কমিয়ে দেবে। আমরা যেন তার বাসে মালপত্র নিয়ে চলে আসি। সে বিকালের মধ্যেই আমাদের হৃষিকেশ পৌঁছে দেবে। এতদিন আমাদের প্রয়োজনের সময়, এইসব বাসই আমাদের নিয়ে ছেলেখেলা করেছে। আজ নিজেদের স্বার্থে, বাসের ভাড়া কম করে নিতেও রাজি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের নিয়ে যাবার জন্য তার এত ইন্টারেষ্ট্ কেন?

যাহোক্, দেরাদুন যাবার স্টেট বাসে একবারে সামনে আমাদের সিট নিলাম। বাস বেশ ফাঁকা। অপর দিকে কম ভাড়ার জন্যই বোধহয়, হৃষিকেশের বাসে বেশ ভালোই ভিড় হয়ে গেছে। আমাদের বাস ছেড়ে দিল। বাস একবারে খালি। বেশ খানিকটা পথ আসার পর, এক জায়গায় বাস দাঁড় করিয়ে, বাসের ছাদে অনেক বস্তা সিমেন্ট তোলা হলো। মনে মনে ভাবলাম, এই লোকটাই তো বেশি খদ্দের তুলতে চায় দেখছি। তবু এই বাসে যাওয়ার একটা অন্য ভালো দিক আছে। হৃষিকেশগামী রাস্তাটা গোটাটাই আমরা দেখে এসেছি, কারণ বাস যাবে সেই ধরাসু হয়ে হৃষিকেশ। এদিকের রাস্তা অদেখা। নতুন রাস্তা, নতুন রূপ। বেলা সাড়ে বারটা-একটা নাগাদ ড্রাইভার “ডামটা” নামে এক জায়গায়, বাস দাঁড় করালো। এর আগে এক জায়গায় বাস দাঁড় করিয়ে, ছাদের সমস্ত সিমেন্ট নামানো হয়ে গেছে। গোটা বাসের জানালার কাচ তাই সিমেন্টে ভর্তি। ডামটায় বাস দাঁড় করিয়ে ড্রাইভার বাস থেকে নেমে পড়ে জানালো, এখানে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে। বাসের সকলে বাস থেকে নেমে পড়লো, আমরাও নামলাম। ডানদিকে দু’টো ছোট ছোট দোকান। এগুলোকে চায়ের দোকান বলাই উচিৎ। আর আছে একটা স্টেশনারি দোকান। এখানে কোথায় খাব, কী খাব, ভেবে পেলাম না। হঠাৎ একটা ডাকে, আমরা বাঁদিকে রাস্তার অনেকটা ওপরে তাকিয়ে দেখি, খুব সরু একটা পায়ে হাঁটা পথ, এঁকেবেঁকে ওপরে উঠে গেছে। বেশ কিছুটা ওপরে দু’টো দোকান। ঐ দোকানের কাছ থেকে আমাদের বাসের ড্রাইভার আমাদের হাত নেড়ে ডেকে, ওপরে চলে আসতে বলছে। আমরা পায়ে হাঁটা সরু রাস্তা ভেঙ্গে ওপরে উঠে গেলাম। ছোট একটা হোটেল। ড্রাইভার জিজ্ঞাসা করলো, “মাছ খাবেন? আপনারা তো বাঙালি? এখানে যমুনার টাটকা মাছ পাবেন”। আমরা প্রায় দিন কুড়ি মাছের মুখ দেখিনি। আমি নিজে মাছ যে খুব একটা ভালোবাসি তা নয়। বিশেষ বিশেষ কয়েক ধরণের মাছ আমার প্রিয়, এই পর্যন্ত। এখানে এতটুকু একটা দোকানে, অচেনা মাছ খাওয়ার খুব একটা ইচ্ছাও ছিল না। কিন্তু আমার সঙ্গী দু’জন মাছের কথায়, বেড়ালের মতো লাফিয়ে উঠলো। দোকানদার জানালো, বেশ বড় বড় মাছ যমুনার জলে পাওয়া যায়, তবে আমাদের ভাগ্য খারাপ, আজ খুব ভালো ও বড় মাছ পাওয়া