রূপকুন্ডের হাতছানি {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary ও Tour Picture এবং ভালো ছবি , Tour & Tourists , Tour Planner পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

হিমালয়ের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। তা না হলে ১৯৭৯ সালের আগষ্ট মাসে ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স, হেমকুন্ড সাহেব, বদ্রীনারায়ণ, মানা হয়ে বসুধারা, ত্রিযুগীনারায়ণ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী, গোমুখ, যমুনোত্রী দর্শণ করে ঘরে ফেরার সাথে সাথে, আবার কেন হিমালয়ে যাবার নতুন করে টান অনুভব করবো? কথায় বলে সব ভাল যার শেষ ভালো। হয়তো গতবার সব শেষে যমুনোত্রী যাওয়াটাই ভুল হয়েছে। সবক’টা জায়গার মধ্যে, ঐ যমুনোত্রীর সৌন্দর্যই বোধহয় সবচেয়ে কম। তাই দেখা হয়েছে, কিন্তু মন ভরেনি।

তাই বছর না ঘুরতেই, হিমালয়ে যাবার টানটা এত প্রবল হলো, যে পরের বছর আগষ্ট-সেপ্টেম্বরে ফের ঘর ছাড়া হতে হলো।  ডালহৌসী, ধরমশালা, জ্বালামুখী, পালামপুর, খাজিয়ার, কুলু, মানালী, মণিকরণ ইত্যাদি, হিমাচল প্রদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরলাম, দেখলাম, কিন্তু পায়ে চলার যে একটা বিশেষ আনন্দ আছে, কষ্ট আছে, বাসে বাসে ঘোরায় সে আনন্দ কোথায়? তাই চাম্বা, ভারমোর, খাড়ামুখ, হাডসার, ধানচো হয়ে দর্শণ করলাম অধুনা হর-পার্বতীর বাসস্থান, ভারতীয় কৈলাশ “মণিমহেশ”। বেশ কষ্টকর রাস্তা, অথচ এই কষ্টের শেষে মন ভরলো না। খারাপ আবহাওয়া আর মেঘ, মণিমহেশ শৃঙ্গকে, আমাদের সাথে পুরোপুরি পরিচিত হবার সুযোগ দিল না। ফিরে এসে বেশ কয়েক মাস আনন্দেই দিন কাটলো। তারপরই দেখি সেই পুরানো রোগটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কোথাও চলো, বেড়িয়ে পড়ো। কিন্তু যাই কোথায়? মনের মধ্যে তো অনেক জায়গাই ভিড় করে আসছে। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে একটা জায়গাই যেন প্রবল ভাবে হাতছানি দিচ্ছে। ফিস্ ফিস্ করে বলছে, “আমায় দেখবে না? আমার কাছে আসবে না”? ওখানকার শত শত কঙ্কাল যেন অভিমান করে বলছে, “যে জায়গা দেখতে গিয়ে আজ আমাদের এই পরিণতি, সেই জায়গার প্রতি কী তোমাদের কোন টানই থাকবে না? হলামই বা আমরা মৃত, তবু একবার আমাদের না হয় দেখেই গেলে”। এ ডাককে এড়িয়ে যাবার, উপেক্ষা করার, ক্ষমতা আমার নেই। অতএব ঠিক করলাম, এবার রূপকুন্ড যাবই।

অসাধারণ লোকেরা বলবেন রূপকুন্ডে যাবে? তা এর মধ্যে চিন্তার আছেটা কী? বেড়িয়ে পড়ো। কিন্তু আমরা যে অতি সাধারণ, না আছে অভিজ্ঞতা, না আছে সহায় সম্বল। তাই চিন্তা হয় বৈকি। ঠিক করলাম মে মাসেই যাব। সঙ্গী হিসাবে এগিয়ে এল সহকর্মী সুভাষ দে। “ইনটূর” নামে দক্ষিণ কলকাতার একটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। এদের কাছে স্লীপিং ব্যাগ পাওয়া যাবে। ভাড়াও খুব একটা বেশি নয়। তবে সিকিউরিটি মানি হিসাবে প্রতিটি স্লীপিং ব্যাগের জন্য চার শত টাকা করে জমা রাখতে হবে। চিন্তার কথা, চার’শ টাকা যদি জমাই রাখবো, তবে যাব কী নিয়ে? তবু উপায় না থাকায়, ঐ শর্তেই রাজি হতে হলো। কিন্তু সতেরই মে থেকে অন্য একটা দল, ঐ সব স্লীপিং ব্যাগ, তাঁবু, ইত্যাদি ভাড়া নেবার জন্য টাকা অ্যাডভান্স্ করে গেছে। আমার ইচ্ছা ছিল, মে মাসের পনের-ষোল তারিখ নাগাদ যাত্রা শুরু করার। কিন্তু বাধ্য হয়ে যাত্রার তারিখ পাঁচই মে তে এগিয়ে আনতে হলো। এর মধ্যেও ওদের একটা শর্ত আছে, যেটা অতি ন্যায্য এবং যুক্তিসঙ্গত। রাস্তায় যত বাধা বিপত্তিই আসুক, পনেরই মের মধ্যে জিনিসগুলো ওদের ফেরৎ দিতেই হবে। দরকার হলে মাঝ রাস্তা থেকে ফিরে এসেও ফেরৎ দিতে হবে। সুভাষ দে’র যাবার আগ্রহ যথেষ্ট। কিন্তু ও সমস্ত কিছু দায়িত্ব, সমস্ত কিছু চিন্তার ভার, আমার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের মনে হলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমরা ফিরে আসতে পারবো। তাই ঐ শর্তেই রাজি হয়ে গেলাম। প্রতিষ্ঠানটির একজন অভিজ্ঞ ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, মে মাসের প্রথম দিকে ওখানে যাওয়া যাবে তো? ভদ্রলোক জানালেন একটু বেশি বরফ হয়তো হতে পারে, কিন্তু না যেতে পারার কোন কারণ নেই।

যাওয়া যাবে কী যাবে না, এই নিয়ে যখন দোটানায় রয়েছি, তখনই আলাপ হলো আমার এক সহকর্মী, শ্রী নন্দ দুলাল দাস এর সঙ্গে। ভদ্রলোকের পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা অনেক। নন্দদা বললেন, মে মাসে ওখানে যাবেন না। মে মাসে ওখানে আমাদের মতো একবারে সাধারণ, অনভিজ্ঞ লোকের পক্ষে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া গাইডের সাথে আগে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা করতে হবে। সব দিক চিন্তা করে ওখানে দাঁড়িয়েই ঠিক করলাম, মে মাসের পরিবর্তে আগষ্ট মাসের মাঝামাঝি যাব।  নন্দদা সহকর্মী হিসাবে আমাদের স্লীপিং ব্যাগ দিতে রাজি হয়ে গেলেন। ভাড়া প্রায় একই রকম। তবে চেনা জানার মধ্যে বলে, কোন সিকিউরিটি ডিপোজিট্ লাগবে না। আমার সঙ্গে সেদিন আবার এক সহকর্মী, শীতাংশু রায় ছিল। ও আমার সাথে একই শাখায় কাজ করে। ঐখানে দাঁড়িয়েই সে আমার রূপকুন্ড যাত্রার সঙ্গী হয়ে গেল। কথাবার্তা পাকা করে আমরা ফিরে এলাম। আমাদের সঙ্গে যাবার জন্য এগিয়ে এল, আরও তিনজন। অমল চৌধুরী, শ্যামল মুখার্জ্জী, ও সরল ভট্টাচার্য্য। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যে সুভাষ দে’র মা হঠাৎ মারা গেলেন। আমরা যদি মে মাসে যেতাম, তাহলে সুভাষ দে’র সাথে ওর মা’র আর কোনদিন দেখা হতো না। এই ঘটনার পর স্বাভাবিক ভাবে সুভাষ দে’র আর আগষ্ট মাসে যাওয়া সম্ভব নয়। আমরা চারজন পয়লা আগষ্টের কাঠগুদামের টিকিট কাটলাম। ইতিমধ্যে সরল ভট্টাচার্য্য, শরীর খারাপের জন্য দল থেকে বেরিয়ে গেছে। গাইড বীর সিং এর সাথে চিঠিতে যোগাযোগ করলাম। সমস্ত রকম যোগাযোগ, ব্যবস্থা ও কেনাকাটার ভার যথারীতি আমার ওপর এসে চাপলো। আমার অফিসের এক বয়স্ক কর্মী, রাম ওউধ পাঠক, উত্তর প্রদেশের সুলতানপুর এর বাসিন্দা, তাকে দিয়ে বীর সিংকে হিন্দীতে চিঠি লিখলাম। বীর সিং নেগী আমার চিঠির উত্তরে জানালেন, তিনি আমাদের নিয়ে রূপকুন্ড যেতে রাজি আছেন। এখান থেকে যাবার সময় তাঁর জন্য একটা ছয় নম্বর হান্টার শূ নিয়ে যাবার কথাও চিঠিতে জানাতে ভুললেন না। সে ব্যবস্থাও করা হলো। কেনাকাটাও প্রায় শেষ, এমন সময় যাবার ঠিক দিন সাতেক আগে, হঠাৎ আমার প্রচন্ড জ্বর হলো। নানা রকম কড়া ওষুধ খেয়েও পাঁচ দিনের আগে জ্বর কমানো গেল না। শরীর খারাপ হলেও যাবার ইচ্ছা ও মনের জো্‌র, তখনও কিন্তু আমার এতটুকু কমে নি। আমি যাবার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু আমার এই অবস্থায় আর সকলে যেতে সাহস করলো না। ফলে প্রচন্ড অনিচ্ছা ও মানসিক যন্ত্রনা নিয়ে, যাবার দু’দিন আগে, ঊনত্রিশ-এ জুলাই আমাদের ট্রেনের টিকিট বাতিল করা হলো। ওঃ! সে যে কী কষ্ট, বোঝাতে পারবো না। পরপর দু’রাত আমার ভালো ঘুম হলো না। পয়লা আগষ্ট হাওড়া স্টেশন না গিয়ে, অফিস জয়েন করলাম। আমার জন্য সকলের যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, নিজেকে যেন কিরকম অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তার থেকেও খারাপ লাগলো আমার জন্য যাওয়া বন্ধ হওয়ায়, সকলের ব্যঙ্গোক্তি। এদের অধিকাংশই কিন্তু জীবনে পুরী, দিঘার বাইরে জগৎ দেখে নি।

ওই দিনই মনস্থির করলাম এ মাসেই রূপকুন্ডু যাব। কেউ না যায়, আমি একা যাব। শ্যামল মুখার্জ্জীর সাথে দেখা করে অনুরোধ করলাম যাবার জন্য। সে জানালো কাঠগুদামের টিকিট বাতিল করতে হওয়ায়, সে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী যাবার জন্য টিকিট কেটেছে। বললাম ও সব জায়গায় ভবিষ্যতে যাবার অনেক সুযোগ আসবে, কিন্তু রূপকুন্ড যাবার সুযোগ হয়তো আর পাবে না। সঙ্গী পাওয়া তো ভাগ্যের কথা। কাজেই গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী যাবার টিকিট বাতিল করে চলো আমার সাথে। ও জানালো সামনের বছর যদি যাই, তাহলে ও আমার সাথে যেতে পারে। সামনের বছর কেন সামনের মাসেও নয়, এই আগষ্ট মাসেই আমি যাব।

যোগাযোগ করলাম অমল চৌধুরীর সাথে। ও আমার সহপাঠী, সহকর্মী শুধু নয়। আমার মণিমহেশ যাবার সঙ্গীও ছিল। কিন্তু অমলও শরীর ও পড়াশোনার অজুহাতে, সযত্নে নিজেকে দল থেকে আলাদা করে নিল।

আমার তখন পাগলের মতো অবস্থা। একা যাব বললেই তো আর যাওয়া যায় না। শেষ চেষ্টা করলাম শীতাৎশুকে অনুরোধ করে। প্রথমে ও যেতে রাজি হলো না। কারণ নাকি আমাদের যাওয়া বাতিল হওয়ায় ওর মন ভেঙ্গে গেছে। পরে শুনলাম আমার অসুস্থতার জন্য ওদের যাওয়া বাতিল হওয়ায়, অফিসের অনেকেই ওর উদ্দেশ্যে অনেক ব্যাঙ্গোক্তি করেছে। ওর শাঁখা সিঁদুর পরে থাকা উচিৎ, একা যেতে ভয় পায় ইত্যাদি। সত্যি, এই এক শ্রেণীর মানুষ, মন্তব্য করার সময় সকলের আগে এরা আছে। অথচ দুঃখের বিষয়, এদের অনেকেই জীবনে কোথাও কখনও যায় নি, অথবা গেলেও সুসজ্জিত শহর অঞ্চলেই গেছে। তাই পুরী আর রূপকুন্ড, এদের কাছে এক, বা হেঁটে তারকেশ্বর যাওয়া আর রূপকুন্ড যাওয়া একই ব্যাপার। যাহোক্, বহু অনুরোধর পর ও যেতে রাজি হলো বটে, তবে এক শর্তে। যাবার আগে পর্যন্ত অফিসে কাউকে কিছু জানানো চলবে না। ওর শর্তে রাজি হয়ে পরের দিনই টিকিট কাটলাম। যাবার দিন স্থির হলো চোদ্দই আগষ্ট, ঊনিশ’শ একাশি সাল। কেউ জানলো না ভিতরে ভিতরে আমরা দু’জন আবার প্রস্তুত হচ্ছি। বীর সিংকে আবার চিঠি দেওয়া হলো। বাধ্য হয়ে এবার হিন্দীতে আমিই লিখলাম। এত অল্প সময়ে তিনি এই চিঠি হাতে পাবেন কী না, বা পেলেও আমার মতো হিন্দীতে পন্ডিত লোকের লেখা চিঠি, তিনি পাঠোদ্ধার করতে পারবেন কী না, যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই গেল। যাবার দু’চারদিন আগে আমি অফিসে জানালাম আমি যাচ্ছি। শীতাংশু যাচ্ছে এটা অনেকে জানলো, অনেকে জানলো না।

অফিসের সলিল দে আমাদের জন্য চিড়ে, বাদাম ভাজা, মুড়কি দিল। অফিসেরই সমীরণ ঘোষাল দিল কফির প্যাকেট। পাড়ার এক বৌদি দিল চানাচুর। যাবার আগের দিন লোড শেডিং এর মধ্যেও সমস্ত জিনিস লিষ্ট্ মিলিয়ে ব্যাগে পুরলাম। যাবার দিন অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়িই বেড়িয়ে পরলাম। কেনাকাটা, গোছগাছ এখনও অনেক বাকি আছে। ওটা সবটাই আমাকে একাই করতে হবে। আশ্চর্য হয়ে গেলাম, যখন দেখলাম অফিসের অনেকেরই ধারণা, আমাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। সেই মুহুর্তে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছিল। সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি চলে এলাম। বাকি টুকিটাকি জিনিসপত্র কেনাকাটা করে, সব গুছিয়ে ফেললাম। রাত আটটার পাঞ্জাব মেল আমাদের নিয়ে যাবে। বিকেলবেলা শীতাংশু আসলো। যথা সময়ে সমস্ত মালপত্র নিয়ে আমরা হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম।

হাওড়া স্টেশনে আমার নিজস্ব কিছু বন্ধুবান্ধব ছাড়া অফিসের সলিল দে এবং তপন গাঙ্গুলী এসে হাজির। কথাবার্তার মধ্যে কখন রাত আটটা বেজে গেল। আস্তে আস্তে ওদের আমাদের মধ্যে দুরত্ব বাড়তে লাগলো। সুন্দর দুটো বার্থ পাওয়া গেছে। আমাদের সামনেই কয়েকজন চেনা মুখ। এরা আমাদের হেড অফিস ও অন্যান্য শাখার কর্মী। আমরা জানালার ধারে মুখোমুখি সিট্, বা ওপর নীচের বার্থ পেয়েছি। আমার ঠিক পিছনের সিঙ্গল আমাদের মতো সিটটায়, সার্টপ্যান্ট পরা এক যুবতী। খুব স্মার্ট। নিজের থেকেই আমাদের সাথে আলাপ করলো। নাম অনিতা। রেলে চাকুরি করে। মেয়েটির চেনাশোনা ছয়জন ছেলে রূপকুন্ড গেছে, গাইড নাথু সিং। তবে খবর পাওয়া গেছে নাথু সিং অসুস্থ। মেয়েটি আমাকে বললো ঐ ছেলেগুলোর সাথে দেখা হলে যেন, আমরা আলাপ করি এবং তার কথা বলি। অনিতা জানালো সে নিজেও ট্রেকিং করে। দার্জিলিং থেকে জুনিয়র মাউন্টেনিয়ারিং ট্রেনিং নিয়েছে। সামনের মাসে মণিমহেশ যাবে। এখন অফিসের কাজে অমৃতসর যাচ্ছে। সঙ্গে দু’জন অফিসকর্মী। অন্য একজন যাত্রীকে সঙ্গী করে, ওরা চারজন তাস খেলতে শুরু করলো। বেশ বুঝতে পারছি জুয়া খেলছে। জানালার মুখোমুখি আমি ও শীতাংশু। গল্পগুজবে বেশ সময় কেটে যাচ্ছে।  মনে কিন্তু একটা চিন্তা সবসময় ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে— বীর সিং আমার চিঠি পেয়েছেন তো? তিনি গোয়ালদামে আমাদের সাথে দেখা করবেন তো? পয়লা তারিখে যাওয়া বাতিল করে চোদ্দ তারিখে যাবার কথা জানিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পোস্ট অফিস থেকে পোস্ট করা তিনটে চিঠি দিয়েছি। একটা টেলিগ্রাম করার কথা চিন্তা করেছিলাম, কিন্তু হয়ে ওঠেনি। যদি বীর সিং চিঠি পানও, তিনি আমাদের কথা বিশ্বাস করবেন তো? আমাদের রূপকুন্ড যাবার ইচ্ছা বা সাহস নেই, শুধু শুধু চিঠি দিচ্ছি ভাববেন না তো? ভাবা অবশ্য উচিৎ নয়, কারণ আমি মোট খান দশেক খাম বা পোস্টকার্ড পাঠিয়েছি। তার ওপর আবার আর এক চিন্তা। যাবার আগে শুনে গেছি বীর সিং হাঁপানির জন্য এখন নিজে না গিয়ে, ওনার ছেলে, গঙ্গা সিংকে পাঠান। গঙ্গা সিং নাকি লোক ভালো নয়। জুলুম করে টাকা আদায় করে। শঙ্কু মহারাজের রূপকুন্ডের উপর লেখা একটা বই-এ রামচাঁদ নামে একজন গাইড এর, ঐ প্রকৃতির চরিত্রের কথা পড়েছি। ঐ অঞ্চলে আমরা তো পুরোপুরি গাইড-কুলির হাতের পুতুল হয়ে থাকবো। সব থেকে বড় চিন্তা অনিতা নামে ঐ মেয়েটার পরিচিত ঐ ছয়জনের দলটা নাথু সিংকে না পেয়ে বীর সিংকে গাইড হিসাবে নিয়ে যায় নি তো? সব রকম প্রস্তুতি লিষ্ট্ করে নিয়ে গেলেও, নানা চিন্তা মনের কোনে উকি দিচ্ছে। কারণ এইসব পথে যেতে গেলে অনেক কিছুই সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, যেগুলো আমাদের পক্ষে নিয়ে যাওয়া বা ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তার প্রধান কারণ পরিচিতি এবং পয়সার অভাব। আমাদের সামান্য স্লীপিং ব্যাগের সিকিউরিটি ডিপোজিট নিয়েই সমস্যায় পড়তে হয়। সঙ্গে টেন্ট্ নিয়ে যাই নি। রাস্তায় বৃষ্টির জন্য আটকে পড়লে থাকবো কোথায়? সব জিনিস গুছিয়ে নিলেও কোন হাঁড়ি, ডেকচি বা প্রেসার কুকার সঙ্গে নেওয়া হয় নি। নেওয়া হয় নি, কারণ লক্ষ্ণৌতে শীতাংশুর এক দাদা থাকেন, তাঁর কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হবে বলে শীতাংশু আমাকে এখান থেকে অযথা বয়ে নিয়ে যেতে বারণ করেছে। ওখানে না পাওয়া গেলে কিনে নেওয়া হবে। অথচ লক্ষ্ণৌ পর্যন্ত আমরা তো ট্রেনেই যাব, তাহলে আর বয়ে নিয়ে যাবার হ্যাপা কোথায় ওই জানে। সঙ্গে বড় বড় তিনটে পাশ বালিশের কভারের মতো ব্যাগ এবং একটা কিট্ ব্যাগ। চারটে ব্যাগই প্রচন্ড ভারী, দু’টো কুলিতে হবে তো? নাকি তিনটে কুলি লাগবে? তার মানে আরও ১৬৫-১৭০ টাকার ধাক্কা। আস্তে আস্তে রাত্রি নেমে এল। আমরা খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম। রাতে ভাল ঘুম হলো না। এক সময় ভোর হয়ে এল।

আজ আগষ্ট মাসের পনের তারিখ। ট্রেনে আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তে শুরু করলো। আসবার আগে কাগজে পড়েছি বিহার ও উত্তর প্র্রদেশে প্রচন্ড বন্যার কথা। ট্রেনে বসে কিন্তু কিছুই বুঝলাম না। দুপুর নাগাদ আমরা লক্ষ্ণৌ এসে পৌঁছলাম। ট্রেনে খুব ভিড়। আমরা ধরাধরি করে মালপত্র্র স্টেশনে নামালাম। একটা বড় ব্যাগ অনিতা নামের মেয়েটিকে লক্ষ্য রাখতে বলে গেছিলাম। আমরা মাল নিয়ে নামার সাথে সাথে দেখি মেয়েটি ঐ ভারী ব্যাগটা প্ল্যাটফর্মে নিজেই নামিয়ে এনেছে। ওর পক্ষেই বোধহয় এটা সম্ভব। গতকাল থেকে ট্রেনে লক্ষ্য করেছি, বিভিন্ন স্টেশনে ও নিজের এবং অন্যান্য অনেক বয়স্ক যাত্রীর খাবার জল, প্ল্যাটফর্মে নেমে ভরে আনছে। সে আমাদের যাত্রার শুভ কামনা জানালো। আমাদের মুখ চেনা, অল্প পরিচিত, সেই হেড অফিস বা অন্যান্য শাখার সহকর্মীরা কিন্তু কোন সাহায্যের হাত বাড়ায় নি।

লক্ষ্ণৌ রেলওয়ে স্টেশন।

আমরা  মালপত্র  নিয়ে কাঠগুদামের  গাড়ির  উদ্দেশ্যে  নির্দ্দিষ্ট  প্ল্যাটফর্মে  রওনা  দিলাম।  গাড়ি রাত  ন’টায়। কাঠগুদাম  যাবার  রিজার্ভেশনও  পাওয়া  গেল।  আমরা  মালপত্র   নিয়ে  দোতলায়  ওয়েটিং  রুমে  গেলাম।  ভালভাবে  স্নান  সেরে,  শীতাংশু  একটা  রিক্সা  নিয়ে  ওর  সেই দাদার  বাড়ি  গেল।  আমার  কিন্তু  মোটেই  ইচ্ছা  ছিল  না   যে, ও  এখন  কোথাও  যায়।  কোন  রকম  বিপদ  ঘটলে  যাবার  বারটা   বেজে  যাবে। কিন্তু  ওই  এক  হাঁড়ির  জন্য  আমাকে   মুখ  বুজে  ওর  যাওয়াকে  মেনে  নিতে  হলো।  আমি  মালপত্র  আগলে  বসে  থাকলাম।  ওয়েটিং  রুমের  বারান্দা  থেকে  লক্ষ্ণৌ  স্টেশনের  গম্বুজের  ওপর  চাঁদ  ওঠার  সুন্দর  দৃশ্য  দেখা  যাচ্ছে।   প্রায়  পৌনে  আটটা  বাজলো,  শ্রীমান  শীতাংশুর  পাত্তা  নেই।  এত  খারাপ লাগছে,  ভিতরে  ভিতরে  কিরকম  একটা  টেনশন  হচ্ছে  বোঝাতে  পারবো  না। এখানকার রিক্সাগুলো এত বাজে, এত বেপরোয়া ভাবে রাস্তায় চলে যে, যেকোন মুহুর্তে একটা কিছু ঘটে যেতে পারে। একটা করে রিক্সা স্টেশনের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে, আমি খুব আগ্রহ ভরে লক্ষ্য করছি সঙ্গী ফিরে এল কী না, আর প্রতিবারই আমাকে আরও চিন্তায় ফেলে, রিক্সা থেকে অপরিচিত লোক নামছে। এবার রীতিমতো বিরক্ত লাগছে। প্রথম থেকে আমি হাঁড়ি বা ডেকচি, বাড়ি থেকেই নিয়ে আসার কথা বলে আসছি। এমন সময় একটা সাইকেলে একটা হাঁড়ি হাতে বাবু তার দাদার সাথে স্টেশনে এলেন। সেই মুহুর্তে যে কী আনন্দ ও শান্তি হলো বলতে পারবো না। ট্রেনের বগি ও বার্থ নাম্বার দেখে, সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে, আমরা ট্রেনে চাপলাম। শীতাংশু জানালো ওর বৌদি বলেছে, হাঁড়িটা যেন বেশি মাজা না হয়, তাহলে ফুটো হয়ে যেতে পারে।

রাত ন’টার একটু পরে ট্রেন ছেড়ে দিল। লোয়ার বার্থে আমি, আর আপার বার্থে শীতাংশুর শোবার ব্যবস্থা হলো। ট্রেনটা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেডিস কুপ থেকে একটা আর্তনাদ ভেসে এল। গিয়ে দেখি জানালার ধারে বসা এক ভদ্রমহিলার কানের রিং কেউ টেনে নিয়ে গেছে। তার কান থেকে রক্ত ঝরছে। নিজের জায়গায় ফিরে এসে দেখি, একটা যুবক বার্থ রিজার্ভেশনের আশায় রেলওয়ে কর্মচারীর সাথে কথাবার্তা বলছে। যুবকটি জানালো, সে পুলিশে কাজ করে। আমার প্যান্টের বাঁ পকেটে এক টাকার একটা প্যাকেট, অর্থাৎ এক’শ টাকা। ডান পকেটে বেশ কিছু টাকার ট্রাভেলার্স চেক্। একটু তন্দ্রা মতো এসেছে, হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। দেখি যুবকটা আমার বার্থে আমার পায়ের দিকে ম্যানেজ করে আধ শোয়া হয়ে রয়েছে। আর তার একটা হাত ঠিক আমার বাঁ পকেটের ওপর। আমার মনে হলো ওর কোন বদ মতলব আছে। হয়তো বা পকেটমার। চুপ করে ঘুমের ভান করে শুয়ে শুয়েই ওর ওপর নজর রাখলাম। যুবকটিও এমন ভাব দেখাচ্ছে, যেন ও ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ আমি নিশ্চিত, ও জেগে আছে। ওর ওপর সন্দেহটা আরও বেড়ে গেল। হঠাৎ মনে হলো এভাবে তো চলতে পারে না। রাত জেগে ওকে আমি পাহারা দেব নাকি? কখন আমি ঘুমিয়ে পড়বো, আর সেই সুযোগে ও আমার পকেটের সমস্ত টাকা নিয়ে কেটে পড়বে। আমি উপুর হয়ে শুলাম। একটু পরে লোকটা উঠে গেল। আমি এবার এমন ভাবে শুলাম, যাতে আর কেউ না আমার পাশে বসবার বা শোবার সুযোগ পায়। ঘুম এসে গেছিল। হঠাৎ একটা ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি সেই যুবকটি আবার আমার পাশে, পায়ের কাছে বসেছে। একটু পরেই ও আমাকে একটু ঠেলে আমার পাশে শোবার চেষ্টা করলো। এবার আমি আপত্তি জানালাম। ও বেশ কড়া সুরে আমায় সরে শুতে বললো। আমার এত রাগ হলো যে সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে ওর টিকিট দেখতে চাইলাম। চিৎকার করে ওকে তখনই আমার সিট থেকে উঠে যেতে বললাম। চিৎকার করার উদ্দে্শ্য, শীতাংশুর ঘুম ভাঙ্গানো। শীতাংশুর ঘুম কিন্তু ভাঙ্গলো না। লোকটা একটু ঘাবড়ে গিয়ে আমার সিট ছেড়ে উল্টো দিকের সিটটায় বসলো। আমার চিৎকার শুনে কন্ডাক্টার গার্ড এসে ওর টিকিট দেখতে চাইলো এবং ওকে নেমে যেতে বললো। ও অভিযোগ করলো যে, আমি তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, সিট থেকে খেদিয়ে দিয়েছি। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত ও আমাদের রিজার্ভড্ কামরা ছেড়ে নেমে গেল। আমিও নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমবার চেষ্টা করলাম।

ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। জানালা দিয়ে খুব সুন্দর সূর্যের আলো এসে পড়েছে। একটু পরে “লালকুয়া” নামে একটা স্টেশনে গাড়ি এসে থামলো। আগেরবার যখন নৈনিতাল, আলমোড়া ইত্যাদি গেছিলাম, তখন দেখেছিলাম এই লালকুয়া স্টেশনে অতি উপাদেয় জিলিপি পাওয়া যায়। তাই তাড়াতড়ি প্ল্যাটফর্মে নেমে টাটকা জিলিপি ও সিঙ্গাড়া কিনে আনলাম। শীতাংশু তার ভাগের সিঙ্গাড়া, জিলিপি নিয়ে নিজের সিটে চলে গেল। আমি দরজার সামনে পাদানিতে পা রেখে মেঝেতে বসে, বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে, সিঙ্গাড়া জিলিপি ও চা দিয়ে উপবাস ভঙ্গে মন দিলাম। খুব আস্তে গাড়ি ছুটছে। লাইনের ধারে ধারে বোর্ডে ঘন্টায় চার কিলোমিটার বেগে গাড়ি চলার নির্দেশ দেখলাম। এত আস্তে গাড়ি চলার কারণ কী বুঝলাম না। সোয়া আটটা নাগাদ ট্রেন হলদুয়ানি স্টেশনে এসে পৌঁছালো। এখানেই আমরা নেমে যাব। এখান থেকেই গোয়ালদামের বাস ধরার সুবিধা। একটা রিক্সা নিয়ে সামনেই বাসস্ট্যান্ডে এলাম। ন’টার সময় বাস ছাড়বে। শীতাংশু টিকিট কাউন্টারে টিকিট কাটতে গেল। আমি মাল পাহারা দিচ্ছি। তিনটে বাঙালি ছেলেও দেখলাম এই বাসে যাচ্ছে। শীতাংশু ফিরে আসলে, মালপত্র বাসের ছাদে তুললাম। কিট্ ব্যাগটা আর কেরোসিন তেলের টিনটা, বাসের ভিতরেই রাখা হলো। আগেই আমি দুটো সিট্ দখল করে রেখেছি। হাওড়া থেকে কাঠগুদামের দুরত্ব ১৫৩১ কিলোমিটার। রিজার্ভেশন চার্জ নিয়ে এক একজনের ভাড়া লেগেছে সাতাত্তর টাকা নব্বই পয়সা। হলদুয়ানি থেকে গোয়ালদাম প্রায় এক’শ আশি কিলোমিটার পথ। দু’জনের বাস ভাড়া লাগলো সাতচল্লিশ টাকা দশ পয়সা। বাসে বসে ঐ তিনজন ছেলের সাথে আলাপ হলো। ওরা কলকাতায় থাকে, যাবে গোয়ালদাম। ওখান থেকে পরের দিন যোশীমঠ হয়ে কেদারনাথ, বদ্রীনারায়ণ, ভ্যালী অফ্ ফ্লাওয়ার্স, হেমকুন্ড যাবে। একেবারেই অনভিজ্ঞ, এই প্রথম এই জাতীয় রাস্তায় আসছে। ওদের মধ্যে একজনকে দেখলাম এর মধ্যেই ভয়ে অস্থির। ওরা গোয়ালদাম দেখতে চায়। তাই এত ঘুরে, পরের জায়গাগুলো যাবে। ঐ সব জায়গা আমার দেখা, কোথায় কোথায় থাকার জায়গা ভালো পাওয়া যাবে, কোথায় কী অসুবিধা, সব কিছু ডিটেলস্-এ ওদের জানালাম।

বাস আলমোড়া হয়ে বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ গোয়ালদাম এসে পৌঁছালো। গোয়ালদাম আমি আগেও এসেছি। পথের সৌন্দর্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। তবে এখান থেকে নন্দাদেবী, নন্দাঘন্টি, ত্রিশুল, ইত্যাদি শৃঙ্গ খুব পরিস্কার দেখা যায়। এবার আমরা ওদের আরও কাছে যাব। মালপত্র নামিয়ে, আমি গেলাম টুরিষ্ট বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা করতে। একটা ঘরে পাঁচটা বেড, এক একটা বেডের ভাড়া আট টাকা। একটা ডবলবেড রুম আছে, ভাড়া পঁচিশ টাকা। কোনটাই আমার পছন্দ হলো না। আমি চাইছি সস্তায় একটা সেপারেট্ ঘর। কারণ রাতে মালপত্র ঠিক করে গোছাতে হবে। তৃতীয় কোন লোক আমাদের ঘরে থাকে, এটা আমার পছন্দ নয়। টুরিষ্ট বাংলোর উল্টোদিকে, রাস্তার ধারেই “মানস সরোবর” হোটেল। মালিক, দীর্ঘদিন পশ্চিম বাংলার হাসানাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জ অঞ্চলে ছিলেন। ভদ্রলোক মিলিটারিতে কাজ করতেন। বেশ ভালো বাংলা বলেন। তার সাথে ঘর দেখতে গেলাম। এক একটা ঘরে চারটে করে বিছানা। প্রতি বেডের ভাড়া চার টাকা। আমরা ষোল টাকা ভাড়া দিয়ে একটা ঘর নিলাম। মালপত্র ঘরে রেখে, তালা দিয়ে রাস্তায় এলাম। বাস থেকে নামার সময় লক্ষ্য করেছিলাম, একজন নেপালিদের মতো দেখতে স্থানীয় লোক, আমাদের দু’জনকে লক্ষ্য করছে। এখনও দেখছি সে রাস্তায় পায়চারি করে বেড়াচ্ছে। এখনও সে আমাদের লক্ষ্য করে যাচ্ছে। আমার বদ্ধ ধারণা হলো, এ অবশ্যই বীর সিং। কিন্তু কী করে বোঝা যায়? শীতাংশুকে বললাম আমরা ওর পাশ দিয়ে যাবার সময় বীর সিং সম্বন্ধে আলোচনা করতে করতে যাব। তাহলে উনি বীর সিং হলে, নিজেই আমাদের সাথে কথা বলবেন। বীর সিং সমস্যা মিটলো ভেবে করলামও তাই। অথচ তাঁর দিক থেকে কোন সাড়া মিললো না। বুঝে গেলাম, এ আর যে সিংই হোক, বীর সিং নয়। চা জলখাবার খেয়ে, যে পথটা দেবল হয়ে রূপকুন্ড যাবার জন্য বড় রাস্তা থেকে নেমে গেছে, সেই পথে একটু নীচে একটা দোকানে গেলাম। বয়স্ক দোকানদারকে আমাদের অসুবিধার কথা জানালাম। সব কথা শুনে ভদ্রলোক জানালেন, বীর সিং নিশ্চই চিঠি পেয়েছেন। আর চিঠি পেলে যত রাতই হোক, তিনি গোয়ালদাম এসে আমাদের সাথে দেখা করবেনই। ভদ্রলোক বীর সিংকে ভালো ভাবে চেনেন। মনে একটু আশার সঞ্চার হলো।  ভদ্রলোক বললেন বীর সিং এই পথেই আসবেন এবং তাঁর সাথে দেখা করবেন। বীর সিং আসলে তিনি তাঁকে আমাদের কথা বলে আমাদের হোটেলে পাঠিয়ে দেবেন। আর বীর সিং যদি আজ না আসেন, তাহলে কাল সকালে দেবলে যে ডাক নিয়ে যায়, তার হাতে আমাদের কথা জানিয়ে চিঠি দিয়ে দেবেন।

আরও কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে, আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। বাড়ি ও অফিসে চিঠি লিখে, সমস্ত মালপত্র ব্যাগ থেকে বার করলাম। ঠিক করলাম খাওয়া দাওয়া সেরে, নতুন করে মালপত্র গোছগাছ করে নেব। একটু বিশ্রাম করে, হিসাবপত্র মিলিয়ে, আমরা রাতের খাওয়া সারতে গেলাম। প্রথমে গেলাম টুরিস্ট্ বাংলোতে সেই তিনজন বাঙালি ছেলের সাথে দেখা করতে। গিয়ে দেখি ওরা কেয়ার টেকারের সাথে, যারা বাংলো বুক করেছে, তাদের চিঠি দেখছে। আমরা হাজির হতে তারা নতুন করে তাদের গন্তব্যস্থলের পথঘাট, হোটেল সম্বন্ধে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলো। কথাবার্তায় বুঝলাম, এই সমস্ত জায়গার পথঘাট সম্বন্ধে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। সেই ভীতু ছেলেটা জানালো, তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কী রকম একটা হাঁপানির ভাব দেখা দিচ্ছে। আমি তাকে বললাম ওটা তার মনের ভুল। সে যেন কম করে স্মোক্ করে। আমরা উঠে পড়লাম। ওরাও রাতের খাওয়া সারতে উঠে পড়লো। রাস্তায় ওরা জানালো টুরিস্ট্ বাংলোয় জলের ভীষণ অভাব। কেয়ারটেকার এক বালতি জল এনে দিয়েছে। আমরা ভাগ্যবান, আমাদের হোটেলে জলের কোন সমস্যা নেই। আমরা সন্ধ্যার সময় একটা হোটেলে খাবার কথা বলে এসেছিলাম। ওরা জানালো ওরাও একটা হোটেলে খাবারের অর্ডার দিয়ে এসেছে। কাজেই ওদের যাত্রার শুভ কামনা জানিয়ে, আমরা নির্দ্দিষ্ট হোটেলে চলে গেলাম। দোকানদার জানালো এটা তার জামাইবাবুর হোটেল। তারা এখন এখানে নেই বলে সে হোটেলটা চালাচ্ছে। সে স্থানীয় হাসপাতালে কাজ করে। ডাল, রুটি, তরকারি যখন প্রায় খাওয়া হয়ে গেছে, তখন সে জানালো মাংস আছে। সে নিজে মাংস খায় না। আমরা মাংসের অর্ডার দিলাম। জানি না এরপর কবে আবার ভালো খাবার জুটবে। যাহোক্, খাওয়ার শেষে সে জানালো সতের টাকা বিল হয়েছে। কী এমন খেলাম জানি না। বিল মিটিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

রাত অনেক হলো, বীর সিং এলেন  না। আমাদের  প্ল্যান অনুযায়ী আঠারো তারিখে হাঁটা শুরু করার কথা। আজ ষোল তারিখ। খেতে যাবার সময় ঠিক করেছিলাম কাল সকালেও বীর সিং না আসলে, আমরা “দেবল” গিয়ে বীর সিং এর সাথে দেখা করে, সন্ধ্যায় গোয়ালদাম ফিরে আসবো। কিন্তু এখানে কথা বলে বুঝেছি, সেটা সম্ভব হবে না। আমরা হোটেলে ফিরে সমস্ত মালপত্র গোছগাছ শেষ করে শুয়ে পড়লাম।

আজ সতেরই আগষ্ট। বেশ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে, হাতমুখ ধুয়ে চা খেতে গেলাম। ঘুম থেকে উঠেই বীর সিং এর চিন্তা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। দোকানে গিয়ে দেখি বেঁটে মতো, নেপালিদের মতো পাহাড়ি চেহারার একজন ভদ্রলোক, চেয়ারে বসে আছেন। সামনে শেষ করা ছোট একটা মদের বোতল। দোকানের একজন, নতুন একটা বোতল বাইরের কোন দোকান থেকে এনে, তাঁর টেবিলে রাখলো। ভদ্রলোকের বোধহয় ঠান্ডা লেগেছে। তিনি চায়ের গ্লাশ বারবার চোখের কাছে এনে গরম ভাব নিচ্ছেন। গতকাল সন্ধ্যার পর এই ভদ্রলোক আমাদের হোটেলে উঠেছিলেন। ইনি ঐ হোটেলে ওঠায়, হোটেল মালিক কিন্তু মোটেই খুশি হন নি। পরে হোটেল মালিকের কাছে শুনেছিলাম যে ভদ্রলোকের নাম পি.ডি.লামা। উনি একটা আমেরিকান দলকে নিয়ে এভারেষ্ট্ জয় করেন। ওনার অনেক ছেলেমেয়ে। ভদ্রলোক কুমায়ন মাউন্টেনিয়ারিং ইনষ্টিটিউটের চেয়ারম্যান। অনেক টাকা মাইনে পান। আবার আমেরিকা থেকেও নাকি প্রতিমাসে একটা বড় অঙ্কের টাকা পেনশন পান। গতকালও এঁকে অনেকগুলো বোতল শেষ করতে দেখেছি। হোটেল মালিককে ওগুলো আনার ব্যবস্থা করতে হয়, হোটেল ভাড়াও নাকি ঠিকমতো পাওয়া যায় না। অথচ উনি যখনই গোয়ালদামের বাইরে যান, এই হোটেলে রাত কাটান। ঐ রকম নামী, ধনী একজন, কেন এইরকম একটা অনামী, নোংরা হোটেলে থাকেন বলতে পারবো না। যাহোক্, চা জলখাবার খেয়ে, আমরা স্টেট্ ব্যাঙ্কটা কোথায় দেখে আসলাম। সাড়ে দশটায় ব্যাঙ্ক খোলে, ব্যাঙ্ক খুললে ট্রাভেলার্স চেক ভাঙ্গাতে যেতে হবে।

আজকের আবহাওয়া খুব সুন্দর। নীল আকাশ, ঝলমলে রোদে গোয়ালদাম রৌদ্রস্নান সারছে। এখানে এসে শুনলাম দিন তিনচার হলো বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে। তার আগে প্রতিদিন ভালো বৃষ্টি হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে এক তারিখে আসা হয়নি, ভালোই হয়েছে। কিন্তু এ ভালো কতক্ষণ থাকবে তার তো কোন স্থিরতা নেই। বেলা বেশ বেড়ে গেল, বীর সিং এর পাত্তা নেই। গতকালের সেই দোকানদারের কাছে গেলাম। ভদ্রলোক জানালেন বীর সিং না আসলে তিনি দেবলে যে ডাক নিয়ে যায়, তার হাতে বীর সিংকে চিঠি দিয়ে সব জানিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন। আমাদের হোটেল মালিক অবশ্য বলেছিলেন এর আগে ছয়জনের যে দলটা রূপকুন্ডের উদ্দেশ্যে গেছে, তাদের গাইড না আসায়, তাঁর ছেলে তাদের কুলির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কুলিরা তাদের মালপত্র দেবলে পৌঁছে দেবে। ওখান থেকে গাইড পেতে অসুবিধা হবে না। কাজেই আমাদের গাইড না আসলে, ভদ্রলোক ছেলেকে বলে কুলির ব্যবস্থা করে দেবেন। একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেলেও চিন্তা শতগুনে বাড়লো। বীর সিং বা তার ছেলে গঙ্গা সিং, ঐ দলটার গাইড হিসাবে চলে যায় নি তো? সম্ভাব্য খরিদ্দার কখনই নিশ্চিত খরিদ্দারের থেকে ভালো হতে পারে না।

বেলা আরও বাড়লে, আমরা নিজেরাই পোস্ট্ অফিসে গেলাম। সেখানে একজন যুবক কর্মীকে সমস্ত ব্যাপারটা জানালাম। যুবকটি বেশ ভদ্র্র। আমাদের সব কথা, সে মন দিয়ে শুনে জানালো— বীর সিংকে সে চেনে। আমাদের সে বীর সিং এর উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে দিতে বললো। একটু পরেই দেবল থেকে ডাক আসবে, তার হাতে সে আমাদের চিঠিটা দিয়ে দেবে। পোস্ট্ অফিসে কাগজ পাওয়া গেল না। আমাদের সঙ্গেও এই মুহুর্তে চিঠি লেখার মতো কাগজ নেই। আশেপাশে অনেকগুলো দোকান ঘুরেও কাগজ পেলাম না। শুধু কাগজ নয়, এখানে একটা দোকানেও সিগারেট পাওয়া গেল না। রাস্তায় গাইড, কুলির জন্য কিছু সস্তার সিগারেট নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। বাধ্য হয়ে বিড়ি কিনে নেওয়া হলো।

হঠাৎ দেখি একদল বাচ্চা ছেলে বইখাতা হাতে স্কুলে যাচ্ছে। তাদের একজনের কাছ থেকে একটা খাতার পাতা ছিঁড়ে নিয়ে, গতকাল রাতে যে হোটেলে খেয়েছিলাম, সেই হোটেলের ছেলেটাকে দিয়ে বীর সিংকে একটা চিঠি লিখিয়ে নেওয়া হলো। ছেলেটা চিঠিটা একটা সাদা খামে পুরে মুখ বন্ধ করে দিল। আমরা চিঠিটা পোস্ট অফিসে দিয়ে আসলাম। ওখান থেকে ফিরে, ঘুরতে ঘুরতে দেবল যাবার রাস্তা দিয়ে একটু নেমেছি, দু’-তিনজন লোক আমাদের পাশ দিয়ে ওপরে উঠে গেল। এমন সময় সেই বৃদ্ধ দোকানদার আমাদের ডেকে জানালেন, বীর সিং এসে গেছেন। আমরা ফিরে এসে দেখলাম আমরা এইমাত্র বীর সিং এর পাশ দিয়েই নীচে নামলাম। বীর সিং হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক্ করলেন। আমি আনন্দে তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম। ভদ্রলোকের বয়স হয়েছে। শুনলাম তাঁর বয়স পঞ্চান্ন-ছাপান্ন। কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় এখনও যথেষ্ট ক্ষমতা ধরেন। তিনি আমাদের সাথে হোটেলে এলেন। সঙ্গে দু’জন লোক। বোধহয় কুলি হবে। তিনি ভীষণ তাড়াতাড়ি কথা বলেন, বললেন গতকাল সন্ধ্যায় তিনি গঙ্গা সিংকে আমাদের খোঁজে পাঠিয়েছিলেন। গঙ্গা সিং টুরিষ্ট বাংলোয় আমাদের আসার খোঁজ করে, আমাদের না পেয়ে ফিরে গেছে। তিনি আরও জানালেন যে তিনি টুরিষ্ট বাংলোয় আমাদের আসার কথা বলে রেখেছিলেন, কারণ তাঁর ধারণা ছিল আমরা নিশ্চই ওখানেই উঠবো। আশ্চর্য ব্যাপার। গতকাল ওখানকার কেয়ারটেকার শুনলো আমরা রূপকুন্ড যাব, অথচ সে গঙ্গাকে কিছু বললো না?