যায় নি। মাছের দাম তিন টাকা প্লেট। কথায় কথায় দোকানদার এখানে এই নদী থেকে, মাছ ধরার বিশেষ কায়দাটা জানালো। এখানে নদীর স্রোত বেশ ভালো। নদীর দু’দিকে বেশ খানিকটা অংশ জাল বা ঐ জাতীয় কিছু দিয়ে, মাছ চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে কোন মাছ ঐ জালের বাইরে পালিয়ে যেতে না পারে। এরপর একরকম গাছের পাতা থেঁতো করে, ঐ দুই জালের মাঝখানে ফেলে দেওয়া হয়। ঐ পাতার গন্ধে দুই জালের মধ্যে আটকে পড়া সমস্ত মাছ ভেসে ওঠে। ঐ খরস্রোতা নদীতে গাছের পাতা থেঁতো করে দিলে, তা সঙ্গে সঙ্গে জলের স্রোতে বয়ে চলে যাওয়া উচিৎ। কাজেই তার গন্ধে মাছ কিভাবে ভেসে ওঠে ঠিক বুঝলাম না। হয়তো গন্ধে নয়, বিষক্রিয়ায় মাছ মরে ভেসে ওঠে। তবু এ যুক্তিও যেন খুব গ্রহণযোগ্য বলে মনে হলো না। যাহোক্, তিন প্লেট মাছ ও ভাত নেওয়া হলো। প্রত্যেককে একটা করে মাছ, টুকরো করে পাঁচ-ছয় টুকরো করে দেওয়া হলো। মাছটা দেখে এবং খেয়ে, এখানকার মাগুর মাছের সঙ্গে মিল আছে বলে মনে হলো। আমি দু’টুকরো মাছ নিয়ে বাকিটা বন্ধুদের দিয়ে দিলাম। ওরা খুব তৃপ্তি করে সব মাছ ভাত সাবাড় করে দিল। হোটেলের এগার টাকা বিল মিটিয়ে, নীচে বাসে এসে বসলাম। ড্রাইভারও কিছুক্ষণের মধ্যে বাসে এসে বসলো। এতক্ষণের রাস্তায় ড্রাইভারকে একটাও সিগারেট খেতে দেখিনি। তাকে একটা সিগারেট অফার করায়, সে জানালো যে সে স্মোক করে না। বাস ছেড়ে দিল। রাস্তা বেশ ভালো হওয়ায়, বাস বেশ ভালো গতিতে এগিয়ে চললো। ড্রাইভার জানালো, বাস ঠিক সময় দেরাদুন পৌঁছে যাবে। তা যে যাবে, আমরাও বেশ বুঝতে পারছি, কারণ কোন প্যাসেঞ্জার বাস থেকে নামতে দেরি করলে, ড্রাইভার বিরক্ত হচ্ছে। অনেক সময় রাস্তায় প্যাসেঞ্জারের হাত দেখানো উপেক্ষা করে বাস না থামিয়ে, ড্রাইভার বাস নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় বাস যত কম সময় দাঁড়ায়, ততই আমাদের পক্ষে মঙ্গল। কিন্তু আরও খানিকটা পথ এগিয়ে আবার অঘটন। প্রত্যেকবার রাস্তায় কোনো না কোন ঝামেলার মধ্যে আমাদের পড়তেই হচ্ছে। এখানে লোক নামানোর জন্য বাস দাঁড় করানোর পর, বাস আর নতুন করে কিছুতেই এগিয়ে যেতে পারছে না। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর যদিও বাস ছাড়লো, কিন্তু কোথাও বাস দাঁড় করালেই, নতুন করে বাস এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ড্রাইভার-কন্ডাক্টারের আলোচনায় মনে হলো, গীয়ারে কোন অসুবিধা দেখা দিয়েছে, গীয়ার ঠিক মতো কাজ করছে না।