বীর সিং ও তাঁর সঙ্গীদের বিড়ি দিলাম। তিনি অনেক কথা অনর্গল বলে গেলেন।  তিনি  কথা  বললেই  বোঝা যায়, তাঁর  হাঁপের  টান  আছে।  আমরা  শঙ্কু মহারাজ, প্রাণেশ চক্রবর্তীর  কথা  জিজ্ঞাসা  করতে,  তিনি  হাত জোড়  করে  নমস্কার  করলেন। এতক্ষণে আসলো প্রধান সমস্যা, তিনি আমাদের মালপত্র দেখতে চাইলেন। মনে মনে ভাবছি আমাদের যা লাগেজ, তাতে তিনটে কুলি নিশ্চই লাগবে। তিনি চটপট্ ব্যাগগুলো তুলে নিয়ে জানালেন, মাল যা আছে, তাতে দু’টো কুলি লাগবেই। তিনি খুব চিন্তার সঙ্গে কথাগুলো বললেও, আমরা দু’জনেই মনে  মনে  খুব  খুশি  হলাম।  শেষে   তিনি  বললেন,  কাল  সকালে  আমাদের  নিয়ে  রওনা  হবেন।  আমরা যেন  ভোরবেলা  তৈরি  হয়ে  থাকি।

তিনি  চলে  গেলেন,  আমরা  ব্যাঙ্ক  থেকে  চেক  ভাঙ্গিয়ে,  আর  একবার  জিলিপি  আর  চা  খেয়ে  নিলাম। আজ ভালো করে স্নান করতে হবে। এরপর আবার কবে স্নান করার সুযোগ পাবো জানি না। হোটেলের ড্রামে জল ধরা আছে। কিন্তু ঐ জলে স্নান করার ইচ্ছা নেই, তাই ঝরনার খোঁজে গামছা গায়ে রাস্তায় এলাম। একটা দোকানে খোঁজ করে জানতে পারলাম, মাইল খানেক দুরে স্নান করার জন্য ভালো জল পাওয়া যাবে। জলের সন্ধানে আমরা রওনা হবো, এমন সময় বীর সিং এর সাথে আবার দেখা হলো। তিনি বললেন— “এক কাজ করা যাক, আজই আমরা দেবলে চলে যাই। আমার সাথে খচ্চর আছে। কাল ভোরে ওখান থেকে কুলি-গাইড নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিকালে ‘ওয়ান’ চলে যাওয়া যাবে”। তাঁর কাছেই এবার জানলাম, গাইড হিসাবে আমাদের সাথে তাঁর ছেলে গঙ্গা সিং যাবে। আবার সেই গঙ্গা? সে কেমন ব্যবহার করবে কে জানে। বীর সিং জানালেন, তাঁর ছেলে বেশ জোয়ান আছে। সঙ্গে দু’জন জোয়ান ভাল কুলি দিয়ে দেবেন। কিছু বলার নেই।

আমরা বললাম আমরা স্নান সেরে এসে খাওয়া দাওয়া করে, তৈরি হয়ে নিচ্ছি। তিনি আমাদের একটু তাড়াতাড়ি করতে বলে চলে গেলেন। আমরাও আমাদের গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বেশ কিছুটা পথ হেঁটে জায়গাটা পাওয়া গেল। রাস্তা থেকে অনেকটা নেমে পরপর দুটো বাড়ির পাশ দিয়ে গিয়ে একটা জায়গায় দেখলাম, মাটি থেকে সামান্য উঁচুতে একটা পাইপ থেকে জল পড়ছে। পাইপটা দ্বিতীয় বাড়িটার পাশের দিকে। পাইপটা এত কম উচ্চতায় অবস্থিত, যে একটা মগ্ না পেলে, স্নান করা যাবে না। আমি ঐ দুটো বাড়ি থেকে একটা মগ্ চাইতে গেলাম। বাড়ি না বলে পরপর দুটো ঘর বলা-ই বোধহয় ঠিক হবে। প্রথম ঘরটা, মানে কলের পাইপের কাছেই যে ঘরটা, সেখানে মগ্ পাওয়া গেল না। দ্বিতীয়টা অন্য লোকের। সেটার সামনে গিয়ে দেখি, ঘরের গৃহিণী রান্নায় ব্যস্ত। সামনে খুব ছোট দুটো বাচ্চা খেলা করছে। মহিলাটি আমায় দেখে একটু অবাক হলো। আমি স্নানের জন্য একটা মগ্ চাইলাম। বাচ্চাদুটো তাদের বাবাকে ডাকলো। সঙ্গে সঙ্গে এক ভদ্রলোক বেড়িয়ে এসে, আমি কোথা থেকে আসছি, কোথায় উঠেছি, কোথায় যাব, এখানে কী প্রয়োজন, ইত্যাদি প্রশ্ন করে, শেষে একটা টিনের কৌটো দিলেন। আমি আবার প্রথম ঘরটার পাশ দিয়ে, ধান বা গমের জমির মধ্যে দিয়ে, জলের পাইপের কাছে নেমে এলাম। দু’জনে পরপর স্নান সেরে, জামা প্যান্ট পরে, উপরে উঠে এলাম। প্রথম ঘরটার কাছে বাচ্চা দুটো ও একটা বিরাট আকারের কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম ঘরের বাসিন্দারাও পাশেই আছে। শীতাংশু আমার আগে আগে যাচ্ছে। আমি একটা বাচ্চার গালে হাত দিয়ে আদর করতেই, কুকুরটা তেড়ে এসে প্রায় আমার গায়ে উঠে পড়লো। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। ওটার যা গতর, কামড়ালে পাঁচ চোদ্দং সত্তরটা ইঞ্জেকশনের কমে কিছু হবে বলে মনে হয় না।  কুকুরটা  কিন্তু  কিছু  করলো  না।  শীতাংশু  এগিয়ে  গেল। আমি  যেই  এগতে  গেলাম,  অমনি  সেটা  আবার  আগের মতো তেড়ে এল। এরপর দেখি আমি দাঁড়িয়ে থাকলে ওটা কিছু করে না, কিন্তু একটু নড়লেই, বা একটু এগবার চেষ্টা করলেই, তেড়ে আসে। প্রথম ঘরের বাসিন্দারা কিন্তু এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। বাধ্য হয়ে আমি ওদের কুকুরটাকে ধরতে বললাম। ওরা একটা কাঠি দিয়ে কুকুরটাকে তাড়িয়ে দিয়ে বললো, বাচ্চার গালে হাত দেওয়ার জন্য ওটা ওরকম করছে। আমরা দ্বিতীয় ঘরে মগটা ফেরৎ দিয়ে, রাস্তায় উঠে এলাম এবং একবারে খাওয়া দাওয়া সেরে নিজেদের ঘরে এলাম। শীতাংশু গেল বীর সিং এর সাথে দেখা করে চাল, ডাল, আটা, ইত্যাদি কিনতে। আমরা হোটেলের চার বেডের একটা ঘর নিয়ে আছি। কথা ছিল ষোল টাকা ভাড়া দিতে হবে। কিন্তু চারটে বেডের দুটো বেডে, ছাদ থেকে জল পড়ায়, আমি হোটেল মালিককে ডেকে পাঠালাম। কিছুক্ষণ পরে তার ছেলে আসলে তাকে বেডের অবস্থা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, চারজন লোকের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, আর দু’জন লোক থাকলে তারা কোথায় শুতো? ছেলেটা বিছানার অবস্থা দেখে, আমাকে বার টাকা ভাড়া দিতে বললো। যাহোক্ ভাড়া মিটিয়ে, সমস্ত মাল একজায়গায় গুছিয়ে রেখে, রাস্তায় এলাম। ওদের অনেক খোঁজার পরে, দেখলাম শীতাংশু ও বীর সিং একটা দোকানে চাল, ডাল, আটা, ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনছেন। বীর সিং নিজেও একটা বড় বস্তায় ময়দা, একটা বড় দেশলাই এর প্যাকেট ইত্যাদি কিনছেন। বোধহয় দেবলে তাঁর দোকান আছে। বীর সিং এর এ অঞ্চলে দেখলাম খুব সম্মান। প্রায় সকলেই তাঁকে হাত তুলে নমস্কার করছে। তাঁর কথামতো একটু ওপরে একটা দোকান থেকে হলুদ ও লঙ্কা গুঁড়ো কিনে নিলাম। নীচে এসে দেখি দুটো খচ্চর দাঁড়িয়ে আছে। বীর সিং ও অপর দু’জন তাতে আমাদের ও ওদের মালপত্র বেঁধে ঠিক করে রাখছেন। একটা দোকান থেকে একটা মোমবাতি কিনে নিলাম। সঙ্গে অবশ্য আরও দুটো আছে। খচ্চর নিয়ে গিয়ে হোটেল থেকে সব মালপত্র গুছিয়ে বাঁধা হলো।

এখন বেলা একটা বেজে পাঁচ মিনিট। আমাদের রূপকুন্ড নামক “মরণ হ্রদ” এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো। বীর সিং বললেন সোজা রাস্তা নেমে গেছে, আমরা প্রেমসে এগিয়ে যেতে পারি। আমরা এগিয়ে গেলাম। রাস্তা ক্রমশঃ নীচের দিকে নামছে। আমরা খুব দ্রুত গতিতে নীচে নামতে শুরু করলাম। সুন্দর পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে আমরা চলেছি, কোন কষ্ট নেই, কোন পরিশ্রম নেই। অনেকটা পথ নেমে এসে দেখলাম একটা ছোট ঘর। ঘরটা ঠিক একটা ঝরনার জলের ওপর। এই ঘরগুলো আমার চেনা। এই ঘরগুলোর মধ্যে দিয়ে প্রচন্ড স্রোতের জলে পাথরের চাকা ঘুরিয়ে গম ভাঙ্গানো হয়। সামনে একটা ছোট নদী পার হতে হবে। জলের স্রোত খুব, তবে জলের গভীরতা নেই। একটা ছেলে প্যান্টটা অনেকটা গুটিয়ে, চটি হাতে করে নদী পার হয়ে গেল।  আমাদের হান্টার শূ খোলার ইচ্ছা ছিল না। বাঁ পাশে প্রায় দেড়তলা বা দোতলা বাড়ির মতো উচু দিয়ে একটা বড় কাঠের স্লীপার পেতে ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। হয়তো পনের-ষোল ইঞ্চি চওড়া কাঠের ব্রিজ। কোন কিছু ধরার ব্যবস্থা নেই। স্রেফ্ ব্যালেন্স রেখে স্লীপারটার ওপর দিয়ে হেঁটে কুড়ি-পঁচিশ ফুট মতো পার হয়ে যেতে হবে। নীচ দিয়ে বেশ স্রোতে নদী বয়ে যাচ্ছে। পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে জলের রঙ দুধের মতো সাদা। আসলে ব্রিজ পার হতে আমাদের মতো লোকেদের ব্যালেন্স, সাহস, ও মনের জোরের খুব প্রয়োজন। স্থানীয় লোকেদের কাছে ওটা, আর পাঁচটা রাস্তার মতোই ব্যাপার। আমরা প্রথমে ছেলেটার মতো নদীটা পার হবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু দেখলাম জুতো না ভিজিয়ে পার হওয়া অসম্ভব। বাধ্য হয়ে প্রথমে শীতাংশু, তারপরে আমি খুব সাবধানে স্লীপারটার ওপর দিয়ে নদী পার হয়ে এলাম। আবার নীচে রাস্তায় নেমে এসে স্লীপারটার নীচের অংশটা দেখতে পেয়ে ভয় পেয়ে গেলাম। ওটার প্রায় মাঝ বরাবর, কাঠ মুচকে ভাঙ্গবার চেষ্টা করলে যেমন ভাবে ফেটে যায়, অনেকটা সেইরকম ফাটা। হয়তো ঘুণ ধরে থাকতে পারে। হয়তো এই ব্রিজটা এখন কেউ ব্যবহার করে না। প্রথমে ভেবেছিলাম এটাই বোধহয় কোয়েলগঙ্গা নদী। পরে মনে হলো এটা কোয়েলগঙ্গা নদী নয়, কারণ কোয়েলগঙ্গা আরও দুর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। রাস্তা সেই একই রকম, কোন বৈচিত্র্য নেই, নেই কোন আলাদা বৈশিষ্ট্য। সৌন্দর্যও সেরকম কিছু উল্লেখ করার মতো নয়। আরও বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে আসার পরে একটা ঝুলন্ত ব্রিজ পার হতে হলো। এটার নীচ দিয়ে কিন্তু কোয়েলগঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। নদীর দু’পাশে পাথর ও সিমেন্টের, ঘরের মতো দেওয়াল। দুই দেওয়ালের মাঝখানে, নদীর ওপর এই তারের ঝুলন্ত ব্রিজ। অবশ্য ব্রিজে হাঁটতে হবে কাঠের তক্তার ওপর দিয়ে। নদীর ওপারের দেওয়ালে খোদাই করে লেখা আছে- নদীর ব্রিজের জন্ম বৎসর। আঠার’শ কত সালে যেন ইংরেজরা এটা তৈরি করে। এর পরেই রাস্তা বেশ ভাঙ্গাচোরা, যেন কিছুক্ষণ আগেই ধ্বস নেমেছিল। আমরা ভয় পেলাম, এই রাস্তার ওপর দিয়ে অত মাল নিয়ে খচ্চরগুলো যাবে কী ভাবে? আরও বেশ কিছুটা পথ হেঁটে একটা চায়ের দোকান পাওয়া গেল।

আমরা দোকানে ঢুকে চায়ের অর্ডার দিলাম। চা খেতে খেতে দোকানের লোকজনের সাথে কথা বলছিলাম। একজন লোক জিজ্ঞাসা করলো আমাদের গাইড কে? আমরা জানালাম আমাদের গাইড বীর সিং, অবশ্য আমাদের সাথে যাবে তার ছেলে গঙ্গা সিং। আমি একটা কাঠের বেঞ্চে শুয়ে ছিলাম। ওদের মধ্যে একজন জিজ্ঞাসা করলো, আমার শরীর খারাপ কী না। আমি জানালাম আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। সে এবার জিজ্ঞাসা করলো কলকাতা থেকে এখানে আসতে কত খরচ পরে। আমি প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলাম। সে আবার জিজ্ঞাসা করলো আমাদের সাথে কুলি কে যাবে। বললাম বীর সিং দু’জন কুলির কথা আমাদের বলেছেন, তবে তাদের নাম জানি না। এতক্ষণে লোকটা জানালো যে, সে বীর সিং এর ছেলে। আমি তার নাম জিজ্ঞাসা করলে, সে জানালো সে গঙ্গা সিং।

বেশি বয়স নয়। স্বাস্থ্যও বেশ ভালো। তবে তার চোখ মুখ দেখে মনে হয় না, সে এখানকার লোকজনের মতো সহজ সরল। গঙ্গা আমাদের সাথে রাস্তায় নেমে এল। সে জানালো এই জায়গাটার নাম “নন্দীকেশী”। আর খানিকটা এগিয়েই “দেবল”।  আমরা বললাম দেবল যদি এত কাছেই হয়, তাহলে আজই তো আমরা “বগরীগড়” চলে যেতে পারি। এখন সবে বিকাল তিনটে পনের বাজে। গঙ্গা জানালো দেবলের পরে আর খচ্চর যাবে না। কাজেই এখন দেবল গিয়ে কুলির ব্যবস্থা করে তবে বগরীগড় যেতে হবে। আজ আর যাওয়া  ঠিক হবে না। আমরা কথা বলতে বলতে আরও অনেকটা পথ পার হয়ে এলাম। গঙ্গা রাস্তার বাঁ পাশে একটু উচুতে, বীর সিং এর বাড়ি দেখালো। বীর সিং এর নাম লেখা আছে। বাড়ির সামনে বিভিন্ন রঙের বড় বড় ডালিয়া ফুটে আছে। এ জায়গাটার নাম “পূর্ণা”। আর সামান্য পথ পার হয়ে আমরা “দেবল” শহরে এলাম। রাস্তা থেকেই গঙ্গা বহু নীচে, কোয়েলগঙ্গা ও পিন্ডার নদীর সঙ্গম স্থল দেখালো। আমরা একটা চায়ের দোকানে বসলাম, চা খেলাম। গঙ্গা জানালো এখানে টুরিষ্ট বাংলোর থেকে সামনের একটা হোটেলে থাকা সুবিধা। ঘর ভাড়াও বেশি নয়, তাছাড়া ওখানেই ভালো খাবার পাওয়া যাবে। আমরা হোটেলটায় গেলাম। নাম “পর্যটক হোটেল”। মালিকের নাম লেখা আছে- ত্রিলোক সিং বিষ্ট্। রাস্তা থেকে একটু নেমে বাঁ দিকে বেশ বড় হোটেল কাম চায়ের দোকান। মাঝখানে একটা ঘরে চাল, গম, খোলা বস্তায় রাখা আছে। বোধহয় এটা মুদিখানা দোকান। ডানপাশে একটা ঘরের মধ্যে ঢুকে, বাঁ পাশে আবার একটা ঘর। প্রথম ঘরটায় তিনটে খাটিয়া পাতা, ভাড়া দেওয়া হয়। খাটিয়া গুলোর পাশে, দ্বিতীয় ঘরের দরজার কাছে, সম্ভবত চালের বা গমের অনেকগুলো বস্তা পর পর সাজানো। শুনলাম দেবলের রেশনের মাল এখানে রাখা হয়। বাড়িটা দোতলা করা হচ্ছে, তাই এই ঘরটায় কাঠের কাজ হচ্ছে। ছোট ছোট কাঠের টুকরো, কাঠের গুঁড়ো আর জঞ্জালে, ঘরের একটা দিক ভর্তি। আমরা দ্বিতীয় ঘরটার তালা খুলে ভিতরে ঢুকলাম। এঘরে আবার পাঁচটা খাটিয়া পাতা। একটা ছোট জানালা। খাটিয়া গুলোয় একটা করে পাতলা তোষক পাতা আছে। এক একটা খাটিয়ার ভাড়া তিন টাকা। অবশ্য বিছানা বা কম্বল নিলে আলাদা টাকা লাগবে। আমাদের সঙ্গে স্লীপিং ব্যাগ আছে। ঠান্ডাও এখানে খুব কম। কাজেই কম্বলের প্রয়োজন আমাদের হবে না। ঘরটা পুরো দখল করতে হলে, পনের টাকা ভাড়া লাগবে। আমরা দেখলাম বিকেল হয়ে গেছে, কাজেই নতুন কোন খদ্দের আসার কোন সম্ভাবনা নেই। কাজেই আমরা দুটো খাটিয়া ভাড়া নিলাম। কাঁধের ঝোলা ব্যাগ ঘরে রেখে, ক্যামেরা দুটো সঙ্গে নিয়ে, নদীর সঙ্গমস্থলে যাব বলে বাইরে এলাম। এই হোটেলের খাবার জায়গা থেকে নীচে সঙ্গমস্থলটা পরিস্কার দেখা যায়। হোটেল মালিককে বললাম ঘরটায় তালা দিয়ে দিতে। তিনি বললেন আমাদের সঙ্গে তালা থাকলে, আমরা নিজেদের তালা লাগিয়ে দিতে পারি। তাই করলাম, এবং এটাও বুঝে গেলাম যে, মাত্র ছ’টাকায় পুরো ঘরটাই আমাদের দখলে এল। এখন জানলাম এই ভদ্রলোকের নাম ত্রিলোক সিং বিষ্ট্ নয়। ত্রিলোক এর ছেলের নাম। এঁর নাম ওমরাহো সিং বিষ্ট্। এই ভদ্রলোক মিলিটারিতে কাজ করতেন। এখন রিটায়ার করে ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন। গঙ্গাকে বললাম আমাদের নদী দুটোর সঙ্গমস্থলে নিয়ে যেতে। ও রাজি হলো। ওর সাথে হোটেলের পিছন দিয়ে ঢালু রাস্তায় অনেকটা নেমে, একটা ছোট মন্দিরের কাছে এসে দাঁড়ালাম। মন্দির থেকে একটু নীচে নামলেই, নদীর সঙ্গমস্থল। গঙ্গা চলে গেল। আমরা সঙ্গম স্থলের একটা ছবি নিয়ে, নীচে নামলাম। সঙ্গম স্থলের পারটা ছোট একটা মাঠের মতো। সবুজ ঘাসে ঢাকা পরিস্কার জায়গা। ওখানে কিছুক্ষণ বসে ওর সৌন্দর্য উপভোগ করে, একটু এদিক ওদিক ঘুরে দেখলাম। বাঁদিক থেকে যে নদীটা আসছে, সেটা “কোয়েলগঙ্গা”। ওটা আসছে কৈলুবিনায়ক থেকে। আসার আগে বই এ পড়েছি কৈলুবিনায়কে একটা গনেশ মূর্তি আছে, সেটাকে তুলে তিনবার প্রদক্ষিণ করতে না পারলে, রূপকুন্ড যাত্রা শুভ হয় না, রূপকুন্ড সফর সফল হয় না। সামনের দিক থেকে যে নদীটা আসছে, তার নাম “পিন্ডার”। পিন্ডারী গ্লেসিয়ারে ওর জন্ম। জায়গাটায় এসে মনে বেশ পুলক জেগে উঠলো। সবুজ মাঠে শুয়ে শুয়ে অনেকগুলো রবীন্দ্র সংগীতের, আধখানা, সিকিখানা করে গলা ছেড়ে গান গাইলাম। মনটা খুব খুশি খুশি। সব ব্যবস্থা পাকা, এখন শুধু আগামীকালের অপেক্ষা। তারপরই শুরু হবে বহু আকাঙ্খিত সেই রূপকুন্ড যাত্রা। শীতাংশু কিছুটা দুরে বসে আছে। ও বললো মালপত্র এসে গেলে ঘরে তুলতে হবে। আমরা আর শুয়ে বসে না থেকে, ঘরে ফেরার পথ ধরলাম। ওপরের মন্দিরটার পর থেকেই রাস্তার দু’পাশে অনেক দোকানপাট। এমন কী মাংসের দোকান পর্যন্ত দেখলাম। হোটেলে ফিরে এসে দেখি মালপত্র এসে গেছে। আমরা ঘরের তালা খুলে, মালপত্র ঘরে তুলে রাখলাম। বেলা অনেক হয়েছে তবু সূর্যের আলো এতটুকু কমেনি। বীর সিং এসে উপস্থিত হলেন। তাঁকে নিয়ে ঘরে বসলাম। তিনি জানালেন দু’জন জোয়ান কুলি তিনি ঠিক করেছেন। সঙ্গে তাঁর ছেলে গঙ্গা তো গাইড হিসাবে যাবেই।

কোয়েলগঙ্গা ও পিন্ডার নদীর সঙ্গম স্থল, দেবল।

আমি কুলি ও গাইডের ভাড়ার কথা জিজ্ঞাসা করাতে, তিনি বললেন দেবল থেকে দেবল, অর্থাৎ দেবল থেকে রূপকুন্ড হয়ে দেবলে ফিরে আসা পর্যন্ত পথকে, দশটা স্টেজে ভাগ করা হয়। অবশ্য আমরা ইচ্ছা করলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসার জন্য এক একদিনে দু’টো করে স্টেজ হাঁটতে পারি। তবে সেক্ষেত্রেও ঐ দশটা স্টেজের ভাড়াই দিতে হবে। প্রতি কুলির এক একটা স্টেজের ভাড়া পনের টাকা। অর্থাৎ এক একটা কুলিকে এক’শ পঞ্চাশ টাকা করে দিতে হবে। তবে ওরা নিজেদের রেশন নিয়ে যাবে, কাজেই ওদের খাবার দিতে হবে না। শুধু চা, পান, বিড়ি, সিগারেট, দেশলাই দিতে হবে। গাইডকেও দশটা স্টেজের ভাড়া দিতে হবে। তিনি জানালেন, তিনি নিজে প্রতি স্টেজের জন্য পঁচিশ টাকা করে নেন। আমি বললাম বীর সিংকে তামাম্ হিন্দুস্থান চেনে। বীর সিং আর গঙ্গা সিং এর পারিশ্রমিক নিশ্চই এক নয়? উত্তরে তিনি বললেন, আমরা যেন গঙ্গার সাথে কথা বলে ওটা ঠিক করে নি। বীর সিং আবার বললেন গঙ্গাকে চা, পান ইত্যাদির সাথে খাবারও দিতে হবে। এ তো মহা বিপদ। কেউ খাবে, কেউ খাবেনা, হিসাব রাখবোই বা কিভাবে, রান্নাই বা কিভাবে হবে? এবার তিনি বললেন ওদের কিছু টাকা অগ্রিম দিয়ে দিতে। আমরা কত টাকা করে দেব জিজ্ঞাসা করায়, তিনি এক’শ টাকা চাইলেন। এর মধ্যে পঁচিশ টাকা তিনি খচ্চর ভাড়া বাবদ দেবেন। বাকি টাকা ওদের তিনজনকে ভাগ করে দেবেন। আমি বললাম কাকে কত টাকা অগ্রিম দেওয়া হলো, আমাদের জানা প্রয়োজন। কারণ পরে টাকা দিতে অসুবিধা হতে পারে। বীর সিং কী ভাবলেন কে জানে। কিছুক্ষণ পরে তিনি দু’জন কুলিকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন।

একজন বেশ ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী, নাম রাম কুমার। অপর জনের বয়স কিছু কম। বেশ রোগা চেহারা, নাম হরিশ সিং। বীর সিং জানালেন, টাকা ভাঙ্গানো না থাকায়, খচ্চর ভাড়া বাবদ তিনি কুড়ি টাকা দিয়েছেন। দু’জন কুলিকে কুড়ি টাকা করে চল্লিশ টাকা অগ্রিম দিয়ে, বাকি চল্লিশ টাকা তিনি গঙ্গাকে দিয়েছেন। ঠিক হলো আগামীকাল সকাল সাতটায় যাত্রা শুরু হবে। আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর তিনি জানালেন, কাল আর দেখা হবে না। কারণ আগামীকাল তাঁর আলমোড়ায় কোর্টে একটা কেস্ আছে। সেখানে তাঁকে যেতেই হবে। কেসটা না থাকলে তিনি নিজেই আমাদের সাথে গাইড হয়ে যেতেন। রূপকুন্ড থেকে ফিরবার সময় তাঁর সাথে নিশ্চই দেখা হবে। তিনি আমাদের যাত্রার শুভ কামনা করে, নমস্কার করে চলে গেলেন। এখানে বাথরুম, পায়খানার কোন ব্যবস্থা নেই। ওমরাহো সিং এর কথা মতো রাস্তা ধরে খানিকটা গিয়ে, ডান পাশের সরু পায়ে হাঁটা পথ ধরে, অনেকটা নীচে নেমে কোয়েলগঙ্গার ধারে এলাম। কাজ মিটলে হোটেলে ফিরে এসে চা খেলাম। একটু রাত হলে গঙ্গা, কুমার ও হরিশকে নিয়ে দেখা করে গেল। আজই আমাদের এ পথের শেষ ভালো খাওয়া। ফিরে না আসা পর্যন্ত কী খাবার জুটবে কে জানে। তাই মাংস, রুটি খেয়ে, আমরা দু’জনে ঘরে ফিরে এলাম। এখানে ইলেকট্রিক লাইট নেই। ছোট একটা কুপি না কী যেন বলে, তার আলোয় দেখলাম আমাদের কিট্ ব্যাগের ঝুলিয়ে নিয়ে যাবার ফিতেটার এক দিকের ক্লিপ, যেটা হাতলটাকে ব্যাগের সঙ্গে আটকে রাখে, বেঁকে গিয়ে প্রায় খুলে গেছে। ভাগ্য ভালো যে রাস্তায় ওটা একবারে খুলে পড়ে যায় নি। ওটার মধ্যে একটা রামের বোতল আছে। পড়লে খুব ঝামেলার ব্যাপার হতো। যাহোক্, তালা দিয়ে পিটিয়ে ওটাকে মোটামুটি ঠিক করা হলো। এরপর আরও কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।

আজ আঠারই আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো খুব ভোরে। আজই আমাদের আসল যাত্রা শুরু হবার দিন। চা খেয়ে গতকালের মতো রাস্তা ধরে কোয়েলগঙ্গার ধারে চলে গেলাম। খানিক পরে ফিরে এসে দেখি গঙ্গা, কুমার ও হরিশ এসে হাজির। ওরা মালপত্র বার করে, দড়ি দিয়ে সুন্দর রুকস্যাকের মতো বেঁধে, পিঠে তুলে নিল। আমরাও ঝোলা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে প্রস্তুত। শুরু হলো “মরণ হ্রদ” অভিযান।

খুব ধীরে পথ চলছি। আজ আমাদের “ওয়ান” যাবার কথা। কোয়েলগঙ্গাকে ডানপাশে বহু নীচে রেখে আমরা এগিয়ে চলেছি। সুন্দর চওড়া রাস্তা, তাই কুলি দু’টো অনেক পিছিয়ে পড়লেও আমরা না থেমে, ওদের জন্য অপেক্ষা না করে পথ চলছি। রাস্তার সৌন্দর্যে কোন নতুনত্ব নেই। গঙ্গা দেখি খানিক বাদে বাদেই আমাদের বিশ্রাম নিতে বলছে। এটুকু পথ হাঁটতে যা পরিশ্রম হয়েছে, তাতে বিশ্রাম নেবার প্রয়োজন হয় না। ওর কী মতলব বুঝছি না। ও কী আমাদের একবারে নতুন ভেবেছে, নাকি ওর আজ ওয়ান পর্যন্ত যাবার ইচ্ছা নেই।  দশটা স্টেজকে ও বার তেরটা স্টেজ করতে চাইছে না তো?

“হলগাঁও” নামে একটা গ্রামে এসে উপস্থিত হলাম। বাঁহাতে রাস্তার একটু ওপরে একটা চায়ের দোকান। ওখানে গেলাম এক রাউন্ড চা খেতে। দোকানের সামনে একরকম গাছ, অনেক হয়ে আছে। আগে কোথাও কে যেন ওগুলো সিদ্ধি গাছ বলেছিল। আমি শীতাংশুকে জিজ্ঞাসা করলাম “বল দেখি ওগুলো কী গাছ”? শীতাংশু চেনে না। কিন্তু দোকানদার আমাকে বোধহয় পাকা সিদ্ধিখোর ভেবে বসলো। সে খুব আগ্রহ নিয়ে বললো “তৈরি করে দেব”? ওরা নিজেদের মধ্যে একটু হাসাহাসিও করলো। আমরা চায়ের দাম মিটিয়ে রাস্তায় নামলাম। রাস্তা খুব আস্তে আস্তে ওপরে উঠছে, কাজেই হাঁটতে কোন কষ্ট হচ্ছে না। আমরা কুলিদের থেকে বোধহয় অনেক এগিয়ে গেছি। গঙ্গা কখনও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে, এবং আমাদের বিশ্রাম নিতে বলছে। আবার কখনও আমাদের বিশ্রাম নিতে আগ্রহ নেই দেখে পিছিয়ে পড়ছে। এক সময় রাস্তার ধারে একটা জায়গায় গঙ্গার কথামতো বসলাম। বাদাম ভাজা, লজেন্স্ খেলাম। কিছুক্ষণ বাদে ওরা এসে উপস্থিত হলে, ওদেরও দিলাম।

কিছুক্ষণ বসে এবার আবার হাঁটা শুরু করলাম। সামান্য একটু পথ গেছি, ডানপাশে একটা চায়ের দোকান। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গা বললো একটু চা খেয়ে নেওয়া যাক। এ পথে এত চা কে খায় জানি না। শীতাংশু ওদের এত ঘনঘন বিশ্রাম নেওয়াতে বিরক্ত হচ্ছে। আমি কোন কথা বললাম না। প্রথম থেকে বিরক্ত ভাব দেখিয়ে অশান্তি করে লাভও নেই। ঠিক করলাম এবার আমরা অনেক এগিয়ে যাব, এবং কোথাও বসবো না। তাহলে ওদের এই মতলব বিশেষ কাজ করবে না। এই জায়গাটা নাম “পিলখোরা”। আগে রাস্তার ধারে যে জায়গাটায় বসেছিলাম, সে জায়গাটার নাম “কান্ডে”। ওখানে শীতাংশুর ক্যামেরার ফিল্ম্ ছিঁড়ে গেছিল। এখন এখানে চায়ের দোকানটার ঠিক পাশে, একটা ছোট্ট অন্ধকার মতো ঘরে ঢুকে আমি ক্যামেরাটার ফিল্ম্ খুলে নতুন করে লাগাবার চেষ্টা করলাম। ঘরটার ভিতরে ঢুকে বুঝলাম, এটাও একটা দোকান ঘর। তবে ঘরটা বেশ অন্ধকার। কিন্তু ক্যামেরা নিয়ে অন্ধকার ঘরে আমি কী করছি দেখবার জন্য বেশ কয়েকজন দরজা খুলে ঘরের ভিতর ঢুকতে গিয়ে, ঘরটায় বেশ আলো ঢুকিয়ে দিল।

             কান্ডে            

এই দোকান থেকে কুলি গাইডের জন্য বেশ কিছু সিগারেট কিনে, দাম মিটিয়ে, আবার পথে নামলাম। রাস্তার সৌন্দর্য ক্রমে বাড়ছে। গাইড আমাদের সাথে নেই, রাস্তাও চিনে যেতে না পারার মতো নয়। এবার একটা ব্রিজ পার হতে হলো। ব্রিজটার একটু ওপর দিয়ে একটা নতুন এবং অনেক চওড়া ব্রিজ তৈরি হচ্ছে। ব্রিজটা পার হয়ে দেখি, রাস্তা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এবার আমরা একটু চিন্তায় পড়লাম। শেষ পর্যন্ত বাঁ হাতের রাস্তাটাই আমাদের যাবার পথ বলে মনে হলো। কাউকে জিজ্ঞাসা করার মতো সুযোগও নেই। হঠাৎ রাস্তার ওপর দিকের চুড়া থেকে ছোট বড় কয়েকটা পাথর রাস্তায় নেমে এল। শীতাংশু আমার থেকে কিছু আগে আগে যাচ্ছিল। ও আমাকে পাথর পড়া জায়গাটা সম্বন্ধে সাবধান করে, আবার এগিয়ে চললো।

পিলখোরার পর “লোহানি” নামে একটা জায়গায়, গঙ্গার সাথে আমাদের শেষ দেখা হয়। ওখানে অনেক নীচু দিয়ে, রূপালী শাড়ী পরে, পাথুরে এলাকার ওপর দিয়ে নেচে নেচে কোয়েলগঙ্গার যাওয়ার দৃশ্য ভুলবার নয়। যাহোক্, লোহানির পরে ওদের সঙ্গে আর দেখা হয় নি। ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি কী না, সেটাও তো জানা প্রয়োজন। বাধ্য হয়ে রাস্তার ধারে বসে বাদাম ও টুকিটাকি খাবার খেলাম। অনেকক্ষণ বসার পরেও, ওদের টিকি দেখা গেল না। শেষ পর্যন্ত উঠে পড়ে এগতে শুরু করলাম। বেশ কিছুটা পথ পার হবার পরে দেখলাম, দু’টো একবারে বাচ্চা ছেলে, প্রকান্ড দু’টো মোষ নিয়ে আসছে। ওদের মধ্যে যেটা বয়সে একটু বড়, তাকে “মান্দোলী”-র কথা জিজ্ঞাসা করলে সে ওপর দিকে হাত তুলে দেখালো। এই মান্দোলীতেই আমাদের দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা। বাচ্চাটার ইশারা মতো রাস্তা ধরে ওপর দিকে এগিয়ে চললাম। কিন্তু গঙ্গারা না আসলে আমাদের এগিয়েও তো কোন লাভ নেই। ওরা আসবে, খাবার ব্যবস্থা হবে, খাওয়া হবে, তবে আবার পথ চলা। কয়েকটা ছোট ছোট ঘর পেরিয়ে, একটু ওপরে উঠে, একটা পাথরের ওপর দু’জনে বসে, বহু নীচে ওরা আসছে কিনা লক্ষ্য করতে লাগলাম। কোথাও ওদের কোন চিহ্ন দেখলাম না। ওদের এরকম ব্যবহারে বিরক্ত লাগছে। হঠাৎ গঙ্গা এসে হাজির। অর্থাৎ ও আমাদের প্রায় পিছনেই ছিল। তাহলে ওকে রাস্তার অত নীচু পর্যন্ত লক্ষ্য করেও দেখতে না পাওয়ার কারণ কী বুঝলাম না। ওর কথায় বুঝলাম, যেখানে রাস্তা দু’ভাগে ভাগ হয়েছিল, আমরা বাঁদিকের রাস্তা ধরে এসেছিলাম, সেখান থেকে ও ডানদিকের পথ ধরে এসেছে। গঙ্গা জানালো দুরের ঐ ঘরগুলো যে জায়গাটায় রয়েছে, ওই জায়গাটার নামই “বগরীগড়”। এখান থেকে মান্দোলী সামান্যই পথ। এবার কুলিদের এত আস্তে হাঁটার জন্য, গঙ্গা নিজেও বিরক্তি প্রকাশ করলো। বুঝলাম না ও সত্যিই বিরক্ত হচ্ছে, না আমাদের দেখাবার জন্য অভিনয় করছে। আমরা উঠে পড়লাম। আস্তে আস্তে খাড়াই পথ পার হয়ে কয়েকটা বাড়িঘরের পাশ দিয়ে, একটা বাড়ির বারান্দায় এলাম। এখানে একটা স্কুল বাড়িতে সবাই রাত কাটায়। আমাদের প্ল্যানও তাই ছিল। কিন্তু আজই আমরা ওয়ান চলে যাব। ওয়ান এ পথের শেষ গ্রাম।

বাড়িটার বারান্দায় একটা দোকান মতো। গঙ্গা একটা পলিথিন সিট্ পেতে দিল। আমরা শুয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগলাম। এই জায়গাটাই মান্দোলী। এখানেই আমরা দুপুরের খাবার খাব। গঙ্গা দোকানদারকে খাবারের ব্যবস্থা করতে বললো। দোকানদার আমাদের চা করে খাওয়ালো। গঙ্গার দেখলাম এখানে বিরাট পরিচিতি। রাস্তাতেও দেখেছি ওকে সবাই চেনে। আসলে বীর সিং এর পরিচয়েই ওর পরিচিতি। দোকানের উল্টোদিকে পরপর দুটো ছোট ঘর। ঐ ঘর থেকে একজন বৃদ্ধা বেরিয়ে এসে গঙ্গাকে বললো একজনের মতো খাবার তৈরি আছে। আমরা গঙ্গাকে খেয়ে নিতে বললাম। ও প্রথমে যেতে চাইলো না। কিন্তু আমরা আাবার ওকে প্রথমে খেয়ে নিতে বলাতে, সে একটা ঘরের ভিতর চলে গেল। আসলে গঙ্গা এদের পরিচিত, তাই গঙ্গাকে এরা একটু ভালমন্দ, অর্থাৎ ভাত-ডালের সাথে একটা সবজি খাওয়াতে চায়। কুলিরা এখনও এসে পৌঁছয় নি। গঙ্গা একটু পরে ঘর থেকে খেয়েদেয়ে এল। দোকানদার বোধহয় পূর্ণা গ্রামে, অর্থাৎ বীর সিং এর গ্রামে থাকে। কারণ গঙ্গাকে সে পাড়াতুত ভাই বলে পরিচয় দিল। শীতাংশু কাছেপিঠে একটু ঘুরতে গেছে। দোকানদার আমায় জানালো যে গঙ্গা, বীর সিং এর সাথে থাকে না। সে তার বাবা, মা, কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলে না। গঙ্গা বীর সিং এর একমাত্র ছেলে। দোকানদার আরও জানালো যে গঙ্গা, বীর সিং এর অনেক টাকা আজেবাজে ভাবে উড়িয়েছে। সে দারু খায়, জুয়া খেলে। বীর সিং ওর বিয়ের ব্যবস্থা করেছিল, কিন্তু কেউ ভাংচি দেওয়াতে তার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। দোকানদার এসব কথা হঠাৎ এত লোক থাকতে আমায় কেন বলতে বসলো জানি না। কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি এসব কথা আমাকে বলাতে, গঙ্গা বেশ অসন্তুষ্ট হচ্ছে। আমি কী করা উচিৎ ভেবে না পেয়ে গঙ্গাকে বললাম, এটা ভালো কথা নয়। সে বীর সিং এর একমাত্র সন্তান, কাজেই তার বাবা মা’র সাথেই থাকা উচিৎ। দোকানদার আবার শুরু করলো— বীর সিংকে গোটা হিন্দুস্থান চেনে। আর তার ছেলে এরকম বাঁদর তৈরি হয়েছে। এবার আমার অস্বস্তি বোধ করার পালা। আমার সামনে সে গঙ্গাকে বাঁদর বলছে, গঙ্গা বিরক্ত হয়ে আমাদের ভোগাবে না তো? দোকানদার কিন্তু থামবার পাত্র নয়। সে গঙ্গাকে বললো গঙ্গা যেন বাড়ি যায়, বাবা-মাকে রোজ পূজো করে। গঙ্গার বিয়ের ব্যবস্থা তিনিই করে দেবেন।

                         

মান্দোলী                                              কোয়েলগঙ্গা, লোহানী

কুলিরা এসে গেল। আমাদের খাবারও প্রস্তুত। আমি ও শীতাংশু খেতে বসলাম। গ্র্যান্ড খানাপিনার ব্যবস্থা। ভাত আর ডাল। আমাদের খাওয়া হয়ে গেলে কুলিরা খেয়ে নিল। আর কিছুক্ষণ বসে, দাম মিটিয়ে, আমরা রওনা হলাম। কুলি দু’টোর জন্য অনেক বেলা হয়ে গেল। ভাবছি আজ ওয়ান যাওয়া যাবে তো? আগেই শুনেছিলাম “লোহাজঙ্গ” এর চড়াই এ প্রানান্তকর কষ্ট। আমরা এখন সেই লোহাজঙ্গ এই যাচ্ছি। ছোট ছোট গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, চড়াই ভাঙ্গতে শুরু করলাম। হঠাৎ গঙ্গা বললো “বাবুজী এক কাজ কর, আজ লোহাজঙ্গে থেকে যাও। কাল ওখান থেকে বৈদিনী চলে যাব”। আগামীকালই আমাদের “বৈদিনী বুগিয়াল” যাবার কথা। লোহাজঙ্গ এ থাকার কথা গঙ্গা “পিলখোরাতে”ও বলেছিল। আমরা তখন আপত্তি জানিয়েছিলাম। আমরা বললাম আজকে ওয়ান যাওয়াই ঠিক হবে। তাছাড়া আমাদের হাতে ছুটিও খুব কম। শীতাংশু আমাকে বললো ওরা ইচ্ছা করে দেরি করছে। ওরা হয়তো কায়দা করে দশ দিনের বেশি সময় লাগিয়ে দেবে। যাহোক্, আমরা গঙ্গার পিছন পিছন জঙ্গলের রাস্তা ভেঙ্গে, ওপরে উঠতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে জঙ্গল পার হয়ে আমরা চওড়া রাস্তায় এসে উপস্থিত হলাম। এবার আমরা ওদের পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম। উদ্দেশ্য সেই এক। একসাথে গেলেই গঙ্গা আমাদের বারবার বিশ্রাম নিতে বলবে। রাস্তা একভাবে ওপর দিকে এঁকেবেঁকে উঠেছে। কোথাও একটু উতরাই নেই। ফলে মধ্যে মধ্যে আমাদের বিশ্রাম নিতেও হচ্ছে। গঙ্গা কখনও কখনও আমাদের ধরে ফেলছে, আবার পিছিয়ে পড়ছে। মধ্যে মধ্যে আমি ওর জন্য অপেক্ষা করে কিট্ ব্যাগের ফিতের রিংটা পরীক্ষা করে নিচ্ছি। শীতাংশু আমার থেকে অনেকটা এগিয়ে গেছে। আরও বেশ খানিকটা চড়াই ভেঙ্গে দেখি, ও বসে আছে। কাঁধের ঝোলা ব্যাগ নামিয়ে একটা পাথরের ওপর শুয়ে পড়লাম। লোহাজঙ্গ নামটা সার্থক। শরীরজঙ্গ বা দেহজঙ্গ হলে বোধহয় আরও সার্থক হতো। ওখানে পৌঁছতে সারা শরীরে জঙ্গ ধরিয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে পড়লাম। সিঁড়ির মতো এঁকেবেঁকে রাস্তা সোজা ওপরে উঠছে। রাস্তা যেন আর শেষ হয় না। শেষে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ আমরা লোহাজঙ্গে এসে পৌঁছলাম।

লোহাজঙ্গ গেস্ট হাউস।লোহাজঙ্গ।

একপাশে একটা চায়ের দোকান, সামনে বিরাট একটা গাছ, তাতে একটা বড় ঘন্টা বাঁধা আছে। গাছটার একটু পাশে একটা ছোট পাথরের মন্দির। মন্দিরের ভিতরে একটা খুব সুন্দর মুর্তি। মন্দিরটার ঠিক পিছনে একটু উুচুতে একটা পাকা বাড়ি। এটাই লোহজঙ্গ টুরিষ্ট বাংলো। বাংলোকে বাঁপাশে রেখে একটু পথ ওপরে উঠলে, একটা সাদা রঙের মন্দির, আর তার একটু ওপরে অনেকটা জায়গা নিয়ে একটা মাঠের মতো। মাঠটার একদিকে কাঁটা তার দিয়ে ঘেরা। ঘেরা দিকটা খাদের দিক হলেও, তারের থেকে বেশ খানিকটা দুরে খাদ শুরু হয়েছে। কাজেই তারের বেড়াটা কে যে দিয়েছে, এবং কেনই বা দেওয়া হয়েছে বুঝলাম না। ঘন্টা বাঁধা গাছটার নীচে আমি, শীতাংশু ও গঙ্গা, কুলিদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। বাঁদিকে অনেকটা দুরে একটা লাল মতো জায়গা দেখিয়ে গঙ্গা বললো, ওটাই ওয়ান গ্রাম। এখান থেকে দেখে মনে হচ্ছে খানিকটা জায়গা যেন সুরকি দিয়ে ঢাকা। আমরা বললাম ওয়ান তো খুব একটা দুরে নয়, আজই ওখানে চলে যাব। পিছনের দোকান থেকেও একটা লোক আজ আমাদের ওয়ান চলে যাবার পরামর্শ দিল। গঙ্গা বলছিল আজ ওয়ান পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। কুলিদেরও অত মালপত্র নিয়ে ওখানে যেতে অসুবিধা হবে। কিন্তু দোকানের লোকটার কথায় গঙ্গা চুপ করে গেল। সে বললো কুলিরা আসুক, ওদের সাথে কথা বলে দেখা যাক্। শীতাংশু বললো ওয়ান খুব একটা দুরে বলে মনে হয় না। আমি বললাম এখান থেকে সোজা দেখতে পাচ্ছি বলে বোঝা যাচ্ছে না। রাস্তা হয়তো অনেক ঘুরে গেছে, সে ক্ষেত্রে ওখানে পৌঁছাতে অন্ধকার নেমে যেতে পারে। এর মধ্যে কুলি দু’টো এসে উপস্থিত হলো। গঙ্গা ওদের আজই ওয়ান যাবার কথা বললো। ওরা নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ আলোচনা করে জানালো, আজ এত মালপত্র নিয়ে ওয়ান যেতে রাত হয়ে যাবে। কাল সকালে আবার হাঁটা শুরু করাই ভাল। গঙ্গা  বললো “এক কাজ করো। আজ আমরা এখানেই থেকে যাই, কাল সকালে আলি বুগিয়াল হয়ে চলে যাব”। কলকাতা থেকে আসার আগে নন্দদা, অর্থাৎ যার কাছ থেকে আমরা স্লীপিং ব্যাগ নিয়েছিলাম, বলেছিলেন বৈদিনী বুগিয়াল আর ওয়ান এর মধ্যে, রাস্তায় ভীষণ জোঁকের উৎপাত। ঐ রাস্তায় পায়ে বা শরীরের কোথাও জোঁক লাগলে, আমরা যেন শরীর থেকে জোঁক ছাড়াতে না যাই। কারণ জিজ্ঞাসা করাতে নন্দদা বলেছিলেন যতক্ষণে একটা জোঁক পা থেকে ছাড়াবে, ততক্ষণে পাঁচ দশটা জোঁক গায়ে আটকে যাবে। রক্ষাকবচ হিসাবে সঙ্গে নুন নিয়ে এসেছি। আলি বুগিয়াল দিয়ে অন্য পথে গেলে সেই জোঁক দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হব। তাছাড়া ওয়ান গ্রাম দেখা হবে না। গঙ্গাকে মনের কথা  খুলে বললাম “গঙ্গা, বৈদিনীর পথে প্রচুর জোঁক আছে শুনেছিলাম, জোঁক দেখা হবে না? ওয়ান এর মতো একটা সুন্দর গ্রাম দেখা হবে না”? আমার কথা শুনে গঙ্গা হেসে ফেলে বললো, “বাবুজী এ পথে লোক জোঁক থেকে বাঁচতে চায়, আর তোমরা জোঁক দেখতে চাইছো”। আমি ব্যাগ থেকে নুন বার করে দেখিয়ে বললাম “এই দেখ আমরাও বাঁচতে চাই”। ও বললো ঠিক আছে, ফিরবার পথে বৈদিনী বুগিয়াল হয়ে, ওয়ান হয়ে, ব্রহ্মতাল যাব। এবার আমাদের রূপকুন্ড ছাড়া ব্রহ্মতাল, বিগুন তাল, খপলু তাল ও পিন্ডারী গ্লেসিয়ার যাবার কথা।

গঙ্গারই জয় হলো। আমরা ভেবে দেখলাম আগামীকাল যদি আলি বুগিয়াল হয়ে যাওয়া হয়, তাহলেও আমরা সময় মতো যাচ্ছি। কারণ আমাদের রুটচার্ট অনুযায়ী আজ আমাদের বগরীগড় থাকার কথা। গঙ্গাকে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, ফিরবার সময় ওয়ান হয়ে ফিরবে তো? গঙ্গা সম্মতি জানালো। ভাবলাম ভালোই হলো। এখন ওয়ান যেতে গেলে সন্ধ্যার মুখে জোঁকের আক্রমনে পড়তে হতে পারে। তাছাড়া এই ফাঁকে আলি বুগিয়ালটাও দেখা হয়ে যাবে। কাজেই আজ লোহাজঙ্গেই রাত কাটাবো স্থির করে ফেললাম। আমরা পাঁচজন, টুরিষ্ট বাংলোয় গেলাম। কেয়ারটেকার একটা দরজা খুলে দিল। ভিতরটা ঘর বলে মনে হলেও, আসলে চারিদিক ঘেরা বারান্দা। তারের জাল লাগানো জানালা। গঙ্গা বললো “আমরা আজ রাতে এখানে থাকবো, বাবুদের ঠান্ডা লাগবে, ঘর খুলে দাও”। কেয়ারটেকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও, বারান্দার বাঁপাশে প্রকান্ড ঘরটার দরজা খুলে দিল। লাইট নেই। মালপত্র নামিয়ে রেখে বাইরে এলাম। ওপরের মন্দিরটা দেখে, আমরা তারঘেরা মাঠটায় গেলাম। বেশ সুন্দর জায়গা। দুরে ঠিক যেন লাল মোরাম ঢাকা খানিকটা অঞ্চল। ওটাই ওয়ান গ্রাম। হরিশ ও কুমার এসে উপস্থিত হলো। গঙ্গা বাংলোতেই আছে। হরিশ এপথে আগেও অনেকবার এসেছে, তবে কুমারের এই প্রথমবার এপথে আসা। সে নেপালের লোক। এখন থাকে দার্জিলিংএ। ওখানে গাইডের কাজ করতো, কাজেই মাল বওয়ার অভ্যাস না থাকায়, ওর হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে। ওর কিন্তু নতুন জায়গা দেখবার আগ্রহ খুব। সে হরিশকে আলি বুগিয়াল যাবার রাস্তা কোন দিক দিয়ে, ওয়ান যেতে গেলে কোন দিক দিয়ে যেতে হবে, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন শুরু করলো। আরও কিছুক্ষণ মাঠটায় বসে, আমরা বাংলোয় ফিরে এলাম। হরিশ ও কুমার গেল গঙ্গার নির্দেশ মতো কাঠের সন্ধানে। আমাদের ঘরটার বারান্দাটার একদিকে রান্নাঘর। এখানে জলের খুব অভাব। বাংলোর সামনেই একটা বিরাট ট্যাঙ্ক করা আছে। কিন্তু তাতে জল নেই। কোন কালে ছিল কিনা কে জানে? কোন কারণে জল আনা হয়তো সম্ভব হচ্ছে না। বড় গাছটাকে বাঁ হাতে ফেলে, ওয়ান যাবার রাস্তা দিয়ে বেশ খানিকটা পথ গেলে, জল পাওয়া যাবে। পাথরের ওপর দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। একটা গাছের পাতার সাহায্যে, পাইপ দিয়ে জল পড়ার মতো ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওখানেই বনে জঙ্গলে সবাই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যায়। আবার সমস্ত গ্রামটার রান্নার, খাবার, বা ঘরের কাজের জন্যও ঐ জায়গা থেকেই জল বয়ে আনা হয়।

কাঠ এল। হরিশ ও কুমার তাদের খাবার জন্য চাল, ডাল, আটা কিনে নিয়ে এল। কথা ছিল বিকেল বেলা খিচুড়ি রান্না হবে। আর পরের দিনের রাস্তায় খাবার জন্য, রুটি ও তরকারি তৈরি করে রাখা হবে। সবকিছু উপকরণই আমাদের সঙ্গে আছে বা গোয়ালদাম থেকে কিনে আনা হয়েছে। কিন্তু ঐ তরকারিটা করতে যে তেল বা ঘি কিছু একটা লাগবে, এটা চিন্তাও করি নি, কিনে নিয়ে আসাও হয় নি। আর বীর সিং আমাদের রেশন কেনার সময় মনে করিয়েও দেন নি। ফলে গঙ্গা গেল তেলের খোঁজে। কিছুক্ষণ পরে গঙ্গা খালি হাতে ফিরে এল। এখানকার লোকেরা বোধহয় তেল, ঘি খায় না, কিছু পাওয়া যায় নি। অগত্যা পরের দিনের জন্য আলু সিদ্ধ করে রাখা হলো। এটা পরিস্কার হয়ে গেল, সারা পথে আর তেল পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ রোজই আলু সিদ্ধ আর রুটি কপালে নাচছে। সত্যি রাজকীয় খাবার আয়োজন।

আমরা দু’জন কখনও ঘরে শুয়ে বসে গল্প করে, কখনও বাইরে এসে অন্ধকারের শোভা দেখে, সময় কাটাচ্ছি। বাংলোর সামনের দিকে একটু বাঁপাশে, বহুদুরে আলোক মালায় সজ্জিত, গোয়ালদামকে দেখা যাচ্ছে। অন্ধকারে এখানে আকাশে তারার সংখ্যা যেন কয়েক গুন বেড়ে গেছে। মধ্যে মধ্যে গোয়ালদামের আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঘরে ফিরে এলে কুমার থালায় করে আমাদের দু’জনের রাজভোগ নিয়ে এল। রুটি, আর তেল ঘি হীন এক সুস্বাদু তরকারি। আমাদের কাছে চার প্যাকেট মাখন আছে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে বার করা হলো না। আমাদের খাওয়া হয়ে গেলে, ওরাও খেয়ে নিল। এরপর গঙ্গা আমাদের আধ মগ করে ভারী সুন্দর কফি খাওয়ালো। বাংলোর কেয়ারটেকারও দেখি আমাদের কফি ক্লাবের সদস্য হয়ে গেছে। আর খালি পেটে যেহেতু কফি খাওয়া ক্ষতিকর, তাই কফির আগে রুটি তরকারি দিয়ে শরীরটাকে কফি সেবনের উপযোগীও করে নিল। অথচ ওই আমাদের ফাঁকা ঘরটা দিতে চাইছিল না। পরের দিনের জন্য মালপত্র গুছিয়ে ভালো করে বেঁধে নিলাম। সঙ্গে আনা মোমবাতি, জিনিসপত্রের চাপে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে গেছে। এখানে বা এরপরে আর কোথাও মোমবাতি পাওয়ার আশা নেই, তাই আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। ওরা তিনজন বারান্দায় শুয়ে গলা ছেড়ে গান ধরলো। গান শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।

আজ ঊনিশে আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। কথা মতো আজ আমাদের বৈদিনী বুগিয়াল যাবার কথা। গঙ্গা অবশ্য আলি বুগিয়াল দিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। আসবার আগে অনেকেই বলেছিল, আমরা যেন একদিন অন্তত বৈদিনীতে থাকি। ওটাই নাকি এ পথের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। গঙ্গা কফি তৈরি করে নিয়ে আসলো। কফি খেয়ে মালপত্র তুলে নেওয়া হলো। কেয়ারটেকারকে দশ টাকা দিতে হলো। আমরা আস্তে আস্তে পথ চলতে শুরু করলাম। উতরাই এর পথে চলেছি। গতকালের সেই জল নেবার জায়গাটা ফেলে, আমরা নীচে নেমে চললাম। এখানেই ভোরবেলার প্রয়োজনে দু’জনে একবার এসেছিলাম। আর এখানে এসে আমি এই যাত্রার সব থেকে বিপজ্জনক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম।

জলের জায়গাটার পবিত্রতা রক্ষা করতে, জামা প্যান্ট খুলে, একটু দুরে পাথরের আড়ালে, অনন্ত আকাশের নীচে গালে হাত দিয়ে, উদাস মনে বসেছিলাম। শীতাংশু অন্য দিকে তার পছন্দ মতো জায়গা বেছে নিয়েছে। অত সকালে কোন লোকজন না থাকায়, জামা, প্যান্ট, জুতো, জলের জায়গার কাছাকাছি একটা পাথরের ওপর রেখে এসেছিলাম। কাজ সেরে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখি, এক পাল বাচ্চা ছেলে, বোধহয় কোন মর্নিং স্কুলের ছাত্র, জলের জায়গায় এসে হৈচৈ করে জল খাচ্ছে, জল ছিটিয়ে খেলা করছে। আমি অশুচি অবস্থায় একটা পাথরের আড়ালে বার্থ ড্রেসে দাঁড়িয়ে আছি। অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল, তাদের বাড়ি বা স্কুলে যাবার কোন লক্ষণ নেই। নির্জন জায়গায় জামা, প্যান্ট, জুতো দেখে তারা অবাক। আমার হাতে তখন দুটো অপশন। হয় নাঙ্গা সন্ন্যাসী হয়ে, লজ্জার মাথা খেয়ে, তাদের কাছে গিয়ে, তাদের আরও অবাক করা। নয়তো আজকের যাত্রা বাতিল করে, ওদের বাড়ি যাওয়া পর্যন্ত চোরের মতো লুকিয়ে অপেক্ষা করা। শেষে কী ভেবে ওরা চলে যেতে, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসতে পেরেছিলাম, এবং স্বপোষাকেই ফিরেছিলাম।