বাসের যন্ত্রপাতির কিছুই বুঝি না। মনে বড় ভয় হলো, বাস ঠিক সময় দেরাদুন না পৌঁছলে, আজ আর দুন এক্সপ্রেস ধরা যাবে না। এর আগে আমরা একবার দেরাদুন এসে, “ওরিয়েন্টাল হোটেল” নামে একটা হোটেলে উঠেছিলাম। মাধব বললো, আজ রাতটা ঐ হোটেলে উঠে, আগামীকাল নাহয় দুন এক্সপ্রেসে হাওড়া রওনা হওয়া যাবে। এবার আমরা ঠিক করেছিলাম, সমস্ত জায়গা ঘুরে, ফিরবার সময় হরিদ্বারে দিনকতক রেষ্ট নিয়ে হাওড়া ফিরবো। রেষ্ট মানে কমপ্লিট্ রেষ্ট। ভালোমন্দ খাওয়া দাওয়া করবো, আর নিশ্চিন্তে ঘুমাব। সন্ধ্যাবেলা হর কী পৌড়িতে গিয়ে আরতি দেখে, বসে বসে গল্প করে সময় কাটাবো। এই উদ্দেশ্যে মাধব একসেট পায়জামা পাঞ্জাবিও সঙ্গে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন বুঝছি বাড়ির টান, নাড়ির টানের মতোই প্রবল। এখন আর আমাদের কোথাও যাবার ইচ্ছা নেই। এখন শুধু একটাই চিন্তা, কখন বাড়ি ফিরবো। কাজেই দেরাদুন থাকতে হতে পারে ভেবে, মন বেশ খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

বাস পাকা রাস্তা ছেড়ে এবার সরু এবং খুব খারাপ কাঁচা রাস্তায় পড়লো। বেশ কিছুক্ষণ এই রাস্তায় চলার পরে, হঠাৎ পিছনের বাঁদিকের চাকার টায়ার বিকট আওয়াজ করে ফেটে গেল। ব্যাস হয়ে গেল দুন এক্সপ্রেসে বাড়ি ফেরা। ড্রাইভার কিন্তু ঐ অবস্থায় বাস নিয়ে এগিয়ে চললো। এই রাস্তায় এই অবস্থায় বাস চালিয়ে নিয়ে যাওয়া কতটা বিপজ্জনক একবারও না ভেবে, ড্রাইভারের সাহসিকতা ও কর্মনিষ্ঠায় পুলকিত হয়ে আমরা চিন্তামুক্ত হলাম। এই অবস্থায় কোনরকমে দেরাদুন পৌঁছলে বাঁচা যায়। খুব খারাপ রাস্তা দিয়ে খানিকটা এগিয়ে এসে, ড্রাইভার এক জায়গায় বাসটাকে দাঁড় করালো। জায়গাটা মুসৌরী থেকে খুব একটা দুরে নয় বলে শুনলাম। এখানে একটা স্টেট বাসের বেশ বড় গ্যারেজ মতো আছে। বেশ কয়েকটা স্টেট বাস এই গ্যারেজে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের বাসটা এখানে গীয়ার মেরামত ও টায়ার পাল্টাতে দাঁড়ালো। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, এখানে কেউ আমাদের বাসটাকে চাকা খুলবার জন্য জ্যাক দিতে রাজি হলো না। প্রত্যেক বাসই আমাদের বাসের ড্রাইভারের কাছে মদ খাবার জন্য কিছু টাকা চাইলো। বিনিময়ে তারা, তাদের বাসের জ্যাকটা দেবে, আমাদের বাসটাকে মাটি থেকে উচু করে চাকা পাল্টাবার জন্য। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা সবক’টা বাসই স্টেট বাস, গ্যারেজটাও স্টেট বাসের, অথচ এরা নিজেদের মধ্যে কিরকম ঘুষ চায়, দেখে অবাক হয়ে গেলাম। এলাকাটাও মদ্যপান নিষিদ্ধ এলাকা বলে ঘোষিত বলে আগেই শুনে এসেছি। আমাদের ড্রাইভার আবার মদ তো অনেক দুরের কথা, বিড়ি সিগারেট পর্যন্ত খায় না। সে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে এর প্রতিবাদ শুরু করলো। কিন্তু একটা বাসও একে জ্যাকটা দিয়ে সাহায্য করলো না। আমাদের বাসে আবার নিজস্ব কোন জ্যাক না থাকায়, বাসটা চুপচাপ দাঁড়িয়েই রইলো। একবার ভাবলাম নিজেদের স্বার্থে, পকেট থেকে কিছু টাকা দিয়ে ঝামেলাটা মিটিয়ে ফেলি। কিন্তু ড্রাইভারের রূপ দেখে, সে প্রস্তাব দিতে সাহস হলো না। সমস্ত প্যাসেঞ্জার বাস থেকে নেমে পড়েছে। বেশির ভাগই স্থানীয় লোক। আশ্চর্য, এরা সবাই এ ঘটনার প্রতিবাদ করার থেকে, আমাদের বাসে কেন জ্যাক নেই, তাই নিয়ে হৈচৈ করতে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করলো। এই সময় একটা বাস আমাদের উল্টোদিকে যাবার সময়, এখানে এসে দাঁড়ালো। বাসটা বোধহয় মুসৌরী বা দেরাদুন থেকে আসছে। ওই বাসের ড্রাইভার বোধহয়, আমাদের বাসের ড্রাইভারের বন্ধু হবে। সে সব কথা শুনে বললো, সে ফিরে আসার সময় জ্যাক নিয়ে আসবে। বাসটা চলে গেল। জানি না তার গন্তব্য স্থল কতদুর। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, দুরে আস্তে আস্তে বহু নীচে একটা ব্রিজ পার হয়ে, বাসটা অদৃশ্য হয়ে গেল। প্রায় আধ ঘন্টা কেটে গেল, বাসটা আর ফিরে আসে না। এমন এক জায়গায় এসে পড়েছি যে, ঐ বাসটা না আসলে হয়তো আমাদের এই গ্যারেজে বাসে বসেই রাত কাটাতে হবে। আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে সব চিন্তার অবসান ঘটিয়ে, সেই ত্রাতা বাসটা ফিরে এল। এবার আমাদের বাসের মেরামতির কাজ শুরু হলো। আরও বেশ কিছু সময় পরে, আমাদের ড্রাইভার, গ্যারেজ ও অন্যান্য বাসের কর্মীদের ছেড়ে, তাদের মা ও মাসির উদ্দেশ্যে চোখাচোখা গালিগালাজ করতে করতে, বাস ছেড়ে দিল।

এইরকম বিপজ্জনক পথে এরা নিজেদের মধ্যে এত অসহযোগিতা নিয়ে কিভাবে বাস চালায় জানি না। খারাপ, খুবই খারাপ রাস্তায় আমরা চলেছি। একবারে কাঁচা, ভাঙ্গা রাস্তা। হঠাৎ অনেক দুরে বাঁহাতে, রাস্তা থেকে অনেক নীচে, অনেক লোকজনের ভিড় নজরে এল। ড্রাইভার কিন্তু আমাদের সাথে খুব ভালো ব্যবহার করছে। অথচ সে তার বাসের কন্ডাক্টারের সাথেও, খুব চড়া সুরে কথা বলছে। সামনে অত লোকের ভিড় দেখে, আমরা আবার নতুন কোন বিপদের আশঙ্কায় ভেঙ্গে পড়লাম। ড্রাইভার জানালো, ওটা কেম্পটি ফলস্। কেম্পটি ফলস্, অর্থাৎ আমরা মুসৌরী এসে গেছি। দেখতে দেখতে কেম্পটি ফলস্ খুব কাছে এসে গেল। সমস্ত লোকজনকে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। চারিদিকে গাড়ির ভিড়। ওই তো একবারে কাছে