যাহোক্, এবার শুরু হলো চড়াই, উতরাইয়ের পথ। এখন পর্যন্ত কিন্তু খুব কষ্টকর কোন চড়াই পাই নি। অন্তত লোহাজঙ্গের সেই প্রাণান্তকর চড়াই পার হওয়ার পর, এ পথকে কোন কষ্টকর বলে মনেই হচ্ছে না। আমরা দু’জনে অনেক এগিয়ে গিয়েছি। কুলি ও গাইডের দেখা নেই। কুলিরা তবু না হয় মাল বইছে, গঙ্গা থেকে থেকে কোথায় হাওয়া হয়ে যাচ্ছে কে জানে। আরও অনেকটা পথ পার হয়ে একটা জায়গায় আমরা বসলাম। আসার পথে একটা জায়গা দেখলাম, যেখানে তাঁবু থাকলে রাত কাটানোর পক্ষে আদর্শ জায়গা হিসাবে মনে হলো। আমরা নিয়ম মাফিক পাথরের ওপর বসে বাদাম ও মুড়কির ঠোঙা বার করলাম। মাটি এখনও শিশিরে ভিজে আছে। সকালের সূর্যালোক খুব আরামদায়ক। এতক্ষণে গঙ্গা ও হরিশের আগমন হলো। ওদের বাদাম ও মুড়কি খেতে দিলাম। গঙ্গার সাথে মুড়কি নামক বস্তুটির আগে পরিচয় হয় নি। সে অনেকক্ষণ দেখে জিজ্ঞাসা করলো “এটা কী খাবার”? নাও ঠ্যালা, মুড়কির হিন্দী কী? বললাম এটা এক প্রকার মিঠাই, এর নাম মুড়কি। সে খানিকটা মুখে পুরে জানালো, খাদ্যটা তার খুব পছন্দ হয়েছে। আগে কখনও কোন যাত্রীকে সে এই খাবার আনতে দেখেনি। এতক্ষণে কুমার এসে হাজির হলো। ওকেও খাবার দিলাম। আরও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে পড়লাম। এখন পর্যন্ত যতটা পথ এলাম, তার বেশির ভাগটাই উতরাই। গঙ্গা দুরে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বললো, বাঁদিকটা ওয়ান গ্রাম। সেই লাল রঙের জায়গাটা এখন বেশ পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। ও জানালো আরও কিছুটা পথ পার হয়ে, আমরা ডানহাতি রাস্তা ধরবো। বহুদুরে আলি বুগিয়াল যাবার রাস্তাটা ও আঙ্গুল দিয়ে দেখালো বটে, কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না, রাস্তাটা ঠিক কোন জায়গা দিয়ে গেছে। সরু আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে আমরা আলি বুগিয়ালের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম। এখন পর্যন্ত বিশেষভাবে আকর্ষণ করার মতো কোন দৃ্শ্য চোখে পড়েনি। সেই পাহাড়, সেই খাদ, দুরে জঙ্গলে ঢাকা উঁচু চুড়া, সেই একই দৃ্শ্য। গঙ্গা জানালো এবার চড়াই এর পথ শুরু হবে। আমি মনে মনে প্রমাদ গুণলাম, এবং নিজেকে সামনের চড়াই এর উদ্দেশ্যে তৈরি করে নিলাম।

বাঁহাতে ওয়ান যাবার রাস্তা ছেড়ে, আমরা ডানদিকে বেঁকলাম। আস্তে আস্তে রাস্তা ওপরে উঠছে, তবে ভয় পাওয়ার মতো খাড়াই নয়। দু’পাশে হাল্কা জঙ্গলের মাঝ দিয়ে রাস্তা। একঘেয়ে হাঁটা, মাঝে মাঝে ছবি তোলা, রাস্তার পাশে বসে বা শুয়ে বাদাম অথবা লজেন্স চেবানো, আবার নতুন করে পথ হাঁটা। এইভাবে কতক্ষণ হেঁটেছি জানিনা, বেলা এখন বেশ বেড়েছে। গঙ্গা বললো সামনের গ্রামে সঙ্গে নিয়ে আসা রুটি ও আলুসিদ্ধ খাওয়া হবে। ডান পাশে ছোট ছোট ছাউনির কুড়ে ঘর ইতস্তত ভাবে তৈরি করা হয়েছে। একটা ঘরের সামনে, একবারে ছোট তিনটে বাচ্চা খেলা করছে। আর একটা বাচ্চা বোধহয় কেবল দাঁড়াতে শিখেছে। আমি রাস্তার ওপর থেকে একটা লজেন্স দেখাতেই, একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে লজেন্সটা নিয়ে আসবার জন্য ইশারা করতে লাগলো। কিন্তু কেউ সাহস করে এগিয়ে আসলো না। আমরা লজেন্সটা নিয়ে এগিয়ে যাবার ভান করতেই, ওরা বুঝলো আর লজ্জা করাটা ঠিক হবে না। একটা বাচ্চা আস্তে আস্তে এগিয়ে এল। তার নাম জিজ্ঞাসা করাতে, সে কী একটা নাম বললো বুঝতে পারলাম না। তার হাতে একটা লজেন্স দিলাম। এই লোভনীয় দৃশ্য দেখার পর, বাকি দুটো বাচ্চাও এগিয়ে এসে তাদের নাম বলে লজেন্স নিল। আমরা এগতে যাব, এমন সময় ওদের মধ্যে একজন, সেই ছোট্ট, কেবল হাঁটতে শেখা বাচ্চাটার নাম বললো। অর্থাৎ ওর ভাগেরটা দাও। আর একটা লজেন্স ওর হাতে দিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম। সামান্য একটা লজেন্স পেয়ে, ওরা যে কী খুশি হয় ভাবা যায় না। আর একটু পথ ওপরে এসে, রাস্তার বাঁপাশে একটা ছোট ঘর। সামনে পাথর পেতে খানিকটা জায়গা বারান্দার মতো করা। সেখানে খুঁটির ওপর কাঠের তক্তা পেতে কয়েকটা বেঞ্চের মতো তৈরি করা হয়েছে। বারান্দা বা উঠোনের মতো জায়গাটায়, অনেক কাঁচা পাতা ছোট ছোট করে ছিঁড়ে, শুকতে দেওয়া হয়েছে। গঙ্গা বারান্দায় উঠে এল। দু’জন বৃদ্ধ বসেছিলেন, তাঁরা আমাদের বেঞ্চে বসতে বললেন। এটা কোন দোকান, না এই দুই বৃদ্ধের বাসস্থান বুঝলাম না। গঙ্গা রুটি ও আলুসিদ্ধ বার করলো। এখানেও দেখলাম গঙ্গাকে এরা চেনে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম শুকতে দেওয়া এগুলো কী পাতা? একজন বৃদ্ধ জানালেন এগুলো তামাক পাতা। হাতে নিয়ে দেখলাম, কোন গন্ধ নেই। বাঁপাশে ছোট্ট একটা জায়গায় বাগান মতো করা। ওখানে কয়েকটা গাছকে বৃদ্ধ ভদ্রলোক আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ওগুলো তামাক গাছ, বিড়ি তৈরি হয়। যদিও খুব উন্নত মানের নয়, তবু ওঁদের কাজ মিটে যায়।

এখান থেকে ওয়ানের দিকে বহুদুরে একটা ঢেউ খেলানো মাঠের মতো জায়গা দেখা যাচ্ছে। খুব সুন্দর সেই দৃশ্য। একজন লোক, সম্ভবত মিলিটারিতে চাকুরি করে, ওপর থেকে এসে, আমাদের পাশে বসলো। আমরা রুটি, আলুসিদ্ধ ও কফি খেলাম। আর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, চললাম বুগিয়াল। বেশ কিছুটা সময় ঝোপঝাড় জঙ্গলের পথ ধরে ওপরে উঠতে শুরু করলাম। এটা আসলে বাইপাশ, হরিশ ও কুমার অন্য দিক দিয়ে মালপত্র নিয়ে আসছে। গতকাল লোহাজঙ্গ আসার পথে হরিশ তার পিঠের ব্যাগের সঙ্গে কেরসিন তেলের টিনটাও বেঁধে নিয়েছিল। ঐ ব্যাগে চাল, ডাল, আটা ও অন্যান্য সমস্ত খাদ্যদ্রব্য ছিল। রাস্তায় হঠাৎ আমাদের চোখে পড়েছিল যে ব্যাগটা টিনের তেলে অনেকটা জায়গা ভিজে গেছে। খুব ভয় পেয়েছিলাম। একে তো সমস্ত রাস্তাটা এই এক খিচুড়ি, আর রুটি আলুসিদ্ধ ছাড়া কিছুই জুটবে না, তার ওপর কেরসিনের সুগন্ধ হলে, ভয়াবহ ব্যাপার হবে। পরে অবশ্য সেই আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। পলিথিন সিটে সমস্ত কিছু মোড়া থাকায়, সম্ভবত কেরসিনের গন্ধ তাদের আক্রমন করতে পারে নি। আজ তাই গঙ্গা নিজে কেরসিনের টিন হাতে করে নিয়ে পথ চলছে। তার পিঠে তার নিজের একটা ব্যাগ আর আমাদের কিট্ ব্যাগটা রয়েছে। হরিশ রোগা হলেও কিন্তু কুমারের থেকে অনেক বেশি ও ভারী মাল বইছে। এখন আমরা যে জায়গাটা দিয়ে যাচ্ছি, সেটা একটা ঘন জঙ্গল। চারপাশে বিরাট বিরাট গাছ, জায়গাটাকে আলো ছায়ায় সাজিয়ে রেখেছে। এখানে কোন রাস্তা নেই, তাই অগত্যা গঙ্গার সাথে গতি মিলিয়ে আস্তে আস্তে ওপরে উঠছি। নিজেদের এ পথ চিনে যাবার ক্ষমতা নেই। গঙ্গা কিছুটা করে পথ যায়, আর যেখানে সেখানে বসে পড়ে, আমার কাছে বিড়ি চায়। আমার এই ঘন ঘন বসে অনবরত বিশ্রাম নেওয়াটা পছন্দ না হলেও, চুপ করে আছি। শীতাংশুকে দেখছি গোমড়া মুখে বসে থাকতে। ওর বিরক্তির কারণ বুঝছি, কিন্তু এপথে কুলি গাইডকে মেনে না নিয়েই বা উপায় কী? এবার গঙ্গা এক জায়গায় বসে আমাদের বললো কুলিরা অনেক পিছিয়ে পরেছে। ও মাঝে মাঝে সুর করে “আ—–উ—–“ করে একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ করে, যেটা অনেক দুর থেকেও শোনা যায়। এখন আবার সেরকম অদ্ভুত রকমের তীক্ষ্ণ আওয়াজ করলো। ওদিক থেকে কোন সাড়া এল না। তার মানে কুলিরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। আমরা চুপচাপ বসে আছি। সামনে বিরাট খাদ। বহুদুরে উচু পাহাড়ের শ্রেণী। তারই একটার মাথায় লোহাজঙ্গের সেই সাদা মন্দিরটা চোখে পড়লো। গঙ্গাই অবশ্য সেটা আমাদের দেখালো। খাদের বাঁদিকে পাহাড়ের শ্রেণী অবশ্য খুব কাছে। অর্থাৎ আমরা এখন যেখানে রয়েছি, তার সাথে যোগ রয়েছে। গঙ্গা হাত দিয়ে দেখিয়ে বললো ওটার ওপর উঠতে হবে। এবার হরিশ এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু কুমার না আসায় চিন্তা শুরু হলো, কারণ ও, এপথে এই প্রথমবার আসছে। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে গঙ্গা উঠে পড়লো। বোধহয় কুমারের-ই খোঁজে।  একটু এদিক ওদিক দেখে, আবার সেই তীক্ষ্ণ আওয়াজ করলো। এবার কিন্তু ওদিক থেকে কুমারেরও সাড়া মিললো। যাক্ বাঁচা গেল। কুমার এসে বসলো। একে একে ওরা এসে উপস্থিত হচ্ছে বলে, প্রত্যেককে বিশ্রামের জন্য সময় দিতে হচ্ছে। ফলে আমরা বসে বসে হাঁপিয়ে যাচ্ছি। ওরা তিনজনে একবারে খাদের ধারে এগিয়ে গিয়ে বসলো। এবার দেখি ওরা আঙ্গুল দিয়ে খাদের দিকে কী দেখাচ্ছে। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, ওরা হরিণ দেখতে পাওয়া যায় কী না খুঁজছে। শীতাংশু যেখানে বসেছিল, সেখানেই বসে রইলো। ওর অবস্থা দেখে হাসিও পাচ্ছে, করুণাও হচ্ছে। আমারও যে খুব ভালো লাগছে তা নয়, তবু ভালো লাগাবার চেষ্টা করছি। অনেকটা “পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে” গোছের ব্যাপার। গঙ্গা জানালো সন্ধ্যাবেলা এখানে এলে অনেক হরিণ দেখতে পাওয়া যায়। আমি বললাম জায়গাটা সত্যিই খুব সুন্দর। গঙ্গা বললো “বাবুজী, এখানে থেকে যাও। তোমায় একটা কোঠি বানিয়ে দেব। এখানকার একটা ভালো লেড়কিকে সাদি করে, এখানকার বাসিন্দা হয়ে যাও”। আমি বললাম তুমিই তাই করো না কেন? সে উত্তরে বললো যে সে ব্রহ্মচারী।

যাহোক্, হাতের লেড়কি পায়ে ঠেলে, আমি উঠে পড়লাম। বাধ্য হয়ে ওরাও আমাদের সঙ্গে এগিয়ে চললো। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ওদের সাথে পথ চলছি। আরও বেশ কিছু পথ চলার পর, ডানপাশে ছোট একটা কুঁড়েঘর দেখতে পেলাম। ঘরের বাসিন্দা এক বৃদ্ধ, বাইরে বসে মনের সুখে ভেড়ার লোম পাকাচ্ছেন। এ পথের সমস্ত পুরুষেরই দিনের অধিকাংশ সময় কাটে এই লোম পাকিয়ে, মোটা উল তৈরি করায়। এর থেকে ওরা নিজেদের গরম পোষাক তৈরি করে। এ ভদ্রলোকও দেখলাম গঙ্গাকে চেনেন। সাধারণত এ পথের সমস্ত যাত্রীই ওয়ান হয়ে বৈদিনী যায়। অর্থাৎ গঙ্গাও এ পথে খুব কম গিয়েছে। হরিশ এ পথে আগে গিয়েছে। কুমারের এই প্রথম। অথচ এই বৃদ্ধ গঙ্গাকে চেনেন। এ পথে দেখছি বৃদ্ধাশ্রমের অভাব নেই। তবে শুধু বৃদ্ধের জন্যই আশ্রম, বৃদ্ধাদের স্থান নেই, এবং শর্ত একটাই, বৃদ্ধ একা থাকবে।

যাহোক্, তিনি গঙ্গাকে ডেকে তাঁর ওখানে একটু বিশ্রাম নিতে বললেন। এই কয়েক মিনিট হলো আমরা এক পর্ব বিশ্রামের পালা শেষ করে আসলাম। আমি বিপদ বুঝে তাড়াতাড়ি বললাম, “এইতো এখনই বিশ্রাম নিয়ে এলাম। এখন আর বসার প্রয়োজন নেই”। গঙ্গা জানালো ওঁর ওখানে একটু বসে না গেলে, তিনি মনে খুব দুঃখ পাবেন। সুতরাং বৃদ্ধকে আসন্ন দুঃখের হাত থেকে মুক্তি দিতে, গঙ্গার ইচ্ছায়, গুটি গুটি পায়ে তাঁর ঘরটার দিকে এগতেই হলো। কুমার ও হরিশ সমস্ত মালপত্র আমাদের যাবার পথের ওপরেই রেখে এল। বৃদ্ধটি  তাঁর ভাঙ্গাচোরা  ঘর থেকে  দুটো চট্ এনে ঘরের সামনে বিছিয়ে দিলেন। আয়োজনের ত্রুটি নেই। ভয় হলো গঙ্গা না আবার আজ এখানে থেকে যাবার প্রস্তাব দিয়ে বসে। আমি আরাম করে চটের ওপর শুয়ে পড়লাম। এবার তিনি একটা হুঁকো সেজে নিয়ে এলেন। ঠিক থেলো হুঁকোর মতো সাধারণ হুঁকো নয়। বৃদ্ধটি ঐ বিস্তীর্ণ এলাকায় একাই থাকেন। জমিদারও বলা যেতে পারে। তাই তিনি জমিদারের মতোই গড়গড়া খান। একটা প্রায় তিন ফুট মতো লম্বা, সরু, বাঁশের ফাঁপা কঞ্চির মতো লাঠি দিয়ে, তিনি পরম আরামে হুঁকো টানতে শুরু করলেন। না ভূল বললাম, হুঁকো টানার নলটাকে কঞ্চি বললে অসম্মান করা হবে। এখানে ঐ জাতীয় গাছ প্রচুর হয়। দেখতে এখানকার বাঁশের কঞ্চির মতো হলেও, এগুলোকে বাঁশ বলাই উচিৎ। হরিশ আমাদের রাস্তা হাঁটার কষ্ট লাঘব করতে দু’টো কঞ্চির ন্যায় বাঁশ কেটে দিল। অসম্ভব শক্ত। গঙ্গা আর বৃদ্ধটি পালা করে হুঁকো টেনে যাচ্ছে। আমি শুয়ে আছি। শীতাংশু জায়গাটা সরজমিনে তদন্ত করে দেখছে। হঠাৎ গঙ্গা আমায় বললো, বাবুজী সখ করবে? সখ করা মানে হুঁকো টানা। এর আগে আমাদের বাড়ির পাশে, এক দাদুর হুঁকো টেনে দেখেছি। তবে সেটা ছিল অতি সাধারণ থেলো হুঁকো। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। হুঁকোটাকে যতটা সম্ভব দুরে রেখে, প্রায় তিন ফুট লম্বা বাঁশ দিয়ে টানতে হবে। মুখ দিয়ে না টেনে কঞ্চি দিয়ে খাচ্ছেন খান, কিন্তু কঞ্চিটা অত বড় রেখে কী সুবিধা, তিনিই বলতে পারবেন। গঙ্গার কথায় বৃদ্ধটি আহ্লাদ প্রকাশ করে আমায় সখ করতে অনুরোধ করলেন। আমি উঠে বসে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর, সখ করতে সমর্থ হলাম। আতুর ঘরে নাতির প্রথম জন্মক্রন্দন শুনে যেমন দাদুর মুখে হাসি ফোটে, আহ্লাদে আটখানা হন, এই বৃদ্ধটিও আমার সখ করার সাফল্যে, সেই রকম আহ্লাদিত হলেন। গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম জায়গাটার নাম কী? সে জানালো জায়গাটার নাম “টোল”। পরে অবশ্য সে জায়গাটাকে “টোর্ন” নামে পরিচয় দিল। জানিনা কোনটা ঠিক নাম। এইরকম নির্জন জঙ্গলে, ভাঙ্গাচোরা একটা ঘরে, বৃদ্ধটি কিসের আকাঙ্খায় বাস করেন, ভগবান জানেন।

যাহোক্, আমরা বৃদ্ধটিকে নমস্কার করে উঠে পড়লাম। শুরু হলো নতুন করে পথ চলা। এবার একটু চড়াই এর পথ। একটু আগে গঙ্গার দেখানো সেই পাহাড়ের চুড়ায় উঠছি। রাস্তা একটু পাথুরে। দু’পাশে ঘন জঙ্গল। এর কিছু পরেই আমরা একটা ফাঁকা মাঠে এসে দাঁড়ালাম। সত্যি এক অদ্ভুত জায়গা। কখনও ভীষণ ঢালু মাটির রাস্তা, কখনও পাথুরে চড়াই এর পথ, কখনও সুন্দর ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, কখনও লাল মাটির রাস্তা, আবার কখনও বা ঘন জঙ্গলে অথবা বড় বড় ঘাসে ঢাকা বা ঝোপঝাড় পেরিয়ে এগতে হয়। এই মাঠটার পরেই আবার বড় বড় গাছের জঙ্গল। গাছগুলো থেকে খুব হাল্কা মাকড়সার জালের মতো এক প্রকার লতা ঝুলছে। পাহাড়ি এলাকায় গাছের ডালপালা বা কান্ডের ওপর বরফ জমে, গরম কালে গলে যাবার পর যেরকম শ্যাওলা জাতীয় জন্মায়, অনেকটা সেই জাতীয় এক প্রকার লতার মতো। অথচ অনেকটা স্বর্নলতিকার মতো রঙ। গঙ্গা জানালো এগুলো খুব দামী জিনিস। এখন এর দাম, প্রতি কিলোগ্রাম ১৬৮ টাকা। আমি বললাম এখানে তো অনেক রয়েছে, নিয়ে গিয়ে বিক্রি করলেই তো পার। গঙ্গা বললো এগুলো গদি তৈরির কাজে লাগে। এগুলো এত হাল্কা যে, এক কিলোগ্রাম তুলতে ঘাম ছুটে যাবে। যাহোক্, আমরা সামনের জঙ্গলের পথে এগতে যাব, এমন সময় শীতাংশু বললো, তার একটা প্রস্তাব আছে। আমরা জানতে চাইলে সে গম্ভীর হয়ে বললো, এক রাউন্ড কফি হলে হতো না? সত্যি, এতক্ষণের রাস্তায় এই প্রথম শীতাংশু একটা দামী কথা বলেছে। জায়গাটা বেশ ঠান্ডা, তাছাড়া মুখের ওপর দিয়ে এত সাদা ঘন মেঘ উড়ে যাচ্ছে, যে একটু দাঁড়ালে, বেশ কষ্ট হচ্ছে। আমি প্রস্তাবে রাজি হলে, ধ্বনি ভোটে সেই প্রস্তাব পাশ হলো। গঙ্গা হরিশকে জল আনতে বললো। হরিশ বললো সে একা যাবে, ভাল্লুর ভয় নেই তো? গঙ্গা বললো ভাল্লু তোমায় খাবে না। হরিশ জঙ্গলের দিকে না গিয়ে, ডানপাশে মাঠ পেরিয়ে জল আনতে চলে গেল। গঙ্গা একটা গাছের তলায় পাথর সাজিয়ে উনন তৈরি করে, শুকনো কাঠ খুঁজতে গোটা মাঠ ঘুরে বেড়াতে লাগলো। কুমার ও শীতাংশু কিছু শুকনো ডালপালা যোগাড় করলো। একটা পলিথিন সিট পেতে আমরা বনের মধ্যে বনভোজনের প্রস্তুতি শুরু করলাম।

অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল, হরিশ ফিরে এল না। গঙ্গা, কুমারকে হরিশের খোঁজে পাঠিয়ে, উননে কাঠ জ্বালাবার চেষ্টা শুরু করলো। আরও বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে গেল, ওদের দু’জনের কেউই ফিরে এল না। এবার শীতাংশু চললো ওদের খোঁজে। আমি শীতাংশুকে বললাম ওদের খুঁজে না পেলেও, তুমি অন্তত ফিরে এস। একটু পরেই তিন মুর্তিমান জল নিয়ে ফিরে এল। হরিশ জানালো অনেক দুরে জল আনতে যেতে হয়েছিল। গঙ্গা জানালো আরও শুকনো কাঠের প্রয়োজন। আমি ওরা যে দিকে জল আনতে গিয়েছিল, সেই দিকে খানিকটা পথ গিয়ে, বাঁদিকে একটা জঙ্গল মতো জায়গায় ঢুকলাম। জায়গাটা এত নির্জন, যে গা ছমছম্ করে। এখানে কোন বসতি নেই। গোটা এলাকাটাই নির্জন, কিন্তু এই জায়গাটার একদিকে মাটির ওপর কাঁটা তার পড়ে আছে। হয়তো কোন সময় কাঁটা তারের বেড়া দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সোজা কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, জায়গাটায় কিরকম একটা ভৌতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। শুকনো কাঠ পাওয়া গেল না।

                দিদনা                     

এদিক ওদিক থেকে কিছু শুকনো ডালপালা নিয়ে ফিরে এলাম। জল ফুটলো, কফিও তৈরি হলো। জায়গাটা সত্যি অতুলনীয়। সামনে পিছনে ঘন জঙ্গল। ডানপাশে, যে দিকে ওরা জল আনতে গিয়েছিল, বেশ বড় মাঠ। বাঁপাশে, যে দিক থেকে আমরা এখানে এলাম, দুরে বহু নীচে খাদ আর উচু পাহাড়ের মেলা। বাড়ি থেকে একটা ছোট অ্যালুমিনিয়ামের বাটি নিয়ে এসেছিলাম কফি তৈরির জন্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, এরা ঐ বাটি ভর্তি কফি এক একজন খায়। সঙ্গে দুটো প্লাষ্টিক মগ আর ঐ একটা বাটি। হাঁড়িতেই কফি তৈরি হলো। তাই আগে তিনজন কফি খেয়ে, পরে দু’জনকে কফি খেতে হচ্ছে। বাদাম আর কফি খেয়ে, মালপত্র বেঁধে উঠে পড়লাম। হঠাৎ গঙ্গা বললো এক কাম করো, আজ “আলি বুগিয়াল” থেকে যাও। কাল ওখান থেকে “বগুয়াবাসা” চলে যাব। আগামীকালই হিসাব মতো আমাদের বগুয়াবাসা যাবার কথা। আমি বললাম গতকাল আমাদের ওয়ান যাবার কথা ছিল, তুমি লোহাজঙ্গে থেকে গেলে। আজ বৈদিনী বুগিয়াল যাবার কথা, তুমি আলি বুগিয়ালে থেকে যাবার কথা বলছো। কাল আবার মাঝ রাস্তায় কোথাও থাকতে বলবে। দরকার নেই, আজই আমরা বৈদিনী চলে যাব। গঙ্গা বললো, আলি থেকে বৈদিনী মাত্র দুই-আড়াই কিলোমিটার পথ। বৈদিনী বুগিয়াল থেকে চড়াই ভাঙ্গতে হবে। আজ বৈদিনী বুগিয়াল গেলে, কাল ঘুম থেকে উঠেই চড়াই ভাঙ্গতে খুব কষ্ট হবে। আজ আলি বুগিয়ালে রাত্রে থেকে, কাল বৈদিনী পর্যন্ত সমান রাস্তায় হেঁটে, তারপর  চড়াই ভাঙ্গলে, কষ্ট অনেক কম হবে। কথাটার যুক্তি আছে বলে মনে হলো। শীতাংশু আমায় বললো, আমাদের ট্যুর প্রোগ্রাম অনুযায়ী আমরাতো একদিন আগেই ওখানে পৌছাব, কাজেই আজ আলি বুগিয়াল থেকে যাওয়া যেতে পারে। তাই ঠিক হলো। হরিশ জানালো আলি, বৈদিনীর থেকে অনেক সুন্দর ও অনেক বড় বুগিয়াল। এতক্ষণে জানা গেল বুগিয়াল কথার অর্থ, তৃণভূমি, এবং আলি বুগিয়ালের বিস্তির্ণ এলাকায় শুধু তৃণভূমি।

একভাবে অনেকটা পথ গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে, আমরা এবার একটা ফাঁকা জায়গায় হাজির হলাম। এও এক অদ্ভুত জায়গা। শীতাংশু ও গঙ্গা আগে আগে যাচ্ছে, ওদের ঠিক পিছনেই আমি। আমার পিছনে কিছুটা দুরে হরিশ ও কুমার। আকাশ পরিস্কার নয়, তবে যথেষ্ট আলো আছে। হঠাৎ হঠাৎ সাদা ভারী মেঘ আমাদের ওপর নেমে আসছে। ভীষণ ঠান্ডা, আর মনে হচ্ছে যেন জামা প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহুর্তে দু’হাত দুরের শীতাংশু ও গঙ্গাকে একদম দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে না পিছনে হরিশ ও কুমারকে। এখানে রাস্তা বলে কিছু নেই। এমন কী আমাদের পথ চলা ও চেনার সুবিধার্থে, কোন দয়ালু মানুষ পায়ে চলার দাগ পর্যন্ত রেখে যান নি। সমতল জায়গা, তাই সম্পূর্ণ আন্দাজে, অন্ধের মতো সোজা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি। আমাদের সুবিধার্থে গঙ্গা হাততালি দিতে দিতে যাচ্ছে। মাত্র কয়েক মিনিট, তার পরেই আবার চারিদিক পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে, বিকালের সেই হাল্কা সুন্দর শেষ সূর্যালোক, তার সীমিত ক্ষমতা দিয়ে আমাদের উত্তাপ দেবার চেষ্টা করছে। উত্তাপ না দিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাচ্ছি, এটাই বড় পাওয়া। আবার সামনে শীতাংশু ও গঙ্গাকে পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি, আর ঐ তো হরিশ ও কুমার পিছন পিছন মালপত্র পিঠে নিয়ে আসছে। সব কিছু আবার আগের মতো, শুধু পর্থক্য এই যে আগে আমরা প্রায় লাইন দিয়ে যাচ্ছিলাম। যাচ্ছিলাম সামনের লোককে লক্ষ্য করে, ঠিক তার পিছন পিছন হেঁটে। আর এখন আমরা একে অপরের থেকে কেউ বেশ খানিকটা ডাইনে, কেউ বা অনেকটা বাঁয়ে চলে গেছি। আবার সেই মেঘ, আবার সেই সূর্যের মিষ্টি আলো। এইভাবে কতটা পথ হেঁটেছি জানিনা, এক সময় মেঘ কেটে যেতে দেখলাম, সামনে কিছুটা দুরে একটা মাঠ যেন আস্তে আস্তে উপরে উঠে একটা পাথুরে ঢিবির কাছে শেষ হয়ে গেছে। গঙ্গা আর শীতাংশু এগিয়ে গিয়ে ওটার ওপর বসে পড়লো। আমি হাতের লাঠি ফেলে ক্যামেরা বার করে, সুন্দর জায়গাটার একটা স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্রকৃতি দেবী বোধহয় চান না, যে তাঁর এলাকায় তাঁর ব্যাপারে আমি নাক গলাই, তাঁর অনুমতি না নিয়ে তাঁর ছবি তুলি। তাই মুহুর্তের মধ্যে ঘন মেঘে নিজের নিরাবরণ অঙ্গ ঢেকে ফেললেন। আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, অগত্যা ক্যামেরা গুটিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। ঢিবিটার কাছে পৌঁছানোর আগেই আবার সামান্য সূর্যের আলো দেখা গেল। আমি সময় নষ্ট না করে একটা ছবি তুলে নিলাম। এরপর আমরা পাঁচজন বেশ কিছুক্ষণ সময় ঢিবিটার ওপর বসে বিশ্রাম নিলাম। বেশ ঠান্ডা লাগছে। তার ওপর এই মেঘ এসে সমস্ত পোষাক স্যাঁতসেঁতে করে দিয়েছে। মনে মনে ভীষণ কফি খেতে ইচ্ছা করছিল। অথচ এখানকার আবহাওয়ার এই বিচি্ত্র রূপ দেখে, গঙ্গাকে আর মনের কথা বলতে পারলাম না। তাছাড়া এখানে শুকনো কাঠও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। গঙ্গা জানালো আর বেশি পথ নেই। আমরা উঠে পড়লাম।

এবার রাস্তা কিন্তু এই মাঠের মধ্যে দিয়েই গেছে। মাঠটা যেন আস্তে আস্তে ওপর দিকে উঠেছে। চারিদিকে গাছপালা বেশ কমে এসেছে। বুঝলাম আমরা বুগিয়ালের জমিদারিতে ঢুকে পড়েছি। আরও খানিকটা পথ এগিয়ে একটা জায়গায়, মাঠটা যেন গোল আকার ধারণ করেছে। তার এক দিকটা একটু উচু। তারপাশে খানিকটা জায়গায় জল জমে আছে। আমরা বসে পড়লাম। একটু পরেই হরিশ ও কুমার এল। দুর থেকে মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। আমি খুব আশ্চর্য হয়ে গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম “এখানে মানুষ থাকে”? ও জানালো এই সময় গরু মোষকে ঘাস খাওয়াতে, নীচের থেকে কিছু লোক এসে ছোট ছোট ঝুপড়ি করে এইসব জায়গায় দু’এক মাস থাকে। একটু পরেই দেখলাম তিনজন মহিলা, তিন-চারটে বাচ্চা ও খানচারেক মোষ নিয়ে আসছে। অনেক আগে থেকেই লক্ষ্য করেছি, এখানকার সমস্ত মেয়েরা কালো রঙের পোষাক পরে। পোষাক বলতে গলা থেকে পা পর্যন্ত কালো রঙের ফ্রক বলা-ই বোধহয় ঠিক হবে। তার থেকেও লক্ষ্য করার বিষয়, এই সব এলাকার কোন পুরুষ, বলতে গেলে কোন কাজ করে না। অন্তত আমি তো দেখলাম না। যাদের ঘরের সাথে দোকান মতো আছে, তারা দোকানে বসে ভেড়ার লোম পাকায়। আর যাদের তা নেই, তারা রাস্তাঘাটে, বা বাড়ির সামনে বসে লোম পাকায়। আর মেয়েরা পিঠে বিরাট বেতের ঝোড়া নিয়ে, গাছের পাতা নিয়ে আসে নিজেদের গরু মোষের জন্য। বনজঙ্গলে চড়াই উতরাই ভেঙ্গে, গাছের শুকনো ডালপালা যোগাড় করে বয়ে আনে। কাঠের বোঝার ভারে তাদের শরীর বেঁকে যায়। তাদের অনেকেরই মুখের দিকে তাকালে সহজেই অনুমান করা যায় যে, অন্তত ষাটটা বসন্ত তারা হিমালয়ের কোলে কাটিয়ে দিয়েছে। বনের কাঠ, পাতা সংগ্রহ করে আনা ছাড়াও, তাদের খেতের কাজও করতে হয়। মনটা হুহু করে উঠলো গঙ্গার দেওয়া প্রস্তাবে সাড়া দেবার জন্য। একবার এ অঞ্চলের একটা মেয়েকে সাদি করতে পারলে, আর আমাকে পায় কে? সারা জীবন বসে বসে খাওয়া। নেই কোন চিন্তা, টাকা রোজগারের ধান্দা, শারীরিক পরিশ্রম। আহা কী সুখের জীবন। শুধু একটু ভেড়ার লোম পাকানো শিখে নিতে পারলে, আর কোন ঝামেলা নেই। বছরে দু’তিনটে কালো ফ্রক? তা আর কিনে দিতে পারবো না? তাহলে মরদ কিসের? যাহোক্ এই তিনজন মহিলা ও তাদের বাচ্চাদের দলটা এসে আমাদের সামনে একটা উচু জায়গায় বসলো। বাচ্চাগুলো ছোটাছুটি করে খেলা করতে শুরু করে দিল। মহিলারা অবাক হয়ে আমাদের লক্ষ্য করছে। কিছুক্ষণ পরে ওরা মোষগুলোকে নিয়ে, যেদিক থেকে এসেছিল, সেই দিকেই ফিরে গেল। গঙ্গার নিজের কথায়, সে একজন ব্রহ্মচারী। তাই বোধহয় ব্রহ্মচর্য পালন করতে, গঙ্গাও ওদের পিছন পিছন, একটু তফাৎ রেখে, ওদের সঙ্গে এগিয়ে গেল। এতো মহা মুশকিল্। হরিশ ও কুমার গঙ্গাকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা শুরু করে দিল। খানিকটা এগিয়ে গঙ্গা একটা ঢিবির কাছে দাঁড়িয়ে শাম্মী কাপুরের স্টাইলে একটা পাহাড়ি সুরে গান ধরলো। শিষ দিয়ে গানের সুর ভাঁজলো। তারপরে একসময় ফিরে এসে আমাদের পাশে বসলো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় গিয়েছিলে? ও একটু হেসে জানালো, সে একজন ব্রহ্মচারী। আমি বললাম “তাই তো দেখছি। আরে তুমি হোচ্ছ গাড়োয়ালের ব্রহ্মচারী, কিন্তু আমি যে কলকাতার ব্রহ্মচারী। কাজেই তোমাকে দেখেই বুঝতে পারছি যে তুমি একজন সাচ্চা ব্রহ্মচারী”। ও হেসে উঠে বললো, একবার হাত মেলান। আমি হাত মিলিয়ে উঠে পড়লাম। বাকি সকলেও তৈরি হয়ে নিল। গঙ্গা বললো তাকে পঁচিশটা টাকা দিতে। সামনের কোন ঝুপড়ি থেকে ঘি পাওয়া গেলে, কিনে নিয়ে আসবে। আলি বুগিয়ালের গেষ্ট হাউস সামনেই, কুমার ও হরিশ আমাদের সঙ্গে যাবে। গঙ্গা ঘি নিয়ে সোজা গেষ্ট হাউসে চলে যাবে। শেষ মুহুর্তে ওকে কাছ ছাড়া করতে ইচ্ছা না থাকলেও ঘিয়ের লোভে তাকে টাকা দিয়ে, হরিশ ও কুমারকে নিয়ে এগলাম। হরিশ জানালো আজ আর কোন চড়াই এর রাস্তা নেই। গাছপালা কমতে কমতে, এখন একবারে ফাঁকা হয়ে গেছে। এত সুন্দর জায়গা এর আগে কোনদিন কোথাও দেখি নি।

            আলি বুগিয়াল                 

গত  বৎসর  হিমাচল  প্রদেশের  খাজিয়ারে,  অসামান্য  সুন্দর  একটা  বিশাল  মাঠের  মতো  বিস্তীর্ণ  অঞ্চল দেখেছিলাম।  চারপাশে  গাছ  দিয়ে  ঘেরা  জায়গাটার  পাগল  করা  সৌন্দর্য,  আমাকে  ভীষণ  ভাবে  মুগ্ধ করেছিল।  কিন্তু  এখানকার  সৌন্দর্যের  কাছে  খাজিয়ারকে  অতি  সাধারণ  বলে  মনে  হলো।  যেদিকে যতদুর  চোখ  যায়,  শুধু  ঢেউ  খেলানো  মাঠ।  কোথাও  কোন  গাছ  নেই।  মাঠের  ওপর  ধনে  বা  মৌরি গাছের  মতো  পাতা,  ঘাসের  মতো  জন্মে  আছে। পাতাগুলো  একবারে  মাঠের  সাথে  লেপ্টে  আছে,  আর  তার  থেকে  ইঞ্চি  দুই-তিন   উচুতে,  সুতোর  মতো  সরু  ডাঁটায়,  ছোট্ট  ছোট্ট  ফুল  মাথা  তুলে  হাওয়ায়  দোল  খাচ্ছে।  কতরকম  যে  তাদের  রঙ  বলতে  পারবো  না।  বড়  আকারের  একটাও  ফুল  নেই।  ছোট্ট  ছোট্ট  চার  পাপড়ির  ফুল।  লাল,  নীল,  হলুদ,  বেগুনী,  সাদা,  মেরুণ,  আরও  কত  অদ্ভুত  সব  রঙ।  যতদুর  চোখ  যায়,  সবুজ  জমির  ওপর  নানা  রঙের  ফুল  হাওয়ায়  দুলছে।  যেন  সবুজ  চাদরের  ওপর  নানা  রঙের  ফুলের  কাজ  করা  হয়েছে।  কত  বর্গমাইল  এলাকা  নিয়ে  এই  এক  সৌন্দর্য   বিরাজ  করছে  জানি  না। এই  সুন্দর  সবুজ  কার্পেটের  মতো  মাঠের  ওপর  দিয়ে  ফুল  মাড়িয়ে  আমরা  চলেছি। ফুলগুলো  পায়ের  চাপে  নষ্ট  হচ্ছে।  তবে  এটাই  যে  পথ,  এ  ছাড়া  উপায়ই  বা  কী ?  একসাথে   কিন্তু  বহুদুরের  মাঠ  দেখা  যায়  না।  কারণ  এই  মাঠের  মতো  জায়গাটা  ধীরে  ধীরে  উপরে  উঠে,  আবার ধীরে ধীরে   নীচে  নেমেছে।  আবার  উঠেছে,  আবার  নেমেছে।  এই  মুহুর্তে  আমি  সঠিক  বলতে  পারবো  না,  ভ্যালি   অফ্  ফ্লাওয়ার্স  বেশি  সুন্দর,  না  এই  আলি  বুগিয়াল।  ঘন  সাদা  মেঘে  চারিদিক  আচ্ছন্ন  হয়ে  গেল।  দু’হাত  দুরের  জিনিস,  শত  চেষ্টা  করেও  দেখা  যাচ্ছে  না।  মধ্যে  মধ্যে  অবশ্য  আকাশ  কিছুটা  পরিস্কার  হচ্ছে,  তবে  তাকে  ঠিক  পরিস্কার  হওয়া  বলা  যায়  না।  বরং  একটু  পাতলা  হচ্ছে  বলা  বোধহয়  ঠিক  হবে।  প্রথমে হরিশ, কারণ ওই একমাত্র পথ চেনে, তারপরে আমি, আমার পিছনে কুমার, তার সাথে শীতাংশু। শীতাংশুর গায়ে একটা ফুলহাতা জামা, আর আমার একটা হাফহাতা জামা সম্বল। এদিকে এখানে অসম্ভব রকমের ঠান্ডা। তার উপর এই সর্বনাশা মেঘ আমাদের আধভেজা করে ছাড়ছে। হাতের লোমকুপ-এ সাদা সাদা, বিন্দু বিন্দু, জলের মতো কী একটা জমেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম বরফ। মেঘের জন্যই হয়তো মেঘের রঙের সাদা জলকণা, বিন্দু বিন্দু হয়ে জমছে। ঠান্ডা লাগছে ঠিকই, তবে আমার কিন্তু চারিদিকের এই সৌন্দর্য আর অদ্ভুত পরিবেশে, তেমন কোন কষ্ট হচ্ছে না। কুমার অনেক পিছিয়ে পড়েছে। আবার, আমার থেকে হরিশ ও শীতাংশু অনেক এগিয়ে গিয়েছে। রাস্তা প্রায় সমতল, ফলে এক ঠান্ডা আর উৎপাতে মেঘ ছাড়া, হাঁটায় কোন কষ্ট নেই। আমি খুব আস্তে আস্তে আশপাশের প্রত্যেকটা নতুন ফুলকে লক্ষ্য করতে করতে চলেছি। সামনে বা পিছনে আমার সঙ্গীদের, মেঘের জন্য আর দেখা যাচ্ছে না। দুর থেকে আমার উদ্দেশ্যে শীতাংশুর চিৎকার শুনলাম। আমিও চিৎকার করে সাড়া দিলাম। ও আবার চিৎকার করে আমাকে কোন দিক দিয়ে এগতে হবে নির্দেশ দিল। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি ওরা একটা উচু মতো জায়গায়, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। শীতাংশু আমাকে আরও তাড়াতাড়ি হাঁটতে বললো। ওর এই এক দোষ। ওকে দেখে মনে হয়, ও যেন হাঁটা প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে এসেছে, এবং প্রথম পুরস্কারই ওর একমাত্র লক্ষ্য। ওদের কাছাকাছি এসে দেখি আমার চেনা নীল আর বেগুনী রঙের গোল গোল একরকম ফুল। অনেকটা এখানকার বনবেগুন ফলের মতো আকার। এই ফুল ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্সে, জোয়ান মার্গারেট লেগি’র  কবরের পাশে অজস্র দেখেছি। আমি শীতাংশুকে বললাম ফুলটা ভালো করে দেখতে। ও খুব বিরক্তি প্রকাশ করে, ফুলের প্রতি কোনরকম আগ্রহ না দেখিয়ে, মুখ বেঁকিয়ে এগিয়ে চললো। আমি ভেবে পেলাম না যে, যে জায়গাটায় শুধু সবুজ মাঠ আর ফুলই একমাত্র দেখবার বস্তু, সেখানে সেটার প্রতি আগ্রহ না থাকলে, এত কষ্ট করে আসার প্রয়োজনটা কী। আর যখন আমরা আমাদের আজকের যাত্রার শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেই গেছি, তখন এত তাড়াতাড়ি করে, প্রায় ছুটে কোন দিকে না তাকিয়ে হাঁটার অর্থই বা কী? তবে কী শুধু হাঁটার জন্যই হাঁটা? আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। আমি ঐ ফুলগুলো কিছু তুলে পকেটে রেখে দিলাম। ওর হাঁটার গতি আরও বাড়লো। আমি কিন্তু আমার গতি অপরিবর্তিত রেখে, আগের মতোই চারিদিকের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রেখে এগিয়ে চললাম। আমি দেখতে এসেছি, দীর্ঘতম পথ দ্রুততম গতিতে হাঁটার কোন রেকর্ড গড়তে নয়। ওদের আর আমার মধ্যে ঘন সাদা মেঘ, সব সময়েই একটা প্রাচীর সৃষ্টি করে রেখেছে। পিছনে কুমার কত দুরে আছে জানি না। শীতাংশুর একটা বিরক্তিপূর্ণ চিৎকার শুনলাম। ও বোধহয় আমাকে ওর সাথে দৌড়ে পাল্লা দিতে আহ্বান জানাচ্ছে। আমি একই গতিতে এগিয়ে গিয়ে দেখি ওরা দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম কুমারকে অনেকক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, ওর জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো। ওরা দাঁড়িয়ে রইলো। আমি শীতাংশুকে তুলে আনা ফুলগুলো দেখালাম। ও জানালো ওর ফুল দেখার আগ্রহ ও ক্ষমতা, কোনটাই নেই। ঠান্ডায় ওর হাতদু’টো জমে গেছে। ও তাড়াতাড়ি গেষ্ট হাউসে যেতে চায়। হরিশের সঙ্গে আমরা দু’জনে গেষ্ট হাউসে চলে যেতেই পারি, কিন্তু আমাদের দু’জনের মতো কুমারও এপথ চেনে না। তাছাড়া ওর পিঠে অনেক মাল আছে। আমি বললাম ঠান্ডা আছে ঠিকই, তবে এত কষ্ট পাওয়ার মতো ঠান্ডা তো নয়। ও বেশ বিরক্ত হয়ে বললো ওর সারা শরীর ঠিক আছে, শুধু ওর হাত দু’টো অকেজো হয়ে গেছে। হাতের লাঠিটার ওপর হাত দু’টো ঘষে ঘষে, হাত দু’টোকে সতেজ রাখার চেষ্টা করছে। হঠাৎ অনেক দুরে কুমারকে দেখা গেল। ও একপাশে মালপত্র নামিয়ে বিশ্রাম নিতে বসলো। আমরা চিৎকার করে ওকে এগিয়ে আসতে বলে, নিজেরা হাঁটতে শুরু করলাম। এঁকেবেঁকে আরও অনেকক্ষণ হাঁটার পরে, আমরা মেঘের দেশের প্রাসাদপুরী, গেষ্ট হাউসে এসে পৌঁছলাম।

                                   

আলি বুগিয়ালের গেস্ট হাউস                             আলি বুগিয়াল গেস্ট হাউসের ভিতরের স্কেচ

দুর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল ফাঁকা মাঠের ওপর একটা পাকা বাড়ি। লোহাজঙ্গ গেষ্ট হাউসের মতো না হলেও, প্রায় ঐ জাতীয়ই বাংলো। রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে তার আসল রূপ দেখলাম। দুটো সিঁড়ি ভেঙ্গে অল্প চওড়া একটা বারান্দা মতো জায়গায় উঠতে হবে। বারান্দার সামনে ও বাঁপাশে দুটো দরজা। সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে বড় ঘর। বারান্দার ডানপাশে বড় ঘরের একমাত্র জানালা। বড় ঘরে ঢুকেই বাঁপাশে পর পর দুটো দরজা। প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকলে, একটা পরিত্যক্ত ঘর। ঘরটার দুটো দরজা। একটা বড় ঘরের মধ্যে, আর একটা বারান্দার বাঁপাশে। বড় ঘরের পরের দরজাটা দিয়ে ঢুকলে, দরজার সোজাসুজি একটু ওপরে একটা জানালা। জানালাটা ভাঙ্গা। আর এই ঘরটায় ঢুকে ডানপাশে বাইরের মাঠে বেরিয়ে যাবার জন্য একটা দরজা। এই ঘরটার মধ্যেখানে খানিকটা জায়গার মাটি কালো হয়ে আছে। কিছু পাইন গাছের পাতার মতো শুকনো পাতা পড়ে আছে। আর আছে ছোট্ট ছোট্ট গোটা দু’তিন শুকনো কাঠের  টুকরো, আর খানকয়েক পাথর। অর্থাৎ কোন সন্দেহ নেই যে এটা রান্নাঘর। জানালার ডানপাশের দেওয়ালে একটা তাক। বড় ঘরেও, একবারে ছোট, ভাঙ্গা ও পরিত্যক্ত হলেও দু’-দু’টো দেওয়াল তাক আছে। না, দেওয়াল তাক নয়, দেওয়াল আলমারি। তাক দু’টো ভাঙ্গা হলেও, পাল্লা দুটো আজও তাদের অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষ বহণ করছে। বড় ঘরটা বেডরুম। ঘরটায় তিনটে দরজা। বাঁপাশেরটা পরিত্যক্ত ঘরটায় যাবার জন্য। ডানপাশেরটা রান্নাঘরে যাবার। তৃতীয়টা বারান্দায় যাবার জন্য। একবারে বাঁদিকের দেওয়াল ঘেঁসে পর পর চারটে তক্তাপোশ। এত সুন্দর এদের গঠন, যে চারটে তক্তাপোশ পর পর রাখায়, দু’দিকের দেওয়ালের পাশে একচুল জায়গাও নেই। যেন ঘরের মাপ নিয়ে সমান মাপের চারটে তক্তাপোশ তৈরি করা হয়েছে। প্রথম তক্তাপোশটার বাঁদিকের দেওয়ালের ধারের দুটো পা-ই নেই। অর্থাৎ ডানদিকের দুটো পায়ের ওপর, ডানদিকের তিনটে তক্তাপোশের ধাক্কায় বা চাপে, বাঁদিকের দেওয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরেরটা অক্ষত, তবে ওটার ওপর শুয়ে নড়াচড়া করলে টলমল্ করে। যেন দু’দিকে দুটো তক্তাপোশ আছে বলে, ইচ্ছা থাকলেও জায়গার অভাবে ভেঙ্গে পড়তে পারছেনা। তার পাশেরটা বেশ শক্ত সমর্থ। কিন্তু ফ্রেমের অর্ধেকটায় কোন তক্তা নেই। আর একবারে ডান দিকেরটার যথারীতি বাঁ পা দুটোই বেঁচে আছে। ডান পা দুটো কোন কারণে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে অসুবিধা নেই। ডান পা দুটো না থাক্, ডানদিকে দেওয়াল ও বাঁদিকে তিন জাত ভাইতো এখনও বেঁচে আছে। তাদের জোরে এটা ভালভাবে বাঁ দিকেরটার মতোই দাঁড়িয়ে আছে। ব্যবস্থার কোন ত্রুটি নেই। এত সুন্দর একটা রাজপ্রাসাদ কিন্তু বিশাল মাঠের মাঝে একা দাঁড়িয়ে আছে। চারিদিকে যতদুর দৃষ্টি যায়, শুধু মাঠ আর মাঠ। অসম্ভব গতিতে হাওয়া বইছে। গোটা অঞ্চলটায় এই প্রাসাদটাই একমাত্র হাওয়ার গতিপথ রোধ করে, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে ঘরের ভিতর তীব্র ঝড়ের মতো হাওয়ার আওয়াজে মনে হচ্ছে, যেকোন সময় বাড়িটাকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে যাবে। কোন কেয়ার টেকারের ব্যবস্থা নেই। থাকলেও তার দেখা পেলাম না। ইলেকট্রিসিটি থাকার তো কোন প্রশ্নই ওঠে না। কয়েক বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে লোকজন থাকার সম্ভাবনাও নেই। শুধু আমরা পাঁচজন।

আমরা চারজন গেষ্ট হাউসের বেডরুমে এলাম। হাঁটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঠান্ডাটা যেন বেশি লাগছে। মালপত্র তক্তাপোশের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে, আমরা রান্নাঘরে এলাম। হরিশ ব্যাগ থেকে হাঁড়ি বার করে জল আনতে গেল। শীতাংশু জানালো ওর হাতে কোন জোর নেই, কোন সাড় নেই। ও ভয় পাচ্ছে, রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে হাত দু’টো না নষ্ট হয়ে যায়। আমরা রান্নাঘরের টুকরো কাঠগুলোয় আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করতে শুরু করলাম। যতবার পাইন জাতীয় শুকনো পাতাগুলোয় দেশলাই জ্বেলে আগুন লাগাই, চোখের পলক পড়ার আগেই, খুব দ্রুত খানিকটা জ্বলেই নিভে যাচ্ছে। অথচ প্রথমে এগুলোয় একটু আগুন ধরে না রাখতে পারলে, কাঠে আগুন লাগার কোন সম্ভাবনা নেই। সরু সরু পাতাগুলো চটপট্ আওয়াজ করে খুব দ্রুত খানিকটা পুড়েই নিভে যাচ্ছে। এদিকে বাইরে আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে আসছে। গঙ্গা এখনও ফেরে নি। হরিশ কত দুরে জল আনতে গেছে কে জানে। আমার সাথে শীতাংশুও আগুন জ্বালাতে আপ্রাণ চেষ্টা করলো। এ কাজটায় ওর উৎসাহে কোন খামতি নেই, প্রয়োজনটা ওরই। অথচ শুধু দেশলাই কাঠি নষ্ট করা ছাড়া, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। শীতাংশু বললো দেশলাই কাঠি নষ্ট না করে মোমবাতি বার করো। ব্যাগ থেকে মোমবাতি বার করে দেখি, তিনটে বড় মোমবাতির একটা একবারে গুঁড়ো হয়ে গেছে। আর দুটো ছোট ছোট টুকরো হয়ে, সুতোয় আটকে আছে। আমি একটা ছোট  টুকরো জ্বাললাম। ঘরে একটু আলো হলো বটে, আগুন কিন্তু জ্বালানো গেল না। মোমবাতির টুকরোটা এতই ছোট যে, শেষ হয়ে দপদপ্ করে নিভে গেল। শীতাংশু বললো আর একটা টুকরো জ্বালাতে। আমি রাজি হলাম না। বললাম কাল কী হবে? ও বললো কালকের কথা কালকে ভাবা যাবে। আমি বললাম “না, এখন থেকে কালকের কথা আজই ভাবতে হবে। কাল আমরা আরও উঁচু, আরও কষ্টকর, আরও ভয়ঙ্কর জায়গায় রাত কাটাবো। প্রায় দশ পনের মিনিট সময় কেটে গেল, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা বেশ কিছু দেশলাই কাঠি পোড়ানো ছাড়া, কাজের কাজ কিছুই করতে পারিনি। কুমার বুদ্ধি দিল স্টোভ জ্বালতে। বুদ্ধিটা মনে ধরলো, কেন এতক্ষণ মাথায় আসেনি জানি না। স্টোভে তেল ভরা হলো। জনতা স্টোভ। স্টোভের একবারে ভিতরে, সলতের ঠিক আগে, সব থেকে ছোট যে টিনের কভারটা থাকে, সেটা মালপত্রের চাপে কিভাবে বেঁকে গেছে। শীতাংশু ও আমি অনেক চেষ্টার পরে, মোটামুটি একটা অবস্থায় ওটাকে নিয়ে আসতে সক্ষম হলাম। ছোট কভারটার খোলা দিকটা, বেঁকে মাথার ক্লীপের মতো হয়ে গেছে। শীতাংশুর নখে যথেষ্ট জোর আছে, তবে এখন ও শুধু চেষ্টাই করলো, উপকার কিছু করতে পারলো না। কুমার স্টোভে তেল ভরে স্টোভ জ্বাললো। কিন্তু স্টোভের ভিতরের কভারটা বেঁকে যাবার জন্য, না অক্সিজেন এর অভাব জানি না, স্টোভ একবার দপ্ করে জ্বলে, তারপরেই নিভে যাবার মতো হয়। ঐ অবস্থায় কিছুক্ষণ থেকে, নিজে নিজেই আবার দপ্ করে জ্বলে ওঠে। অর্থাৎ স্টোভ কোন কাজে আসবে না। এ জায়গাটা বুগিয়াল, অর্থাৎ তৃণভুমি। সমুদ্রতল থেকে উচ্চতাও এগার হাজার ফুট। যতদুর দৃষ্টি যায়, একটা ছোট গাছও কোথাও নেই দেখে এসেছি। রান্নাঘরে দু’তিনটে সরু সরু কাঠের টুকরো, মানে কাঠও নেই। অর্থাৎ আজ রাতে হরিমটর চিবতে হবে। সঙ্গে যা শুকনো খাবার আছে, তা যদি আজ খাই, কাল কী হবে? আবার নতুন করে চেষ্টা শুরু হলো। এবার কুমার, পাইন পাতা ও কাঠের টুকরোগুলোর উপর খানিকটা কেরসিন তেল ঢেলে আগুন দিল। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। একটু পরে আগুন নিভে গেলে দেখা গেল, শুধু তেলটুকু আর পাতাগুলোই পুড়েছে। কাঠগুলো অক্ষত শরীরে ড্যাবড্যাব্ করে আমাদের দিকে চেয়ে যেন ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করছে। বিরক্তি প্রকাশ করছে, তাদের চন্দন বর্ণের গায়ের রঙ শ্যামবর্ণে পরিণত করায়। আবার তেল ঢালা হলো। এবারও শুধু তেল ও পাতাই পুড়লো। লাভের মধ্যে শুধু ঐ সাময়িক সময়ের জন্য হাতগুলো আগুনের ওপর মেলে রাখা গেল।

এর মধ্যে হরিশ ফিরে এল। এল এক নতুন সুসংবাদ নিয়ে—“বাবুজী হাঁড়ি ফুটো। সব জল পড়ে যাচ্ছে”। ও জানালো, কাছাকাছি কোথাও জল নেই। প্রায় এক কিলোমিটার দুর থেকে ও জল বয়ে নিয়ে আসছে। হাঁড়ির তলায় ফুটোর ওপর আঙ্গুল চেপে ধরে, ও অনেক কষ্টে জল নিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন ঐ জল ধরে রাখবো কোথায়, কী ভাবে? আগুন জ্বালার প্রচেষ্টা ছেড়ে জল নিয়ে পড়লাম। জল ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে বড় ঘরে গেলাম। দেখি তিনটে বেশ বড় বড় ফুটো, হাঁড়ির তলায় প্রায় একই অক্ষরেখায় অবস্থান করছেন। ঠিক করলাম ফুটোগুলোর ওপর, হাঁড়ির তলায় লিউকোপ্লাষ্টার লাগিয়ে দেব। অন্ধকারে ওটাকে খুঁজেপেতে বারও করলাম। কিন্তু ওটাকে কাটবো কী দিয়ে? শীতাংশু রান্নাঘরে বসে আছে ওর “কুবেরের ধন”, হাত আগলে। ওকে ডাকতে ও জানালো, ও এখন কিছু করতে পারবে না। ও এখন সাময়িক হাত স্যাঁকা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। দাঁত দিয়ে খানিকটা প্লাষ্টার ছিঁড়ে, হাঁড়ির তলায় ও হাঁড়ির জলের ভিতর হাত ডুবিয়ে, ফুটোগুলোর ওপর ভালো করে সেঁটে দিলাম। হাত সরাতেই ফুটোর জলের চাপ, হাঁড়ির পিছনের প্লাষ্টারটাকে মাটিতে ফেলে দিল। ওঃ, কী বিপদ। আগুন যদিও বা জ্বালা যায়, রান্না হবে কী দিয়ে?  জলও নেই, হাঁড়িও নেই। অথচ শীতাংশুর কোন চিন্তা নেই দেখে এত রাগ হচ্ছে বোঝাতে পারবো না। ওর ওপর আরও রাগ হচ্ছে কারণ হাঁড়িটা ওর বুদ্ধিতেই ও ওর দাদার কাছ থেকে নিয়ে এসেছে। আমি বার বার বারণ করেছিলাম। বলেছিলাম, এত কিছু মালপত্র যদি কলকাতা থেকে বয়ে নিয়ে যেতে পারি, একটা প্রেসার কুকার বা ডেকচিও বয়ে নিয়ে যেতে পারবো। কিন্তু লক্ষ্ণৌ-এ ও তার দাদার বাড়ি যাবেই, আর তখন ও পাত্রটা নিয়ে আসবে, এরকমই তার ইচ্ছা ছিল। আজ রাতে শুকনো খাবার খাওয়া মানে, আগামীকাল সারাদিন সারারাত এবং ফেরার পথে রাস্তায় অনাহারে কাটাতে হবে, এই সহজ কথাটা কী ও বুঝছে না। হাতে না হয় সাড় নেই, মাথায় কী হয়েছে? ও সেই একই ভাবে হাত সেঁকে যাচ্ছে। এবার আমি খুব বিরক্তির সঙ্গে ওকে ডাকলাম। ও খুব রেগে গিয়ে আমায় বললো, “তুমি কী আমায় বিশ্বাস করতে পারছো না যে, আমার হাতদুটো একদম কাজ করছে না”? সেই মুহুর্তে এই যুক্তি মেনে নিতে পারলাম না। কাজ করতে না পারুক, অবস্থার গুরুত্ব ও ভয়াবহতার ব্যাপারে ওর কোন চিন্তা নেই দেখে এত রাগ হলো যে ওকে বললাম “ওরকম হাত নিয়ে আস কেন”? শারীরিক কোন সাহায্য করতে না পারুক, জলটা ধরে রাখার একটা উপায়ও তো সে চিন্তা করতে পারে। কাছাকাছি কোথাও জলও নেই যে বলবো আবার জল নিয়ে এস। অথচ ওর কাছে এই বিপদেও হাত গরম করাটা বড় হলো? এই অবসরে ও গায়ে একটা ফুলহাতা সোয়েটারও চাপিয়ে নিয়েছে। একবার মনে হলো আমিও রান্নাঘরে গিয়ে বসে থাকি, যা হয় হোক। পরের মুহুর্তেই মনে হলো, তাতে শুধু ট্যুরটাই বানচাল হবে। বাড়ি ফিরে বলতে হবে খাবারের অভাবে আমরা রূপকুন্ড যেতে পারি নি। কাজেই নতুন উদ্যোগে চেষ্টা শুরু করলাম। হরিশকে বললাম একটু মাটি নিয়ে আসতে। ও মাটি নিয়ে আসলো। এখানকার মাটিতে খুব কাঁকড়। হাঁড়ির তলায় মোটা করে মাটি লাগিয়েও, জল পড়া বন্ধ করতে পারলাম না। সঙ্গে সাবান আছে। মনে হলো সাবানে কাজ হতে পারে। কিন্তু সেটা কোথায় আছে কে জানে। ঘরে আলো নেই, সঙ্গীও সাহায্য করবে না, তার ওপর বার বার হাঁড়ির তলা থেকে আঙ্গুল সরানোর জন্য অর্ধেক জল ইতিমধ্যেই পড়ে গেছে। তাই চটপট্ দুটো পলিথিন ব্যাগে জল ভরে ফেললাম। কিন্তু তারপর? শক্ত কোন পাত্র হলে না হয়, দেওয়ালে ঠেস্ দিয়ে রেখে দিতাম। কিন্তু পলিথিন ব্যাগে তো আর ঐ ভাবে জল রাখা সম্ভব নয়। অনেকক্ষণ হরিশ একটা আর আমি একটা ব্যাগ হাতে করে দাঁড়িয়ে থেকে, শেষে বিরক্ত হয়ে আবার হাঁড়িতে রেখে, রান্নাঘরে চলে এলাম। মাঝ থেকে বেডরুমের মেঝে পুরো জলে ভিজে গেল। এখনও কিন্তু আগুন জ্বালা সম্ভব হয় নি, শুধু তেলই পুড়েছে। শীতাংশু তার শারীরিক অবস্থার কথা বোঝাবার চেষ্টা করলো। আমার তখন ওর কথা শুনবার, বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। শীতাংশু ফুলহাতা মোটা সোয়েটার অনেকক্ষণ পরে নিয়েছে। আমি এখনও সেই হাফহাতা পাতলা জামা পরেই আছি। এখানে ঠান্ডা বেশ ভালো রকম। কিন্তু অন্ধকারে ব্যাগ থেকে খুঁজে গরম জামা বের করে আনার মতো মানসিক অবস্থা তখন আমার আর নেই। ভীষণ একটা অশান্তি ভোগ করছি। তবে কী সামান্য একটা হাঁড়ির জন্য আমাদের পিছু হটে যেতে হবে? শুধু হাঁড়িই বা কেন? কাল সকালে কোন ভাবে হাঁড়ির ফুটো বন্ধ করতে পারলেও, রান্না হবে কী ভাবে? স্টোভও যে কাজ করছে না। এখানেই কাঠ পাওয়া যায় না, “বগুয়াবাসা”য় কাঠ পাওয়ার আশা? না, আর ভাবতে পারছি না। শীতাংশু বারবার আমাকে সোয়েটার পরে নিতে বলছে। কিন্তু ঠান্ডা লাগার ভয়ের চেয়েও ফিরে যাবার ভয়, তখন আমাকে চারিদিক থেকে গ্রাস করে ফেলেছে। শীতাংশু আবার তার কষ্টের কথা আমায় জানালো। ব্যাগ থেকে রামের ছোট বোতলটা বার করে বাড়ির বাইরে মাঠে এসে, ওকে খানিকটা গলায় ঢালতে বললাম। ও বললো কী দিয়ে খাব? মেজাজ হারিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কী মাল খাবার চাট চাইছো? বাইরে তখন ভীষণ ঠান্ডা। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, তার সাথে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। ও আর কথা না বাড়িয়ে ছিপি খুলে খানিকটা গলায় ঢেলে দিল। এবার শুরু হলো তার কাশি। ভয় হলো, হার্টফেল করবে না তো? একটু অপেক্ষা করে ঘরে ফিরে এলাম। এমন সময় গঙ্গা ফিরে এল। ঘি পাওয়া যায় নি। শীতাংশুর ওপর রাগটা গঙ্গার ওপর বর্ষণ করলাম। ও শান্তভাবে বললো “বাবুজী কী হয়েছে”? একে একে সমস্ত অবস্থাটা খুলে বলে, শেষে বললাম “গঙ্গা আমরা যে না খেয়ে, ঠান্ডায় মরে যাব। স্টোভ জ্বলছে না, হাঁড়ি ফুটো, মোমবাতি নেই, তবে কী আমাদের ফিরে যেতে হবে”?

এখন পর্যন্ত গঙ্গা সম্বন্ধে নিয়ে আসা খারাপ ধারণাটা, ওর আর আমাদের মধ্যে একটা্ ব্যবধান সৃষ্টি করে রেখেছিল। গঙ্গা মাতাল, গঙ্গা সুযোগ বুঝে যাত্রীদের কাছ থেকে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করে, গঙ্গা চরিত্রহীন, গঙ্গার ব্যবহার খুব খারাপ, এইসব ধারণার বশে রাস্তায়, প্রথম থেকে শীতাংশু ও আমার ধারণা হয়েছিল, গঙ্গা সত্যিই একটা ঘুঘু লোক। ওর কাছ থেকে সব সময়েই খারাপ ব্যবহার পাওয়ার জন্য, ওর চাপে বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দেবার জন্য, আমরা যেন প্রস্তুত হয়েই ছিলাম। রাস্তায় ঐ দোকানদার আবার এই সব বিশেষণগুলো নতুন করে শুনিয়ে, দুরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া এতটা পথে তাকে এমন কিছু করতেও দেখিনি, যার জন্য ধারণাটা পাল্টাতে পারে। কথাগুলো গঙ্গাকে বলে খারাপ লাগছিল, কারণ হাঁড়ি ফুটো হওয়া, স্টোভ খারাপ হওয়া, মোমবাতি গুঁড়ো হয়ে যাওয়া, কোনটার জন্যই কিন্তু গঙ্গা দায়ী নয়।

কিন্তু এ কী? মাতাল, লম্পট, চরিত্রহীন গঙ্গা যে মুক্তিদূতের মতো ঘোষণা করলো —“বাবুজী, আমি যদি জিন্দা থাকি, তোমরাও জিন্দা থাকবে, ডরো মাৎ”। ও আবার অন্ধকারে ঐ ঠান্ডায় সম্ভবত ত্রাণসামগ্রী যোগাড়ে, আমাদের প্রাণ রক্ষার চেষ্টায় বেড়িয়ে গেল। আরও অনেকক্ষণ কাটলো আশায় আশায়। আরও তেল পুড়লো, আরও দেশলাই কাঠি ধ্বংস হলো, পুড়ে শেষ হলো রান্নাঘরের অবশিষ্ট পাইন পাতা। অপেক্ষা করে করে যখন ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছি, ঠিক তখনই চোখের সামনে এক দেবদূতকে দেখলাম। তিনি যেন স্বর্গ থেকে নেমে এসেছেন আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে, রূপকুন্ড পেড়িয়ে দেবস্থান হোমকুন্ডে আমাদের পৌঁছে দিতে। পরশুরামের মতো এক হাতে তাঁর কুঠার, অপর হাতে ভুসোকালি মাখা একটা ডেকচি। সত্যিই সেই মুহুর্তে গঙ্গাকে দেবদুত বলে মনে হয়েছে।

কয়েক মাসের জন্য যারা এত উচ্চতায় গরু মোষ চড়াতে আসে, তাদের কাছ থেকে দু’দিনের জন্য পাঁচ টাকা ভাড়ায়, গঙ্গা ডেকচিটা নিয়ে এসেছে। কথা হয়েছে পরশু রূপকুন্ড দেখে ফেরার পথে, ডেকচিটা ফেরৎ দেওয়া হবে। ডেকচিটার যা আকার, তাতে আমাদের পাঁচজনের খিচুড়ি হওয়া মুশকিল। তা হোক্, তবু চলে যাবে। আর ভাড়া? পাঁচ টাকা কেন পঞ্চাশ টাকা বললেও, আমি অন্তত আপত্তি করবো না, একথা শপথ করে বলতে পারি। গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম কুড়ুল কী কাজে লাগবে? গঙ্গা বললো কাঠ কাটতে হবে। কোথায় কাঠ? এই বিস্তীর্ণ বুগিয়ালে ও কাঠের সন্ধান কোথায় পেল? গঙ্গা জানলো রেষ্ট হাউসের পাশে এই ঘর মেরামতের জন্য গভর্ণমেন্ট কিছু স্লীপার এনে রেখেছে। তারই একটা সে কেটে ফেলবে। ওগুলো ঘরে ঢুকবার সময়েই দেখেছি। ওগুলো কেটে ব্যবহার করার কথা ভাবিও নি। আবার এক নতুন বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। আমি বললাম গভর্ণমেন্টের রেখে যাওয়া স্লীপার কাটলে কোন রকম ঝামেলা হবে না তো? ও জানালো এখানে দেখবার কেউ নেই। তাছাড়া আগে মানুষের প্রাণ, পরে গভর্ণমেন্ট। গঙ্গা এবার কুমারকে নিয়ে বাড়িটার ডানপাশে রাখা হাল্কা কাঠের কয়েকটা স্লীপারের একটাকে, কুড়ুল দিয়ে কাটতে শুরু করলো। গঙ্গার হাতের কাজও খুব সুন্দর। ওকে একজন দক্ষ শিল্পী বলা উচিৎ। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ও কাঠ কাটা শেষ করে ফেললো। কাঠ কাটারও কিছু রীতি আছে দেখলাম। কিছু কাঠ মোটা মোটা করে কাটা হয়েছে, কিছু খুব সরু সরু, আবার কিছু কাঠ দারুচিনির মতো পাতলা করে কেটে, কুড়ুলের ভোঁতা দিক দিয়ে পিটিয়ে থেঁতো মতো করা হলো। এ সবই শুধু তাড়াতাড়ি ও সহজে আগুন জ্বালাবার জন্য। আর সত্যি হলোও তাই। বোধহয় দুই কী তিন মিনিটের মধ্যে, গঙ্গা কাটা কাঠে আগুন জ্বেলে ফেললো। সামান্য কেরসিন তেল ঢেলে আগুন লাগিয়ে, মুখ দিয়ে যতটা সম্ভব হাওয়া টেনে খুব জোরে ফুঁ দিয়ে, অনায়াসে সে আগুন জ্বেলে ফেললো। আমি একটা শান্তির নিশ্বাস ফেলে বেডরুম থেকে সোয়েটার বার করে আনলাম। এবার আগুন ঘিরে আমরা পাঁচজন গোল হয়ে বসলাম। মনে হচ্ছে গঙ্গাকে একটা প্রণাম করি। গঙ্গা হাঁড়ির ভিতর পলিথিন ব্যাগে যতটা জল ছিল, ডেকচিতে ঢেলে কফি তৈরির আয়োজন করলো। হরিশ বা কুমার এতক্ষণ সময়ে যা করতে পারেনি, গঙ্গা কত অল্প সময়ে তা করে দিল।

গঙ্গার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা, আস্থা, অনেক বেশি বেড়ে গেল। বই-এ পড়া বীর সিং এর কথা মনে হলো। মনে হলো বীর সিং এর রক্ত যার শরীরে বইছে, সে কখনও খারাপ হতে পারে না। ওকে আমরা চিনতে পারিনি, অকারণে ভুল বুঝেছিলাম। গঙ্গাকে বললাম কলকাতায় তার সম্বন্ধে কতো খারাপ কথা শুনেছিলাম। গঙ্গা মাতাল, গঙ্গা জুয়া খেলে, গঙ্গা লোককে ঠকিয়ে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করে। এখন বুঝতে পারছি কতো ভূল ধারণা, তার সম্বন্ধে নিয়ে এখানে এসেছিলাম। এখন, এই মুহুর্তে তাকে নতুন করে চিনছি। আজকের রাতটা যদি বেঁচে থাকি, তবে সে শুধু গঙ্গার জন্যই।

গঙ্গা সব শুনে বললো “ওসব কথা ছেড়ে দাও বাবুজী, আমি কারো সাথে কখনও খারাপ ব্যবহার করিনি। জানি না কেন আমার নামে এত বদনাম রটেছে। সবই আমার ভাগ্য”। ওর কথাগুলো শুনে সত্যি এখন তার কথা ভেবে খুব খারাপ লাগছিল।

যাহোক্, কফি তৈরি হয়ে গেল। গঙ্গা আমাদের দু’জনকে দু’টো মগে কফি দিল। এই এক সমস্যা। পাঁচজন লোক, আর দু’টো মাত্র মগ। অবশ্য একটা বাটিও আছে। মোট তিনটে কফি খাবার পাত্র। আমি গঙ্গাকে বললাম তোমরা তিনজন আগে খাও, তারপর আমাদের দু’জনকে দেবে। শুধু যে ওদের খুশি করবার জন্যই ওকে বা কুলিদের আগে কফি খেতে বললাম, তা কিন্তু নয়। সেই মুহুর্তে এটার খুব প্রয়োজনও ছিল। এবার শীতাংশুও আমার মতোই ওদের, আগে খাবার জন্য বললো। গঙ্গা কিন্তু রাজি হলো না। ও বললো “তা হয়না। তোমাদের জন্যই কফি তৈরি করা, তোমরা না খেলে আমরা খেতে পারি না”। হরিশ ও কুমার ওর সাথে সুর ধরলো। আমি বললাম, গঙ্গা দু’বার ঠান্ডার মধ্যে বাইরে গেছে। হরিশকেও আবার জল আনতে যেতে হবে, কাজেই তোমাদের আগে শরীর গরম করার প্রয়োজন। আমরা একটু পরে খেলেও, কোন ক্ষতি হবে না। ওরা আরও কিছুক্ষণ না না বলে, শেষে আমাদের কথায় কফি খেতে শুরু করলো। ওরাও আমাদের ব্যবহারে খুব খুশি, আমরাও তাই। গঙ্গাকে বললাম আজ না হয় একটা ব্যবস্থা হলো, কাল কী হবে? আগামীকাল তো আমরা ১৪৬৫৫ ফুট উচ্চতার বগুয়াবাসার গুহায় থাকবো। ওখানে তো কিছুই পাওয়া যাবে না। গঙ্গা জানালো স্টোভ কোন কাজে আসবে না, কাজেই এখান থেকে কাঠ বয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাই একটা লোকের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি রাজি হলাম, রাজি না হয়ে উপায়ও নেই। গঙ্গা বললো কাল সকালে সে একটা লোক যোগাড় করে নেবে। ইতিমধ্যে আমাদেরও কফি খাওয়া শেষ। হরিশ ও কুমার গেল অন্ধকারে, ঠান্ডার মধ্যে আবার জল আনতে। গঙ্গা আগামীকালের জন্য কাঠ কাটতে বসলো। আমরা আগুনের ধারে বসে নিজেদের শরীর খানিকটা গরম করে নিলাম। গঙ্গা জানালো এই বাংলো মেরামতের জন্য গভর্ণমেন্ট টেন্ডার ডাকে। যে সব থেকে কম দর দিয়েছে, তাকে অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, আশ্চর্য হলাম পরের কথাটা শুনে। সে জানালো, যে অর্ডার পেয়েছে, সে এক’শ টাকা দর দিয়েছে। কাঠ এসে গেছে, এবার কাজ শুরু হবে। এক’শ টাকার গল্পটা সত্যি কিনা জানি না। তবে তাই যদি হয়, তবে এই টাকায় কী মেরামতির কাজ হবে, তা বোধহয় ভগবানও জানেন না। ঐ টেন্ডার প্রাপক ও গভর্ণমেন্ট হয়তো বলতে পারবে। এই এক’শ টাকার মধ্যে কাঠের দামও আছে কিনা জানি না। ক’টা স্লীপার এসেছিল কে জানে। আমরা তো একটা কেটে ফেললাম। হয়তো আগেও আমাদের মতো কোন দল প্রাণ বাঁচাতে স্লীপার কেটেছে। শীতাংশু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, আজকের রাতের কথা সে জীবনে ভুলবে না। ভুলবো না আমিও। এই অভিজ্ঞতা কী ভোলা যায়? গঙ্গাও বললো ইয়ে রাত ইয়াদ রহেগা। গঙ্গাকে বললাম তোমার কথাও ভুলবো না। গঙ্গা বললো সকলেই এই কথা বলে, কিন্তু বাড়ি ফিরে সব ভুলে যায়। সে এক ডাক্তারের কথা বললো। সকলকে ওষুধ দিয়ে সুস্থ রেখে, শেষে ডাক্তার নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। গঙ্গার সেবা যত্নে সে সুস্থ হয়ে ওঠে। সেও গঙ্গাকে বলেছিল যে সে গঙ্গাকে সারা জীবন মনে রাখবে, গঙ্গাকে চিঠি দেবে। গঙ্গার জন্যই সে এ যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেল। অথচ আজও গঙ্গা তার কোন চিঠি পায় নি। আমি বললাম আমি চিঠি দেব, ছবি পাঠাবো। হরিশ ও কুমার জল নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললো তাদের ছবিও পাঠাতে। বললাম গঙ্গার ঠিকানায় তাদের ছবিও অবশ্যই পাঠাবো।

আগুন জ্বালা হয়েছে, জল আনা হয়েছে, প্রয়োজনীয় কাঠ কাটাও হয়েছে। অতএব রাতের খাবার তৈরি করা যেতেই পারে। গঙ্গা ভাড়া করে আনা ডেকচিতে খিচুড়ি চাপালো। আমরা সবাই গোল হয়ে বসে গল্পগুজব করছি। ঘরটাতে অসম্ভব ধোঁয়া হয়ে যাওয়ায় চোখ খুলতে পারছি না। নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। মাঝে মাঝে ডানদিকের দরজাটা খুলে দেওয়া হচ্ছে। দমকা ঠান্ডা হাওয়ায় কিছুটা ধোঁয়া বার হয়ে যাচ্ছে। মোমবাতির খুব অভাব, তাই আলো জ্বালানো হয় নি। ওপরের জানালাটা খোলার প্রয়োজন হবে আগে জানলে, কলকাতা থেকে যাবার আগে ভালো ভালো পুষ্টিকর খাবার খেয়ে, ডন বৈঠক দিয়ে, শরীরটাকে তৈরি করে নিয়ে যেতাম। বেডরুমের  মেঝে, ফুটো  হাঁড়ির  কৃপায়  জলকাদায়   থৈথৈ  করছে।  নানারকম  অভিজ্ঞতার  কথা  আলোচনা হচ্ছে। গঙ্গা  একাই একশ’। ঐটুকু  ডেকচিতে  যতটা  সম্ভব  বেশি  খিচুড়ি  তৈরি  করতে  গিয়ে  সে হিমশিম খাচ্ছে। বিড়ি,  সিগারেট  খুব  দ্রুত  শেষ  হচ্ছে।  এর  মধ্যেও  শীতাংশুর  হাত  স্যাঁকা  অব্যাহত  আছে। যাহোক্‌  অবশেষে  খাবার  তৈরি  শেষ  হলো। ব্যাগ  থেকে  মাখন  বার   করে  দিলাম। গঙ্গা  আমাদের দু’জনকে  খেতে  দিয়ে  দিল। হরিশের  শরীর  খারাপ  লাগছে  বলে অনেকক্ষণ  আগেই  বেডরুমের  একবারে ডানদিকের  “পালঙ্কে”  গা  এলিয়ে  দিয়েছে।  শুধু  খাওয়ার  জন্য  এতক্ষণ  যুদ্ধ  করে,  তার  আর  খাওয়ার ইচ্ছা  বা  ক্ষমতা,  কোনটাই  নেই।  গঙ্গাকে  খিচুড়ি  কমিয়ে  দিতে  বললাম।  ও  ভাবলো  কম  পড়বে  ভেবে আমরা  খাচ্ছি  না।  ওকে  বললাম  আমার  খিদে  পায়  নি।  ও  একটু  কমিয়ে  দিল।  পরে  আবার  আমায় ও শীতাংশুকে  বড়  চামচের  এক  চামচ  করে  খিচুড়ি  দিয়ে  হেসে  বললো,  এটা  আমার  অনারে  নিন।  নিতে হলো,  খাওয়াও  শেষ  হলো।  উঠে  গিয়ে  এবার  হরিশকে  ডাকলাম।  ও  জানালো ওর শরীর খারাপ লাগছে, আজ রাতে  সে  কিছু  খাবে  না।  ওদের  কারো  শরীর  খারাপ  হলে,  আমাদের  যাওয়া  বন্ধ  হতে  পারে ভেবে,  ওকে  জোর  করে  তুলে ওষুধ  দিলাম।  গঙ্গাকে  বললাম  ওকে  খাবার  দিতে।  গঙ্গা  ও  কুমার  খাবার খেয়ে  নিল।  গঙ্গা  জানালো,  সে ও  কুমার  রান্নাঘরে  শোবে।  আমি  বললাম  ওখানে  ভীষণ  ধোঁয়া, তাছাড়া ঐটুকু  ঘর,  তার  আবার  অর্ধেকটায়  ছাই,  কাঠ  আর  আগুনে  ভর্তি।  গঙ্গা  জানালো  ওদের  কোন অসুবিধা  হবে না।  বুঝলাম  আমাদের  শুতে  অসুবিধা  হবে  ভেবে,  ওরা  রান্নাঘরে  শুতে  চাইছে।  গঙ্গাকে বললাম,  আমাদের কোন অসুবিধা হবে না। তাছাড়া মাটিতে ধোঁয়ার মধ্যে শুয়ে তাদের শরীর খারাপ হলে, আমাদেরই ভুগতে হবে। গঙ্গা আমাদের চিন্তা করতে বারণ করে, রান্নাঘরে কুমারকে নিয়ে, মাটিতে পলিথিন সিট্ পেতে শুয়ে পড়লো। ধোঁয়ায় আমাদের কষ্ট হবে বলে, দুই ঘরের মাঝখানের দরজাটা ভেজিয়েও দিল। আমরা পরদিন ভোরবেলা হাঁটা পথ ধরবো বলে, ব্যাগগুলো গুছিয়ে রাখলাম। পরদিন রাস্তায় খাবার জন্য গঙ্গা খিচুড়ি রান্নার শেষে, রুটি তৈরি করে রেখেছে। কিছু আলুসিদ্ধও রাখা হয়েছে। সবকিছু ঠিক করে রেখে আমরা স্লীপিংব্যাগে ঢুকে পড়লাম।

ঘরের একদম বাঁদিকের তক্তাপোশে শীতাংশু শুয়েছে। ওটার দেওয়ালের দিকের দুটো পা-ই নেই। ওকে সাবধান করে দিয়ে বললাম, “তক্তাপোশটা দেওয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো আছে, বেশি নড়াচড়া কোর না। সবসুদ্ধু ভেঙ্গে পড়বার সম্ভাবনা আছে”। তার পাশেরটায় আমি শুয়েছি। এটার চারটে পা যদিও আছে, তবু একটু নড়লেই, বিকট আওয়াজে সবার পাকা ঘুম ভেঙ্গে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। আমার পাশেরটার তক্তাপোশ নাম হলেও, অর্ধেক তক্তা নেই। কাজেই ওটায় শুলে মাঝখান দিয়ে গলে নীচে মেঝেতে পরে যাবার সম্ভাবনা কম নয়। একবারে ডানদিকে, বারান্দার দিকটায়, হরিশ শুয়েছে। একটু পরেই দেখলাম শীতাংশু ঘুমিয়ে পড়েছে। গঙ্গা ও কুমারের কথাবার্তাও অনেকক্ষণ বন্ধ হয়ে গেছে। হরিশ তো অনেক আগেই ঘুমিয়েছে। আমার পোড়া চোখে ঘুম নেই। নেই কারণ, সারাদিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, স্লীপিংব্যাগে ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর আওতার বাইরের পিসুর দল, সর্বপরি অবিরাম একটা টপ্ টপ্ করে শব্দ। টর্চ জ্বেলে কিসের শব্দ বুঝবার চেষ্টা করলাম। কোথাও কিছু দেখতে পেলাম না। পিসুগুলো বড়ই বিরক্ত করছে। হঠাৎ আমার বাঁ হাতটা ডান কাঁধের কাছে ঠেকতে চমকে উঠলাম। এত ভিজে কেন? উঠে বসে দেখি, বাইরে হাল্কা বৃষ্টি ও কুয়াশার জন্য ছাদ থেকে টপ্ টপ্ করে জল পড়ছে। তাহলে এতক্ষণ এরই শব্দ শুনছিলাম? সর্বনাশ, বাঁদিকের তক্তাপোশে যাবার উপায় নেই। দু’জনে শুলে ওটা ভাঙ্গতে বাধ্য। ডান দিকেরটার অর্ধেক তক্তা নেই। ওটাতে একটা শিশু শুতে পারে। কিন্তু আমি স্লীপিংব্যাগে ঢুকে, নীল আর্মস্ট্রং সেজে ওখানে শুলে? সকাল বেলা আমার মৃতদেহ নির্ঘাৎ নীচের মেঝে থেকে আবিস্কার করা হবে। তখন রূপকুন্ড না গিয়ে আমাকে কাঁটাপুকুর মর্গে যেতে হবে। অতএব কোন উপায় না থাকায়, একটু ডানদিকে সরে চোখ বুজে গায়ের ওপর জল পড়াকে মাথা পেতে মেনে নিয়ে, নিদ্রা দেবীর আরাধনা করতে শুরু করলাম।

আজ  বিশে  আগষ্ট।  ঘুম  ভাঙ্গলো  বেশ  ভোরে।  ঘরের  বাইরে  এসে  কালকের  দুর্যোগের  কথা  ভুলে  গেলাম।  ঝকঝকে  রোদ  উঠেছে।  বাঁহাতে  সম্ভবত  ত্রিশুল,  নন্দাদেবীর  শিরদেশ,  শুভ্র  পাগড়িতে  ঢাকা।  চারদিকে  সবুজ  ঘাসে,  স্নিগ্ধ  হাওয়ায়,  ছোট  ছোট  ফুলগুলো  দোল  খাচ্ছে।  সমস্ত  বাঁধাছাদা  করে,  আমরা  তৈরি  হয়ে  নিলাম।  গঙ্গা  কফি  তৈরি  করলো।  কালকের  ডেকচিওয়ালা এসে হাজির হলো। এসেই এপথের রীতি অনুযায়ী, এর অসুখ, তার মাথার ব্যথা, তার গলার ব্যথা, ইত্যাদি বলে ওষুধ চাইতে শুরু করে দিল। আমাদের সবকিছু প্যাক্ করা হয়ে গেছে। গঙ্গা অবস্থা বুঝে ওকে বললো, বাবুরা নওজোয়ান আদমী, তাই ওষুধের প্রয়োজন নেই বলে কোন ওষুধ সঙ্গে নিয়ে আসে নি। ডেকচিওয়ালা কফি, রুটি খেয়ে, বিড়ি টেনে চলে গেল। আমরা চারিধারের ছবি তুলে, মালপত্র নিয়ে, আলি বুগিয়ালকে নমস্কার করে বিদায় জানিয়ে, পথে নামলাম। জায়গাটা যে এত সুন্দর, গতকাল কুয়াশায় ও মেঘের উৎপাতে, বুঝতে পারি নি। চারিদিকে যত দুর চোখ যায়, শুধু মাঠ আর মাঠ। আস্তে আস্তে উপরে উঠে, আবার আস্তে আস্তে নীচে নামায়, কোন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, জায়গাটার বিশালত্ব বোঝা যায় না, দেখাও যায় না। পায়ে হাঁটার সরু পথ ধরে এঁকেবেঁকে প্রথমে আমি, আমার পিছনে শীতাংশু, কিছুটা দুরে হরিশ ও গঙ্গা। কুমারকে দেখা যাচ্ছে না।  ও অনেক  পিছিয়ে  পড়েছে। গঙ্গা  ঠিকই  বলেছিল,  ওর  মাল  বওয়ার  অভ্যাস  নেই।  আজ  এখন  পর্যন্ত  চড়াই  ভাঙ্গতে হয়নি। গঙ্গা অবশ্য  আগেই  বলেছিল  আলি বুগিয়াল থেকে প্রথমে চড়াই ভাঙ্গতে হবে না। অনেকক্ষণ হাঁটলাম, চারিদিকের দৃশ্যপট কিন্তু এতটুকু বদলায় নি। সেই এক মাঠ, এক ফুল, একই পায়ে হাঁটার পথ। শুধু এক ধরণের চিল জাতীয় পাখি, এখানে প্রচুর দেখতে পাচ্ছি। অসম্ভব ভীতু প্রকৃতির পাখিগুলোর কাছে যাওয়া যায় না। কিছুটা দুর থেকে মানুষ দেখেই উড়ে চলে যায়। একসাথে বেশিক্ষণ উড়তেও পারে না, বা বেশি উচুতেও উড়ে যেতে পারে না। উড়বার সময় ডানায় একটা বেশ জোরে আওয়াজ তুলে যায়, সঙ্গে একটা অদ্ভুত ডাক। এগুলো বেশিরভাগই পাথরের আড়ালে বসে আছে। ফলে আমরাও আগে থেকে এদের দেখতে পাচ্ছি না। পাখিগুলোও বোধহয় আমাদের আগে থেকে দেখতে পাচ্ছে না। হঠাৎ কাছে গিয়ে ঊপস্থিত হলে, আমাদের ভীষণ ভাবে চমকে দিয়ে, ডানায় বিশ্রী আওয়াজ তুলে, ডাকতে ডাকতে উড়ে গিয়ে একটু দুরেই বসে পড়ছে। গঙ্গা জানালো তার পিতাজীর সঙ্গে আসলে এসব পাখি শিকার করে খাওয়ার সুবিধা হয়, কারণ তার পিতাজীর সঙ্গে বন্দুক থাকে। হরিশ জানাল, সে একবার গঙ্গার পিতাজী,  বীর সিং এর সাথে কিছু টুরিষ্ট নিয়ে এসেছিল। বীর সিং একটা কস্তুরী হরিণ মেরেছিল। সবাই মিলে কিছু মাংস খেয়ে, বাকী মাংস বিরাট দামে বিক্রি করা হয়েছিল। কাদের বিক্রি করা হয়েছিল, সেইসব খদ্দেররা সেখানে কী করতে এসেছিল, হরিশই বলতে পারবে। যদিও আজ রাতে কস্তুরী মৃগ কেন, পাতি নেড়ি কুত্তা রান্না করলেও, আমার কিছুমাত্র আপত্তি নেই। তবু আমি বললাম, বীর সিং বাবার বয়সী, আর গঙ্গা বন্ধুর মতো। কাজেই বীর সিং এর সাথে গিয়ে শিকার করা পাখি বা হরিণ খাওয়ার থেকে, গঙ্গার সাথে গিয়ে, গঙ্গার হাতের খিচুড়ি খাওয়াতেই বেশি আনন্দ। গঙ্গা আমার কথা শুনে খুব খুশি হলো। আমরা এগিয়ে যেতে যেতে গঙ্গাকে বললাম, পাথর ছুড়ে একটা পাখিকে মারা যায় না? আমি নিজেও অনেকবার চেষ্টা করলাম। হরিশ ও গঙ্গাও চেষ্টা করে দেখলো। কিন্তু পাখিগুলোর পাখার জোর না থাকলেও, সৃষ্টিকর্তা বুদ্ধির জোর ভালোই দিয়েছেন।

এখানে চিরাচরিত একদিকে খাদ, একদিকে পাহাড়ের সারি দেখা যাচ্ছে না। ঠিক যেন একটা বিরাট মাঠের ঠিক মাঝখান দিয়ে  আমরা  হাঁটছি।  গতকাল  রাতের তিক্ত  অভিজ্ঞতার  কথা  গঙ্গা   বোধহয়  এখনও  ভুলতে পারে নি। তাই  মধ্যে  মধ্যেই  আমাদের  সতর্ক  করে  দিচ্ছে— “আজ  আমাদের  ১৪৫০০  ফুট  উচ্চতায় পাথুরে গুহায়  রাত কাটাতে  হবে।  খুব  ঠান্ডা,  তাই  যত  দেরিতে  সম্ভব  পৌঁছনোই  ভালো।  ওখানে  গিয়ে  খাওয়া দাওয়া  করেই  গুহায়  ঢুকে পড়বো”। গঙ্গা  শেষ  পর্যন্ত  আজকের   রাতের  প্রয়োজনীয়  কাঠ  নিজের  পিঠেই বেঁধে  নিয়েছে।  হাতে  অঢেল  সময়। “যত দেরীতে পৌঁছনো যায়, ততই  মঙ্গল”, এই  বেদবাক্য  মাথায়  রেখে গঙ্গার  কথা  মতো,  মাঝে  মাঝেই  রাস্তায়  বসছি, বাদাম, লজেন্স  চিবচ্ছি, আবার  নতুন  করে  হাঁটা  শুরু করছি।  কমলা লেবু স্বাদের গোল গোল লজেন্স আর বাদাম, একসাথে চিবলে যে কী অমৃতের স্বাদ পাওয়া যায়, কী বলবো।

এক সময় গঙ্গা জানালো, এই জায়গাটার নাম “বৈদিনী বুগিয়াল”। জিজ্ঞাসা করলাম থাকার জায়গাটা কোথায়? গঙ্গা জানালো, নীচে নেমে খানিকটা যেতে হবে। ভয় হলো গঙ্গা গতকাল রাতে বৈদিনী বুগিয়ালে না থেকে আলি বুগিয়ালে থাকতে বলেছিল, কারণ বৈদিনী থেকে চড়াই এর রাস্তা শুরু। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠেই চড়াই ভাঙ্গতে কষ্ট হবে। আমরা এখন সেই বৈদিনীতে হাজির। অর্থাৎ এবার শুরু হবে উতরাই হীন চড়াই এর রাস্তা। আরও খানিকটা পথ গিয়ে গঙ্গাকে একটু খাবার জল যোগাড় করতে বললাম। হরিশ জানালো একটু এগিয়েই জল পাওয়া যাবে। রাস্তার রূপ আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করেছে। বাঁদিকে সামান্য উচু পাহাড়, ডান দিকে মাঠ যেন অনেকটা নীচে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। ফুল এখনও আছে, তবে রঙের সংখ্যা সীমিত হয়ে গেছে।

আমরা এবার বসলাম। হরিশ গেল ওয়াটার বটল্ নিয়ে জল আনতে। সে ফিরে এল প্রায় মিনিট পনের বাদে। প্রাণ  ভরে ঠান্ডাজল খেয়ে উঠে পড়লাম। রাস্তা আস্তে আস্তে ওপরে উঠছে। আরও অনেকটা পথ নীরবে হাঁটলাম। মনে শুধু একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে— আগামীকাল সকাল কখন আসবে। বহু আকাঙ্খিত সুন্দরী রূপকুন্ডকে কাল সকালে দেখতে পাবো তো? দুরে বড় বড় পাথরের টুকরো চোখে পড়লো। গঙ্গা জানালো জায়গাটার নাম “পাথরনাচুনি”। নির্জন পাথরনাচুনিতে এসে, গঙ্গা, কুমার ও হরিশ, পিঠের মালপত্র নামিয়ে ফেললো। খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। পাথরের আড়ালে কাঠ জ্বালানো হলো। গঙ্গাকে বললাম কম করে কাঠ খরচ করতে। রাতে যেন  কাঠের অভাব না হয়। গঙ্গা জানালো, সঙ্গে যা কাঠ আছে, তাতে আজ রাতের খাবার ও কাল সকালের কফি তৈরি করতে কোন অসুবিধা হবে না। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, বগুয়াবাসায় জল পাওয়া যাবে তো? সে জানালো জল পাওয়া যাবে, তাছাড়া বরফও প্রচুর আছে। গঙ্গা কফি তৈরির আয়োজন করতে বসলো। আমি এদিক ওদিক একটু ঘুরে নিলাম। কিছু ছবিও তুললাম। কী রকম একটা আনন্দ ও উত্তেজনা বোধ করছি। মনে হচ্ছে এই বিশাল পৃথিবীতে আমরাই মাত্র পাঁচজন প্রাণী। রুটি,  আলুসিদ্ধ ও কফি দিয়ে লাঞ্চ শেষ করে, গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম, নাচুনিদের যেখানে কবর দেওয়া হয়েছিল, সেই গর্তগুলো দেখা যায় শুনেছি, সেগুলো কোথায়? গঙ্গা জানালো যাবার পথে পড়বে। জায়গাটার নাম “হুনিয়াথর” অর্থাৎ ভূতেদের স্থান।

পাথর নাচুনি।

খাওয়া দাওয়া সেরে, মালপত্র বেঁধে, নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করলাম। একটু এগিয়েই ডানদিকে একটা ছোট গর্ত দেখিয়ে গঙ্গা বললো, ওপর দিকে আরও আছে। এই গর্তগুলোই সেই নর্তকীদের কবর। সে আরও বললো “বাবুজী গর্তে কান পেতে শুনুন, আজও নর্তকীদের নুপুরের আওয়াজ শোনা যায়”। নর্তকী হওয়ার অপরাধে জীবন্ত মানুষ কবরে স্থান পাবার পরেও, কবরের ভিতর শুয়ে শুয়ে নাচার সখ হয় কিভাবে কে জানে। যাহোক্, তখন হয়তো নর্তকীদের ঘুমবার বা বিশ্রাম নেবার সময়, আমি কোন নুপুরের শব্দ শুনতে না পেয়েও, এমন একটা ভাব দেখালাম, যেন আমি নুপুরের আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। কোথায় যেন পড়েছিলাম, অনেকদিন আগে কোন এক রাজার রূপকুন্ডের পথে যাবার সময় এই জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সঙ্গে মন্ত্রী-সান্ত্রি, লোক-লশকর ও কিছু নর্তকী নিয়ে সেখানে যাওয়ায়, হিমালয়ের দেবী, নন্দাদেবী রুষ্ট হন। রাজা স্বপ্নে আদেশ পান যে, এই পথে নর্তকীদের নিয়ে গেলে তার বংশ লোপ পাবে, কাজেই তিনি যেন অবিলম্বে ফিরে যান। রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়ে সমস্ত নর্তকীদের ওখানে পাথর খুঁড়ে গর্ত করে জীবন্ত কবর দেন। তাই জায়গাটর নাম পাথরনাচুনি। কথিত আছে আজও ঐ গর্তে কান পাতলে নর্তকীদের পায়ের নুপুরের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। এই জায়গাটা হুনিয়াথর নামেও পরিচিত। হুনিয়া মানে ভুত আর থর মানে স্থান, অর্থাৎ ভুতেদের স্থান। পরে অবশ্য প্রায় এর মতোই অন্য গল্পও শুনেছিলাম। যাহোক্, গল্পের সেই নর্তকীদের জীবন্ত কবরস্থান দেখার সখ মিটিয়ে, উপরে ওঠার পর্ব শুরু হলো। গঙ্গা জানালো, এরপর “কৈলুবিনায়ক”। আমরা খুব আস্তে আস্তে হাঁটছি। এখনও ভরা বিকেল, কাজেই গঙ্গার কথামতো সন্ধ্যাবেলায় বগুয়াবাসা বোধহয় আর যাওয়া হলো না। ভালোই হলো বগুয়াবাসার শোভা দেখার জন্য হাতে অনেক সময় ও সূর্যালোক পাওয়া যাবে।

গঙ্গা,  হরিশ  ও  কুমার  অনেক  পিছিয়ে  পড়েছে। এখন  অবশ্য  পথ  না  চেনার  কোন  ভয়  নেই।  রাস্তা খাড়া  ওপর  দিকে  উঠেছে।  তবে  পাথরের  মধ্যে  দিয়ে  এঁকেবেঁকে  ওঠা  পথটাকে  চিনে  নিতে  কোন  কষ্ট হয়না।  প্রথমে  শীতাংশু,  ওর  ঠিক  পিছনে  আমি।  এক  সময়, একটু  বসে  আমরা  ঠিক  করলাম,  এবার একবারে  কৈলুবিনায়কের  সেই  গণেশ  মুর্তির  কাছে  গিয়ে,  তবে  বিশ্রাম  নেব।  বইতে  পড়া  গণেশের  কথা নিয়ে  আলোচনা,  ঠাট্টা,  তামাশা  করলাম। এই  কৈলুবিনায়ক  থেকেই  কোয়েলগঙ্গা  নদীর  জন্ম।  এখানে একটা পাথরের গণেশ মুর্তি  আছে।  এই  মুর্তিটিকে  নিয়ে  বেদীর  চারপাশে  ঘুরতে  না  পারলে,  রূপকুন্ড যাওয়া  নাকি  সার্থক  হয়  না।  বাংলার  একজন  বিখ্যাত, সর্বজন বিদিত, সর্বজন প্রিয় পর্বতারোহী, ও সুলেখকের রূপকুন্ড  ভ্রমণ  কাহিনীতে  পড়েছিলাম, ওনার  সঙ্গীসাথীরা  ঐখানে  আনন্দে  গণেশ  মুর্তি  নিয়ে লোফালুফি  খেলেছিলেন।  গণেশে  আমার  বিশ্বাস  বা  আস্থা,  কোনটাই   নেই। শীতাংশুর আছে কী না জানি না। তবে কৌতুহল, গণেশমুর্তি  তুলে  ঘোরাতে  না  পারলে  যখন  রূপকুন্ড  যাওয়াই   সার্থক হয় না,  পৌঁছনো যায়না, তখন  মুর্তি  না  তুলতে  পারার  সম্ভাবনাও,  একবারে  উড়িয়ে  দেওয়া  যায়  না।   তবে ঐসব  শ্রদ্ধেয় অভিযাত্রীরা  পাহাড়ী  পথে  যথেষ্ট অভিজ্ঞ  সন্দেহ   নেই,  কিন্তু  তাঁরা  সকলেই  নিশ্চয়  ব্যায়ামবীর   নন। কাজেই  তাঁরা  যাকে  নিয়ে  “খেলার  ছলে  ষষ্ঠীচরণ  হাতী   লোফেন  যখন  তখন”  এর  মতো  লোফালুফি খেলতে  পারেন,  আমরা,  ঊনত্রিশ- ত্রিশ  বছরের  যুবকেরা,  তাকে  তুলতে  পারবো  না?  ক্ষমতা  পরীক্ষার লোভেই  বোধহয়  হাঁটার  গতি  বেড়ে  গেল।

ঝিড়  ঝিড়  করে  বৃষ্টি  শুরু  হলো।  আরও  অনেকটা  পথ এঁকেবেঁকে উপরে  উঠে,  শেষে  শ্রীমান  গণেশের সাক্ষাৎ  মিললো। একটা  বেদীর  ওপরে প্রায় ফুট দু’এক উচু একটা কালো পাথরের তৈরি গণেশ মুর্তি হেলান দিয়ে দাঁড় করানো আছে। মুর্তিটির ফিনিশিং সত্যিই প্রশংসা করার মতো। মসৃন এবং নিখুঁত মুর্তিটার মাথার উপর অর্ধ বৃত্তাকার একটা পাথর রাখা আছে। দেখে মনে হলো কোন কালে ওটা চাকার মতো বৃত্তাকার  ছিল, এবং  মুর্তির  মাথার  পিছনে  শোভা পেত। মুর্তিটা ভালোই চওড়া, কিন্তু পাথরটা খুব বেশি মোটা নয়। শীতাংশু প্রথমে গতকালের হাতের অবস্থার কথা ভুলে, মুর্তিটাকে তুলবার চেষ্টা করলো। কিন্তু ও হয় মুর্তিটার ডানদিকটা একটু উচু করতে পারে, বাঁদিকটা বেদীর ওপরেই থেকে যায়। না হয় বাঁদিকটা একটু উচু করতে পারলেও, ডানদিকটা বেদীর ওপর থেকে তুলতে পারে না। মোটকথা শত চেষ্টাতেও মুর্তিটাকে নিয়ে পাক খাওয়া দুরে থাক, বেদী থেকে তুলতেই পারলো না। আমি ওকে আর চেষ্টা করতে বারণ করলাম। কারণ গণেশ অসন্তুষ্ট হলে, যায় আসে না, কিন্তু ওর ফিকব্যথা লাগলে, আমাদের উভয়েরই যথেষ্ট যায় আসবে। ও সরে এলে আমি নিজে একবার শক্তি পরীক্ষায় নামলাম। আমাকেও সেই একই অবস্থা থেকে রণে ভঙ্গ দিতে হলো। সুতরাং দু’জনেই বিফল মনোরথে চুপ করে বসে রইলাম। গণেশ মুর্তির সামনে একটা ব্রহ্মকমল, বোধহয় আগের যাত্রীরা পূজো দিয়ে গেছে। শীতাংশু আগে এই ফুল দেখে নি। ওকে তাই ফুলটা দেখিয়ে, ফুলটার পরিচয় দিলাম। ফুলটার গন্ধ কিন্তু খুব একটা তীব্র নয়। হেমকুন্ড সাহেবে দেখেছি এই ফুলের গন্ধ অতি তীব্র। ফুল দুরে থাক, এর ছোট্ট মুলো গাছের মতো গাছে বা পাতায় হাত দিলেও, হাতে অনেকক্ষণ একটা তীব্র শেয়াল কাঁটা ফুলের মতো গন্ধ থেকে যায়। কাছাকাছি কোথাও ব্রহ্মকমল ফুলের গাছ কিন্তু দেখা গেল না। অথচ বই-এ পড়েছি, এখানে প্রচুর ব্রহ্মকমল, হেমকমল, ও ফেনকমল ফুল হয়। ব্রহ্মকমল আগে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু হেমকমল ও ফেনকমল এর সাথে পরিচয় পর্বটা এবারেই সারবার কথা।

একে একে গঙ্গা, কুমার ও হরিশ এসে হাজির হলো। গঙ্গাকে আমাদের গণেশ মুর্তিটা তোলার ঘটনাটা বললাম। গঙ্গার এসব কুসংস্কারে, খুব একটা বিশ্বাস বা আস্থা আছে বলে মনে হলো না। তবু আমাদের খুশি করতে সে হরিশকে, গণেশ মুর্তিটা তুলে একবার পাক খেতে বললো। হরিশ মাল বওয়ার ব্যাপারে কুমারের থেকে অনেক পোক্ত। আমাদের ঐ বিশাল মালপত্রের বেশির ভাগটাই সে, দেবল থেকে পাহাড়ি রাস্তায়, ভয়ঙ্কর চড়াই উতরাই ভেঙ্গে বয়ে এনেছে। হরিশ বার কতক আমাদের মতো চেষ্টা করেও, গণেশ মুর্তি তুলতে সক্ষম হলো না। শেষে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কোনমতে ওটাকে তুলে, নিজেকে নিজে একপাক ঘুরে, দড়াম করে মুর্তিটাকে বেদীর ওপর নামিয়ে রাখলো। এখন বুঝতে পারছি, এই কুসংস্কারের জন্যই গণেশ মুর্তিটার নীচের দিকের অনেক জায়গায় চটা উঠে গেছে, একটু আধটু ভেঙ্গেও গেছে। মাথার পিছনের পূর্ণ বৃত্তাকার পাথরটাও, এই ভাবেই হয়তো দু’টুকরো হয়ে থাকতে পারে। সকলে জোর করে কোনমতে এটাকে তুলে আর রাখতে না পেরে, তাড়াতাড়ি কোনমতে বেদীতে নামিয়ে রাখতে গিয়ে, আঘাত লাগিয়ে নীচের অংশটায় চটা উঠিয়ে, ভেঙ্গে ফেলে, নষ্ট করে। অবশ্য মেসার্স পুস্তক লেখক অ্যান্ড পার্টির কথা আলাদা। হরিশের অবস্থা দেখে, আর ঐ বিখ্যাত পর্বতারোহীর চ্যালাদের বীরত্বের কাহিনী পড়ে, সুকুমার রায়ের “পালোয়ান” কবিতার প্রথম লাইনটা আবার একবার মনে হলো।

বৃষ্টি এখনও পড়ছে, সঙ্গে আবার রোদও উঠেছে। গঙ্গা এবার আমাদের এগিয়ে যেতে বললো। মালপত্র তুলে বগুয়াবাসার গুহার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। গঙ্গা জানালো, আর খুব বেশিক্ষণের পথ নয়, রাস্তাও সোজা, বিশেষ চড়াই উতরাই নেই। রাস্তার বাঁপাশে একটু ঢালু নীচু জমি। সেখানে অনেক পাথর পড়ে আছে। রাস্তার দু’পাশে, বিশেষ করে বাঁপাশে অজস্র ব্রহ্মকমল ফুটে আছে। অর্থাৎ এখান থেকেই ফুল তুলে গণেশকে দেওয়া হয়েছিল। এখানকার ব্রহ্মকমল গাছের একটা বৈশিষ্ট্য আছে। পাতাগুলো দেবদারু পাতার মতো পাশগুলো একটু কোঁচকানো, আর একটা গাছে একসাথে অনেকগুলো ফুল ফুটে আছে। অবশ্য গাছগুলো অনেকটা জায়গা নিয়ে ঝোপের মতো হয়ে আছে। কাজেই একটা গাছে একটার বেশি ফুল, নাও হতে পারে। কোন কোন ফুলের রঙ আবার একটু লালচে। গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোনটা ব্রহ্মকমল, কোনটা ফেনকমল, আর কোনটাই বা হেমকমল? ওর বলার ভঙ্গি দেখে বুঝলাম, ও নিজেও জানে না, বা এইসব ফুল নিয়ে ও কোনদিন মাথাও ঘামায় নি। আর সামান্য পথ হেঁটে এসে, আমরা সেই বগুয়াবাসার গুহার সামনে উপস্থিত হলাম। আগেই জেনেছি এটা শ্রী প্রনবানন্দ স্বামীজীর তৈরি। এটা আছে বলেই রূপকুন্ড দেখা সম্ভব। অন্তত আমাদের মতো অতি সাধারণ হতভাগ্য টেন্টহীনদের পক্ষে। এটাকে কিন্তু গুহা বললে ভুল হবে। একটা বড় পাথর একটু ঝুঁকে আছে। তার পাশগুলো পাথর সাজিয়ে একটা গুহা, বা ঘর মতো তৈরি করা হয়েছে। ওপরেও ফাঁক ফাঁক পাথর সাজানো। বৃষ্টি দুরে থাক্, বড় মাপের কুকুরও অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে। গুহার ভিতরে একরাশ পাতা ফেলা। আগের যাত্রীদের কাজ। এখানে যারা যখন আসে, তারা তাদের নিজেদের সুবিধা ও পছন্দ মতো ব্যবস্থা করে নেয়। আমাদের কপাল ভাল যে, পাতা ফেলে সম্ভবত বিছানা করার পর, সেরকম বৃষ্টি হয় নি। তা নাহলে পাতা পচে গোবর হয়ে থাকতো। হামাগুড়ি দিয়ে ঘরটায় ঢুকতে হবে। ঘরের ভিতরেও দাঁড়ানো যাবে না। বসে বা শুয়ে থাকতে হবে। ঘরটা একে একবারে ছোট, তা আবার একদিকে পাথরের একটা ঢাল থাকায়, আরও ছোট হয়ে গেছে। আমাদের পাঁচ জনের, তার মধ্যে আবার দু’জনের স্লীপিংব্যাগ থাকায়, রাতে থাকতে বেশ কষ্ট হবে।

                                    

“গণেশ মুর্তিটা অনেকটা এরকমই দেখতে ছিল”।                      কৈলুবিনায়ক যাবার পথে

বোধহয় রাতে না শুয়ে, বসেই কাটাতে হবে। তবে এটা যে পেয়েছি, তাতে আমরা ধন্য। এখানে ১৪৫০০ ফুট উচ্চতায় এই গুহা তো কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলকে হার মানায়। প্রণাম স্বামী প্রনবানন্দজী, আপনাকে শতকোটি প্রণাম। গুহাটার একটু নীচে বাঁদিকে পাথর সাজিয়ে, আর একটা ছোট ঘর তৈরি করা হয়েছে। এটা বোধহয় রান্নাঘর হিসাবেই ব্যবহৃত হয়। দু’দিকে দুটো দরজা। আমি আর শীতাংশু সময় নষ্ট না করে, বড় পলিথিন সিট্ পেতে বেডরুমের ছাদ মেরামত করতে শুরু করলাম। মোটামুটি যাহোক্ একটা থাকার মতো ব্যবস্থা হলো।

আসবার আগে কিটব্যাগে রাম ও ব্র্যান্ডির বোতল ছিল। হাঁটার তালে তালে ওগুলোর ছলাৎ ছলাৎ তরল আওয়াজ, গঙ্গা অবশ্যই শুনেছে। কিন্তু ব্যাগে তালা লাগানো থাকায়, ও ব্যাগ খুলে দেখার সুযোগ পায় নি। ওরা কিন্তু বুঝতে পেরেছে ব্যাগের মধ্যে কী থাকতে পারে। আমার খুব সামান্য পাহাড়ি অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এদের টাকা পয়সা বা ভালো খাবার দাবারের থেকে, দারু ও দাওয়াই এর প্রতি লোভ বা আকর্ষণ অনেক বেশি হয়। হরিশ বারকতক আমাকে জিজ্ঞাসাও করেছে, ব্যাগের ভিতর থেকে জলের আওয়াজ হচ্ছে কেন? আমি চটজলদি জবাব দিয়েছি– খাশির ওষুধ আছে। কিন্তু এ প্রসঙ্গ আর এগতে না দেওয়ায়, ও বারবার চুপ করে গেছে। আমার ভয় হচ্ছিল, ওরা না আবার খাশি হয়েছে বলে কাশির ওষুধ চেয়ে বসে। কিন্তু এতটা পথে, সেসব ঝামেলা হয় নি।

এখানে বেশ ঠান্ডা। ঠান্ডা হওয়াই স্বাভাবিক। হরিশ ও কুমার গেল জল আনতে। আমরা চারিদিক ঘুরে দেখলাম, ছবি তুললাম, বাদাম খেলাম। গঙ্গা রান্নাঘরে কাঠ সাজিয়ে, রাতের রান্নার ব্যবস্থা করতে শুরু করলো। এখনও যথেষ্ট আলো আছে। এখন সবে বিকেল, কিন্তু ওর ব্যস্ততা দেখে রাতে ঠান্ডার প্রকোপ সম্বন্ধে একটা ধারণা করতে পারছি। ভয় হলো বৃষ্টি না আসে, ভালোয় ভালোয় রাতটা কাটলে হয়। আমাদের মালপত্র সব রান্নাঘরেই রাখা হয়েছে। বেডরুমের মাটিতে একটা বড় পলিথিন সিট পেতে, কাঁধের ঝোলা ব্যাগ  ও  মালপত্র  ওখানে  গুছিয়ে  রেখে  এলাম।

বগুয়া বাসার গুহার স্কেচ

সঙ্গে  নিয়ে  আসা  সব  মোমবাতি  নষ্ট  হয়ে  গেছে।  গঙ্গা  বললো  কাঠ  জ্বালালে  মোমবাতির  প্রয়োজন  হবে না।  রান্নাঘরে  একটা  সামান্য  ব্যবহৃত  সরু  মোমবাতি  আবিস্কার  করা  হলো।  বোধহয়  আগের  কোন যাত্রী  ভুল  করে  ফেলে  গেছে,  বা  পরের  যাত্রীদের  প্রয়োজনে  রেখে  গেছে। আমরা  সোনার  খোঁজ  পেয়ে হৈচৈ  করে  উঠলাম।  গঙ্গা  বললো  ভগবানের  দান।  তথাস্তু, ভগবান  হোক,  আর  মানুষই  হোক,  ইচ্ছা করে  হোক  বা  অনিচ্ছায়,  ভুলে  হোক,  আমাদের  কাছে  এটা  যে  দান,  এটা  যে  ত্রাণ,  এ  বিষয়ে  সন্দেহের কোন  অবকাশ  নেই।  আমরা  এই  দান, মাথাপেতে গ্রহণ করে ধন্য হলাম। অনেকক্ষণ পরে কুমার ও হরিশ এক ডেকচি জল নিয়ে আসলো। গঙ্গা বলেছিল এখানে জলের কোন অভাব নেই, অথচ হরিশ ও কুমার জানালো, এখানে কাছে পিঠে কোথাও জল নেই। গঙ্গা  বললো  কাছে  পিঠে  কোথাও  জল  না  থাকলেও,  বরফের  অভাব হয়  না।  এবার  এখানে  সেরকম  বরফ  জমেনি  বা  জমে  থাকলেও,  এখন  নেই।  এরা  এক  একবার  এক একরকম  কথা  বলে।  আমরা  এ  বিষয়ে  কোন  কথা  বললাম  না।  ঐ  এক  ডেকচি  জলে  হাত  ধোয়া, খিচুড়ি  রান্না  ও  জল  খাওয়ার  কাজ  সারতে  হবে।  কাল  সকালের  কফি  তৈরির  জলও  রাখতে  হবে। আমার  আবার  রাতে শোবার আগে অনেকটা জল খেতে হয়। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত গঙ্গাকে বলতে বাধ্য হলাম “একে আমি জল একটু বেশি খাই, তার ওপর খিচুড়ি খেলে, জলের আরও বেশি প্রয়োজন হবে। তাই আমার জন্য একটু জল রেখ”। গঙ্গা কোন কথা না বলে আলু কেটে, ডেকচিতে ধরবে, এরকম মাপের চাল বসিয়ে দিল। ডেকচিটা আমাদের পাঁচজনের পক্ষে সত্যিই খুব ছোট। তবে আমি প্রায় না খেয়েই থাকি। শীতাংশুর খাওয়ার পরিমানও প্রায় একই রকম। ফলে, যাহোক্ করে কুলিয়ে যায়। গঙ্গাকে বললাম পাঁচজন অতটুকু গুহাতে শোয়া যাবে না, তার চেয়ে আজকের রাতটা গান গেয়ে, গল্প করে কাটানো যাক। গঙ্গা, হরিশ ও কুমার এক কথায় রাজি হয়ে গেল। অন্ধকার নেমে এসেছে। মনে হচ্ছে এই বিরাট পৃথিবীতে আমরাই বোধহয় পাঁচজন প্রাণী। ডেকচিতে খিচুড়ি ফুটছে। আমরা গঙ্গাকে ঘিরে বসে আছি।

গান শুরু করলাম। গান গেয়ে এত বড় রাত কাটানোর মধ্যে একটা বিরাট অসুবিধা দেখা দিল। রবীন্দ্র নাথ, হাজার কবিতা ও গান লিখে, মন মাতানো সুর দিয়ে, পৃথিবীর সেরা সম্মান “নোবেল” আনতে পারেন, নজরুল তাঁর গানের কথায় ও সুরে শহুরে বাবুদের পাগল করতে পারেন, স্বাধীনতা সংগ্রামী যুবকের রক্তে বিদ্রোহের ঝড় তুলতে পারেন, কিন্তু এঁরা এই নিস্তব্ধ পাহাড়পুরীতে মাত্র তিনজন লোককে খুশি করতে, আনন্দ দিতে, তাঁদের গান শুনে রাত জাগাতে অপারগ। অপরদিকে এই পাহাড়ি তিন যুবকের গান, আমাদের কিছুটা সময় হয়তো চুরি করতে পারে, কিন্তু সারা রাত জাগিয়ে রাখতে অক্ষম। ফলে এই মুহুর্তে প্রয়োজন এমন কিছু গানের, যা ওরা এবং আমরা, উভয়পক্ষই জানি বা শুনি। ফলে শুরু হলো “জয় জগদীশ হরে”, “গোবিন্দ বল হরি” গোছের কিছু ভক্তিমুলক গান, আর অতি প্রচারিত, সারা দেশে প্রচলিত, কিছু হিন্দী ফিলমি গান। কিন্তু তার স্টক্ আর আমাদের কতো? ফলে একই গান একাধিকবার গোটা, অর্ধেক, সিকি, যতটা জানি, গেয়েও একসময় থেমে গেল। রাত এখনও অনেক বাকি। শীতাংশু জানালো এখন রাত আটটাও বাজে নি। খিচুড়ি রান্না শেষ। খাওয়া দাওয়া সেরে, ভাগের অতি সামান্য পাওনা জলটুকু খেয়ে, আরাম করে বসলাম। গঙ্গা বাঁচিয়ে রাখা জলটা দিয়ে কফি তৈরি করতে বসলো। ওকে কিছু বলতে হয় না, ও আমাদের প্রয়োজন, আমাদের থেকেও বেশি বোঝে, তাই আর একবার হাত মিলিয়ে নিলাম। এক সময় সে পর্বও শেষ হলো। আর যে সময় কাটে না।

গতকাল রাতে আমার ভালো ঘুম হয় নি, তার ওপর আজকের সারা দিনের পরিশ্রম, ফলে শরীরটাকে একটু কাত করতে ইচ্ছা করছে। ঘুমও পাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে গান গেয়ে রাত জাগার পরিকল্পনা ত্যাগ করে, আমরা মালপত্র নিয়ে বেডরুমে ঢুকে, পলিথিন সিট দিয়ে দরজার মুখটা ঢেকে দিলাম। সবাই গুছিয়ে বসার পর সঙ্গে আনা অফিসের আর্মড গার্ড, কল্যানদার দেওয়া মিলিটারি “খাশির ওষুধ” এর বড় বোতলটা বার করে গঙ্গার হাতে দিয়ে দিলাম। আমাদের সঙ্গে স্লিপীংব্যাগ আছে, ওদের সেরকম গরম জামাও নেই, ঠান্ডাও ক্রমশঃ জাঁকিয়ে পড়ছে। ওরা খুব খুশি হলো। ওরা ভাবতেই পারছে না যে বাবুরা না চাইতেই, নিজেরা এক ফোঁটা না খেয়ে, গোটা একটা বড় রামের বোতল দিয়ে দিতে পারে। গঙ্গাই বেশি পরিমান খেয়ে ফেললো, হরিশও কিছু খেল। কুমার খায় না, তাই সামান্যই গলায় ঢাললো। গঙ্গা এবার আমাদের শুয়ে পড়তে বললো। সে তার কম্বলটা পেতে আমাদের শুতে বললো। আমরা জানালাম যে আমাদের স্লীপিংব্যাগ আছে, কাজেই ওর একমাত্র কম্বলটা নেওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। সে আবার আমাদের শুয়ে পড়তে বললো। শুতে পারলে তো ভালোই হতো, কিন্তু শোব কী করে? শুতে গেলে ওদের গায়ের ওপর পা দিয়ে শুতে হবে। গঙ্গা বোধহয় সেটা বুঝতে পেরেই বললো, আমাদের গায়ের ওপর পা তুলে দিন, আমাদের কোন অসুবিধা হবে না। আমরা কিন্তু এ প্রস্তাবে রাজি হলাম না। ফলে আবার সংগীত চর্চা শুরু হলো। আমি চুপ করে কাত হয়ে হাঁটু থেকে পা মুড়ে, আধ শোয়া হয়ে ছিলাম। গঙ্গা বললো, বাবু আপনার ঘুম পেয়েছে, শুয়ে পড়ুন। তা নাহলে শরীর খারাপ হবে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে, স্লীপিংব্যাগটা গায়ে চাপা দিলাম। শীতাংশু একটা শাল গায়ে দিয়ে পাথরে হেলান দিয়ে বসে আছে। তরল পদার্থ বোধহয় এতক্ষণে গঙ্গার শরীরে কাজ করতে শুরু করেছে। হঠাৎ গঙ্গা বললো, “হরিশ, ওরা বাবু, আমরা নোকর। আমাদের কাজ মনিবের সেবা করা”। বলেই আমার হান্টার শূ সমেত পা দু’টো ওর পেটের ওপর তুলে দিল। আমি তাড়াতাড়ি উঠে বসে, জুতো খুলে, স্লীপিংব্যাগে ভালো করে ঢুকে, স্লীপিংব্যাগের চেন টেনে শুয়ে পড়লাম। একসময় আমাদের কথা বলাও বন্ধ হলো। শীতাংশু বললো তার খুব ঠান্ডা লাগছে। আমি তাকে স্লীপিংব্যাগে ঢুকতে বললে, সে এতক্ষণে জানালো যে, সে ওটা রান্নাঘরে ফেলে এসেছে। সে ওটা নিয়ে আসার কথা বললে, আমি তাকে বারণ করলাম। কারণ এখন বদ্ধ গুহার থেকে বাইরে বেরলে, অবধারিত ঠান্ডা লাগবে। গঙ্গা, হরিশ ও কুমার ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই ওদের আর ডাকা হলো না। ঐটুকু জায়গাতে ওদের ডিঙ্গিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে, বাইরে যাওয়াও খুব অসুবিধাজনক। ফলে শীতাংশু ভালোভাবে শাল গায়ে দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় রইলো। আমারও যে ঘুম হলো তা নয়। তবে কখনও কিছুটা তন্দ্রা, কখনও জেগে উসখুস করে রাত কাটতে লাগলো। আমার অনেকক্ষণ খাওয়া হয়ে গেছে, এবার পিসুরা খাওয়া শুরু করলো।

আজ একুশে আগষ্ট, বহু আকাঙ্খিত সেই দিন। খুব ভোরে গঙ্গা আমাদের ডেকে দিল। কথা ছিল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটার মধ্যে আমি, শীতাংশু, গঙ্গা ও কুমার বেরিয়ে পড়বো। হরিশ বগুয়াবাসায় থাকবে, এবং কফি ও খাবারের ব্যবস্থা করবে। পাঁচটা বেজে গেছে। ঘুম ভাঙ্গতে দেখি পায়ের কাছে ওদের গায়ের ওপর পা তুলে নিশ্চিন্তে শুয়েছিলাম। উঠে পড়ে তৈরি হয়ে নিলাম। বাইরে কেমন ঠান্ডা বুঝতে পারছি না। সমস্ত মালপত্র জড় করে রেখে, কাঁধের ব্যাগ নিয়ে গুহার বাইরে এলাম।

আজ আমরা সেই কুন্ডের দর্শণ পাব, যার রূপের তুলনা নেই। যার রূপ দর্শণ করতে গিয়ে একদিন শ’য়ে শ’য়ে মানুষ একই জায়গায়, একসাথে প্রাণ দিয়েছিল। আজ আমাদের সেই রূপকুন্ড দেখার শুভদিন। গুহাটাকে ডানহাতে রেখে, সরু রাস্তা ধরে আমরা চারজন এগিয়ে গেলাম। গঙ্গা আগে আগে চলেছে। ওই একমাত্র পথ চেনে। রাস্তা খাড়া ওপরে উঠেছে। দুরে কোন একটা শৃঙ্গ, বরফের টুপি পরে ধ্যানে বসেছেন। পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে আমরা সেই দিকেই চললাম।  সকাল থেকে  এক  কাপ  চা  পর্যন্ত  পেটে  পড়ে  নি,  ফলে  মানসিক  আনন্দ যতই থাকুক,  শারীরিক  কষ্ট  যথেষ্টই   অনুভব  করছি।  গঙ্গা  একটা  স্যান্ডাকের  জুতো  পরে  এসেছিল।  জুতোটা পায়ে  ঠিক  মাপের  না  হওয়ার  জন্যই  হোক,  বা  ঐ  জুতো  পরে  এত  বেশি  হাঁটার  জন্যই  হোক,  ওর পায়ে  বিশাল  এক  ফোস্কা  পড়েছিল।  কাল  সারা  রাস্তা  ও  খুঁড়িয়ে  খুঁড়িয়ে  হেঁটেছে।  কাল  সন্ধায়  ওকে ওষুধ  দিয়ে  ব্যান্ড-এড্  লাগাতে  বললে,  ও  খুব  বাহাদুরি  দেখিয়ে  বললো  “বাবু,  ওসব  জিনিস  আপনাদের মতো  শহুরে  সাহেবদের  জন্য,  আমাদের  ওষুধ  হচ্ছে  এই”।  কথাটা  বলেই,  স্যান্ডাকের  জুতো  সমেত  পা দিয়ে  ফোস্কাটা  গেলে  দিল।  আজ  আর  পুরানো  জুতো  পরার   অবস্থায়  না  থাকায়,  শক্ত  জুতো  রেখে শীতাংশুর  হাওয়াই  চটি  পরে  রূপকুন্ডে  চলেছে।

আর  কিছুটা  পথ  হাঁটার  পর  এল  প্রথম  গ্লেসিয়ারটা।  ভ্যালি অফ্  ফ্লাওয়ার্স  যাওয়ার  সময়,  এর  থেকে  অনেক  চওড়া  গ্লেসিয়ার  পার  হতে  হয়েছিল, কিন্তু  সেটা  ছিল প্রায়  সমতল  মাঠের  মতো।  তার  ওপর  দিয়ে  হাঁটতে  কোন  অসুবিধা  হয়  নি।  কিন্তু  বসুধারাতে বরফ  ভেঙ্গে  খানিকটা  ওপরে  উঠে  বুঝেছিলাম,  বরফের  ওপর  দিয়ে  হেঁটে  যাওয়া,  বিশেষ  করে  ওপরে  ওঠা  কী  রকম  শক্ত  কাজ।  আজকের  এই  গ্লেসিয়ারটা খুব কম চওড়া, হয়তো কুড়ি-পঁচিশ ফুট হবে। কিন্তু এই   গ্লেসিয়ারটা  পার  হওয়ার  মধ্যে বিপদের  ঝুঁকি  প্রচন্ড।  ওপর  থেকে  সোজা  রাস্তা  ক্রস্  করে  ওটা  নীচের  দিকে  নেমে  গেছে।  একবারে শক্ত  বরফকে  আড়াআড়ি  ভাবে  পার  হয়ে,  আমাদের  আবার  রাস্তায়  পড়তে  হবে।  গ্লেসিয়ারটা  কিন্তু খুব ওপর  থেকে  আরম্ভ  হয়নি।  তবে  একবারে  সোজা  কত  নীচু  পর্যন্ত  নেমে  গেছে,  বলতে  পারবো  না। ওটা পার  হওয়ার  সময়  যদি  কোনভাবে  পা  পিছলে  যায়,  তাহলে  ধরবার  মতো  একটা  ঘাসও  নেই। একবারে  গড়িয়ে  কত  নীচে  চলে  যেতে  হবে  জানি  না।  সঙ্গে  স্পাইক্  লাগানো  লাঠিও  নেই।  হাতে  অতি সাধারণ  একটা  বাঁশের লাঠি,  তা  দিয়ে  হুঁকো  খাওয়া  যায়  জানি,  কিন্তু  গ্লেসিয়ারে  পিছলে  পড়লে  কোন কাজে  আসবে  না,  এটা  নিশ্চিত। গঙ্গা হাওয়াই চটি পরে আছে। তাই কুমার গ্লেসিয়ারটা পার হওয়ার দায়িত্বটা নিয়েছে। কুমার প্রথমে তার হান্টার শূ এর পিছন দিয়ে, অর্থাৎ গোড়ালির কাছ দিয়ে লাথি মেরে ঠুকে ঠুকে, বরফের ওপর একটা ছোট গর্ত মতো তৈরি করছে। সেই গর্তে পা দিয়ে গঙ্গা, তার পিছনে আমি, আমার পিছনে শীতাংশু যাচ্ছে। কুমারের তৈরি গর্তে কুমার দাঁড়িয়ে, ওর সামনে আর একটা নতুন গর্ত তৈরি করে

বিপজ্জনক সেই গ্লেসিয়ারের স্কেচ।

এগিয়ে যাচ্ছে। তখন গঙ্গা প্রথম গর্তে পা রেখে দ্বিতীয় গর্তের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। গঙ্গা যখন সামনের গর্তে পা রেখে এগিয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণে পিছনের গর্ত প্রায় ভরাট হয়ে, আগের চেহারায় রুপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমার পক্ষে পার হওয়া বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমার পরে শীতাংশুর জন্য আর অপেক্ষা না করে, পুরোপুরি আগের রূপ নিয়ে নিচ্ছে। ছোট গর্তে পায়ের গোড়ালি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, আগের গর্ত থেকে গঙ্গা পা ওঠালে, আমি সেই গর্তে পা দিয়ে এগিয়ে যাব। শীতাংশু আর এইভাবে ঝুঁকি নিয়ে না এগিয়ে, ফিরে গিয়ে পাথর বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠে, বরফ যেখান থেকে আরম্ভ হয়েছে, তার ওপর দিয়ে পার হয়ে, আবার শক্ত পাথর ধরে ধরে, কোনমতে নীচে রাস্তায় নেমে এল। ওকে দেখে আমারও তাই ইচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু আমি গ্লেসিয়ারের প্রায় মাঝামাঝি চলে এসেছি। পিছনের সব গর্ত বুঁজে গেছে। আমি এক পায়ের গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছি, তাই পিছন ফেরাই মুশকিল। তার ওপর বরফ ভেঙ্গে গর্ত করে পিছনে যাওয়ার থেকে, সামনে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। গঙ্গা আমার অবস্থা দেখে তার হাত ধরতে বললো। সে সামনের দিকে মুখ করে পিছন দিকে হাত বাড়ালো। ওর হাত ধরলাম। ও খুব শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরলো। কিন্তু ঐভাবে হাঁটতে আরও অসুবিধা বোধ করলাম। তাছাড়া ও যতই অভিজ্ঞ ও দক্ষ হোক, ও হাওয়াই চটি পরে আছে। ওর পা কোন ভাবে পিছলোলে, ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে নীচে চলে যাবে। তাই ওকে হাত ছেড়ে দিতে বলে, কোনক্রমে বরফ পার হয়ে, আবার রাস্তায় এসে হাঁফ ছাড়লাম। একটু এগিয়েই আবার ঐ একই রকমের গ্লেসিয়ার। পার্থক্য শুধু এবারেরটা কত উচু থেকে নেমে এসেছে বোঝা যাচ্ছে না। ফলে এবারে আর শীতাংশু আগের বুদ্ধিটা কাজে লাগাতে পারলো না। তবে এবার আমরা কিছুটা অভিজ্ঞ। আস্তে আস্তে গতবারের কায়দায় গ্লেসিয়ারটা পার হয়ে গেলাম। গঙ্গা হাওয়াই চটি পরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দিব্বি পার হয়ে গেল।

এরপরেই শুরু হলো তীব্র চড়াই। আস্তে আস্তে পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে ওপরে উঠছি। আরও অনেকক্ষণ হাঁটলাম। এখন পর্যন্ত রাস্তাও কম হাঁটা হলো না। কিন্তু গঙ্গার হিসাব মতো সাত কিলোমিটার পথ এখনও শেষ করতে পারলাম না। হঠাৎ আমার কীরকম শ্বাস কষ্ট হতে শুরু করলো। হাঁটতে গেলে বুকের বাঁ দিকটায় একটা যন্ত্রণা অনুভব করছি। বুকের ভিতর হৃতপিন্ড যেন অসম্ভব দ্রুত গতিতে চলছে। মনে হচ্ছে বুকের ভিতর হৃতপিন্ড যেখানে থাকে, সেই জায়গাটায় যেন কী একটা লাফাচ্ছে। এসব রাস্তায় একটু বসে বা দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিলে, আবার আগের শক্তি ফিরে পাওয়া যায়, সুস্থ বোধ হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাও হচ্ছে না। অনেকক্ষণ বসে থেকে বিশ্রাম নিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে, আবার সেই কষ্টটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। গঙ্গা আমাকে উৎসাহ দিতে জানালো, সামনের চুড়াটা পার হলেই রূপকুন্ডের দেখা মিলবে। অথচ আমি আর এগিয়ে যেতে পারছি না। হঠাৎ মনে হলো হার্টে কোন গোলমাল হয় নি তো? হার্ট অ্যাটাক হবে না তো? গঙ্গা বোধহয় আমার মনের কথা, আমার অসহায় অবস্থার কথা, আমার কষ্টটা বুঝতে পেরেছে। সে বললো বিশ্রাম নিয়ে খুব আস্তে আস্তে এগতে। বিশ্রাম নিলাম, কিন্তু এগবার ক্ষমতা ফিরে পেলাম না। প্রায় ষোল হাজার ফুট উচ্চতায় আমার এখন যদি কিছু হয়, এরা কী করবে? শীতাংশু দাঁড়িয়ে পড়লো। আ্মাকে বললো একটু বসে নিতে। ওর কথাটা যেন কীরকম শোনালো। ওর কথায় ভয়, না বিরক্তি মেশানো, ঠিক বুঝলাম না। আমি বেশ বুঝতে পারছি, আমার আর রূপকুন্ড দেখা হলো না। ভাবলাম ওদের বলি, তোমরা চলে যাও, আমি এখানে  বসে অপেক্ষা করছি। কিন্তু রূপকুন্ডের দোরগোড়ায় এসে, সে কথা মুখ ফুটে বলতে পারলাম না। গঙ্গা বললো, “হাতে অনেক সময় আছে, তাড়াতাড়ি করার প্রয়োজন নেই। প্রেমসে হাঁটো”। আমার তখন   প্রেম  বার  হচ্ছে। আমি  শীতাংশুকে  বললাম,  তোমরা  এগিয়ে  যাও।   আমি একটু  বিশ্রাম  নিয়ে,  আস্তে  আস্তে  যদি  যেতে পারি  তো  যাব।  তোমরা  দেখে  এস।  ওরা  কিছুক্ষণ  দাঁড়িয়ে  থেকে, সামনের  পথ  ধরলো। আমাকে  কী  কষ্টে  যে হাঁটতে  হচ্ছে,  বোঝাতে  পারবো  না।  কোনক্রমে  লাঠিতে  ভর  দিয়ে  আস্তে  আস্তে, এক  পা  এক  পা  করে  ওপরে  উঠছি। ওরা  তখন  অনেকটা  ওপরে  উঠে  গেছে।  আমি  আবার  বসে  পড়লাম।  ওরা  আর  একটু  পথ  ওপরে  উঠেই,  দাঁড়িয়ে পড়লো।  শীতাংশু  চিৎকার  করে  জানালো,  রূপকুন্ড  দেখা  যাচ্ছে।  নতুন  উদ্যমে আস্তে আস্তে, অনেকটা সময় নিয়ে ওপরে উঠে এলাম। এখান থেকে ছোট্ট কুন্ডটা দেখা যাচ্ছে বটে, তবে তার সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যাচ্ছে না। আজ এত কষ্ট কেন ভোগ করলাম জানি না। অতীতে কখনও এই অবস্থায় পড়তে হয় নি। কিন্তু কষ্টের শেষ প্রান্তে এসেই যেন সমস্ত কষ্ট লাঘব হলো। তরতর করে অনেকটা নীচে নেমে এসে, কুন্ডের পারে দাঁড়ালাম। কুন্ডটাকে একটা গোলাকার নীল জলের ডোবা বললেই ঠিক ব্যাখ্যা করা হবে। ডানদিকটা সম্পূর্ণ বরফে ঢাকা, অপর পারটা, অর্থাৎ আমাদের ঠিক সামনের দিকটা পূর্ব দিক। ওদিকের পাহাড়ের চুড়াটা অনেকটা উচু। ফলে হাল্কা রোদ উঠলেও, কুন্ডে তার ছিটেফোঁটাও পড়ছে না। এখন পৌনে আটটা বাজে। শীতাংশু এত কষ্টের পরে রূপকুন্ডের এই রূপ দেখে, একবারে ভেঙ্গে পড়েছে।

কুন্ডের পারে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, কিছু পাথর সাজিয়ে একটা বেদী মতো তৈরি করা, তার উপর অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি একটা  বড়  প্লেট্,  একটা  লোহার  শিকে  বাঁধা  অবস্থায়  দাঁড়  করানো  আছে।  আরও অনেক  এই  জাতীয়  প্লেট,  হেলান  দিয়ে  দাঁড়  করানো  ও  ইতস্তত  ছড়ানো  পড়ে  আছে।  এগুলোতে  আগে যারা  এখানে  এসেছে,  তাদের  নাম,  ঠিকানা  খোদাই  করা। এখানে আসবার সময় তৈরি করে  নিয়ে  আসা হয়েছে।  বেদীর  ওপরে  একটা  পলিথিন  পেপারে  মোড়া  একটা  ছোট্ট  ডায়েরি,  তাতে  কয়েকজন  বাঙালির নাম,  ও   তাদের  গাইডের  নাম  লেখা  আছে।  এদের  মধ্যেই  একজন,  লক্ষ্ণৌ  আসার  সময়  ট্রেনে  অনিতা নামে  মেয়েটার  মুখে  শোনা  তার  পরিচিত  ছেলেটা।  নাথু  সিং  অসুস্থ  হওয়ায়,  অপর  একজন  গাইড এদের  দলকে  সঙ্গে  নিয়ে  এসেছে।  সঙ্গে  অপর  একটা  দলও  এসেছে।  আমরাও  ঐ  ডায়েরিতেই  আমাদের নাম,  ঠিকানা  ও  গাইড-কুলিদের   নাম  লিখে,  আবার  পলিথিন  পেপারে  মুড়ে, বেদীর  ওপর  চাপা  দিয়ে রেখে  দিলাম।  অ্যালুমিনিয়ামের  প্লেটগুলোয়,  বেশিরভাগই  পশ্চিম বঙ্গ  বাসীর  নাম।

শীতাংশু  জানালো, এত  কষ্ট  করে  এতদুর  এসে,  রূপকুন্ডের  এই  রূপ  দেখে, তার আর অন্য কোথাও যাবার ইচ্ছা নেই। সে এখান থেকে সোজা বাড়ি ফিরে যাবে। অনেক আশা নিয়ে এসে রূপকুন্ডের এই রূপ দেখে, আমার মনও খুব খারাপ হয়ে গেছে। তবে আমি নিশ্চিত, এখান থেকে কথামতো তিন তাল দেখে আমরা পিন্ডারী গ্লেসিয়ার যাবই। শীতাংশুর  এই  বিমর্ষভাব  ততক্ষণ  আর  থাকবে  না।  ছোট  একটা  ব্রান্ডির  বোতলে,  গঙ্গাকে  কুন্ড  থেকে  জল  ভরে  আনতে  বললাম।  গঙ্গা  কুন্ড  থেকে  জল  ভরে  এনে  দিল।  শীতাংশু  গঙ্গাকে  জিজ্ঞাসা  করলো,  তার  ভীষণ  জল  পিপাসা  পেয়েছে,  এই  জল  খাওয়া  যাবে  কী না।  গঙ্গা  জানলো,  এই  জল  খেলে  নির্ঘাত  অসুখ  করবে।  তাই  জল  খাওয়ার  পরিকল্পনা  ত্যাগ  করে  ও  নীচে  কুন্ডের  কাছে,  একবারে  জলের  কাছে  নেমে  গেল।

আমি  ডানদিক  দিয়ে  কিছুটা  নেমেই,  একটা  সাদা  মতো  কী  যেন  আবিস্কার  করলাম।  তুলে  দেখি, একটা নরকঙ্কালের  মুন্ডু।  সাদা  ধবধবে,  দাঁতগুলো  পর্যন্ত  অবিকৃত  আছে।  এতক্ষণ  নানা  সমস্যায়  রূপকুন্ডের ধারে  হাজার  কঙ্কালের  কথা  ভুলেই  গেছিলাম। রূপকুন্ডের বুকে শয়ে শয়ে কঙ্কাল, বা কঙ্কালের হাড়গোড় দেখতে পাওয়ার কারণ হিসাবে দু’রকম মত শোনা যায়। ১)প্রাকৃতিক ২)ধর্মীয়।

১) সম্ভবত বহু বছর আগে কোন ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিতে যাওয়ার সময় কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে শয়ে শয়ে মানুয় মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এর বহু বছর পরে, এক ইংরেজ সাহেব জায়গাটায় গিয়ে অনেক মৃতদেহ ও কঙ্কাল দেখতে পান। ঘটনার কারণ ও সময়কাল বিশ্লেষণের জন্য একটি মহিলার অবিকৃত মৃতদেহ তিনি সঙ্গের কুলিদের নিয়ে আসতে বলেন। কুলিরা রাজি না হয়ে ভয়ে পালিয়ে আসতে চাইলে, তিনি বন্দুক তুলে ভয় দেখিয়ে মৃতদেহটি নিয়ে আসেন। বলতে লজ্জা করছে, মৃত্যুর কারণ ও সময় আমার জানার সুযোগ হয় নি।

২) হিমালয়ের দেবী, নন্দাদেবী রুষ্ট হওয়ায়, ঐ অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হাজার হাজার মানুষের একসাথে মৃত্যু হয়।

কারণ যাই হোক না কেন, বহু মানুষ রূপকুন্ডে একসাথে মারা গেছিলেন। জায়গাটা অসম্ভব ঠান্ডা হওয়ায়, এখনও মৃতদেহ দেখতে পাওয়া না গেলেও, মাংসযুক্ত হাড়গোড় দেখতে পাওয়া যায়। মহিলাদের ওখানে যাওয়ায়, অলিখিত নিষেধ আছে বলে শোনা যায়।

যাহোক্, ওটাকে  নিয়ে  গঙ্গা  ও  শীতাংশুর  কাছে  ফিরে  এলাম।  গঙ্গা  জানালো,  এত পরিস্কার  কঙ্কাল,  বা তার  অংশ  এখন  আর  বিশেষ  দেখতে  পাওয়া  যায়  না।  কঙ্কালের  মুন্ডুতো  দেখাই  যায়  না।  এখানে যারা আসে,  স্মৃতি  হিসাবে  অনেকেই  কিছু  কিছু  অংশ  নিয়ে  যায়। অবশ্য  বরফ  খুঁড়লে  পূর্ণ  কঙ্কাল এখনও অনেক  পাওয়া  যাবে।  তবে  বরফের  ওপরে  পূর্ণ  কঙ্কাল  আর  একটাও  পাওয়া  যাবে  না।  গঙ্গা  চারিদিকে ছড়ানো  ছেটানো  অনেক  হাড়ের টুকরো  দেখালো।  কোনটা  হাতের  অংশ,  কোনটা  পায়ের  অংশ।  তবে নরমুন্ড  আর  একটাও  দেখতে  পেলাম  না।  কোন  কোন  হাড়ের  ওপর  কালো  মতো  জমা  অংশ  দেখিয়ে, গঙ্গা  জানালো,  এগুলো  মাংস।  ঠান্ডায়  নষ্ট  হয়নি।  হয়তো  তাই  হবে,  কিন্তু  পরীক্ষা  করার  প্রবৃত্তি  হলো না।  গঙ্গা  আমাকে  নরমুন্ডুটা  সঙ্গে  করে  নিয়ে  যেতে  বললো।  কিন্তু  একমাত্র  অবিকৃত  নরমুন্ড  সঙ্গে করে নিয়ে  যেতে  ইচ্ছা  করলো  না।  তাছাড়া  এতটা  রাস্তা  হেলমেটের  মতো  নরমুন্ড  হাতে  করে  নিয়ে  গেলে, ফেরার  পথে  পুলিশের  ঝামেলা,  এবং  সর্বপরি  এই  বয়সে  নরমুন্ড  হাতে  বাড়ি  ফিরে  বাড়ির  লোকেদের, ছেলে  সন্ন্যাসী  হয়ে  নরমুন্ড  হাতে  হিমালয়  থেকে  ফিরেছে  ভেবে  কষ্ট  পাবার  হাত  থেকে  মুক্তি  দিতে, নরমুন্ড  আর  নিয়ে  আসা  হলো  না। তাই পরের যাত্রীদের সহজে দর্শণ লাভের জন্য,  ওটাকে  বেদীর  ওপর রেখে  এলাম।  ডানদিকের  বরফের  ওপরেই  বেশি  কঙ্কালের  হাড়গোড়  পড়ে  আছে।  গঙ্গা  জানালো,  ঐ বরফের  তলায়  এখনও  অবিকৃত  গোটা  মৃতদেহ  আছে।  দেহের  মাংস  পর্যন্ত  নষ্ট  হয়  নি।  কারণ  ঐ বরফ  কখনও  গলে  না।

রূপকুন্ডের  পারে  পারে  আমরা  অনেকক্ষণ  ঘুরলাম, জলে  হাত  দিলাম। গঙ্গা  বললো  ওপরে  উঠে  আসতে। এবার  মেঘ  করতে শুরু করবে। আর একটু পরেই ফিরতে হবে। আমরা  ওপরে  উঠে  এসে  বেদীর  ধারে  বসলাম। এ  জায়গাটার ঊচ্চতা  ১৬৪৭০ ফুট। গঙ্গা  জানালো,  সাড়ে  ন’টা-দশটার  মধ্যে,  জায়গাটা  সাদা  মেঘে  ঢেকে  যাবে।  সূর্য  পূর্বদিকের  চুড়ার  কাছাকাছি  এসে  পৌঁছেছে। সূর্য  ঠিক  মাথার  ওপর  না  উঠলে,  রূপকুন্ডের  জলে  রোদ  পড়ার  আশা  কম।  অর্থাৎ সাড়ে এগারটা-বারটার  আগে  কুন্ডের  জলে  সূর্যালোক  পড়ার  কোন  সম্ভাবনা  নেই।  অথচ  ওর  কথা  মতো   প্রতিদিনই  তার  অনেক  আগেই  জায়গাটা  গভীর  মেঘে  ঢেকে  যায়। বোঝাই যাচ্ছে রূপকুন্ডে প্রায় কোনদিনই  সরাসরি  সূর্যালোক পড়ে না। খুব ভাল আবহাওয়া থাকলে, ন’মাসে ছ’মাসে রূপকুন্ড রৌদ্রস্নান করার সুযোগ  পায়। এখন ন’টা  বাজে। গঙ্গা বললো এর আগে কলকাতার এক ভদ্রলোক রূপকুন্ডে পৌঁছেই, সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে কূন্ডের ধারে পূজোয় বসেন। কিন্তু তিনি আর তাঁর পূজো শেষ করার সুযোগ পাননি। তার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। এবার  আমাদের  ফিরতে  হবে।  আমাদের  ছবি  তোলাও  শেষ।  নরমুন্ড  নিয়ে  শীতাংশু, গঙ্গা  ও  কুমারের  ছবি  তুলতেও  ভুললাম  না।  সকাল  থেকে  একবারে  খালি  পেটে  আছি। খানিক  বাদাম  চিবিয়ে  প্রাতরাশ সারলাম। রূপকুন্ডের  রূপ,  মহিত  হয়ে  বসে  থাকার  মতো  নয়,  তাই  আমরা  রূপকুন্ডকে  শেষ  বারের  মতো  দর্শন  করে,  বিদায়  জানিয়ে  সদলবলে  বগুয়াবাসার  উদ্দেশ্যে  যাত্রা  করলাম।

রূপকুন্ডে  আসবার  সময়  লক্ষ্য  করেছি  বগুয়াবাসা  থেকে  প্রায়  রূপকুন্ড  পর্যন্ত  পথের  ধারে  ধারে,  ব্রহ্মকমল  ফুটে  আছে।  কিন্তু  প্রায়  সব  ফুলই  মাকড়সার  গুটির  মতো  সাদা  একটা  আবরণে  ঢাকা।  কী  কারণ,  জিনিসটাই  বা  কী,  জানি  না। এতদিনের  স্বপ্ন,  রূপকুন্ড  দেখে  মন  ভরে  নি।  শীতাংশুর  হাঁটার  গতি  অনেক  কমে  গেছে।  মনে  মনে  ভাবছি  ও  মণিমহেশ  গেলে  কী  করবে?  এ  পথে  তবু  অফুরন্ত  প্রাকৃতিক  সৌন্দর্য  আছে,  মণিমহেশে  তো  তাও  নেই।  মনে  মনে  একটা  দুর্ভাবনা,  সত্যি  যদি  ও  আর  কোথাও  যেতে  না  চায়?  অনেকটা  পথ  নেমে  এসেছি।  এখন  শুধু  উতরাই  এর  পথ,  কাজেই  হাঁটতে  কোন  কষ্ট  নেই।  এবার  একটা  ঢালু  বড়  পাথরের  ওপর  দিয়ে  নামতে  হবে।  আসার  সময়  ওটার  ওপর  দিয়েই  হেঁটে  গেছিলাম।  পাথরটার  ওপর  পা  দিয়েই  পা  পিছলে  আছাড়  খেলাম। কোন রকমে সামলে নিয়ে শীতাংশুকে সাবধান করে দিলাম। পাথরটার ওপর একটা হাল্কা শ্যাওলার আস্তরণ, ওপর থেকে দেখাও যায় না, বোঝাও যায় না। তবে ভীষণ পিচ্ছিল, একটু নেমেই আবার আছাড় খেলাম। এবার কিন্তু অনেকটা গড়িয়ে পড়লাম। ভয়ের কোন কারণ নেই, কারণ জায়গাটায় খাদ নামক বিপজ্জনক বস্তুটি নেই। তবে এবার দাঁড়িয়ে উঠে বুঝলাম, হাঁটুর নীচে বেশ খানিকটা জায়গা কেটে গেছে। অথচ প্যান্টের কোথাও ছেঁড়েনি। শীতাংশু আমাকে সাবধানে নামতে বললো। ওদের কাউকে আর জানালাম না যে, আমার পা কেটে গেছে। কাটা জায়গাটা বেশ জ্বালা করছে। আস্তে আস্তে একসময় সেই গ্লেসিয়ার দু’টো পার হয়ে গেলাম। এবার কিন্তু আগের মতো অতটা অসুবিধা হ’ল না। এঁকেবেঁকে একসময় বগুয়াবাসা গুহার সামনে এসে হাজির হলাম।

অসম্ভব খিদে পেয়েছে। সকাল থেকে এক কাপ চা পর্যন্ত খাওয়া হয় নি। এসে দেখলাম সকালের খাবার তো দুরের কথা, কফির ব্যবস্থাও হরিশ করে রাখে নি। আমি আর শীতাংশু গুহার বেডরুমে ঢুকে, টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। যাবার সময় আমার এত কষ্ট হলো, অথচ এখন দেখছি শীতাংশু আমার থেকে অনেক বেশি কাহিল হয়ে পড়েছে। ব্যাগ থেকে বাদাম বার করে চিবতে শুরু করলাম। হাত বাড়িয়ে শীতাংশুকেও দিলাম। ও অতি কষ্টে হাত পেতে নিল। একটু পরে কুমার কফি দিয়ে গেল। শীতাংশুকে দেখে মনে হলো ও ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি কাত হয়ে শুয়ে শুয়ে কোনমতে কফি খেলাম। শীতাংশু কিন্তু কাতও হলো না, কফিও খেল না। একবার ডাকলাম, কিন্তু কোন উত্তর পেলাম না। আমিও চোখ বুজে শুয়ে রইলাম। কতক্ষণ শুয়ে ছিলাম জানিনা। আমরা দু’জনেই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গঙ্গার ডাকে উঠে পড়লাম বটে, কিন্তু আর হাঁটতে ইচ্ছা করছে না। হাঁটবার শক্তিও যেন নেই। শীতাংশুর ওঠার ভঙ্গি দেখে বুঝলাম, ওর অবস্থাও খুবই খারাপ। বিস্কুট বার করে ওকে দিলাম। মালপত্র বাঁধাছাদা গঙ্গারাই করলো। আস্তে আস্তে গুহা থেকে বার হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। শুরু হলো পথ চলা। যদিও জানি এবার শুধু উতরাই এর পথ, কাজেই কষ্টও কম এবং খানিকটা হাঁটলেই, আবার হাঁটার ক্ষমতা ও ইচ্ছা ফিরে পাওয়া যাবে। রাস্তা এখন সমতল, তাই হাঁটতে বিশেষ কষ্ট হচ্ছে না। পথে হরিশ ও কুমারের কথাবার্তায় মনে হলো, ওদের মধ্যে কোন অশান্তি হয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা কী জানতে পারলাম না। গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম “আজ রাতে আমরা কোথায় থাকবো”? ও বললো, আজ রাতে বৈদিনীতে থাকাই ভালো হবে। শীতাংশু তার অবসন্ন দেহে একবার মাথা নাড়লো। মনে হলো ও বোধহয় রাজি হয়ে গেল। আমার কিন্তু তিন তাল ও পিন্ডারীর কথা মাথায় রেখে, আজ আরও এগিয়ে যাবার ইচ্ছা। তাছাড়া বৈদিনী বুগিয়াল তো খুব বেশি দুরের পথও নয়। যাইহোক, সেই পুরানো, আধা চেনা পথ ভেঙ্গে, আস্তে আস্তে একসময় আমরা বৈদিনী বুগিয়াল এসে পৌঁছলাম। সারা রাস্তা হরিশ, কুমারের থেকে একটা ব্যবধান রেখে হেঁটে আসলো। বৈদিনীতে থাকার বাংলোটা, আলি বুগিয়ালের থেকে ভালো নয়। অন্তত বাইরে থেকে আমার তো তাই মনে হলো। এখানে মাঠে বসে আমরা ছাতু মেখে খেলাম। আজ কেন রুটি তৈরি করেনি বুঝলাম না। গঙ্গাকে আড়ালে ডেকে কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করলাম। সে জানালো, হরিশ আমাদের ব্যাগ থেকে সিগারেট, বিস্কুট ইত্যাদি নিয়েছে। গঙ্গা সেটা জানতে পেরে হরিশকে বলেছে, “বাবুরা তো সবকিছু আমাদের না চাইতেই দিয়েছে, তবে তুমি কেন চুরি করবে”? এই নিয়ে ওদের মধ্যে অশান্তি হয়েছে। আমি গঙ্গাকে বললাম ওসব ছেড়ে দাও, ও যে নিয়েছে আমরা বুঝতেও পারিনি। ওর কিছু প্রয়োজন হলে আমায় বলতে বলবে। গঙ্গা বললো, হরিশের এই স্বভাবের জন্য তার বদনাম হবে। এ লাইনে একবার কারো নামে বদনাম হলে, কোন খদ্দের তাকে বিশ্বাস করতে চায় না। আমি তাকে এই ব্যাপারটা ভুলে যেতে বললাম।

বৈদিনী বুগিয়াল।

এখানে একদল নতুন যাত্রীর সাথে আলাপ হলো। চার-পাঁচ জনের একটা দল। শ্র্রীরামপুর, চন্দননগর ইত্যাদি জায়গা থেকে এসেছে। সঙ্গে চারজন কুলি। এদের গাইড রাম সিং। ওরা সঙ্গে আইস অ্যাক্স্, ছোট ছোট টেন্ট্, ইত্যাদি অনেক কিছু পাহাড়ি উপকরণ ও বিস্তর শুকনো খাবার নিয়ে এসেছে। কোন বিস্কুট কোম্পানী তাদের বিস্কুটের টিন দিয়েছে। আরও অনেকের কাছ থেকে তারা অনেক সাহায্য পেয়েছে। এইসব কথা, তাদের দলের একজনের কাছেই শুনলাম। আমরা সারা পথে বাদাম, অল্প বিস্কুট চিবিয়ে কাটিয়েছি। এরা দু’টো বিস্কুটের মধ্যে কোনটায় মাখন, কোনটায় ক্রীম, কোনটায় জ্যাম ইত্যাদি দিয়ে নিজেরাও খেল, আমাদেরও দিল। ওদের মধ্যে দু’জনের খুব বড় বড় কথা, আমাদের তারা বিভিন্ন জায়গার নাম উল্লেখ করে জানতে চাইলো, আমরা এই ট্যুরে সেইসব জায়গা গেছি কী না, বা যাবার প্ল্যান আছে কী না। অনেক জায়গার নামই আমরা শুনি নি। তারা বিজ্ঞের হাসি হেসে, প্র্রায় বিদ্রুপ করেই বললো, তাহলে এ পথে আসলেন কেন? তাদের কথাবার্তার ধরণ ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হবে, যেন তারা এভারেষ্ট সমেত সমস্ত হিমালয় জয় করে, এখানে এসেছে, উল্লিখিত জায়গাগুলো জয় করে কোর্স কমপ্লিট করতে। আমাদের সাথে আইস অ্যাক্স্ নেই, তাঁবু নেই, এমন কী যথেষ্ট খাবার দাবার নেই শুনে, তারা আর এক দফা বিদ্রুপের হাসি হাসলো। ওরা আজ রাতটা এখানেই থাকবে, তাই কোথায় তাঁবু ফেলা হবে, তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। হাবভাব দেখে মনে হলো, এভারেষ্ট জয়ের পথে বেস্ ক্যাম্পে রাত্রিবাসের আয়োজন। আমার এদের সঙ্গ আর ভালো লাগলো না। এখনও আমাদের হাতে অনেক সময় আছে। কাজেই “ওয়ান” গ্রামে চলে যাওয়াই স্থির করে ফেললাম।

একটু পরে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, আমরা আবার নিজেদের রাস্তা ধরলাম। বৈদিনী খুবই সুন্দরী সন্দেহ নেই, তবে আলি বুগিয়ালের মতো সুন্দরী সে মোটেই নয়, এ কথা হলফ্ করে বলতে পারি। বেশ কিছুটা পথ এসে, একটা সরু খালের মতো জায়গা দিয়ে আসতে হলো। অল্প একটু পথ। খালটার ওপরে বাঁপাশের গাছের শুকনো পাতা পড়ে পড়ে, ভরাট হয়ে গেছে। অবশ্য খালের মতো দেখতে হলেও, ওটা আসলে খাল নয়, জলও নেই। যেন খানিকটা জায়গার মাটি কেটে, কেউ নালার মতো তৈরি করেছে। আর তার ভিতর শুকনো পাতা পড়ে পড়ে, সেটা ভরাট হয়ে গেছে। খাল বা নালাটার বাঁপাশে অনেক গাছ আছে, আর সেইসব গাছের ঝরে পড়া শুকনো পাতায়, সেটা ভর্তি হয়ে গেছে। জায়গাটা একটু স্যাঁতসেঁতে। ওটার ওপর দিয়ে হাঁটার সময়, মনে হচ্ছে যেন কোন স্পঞ্জ দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। লাফাতে লাফাতে, নাচতে নাচতে, পার হতে হয়। এর ওপরেই গঙ্গা একটা জোঁক হাতে তুলে আমায় দেখিয়ে বললো, জোঁক দেখতে চেয়েছিলেন, এই দেখুন আপনার জোঁক। আশ্চর্য, ওর জোঁকের ব্যাপারটা মনেও আছে? নন্দদার সাবধান বাণী মনে হতেই সচেতন হয়ে গেলাম। কিন্তু একটা জোঁককেও পায়ে বা কোথাও রক্ত খাওয়ার জন্য কামড়াতে দেখলাম না। গঙ্গা বললো এ জায়গায় এখন যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে এখনি শ’য়ে শ’য়ে জোঁক এসে হাজির হবে। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্যই হোক বা দুর্ভাগ্যই হোক, বৃষ্টিও হলো না, জোঁকও দেখা হলো না। কিন্তু আর কিছুটা পথ যাবার পরই মুষলধারে বৃষ্টি আসলো। অতর্কিতে এত জোরে বৃষ্টি আসলো যে, ওয়াটার প্রুফ বার করে গায়ে দেবার সময় পর্যন্ত পেলাম না। হাতের কাছে বগুয়াবাসার গুহায় পাতা, ভাঁজকরা পলিথিন সিটটা ব্যাগে ছিল। আমি সামনে, শীতাংশু পিছনে দু’হাত বাড়িয়ে পলিথিনটাকে ধরে ছাদের মতো তৈরি করে, সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। সরু রাস্তাটার ডান পাশটায় গোলাপ গাছের মতো কী একটা কাঁটা যুক্ত গাছের জঙ্গল। অনেকটা রাস্তার পাশে লাইন দিয়ে ঐ গাছের ঘন জঙ্গল। ঐ গাছের কাঁটায় পলিথিন সিটটা বার বার আটকে গিয়ে, অনেক জায়গায় ছিঁড়ে গেল। আমাদের হাতেও অনেক জায়গায় ছড়ে গেল। এইভাবে কিছুটা পথ গিয়ে বুঝলাম, মাথার ওপর কষ্ট করে ওটা ধরে রাখার কোন মানে হয় না। আমরা একদম ভিজে গেছি, বৃষ্টিও অসম্ভব জোরে পড়ছে। ভীষণ ঠান্ডা, তার ওপর এভাবে হাঁটতেও খুব অসুবিধা হচ্ছে, হাঁটার গতিও কমে যাচ্ছে। গাইড-কুলিরা আমাদের থেকে বিশ-পঁচিশ হাত পিছনে মালপত্র নিয়ে ভিজে ভিজে আসছে। আমরা বাধ্য হয়ে পলিথিন সিট্ মুড়ে ফেলে, হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। তাতে কী লাভ হলো অবশ্য নিজেরাও জানিনা। চোখে মুখে বৃষ্টির জলে ছুঁচ ফোটার মতো বোধ হচ্ছে। হান্টার শূ-এর ভিতরে জল ঢুকে, নতুনদার পাম্প শূ-এর আকার নিয়েছে। এইভাবে অনেকটা পথ প্রায় দৌড়ে আমরা প্রায় আট হাজার ফুট উচ্চতায়, ওয়ান ডাকবাংলোয় এসে উপস্থিত হলাম।

বাংলোয় কাউকে দেখা গেল না। গঙ্গারাও এসে হাজির হলো। কেয়ার টেকারের দেখা পাওয়া গেল না। দরজায় ছোট্ট একটা তালা লাগিয়ে, সে কোথায় গেছে কে জানে। গঙ্গা সময় নষ্ট না করে, তার বা পেরেক জাতীয় কিছু দিয়ে দিব্বি বাংলোর তালা খুলে ফেললো। আমরা ভিতরে ঢুকে সমস্ত জামা কাপড় খুলে, ভিজে জাঙ্গিয়া পরে ব্যাগ থেকে একে একে সমস্ত জিনিস বার করে, মেঝেতে রাখলাম। খাবার জিনিস সবই পলিথিন প্যাকে আছে, তাই ওগুলো খুব একটা ভিজতে পারেনি। তবে একটা জামা কাপড়ও শুকনো নেই। এমনকি মোটা মিলিটারি কাপড়ের পাশ বালিশের মতো ব্যাগগুলো পর্যন্ত, ভিজে চপচপ্ করছে। সব কিছু ভাল করে চিপে, দড়ি টাঙ্গিয়ে, তাতে শুকতে দেওয়া হলো। ওদের ও আমাদের এত কিছু টাঙ্গাবার মতো দড়ির অভাব দেখা দিল। বৃষ্টি এখনও অবিরাম পড়ে যাচ্ছে। আমরা খালি গায়ে, ভিজে জাঙ্গিয়া পরে বসে রইলাম। গঙ্গা সম্ভবত বাংলোর কাঠ এনে, আগুন জ্বালালো। এর মধ্যে বাংলোর কেয়ার টেকার এসে উপস্থিত হলো। বাংলোর তালা খোলা নিয়ে সে একটা প্রশ্নও করলো না, বরং গঙ্গা কফি তৈরি করছে দেখে, পরম উৎসাহে গঙ্গার সাহায্যে, কাজে হাত লাগালো। আমরা বাড়ির উদ্দেশ্যে চিঠি লিখলাম। এখানে ডাকবাক্সে চিঠি ফেলার ব্যবস্থা আছে, তবে সে চিঠি যাবে কী না, বা গেলেও ক’বছরে যাবে, বলতে পারবো না। ওয়ান বেশ বড় গ্রাম। গঙ্গা কফি দিয়ে গেল। শুয়ে শুয়ে গরম কফিতে চুমুক দিয়ে ভাবতে লাগলাম, গতকাল রাতে যদি এই বৃষ্টি হতো, তাহলে আমরা বোধহয় কোনমতেই বেঁচে ফিরতাম না। সাড়ে চোদ্দ হাজার ফুট উচ্চতায় বৃষ্টি মানেই তুষারবৃষ্টি। বগুয়াবাসার গুহায় পলিথিন সিট্ আমাদের বৃষ্টি বা তুষারপাতের হাত থেকে রক্ষা করতে পারতো না। বৈদিনীতে একটু আগের দেখা দলটার কী অবস্থা কে জানে। গঙ্গা কাঠের আগুনে আমাদের সমস্ত ভিজে জিনিস শুকতে বসে গেল। হরিশ, কুমার ও এই বাংলোর কেয়ার টেকারও, এই কাজে হাত লাগালো। আমরা শুয়ে বসে বিশ্রাম নিতে লাগলাম।

শীতাংশু জানালো, তিন তাল যাবার তার আদৌ কোন ইচ্ছা নেই। রূপকুন্ডের যদি এই রূপ হয়, তবে খপলু তাল, বিগুন তাল (বিখল তাল), বা ব্রহ্মতালের কী রূপ হতে পারে, ও এখান থেকেই বুঝতে পারছে। আমি ওকে বোঝালাম, জীবনে আর কখনও এদিকে আসা হবে না, কাজেই কষ্ট হলেও দেখে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কিন্ত ও, ওর গোঁ ধরে বসে রইলো। কিছুতেই রাজি করাতে না পেরে বললাম, একজন কুলি সঙ্গে নিয়ে ও যেন গোয়ালদাম চলে যায়। আমি তিন তাল দেখে ওখানে চলে যাব। ও জানালো, ও বাড়ি ফিরে যেতে চায়। আমি কোন কথা না বলে, আগুনের কাছে চলে গেলাম। গঙ্গাকে তিন তালের কথা বলতে, ও খুব উৎসাহ দেখিয়ে বললো ওগুলো খুব সুন্দর তাল, আমরা না দেখে ফিরে গেলে, আমরাই ঠকবো। কী করা উচিৎ ভেবে পাচ্ছি না। বেশ কিছু প্রায় শুকনো জামা কাপড়, গঙ্গা ঘরে নিয়ে গিয়ে, দড়িতে মেলে দিয়ে আসলো। একটু পরে আমি ঘরে গেলে শীতাংশু জানালো, পরশু জন্মাষ্টমী। গঙ্গা তাকে বলেছে ঐ সব জায়গাগুলোয় কিছুই দেখার নেই, তাছাড়া জন্মাষ্টমীতে বৃষ্টি হবেই। ওপথে বৃষ্টি হলে খুব কষ্ট হবে। কাজেই ওখানে যাবার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

গঙ্গা আমাকে একরকম কথা, শীতাংশুকে আর একরকম কথা কেন বলছে কে জানে। তবে কী শীতাংশুর মতো ওরাও ঐ তিন তাল যেতে চায় না? উঠে গিয়ে গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করাতে, সে বললো তার ওখানে যেতে কোন আপত্তি নেই, আমরা চাইলেই ওরা আমাদের ওখানে নিয়ে যাবে। ওকে বললাম শীতাংশুকে একটু বুঝিয়ে বলে রাজি করাতে। আমার কথায় গঙ্গা শীতাংশুকে কী বললো ওই জানে, শীতাংশু কিছুতেই রাজি হলো না। শেষে গঙ্গাকে সঙ্গে নিয়ে শীতাংশুর সাথে কথা বলে অনেক বুঝিয়ে, ওকে রাজি করালাম। গঙ্গা হঠাৎ এরকম ব্যবহার শুরু করলো কেন কে জানে। শীতাংশুর কথাবার্তায় মনে হলো গঙ্গাই ওকে না যাবার জন্য বুদ্ধি দিয়েছে। যদিও গঙ্গা সারাক্ষণ আমাকে ওখানে যাবার জন্য উৎসাহ দিয়ে গেছে। যাহোক্, আবার নতুন করে মোটামুটি শুকিয়ে যাওয়া পোষাক এবং অন্যান্য সব কিছু গুছিয়ে নেওয়া শুরু হলো। অধিকাংশ জামা কাপড়ই দড়িতে ঝোলানো রইলো। রান্না হয়ে গেলে আমরা সবাই বসে গল্পগুজব শুরু করলাম। গঙ্গা জানালো, বৈদিনীতে আলাপ হওয়া ঐ দলটার গাইড রাম সিং, তার মামাতো ভাই হয়। আরও বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা মারার পর, আমরা রাতের খাবার খেয়ে, শুয়ে পড়লাম। এখানকার বাংলোটা বেশ ভালো। বোধহয় এই গ্রামটা বেশ বড়, এবং এই পথের প্রায় সব যাত্রীই রাতে এখানে থাকে বলেই, এটাকে একটু যত্ন করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয়।

ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। বৃষ্টি এখন আর পড়ছে না। পরিস্কার আকাশ। রাতে ভালোভাবে শুতে পেরে এবং চিন্তামুক্ত হতে পেরে, শরীর ও মন বেশ তরতাজা ঝরঝরে। কফি ও জলখাবার খেয়ে আমরা মালপত্র নিয়ে রাস্তায় নামলাম। গঙ্গা কাল রাতে আমাদের লেখা চিঠিগুলো পোষ্ট করার ব্যবস্থা করতে গেল। ও ফিরে এলে আমরা তিন তালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। আমাদের কথায় শীতাংশু যাচ্ছে বটে, কিন্তু মুখ গোমড়া করে। আসলে ও যাচ্ছে না, যেতে বাধ্য হচ্ছে।

পাহাড়ি পথে এঁকেবেঁকে অনেকটা পথ পার হয়ে এলাম। বেশ জঙ্গলের পথ, চারিদিকে শুধু গাছ। চড়াই, উতরাইও বেশ ভালোই। ফলে রাস্তাও বেশ কষ্টকর। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ও ভয়ের ব্যাপার হলো, গঙ্গা সম্ভবত এই পথ চেনে না। এখানে রাস্তা বলে কিছু নেই। এমন কী পায়ে চলা পথের যে দাগ থাকে, যা দেখে বোঝা যায় এটাই রাস্তা, তাও প্রায় নেই। গঙ্গা ভুল পথে যাচ্ছে কিনা চিন্তা হলো। মাঝেমাঝেই ও দাঁড়িয়ে পড়ে ভ্রুর কাছে হাত রেখে দুরে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করে, আমাদের ওর সাথে এগতে বলছে। ওকে জিজ্ঞাসা করলে বলছে, সামনের ঐ চুড়াটার পরেই তাল পাওয়া যাবে। চড়াই পথে অনেক ঘুরে দুরের চুড়া পার হওয়ার পর, আবার সেই ভ্রুর কাছে হাত নিয়ে এসে দুরে এদিক ওদিক কিছুক্ষণ দেখে, আবার জানাচ্ছে সামনের চুড়ার পরে তাল পাওয়া যাবে। এক সময় আমি গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে এই পথ চেনে কী না, বা আগে এই পথে কখনও এসেছে কী না? ও আমাদের ভয় পেতে বারণ করে জানালো, এই পথে কোন রাস্তা নেই। আগেও সে এসেছে, তবে অনুমান করে দিক নির্ণয় করে। এবারও ও আমাদের ঠিক ঐ তিন তালে পৌঁছে দেবে। এসব ব্যাপার দেখে, শীতাংশুর গোমড়া মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেছে। আমার সাথে একটাও কথা বলছে না। এদিকে আস্তে আস্তে বেলাও বেশ বেড়ে গেছে। এক জায়গায় বসে আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। কুমার জল নিয়ে এল। এতক্ষণে শীতাংশু গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলো রাস্তা আর কতটা বাকি? গঙ্গা জানালো বিকেলের মধ্যে আমরা পৌঁছে যাব। একটু বসে বিশ্রাম নিয়ে, আমরা আবার একই পদ্ধতিতে এগিয়ে চললাম। আবার সেই একই রকম ভাবে আন্দাজে পথ চলা। তবে এবার মাঝেমাঝেই গঙ্গা শান্তনা বাণী শোনাচ্ছ—“কোন ভয় নেই”। আমার ভয়টা অন্য কারণে। ইতিমধ্যে আমরা বেশ কয়েক কিলোমিটার পথ আন্দাজের ওপর ভর করে এগিয়ে এসেছি। এতক্ষণের পথে একটা গ্রাম তো দুরের কথা, একটা মানুষও চোখে পড়ে নি। এখন যদি পথ ভুল হয়ে থাকে, তবে রাতে না পারবো ওয়ান ফিরে যেতে, না পারবো কোন একটা তালের কাছে পৌঁছতে। কারণ সামনে বা পিছনে, যে দিকেই যাই না কেন, আবার যেতে হবে সেই আন্দাজের ওপর ভর করেই। মুখ্য রূপকুন্ড তালের যদি ঐ রূপ হয়ে থাকে, গৌণ এই তিন তালের সৌন্দর্য নিয়ে আমার মনেও যথেষ্ট সংশয় প্রথম থেকেই ছিল। একমাত্র আমার জেদেই, সকলে এ পথে আসতে বাধ্য হয়েছে। এখন শীতাংশুর হাতে খুন হয়ে যাবার সম্ভাবনাও আমার প্রবল।

ইলশেগুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। মাঝে মাঝে সামান্য জোরে হয়ে, আবার সেই একই ভাবে এক নাগাড়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। গঙ্গার কথায় একটার পর একটা চুড়া পার হয়ে, আমরা একটা চুড়ার ওপর এসে দাঁড়ালাম। আমি আর শীতাংশু পাশাপাশি, গঙ্গা আমাদের সামনে, অনেকটা নীচে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে হঠাৎ যেন ঢালু পাথর বিছানো মাঠ অনেক নীচে নেমে গেছে। গঙ্গা হঠাৎ অনেক ওপরে আমাদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে হি-স্-স্-স্ করে একটা শব্দ করে আমাদের চুপ করে থাকতে, কথা না বলতে ইশারা করলো। আমরা কিছু না বুঝেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। মিনিট কয়েক পরে গঙ্গা চিৎকার করে বললো—“শালা বকরি”। আমরা নীচে নেমে এলাম। এতক্ষণে ব্যাপারটা জানা গেল। ঘটনাটা আর কিছুই নয়, অনেক নীচ থেকে একটা কালো রঙের ছাগল আসছিল, ওটাকে দুর থেকে দেখে গঙ্গা ভাল্লু মনে করেছিল। তার মানে এখানে ভাল্লুর উৎপাতও আছে বোঝা গেল। আমরা এগিয়ে চললাম। বোধহয় বিশ-পঁচিশ পা এগিয়েছি, হঠাৎ পিছন থেকে গঙ্গার ডাকে পিছন ফিরতে গঙ্গা বললো, “বাবু, বকরি মর্ গিয়া”। এই তো ছাগলটাকে দেখলাম, এর মধ্যে এমন কী হলো, যে মরেই গেল। ছাগলের হার্ট অ্যাটাক হয় বলে তো শুনি নি। গঙ্গার কাছে ফিরে এসে দেখি ছাগলটা বোধহয় অসুস্থ, দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আর তারপরেই মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। গঙ্গা তাকে আবার দাঁড় করিয়ে দিল, কিন্তু ছাগলটা আবার মাটিতে পড়ে গেল। বোঝা যাচ্ছে যেকোন কারণেই হোক, ছাগলটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয়ই বা কী থাকতে পারে, তাই এগিয়ে যাবার উদ্যোগ নিতেই, গঙ্গা বললো- “বাবু, টাং কাট লি”? ও ঠিক কী বলছে বুঝতে না পারায়, ও আবার বললো, টাং কাট লি? কলকাতা থেকে যাবার সময় প্রয়োজন হতে পারে ভেবে, একটা চামড়ার খাপে ভরা বড় ভজালির মতো ছুরি নিয়ে গেছিলাম। সেটা গঙ্গার ব্যাগেই আছে। গঙ্গা সেটা দিয়ে অর্ধমৃত ছাগলটার পাগুলো কেটে নিতে চায়, রাতে মাংসের খিচুড়ি বানাবার জন্য। শুনে জিভে জল এসে গেল, কিন্তু পরমুহুর্তেই সাবধান হয়ে গেলাম। ওকে এই কাজ করতে বারণ করে বললাম — প্রথমত, ছাগলটা অসুস্থ, কিন্তু মরে নি। দ্বিতীয়ত, এখানে ছাগল যখন আছে, তখন তার মালিকও কাছেপিঠে কোথাও আছেই। এই দীর্ঘ পথে এখন পর্যন্ত কোন মানুষ দেখিনি। কাজেই পা কাটা ছাগল দেখে তার মালিক সহজেই বুঝতে পারবে, আমরাই তার ছাগলের  হত্যাকারী। সেক্ষেত্রে এই নির্জন, অচেনা, অজানা, জায়গায় বিপদ হতে পারে। গঙ্গা জানালো, ছাগলটা অসুস্থ, ওটা একটু পরেই মরে যাবে। কাজেই ওটাকে কেটে ফেললে ছাগলের মালিক কিছু মনে করবে না, বা কিছু বলবে না। এ যুক্তি মেনে নিতে পারলাম না। গঙ্গা আবার রাতের লোভনীয় খাবারের কথা মনে করিয়ে দিয়ে পাগুলো কেটে ফেলতে চাইলো। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি ওর মধ্যে আগের সহজ সরল গঙ্গাকে খুঁজে পেলাম না। এরমধ্যে ওপরের সেই জায়গাটায়, যেখানে কিছুক্ষণ আগে আমি ও শীতাংশু গঙ্গার ইঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কুমার ও হরিশ এসে উপস্থিত হলো। গঙ্গা চিৎকার করে কুমারকে ডাকলো। কুমার ও হরিশ ছুটে নেমে এলে, গঙ্গা জানালো বকরি মর্ গিয়া। চোখের পলক পরার আগেই কুমার বললো, টাং কাট লো। মরেছে, সব শিয়ালের এক রা। এবার ছাগলের পা কাটা থেকে এদেরকে রোখা, আর বোধহয় আমার পক্ষে সম্ভব হলো না। আমি ওদের অনেক ভাবে বোঝালাম। শীতাংশুও ওদের এ কাজ থেকে বিরত থাকতে বললো। ওরা অনেক ভাবে আমাদের বুঝিয়েও যখন আমাদের রাজি করাতে পারলো না, তখন গঙ্গা আমাদের এগিয়ে যেতে বললো। আমরা এগিয়ে চললাম। বোধহয় মিনিট তিনেকের পথ হেঁটে এসে, গঙ্গা আবার আগের জায়গায় ফিরে গেল। আমরা বিপদের গন্ধ পেয়ে আবার পিছিয়ে এসে ছাগলটার কাছে এলাম। গঙ্গা কিন্তু ছুরিও বার করলো না, ছাগলটার পা কাটারও কোন চেষ্টা করলো না। এমনকী টাং কেটে নেওয়ার জন্য আমাদের নতুন করে অনুরোধ পর্যন্ত করলো না। সে তার হাতের কঞ্চিটা দিয়ে ডাংগুলি খেলার মতো, ছাগলটাকে অনেক নীচে ফেলে দিল। আবার নীচে ছাগলটার কাছে ছুটে গিয়ে, ছাগলটার পেটের নীচে কঞ্চিটা দিয়ে একই কায়দায়, ওটাকে আবার বেশ কিছুটা নীচে তুলে ফেলে দিল। জায়গাটা ঢালু মাঠের মতো, ইতস্তত ছোট বড় পাথর পড়ে রয়েছে। ফলে অনেকটা দুরে ছিটকে পড়ে, ছাগলটা গড়াতে গড়াতে আরও খানিকটা নীচে চলে গেল। এইভাবে তিন-চারবার ছাগলটাকে ফেলে, একটা বড় পাথর দিয়ে তাকে আঘাত করে, সে আমাদের কাছে ফিরে এসে বললো, “চলিয়ে”। ছাগলটা কিন্তু তখনও মরে নি। টাং-ই যদি না কাটবে, তবে ছাগলটাকে এইভাবে আঘাত করার কী কারণ থাকতে পারে বুঝলাম না। তবে কী আমাদের ওপর রাগটা ছাগলের ওপর বর্তালো? আমরা আবার এগিয়ে চললাম এবং একটু আগে যে জায়গাটা থেকে ফিরে এসেছিলাম, সে জায়গাটায় এসে পৌঁছলাম। গঙ্গা, বহু নীচে বিন্দু বিন্দু কালো, সাদা রঙের কিছু দেখিয়ে বললো, বাবু ঐ দেখুন নীচে কত ছাগল, ভেড়া চরছে। ওখান থেকেই এই বকরিটা কী ভাবে এখানে চলে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওটাকে এমন ভাবে আঘাত করা হয়েছে যে, ওটা কিছুক্ষণের মধ্যেই মরে যাবে। যাবার পথে বকরির মালিককে বকরির সন্ধানটা দিয়ে যাব। ও তখন বাধ্য হবে আপনাদের কাছে ঐ বকরির মাংস সামান্য কিছু দামে বিক্রি করে দিতে। কারণ এখানে একটা গোটা ছাগল খাবার মতো লোক কোথায়? আপনারা যদি কিনতে রাজি না হন, তবে বিনা পয়সায় আপনাদের ও মাংস দিয়ে যাবে। আজ রাতে মাংসের খিচুড়ির পাকা ব্যবস্থা করে দিয়ে এলাম। এতক্ষণে গঙ্গার ছাগলটাকে পৈশাচিক ভাবে আঘাত করে আধমরা করে রেখে যাবার কারণ বোঝা গেল। ও কেন ঐ ভাবে ছাগলটাকে আঘাত করলো, তাও বোঝা গেল। ছাগলের দেহে কোন আঘাতের চিহ্ন রেখে গেল না। ওর দুরদর্শিতা দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। ভয়ও হলো, মাংসের লোভে যেভাবে ও ছাগলটাকে হাফমরা করে রাখলো, টাকার লোভে আমাদের না আবার ফুলমরা করে রেখে যায়। ছাগলের তবু মালিক আছে, আমাদের তো ত্রিসীমানায় কেউ নেই। আস্তে আস্তে একসময় আমরা ছাগলের মালিকের সাম্রাজ্যে এসে উপস্থিত হলাম। তিনি তাঁর একপাল ছাগল, ভেড়া নিয়ে অবস্থান করছেন। গঙ্গা তাকে খুব দুঃখের সঙ্গেই জানালো যে, তার একটা বকরি দলছুট হয়ে ওপরে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। উত্তরে নিরুত্তাপ কন্ঠে মালিক জানালো, উসকো তো বিমার থা। আর কোন কথাবার্তা উভয় পক্ষের মধ্যে না হওয়ায়, আমরা এগলাম।

একে একে আমরা তিনটে তালই দেখলাম। তাল বলতে কেউ যদি এগুলোকে নৈনিতাল জাতীয় তাল বলে ভাবে, তবে এদের দর্শন করলে সে মর্মাহত হবে। ব্রহ্মতাল, বিগুন তাল (বিখল তাল) ও খপলু তাল আসলে তিনটে ডোবা। বিগুন তালে দেখি কয়েকটা বাচ্চা ছিপ দিয়ে মাছ ধরছে। মাছ বলতে ছোট ছোট পুঁটি মাছের মতো সাইজের কী একটা মাছ। ছেলেগুলো কোথায় থাকে, ছিপের বঁড়শি কোথায় পেল, বা এই পুকুরে মাছ কোথা থেকে এল, কিছুই জানি না। তবে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম—এরা ছিপের ফাৎনা জিনিসটার সঙ্গে পরিচিত নয়। ফলে মাঝে মাঝে আন্দাজে ছিপটা টেনে, মাছ ধরার চেষ্টা করছে। ছোট ছোট কয়েকটা মাছ ধরেছে, তাই বিশ্বাস করতেই হলো যে এই পুকুর, বা তালে মাছ আছে। আমি একটা ছোট্ট চাড়া গাছের ডাল ভেঙ্গে, তার ভিতরের শোলার মতো নরম অংশটা দিয়ে ফাৎনা বানিয়ে দিলাম। এবার দিব্বি ফাৎনা নড়তে শুরু করলো। ওরাও খুব খুশি। এত বড় একটা আবিস্কারের জনক হিসাবে আমাকে পেয়ে, ওরা খুব আনন্দিত হলো বটে, কিন্তু আমাকে বেশিক্ষণ মাছ ধরার ডেমো দিতে রাজি হলো না।

আবার বৃষ্টি শুরু হলো। আমরা গঙ্গার কথা মতো দ্রুত এগিয়ে চললাম, এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই এই বিস্তীর্ণ এলাকার একমাত্র থাকবার জায়গাটা দেখতে পেলাম। একটু আগে গঙ্গার ছাগল মারা দেখে, গঙ্গা সম্বন্ধে যে ভয় পাচ্ছিলাম, বাসস্থানের নমুনা দেখে শীতাংশু সম্বন্ধে সেই ভয়টা আবার নতুন করে দেখা দিল। এত সুন্দর তিন-তিনটে তাল দেখে, এত সুন্দরতর বাসস্থানে রাত কাটাতে হলে, মনে একটা কবি কবি ভাব জাগবেই। আর তারপরে যদি—“এমন দিনে তারে মারা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়” ভেবে ও আমাকে খুন করতে আসে, কিছু বলার নেই। কারণ এখানে আসার জন্য একমাত্র আমিই দায়ী। দু’টো মাত্র ঘর বা ঐ জাতীয় কিছু একটা। ঘাস, খড়, কঞ্চি, ও লতাপাতা দিয়ে তৈরি ইগলুর মতো দেখতে, বেশ লম্বা ঘর। ঘরদুটোর চারপাশে গোবরে থৈ থৈ করছে। বৃষ্টিতে তার অবস্থা আরও শোচনীয়। ঘরে নিশ্চিন্তে ঢুকবার জন্য গোবরের ওপর পর পর কয়েকটা পাথর ফেলা আছে। ব্যবস্থাপনার কোন ত্রুটি ধরা যাবে না। গঙ্গা আমাদের বড় ঘরটার ভিতরে যেতে বললো। আমাদের গায়ে ওয়াটারপ্রুফ থাকলেও, বেশ ভিজে গেছি। জুতো মোজাও বেশ ভিজে। এই অবস্থায় ঘাস, খড়, লতাপাতার তৈরি ঘরে রাত কাটানো কতটা সুখকর হবে ভাবতে ভাবতে, শীতাংশুর পিছন পিছন পাথরের ওপর পা রেখে রেখে চোরের মতো ঘরে ঢুকছি, এমন সময় শীতাংশুর পায়ের তলার পাথরটা নড়ে যাওয়ায়, তাল সামলাতে গিয়ে ওর একটা পা পাথরের বাইরে পড়তেই, সেটা বেশ খানিকটা গোবরে ডুবে গেল। আমারও ওর হাতে মৃত্যুর সম্ভাবনা আরও প্রশস্ত হলো।

যাহোক্, ঐ অবস্থায় মাথা নীচু করে ছোট দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেই, প্রচন্ড ধোঁয়ায় আমার দম বেরিয়ে যাবার উপক্রম। চোখ জ্বালা করে উঠলো, নিশ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। ওয়াটারপ্রুফের বোতাম গলা পর্যন্ত লাগানো। তাড়াতাড়ি গলার কাছের বোতামটা খোলার চেষ্টা করেও, খুলতে পারলাম না। গঙ্গা এসে একটানে বোতামের জায়গাটা ছিঁড়ে দিল। ওয়াটাপ্রুফটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, প্রাণটা বাঁচলো। ঘরের ভিতর তিনজন লোক আগুন জ্বেলে বসে আছে। দরজার কাছেই ওরা বসে আছে। লম্বা ঘরটার পিছন দিকে পর পর অনেকগুলো গরু বাঁধা আছে। গুনে না দেখলেও, চল্লিশ-পঞ্চাশটা তো হবেই।

ঘরের ভিতর ঐ লোকগুলোর দেওয়া সামান্য জলে শীতাংশু তার পা ধুয়ে পরিস্কার করে নিল। এই ঘরটার উল্টো দিকে পনের-বিশ হাত দুরে অপর ঘরটা। ঐ ঘরটায় যাবার সময় কুমারের পায়েও প্রচুর গোবর মাখামাখি হলো। আমাদের ঘরে, যেখানটায় আগুন জ্বালানো হয়েছে, তার ঠিক পাশে, এক ফুট বা দেড় ফুট উচ্চতার একটা পাথরের স্ল্যাব, দাঁড় করানো আছে। আড়াই ফুট মতো লম্বা এই স্ল্যাবটার খানিকটা অংশ মাটির তলায় পোঁতা আছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে বেশ পাকাপাকি ব্যবস্থা। স্ল্যাবটার অপর দিকে দু’টো শুকনো চট পেতে দেওয়া হলো। এই দু’টো চটই এই ঘরের একমাত্র শুকনো বস্তু। আমরা মহামান্য অতিথি বলে, ঐ দুটো শুকনো চটে আমাদের রাতে শোবার ব্যবস্থা করা হলো। ঘরের মেঝের মাটি পিটিয়ে শক্ত ও সমান করা হলেও, জলে ভিজে চটচটে, কাদা কাদা। চট্ দু’টো খুব বেশি লম্বা না হওয়ায়, আমাদের প্রায় কোমড়ের কাছ থেকে, চটের বাইরে ভিজে মাটিতে থাকবে। এখানে ঠান্ডাও বেশ ভালই, জায়গার অভাবে স্লীপিং ব্যাগ খোলার উপায় নেই, তার ওপর একনাগাড়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে। আমরা আগুনের পাশে সবাই বসে আছি। আগুন আর আমাদের শোবার চটের মাঝখানে, শিলনোড়ার শিলের মতো পাথরের স্ল্যাবটা রয়েছে। শুনলাম কুমার, হরিশ ও এই ঘরের দু’একজন উল্টোদিকের ছোট ঘরটায় রাত্রে শোবে। বৃষ্টি, গোবর, আর শীতাংশুর হাতে খুন হওয়ার ভয়ে, ইচ্ছা থাকলেও পাশের ঘরটার সৌন্দর্য আর দেখতে যাওয়ার সাহস হলো না। তবে ওটার অবস্থা যে এর থেকেও শোচনীয়, তা না দেখেও বলে দেওয়া যায়। কারণ আমরা অতিথি, আমাদের খারাপ ঘরে ওরা থাকতে দেবে না।

এবার রান্না করার তোরজোর শুরু হলো। গঙ্গা ছাগলের মাংসের আশায় এতক্ষণ অপেক্ষা করেছে। আস্তে আস্তে বেশ অন্ধকার নেমে এল। গঙ্গা আর অপেক্ষা না করে নিজেই ছাগলের মালিক, প্রয়োজন হলে ছাগলের মৃত দেহের উদ্দেশ্যে, ছুরি নিয়ে রওনা হবার জন্য উঠে দাঁড়ালো। আমরাও মনে মনে বিনা ঝুঁকির ও প্রায় বিনা পয়সার মাংসের খিচুড়ি ভোগের আশায় মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু বাধ সাধলো ঘরের লোকগুলো। তারা একসাথে প্রায় সকলেই গঙ্গাকে ওখানে এই অন্ধকারে যেতে বাধা দিল। ওরা জানালো যে, “যে সব কুত্তা ছাগল পাহারা দেয়, তারা ওকে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলবে। ওই কুত্তার হাত থেকে বেঁচে গঙ্গা তো দুরের কথা, শেরও ছাগল নিয়ে যেতে পারবে না”। আমি নিজেও ঐ জাতীয় কুকুর অন্যান্য পাহাড়ি পথে দেখেছি। স্থানীয় পাহাড়ি কুকুর, কিন্তু বাঘের মতো চেহারা। এইসব কুকুর পাল পাল ছাগল, ভেড়া পাহারা দেয়। এই সব ছাগল, ভেড়ার পাশ দিয়ে যাবার সময়, ছাগল ভেড়ার মালিক আমাদের সাবধান করে দিয়ে বলেছে—ওদের গায়ে হাত না দিয়ে, পাশ দিয়ে চলে যেতে। তাদেরও বলতে শুনেছি, শেরও ওদের কাছ থেকে ছাগল, ভেড়া তুলে নিয়ে যেতে পারবে না।

শেষ পর্যন্ত গঙ্গা আগেই টাং কেটে নিয়ে না আসার জন্য আক্ষেপ করতে করতে, রণে ভঙ্গ দিয়ে বসে পড়লো। সেই পুরানো ফর্মুলায়, ঐ আগুনেই খিচুড়ি রান্না শুরু হলো। আমরা আগের মতোই আগুনের ধারে বসে গল্প করছি। এই ঘরের লোকেরা গঙ্গাকে সিগারেট দিল। একটা সিগারেট ওরা দু’-তিনজন মিলে টানছে। ওদের হাবভাব ও কথাবার্তায় মনে হলো, ওরা নির্দোষ সিগারেট খাচ্ছে না। আমি গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করা‌য়, ও বললো কুছ নেহি বাবু, ইয়ে সিগারেট হায়। আমার কিন্তু বিশ্বাস হলো না। ওদের কাছে একটা সিগারেট চাইতে, ওরা নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে একটা সিগারেট বার করে, তার মধ্যে চেপ্টা চেপ্টা, কালো কালো, কী যেন ঢুকিয়ে, আমায় বলল, ছাই ঝাড়বেন না। আমি বেশ কয়েক টান দিয়েও, সাধারণ সিগারেটের থেকে কোন পার্থক্য খুঁজে পেলাম না। গঙ্গা আমাকে বললো, বেশি হয়ে যাবে, আর টানবেন না। আমি সিগারেটের অংশটা ওকে দিয়ে দিলাম।

একটু পরেই খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়া গেল। শুয়ে পড়তে বাধ্য হলাম, কারণ ঘরের মালিকদের এর বেশি আলো বা আগুন জ্বালিয়ে বিলাসিতা করার মতো সামর্থ্য নেই। শিলের মতো পাথরের স্ল্যাবটার ঠিক পাশে আমি, আমার পাশে শীতাংশু শুয়েছে। আমরা অতিথি বলে ওরা ক্ষমতার বাইরে হলেও, আগুনে বেশ কিছু শুকনো ডালপালা দিয়ে দিল। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করলো। আগুনের তাপে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে বলে, শীতাংশু ওর ভিজে উলিকটের গেঞ্জিটা আমার বুকের ওপর মেলে দিল। আগুনের তাপে পাথরের স্ল্যাবটাও বেশ গরম হয়ে গেছে। আমার রীতিমতো গরম লাগছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের সবাই চুপ করে গেল। শীতাংশুও ঘুমিয়ে পড়েছে। পায়ের কাছের খোলা দরজা দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। এখন বাইরে আর বৃষ্টি পড়ছে না। আকাশ ভরা তারার মেলা। আমার আর ঘুম আসে না। যতবার তন্দ্রা মতো আসে, ঘুম ভেঙ্গে যায়। গরুদের উৎপাতে ঘুম আসা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। এটা পত্ পত্ করে পায়খানা করলো, তো ওটা ছড় ছড় করে পেচ্ছাব করতে শুরু করলো। তার ওপর মাঝে মাঝেই, হাম্বা-আ-আ-আ-আ রব্। সর্বপরি স্যাঁতস্যেঁতে মাটিতে পিসুর উৎপাত ও ঘরের সুগন্ধ আমার ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করলো। আসলে এটা একটা অস্থায়ী গোয়াল ঘর। বহু নীচে এইসব লোকের বাস। ঐসব এলাকা থেকে এরা গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া নিয়ে আসে ঘাস খাওয়াবার জন্য। অনেকের গবাদি পশু একসাথে এখানে নিয়ে আসা হয়। আর এরা পালা করে কিছুদিনের জন্য এখানে এসে থাকে। প্রত্যেকেই কিছু না কিছু গরু মোষের মালিক। একদল আসে, তারা কিছুদিন থেকে ফিরে যায়, অন্য দল আসে। এইভাবে বর্ষার সময় থেকে কয়েক মাস তারা এখানেই গরু, মোষগুলোকে রাখে। ভাবতেও গর্ব হচ্ছে, অতগুলো গরুর সঙ্গে সমান আদরে, জামাই আদরেও বলা যায়, আজ আমরাও এখানে থাকার সুযোগ পেয়েছি। অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে নানা রকম আজগুবি চিন্তা, মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার ডানপাশে এখনও আগুন জ্বলছে, তবে তার তেজ অনেক কমে গেছে। এইভাবে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।

খুব জল পিপাসা পাওয়ায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে বসে দেখি ডানপাশের আগুন কখন নিভে গেছে। পায়ের কাছের খোলা দরজা দিয়ে হুহু করে বরফ শীতল বাতাস ঢুকছে। শরীরটা কিরকম ম্যাজ্ ম্যাজ্ করছে। বোধহয় পাস্তুরাইজড্ হয়ে গেছি। ঢকঢক্ করে বেশ খানিকটা জল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। শরীরের মধ্যে কিরকম একটা অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হয় জ্বর আসছে। এইভাবে শুয়ে থেকে থেকে, কখন আবার ঘুমিয়ে পড়েছি।

সকালবেলা  শীতাংশুর  ডাকে  ঘুম  ভাঙ্গলো।  উঠে  দেখি  আমার  গা  জ্বরে  পুড়ে  যাচ্ছে।  কাউকে  কিছু  জানালাম  না। গঙ্গা  শুনলেই  আজ  এখানে  থেকে  যেতে  বলবে।  মুখ  ধুয়ে,  কফি  খেয়ে,  মালপত্র  নিয়ে  রাস্তায়  নামলাম।  কিন্তু  সামান্য  পথ  হেঁটেই  আমি  বুঝে গেলাম,  এই  জ্বর  নিয়ে,  আমার  পক্ষে  আর  হাঁটা  সম্ভবপর  নয়।  অথচ  “দেবল”  এখান   থেকে  অনেক  কিলোমিটার  পথ, এবং  সেখানে  না  ফিরেও  আমার  কোন  উপায়  নেই।  সময়  নেবার  জন্য  শীতাংশুকে  বললাম,  খুব  খিদে  পেয়েছে,  কিছু  না  খেয়ে  হাঁটতে  আমার  খুব  কষ্ট  হচ্ছে।  ও  হরিশ,  কুমার  ও  গঙ্গাকে  ডেকে  ছাতু  মাখতে  বললো।  ছাতু  মাখা  হলে,  ওরা  সকলে  পরিমান  মতো  খেল।  আমি  এক  দলা  ছাতুও  খেতে  পারলাম  না।  আমার  তখন  মনে  হচ্ছে  রাস্তার  ওপরেই  গায়ে  কিছু  চাপা  দিয়ে  শুয়ে  পড়ি।  ছাতু  না  খাওয়ায়  শীতাংশু  জিজ্ঞাসা  করলো,  আমি  খেলাম  না  কেন ?  ভাল  লাগছে  না  উত্তর  শুনে, ও  ভীষণ  রেগে  গেল।  আমরা  একটু  বসে  আবার  হাঁটতে  শুরু  করলাম।  আমি  দেখতে পাচ্ছি  প্রতি  মিনিট  হাঁটা  পথে,  আমি  ওদের  থেকে  অনেক  পিছিয়ে  পড়ছি।  এইভাবে,  এই  গতিতে  হাঁটলে,  আমি  অসুস্থ  শরীর  নিয়ে  একা  পিছনে  পড়ে  যাব।  বাধ্য  হয়ে  আবার  ওদের  থামতে  বললাম।  জল  খেলাম। একটু সময় নষ্ট করে আবার হাঁটার চেষ্টা করলাম।

এইভাবে  আস্তে  আস্তে  সকাল  গড়িয়ে  দুপুর  হয়ে  গেল।  আমার  এখন  আর  এক  পা ও  হাঁটার  ক্ষমতা নেই।  গায়ে  প্রবল  জ্বর,  নাক  মুখ  দিয়ে  গরম  নিশ্বাস  পড়ছে।  বিশ্রাম  পাবার  আশায়  শরীর  এলিয়ে পড়ছে,  অথচ  দেবলের  আগে  বিশ্রামের  কোন  সুযোগ  নেই।  বাধ্য  হয়ে  শীতাংশুকে  ডেকে  আমার অবস্থার  কথা  বললাম।  ও  আমার  গায়ে  হাত  দিয়ে,  রীতিমতো  ভয়  পেয়ে  গেল।  ও  গঙ্গাকে  ডাকতে গেলে  আমি  বাধা  দিয়ে  বললাম,  গঙ্গা  শুনে  কী  করবে?  শরীর  খারাপ  শুনলে,  গঙ্গা  এখানে  কোথাও কোন  চালাঘরে  থেকে  যেতে  বলবে।  এখানে  কোন  ডাক্তার  নেই,  আমার  শরীরও বেশ  খারাপ।  কাল রাতে  ঠান্ডা  গরমে,  আমার  প্রচন্ড  ঠান্ডা  লেগে  গেছে।  এখন  যত  তাড়াতাড়ি  সম্ভব,  কাঠগুদাম  বা  অন্য  কোন  বড়  শহরে  ফিরে  যাওয়াই  ভাল।  ও  ভয়  পেয়ে  আমার  সঙ্গে  সঙ্গে,  খুব  আস্তে  আস্তে  হাঁটতে  লাগলো।  কিছুটা  হেঁটে  ও  একটা  মুসম্বি  লেবুর  গাছ  থেকে  ছোট্ট  একটা  লেবু  তুলে  আমাকে দিয়ে,  লেবুর  গন্ধটা  শুঁকতে  শুঁকতে  যেতে  পরামর্শ  দিল।  ও  জানালো  লেবুর  গন্ধে  শরীর  ভাল  লাগবে। ওকে বললাম আমার ঠান্ডা লেগেছে, জ্বর হয়েছে, কিন্তু গা বমি বমি করছে না, যে লেবুর গন্ধ শুঁকলে শরীর ভালো লাগবে। ও এবার আর আমার কথায় কান না দিয়ে, গঙ্গাকে ডাকলো। গঙ্গা সব শুনে আমাদের সাথে ওষুধ আছে কী না জিজ্ঞাসা করলো। আমি বললাম হরিশের কাছে যে ব্যাগটা আছে, তাতে সবরকম ওষুধই আছে। গঙ্গা আমাদের শুয়ে বসে বিশ্রাম নিতে বলে বললো, ও হরিশের কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে আসছে। একটু পরেই তার চিৎকার শুনতে পেলাম। সে চিৎকার করে হরিশকে ডাকছে। আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে সে খালি হাতে ফিরে এসে জানালো, হরিশ অনেক এগিয়ে গেছে। ওষুধের ব্যাগ নিয়ে হরিশ এগিয়ে চলে গেছে বলে, সে হরিশের উদ্দেশ্যে গালিগালাজ শুরু করে দিল। দেবলে ফিরে আজ তার একটা ব্যবস্থা করবে, তাও জানাতে ভুললো না। আসলে হরিশের রাগ হয়েছে। গঙ্গা জিজ্ঞাসা করলো আমি হাঁটতে পারবো কী না। না পারলে ও এখানে কোথাও থাকার ব্যবস্থা করবে। উত্তরে আমি জানালাম যে, আজ যে ভাবেই হোক, দেবলে ফিরে যাবই। গঙ্গা বললো হরিশ থাকলে ওর পিঠের মাল হরিশকে দিয়ে, ও আমায় পিঠে চাপিয়ে নিয়ে যেত। আমি জানালাম তার প্রয়োজন হবে না, তবে তোমরা একটু আস্তে হাঁটো, এগিয়ে যেও না। এর মধ্যে কুমারও গঙ্গার চিৎকার শুনে ফিরে এসে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। আমরা এবার খুব আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করলাম। গায়ে প্রবল জ্বর, পেট একদম খালি, গতি ক্রমশঃ কমতে শুরু করলো। গঙ্গা মাঝেমাঝেই উৎসাহ দিয়ে জানাচ্ছে, আমরা প্রায় দেবলের কাছাকাছি এসে গেছি। এইভাবে কখনও থেমে, কখনও বসে, কখনও বা একটু আধশোয়া হয়ে, সন্ধ্যার কিছু আগে দেবলে এসে হাজির হলাম।

গঙ্গা ঘর খুলে দিল। আমি শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়েই ঘরের বাইরে গঙ্গার সাথে হরিশের ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। গঙ্গা হরিশকে বলছে- “তুমি ওষুধের ব্যাগ নিয়ে আগে চলে এলে কেন? রাস্তায় যদি বাবুর কিছু হতো, তাহলে কী হতো? কে দায়িত্ব নিত”? ঝগড়া, কথা কাটাকাটি চলতেই লাগলো। এর মধ্যে কুমার দু’কাচের গ্লাশ গরম দুধ  আর দু’টো বড় বড় বালুসাই মিষ্টি নিয়ে এসে হাজির হলো। সে বললো এগুলো তার বাড়িতে জন্মাষ্টমীতে, পূজোর জন্য তৈরি হয়েছে। আমার এসব খেতে ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু সে আমাকে ওগুলো খেয়ে নিতে অনুরোধ করলো। আমি উঠে বসে খেয়ে নিয়ে, ব্যাগ খুলে একটা ক্রসিন টেবলেট্ খেয়ে নিলাম। একটু পরেই প্রচুর ঘাম হয়ে জ্বর কমে গেল। মাথার ভিতর একটা প্রচন্ড যন্ত্রণা বোধ করছিলাম। ঐ অবস্থায় শুয়ে শুয়ে, আমরা আমাদের রূপকুন্ড যাওয়ার অভিজ্ঞতা, জায়গাগুলোর সৌন্দর্য, ইত্যাদি নিয়ে নিজেরা আলোচনা করতে শুরু করলাম। গঙ্গা, কুমার ও হরিশ এক ধারে বসে, ও শীতাংশু তার চৌকিতে শুয়ে। আমি অবশ্য একরকম শ্রোতার ভুমিকায় ছিলাম। একটু পরে ওরা চলে গেল। আমরা চুপ করে শুয়ে থেকে অনেকক্ষণ পরে, রাতের খাবার খেতে গেলাম। অনেক দিন পরে খিচুড়ির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে, মাংস রুটি খেলাম। ঘরে ফিরে এসে আর একটা ক্রসিন খেয়ে শুয়ে পড়লাম। আজ আর নিদ্রা দেবীর আরাধনা করতে হলো না। একটু পরেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়লাম।

ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরেই। গায়ে আবার গতকালের মতো জ্বর ও মাথা ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙ্গলো। শীতাংশুকে বললাম দশটার সময় একটা ক্রসিন খেয়ে নেব। আধ ঘন্টার মধ্যে জ্বর কমে যাবে। সাড়ে দশটায় আমরা গোয়ালদামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবো। আট কিলোমিটার পথ যেতে যদি তিন ঘন্টাও লাগে, তাহলেও দেড়টা-দু’টোর মধ্যে পৌঁছে যাব। তারপরে আবার জ্বর ফিরে এলে, তখন দেখা যাবে।

কথা মতো আমরা তৈরি হয়ে দোকানে খেয়ে দেয়ে, দশটার সময় একটা ক্রসিন চার্জ করে দিলাম। হিসাব মতো সাড়ে দশটা নাগাদ জ্বরও কমলো, আমরাও সময় নষ্ট না করে, গোয়ালদামের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে দিলাম। গঙ্গারা আমাদের সাথে গোয়ালদাম পর্যন্তই যাবে। আমাদের মালপত্র পৌঁছে দিয়ে, ওরা ওদের গ্রামে ফিরে আসবে। দু’-তিন ঘন্টায় পৌঁছনোর জন্য আমি একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু মাঝপথেই আবার জ্বর বাড়তে শুরু করলো। রাস্তায় আবার একটা ক্রসিন খেয়ে বসে থাকলাম। কিছুক্ষণ পরে আবার হাঁটা শুরু করলাম। অবশেষে বিকেল বেলা গোয়ালদাম এসে পৌঁছলাম।

আমার অবস্থা এখন শোচনীয়। পিন্ডারী যাবার প্ল্যান, অনেক আগেই দেবলে বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু আমার গায়ে এত জ্বর, চোখ দুটো টকটকে লাল, ভালোভাবে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই দেখে, গঙ্গারা আজ রাতটা এখানেই থেকে, কাল ভোরে আমাদের বাসে তুলে দিয়ে নিজেদের গ্রামে ফিরে যাবে ঠিক করলো। আমার ঠান্ডা লেগেছে জানতে পেরে গঙ্গা শীতাংশুকে বুদ্ধি দিল, আমায় যেন একটুও জল খেতে না দেওয়া হয়। শীতাংশু কারো সাথে পরামর্শ করার সুযোগ না পেয়ে, গঙ্গার কথার ওপর আস্থা রাখলো। আমার জল পিপাসায় ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম, কিন্তু ও আমাকে এক ফোঁটা জল খেতে দিতে রাজি হলো না। শেষে অনেক কাকুতি মিনতির পর, ও এক ঢোক জল দয়া করে দিল। গঙ্গা এবার ওকে নিয়ে ডাক্তার ডাকতে চললো। আমি শীতাংশুকে অনেক ভাবে, এখানকার ডাক্তার ডাকতে বারণ করলাম। এখানে ডাক্তার বলতে কেউ নেই। কিছু কোয়াক ডাক্তার অবশ্য আছে, কিন্তু তারা কিছু হলেই সুঁই দেয়, অর্থাৎ ইঞ্জেকশান দেয়। সব অসুখেই প্রায় একই চিকিৎসা। এতে হিতে বিপরীত হবে। কিন্তু শীতাংশু তখন অসহায় অবস্থায় বোধবুদ্ধি, বিচার বিবেচনা শক্তি হারিয়েছে। “কানু বিনা গীত নাই” এর মতো “গঙ্গা বিনা গতি নাই” ধারণায়, ও গঙ্গাকে নিয়ে ডাক্তার ডাকতে চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল ডাক্তারের দেখা না পেয়ে। যাক্ বাঁচা গেল, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

হঠাৎ বাইরে একটা হৈচৈ শোনা গেল। কিছু বোঝার আগেই যারা আমাদের ঘরে ঢুকলো, তাদের দেখে তো আমরা ভুত দেখার মতো চমকে উঠলাম। বৈদিনী বুগিয়ালে যে দলটার সাথে আমাদের দেখা হয়েছিল, তারা ফিরে এসেছে। ওদের কাছে ফিরে আসার কারণ শুনে, মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বলা যায় ফিরে আসতে তারা বাধ্য হয়েছে। এখন বুঝতে পারছি, আমরা কত ভাগ্যবান। কত সহজে রূপকুন্ড দেখে, নির্বিঘ্নে ফিরে আসতে পেরেছি।

সেদিন আমরা বৈদিনী থেকে চলে আসার পরে, ঐ প্রচন্ড বৃষ্টিতে ওরা বৈদিনীর বাংলো ও টেন্টে আশ্রয় নেয়। ওদের কুলিদের মধ্যে একজন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওরা তাকে তাদের বুদ্ধি মতো ওষুধ দেয়। সম্ভবত তার ঠান্ডা লেগেছিল। ওরা তার বুকে পিঠে রাম মালিশ করে, রাম খাওয়ায়। তাতেও সে সুস্থ না হয়ে, আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়তে থাকে। তখন ওরা তাকে কোরামিন দেয়, গরম সেঁক দেয়। কিন্তু এতকিছু করার পরেও, কুলিটা আস্তে আস্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ওখানে না আছে ডাক্তার, না আছে পুলিশ। ফলে গাইডের কথা মতো, কুলিটাকে বৈদিনীতে কবর দিয়ে ওরা ফিরে এসেছে। এখন এখানে ওদের কুলিরা আরও অনেক লোক জরো করে ক্ষতিপুরণ দাবী করছে। ওরা তাই এ ব্যাপারে কী করা উচিৎ জানার, এবং এই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য‌, আমাদের কাছে সাহায্য চাইতে এসেছে।

একটা জলজ্যান্ত লোক, বিনা চিকিৎসায় অসহায় ভাবে মারা যাবার খবরটা শুনে আমরা খুব দুঃখ পেলেও, গঙ্গা আনন্দে নেচে নেচে ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। একজন লোকের মৃত্যু যে আর একজন লোকের এত আনন্দের, নাচের কারণ হতে পারে, আগে জানা ছিল না। এইবার গঙ্গার কথায় তার এই নাচের কারণ জানা গেল। ওদের গাইড, রাম সিং গঙ্গার মামাতো ভাই হয়। এই ঘটনার পরে রাম সিং এর ওপর যাত্রীদের আস্থা কমে যাবে। পরোক্ষ ভাবে গঙ্গার ব্যবসা আরও ফুলে ফেঁপে উঠবে।

নদীর এক পার ভাঙ্গে, অপর পার গড়ে। রাম সিং এর ব্যাড উইল, গঙ্গা সিং এর গুড উইলের কারণ, তাই এত নাচাকোঁদা। এখন মনে হচ্ছে আমার অসুস্থতায় তার এই ব্যস্ততা, তার এত ভয় পাওয়ার কারণও হয়তো সেই ব্যাড উইল।

যাহোক্, ওদেরকে বলা হলো কিছু টাকা পয়সা দিয়ে একটা বোঝাপড়া করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। গঙ্গাও তাই বললো। ওরা আমাদের ওদের সঙ্গে গিয়ে কুলিদের সঙ্গে কথা বলতে অনুরোধ করলো। কিন্তু শীতাংশু আমার শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে, ওদেরকে নিজেদেরই কথা বলতে বললো। আমি বললাম, কাল প্রথম বাসেই ওদের এখান থেকে চলে যাওয়া উচিৎ। ওরা এখানে যত বেশি সময় নষ্ট করবে, ঝামেলা, চাহিদা, তত বাড়বে। ওরা এবার আমাদের সাথে এক বাসে কাঠগুদাম যাবার কথা বললো। ওরা ওদের দল ভারী করতে চাইছে। কিন্তু এতে আমাদেরও লাভ কম নয়। কাল সকাল থেকে গঙ্গারা আর আমাদের সাথে থাকবে না। বাড়ি ফিরতে এখনও অনেক, অনেক পথ বাকি। ওরা সঙ্গে গেলে অন্তত হাওড়া পর্যন্ত ওদের সঙ্গ পাওয়া যাবে। উপকার কতটা হবে জানি না, তবু লোকবল তো প্রয়োজন হতেই পারে। ভোরের বাসে ফেরার কথা ঠিক করে, ওরা চলে গেল। আমরাও আর কিছুক্ষণের মধ্যেই খাওয়া দাওয়া সারতে গেলে, আগের পরিচিত সেই হোটেল মালিক আমার অসুস্থতার কথা শুনে বললেন, বাবু বাড়ি ফিরে গিয়ে মা’র হাতের ইলিশ মাছের ঝোল ভাত খেলেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। কথায় আছে না—“চাকরি করি তো পুলিশ, মাছ খাই তো ইলিশ”। যাহোক্ খাওয়া সেরে ফিরে এসে, শুয়ে পড়লাম।

আজও ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। রাতেই শীতাংশু গিয়ে গোয়ালদাম থেকে কাঠগুদামের বাসের টিকিট কেটে একবারে সামনের সিট্ রিজার্ভ করে এসেছে। আমরা তৈরি হয়ে বাসে গিয়ে একবারে সামনের সিটে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে ওরাও বাসে এসে বসলো। ওদের দেখে মনে হলো, ওদের টেনশন কমেছে। বোধহয় টাকা পয়সা নিয়ে একটা বোঝাপড়া হয়েছে। যাহোক্, সমঝোতা হলেই মঙ্গল। বাস ছাড়বার ঠিক আগে, আমার ডানদিকের সিটে জানালার ধারে সেই এভারেষ্ট বিজয়ী লামা সাহেব এসে বসলেন। বাস ছাড়তে গঙ্গারা হাত মেলালো। আস্তে আস্তে আমরা ওদের ছেড়ে চিরতরে দুরে চলে গেলাম। বাসের সিটে হেলান দিয়ে আধ শোয়া হয়ে চোখ বুজে রইলাম। শরীর একদম ভালো নয়। গায়ে বেশ জ্বর। অনেকটা পথ বাস জার্নি করে কাঠগুদাম। সেখান থেকে এক রাত্রি ট্রেন জার্নি করে লক্ষ্ণৌ। সেখান থেকে আবার এক রাত্র্রি ট্রেন জার্নি করে হাওড়া। আমার অবস্থার কথা শুনে নতুন সঙ্গীরা বললো, লক্ষ্ণৌতে নেমে ভালো ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা করা যাবে। যাহোক্, কোনরকম নতুন ঝামেলা ছাড়াই আমরা একসময় কাঠগুদাম এসে পৌঁছলাম। ট্রেন আসতেই নতুন সঙ্গীরা কামরায় উঠে, আমার শোবার ব্যবস্থা করে দিল। আমাদের সিটের সামনে ওদের ও আমাদের সমস্ত মালপত্র এমন ভাবে রাখলো, যাতে সহজে কেউ আমাদের কাছে যেতে না পারে। রিজার্ভেশন পাওয়া না গেলেও, ওদের সহযোগীতায়, আমাদের বিশেষ কোন অসুবিধা হলো না। ওদের সেই বড় বড় তেনজিং নোরগে মার্কা কথাবার্তা বা হাবভাব আর নেই। রাতটা ভালোয় ভালোয় কেটে, একসময় আমরা লক্ষ্ণৌ এসে পৌঁছলাম। এখনও আমার জ্বর, চিকিৎসার অভাবেই বোধহয়, এতটুকু কমেনি।

ওরা ডাক্তার দেখাবার আগে, হাওড়ার রিজার্ভেশনের চেষ্টা শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত ওরা রিজার্ভেশনও ম্যানেজ করে ফেললো। তবে বিভিন্ন স্টেশন থেকে বিভিন্ন জনের, যখন যেরকম, যেখানে পাওয়া যাবে, শর্তে ম্যানেজ হলো। ডাক্তার আর দেখানো হলো না। বেশ কিছু সময় আমাকে বসে যেতে হলো। অবশেষে আমার শোবার ব্যবস্থাও হয়ে গেল। একে একে, আর সকলেরই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বার্থ ম্যানেজ হলো। গোটা ট্রেন জার্নিটাই আমি প্রায় অচৈতন্য অবস্থায়, ঘুমের ঘোরে পড়ে থাকলাম। অবশেষে একসময়, শেষপর্যন্ত আমরা হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছতে সক্ষম হলাম। ওরা বিদায় নিয়ে চলে গেল। শীতাংশু আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, আমি একা বাড়ি যেতে পারবো কী না। আমি ওকে আমায় ট্রেনে তুলে দিয়ে যেতে বললাম। ও আমার মালপত্র, মানে প্রায় সব মালপত্র সমেত আমাকে ট্রেনে তুলে দিল। নির্দিষ্ট স্টেশনে নেমে, কুলির মাথায় মাল চাপিয়ে, বাড়ি ফিরে এসে বিছানা নিলাম। ডাক্তার এলেন, পরীক্ষা করে চিকিৎসা শুরু হলো। কোন রকমে পরের দিন অফিস জয়েন করে, সিক্ লিভ্ নিলাম। ওজন নিয়ে দেখলাম, আমার ওজন প্রায় পাঁচ কিলোগ্রাম এর ওপর কমে গেছে। হিমালয় মানুষের রক্ত শুষে নেয় বলে নাকি প্রবাদ আছে। তা নিক্, আমার তাতে কিছুমাত্র দুঃখ নেই।

ভবিষ্যতের রূপকুন্ড যাত্রীদের জানাই, রূপকুন্ড যাবার কষ্ট হয়তো অনেক, বিপদও হয়তো পদে পদে আছে, আমাদেরও হয়তো ফিরেই আসতে হতো, যদি না গঙ্গা সিংকে সাথে পেতাম। ওর ঠিকানা দিলাম। ওকে সাথে পেলে, বিপদ ও দায়িত্ব অর্ধেক কমে যাবে, এবং রূপকুন্ডে পৌঁছনোর নিশ্চয়তা দ্বিগুন বেড়ে যাবে।

গঙ্গা সিং, / প্রযত্নে-বীর সিং নেগী, / গ্রাম-পূর্ণা, / পোষ্ট- দেবল, / জেলা-চামোলী, / উত্তর প্রদেশ।

সুবীর কুমার রায়।

১০-১০-১৯৮১

Advertisements

তাল ফল টক (স্মৃতির পাতা থেকে) { লেখাটি বই পোকার কলম, বাংলায় লিখুন, ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত}

কলেজে পড়ার সময় ব্যাতড়ে দীপুদার দোকানে বা অজিতের চায়ের দোকানে আড্ডাটা বেশ ভালোই চলছিল। রেল লাইনের পাশ দিয়ে একটা  ভাঙাচোরা পাকা রাস্তা ছিল। এখন সেটা আরও ভাঙ্গা ও অবহলিত, কারণ ঐ রাস্তা এখন আর ব্যবহৃত হয় না। পাশ দিয়ে এখন কোনা এক্সপ্রেস হাইওয়ে বয়ে গেছে। ঐ আধভাঙা রাস্তার ধারে একটা কালভার্টের ওপর সিমেন্ট বাঁধানো বেঞ্চির মতো ছিল। সেটার ওপর বসেও আমরা আড্ডা মারতাম। শীতের সন্ধ্যায় একদিন ঐ বেঞ্চে বসে আছি। শীতকাল, সবাই সিগারেট ধরাবার জন্য ব্যস্ত, কিন্তু কারো কাছেই দেশলাই নেই। এমন সময়, বিড়ি বা সিগারেট টানতে টানতে চাদরমুড়ি দিয়ে একজনকে আসতে দেখা গেলে, রাঘব উঠে গিয়ে বললো, “দাদা একটু আগুনটা দেবেন”? সঙ্গে সঙ্গে লোকটা সপাটে রাঘবকে একটা চড় কষিয়ে দিল। রাঘব, মাধবের আত্মীয় ও একটু দাদা দাদা গোছের ছেলে, ব্যাতড়েই থাকে। আমাদের থেকে বয়সে সামান্যই ছোট। অমন একটা সুস্বাদু পুষ্টিকর চড় খেয়েও রাঘব লোকটাকে কিছু না বলে, গালে হাত বোলাতে বোলাতে চুপচাপ্ চলে গেল। পরে জানা গেল, রাঘবের বাবা সান্ধ্য ভ্রমণ সেরে ফিরছিলেন, আর বেচারা রাঘব তাঁকেই গিয়ে “দাদা একটু আগুনটা দেবেন” বলে বসেছে।

সন্ধ্যার দিকে আমাদেরও খুব সাবধানে থাকতে হতো, কারণ ঐ সময়ে মাধবের দাদু সান্ধ্য ভ্রমণ সেরে বাড়ি ফিরতেন। মাধব দাদুর বাড়িতেই মানুষ হয়েছে। দাদু আমাদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন বটে, কিন্তু আমরা তাঁকে খুব ভয়ও পেতাম। তবে তাঁর চোখের আড়ালে আমরা সবই করতাম।

দাদুর বাড়ির পিছনে ও দাদুর বাড়ি ও পাশের দীপুদার বাড়ির মাঝখানে, দু’-তিনটে নারকেল গাছ ছিল। মাধবদেরই গাছ। একদিন দুপুরে মাধবের বাড়ি পড়তে গিয়ে নারকেল পাড়ার পরিকল্পনা হলো। দরজা খুলে বাইরে গেলে অনেক প্রশ্ন উঠতে পারে। ফিরে আসার সময়ও সেই একই বিপদের সম্ভাবনা, কেউ জেগে গেলে জানাজানি হবেই, এবং তাতে বিপদ ও ঝামেলার সম্ভাবনাও যথেষ্ট। আমরা ওপরে দোতলার ঘরে পড়তাম। দোতলা থেকে কায়দা করে রান্নাঘর বেয়ে নেমে পাঁচিল টপকে গিয়ে, পিছনের গাছ থেকে নারকেল পেড়ে আনলাম। কাক পক্ষীতে টের পেলে ক্ষতি ছিল না, ক্ষতি ছিল দাদু টের পেলে, কিন্তু কেউ কিছু জানার আগে একই কায়দায় দোতলার ঘরে ফিরে এলাম। আর একদিন সন্ধ্যাবেলা পাশের গাছ থেকেই নারকেল পাড়লাম। গাছটা ঠিক জানালার পাশে হলেও সন্ধ্যাবেলা সম্ভবত মশার আগমন থেকে বাঁচতে, সমস্ত জানালা বন্ধ করে রাখা ছিল। আমি ভর সন্ধ্যায় নারকেল গাছে উঠেছি জানলে আর রক্ষা ছিল না। নারকেল গাছে আমি আগেও অনেক উঠেছি, কাজেই বিপদ কিছু হতো না, তবে বিপদে পড়েছিলাম তাল গাছে উঠে।

ঘটনাটা যদিও অনেক পরের। গ্র্যাজুয়েট হয়ে যাবার পরে, তখনও আমরা চাকরি পাইনি। রোজ সকাল বিকেল ব্যাতড়ে আড্ডা মারতে যাই। রেল লাইনের ঠিক পাশে, পরপর কয়েকটা তালগাছ ছিল। তাতে কচি কচি তাল হয়ে আছে দেখে একদিন তালশাঁস খাওয়ার প্ল্যান হলো। অনেক খুঁজেও গাছ থেকে তাল পেড়ে দেওয়ার লোক পাওয়া গেল না। শেষপর্যন্ত ঠিক হলো নিজেরাই তাল পেড়ে, তাল কেটে শাঁস খাওয়া হবে। অতীত অভিজ্ঞতার একমাত্র অধিকারী, এই অগতির গতির কপালেই সেই মহান দায়িত্ব পড়লো। আমি আগে কোনদিন তাল গাছে উঠিনি বটে, তবে ধরেই নিয়েছিলাম যে দু’টো গাছেরই কান্ডের গঠন যখন একই রকম, তখন গাছে ওঠায় কোন অসুবিধা হবে না। আমি একটা কাটারি নিয়ে খুব কায়দা করে গাছে উঠতে শুরু করলাম। নীচে সবাই ঘাড় তুলে তীর্থের কাকের মতো আমার সাফল্য ও তালের আশায় অপেক্ষা করতে লাগলো। নারকেল গাছের পাতা শুকিয়ে গেলে নীচের দিকে মুখ করে ঝুলে থাকে, কিন্তু তাল গাছের আবার কাঁচা পাতাও নীচের দিকে ঝুলে থাকে দেখছি। ঐ ঝুলে থাকা পাতা পর্যন্ত উঠে কাঁটা ভর্তি পাতা সরিয়ে ওপরে উঠতেও পারছি না, তালের নাগালও পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে কাটারি দিয়ে তাল কাটার পরিবর্তে পাতা কাটার চেষ্টায় মাতলাম, সফল হলে আরও কিছুটা ওপরে উঠে তাল কাটা, তারপরেও বেঁচে থাকলে তালশাঁস খাওয়া। গাছগুলো রেলের জমিতে, রেলের সমস্ত কর্মচারী আমাদের পরিচিত, কাজেই ধরা পড়ার বা ঝামেলা হওয়ার কোন ভয় নেই। কিন্তু ভোঁতা কাটারিটা বোধহয় প্রস্তর যুগ শেষ হয়ে লৌহ যুগ আরম্ভের সময় তৈরি হয়েছিল। অনেক চেষ্টা করে একটা পাতাও কাটতে সক্ষম না হয়ে অনেকক্ষণ তালগাছের পাতা ধরে, গাছের কান্ডে পা জড়িয়ে হাওড়া ব্রিজে ওঠা পাগলের মতো বসে থেকে, পা কাঁপতে শুরু করলো। অনেক দিনের অভ্যাস, বিনা রেওয়াজে নষ্ট হয়ে গেছে। শেষপর্যন্ত ‘তাল ফল টক’ এই সিদ্ধান্তে এসে, নীচে নেমে আসতে বাধ্য হলাম। গাছ থেকে নেমে এসে দেখি জামা, প্যান্ট, হাত, পা, গোটা শরীর, কয়লা ও ডিজেল ইঞ্জিনের ধোঁয়ার ভুষো কালিতে কালো হয়ে গেছে। তখন বুঝলাম যুগ যুগ ধরে ইঞ্জিনের কালো ধোঁয়ার ভুষো কালিতে তালগাছের কান্ড অনেকটাই মোটা হয়ে গেছে। কোন পর্বত শৃঙ্গ প্রথম জয়ের চেষ্টার মতো আমিই বোধহয় প্রথম এই তালগাছ জয়ের চেষ্টা করে বিফল হয়ে ফিরে এলাম। যাহোক্ হাজার ধুয়েও এই কালি তুলতে না পেরে, মোটামুটি কিছুটা পরিস্কার হয়ে, অজিতের চায়ের দোকানে তালশাঁসের পরিবর্তে চা খেয়ে, আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরলাম।

সুবীর কুমার রায়

২১-১১-২০১৭

লাভের বখরা

দীর্ঘক্ষণ খদ্দেরের আশায় তার ভাঙাচোরা ট্যাক্সিটা নিয়ে অনুকূল অপেক্ষা করে গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন চালু করতে যাবে, এমন সময় তিনজন সাধু গোছের মানুষ তার কাছে এসে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসা করলো “নিউ আলিপুর যায়গা”? অনুকূল সম্মত হয়ে গাড়ির মিটার ডাউন করলো। তিনজনের পরনেই অদ্ভুতভাবে পরা ধবধবে সাদা ধুতি, সাদা চাদর, মাথায় গেরুয়া রঙের পাগড়ি, কপালের ওপর থেকে ভ্রু পর্যন্ত চওড়া কমলা রঙের সিঁদুরের টিপ, গায়ে তীব্র আতরের গন্ধ।

“নিউ আলিপুরের কোথায় যাবেন”?

“লক্সমীনারাণ্ প্যালেস যায়গা। তুমে মালুম হ্যায় ও মকান কিধার হ্যায়”?

“বুঝেছি, ওই তিনতলা যে বড় বাড়িটা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হচ্ছে তো”? যাওয়া আসার পথে সে অনেকবার বাড়িটা লক্ষ্য করেছে। যেকোন লোকের বাড়িটার ওপর নজর যাবেই। বড় রাস্তার ওপর পাঁচিল দিয়ে ঘেরা প্রায় চার কাঠা জমির ওপর রঙিন মার্বেল মোড়া বাড়িটা নজর পড়তে বাধ্য।

“সহি পহচানা, লেকিন উও মকান তৈয়ার হো গয়া। আজ গৃহপ্রবেশ হ্যায়। হাম তিন আদমি পূজাপাঠ আউর যজ্ঞ করনে কে লিয়ে রাজস্থান সে ইধার আয়া হ্যায়। জানতা হায় ইসি লিয়ে কিতনা রুপিয়া হামলোগোকো মিলেগা? আইডিয়া তো করো। হাম লোগোকো আশশি হাজার রুপিয়া ইসি কাম করনেকে লিয়ে মিলেগা, আশশি হাজার, প্রণামি আলাগ”।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনুকূল স্বগতোক্তি করলো আআআশিইই হাআআজাআআর!

“আশশি হাজার বহুত যাদা হো গিয়া কেয়া? জানতা হায় উসি এরিয়া মে চার কঠ্ঠা জমিনকা ভাও কিতনা? ও মকানকে লিয়ে লক্সমীনারাণ্ ঝুনঝুনওয়ালা সাহাব কিৎনা রুপয়া খরচ কিয়া? নও কোরোর রুপয়া। নও কোরোর রুপিয়াকা মকানকা পূজাপাঠকে লিয়ে আশশি হাজার রুপয়া বহুত যাদা হো গিয়া কেয়া”?

অনুকূল কথা না বাড়িয়ে চুপ করে গাড়ি চালিয়ে একসময় নির্দিষ্ট বাড়ির খোলা গেটের ভিতর দিয়ে প্রবেশ দ্বারের কাছে গাড়ি দাঁড় করালো।

প্রবেশ দ্বারের কাছে বহু লোকের ভিড়, কিন্তু পরিবেশটা যেন কিরকম থমথমে। একজন সাধু কত ভাড়া উঠেছে জিজ্ঞাসা করায় অনুকূল জানালো “দুশ’ পঁচাশি রুপয়া”। সাধুটি তিনটি একশ’ টাকার  নোট দিলে সে একটা দশ টাকার নোট ও একটা পাঁচ টাকার কয়েন ফেরৎ দিল। সাধুটি একটু সময় নিয়ে “ইয়ে রাখ দেও” বলে  পাঁচ টাকার কয়েনটা তাকে ফেরৎ দিল।

অনুকূল গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে আসার সময় বাড়ির ভিতর থেকে হঠাৎ তীব্র কান্নার আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে গেল। জানা গেল গতকাল গভীর রাতে বাড়ির মালিক লক্ষ্মীনারায়ণ বাবু হৃদরোগে পরলোক গমন করেছেন। আজ তাই আর গৃহপ্রবেশ হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, প্রথম দিনই এই অঘটন ঘটায় তাঁর স্ত্রী ঊমা দেবী নিশ্চিত, যে এই বাড়ির কোন বাস্তুদোষ আছে। তিনি আর কোন ঘটনা ঘটার আগেই আগামীকালই এই বাড়ি ছেড়ে দেশে ফিরে যেতে চান। যে প্রোমোটারকে দিয়ে বাড়িটা তৈরি করানো হয়েছিল, তাঁকেই বাড়িটা বিক্রি করার দায়িত্ব দিলে, তিনি একমুহুর্ত সময় নষ্ট না করে জলের দামে বাড়িটি কিনে নেওয়ার চুক্তি করে এক কোটি টাকার একটি চেক অগ্রিম হিসাবে ঊমাদেবীকে দিয়েও দিয়েছেন।

অনুকূলের আজ আর খদ্দেরের অভাব নেই, তার ট্যাক্সিতেই ওই তিনজন আবার আগের জায়গায় ফিরে চললেন। তাদের মুখে আর সেই হাসির রেশ নেই। সেটা লক্ষ্মীনারায়ণ বাবুর মৃত্যুর জন্য, না আশশি হাজার রুপয়া হারানোর জন্য বোঝা গেল না।

সুবীর কুমার রায়

১৮-১১-২০১৭

 

 

 

সোনকুপি বানজারা ক্যাম্পে দুটো দিন { লেখাটি Tour & Tourists ও Weekend tours from Kolkata পত্রিকায় প্রকাশিত}

 

 

বেশ কিছুদিন ধরে পশ্চিম বঙ্গের সবথেকে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র উত্তর বঙ্গ বিভিন্ন কারণে উত্তপ্ত থাকায়, ভ্রমণপিপাসু মানুষের ঢল হাতের কাছের দিঘা ও পুরীর ওপর সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই আছড়ে পড়েছিল। এছাড়া আর যেখানে ভ্রমণার্থীর ভিড় উপচে পড়ছে, সেটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হলেও দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। জায়গাটা হচ্ছে পুরুলিয়া। পুরুলিয়া আমি অনেক বছর আগে বেশ কয়েকবার গিয়ে থাকলেও, সেই অর্থে ঘুরে দেখা হয় নি। অবশেষে গত একুশে অক্টোবর, ২০১৭ তারিখে তিনদিন দুই রাত্রির একটা ঝটিকা সফর সেরে যারপরনাই মুগ্ধ হলাম।

গত ২১ তারিখ রাতে ৫৮০১১ আপ হাওড়া চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে সাতটি বার্থ বরাভূম পর্যন্ত বুক করে ফেললাম। এই ট্রেনে পাঁচ জন মহিলা ও একটি পাঁচ বছরের শিশুকে নিয়ে আমাদের মোট সাড়ে সাতজনের যাওয়ার কারণ একটাই, আমরা বরাভূম স্টেশনে নামবো, পুরুলিয়ায় নয়। এখান থেকে তেইশ কিলোমিটার দূরের সোনকুপি বানজারা ক্যাম্পে গিয়ে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। পুরুলিয়া স্টেশন থেকেও যাওয়া যায়, তবে সেক্ষেত্রে প্রায় বাহান্ন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে।

সোনকুপি বানজারা ক্যাম্পের বরুণবাবু আমাদের জানান যে, বরাভূম স্টেশনের ঠিক বাইরে থেকে গাড়ি পাওয়া যায়, দরদাম করে গাড়ি নিলে হয়তো দু-একশ’ টাকা ভাড়া কমও পড়ে, তবে ক্যাম্পের সাথে যে সমস্ত গাড়ি নিয়মিত যোগাযোগ রাখে বা যাতায়াত করে, তাদের কাউকে বলে দিলে তারা সাতশ’ টাকা ভাড়ায় স্টেশন থেকে ক্যাম্পে পৌঁছে দেবে। আরও জানা গেল যে এই গাড়িগুলো দেড় হাজার টাকা ভাড়ায় পুরুলিয়া ও সাড়ে তিন হাজার টাকায় পুরুলিয়ার বেশ কয়েকটা জায়গা ঘুরিয়ে দেখায়। যদি মনে করেন ওইসব গরীব ছেলেদের দু-একশ’ টাকা বেশি দিয়ে সাহায্য করতে রাজি আছেন, তাহলে আমাদের বললে আমরা ট্রেন পৌঁছনোর সময় গাড়ি পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করে দেবো। আমরা কোন ঝামেলায় না গিয়ে বানজারা ক্যাম্পকেই আমাদের সাত জনের জন্য একটা বড় গাড়ি সময় মতো স্টেশনে পাঠাবার অনুরোধ করি। ওদের যদিও নিজেদের গাড়ি নেই, তবে কিছু গাড়ি ভাড়ার আশায় ওদের সাথে যোগাযোগ রাখে। ওরা জানায় যে সাতশ’ টাকা ভাড়ায় একটা স্করপিও গাড়ি সময়মতো পাঠিয়ে দেবে। আমাদের হাওড়া থেকে বরাভূম যাওয়ার, ও পুরুলিয়া থেকে হাওড়া ফেরার কনফার্ম টিকিট কাটা হয়ে গেছে, থাকার জন্য তিনটে ডিলাক্স টেন্ট্ বুক করা হয়ে গেছে, কাজেই এবার শুধু যাওয়ার অপেক্ষা মাত্র। একটা অসুবিধা বেশ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। এই ক্যাম্পটির চেক আউট সকাল দশটায়। আমাদের ফেরার ট্রেন রূপসি বাংলা বিকেল তিনটে পঁয়ত্রিশ মিনিটে পুরুলিয়া থেকে ছাড়ে। এই সাড়ে পাঁচ ঘন্টা সময় আমরা একটা বাচ্চা নিয়ে কিভাবে কাটাবো, খাবই বা কোথায়। আমাদের কথায় তারা আশ্বস্ত করে জানান যে সকাল দশটা বাজলেই কেউ আমাদের টেন্ট্ ছেড়ে দিতে হুকুম করবে না। নতুন পর্যটকের ভিড় হলে হয়তো দশটার পর একটা বা দুটো টেন্ট্ খালি করে দিয়ে বাকি একটায় ওই দু-তিন ঘন্টা সময় কাটিয়ে দিতে হতে পারে। ওই সময়ের মধ্যে বেশ খানিকটা সময় আবার মধ্যাহ্নভোজের জন্য ডাইনিং হলেই কেটে যাবে। আমরা প্রাতরাশ ও মধ্যাহ্নভোজ সেরে দুপুর একটায় পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলে, স্বচ্ছন্দে বিকেল তিনটে পঁয়ত্রিশের রূপসি বাংলা ধরতে পারবো। প্রতিদিন দু’জনের জন্য টেন্ট্ ভাড়া এক হাজার চারশ’ টাকা, ও অন্যান্য দিনে সারা দিনের খাবার খরচ সাড়ে চারশ’ টাকা হলেও, ওই দিন টেন্টের কোন ভাড়া লাগবে না ও খাবার খরচ আড়াইশ’ টাকা দিতে হবে। এরপরে আর অসুবিধার কোন কারণ থাকতে পারে না।  

নির্দিষ্ট দিনে সময়ের বেশ আগেই আমরা সাতজন বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে হাওড়া স্টেশনে গিয়ে হাজির হলাম। বেশ ভিড়, বসার জায়গা পাওয়াই দুস্কর। মানুষ বড় নিন্দুকের জাত, তাই অপরিস্কার, অব্যবস্থা, অযথা হয়রানি, ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করে, সমালোচনা করে। হাওড়া স্টেশনে দেখলাম একই জায়গায় পাঁচ-পাঁচটা কুকুর কি সুন্দর মিলেমিশে ঘোরাফেরা করছে, ছুটে বেড়াচ্ছে, কোন ক্ষোভ নেই, নেই কোন অভিযোগ। বসে বসে যখন ক্লান্ত হয়ে গেছি, তখন আমাদের কাঙ্খিত ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে হাজির হলো। আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে, প্রায় ঘন্টাখানেক বিলম্বে আমাদের বরাভুমের উদ্দেশ্যে যাত্রা হলো শুরু।

হাওড়া স্টেশন থেকে যখন এক ঘন্টা বিলম্বে যাত্রা শুরু করেছে, তখন এক ঘন্টা নাহোক তার আশেপাশে কোন একটা সময়ের বিলম্বে বরাভূম পৌঁছনোর হক্ অধিকার ট্রেনটির থাকবেই। আমরাও তাই নির্দিষ্ট সময়ের বেশ কিছু পরে বরাভূম এসে পৌঁছলাম। কিছুক্ষণ আগেই আমাদের ফোনে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ৯২৮৫ নম্বরের একটা লাল রঙের স্করপিও গাড়ি বরাভূম স্টেশনের বাইরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সুতরাং চিন্তামুক্ত হয়ে আমরা স্টেশনের বাইরে এসে হাজির  হলাম।

স্টেশনের বাইরে যেখানে গাড়ি বা অটো দাঁড়িয়ে থাকে, দূর থেকে দেখলাম অল্প কিছু গাড়ির মধ্যে একটা মেরুন রঙের বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে নাম্বার দেখে গাড়ির কাছে এগিয়ে যেতেই ড্রাইভার, মহাদেব এসে আমাদের মালপত্র গাড়ির ছাদে গুছিয়ে তুলে বাঁধাছাঁদা শুরু করে দিলো। আমরা পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে নিশ্চিন্তে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিলাম।

গাড়ি ছেড়ে দিলো। রাস্তা খুব ভালো, তাই বেশ দ্রুত গতিতে আমরা এগিয়ে চললাম। একসময় আমাদের গাড়ি পাকা রাস্তা ছেড়ে এবড়ো খেবড়ো মেঠো পাথুরে রাস্তা ধরলো। রাস্তার দুদিকে বড় বড় গাছ। বুঝলাম আমরা সোনকুপি ক্যাম্পে প্রবেশ করতে চলেছি। লাফাতে লাফাতে গাড়ি এসে একসময় সোনকুপি বানজারা ক্যাম্পের নিজস্ব এলাকার ভিতর দাঁড়ালো। প্রথম দর্শনেই জায়গাটার প্রেমে পড়তে হবে। বাঁহাতে একটা একতলা ছোট বাড়ি, বাড়ি ঠিক নয় হলঘরের মতো। তার পাশে কয়েকটা খাটিয়ায় কয়েকজন বসে গুলতানি করছে। বিস্তীর্ণ মাঠের মতো জমিতে বড় বড় পলাশ গাছে ভরা। এখন পলাশের সময় নয়, তাই ফুলহীন। শুনলাম ছয় বিঘা জমির ওপর এই বানজারা ক্যাম্পটি তৈরি করা হয়েছে। জমির চারপাশে বেড়া বা এক কোমর জংলি গাছ, জমির সীমানা নির্দেশ করছে। মাঠের মতো জমির দু’পাশে বেশ কয়েকটি টেন্ট্।  

না, আর দেখার সুযোগ হলো না, কারণ একটি কর্মচারী ডোরাকাটা লাল সবুজ রঙের অনেকগুলি নতুন গামছা নিয়ে এসে সরু করে ভাঁজ করে করে প্রত্যেকের গলায় উত্তরীয়র মতো করে পরিয়ে  দিয়ে, হাতে একটি করে ছোট্ট টর্চ দিয়ে বরণ করে নিলেন। পাঁচ বছরের শিশুটিও কিন্তু এই সাদর আপ্যায়ণ থেকে বঞ্চিত হলো না। এখানে চেক আউটের সময় সকাল দশটা, আমরা দশটা বাজার অনেক আগেই এসে পৌঁছেছি। আমরা চেয়ারে কিছুক্ষণ বসে ও মাঠটা ঘুরে ঘুরে দেখে সময় কাটালাম। ইতিমধ্যে পাশাপাশি দুটো টেন্ট্ পরিস্কার করে আমাদের দেওয়া হলো। তার পাশের টেন্টটি তখনও আগের দল ছেড়ে চলে না যাওয়ায়, আমাদের দলের মহিলারা শিশুটিকে নিয়ে দুটি টেন্টের ভিতর ঢুকে একে একে স্নান সেরে পরিস্কার কাপড় জামা পরে নিল। আমরা তিনজন পুরুষ একটা টেন্টের বাইরে খাটিয়ায় বসে সময় কাটাতে লাগলাম। সকলে তৈরি হয়ে নিলে ডাইনিং হলে জলখাবার খেতে গেলাম। ওদের অনুরোধ করা হলো বাচ্চার ও তার মায়ের জলখাবারটা তাদের টেন্টে দিয়ে আসতে। বিনা বাক্যব্যয়ে তারা খাবার দিয়ে আসতে সম্মত হলো। মর্নিং শোজ দা ডে কথাটা মনে পড়ে গেল। গরম গরম লুচি, আলু মটরের তরকারি, ডিম সিদ্ধ, ও বেশ মোটা মোটা নরম রংহীন জিলিপি ও চা দিয়ে দিনের শুভ সূচনা হলো। জিলিপিগুলো যে কি অপুর্ব খেতে বোঝাতে পারবো না। শুধুমাত্র এই জিলিপির লোভে আমি আবার একবার যেতে রাজি আছি। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম ওগুলো তাদের তৈরি নয়। বাইরে, অর্থাৎ সেই বড় রাস্তার কোন দোকান থেকে কিনে আনা হয়েছে। যাবার আগে খাবারের ব্যাপারে, বিশেষ করে সঙ্গের পাঁচ বছরের শিশুটির খাবারের ব্যাপারে যে তথ্যগুলি আমাদের জানানো হয়েছিল, তাতেই আমি নিশ্চিন্ত শুধু নয়, মুগ্ধ হয়েছিলাম বলা যায়। আমাদের পরিস্কার ভাবে জানানো হয়েছিল, যে ওখানে আমাদের এখানকার হোটেল রেস্টুরেন্টের মতো আধুনিক খাবার দেওয়া সম্ভব হবে না। স্থানীয় মানুষেরা রান্না করে, কাজেই বাড়ির রান্নার মতোই খাবার পরিবেশন করা হবে। পাঁচ বছরের বাচ্চার জন্য কোন খাতেই একটা পয়সাও লাগবে না। ওদের বলে দিলে ওরা বাচ্চার জন্য মাছ ভাজা, আলু ভাজা রেখে দেবে। ইচ্ছা করলে বাচ্চার মা নিজেও বাচ্চার রান্নাটা করে নিতে পারে।

ধীরে ধীরে আশপাশের সমস্ত টেন্টের ভ্রমণার্থীরাই ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে মালপত্র নিয়ে নিজ নিজ গাড়িতে গিয়ে বসলো। নিমেষের মধ্যে গোটা এলাকা নির্জন হয়ে গেল। আমাদের ঠিক পাশের টেন্টটা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে, টেন্টের বাইরে একটা খাটিয়া পেতে দিয়ে, আমাদের তৃতীয় টেন্টটি দিয়ে দেওয়া হলো। এতক্ষণে আগের টেন্টদুটিতে বিশ্রামরতা মহিলারা জানালেন যে পিছন থেকে রোদ এসে টেন্টের ওপর পড়ায়, টেন্টদুটি বেশ উত্তপ্ত। তাই মাঠের অপর দিকের টেন্টগুলোয় চলে যেতে পারলে সুবিধা হতো। নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। ক্যাম্পের একটি কর্মচারীকে ওপারের টেন্টের কথা বলায়, সে জানালো যে, সব টেন্ট ফাঁকা ও পরিস্কার করা আছে, কাজেই আমরা আমাদের পছন্দমতো যেকোন টেন্টের দখল নিতে পারি। আমরাও ওপারের সর্বসুখের সন্ধানে, ছড়ানো ছেটানো সব মালপত্র নিয়ে অপর দিকের পরপর তিনটি টেন্টের দখল নিয়ে টেন্টশান্তি বজায় রাখায় সচেষ্ট হলাম। বোধকরি উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই, যে ওপারেও সূর্যালোকের কিছুমাত্র অভাব ছিল ন।। তবে আবার একটা কথা স্বীকার করতেই হয়, যে এখন পর্যন্ত এখানকার কর্মচারীদের কোন ব্যাপারে বিরক্তি বা অসহযোগীতা চোখে পড়ে নি।

পরপর দুটি বা তিনটি করে টেন্ট, বেশ কিছু দূরে আবার ঠিক একই রকম টেন্ট্। প্রতিটা টেন্টে দুটি এক শয্যার খাট আছে। খাটগুলি বাঁশের তৈরি, যদিও তার ওপর ভালো গদি, পরিস্কার সাদা চাদর ও সাদা কভার দেওয়া বালিশ দেওয়া আছে। অ্যাটাচ না হলেও প্রতিটা টেন্টের পাশেই একমাত্র ওই টেন্টটির ব্যবহারের জন্যই ঘেরা জায়গায় হাতমুখ ধোয়ার জন্য একটি বেসিন, ও একটি টেন্টের ভিতর শৌচাগার। প্রতিটা টেন্ট্ বা বেডরূম, বাথরূম নিয়ে তার নিজের গোটা এলাকাটা বেড়া দিয়ে ঘেরা। টেন্টের ঠিক পিছন থেকে জঙ্গল, সেখানে ছোট্ট ছোট্ট টুনটুনি পাখির মতো একপ্রকার পাখি, জানি না এগুলোকেই হামিং বার্ড বলে কিনা, মৌমাছির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে।

আরও কিছুক্ষণ খাটিয়ায় বসে গুলতানি করার পর আমরা দলবেঁধে উল্টোদিকের ডাইনিং হলে মধ্যাহ্ন ভোজ সারতে উপস্থিত হলাম। বাচ্চার জন্য ভাত, ডাল, আলু-উচ্ছে ভাজা, মাছ ভাজা, পাঁপড় ভাজা, সামান্য সবজি, স্যালাড ও চাটনি দিয়ে গেলে ওর মা বাচ্চাকে নিয়ে পড়লো, কারণ সেটা তাড়া দিলে ঘন্টা দেড়েক, না দিলে সারাদিনের প্রোগ্রাম। এরপর একে একে আমাদেরও একই খাবার দেওয়া হলো। তরকারিটা বিভিন্ন সবজি দিয়ে তৈরি, আর মাছ ভাজা ছাড়াও আমাদের এক টুকরো মাছের ঝালও পরিবেশন করা হয়েছে। সবথেকে বড় কথা, যতক্ষণ না আমাদের খাওয়া শেষ হলো একজন কর্মচারী আমাদের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে থেকে আর কিছু লাগবে কিনা খোঁজ নিয়ে গেল।

পুরুলিয়া ঘুরে দেখার জন্য সকালের মহাদেব নামে ছেলেটি তার স্করপিও গাড়ি নিয়ে এসে হাজির। সকালেই কথা হয়েছে যে সে আজ দুটো স্পট্ দেখিয়ে আনবে, কারণ একদিনে সবকটা স্পট ঘুরে দেখতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে, কিন্তু সবকটা জায়গা ভালোভাবে দেখা যাবে না। তাছাড়া আজ বিকালের দিকে বেরলে খইরাবেড়া ড্যামে সূর্যাস্তটা দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে। আমরা, পর্যাটকরা তো এইসব সাহায্যই আশা করে থাকি। সেই মতো খাওয়া দাওয়া সেরে খইরাবেড়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া গেল। অনেকটা রাস্তা পার হয়ে আমরা একসময় খইরাবেড়া ড্যামের কাছে এসে পৌঁছলাম। রাস্তার বাম দিকে অসাধারণ সুন্দর একটা বিশাল লেক। যেদিক থেকে আমরা গেলাম সেদিকে, অর্থাৎ লেকের একবারে শুরুতে লেকের ঠিক পাশেই একটা সুন্দর দোতলা বাড়ি, ও পরপর বেশ কয়েকটা বাংলো ধাঁচের একতলা বাড়ি নিয়ে ইকো রিসর্ট। লেকের ঠিক পাশ দিয়ে সিমেন্ট বাঁধানো চওড়া রাস্তা দিয়ে সেখানে যেতে হয়। ঢোকার মুখেই একটা মজবুত লোহার গেট, যেটা প্রায় সব সময়েই বন্ধ করে রাখা হয়। একটা সুন্দর গাড়ি দেখলাম মূল রাস্তার কাছ থেকে গেট পেরিয়ে ভিতরে চলে গেল, সম্ভবত ব্যাটারি চালিত গাড়ি। শুনলাম কলকাতার কোন এক সিনেমা হলের মালিক নাকি ওটা তৈরি করেছেন এবং সত্যি মিথ্যা জানি না, তবে ওখানে থাকার প্রতিদিনের ভাড়া নাকি আট হাজার টাকা। তবে স্বীকার করতেই হবে যে এক অসাধারণ সৌন্দর্যের মাঝে ওই রিসর্টটি তৈরি। ঠিক সামনে থেকে ছোট পাহার ও গাছপালায় ঘেরা নীল জলের বিশাল লেকটি অবস্থিত। আমরা যে পথে এসেছি, সেই বড় রাস্তা দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলে রাস্তার ওপর একটা মাঝারি আকারের সেতু বা কালভার্ট মতো, যার নীচ দিয়ে ডানপাশে সিমেন্ট বাঁধানো লক গেটের মতো ঢালু জায়গা দিয়ে জলস্রোত বেশ জোরে নীচে নেমে খালের মত বয়ে যাচ্ছে। গোটা অঞ্চলটাই লেক, ঘন গাছে ঢাকা সবুজ পাহাড়, ইত্যাদি দিয়ে প্রকৃতি যেন নিজের মতো করে সাজিয়ে দিয়েছে। মানুষ শুধু লেকের একপাশে সুন্দর পরিবেশে থাকার ব্যবস্থা, ও লেকের পাশে জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।    

ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে। ড্রাইভার মহাদেব জানালো এরপর আমরা চোরিদাগ্রাম যাব, যেখানে ছৌ নাচের বা অন্যান্য মুখোশ তৈরির জন্য বিখ্যাত। অন্ধকার গভীর হলে চোরিদাগ্রাম ভালোভাবে দেখার সুযোগ নাও হতে পারে ভেবে আমরা খইরাবেড়ার সূর্যাস্তের মায়া ত্যাগ করে আর অপেক্ষা না করে গাড়িতে উঠে বসলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই চোরিদাগ্রাম পৌঁছে আশাহত হলাম। সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ফিরে আসার জন্য আপশোস করতে হলো।

ভেবেছিলাম চোরিদাগ্রাম চোরিদা নামে কোন গ্রামের নাম, অন্ধকার নেমে গেলে ঘুরে দেখার অসুবিধা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে চোরিদাগ্রাম যাওয়ার পথে একটা জায়গা, যেখানে বড় রাস্তার দুপাশে বেশ কিছু দোকানে নানারকম মুখোশ শুধুমাত্র বিক্রিই নয়, তৈরিও হয়। খুব অল্প বয়সী ছেলেরাও দক্ষ হাতে কি সুন্দর ঠাকুর দেবতা, কিরাত-কিরাতী, সাঁওতাল নারী-পুরুষের মুখোশ তৈরি করছে, দেখলে অবাক হতে হয়। কি তার রঙের বাহার, কি তার ফিনিশিং। তবে এখানে আধ বা এক ঘন্টা পরে এসে উপস্থিত হলেও অসুবিধা কিছু ছিল না। যাইহোক, ঘুরে ঘুরে ওদের শিল্পকলা দেখলাম, কিছু মুখোশ কিনলাম। আরও কিছু সময় ঘুরে ঘুরে দেখে কাটিয়ে ফেরার রাস্তা ধরলাম। রাস্তায় যথেষ্ট গাড়ি ও মানুষের ভিড়, ফলে ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে গাড়ির গতি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

কিছুটা রাস্তা পার হয়ে যাবার পর মহাদেবের মোবাইল বেজে উঠলো। অপর প্রান্তের কথা শুনতে পাচ্ছি না। মহাদেবের কথায় বোঝা গেল, যে সে কাউকে নির্দেশ দিলো, যে সে সামনের কোন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করছে তার পিছু পিছু আসলে কোন অসুবিধা হবে না। একটু এগিয়ে আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর পিছন থেকে একটা গাড়ি এসে হাজির হলে আবার এগিয়ে চললো। যাওয়ার আগে শুনেছিলাম মাথা ফরেস্ট এলাকা হওয়ায় মাঝেমাঝেই হাতির আগমন হয়। আগুন জ্বেলে পটকা ফাটিয়ে তাদের তাড়াতে হয়। ব্যাপারটা ভুলেই গেছিলাম, হঠাৎ মহাদেব বললো “রাস্তায় কোন হাতি দেখলে চেঁচামিচি করবেন না, কথা বলবেন না”। ব্যাস গাড়ির ভিতর সকলেরই প্রায় কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। কেউ কোন কথা বললেই সঙ্গের বাচ্চাটা কথা বলতে বারণ করছে। মহাদেব জানালো ওরা এই এলাকার হাতির গতিবিধি জানে। বড় রাস্তা থেকে যেখানে জঙ্গলের রাস্তা ধরে ক্যাম্পে যেতে হয়, সেখানে মাঝেমধ্যেই হাতির আগমন হয়। তবে কোন ভয় নেই, শুধু কথা বলবেন না। একসময় আমরা সেই জঙ্গলের এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় প্রবেশ করলাম। ধীরে ধীরে ক্যাম্পে গাড়ি রাখার জায়গায় পৌঁছেও গেলাম, কিন্তু হাতিরা আমাদের নিরাশ করলো।

ক্যান্টিনের ছেলেটি জানালো একটু পরে মুড়ি পকোড়া দিয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করে জানা গেল ভেজ পকোড়া, অর্থাৎ পেঁয়াজি জাতীয় কিছু। আমরা দু’প্লেট চিকেন পকোড়ার অর্ডার দিয়ে ভেজ পকোড়া দিতে বারণ করলাম। দুপুরে চিকেন রোস্ট করা যাবে কী না জিজ্ঞাসা করায়, ওরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চিকেন পকোড়ার কথা বলেছিল। হয়তো রোস্ট করায় ওদের কোন অসুবিধা আছে। আগেই বলেছি যে এখানে সব কিছুর মধ্যেই একটা প্রাকৃতিক গন্ধ আছে। খাট বাঁশের তৈরি, তাঁবুর ভিতরে কোন চেয়ার নেই, তার জায়গায় মোড়া। বাইরে বসার জন্য কোন চেয়ার বা বেঞ্চ নেই, তার জায়গা দখল করেছে খাটিয়া ও দোলনা। অবশ্য চাইলে ওরা বিরক্তি ছাড়াই চেয়ার দিয়ে যাবে। যাইহোক, যদিও দুপুরে খাওয়ার পর এখন বিশেষ খিদে নেই, তবু এই পরিবেশে সন্ধ্যায় চিকেন পকোড়া না হলে লোকে কি বলবে? তাই আমরা চিকেন পকোড়ার আশায় বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে একজন অনেকগুলো ঠোঙা নিয়ে এসে হাজির হলো। ঠোঙার ভিতরে মুড়ি আর সেই ভেজ পকোড়া। চিকেন পকোড়ার কি হলো জানতে চাওয়ায় জানা গেল তৈরি হচ্ছে, একটু পরে দিয়ে যাবে। সর্বনাশ! একে সেরকম খিদে নেই, তার ওপর এখন মুড়ি-ভেজ পকোড়া, একটু পড়ে দু’প্লেট্ চিকেন পকোড়া, তারপরে রাতে আবার ভাত বা রুটি, সাথে চিকেন। মুড়ি ও ভেজ পকোড়া বোধহয় নিয়ম মাফিক দেওয়া হয়েছে।

আরও কিছুক্ষণ খাটিয়ায় বসে প্রচন্ড ঝিঁঝির ডাকের মধ্যে গুলতানি করার পরে, চিকেন পকোড়া এসে হাজির হলো। কাউকে দেখেই কিন্তু খিদের অভাব বলে তো মনে হলো না। দু’তিনটে কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে ওদের একবার ডাকতেই ছুটে এলো বটে, তবে ওনারা আবার মুড়ি বিশেষ পছন্দ করেন বলে মনে হলো না। তবে চিকেন পকোড়ায় কোন অনীহা লক্ষ করলাম না। এক সময় আমাদের খাবার জায়গায় যাওয়ার ডাক পড়লো। উপায় নেই, আমরা না হয় মুড়ি, ভেজ পকোড়া, চিকেন পকোড়া খেয়ে পেট ভরিয়েছি, ক্যান্টিনের ছেলেগুলো তো ভরায় নি। আমরা খেয়ে আর আড্ডা দিয়েই খালাশ, ওদের কিন্তু খাওয়ার জোগাড় ও পরিশ্রম করতে হয়। আমরা গভীর রাত পর্যন্ত জাগলেও ক্ষতি নেই। ওদের আছে, ওদের বেশ ভোরে উঠতে হয়। আমরা দলবেঁধে উল্টোদিকের ডাইনিং হলে রাতের খাওয়া সারতে উপস্থিত হলাম। নতুন দুটি দলের সাড়ে পাঁচজন সদস্য-সদস‌্যা দেখলাম ততক্ষণে ডাইনিং হলে এসে হাজির হয়ে গেছেন। আমার খুব ইচ্ছা ছিলো ওই মাঠে যদি ছৌ নৃত্য বা আদিবাসী সাঁওতালী নৃত্যের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সন্ধ্যাটা বেশ উপভোগ করা যায়। এখানে এসে এই ব্যাপারে কথা বলে বুঝেছি যে সেটা খুব খরচ সাপেক্ষ, প্রায় চার-সাড়ে চার হাজার টাকার ধাক্কা। দু’-তিনটি দল খরচটা শেয়ার করলে গায়ে লাগে না। সেইমতো আমি অন্য দুটি দলকে একবার প্রস্তাবটা দিয়ে বুঝলাম, তারা খুব একটা ইচ্ছুক নয়। আসলে তাই হয়। বাড়ির কাছে বাঁদর বা সাপ খেলা দেখাতে আসলে ইচ্ছুক প্রতিবেশী খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু কেউ একজন নিজের বাড়ির বাচ্চাকে দেখাবার জন্য ডাকলে গোটা পাড়া উপচে পড়ে। সুতরাং আদিবাসী নৃত্য দেখার আশা ছেড়ে দিয়ে আমরা খাবার টেবিলে বসলাম। ভাত, ডাল, সবজি, স্যালাড ও মুরগির ঝোল দিয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে আরও কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে পোকা বাঁচিয়ে যে যার টেন্টে প্রবেশ করলাম। দিনের বেলায় বেশ গরম ছিলো, যদিও টেন্টের ভিতর কুলার থাকায় বিশেষ কষ্ট অনুভব করি নি। তবে ওই রোদ্দুরে মাঠের দড়িতে প্রচুর কম্বল মেলা দেখে কারণ জিজ্ঞাসা করায় উত্তর পেয়েছিলাম, রাতে বুঝতে পারবেন। ব্যাপারটা অনেকাংশেই সত্য। আমি একটা চাদর নিয়ে শুলেও দু’একজনকে শুনলাম পায়ের কাছ থেকে কম্বল টেনে নিতে হয়েছিল।

আজ অক্টোবর মাসের তেইশ তারিখ। আমার অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠে বিছানা ছাড়ার অভ্যাস। এখানে ভোরের আলো ফোটার আগে অন্ধকার থাকতেই হাজার পাখির বিচিত্র ডাকে বিছানা ছেড়ে তাঁবুর বাইরে এলাম। টেন্টের ঠিক পিছনের আগাছার জঙ্গলে যে ছোট ছোট কত পাখি ভাবা যায় না। চা বিস্কুট দিয়ে গেল। একে একে সবাই টেন্ট থেকে বাইরে এসে এক জায়গায় জড়ো হলে জানা গেল যে গতকাল রাতে আমি ছাড়া প্রায় আর সবাই হাতির ডাক শুনেছে। এখানে বানজারা ক্যাম্পের আশেপাশে লোকবসতি আছে কী না জানি না, তবে সন্ধ্যার পর থেকেই মাঝেমাঝেই পটকা ফাটাবার আওয়াজ শুনছিলাম। রাতে হাতির ডাক শুনে পটকা ফাটানো ও ক্যানেস্তারা বাজানো শুরু হয়ে যায়। বাচ্চাটাও নতুন করে হাতির প্রসঙ্গ আসায় এবার সকলকে কথা বলতে বারণ করলো।

মুখ হাত ধুয়ে খাবার জায়গায় গেলাম। আজ জলখাবারে আলুর পরোটা, আলুর তরকারি, সিদ্ধ ডিম, আর সেই একই রকম সুস্বাদু জিলিপি। আজ আমরা জলখাবার খেয়ে বিভিন্ন দ্রষ্টব্য স্থল দেখতে যাবো। দুপুরে ফিরে এসে মধ্যাহ্ন ভোজ সারার কথা। আমাদের সকাল আটটায় বেরনোর কথা। অনেকেরই হাঁটুর সমস্যা, গতকালের গাড়িটায় আমাদের একটু স্থানাভাবের সমস্যা হচ্ছিল। এখানকার ম্যানেজার অসিত এমন একজন মানুষ, যাকে বললে যেকোন সমস্যার সমাধান হবেই। তাই আজ আমাদের গাড়ি নিয়ে অনেক বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে বলে তাকে একটা টাটা সুমোর ব্যবস্থা করতে বলেছিলাম। সেইমতো অর্জুন তার সাদা রঙের টাটা সুমো নিয়ে সকাল আটটার আগেই উপস্থিত হয়ে গেছে। আমরাই তৈরি হয়ে বেরতে বেরতে প্রায় সকাল ন’টা বাজিয়ে দিলাম।

আজ প্রথমেই আমরা যে জায়গাটায় এসে পৌঁছলাম, তার নাম ঘাটপোচা ফলস্। অবশ্য কেউ কেউ আবার এটাকে ঘাকখোচা ফলস্ও বলে থাকেন দেখলাম। এই ফলসটি দেখতে হলে অনেকটা আগাছায় ঘেরা এবড়ো খেবড়ো পাথুরে পথ ভেঙ্গে নীচে নামতে হয়। ড্রাইভার গাড়ি রেখে আমাদের নিয়ে নীচে নামতে শুরু করলো। একসময় আমরা ফলসটির সামনে এসে উপস্থিত হলাম। বাচ্চাটি কখনও একা, কখনও কারো হাত ধরে গটগট্ করে দিব্বি ফলসের কাছে চলে এলো। অনেকটা ওপর থেকে বেশ চওড়া উত্তাল জলধারা তীব্র গতিতে সোনালী রঙের পাথরের ওপর দিয়ে নীচে নেমে এসে চারিদিকে সবুজ গাছে ঘেরা তুর্গা নামে বেশ বড় একটা লেকে এসে মিশছে। জায়গাটা খুবই সুন্দর। লেকের ধারে বসে অনেকটা সময় স্বচ্ছন্দে কাটিয়ে দেওয়া যায়। ডানদিক দিয়ে প্রবল জলধারা বয়ে যাচ্ছে। পাথরের ওপর দিয়ে আমরা লেকের ধারে এসে বসে, ছবি তুলে অনেকটা সময় কাটালাম। আরও কিছুটা সময় এখানে কাটিয়ে যাবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আরও অনেকগুলো দ্রষ্টব্য স্থল যেতে হবে। সবথেকে বড় কথা সঙ্গে একটা শিশু পর্যটক আছে, যদিও এর আগে ঝাড়খন্ডের লোধ ফলসে গিয়ে সে প্রমাণ করেছে, যে সে আরও অনেকের থেকে পাহাড়ি পথ ভাঙ্গতে সক্ষম। তবু ফিরে গিয়ে তবে তাকে দুপুরের খাবার খাওয়াতে হবে। ফলে শুরু হলো সেই পাথুরে জংলি পথ ভেঙ্গে ওপরে ওঠা। বেশ খানিকটা পথ অর্জুনের হাত ধরে ওপরে ওঠার পর, হঠাৎ অর্জুন তাকে কোলে নিয়ে অনেকটা পথ উঠে এলো। মহিলারা অনেকটা সময় নিয়ে একসময় গাড়ির কাছে এসে হাজির হলো।  

আমরা আবার এগিয়ে চললাম। বেশ কিছুটা পথ পার হয়ে, আমাদের গাড়ি একটা জায়গায় এসে থামলো। অর্জুন জানালো বাম দিকের পাথুরে সিঁড়ি ভেঙ্গে নীচে নেমে তুর্গা ফলস্ দেখতে হবে। রাস্তা থেকেই নীচে নামার রাস্তার চেহারা দেখে মহিলারা হাঁটুর কথা ও নামার কষ্টের কথা চিন্তা করে নীচে নামা থেকে বিরত হলো। আমরা তিনজন ধীরে ধীরে নীচে নামতে শুরু করলাম। বাচ্চাটাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ওর মা’র ভয় ও আপত্তিতে শেষপর্যন্ত সেও অন্যান্য মহিলাদের সাথে ওপরেই রয়ে গেল।  

এই ফলস্-এর নীচে নামার রাস্তা খুব একটা বেশি নয়, তবে সিঁড়ির মতো পাথরগুলোর উচ্চতা  অনেকটা। ফলে নামা ও ওঠা, উভয় ক্ষেত্রেই হাঁটুর সমস্যা থাকলে একটু কষ্টকর বটে। এই জলপ্রপাতটি খুব একটা ওপর থেকে নেমে আসিনি। জলের গতিও খুব একটা প্রবল নয়। তবে জলপ্রপাতের একবার কাছে যাওয়া একটু বিপজ্জনক, কারণ পাথরগুলি বেশ পিচ্ছিল। জলপ্রপাতটি নেমে এসে যেখানে মিশছে, সেটা শুনলাম তুর্গা নদী। জলপ্রপাতের সংযোগ স্থলের অংশটি স্বাভাবিক ভাবেই বেশ খরস্রোতা। নদীটি যদিও খুব একটা চওড়া নয়, তবু বেশ খরস্রোতা তো বটে, কিন্তু সেখানে দেখলাম কোন একটি কলেজের যুবক যুবতীরা উচ্চতা মাপার কাঠের বড় স্কেল, দুরত্ব মাপার ফিতে, ইত্যাদি নিয়ে নদীর ওই স্রোতেও একদিক থেকে অপর দিক যাতায়াত করে মাপজোক করছে। আরও কিছুক্ষণ সময় সেখানে কাটিয়ে আমরা ওপরে উঠে এসে রাস্তায় দাঁড়ালাম। এখানে মনে হয় অনেকেই এসে আর নামতে পারেন না, বা নামবার সাহস দেখান না। কারণ জনমানব শুন্য একবারে ফাঁকা রাস্তায় সিমেন্ট ও কাঠ দিয়ে সুন্দর একটা রঙ করা বেঞ্চ তৈরি করে রাখা হয়েছে।

আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। অর্জুন জানালো আমাদের পরবর্তী গন্তব্য স্থল বামনি ফলস্। শুনলাম এই জলপ্রপাতটি দেখতে সবথেকে বেশি, অর্থাৎ বারোশ’ সিঁড়ি ভাঙ্গতে হবে। শুনেই সকলে প্রমাদ গুণে গাড়িতে বসেই নীচে না নামার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। একসময় আমরা বামনি জলপ্রপাতের কাছে এসে পৌঁছলাম। নীচে নামার রাস্তার ঠিক পাশে একটা ছাউনি মতো তৈরি করা। এই ছাউনির ভিতরে একপাশে ও বাইরে বসার জন্য বেঞ্চ করা আছে। ছাউনির মধ্যে পিছন দিকটা খোলা একটি মোটর গাড়ি রাখা আছে, যার ভিতর নানারকম আইসক্রীম, কোল্ড্ ড্রিঙ্কস্, মিনারেল ওয়াটার, ইত্যাদি রাখা আছে। গাড়ির ভিতরেই সেগুলো ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থাও করা আছে। গাড়ির পাশে দড়িতে পটাটো চিপস্, কুরকুরে, ইত্যাদি বর্তমানের জনপ্রিয় ভাজাভুজি ঝুলিয়ে রাখতেও ভুল করে নি। এখানেও মহিলারা শিশুটিকে নিয়ে অপেক্ষা করলো। আমরা তিনজন নীচে নামতে শুরু করলাম। অনেকটাই পথ একথা সত্য, কিন্তু বারোশ’ সিঁড়ির গল্প কোথা থেকে এলো বুঝলাম না। আর পাঁচটা জায়গার মতো পাহাড়ি পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে নীচে নামতে হবে। কোথাও কোথাও পাথর সাজিয়ে সিঁড়ির মতো করা আছে ঠিকই, তবে তার কোনটা উচ্চতা দু’সেন্টিমিটার, কোনটা বা দু’ফুট। এই জলপ্রপাতটি দুভাগে দেখা যায়। প্রথম যেখানে এর দর্শন মেলে, সেখানে এর কাছাকাছি যাওয়া না গেলেও বেশ সুন্দর। আরও অনেকটা পথ পার হয়ে নীচে নেমে এসে দ্বিতীয় বার এর দর্শন মেলে। এখানে জলপ্রপাতের কাছে যাওয়া গেলেও, কোন অংশটিই সেরকম ভয়ঙ্করভাবে নেমে আসে নি। দ্বিতীয় অংশের কাছে বেশ কয়েকটি ছেলেকে পিকনিক মুডে দেখলাম। পাশে পাথরের ওপর হেলমেট রাখা।

বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে, ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। অনেকটা পথ উঠতে হবে, ওপরে বাচ্চাটাকে নিয়ে মহিলারা অপেক্ষা করছে। ধীরে ধীরে ওপরে উঠে একসময় আমরা সেই জায়গাটায় এসে উপস্থিত হলাম, যেখান থেকে জলপ্রপাতটিকে প্রথম দেখতে পাওয়া যায়। তরুণ আমাদের একটু আগে আগে আসছিলো। এখানে এসে দেখলাম সে খুব ক্লান্ত হয়ে ঝরনাটার পাশে বসে আছে। সে ওই ঝরনা থেকে একটু জল আনা যায় কিনা জিজ্ঞাসা করলো। আমরা কোন জলের বোতল সঙ্গে নিয়ে আসিনি। আশপাশে অনেক কোল্ড ড্রিঙ্কসের খালি বোতল পড়ে আছে। আমি ওকে এই ঝরনার জল খেতে বারণ করলাম। আসার পথে এখান থেকে একটু ওপরে বড় রাস্তায় ওঠার কিছুটা আগে একটা ঝুপড়ি মতো দোকানে শশা, বিস্কুট, জলের বোতল, ইত্যাদি বিক্রি হতে দেখে এসেছি। তরুণ জানালো সে জল খাবে না, মুখে চোখে একটু জল দেবে। অগত্যা রুদ্রেন্দু ফুলপ্যান্ট ও গায়ের টিসার্ট খুলে, খালি গায়ে একটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল নিয়ে ঝরনার কাছে গিয়ে অনেক কসরত করে এক বোতল জল নিয়ে এলো। মুখে চোখে জল দিয়ে আমরা ওপরে উঠে গাড়ির কাছে এসে হাজির হলাম। এখানে সেই মোটর গাড়ি থেকে ঠান্ডা জল কিনে খেয়ে, সঙ্গে আইসক্রীম খেয়ে আবার পুরো মাত্রায় চাঙ্গা হয়ে গেলাম। মহিলারা জানালো যে এই আইসক্রীম বিক্রেতা নাকি বার বার বলেছে যে  সঙ্গে একটা খাবার জলের বোতল নিয়ে আমাদের নীচে নামা উচিৎ ছিল।   

এবার আবার এগিয়ে যাবার পালা। আমাদের গাড়ি ছুটলো দুরগুবেড়া বাঁধের দিকে। খুব একটা দুরত্বের পথ নয়। গাড়ি থেকে নামলাম। ভীষণ গরম লাগছে। বামনি ফলস্-এর কল্যানে আমার টিসার্ট ঘামে ভিজে চপচপ্ করছে। ফাঁকা জায়গা, গাড়ির জানলায় টিসার্টটা মেলে দিয়ে খালি গায়ে এগিয়ে চললাম। বেশ খানিকটা পাথুরে সমতল রাস্তা পার হয়ে পাথর ও পাহাড় ঘেরা একটা মাঝারি আকারের জলাধার। দেখেতো মনে হলো না গভীরতা আছে বলে। যাওয়ার পথে দেখলাম ওই রোদ ও উত্তাপে বসে বয়স্ক বৃদ্ধ বৃদ্ধারা পাথর ভাঙ্গছে। জলাধারটি স্থানীয় মানুষের কাপড় কাচা ও স্নান করার কাজে ব্যবহৃত হয় দেখলাম। বেশ গরম, প্রখর রোদের তেজও যথেষ্ট। কাচা কাপড় চোপড় জলাধারের পাশে পাথুরে জমিতে মেলে দেওয়া আছে, স্নান সেরে ফেরার পথে শুকনো অবস্থায় নিয়ে চলে যাবার সুন্দর সুব্যবস্থা। আমিই শুধু নির্বোধের মতো ঘেমো টিসার্ট গাড়ির জানলায় মেলে রেখে খালি গায়ে রদ্দুরে ঘুরে মরছি। আমরা জলাধারের জল মুখে চোখে দিয়ে, জলে পা ভিজিয়ে ফিরে আসার পথ ধরলাম। একটা ঘোর কৃষ্ণবর্ণের বছর দশেকের শীর্ণ বালক এগিয়ে এসে হাত পাতলো। একটু হেসে পকেটে হাত ঢোকাতেই সে বললো দশটা টাকা হলেই চলে যাবে। দেখে মায়া হলো, জিজ্ঞাসা করলাম “তোর বাড়ি কোথায়”? সে ডান দিকের পাহাড়ের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললো ওই হোথা। জিজ্ঞাসা করলাম স্কুলে পড়িস? সে মাথা নেড়ে জানালো কেলাশ থিরি। এর হাতে টাকা দিতেই একজন বৃদ্ধা এগিয়ে এসে বাবা বলে হাত পাতলো। তাকেও দশটা টাকা দেওয়া হলো। এবার তার একটা ছবি নিতেই সে বললো ছবি নেওয়ার জন্য আর দশটা টাকা দাও। আমি কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। গাড়ির কাছে খোলা জায়গায় একটা টেবিল পেতে একদিকে একটা গাছের সাথে অপর দিকে একটা বাঁশে দড়ি বেঁধে একটা অল্প বয়সি ছেলে কিছু লজেন্স্, কিছু চিপসের প্যাকেট, গোটা তিনেক জলের বোতল, ও সামান্য কয়েকটা শশা নিয়ে দোকান খুলে বসেছে। আশপাশের মানুষদের দেখেই তার সারা মাসের টার্নওভার অনুমান করা যায়। জানি না সারা বছরে কতজন পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন, আর তাদের মধ্যে কতজন এর কাছে ওই নির্দিষ্ট কয়েকটি জিনিসের মধ্যে থেকে কিছু জিনিস কেনেন। আমাদের কাছে কিছু শশা ছিল, তাই নতুন করে আবার কেনার সুযোগ কম। আমাদের তিনটি শশা সে খোসা ছাড়িয়ে একটু নুন দিয়ে দিলো। তাকে দশটা টাকা দিয়ে গাড়িতে ওঠার আগে গাড়ির পাশে মাটিতে বসা এক ভিখারিনি হাত পাতলো। এখানে কে তাকে ভিক্ষা দেবে জানি না। মানুষগুলো এতো গরীব, যে সবাইকে কিছু করে দিতে পারলে ভালো হয়। খোঁজ করলে দেখা যাবে সাহায্য করার লোকের থেকে শিশু শ্রমিক আছে কী না খোঁজ করার লোকের সাথেই তাদের পরিচিতি হয়তো অনেক বেশি। যাইহোক, এই ভিখারিনিকে একটা স্লাইজ কেকের কিছুটা অংশ দিতে গিয়ে জানা গেল যে ইনি খাবার নেন না, টাকা নেন। ফলে তাকেও দশটা টাকা দিয়ে গাড়িতে ওঠা গেল।  

গাড়ি ছেড়ে দিলো, এবার আমরা যাবো অযোধ্যা পাহাড়। একসময় আমরা অযোধ্যা হিল টপে এসে উপস্থিত হলাম। প্রথমেই এই জায়গায় আসলে হয়তো জায়গাটা ভালো লাগতো, কিন্তু ওইসব লেক ও জলপ্রপাত ঘুরে এখানে আসায়, জায়গাটা কিরকম বিস্বাদ ম্যাড়মেড়ে লাগলো। গাড়ি থেকে নেমে রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বানজারা ক্যাম্পে আসার জন্য সকলের পরিচয় পত্রের প্রমাণ হিসাবে ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড সঙ্গে করে নিয়ে আসলেও, জেরক্স কপি নিয়ে আসা হয় নি। ক্যাম্পের রেজিস্টারে নাম ঠিকানা ইত্যাদি লেখার সময় এক কপি করে জেরক্স দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এখানে একটা জেরক্সের দোকান দেখে কাজটা মিটিয়ে নেওয়ার জন্য ঢোকা হলো। এখানে দেখলাম জেরক্স্ ছাড়া কম্পিউটারে অনেক কিছুই করা হয়। ভিডিও ও গান সিডি করে দেওয়া হয় বলে একটা সাইনবোর্ড টাঙ্গানো আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো কার্ডগুলো স্ক্যান করে প্রিন্টারে প্রিন্ট করে দেওয়া হয়। তাই জেরক্স নামের কাগজগুলোর মান যতটা কম, খরচ ও সময় ব্যয়ের পরিমান ঠিক ততটাই বেশি। দীর্ঘক্ষণ সময় ব্যয় করে, প্রতি কপি দু’টাকা করে চার্জ দিয়ে, কাগজ হাতে নিয়ে গাড়িতে এসে বসলাম।  

আমাদের আজকের পুরুলিয়া ভ্রমণ মোটামুটি শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছলো। এখান থেকে ক্যাম্পে ফেরার পথে পি.পি.এস.পি. লোয়ার ড্যাম ও আপার ড্যাম দেখে যাব। ব্রিজের ওপর থেকে আপার ড্যামের সৌন্দর্য ও তার পরিবেশ খুব ভালো লাগলো। কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে ছবি নিয়ে আমরা ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠে বসলাম। আর কোথাও দাঁড়াবার নেই, আগের দিন ক্যাম্পের ক্যান্টিনে কোল্ড ড্রিঙ্কস্ শেষ হয়ে গিয়েছিল, পথে বাচ্চাটার আবদার মেটাতে একটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল কিনে, একসময় আমরা ক্যাম্পের ক্যান্টিনের সামনে গাড়ি থেকে নামলাম।

সকালে বেরতে অনেক দেরি হওয়ায় ও সমস্ত জায়গাতেই একটু বেশি সময় ব্যয় করায়, আমাদের স্বাভাবিক ভাবেই ফিরতে অনেক বেলা অনেক হয়ে গেছে। কাজেই হাত মুখ ধুয়ে পরিস্কার হয়ে সোজা খাওয়ার জায়গায়। আজও প্রায় গতকালের মতোই মেনু। ভাত, ডাল, উচ্ছে ভাজা, বেগুন ভাজা, আর মুরগির ঝোল। এখানে আর একটা জিনিস বেশ ভালো লাগলো, অধিকাংশ জায়গায় দেখি দুপুর বা রাতে না চাইলে স্যালাড দেওয়া হয় না, বড়জোর একটা পাত্রে কিছু পেঁয়াজের টুকরো ও কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ঠক্ করে খাবার টেবিলে রেখে যাওয়া হয়। এখানে কিন্তু যথেষ্ট পরিমান স্যালাড না চাইতেই দিয়ে যাওয়া হয়।

যাইহোক খেয়ে দেয়ে উঠে কোল্ড ড্রিঙ্কসটা ক্যান্টিনের ফ্রিজে রেখে এসে খাটিয়ায় বসে একটু সময় কাটিয়েই সবাই একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য যে যার নিজ নিজ তাঁবুতে ঢুকে পড়লো। আজ আর কোথাও যাওয়ার নেই, হাতে কোন কাজও নেই, তাই সন্ধ্যার পর চিকেন পকোড়া ও চা সহযোগে নির্ভেজাল আড্ডাই একমাত্র সময় কাটাবার অবলম্বন।

ছোটখাটো একটা ঘুম দিয়ে উঠে এক দফা চা খাওয়া হলো। আমরা খাটিয়ায় বসে, মাঠে ঘুরে, সময় কাটাতে লাগলাম। বাচ্চাটা লাগাম ছাড়া হয়ে মাঠে ছোটাছুটি করে, দোলনায় চেপে মনের আনন্দে রইলো। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামছে। চোখ বুজে থাকলেও সেটা বোঝা যায়, কারণ স্থানীয় পোকার দলের আগমন ও সাথে ঝিঁঝিদের সুরেলা সংগীত সে খবর নিয়ম করে প্রতিদিন জানিয়ে যায়। আজ এক প্লেট চিকেন পকোড়া দেওয়ার কথা দুপুরেই বলে দিয়েছিলাম, কিন্তু সন্ধ্যার পর এখানকার সান্ধ্য নিয়মে যথারীতি প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা ঠোঙায় করে মুড়ি ও তেলেভাজা দিয়ে গেল। অল্প কিছুটা মুড়ি খেয়ে, কুকুরের খেতে সুবিধা হবে বলে ঠোঙার মুখটা একটু ছিঁড়ে একবার ডাকতেই কালকের কালো কুকুরটা মহানন্দে ছুটে এসে হাজির হলো। আমি ছেঁড়া ঠোঙাটা মাটিতে রাখতেই সে ঠোঙার ভিতর মুখ ঢুকিয়েই বার করে নিয়ে আমার দিকে রুদ্রদৃষ্টিতে একবার তাকালো। মনে হয় সে যেন বলতে চাইলো “রোজ রোজ এক খাবার খাওয়া যায়? মুড়ি আমার না পসন্দ্”। উনি চলে গেলেন, ওনার এঁটো বাসন, থুরি ঠোঙা আমায় তুলে নিয়ে গিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে আসতে হলো। বাচ্চাটাকে তার পছন্দের কোল্ড ড্রিঙ্কস খানিকটা দিয়ে আমরা চা নিয়ে গুছিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই চিকেন পকোড়া এসে হাজির। আহা কি সুখ, এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না।  

খাওয়া হলো, অনেকেই এবার আর চা না খেয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস্ নিয়ে বসলো। গতকাল রাতের সেই নতুন দুটো দলের একটা দল, যাঁরা আমাদের উলটো দিকের তাঁবুতে উঠেছিলেন, সেই দম্পতি আজ সকালে উঠে চলে গেছেন। অপর দলটি আমাদের দিকে আমাদের পাশের দুটি তাঁবুতে রয়েছেন। একটা তাঁবুতে স্বামী স্ত্রী একটা ছোট বাচ্চা নিয়ে, অপরটায় আর এক ভদ্রলোক সম্ভবত তাঁর গাড়ির ড্রাইভারকে নিয়ে আছেন। যাইহোক ওই দুই ভদ্রলোক নিজে থেকেই আমাদের গুলতানির আসরে সদস্য পদ গ্রহণ করলেন। এনারা দুই বন্ধু ও ভিন্ন স্কুলে হলেও দুজনেই শিক্ষকতা করেন। যিনি স্ত্রী পুত্র নিয়ে এসেছেন, তিনি ইতিহাস পড়ান, আর একমুখ দাড়ি, মাথায় টুপি পরা দ্বিতীয় ভদ্রলোক ভূগোলের শিক্ষক। তিনি ঘুরে বেড়ান, লেখালিখি করেন, ও ছবি তোলেন। আজ তাঁরা বিকালে খইরাবেড়া গেছিলেন। তিনি তাঁর ক্যামেরায় তোলা খইরাবেড়ায় সূর্যাস্তের ছবি দেখিয়ে মন খারাপ ও আপশোসের পরিমানটা বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন। পূর্বের তোলা অন্যান্য আরও অনেক ছবি দেখালেন। গতকাল রাতের হাতির আগমন ও পটকা ফাটিয়ে তাদের বিদায় করা নিয়েও গল্প করে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে গেলেন।

রাত বাড়ছে, আগামীকাল সন্ধ্যায় আর দেখা হবে না বলে বোধহয় সমস্ত কীটপতঙ্গরা সপরিবারে আজ আমাদের বিদায় জানাতে সন্ধ্যা থেকে এসে হাজির হয়েছে। তাঁবুর চেন ভালো করে বন্ধ করে তাঁবুর বাইরের আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছে। মাঝে মাঝেই একটা বোঁ বোঁ আওয়াজ শুনে দেখা গেল একটা বিশাল গুবরে পোকা উলটে গিয়ে তাঁবুর দরজার কাছে সাহায্যের আশায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আমরা আগের মতোই খাটিয়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম, হঠাৎ আমাদের মধ্যেই একজন সামান্য দূরে মাঠের প্রান্তে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলো “কালো মতো ওটা কি, হাতি নয় তো”? কেউ বললো মোষ, কেউ বললো ছায়া, আমি কিছুই দেখতে পেলাম না। আরও কিছুক্ষণ সময় পার হলো, না এবার আর কোন ভুল নয়, খানিকটা দুরে আগের জায়গায় একটা গাছের নীচে তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান নাড়াচ্ছেন। জায়গাটা অন্ধকার হলেও তাঁবু ও উলটো দিকের ক্যান্টিন এলাকার আলোয় সামান্য আলোকিত। আমি সঙ্গীদের ডেকে দেখাবার চেষ্টা করলাম। বাচ্চাটাও তাঁবুর ভিতর থেকে ছুটে এল, কিন্তু ততক্ষণে সম্ভবত ক্যান্টিন বা অফিস কর্মীরা টর্চ জ্বেলে ওই দিকে ছুটে যেতে, তিনি নিশব্দে বিদায় নিলেন। জানি না তিনি একাই এসেছিলেন, না সঙ্গীসাথীদের নিয়ে ক্যাম্প বুকিং করতে এসেছিলেন।

একসময় আমরা সদলবলে ক্যান্টিনে গেলাম। আজ দুপুরে চিকেন হওয়ায় রাতে আমরা ডিমের কারি খাব কী না জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। আজও গতকালের মতোই আয়োজন, শুধু মাতার বদলে তার ভবিষ্যৎ সন্তানের কারি। খাওয়া হলে মৌড়ি চিবিয়ে আবার ক্যাম্পের খাটিয়ায় ফিরে এসে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে যে যার বিছানায় চলে গেলাম।

আজ চব্বিশ তারিখ। ভোর বেলা আগের মতোই চা বিস্কুট টেন্টে এসে দিয়ে গেল। নিয়ম মতো আজই আমাদের সকাল দশটায় তাঁবু খালি করে দিয়ে চলে যাওয়া উচিৎ। আজ আমাদের দুপুর একটায় গাড়ি নিয়ে পুরুলিয়া রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যাওয়ার কথা। আমাদের ট্রেন, রূপসি বাংলা দুপুর তিনটে পঁয়ত্রিশ মিনিটে পুরুলিয়া থেকে ছাড়বে। গতকালের টাটা সুমোতে একটু আরামে বসা গেলেও, গাড়িটার ছাদে কোন ক্যারিয়ার নেই। আমাদের লাগেজ নিয়ে যাওয়ার বেশ অসুবিধা হবে বলে ক্যাম্পের ম্যানেজার, অসিতকে আগের দিনের গাড়িটা নিয়ে মহাদেবকে ঠিক সময় আসতে বলে দেওয়া হয়েছে। অসিত সত্যিই একজন যোগ্য ম্যানেজার, যেকোন অসুবিধায় ওকে সব সময় পাশে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, এই বানজারা ক্যাম্প্ সম্পর্কিত সকল মানুষই অত্যন্ত দায়িত্ববোধ সম্পন্ন ও ভালো। প্রথম দিনের গাড়িটিকে দ্বিতীয় দিন বাতিল করায়, মহাদেবের মধ্যে কোন ক্ষোভ বা বিরক্তি দেখিনি। দ্বিতীয় দিনের গাড়ির অর্জুনের সাথে অতটা সময় ধরে অতটা পথ নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়িয়ে পরের দিন তাকে না নিয়ে মহাদেবকে আবার ডাকায়, তার মধ্যেও কোন ক্ষোভ বা দুঃখ লক্ষ করিনি। বানজারার কর্মী মহাদেব, ইন্দ্র, গুরুপদ, গুরুং, বুলেট, দামু, বা আর সকলের ব্যবহার খুবই ভালো ও মনে রাখার মতো।   

আজ আমরা রুটি, সবজি, সিদ্ধ ডিম, জিলিপি ও চা সহযোগে প্রাতরাশ সেরে, অসিতের কাছে গিয়ে কালকের জেরক্স কপিগুলো দিয়ে বিল মিটিয়ে দিলাম। আজকের প্রাতরাশ ও মধ্যাহ্ন ভোজের জন্য মাথা পিছু দুশ’ পঁচিশ টাকা করে নেওয়া হলো। আমরা গাড়ির খরচ কম করার জন্য যদিও কোন অনুরোধ করিনি, তবু বাস্তবে গাড়ি নিয়ে ঘোরার খরচ যা শুনে এসেছিলাম, তার থেকে অনেকটাই কম নেওয়া হলো।

বাচ্চাটার খেতে অনেক সময় লাগে বলে, বাচ্চার খাবার অনেক আগে তাঁবুতে দিয়ে গেল। মালপত্র গোছগাছ করে, স্নান সেরে আমরা খেতে গেলাম। দেখলাম মহাদেব তার গাড়ি নিয়ে তৈরি। ক্যাম্পের ছেলেগুলোই টেন্ট থেকে আমাদের লাগেজ গাড়ির কাছে এনে জড়ো করে রাখলো। খাওয়া দাওয়া সেরে একবার টেন্টগুলো চেক্ করে আমরা গাড়ির কাছে এসে হাজির হলাম। আলাপ হলো সুজিত বাবুর সাথে। শুনলাম ইনি ম্যানেজার, অসিতের দাদা ও এই ক্যাম্পটির একজন অংশীদার। এখান থেকে সাত কিলোমিটার দুরে চৌবুড়ু ট্যুরিসম্ নামে তাঁর একটি হোমস্টে আছে। ছবি দেখালেন, বেশ ভালো লাগলো।

মহাদেবের গাড়ির ছাদে মালপত্র বাঁধাছাদা হয়ে গেছে, আমরা গাড়িতে এসে বসলাম। বিদায় সোনকুপি বানজারা ক্যাম্প, তোমাদের আতিথেয়তা আমাদের মুগ্ধ করেছে। পলাশের সময় আবার আসার ইচ্ছা নিয়ে আমরা ফিরে যাচ্ছি।

ট্রেন ছাড়ার অনেক আগেই মহাদেব আমাদের পুরুলিয়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিল। প্ল্যাটফর্মে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের সিট রিজার্ভ করা আছে। আমরা নিজেদের নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসলাম। নির্দিষ্ট সময় গাড়ি ছাড়লেও সামান্য বিলম্বে আমরা হাওড়ার পরিববর্তে সাঁত্রাগাছি স্টেশনে এসে নামলাম। সবশেষে যে কথাটা উল্লেখ না করলে এই সোনকুপি বানজারা ক্যাম্প নিয়ে লেখাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, সেটা হলো আমরা ফিরে আসার পর কিন্তু ক্যাম্পের ম্যানেজার অসিত ফোন করে খোঁজ নেয় যে আমাদের কোনরকম অসুবিধা হয়েছে কী না। এর পরেও কি আর কিছু অতিরিক্ত আশা করা উচিৎ? আমার তো মনে হয় না।

সুবীর কুমার রায়

০৯-১১-২০১৭

 

 

 

 

পন্ডিত মশাই (স্মৃতির পাতা থেকে) { লেখাটি বই পোকার কলম, বাংলায় লিখুন, উইপোকার কলম, ও পাক্ষিক ‘গল্পগুচ্ছ’পত্রিকায় প্রকাশিত।}

দাদারা তখন নাটক করার নেশায় মেতেছে। পন্ডিত স্যারের মেজছেলে, দাদার প্রাণের বন্ধু অশোকদাও, দাদার সাথে নাটকের দলে আছে। আর আছে পন্ডিত স্যারের সেই ভাইপো, আমার সহপাঠী বলাই, বা বাবু। এখনকার মতো তখন নাটকের এত চল্ ছিল না, দলতো ছিলই না। যতদুর মনে পড়ে “বন্ধন” নামে একটা নাটক সেদিন বড় রাস্তার ওপর “পাঠ ভবন” নামে একটা পাবলিক লাইব্রেরীতে সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হবে। দুপুর থেকেই দাদা, অশোকদা ও আরও সকলে নাটক নিয়ে খুব ব্যস্ত। হলে চেয়ার পাতা, মাইক বাঁধা, আলোর ব্যবস্থা করা, জোর কদমে চলছে। আজকের এই অনুষ্ঠানে পন্ডিত স্যার প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কিত করবেন।

সন্ধ্যাবেলা দাদা, অশোকদারা গ্রীনরুমে মেক-আপ নিয়ে ব্যস্ত। দর্শকরা কার্ড হাতে হলে ঢুকতে শুরু করেছে। মাইক্রোফোন হাতে পেয়ে পর্দার ওপাশ থেকে কে যেন একই কথা বারবার ঘোষণা করে চলেছে। ঘোষণার মাঝেমাঝে, কাম-সেপ্টেম্বর এর মিউজিকের রেকর্ড বাজানো হচ্ছে। হলের বাঁধানো মঞ্চে উঠবার জন্য দু’পাশে সিঁড়ি রয়েছে। পর্দার পিছন দিয়ে মঞ্চে যাবার ব্যবস্থা যেমন থাকে তাতো আছেই। হল থেকে বাঁধানো মঞ্চ বেশ উচু। যাহোক্, একসময় মঞ্চের পর্দা ধীরে ধীরে দু’পাশে সরে গেল। নিয়ম মতো উদ্বোধন সঙ্গীত ও দু’-একজনের বক্তৃতার পর, ঘোষণা করা হলো— এবার আমাদের প্রধান অতিথি, শ্রী রবীন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্য মহাশয়, কাব্য ব্যকরণ তীর্থ, ইত্যাদি ইত্যাদি, তাঁর মূল্যবান বক্তব্য রাখবেন।

পন্ডিত মশাই মঞ্চে এলেন। তাঁর সামনে মাইক্রোফোনটা সেট করে দিয়ে যাওয়া হলো। স্কুলের পড়ানোর কায়দায় তিনি মাঝেমাঝেই দুই পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে উঁচু হচ্ছেন, এবং বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘক্ষণ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও, তাঁর বক্তৃতা শেষ হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। ‘পাঠ ভবন’ হলও রাতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভাড়া দেওয়া হয়। বেশি দেরি হলে সম্পূর্ণ নাটক মঞ্চস্থ করায়, অসুবিধা দেখা দিতে পারে। কী ভাবে তাঁকে ক্ষান্ত করা যায়, এই নিয়ে দাদারা চিন্তায় পড়ে গেছে। এমন সময় তিনি বললেন, “এই তো গেল গোড়ার কথা, এখন দেখতে হবে, রস কয় প্রকার। রস প্রধানত তিন প্রকার, আদি, মধ্য ও অন্ত। এবার তিনি আদি রস ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন। অবস্থা যা দাঁড়ালো, তাতে এইভাবে রসের ব্যাখ্যা করতে গেলে নাটক তো দুরের কথা, তিনি অন্ত রসে পৌঁছনোর আগেই, ‘পাঠ ভবন’ হল ব্যবহার করার অনুমোদিত সময় অন্ত হয়ে যাবে। শেষে তাঁর কাছে গিয়ে ফিসফিস্ করে, বক্তব্য ছোট করার কথা বলার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু তিনি সেসব কথা শুনলে, তবে তো তাঁকে বলা হবে। যাইহোক, এইভাবে অনেক চেষ্টার পরে তিনি তাঁর মূল্যবান বক্তব্য শেষ করে, ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে প্রথম রোতে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট আসনে বসলেন। বহু আকাঙ্খিত নাটক শুরু হলো।

পন্ডিত স্যারের ভাইপো বাবু, যে আমার সাথে পড়তো, কৌতুক অভিনয় ভালোই করতো। এই নাটকেও সে একটা হাসির রোলে চুরান্ত অভিনয় করছে। দু’একবার হাততালিও পেয়েছে। পুরোদমে নাটক চলছে, এমন সময় পন্ডিত স্যার মঞ্চে ওঠার পাশের সিঁড়ি ব্যবহার না করে, পা উঁচু করে হাতে ভর দিয়ে একবারে দর্শকদের সামনে দিয়ে মঞ্চে উঠে, মঞ্চের মাঝখানে গিয়ে, বাবুর হাত ধরে বললেন— “এই বাবু, এদিকে আয়”। মঞ্চের সমস্ত অভিনেতারা দাঁড়িয়ে পড়েছে, অভিনয় বন্ধ। এবার তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললেন— এই যে বাবু, আমার ভাইপো, ভালো নাম বলাই ভট্টাচার্য্য, এর অভিনয় আমার খুব ভালো লেগেছে। এর অভিনয়ে খুশি হয়ে একে একটা মেডেল দেবার কথা ঘোষণা করছি। আজকের এই নাটকে সকলেই খুব ভালো অভিনয় করছে, ইত্যাদি কিছু কথা বলে, তিনি প্রায় একই কায়দায় মঞ্চ থেকে নীচে নেমে এসে নিজের আসনে বসলেন। নাটক আবার শুরু হলো।

সুবীর কুমার রায়

০৫-১১-২০১৭

 

বৃদ্ধ-বৃদ্ধা (স্মৃতির পাতা থেকে) { লেখাটি বই পোকার কলম, বাংলায় লিখুন, ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

ছেলেবেলার স্মৃতির অনেকের মধ্যে, দু’জনের কথা বেশ মনে পড়ে। একজন, ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়া এক বৃদ্ধা। সকলে বলতো তার বয়স নাকি একশ’ পাঁচ বছর। সত্যি কিনা জানিনা, তবে চেহারা দেখে মনে হতো, হলেও হতে পারে। হাড়ের ওপর কোঁচকানো চামড়া ছাড়া, তার শরীরে কোন মেদ তো ছিলই না, মাংস ছিল বলেও মনে হতো না। কিন্তু খালি চোখেও সে পরিস্কার দেখতে পেত। মুখটাতে যে কত আঁকিবুকি ভাঁজের দাগ ছিল, না দেখলে বোঝানো যাবে না। সকলেই তাকে “সুখীবুড়ি” বলে ডাকতো। তার বোধহয় এক-আধটা গরু ছিল। দুধ বিক্রি করে সে অতি কষ্টে সংসার চালাতো। নাম ছাড়া তার জীবনে আর কোন সুখ ছিল কিনা জানি না। আমরা এই সুখীবুড়ির পিছনে খুব লাগতাম। কেউ তার পিছন থেকে কাপড় ধরে টানলো, বুড়ি গালি দিতে দিতে তার দিকে তাড়া করে যেতেই, আর একজন কাপড় ধরে টানলো। বুড়ির কিন্তু গালাগালির ভান্ডারের স্টক্, খুবই সীমিত ছিল। তারমধ্যে “আঁটকুড়ির বেটা” বোধহয় প্রধান, ও সবথেকে প্রিয় ছিল। একদিন এইভাবে বুড়িকে রাগিয়ে ছুটে পালাতে গিয়ে, আমরা দু’জন ছেলে নিজেদের মধ্যে ধাক্কা লেগে পড়ে গেলাম। আর সেই সুযোগে বুড়ি আমার কব্জিটা চেপে ধরলো। মনে আছে, হাজার চেষ্টা করেও তার হাত থেকে নিজেকে কিছুতেই মুক্ত করতে পারি নি। পড়ে যখন ছাড়া পেলাম, তখন দেখি কব্জিতে গোল হয়ে কালো কালশিটে পড়ে, বুড়ির আঙ্গুলের দাগ হয়ে গেছে। পরদিন থেকে আবার সুখীবুড়ির পিছনে লাগা, যথারীতি চলতে লাগলো।

দ্বিতীয়জন একজন বৃদ্ধ। তখনও তাঁকে চিনতাম না। পরে জেনেছিলাম তাঁর ছেলে খুব ভাল নাট্য পরিচালক। সবাই তাঁকে চেনে। একদিন স্টেশনের কাছে ঐ বৃধ্ধকে দেখে হঠাৎ কী মন হলো, তাঁকে বললাম— “দাদু কেমন আছেন”? দাদু যে কেমন আছেন, তা জানার আমার যে খুব আগ্রহ ছিল তাও নয়, তবু হঠাৎ কী মনে হলো তাই বললাম। বৃদ্ধও হাসি মুখে বললেন, “ভালো আছি বাবা, তুমি ভালো আছো”? আমি কিছু বলার আগেই, বৃদ্ধ আমার হাতটা চেপে ধরে বললেন, “ফাজলামো হচ্ছে? দাদু? বলতো আমি কে, কোথায় থাকি”? বাপরে বাপ্, এ কী বুড়ো রে বাবা। বুড়ো কোথায় থাকে, সে যে কে, কী দিয়ে ভাত খেয়েছে, আমি কী করে জানবো? বাধ্য হয়ে বললাম, “এই তো একটু ওদিকে”। বৃদ্ধ চিৎকার করে লোক জড়ো করে ফেললেন। তিনি জনতার উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলেন, “দেখ বাবারা, দেখ, আমি নাকি একটু ওদিকে থাকি। আমার সাথে ফাজলামো হচ্ছে? একে পুলিশে দিয়ে তবে ছাড়বো”? এত কিছুর পরেও, তিনি কিছুতেই আমার হাত ছাড়েন না। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রচেষ্টায়, তাঁর হাত থেকে মুক্তি পেলাম। পরে তাঁর পরিচয় পেয়েছিলাম, তবে সেটা আর নাই জানালাম। আরও অনেক পরে একটা ঘটনায় এই বুড়ো যে কী জিনিস, বুঝতে পেরেছিলাম।

অনেকদিন পরে রেল লাইন ধরে স্টেশন যাবার পথে, একটা এমটি রেক তাঁকে ধাক্কা মারে। দু’তিনটে বগি তাঁর ওপর দিয়ে চলে যাবার পরে, চিৎকার চেঁচামিচিতে গাড়িটা দাঁড়িয়ে যায়। কিছু লোক তাঁকে ট্রেনের তলা থেকে বার করে আনে। কোথাও কোন আঘাত লাগেনি। বোধহয় ধাক্কা খাওয়ার আগেই, ভয়ে বা অন্য কোনভাবে, দুই লাইনের মাঝখানে পড়ে গিয়েছিলেন। পাথরে পড়ে গিয়ে হাতে পায়ে সামান্য আঘাত পেলেও, দুই লাইনের মাঝখানে এমন ভাবে পড়েন যে, ট্রেন তাঁর শরীর স্পর্শ করে নি। একটু ধাতস্থ হয়েই তিনি লাঠি উঁচিয়ে ইঞ্জিন ড্রাইভারকে মারতে, প্রায় ছুটে এগিয়ে যেতে, সকলে তাঁকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত করে।

সুবীর কুমার রায়

০৮-১০-২০১৭

 

 

অম্ল-মধুর { লেখাটি প্রতিলিপি-বাংলা, বই পোকার কলম, বাংলায় লিখুন , উইপোকার কলম, ‘মনের কথা ও সাহিত্য’ সঙ্গে আমরা ও পাক্ষিক ‘গল্পগুচ্ছ’ পত্রিকায় প্রকাশিত।}

ফেসবুক পাগল তপন আজ হঠাৎ এক মহিলার ছবি মোবাইলে দেখে একটু সময় নিয়ে ভাবতে বসলো। এই মহিলার নাম বা পদবি, কোনটাই তার পরিচিত না হলেও, ছবিটা যেন অতি পরিচিত বলে মনে হলো। কিছুতেই মনে করতে না পেরে তার প্রোফাইল খুলে দেখতে দেখতে কলেজ ছাড়ার পরের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। প্রায় রোজই সে দু’-তিনজন বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে সন্ধ্যার পর স্থানীয় রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে আড্ডা দিতো। তখন প্ল্যাটফর্মগুলো আজকের মতো এত সাজানো গোছানো ছিল না, এতো উজ্জল আলোও জ্বালা হতো না। বেশ দুরে দুরে কিছু অল্প পাওয়ারের বাল্ব, লাইট পোস্টের নীচের কিছুটা অংশ আলোকিত করতো মাত্র।

সন্ধ্যার পর একজন বৃদ্ধ প্ল্যাটফর্মের দক্ষিণ দিক থেকে এসে ও একজন বৃদ্ধা প্ল্যাটফর্মের উত্তর দিক থেকে প্রায় একই সময় এসে, আলো আঁধারিতে একটা গাছের নীচে নির্দিষ্ট বেঞ্চে পাশাপাশি বসে গল্প করতেন। ঘন্টাখানেক পরে তাঁরা আবার যে যার পথে ফিরে যেতেন। সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত তরতাজা তপনরা ধরেই নিয়েছিল যে তাঁদের মধ্যে একটা প্রেমপর্ব চলছে, অতীতের ব্যর্থ প্রেমও দীর্ঘদিন পড়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে থাকতে পারে।

মহিলাটির প্রোফাইল ঘেঁটে তপন তাকে চিনতে পারে। আজ থেকে প্রায় বিয়াল্লিশ বছর আগে বাইশ বছরের তপনের বছর সতেরোর অল্প পরিচিত এই মহিলাটির সাথে আলাপ হয়েছিল। আজও তপনের বেশ মনে পড়ে, সেদিনের সেই মেয়েটি তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল, বোঝাতে চেয়েছিল। সব বুঝেও না বোঝার ভান করে তপন সেদিন পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ সেদিন সে বেকার ছিল। তারপর থেকে দু’জনের আর কোনদিন দেখা হয় নি।

আজ এতগুলো বছর পরে রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মের সেই বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার মুখ দুটো কিছুক্ষণ মনে করার চেষ্টা করে, শেষে মহিলাটিকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট্ পাঠিয়েই দিলো।

সুবীর কুমার রায়

২৯-০৯-২০১৭